Text Size

২০২৫০৩৩০ ‘গুরু আজ্ঞা’ অনুষ্ঠানে প্রাতঃকালীন প্রবচন

30 Mar 2025|Duration: 03:56:06|Bengali|Public Address|Madurai, India

নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী ৩০শে মার্চ , ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ইসকন মাদুরাই, ভারতে প্রদান করেছেন।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
 যৎ কৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
 পরমানন্দমাধবম্ শ্রীচৈতন্য ঈশ্বরম্
 হরি ওঁ তৎ সৎ

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: গৌরাঙ্গ! নিত্যানন্দ! আমরা সিডিএমকে ধন্যবাদ জানাই এই সুন্দর অ্যাপটির জন্য এবং আমরা বলরাম গোবিন্দ দাস আর তার পরিবারকেও ধন্যবাদ জানাই তাদের অত্যন্ত সুন্দর আতিথেয়তার জন্য। আমি দেখছি যে তার পুত্রেরা, তার পুত্রবধূরা সকলেই অত্যন্ত ব্যস্ত। আমি শঙ্খধারী দাসের কাছেও অত্যন্ত কৃতজ্ঞ তার আশীর্বাদের জন্য। সম্ভবত এটি মাদুরাইয়ের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হল।  তাহলেও এটি সবচেয়ে বড় নয়, কারণ অনেক ভক্তরা রয়েছেন যারা বাইরে থেকে এই অনুষ্ঠান দেখছে, প্রসাদ হলেও একটি বড় পর্দা রয়েছে যেখানে তারা এই অনুষ্ঠান, যা এখানে চলছে সেটা দর্শন করছে। যাইহোক, এমন কোন মন্দির যদি থাকে যাদের শহরের মধ্যে সবচেয়ে বড় হল রয়েছে তারা আমাদেরকে আহ্বান জানাতে পারে। যদিও সেক্ষেত্রে কেবল বড় হলের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় বড় হৃদয়ের!

ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সমগ্র দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করেছিলেন এবং তিনি যে যে স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন সেই সেই স্থানে তার শ্রীপাদপদ্ম চিহ্ন স্থাপন করার প্রয়াস আমরা করছি। মানুষজনের জানা প্রয়োজন যে কোন কোন স্থানে তিনি ভ্রমণ করেছিলেন! আমি সাফারি ভক্তদেরও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি যে তারা এই কার্য সম্পাদনে সহায়তা করছেন।আমরা যারা মনুষ্যদেহ লাভ করেছি এবং যারা বিশেষত এই ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছে তারা অত্যন্ত ভাগ্যবান। যদিও ক্রমান্বয়ে এই দেহটির একদিন মৃত্যু ঘটবে কিন্তু আমাদের প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে আমরা এই দেহটিতে থাকা চিন্ময় আত্মা। উপনিষদে বর্ণিত হয়েছে যে মনুষ্যদেহে থাকা এই আত্মার আয়তন কেশাগ্রের দশ হাজার ভাগের এক ভাগ। একটি চুলের আগা নিন তাকে ১০০ ভাগ করুন এবং তাকে আবার ১০০ ভাগ করুন, অত্যন্ত ক্ষুদ্র! কিন্তু তা চিন্ময়। মন্ট্রিয়লে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ডাক্তার ছিলেন তিনি বলেছিলেন মনুষ্য হৃদপিণ্ডে এমন কিছু রয়েছে যা রক্তকে সক্রিয় করে, যাকে তিনি ‘টিকার’ বা স্পন্দনকারী নাম দিয়েছেন, টিক-টিক-টিক-টিক! কিন্তু আমরা এটাকে বলি আত্মা।  আপনাদের সকলকে সুন্দর দেখায় কারণ আপনাদের মধ্যে আত্মা রয়েছে। এই আত্মা রয়েছে বলেই চেতনা রয়েছে এবং এই চেতনাই সমগ্র শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই জানে না যে তারা নিত্য। দেহটি অনিত্য কিন্তু তার মধ্যে থাকা চিন্ময় আত্মা নিত্য। তবে আপনাদের এই অপ্রাকৃত জ্ঞান রয়েছে.  ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায়, ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় আপনারা চিন্ময় জগতে ফিরে যেতে পারেন এবং আপনাদের নিত্য দেহ লাভ করতে পারেন।  ভগবানের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্কের ভিত্তিতে সেই নিত্য দেহ নির্ধারিত হবে।  প্রধান পাঁচটি সম্পর্ক রয়েছে। শান্ত সম্পর্ক, যেমন গাছেদের সঙ্গে, গাভীদের সঙ্গে ভগবানের সম্পর্ক যারা ভগবানের মহত্ত্বকে উপলব্ধি করে।  তারপর রয়েছে দাস্য সম্পর্ক, যেমন হনুমান যিনি ভগবান শ্রী রামের একজন দাস এবং তিনি ছিলেন সরল। একবার তিনি ভেবেছিলেন যে মাতা সীতা তার কপালে কেন কুমকুম লাগায়? সীতা দেবী তাকে বলেছিলেন যে এটি ভগবান শ্রীরামকে অত্যন্ত প্রীত করে। তখন হনুমান ভাবলেন এই কুমকুম শ্রীরামকে প্রীত করে! তখন তিনি তার সর্ব অঙ্গে কুমকুম লাগিয়ে এলেন! আপনারা হনুমানের সেই লাল রংয়ের রূপ দেখেছেন? উনি দেখেছেন, উনিও দেখেছেন আর আপনারা কারা দেখেছেন?

আরেকটি সম্পর্ক হল বন্ধুত্বের। বৈকুণ্ঠের বন্ধুত্ব শ্রদ্ধাভিত্তিক হয়ে থাকে কিন্তু গোলোক বৃন্দাবনের বন্ধুত্ব অধিক অন্তরঙ্গ, শ্রদ্ধাভিত্তিক নয়। কৃষ্ণ এবং বলরাম তাদের সেই সব বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করে। যখন তারা বৃন্দাবনের গোচারণ ভূমিতে তাদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা ভোজন করে তখন প্রত্যেক গোপসখা মনে করে যে কৃষ্ণ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কিন্তু একসাথে সব ভক্তদের দিকে তাকানো সাধারনত সম্ভব নয়। তারা আবার একসঙ্গে কুস্তি করে আর সেই কুস্তিতে যে হেরে যাবে তাকে যে জিতবে তাকে নিয়ে নিজের কাঁধে চড়িয়ে ভ্রমণ করাতে হবে। একবার প্রলম্বাসুর নামে এক অসুর গোপবেশে এসেছিল। বলরাম তাকে পরাজিত করে তাই তাকে বলরামকে কাঁধে চরাতে হয় এবং সে বলরামকে নিয়ে পালিয়ে যায় আর তারপর তার দেহকে বড়ো করতে থাকে। বলরাম গোপভাব আস্বাদনে মগ্ন ছিলেন।  কিন্তু অসুরটি তার দেহকে অনেক বড় করে ফেলেছিল, তারপর বলরাম বুঝতে পারেন যে এই ব্যক্তিটি একজন অসুর এবং সে ভাবে যে আরো একজন অসুর কৃষ্ণের ক্ষতি করতে এসেছে আর তখন সে প্রলম্বাসুরের মাথায় আঘাত করে এবং সেই  অসুরটি মারা যায়। কৃষ্ণ এবং বলরামের মধ্যে এইরকম বন্ধুত্বের সম্পর্কও বিরাজ করে। তারপর সকলে বলরামকে অভিনন্দন জানায় এবং তাকে আলিঙ্গন করে যে সে অসুরের হাত থেকে কোনক্রমে বেঁচে গেছে।  কৃষ্ণ এবং বলরাম- তাদের মধ্যে কৃষ্ণ হলেন আদি পুরুষ ভগবান এবং বলরাম তার প্রথম প্রকাশ। তারপর রয়েছে বাৎসল্য ভাবের সম্পর্ক, যেমন মা যশোদা এবং কৃষ্ণের মধ্যে সম্পর্ক। আমরা দামোদর মাসে ভগবানকে দ্বীপদান করে থাকি।  মা যশোদা ভগবানকে বন্ধন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যতবারই তিনি প্রয়াস করেছেন ততবারই রজ্জু দু-আঙ্গুল করে ছোট হয়ে যেত।  তারপর মা যশোদার নিবিড় ভক্তি এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস দেখে প্রীত হয়ে ভগবান নিজে মা যশোদার হাতে বাঁধা পড়েছিলেন তাই কৃষ্ণের আরেক নাম দামোদর।

আরেক প্রকার পঞ্চম সম্পর্ক হল বৃন্দাবনের গোপীগণ এবং দ্বারকার মহিষীগণের সঙ্গে ভগবানের সম্পর্ক।  চিন্ময় জগতে এই সকল সম্পর্ক প্রকৃতরূপে বিরাজ করে কিন্তু এই জড়জগতে আমরা কেবল সেসব সম্পর্কের বিপরীত অথবা বিকৃত প্রতিফলন দেখতে পাই। ভক্তিমূলক সেবা সম্পাদনের নয়টি পদ্ধতি রয়েছে। প্রথম দুটি হলো শ্রবণ এবং কীর্তন। কলিযুগে এর মাধ্যমে আমরা আমাদের অন্তরে থাকা শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেমকে পুনরায় জাগরিত করতে পারি। গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! নিত্যানন্দ! নিত্যানন্দ! নিত্যানন্দ! ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা এই পাঁচটি সম্পর্কের যেকোনো একটিতে স্থিত হতে পারি।

আমি কাল কথা দিয়েছিলাম যে কালকের কিছু প্রশ্নের উত্তর আমি আজকে দেব।

প্রশ্ন: অনেক সময় আমরা দেখতে পাই ভক্তরা কুনজর নিয়ে চিন্তিত হয়। যার জন্য তারা অনেক সময় সত্যকে গোপন করে অথবা মিথ্যা বলে। ভক্তরা যদিও জানে যে কৃষ্ণ হচ্ছেন পরম নিয়ন্ত্রক তাহলে অন্যদের হিংসা তাদের ক্ষতি করবে এমনটা তারা কেন মনে করে?  

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী : বলা হয় যে যখন আমরা কৃষ্ণের প্রতি পূর্ণ শরণাগত হব তখন আমরা ভয় মুক্ত হতে পারব। কারন আমরা তখন কৃষ্ণের আশ্রয়ে আছি বলে জানবো। প্রহ্লাদ যিনি ভগবানের প্রতি পূর্ণ শরণাগত ছিলেন তার পিতা সৈন্যদের তাকে মেরে ফেলার আদেশ দিয়েছিল। তখন তারা তার দিকে অস্ত্র ছুড়ে ছিল কিন্তু সেই সকল অস্ত্র তার গায়ে স্পর্শ হওয়া মাত্র নীল পদ্মে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। তারা তাকে বিষ দিয়েছিল কিন্তু তিনি তা ভগবানকে নিবেদন করেন এবং সেই বিষ শুদ্ধ হয়ে যায়। এভাবে সপ্তম স্কন্ধতে বর্ণিত হয়েছে কিভাবে হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে মারার প্রয়াস করেছিলেন। আমরা মাদুরাই থেকে দেড় ঘন্টা মতো দূরের একটি মন্দিরে গিয়েছিলাম যেখানে ব্রহ্মা বিষ্ণু এবং শিব কিভাবে হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করা হবে তার পরিকল্পনা করতে একত্রিত হয়েছিলেন এবং তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ভগবানের নরসিংহ রূপ তাকে হত্যা করবে।

প্রশ্ন: কিভাবে আমাদের সন্তানদেরকে কৃষ্ণভাবনার অনুশীলনের আগ্রহী করানো যায়? আমরা দেখতে পাই যে অভিভাবকগণ এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে কৃষ্ণভাবনার অনুশীলন করানো নিয়ে যেমন অন্ততপক্ষে এক মালা জপ করা নিয়ে, প্রসাদ গ্রহণ এবং জড়জাগতিক চলচ্চিত্র দেখা থেকে তাদেরকে বাধা দেওয়ার সময় প্রতিদিন সংগ্রাম চলতে থাকে। সন্তানেরা ভক্তদের চেয়ে বেশি অভক্তদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায়। সেই সকল অভিভাবকগণকে দেখে মনে হয় যে তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে।  তাই দয়া করে কিছু বলুন গুরু মহারাজ। 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী : জগদীশ প্রভু গুরুকুল বিষয়ে প্রভুপাদের সকল উক্তি সংগ্রহ করেছেন। তিনি সন্তানদের বিভিন্ন মানসিক স্থিতি সম্বন্ধে সেখানে উল্লেখ করেছেন যে কিভাবে ছোট শিশুরা আমাদের কৃষ্ণভাবনার দর্শনকে বুঝতে পারেনা, কিন্তু তারা দেহ এবং আত্মার মধ্যের পার্থক্য বুঝতে পারে। দু-তিন দিন আগে আমি এখানে ‘শ্রীল প্রভুপাদ শিক্ষালয়’ নামে শ্রীল প্রভুপাদের একটি স্কুলে গিয়েছিলাম। সেখানে তারা শিশুদের পুঁথিগত বিদ্যা এবং কৃষ্ণভাবনামৃত দুইই প্রদান করছে।  এটি একটি কোন ছোট বিষয়ের প্রশ্ন নয়, এটি একজনের সারা জীবনের ব্যাপার। তাই যদি আপনি পিতা অথবা মাতা হতে চলেছেন তবে আপনার এটা দেখা দরকার যে সন্তানেরা যেন পুনরায় জন্ম-মৃত্যুর চক্রে পতিত না হয়। গৃহস্থরা এ বিষয়ে আরো ভালো কিছু জানতে পারে। আমাকে প্রশ্ন-উত্তর পর্ব এখানেই সমাপ্ত করতে বলা হল।

“হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে”

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by পায়েল চন্দ্র 19/02/2026
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions