Text Size

২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ

21 Jul 2021|Duration: 01:08:53|Bengali|শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য গ্রন্থ|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ কর্তৃক সংকলিত শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য গ্রন্থ। ২১শে জুলাই ২০২১, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারতবর্ষ। 

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎ-কৃপা তম্ অহং বন্দে শ্রী-গুরুং দীন-তারণম্
পরমানন্দং মাধবং শ্রী চৈতন্য ইশ্বরম্
হরিঃ ওঁ তৎ সৎ

ভূমিকা: আজ আমরা শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামক গ্রন্থের ক্রমাগত সংকলন বজায় রাখব।

ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ 

এই বিভাগাধীন: ভগবানের শ্রীবৃন্দাবনে গমণের প্রয়াস।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪২

বৈষ্ণব-নিন্দুকের অপরাধ-খণ্ডনের একমাত্র উপায় বৈষ্ণব-বন্দন ও হরিনাম-কীর্তন—
হেনই সময়ে এক আসিয়া ব্রাহ্মণ।
দৃঢ় করি’ ধরিলেন প্রভুর চরণ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: ঠিক সেই সময় সেখানে একজন ব্রাহ্মণ এলেন এবং দৃঢ়ভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীচরণপদ্ম ধরলেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪৩

দ্বিজ বলে,—“প্রভু, মোর এক নিবেদন।
আছে, তাহা কহি যদি ক্ষণে দেহ মন॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সেই ব্রাহ্মণ বললেন, “হে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, আমার একটি নিবেদন আছে। আপনি যদি আমার কথাটি এক মুহুর্তের জন্য মনোযোগ দিয়ে শুনেন তবে আমি সেটি কি বলব।” 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪৪

ভক্তির প্রভাব মুঞি পাপী না জানিয়া।
বৈষ্ণব করিনু নিন্দা আপনা’ খাইয়া॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “আমি এতই পাপীষ্ঠ যে আমি ভক্তিমূলক সেবার কোন মাহাত্য জানতাম না, তাই আমি বৈষ্ণবগণের নিন্দা করে নিজেকে অধঃপতিত করেছি।” 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪৫

‘কলিযুগে কিসের বৈষ্ণব, কি কীর্তন।
এই মত অনেক নিন্দিনু অনুক্ষণ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “আমি সর্বদাই এই প্রকারের নিন্দনীয় বক্তব্য রাখতাম যে, “কলিযুগে কে বৈষ্ণব হতে পারে, আর এই কীর্তনই বা কি?” 

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: কলিযুগে তর্কহত ব্যক্তিগণ ‘বৈষ্ণব’ হইতে পারে না, যেহেতু তাহাদের ভগবৎকীর্তনের সম্ভাবনা নাই; সুতরাং বৈষ্ণবতা ও কীর্তন কলিযুগে সম্ভব নহে—এই প্রকার নিন্দা পাপিষ্ঠগণ সর্বদা করিত।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: একবার শ্রীল প্রভুপাদ একটি বলেছিলেন যে, একবার একজন ভক্ত কোন এক অভক্তকে বলছিলেন, “দয়া করে কীর্তন করুন, কীর্তন করুন, কীর্তন করুন,” আর সে উত্তর দিত, “আমি পারব না, পারব না, পারব না।” প্রকৃতপক্ষে, সে অনেকগুলি শব্দ বলল, তবে সে যদি কেবল হরেকৃষ্ণ কীর্তন করত তা হলেই সে এই কলিযুগের জন্য যে বিধান তা পূর্ণ করতে পারত, কিন্তু পাপীরা সাধারণত সবসময় হরেকৃষ্ণ কীর্তন না করার জন্য অনেক প্রকারের অজুহাত মনে করে। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪৬

এবে প্রভু, সেই পাপকর্ম সঙরিতে।
অনুক্ষণ চিত্ত মোর দহে’ সর্বমতে॥

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: সঙরিতে—স্মরণ করিতে, মনে পড়িলে।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “হে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, এখন আমি যখন সেইসকল পাপাচারের কথাগুলি মনে করি আমার অন্তর ক্রমাগত অনুতাপে দগ্ধীভূত হচ্ছে।” 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪৭

সংসার-উদ্ধার-সিংহ তোমার প্রতাপ।
বল মোর কিরূপে খণ্ডয়ে সেই পাপ॥”

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “হে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, আপনি সিংহের ন্যায় শক্তিশালী। কৃপাপূর্বক আমাকে বলুন কীভাবে এই পাপগুলি খণ্ডন করা যায়।”

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪৮

শুনি’ প্রভু অকৈতব বিপ্রের বচন।
হাসিয়া উপায় কহে শ্রীশচীনন্দন॥

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: অকৈতব—কপটতাবিহীন, সরল।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সেই ব্রহ্মণের আন্তরিক ও সরল কথা শুনে প্রভু শ্রীশচীনন্দন মৃদু হাসলেন এবং তাঁহাকে প্রতিকারের জন্য বিধান দিলেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪৯

যে মুখে বিষপান, সেই মুখেই অমৃতসেবন-প্রভাবে অমরত্ব-লাভ—
“শুন দ্বিজ, বিষ করি যে মুখে ভক্ষণ। 
সেই মুখে করি যবে অমৃত-গ্রহণ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “শোন হে ব্রাহ্মণ, যে গরল পান করেছে তার একই মুখে অমৃত পান করা আবশ্যক।” অতএব তুমি যদি তোমার মুখ দিয়ে বিষ পান করে থাকো, তার প্রতিকার হচ্ছে তোমার একই মুখে অমৃত পান করা। অন্য কথায় বলা যায় দিব্যনাম কীর্তন তা সকলই শোধন করে দেবে। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫০

বিষ হয় জীর্ণ, দেহ হয়ত অমর।
অমৃত-প্রভাবে, এবে শুন সে উত্তর॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “তখন বিষের প্রভাব ব্যার্থ হয়ে যাবে, এবং অমৃতের প্রভাবে তার দেহ অমর হয়ে যাবে। এখন আমি এর অর্থ ব্যাখ্যা করব।”

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫১

অজ্ঞতাক্রমে বৈষ্ণবনিন্দা বিষপান-তুল্য—
না জানিয়া তুমি যত করিলা নিন্দন।
সে কেবল বিষ তুমি করিলা ভোজন॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “অজ্ঞতার বশে তুমি যে সমস্ত নিন্দনীয় বক্তব্য রেখেছ তা হ’ল বিষ গ্রহণের মতো।” ভগবান বা তাঁর ভক্তগণের নিকট অপরাধ করা বা হরিনাম সঙ্কীর্তনের প্রকৃয়াকে কেউ নিন্দা করাটি হ’ল কারও বিষ পান করার মতো। বহু মানুষ অজ্ঞতার বশে ভক্তদের ভর্ৎসনা করে এবং পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু চেঁচিয়ে অপরাধমূলক বক্তব্য বলে থাকে, তাই এই সমস্ত জিনিস হ’ল বিষ গ্রহণের মতো। তারা জানে না যে ভক্তরা নিঃশর্তে, উপকারমূলক সেবা করছেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫২

জ্ঞানোদয়ে অমৃতপানতুল্য বৈষ্ণব-বন্দন-ক্রমে বিষক্রিয়ার বিনাশ—
পরম-অমৃত এবে কৃষ্ণ-গুণ-নাম। 
নিরবধি সেই মুখে কর তুমি পান॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “এখন তোমার অবশ্যই একই মুখে নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের নাম ও অপার মহিমা কীর্তনের শ্রেষ্ঠ অমৃত পান করা উচিত।”

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: তথ্য। 

যৎকীর্তনং যৎস্মরণং যদীক্ষণং যদ্বন্দনং যচ্ছ্রবণং যদর্হণম্।
লোকস্য সদ্যো বিধুনোতি কল্মষং তস্মৈ সুভদ্রশ্রবসে নমো নমঃ। 
(ভাঃ ২/৪/১৫),

“আমি সেই সর্বমঙ্গলময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করি, যাঁর যশগাঁথা কীর্তন, স্মরণ, দর্শন, বন্দন, শ্রবণ এবং পূজনের ফলে সমস্ত পাপরাশি অচিরেই ধৌত হয়।” 

নোত্তমশ্লোকবার্তানাং জুষতাং তৎকথামৃতম্‌। 
স্যাৎসম্ভ্রমোঽন্তকালেঽপি স্মরতাং তৎপদাম্ভূজম্॥ 
(ভাঃ ১/১৮/৪)।

“তাঁর এরকম হইয়া বিচিত্র নয়, কেননা যাঁরা উত্তমশ্লোক ভগবানের বার্তাকেই অবিরত রত করে থাকেন, যাঁরা নরন্তর ভগবানের কথারূপ সেই অমৃত পান করেন এবং তাঁর চরণ-কমল স্মরণ করেন, জীবনের অন্তিম সময়েও তাঁদের বুদ্ধি-বিভ্রম হয় না।”

একান্তলাভং বচসো নু পুংসাং সুশ্লোকমৌলের্গুণবাদমাহুঃ । 
শ্রুতেশ্চ বিদ্বদ্ভিরুপাকৃতায়াং কথাসুধায়ামুপসং প্রয়োগম্‌ ॥ 
(ভাঃ ৩/৬/৩৭)।

“পুণ্যশ্লোক ভগবানের কার্যকলাপ এবং গুণাবলী কীর্তন করাই মানবজীবনের সর্বোচ্চ সিদ্ধি। ভগবানের এই সমস্ত কার্যকলাপ মহান ঋষিগণ এমনই সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন যে, কেবল তার সমীপবর্তী হওয়ার ফলেই শ্রবণেন্দ্রিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয়।”

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: ভগবানের গুণমহিমার আলোচনা ও কীর্তন করে মুখটি শুদ্ধ করা যায় এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা শ্রবণ করার মাধ্যমে কর্ণদ্বয়কে শুদ্ধ করা যায়, অতএব এই প্রকারে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গুণগাঁথা কীর্তন ও শ্রবণের কার্যে ব্যবহার করা যায় আর এভাবেই সেই ইন্দ্রিয়গুলির অস্তিত্বকে বিশুদ্ধ করে তোলা যেতে পারে। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫৩

যে মুখে করিলা তুমি বৈষ্ণব-নিন্দন।
সেই মুখে কর’ তুমি বৈষ্ণববন্দন ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “যে মুখ দিয়ে তুমি বৈষ্ণবগণের নিন্দা করেছ সেই মুখেই তোমার বৈষ্ণবের মহিমা কীর্তন করা উচিত।”

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: অপরাধী ব্যক্তি যে মুখে বৈষ্ণব-নিন্দা করে, সেই মুখে অনুতপ্ত হইয়া নিজাপরাধ স্বীকারপূর্বক বৈষ্ণব-বন্দনা করিলে তবে তাহার মঙ্গললাভ ঘটে। যেরূপ বিষভক্ষণ করিলে বিষের ক্রিয়ায় শরীর জর জর হয়, আবার বিষনাশক অমৃত পান করিলে ঐ বিষ নষ্ট হইয়া শরীর পুনরায় সবল হয়, তদ্রুপ বৈষ্ণবনিন্দা পুনরায় না করিলে কোটি প্রায়শ্চিত্তেও বৈষ্ণবনিন্দা-জনিত যে পাপ দূর হয় না, সেই পাপ বৈষ্ণবের স্তুতির দ্বারাই দূরীভূত হয়।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সুতরাং কখনো কখনো ভক্তরা প্রশ্ন করেন যে কিভাবে তাঁরা বৈষ্ণব অপরাধ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে তাঁরা যদি অনুশোচনা করে, এবং অন্য কোনও অপরাধ করা থেকে বিরত থাকেন, এবং একই বদনে বৈষ্ণবের মহিমা কীর্তন করেন, এই প্রকারে তাঁরা শুদ্ধ হতে পারেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫৪

সবা’ হৈতে ভক্তের মহিমা বাড়াইয়া

সঙ্গীত কবিত্ব বিপ্র কর তুমি গিয়া॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “হে ব্রাহ্মণ, যাও এবং ভক্তের গৌরবগাঁথা ও মহত্বের বর্ণনাকারী গীত ও কবিতা রচনা করো। 

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: তথ্য। 

তৎ কথ্যতাং মহাভাগ যদি বিষ্ণুকথাশ্রয়ম্। 
অথবাস্য পদাম্ভোজ-মকরন্দলিহাং সতাম্‌। 
(ভাঃ ১/১৬/৬)।

“এই সমস্ত ঘটোনা যদি কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় হয়, তা হলে দয়া করে আপনি আমাদের কাছে তা বর্ণনা করুন। ভগবদ্ভক্তেরা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের মধু লেহনকারী।” 

মাহাত্ম্যং বিষ্ণুভক্তানাং শ্রুত্বা বন্ধাদ্বিমুচ্যতে॥ 
(ভাঃ ৬/১৭/৪০)।

“কেউ যদি শুদ্ধ ভক্তের শ্রীমুখ থেকে চিত্রকেতুর এই ইতিহাস শ্রবণ করেন, তা হলে তিনি সংসার-বন্ধন থেকে মুক্ত হন।”

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫৫

ভক্তের মহিমার অসমোর্ধ্বত্ব স্থাপনপূর্বক সঙ্গীত, কাব্যাদি রচনা বা কীর্তন-প্রভাবে নিন্দাবিষের সংহার—
কুশ-পরান অমুতে তোমার।
নিন্দা-বিষ যত সব করিব সংহার॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “শ্রীকৃষ্ণের মহিমাগুলি চিন্ময় অমৃতে পূর্ণ, এবং সেগুলি নিন্দামূলক বিষাক্ততার প্রভাবগুলিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।” 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫৬-৪৫৮

এই সত্য কহি, তোমা’ সবারে কেবল।
না জানিয়া নিন্দা যেবা করিল সকল ॥

নির্বুদ্ধিতাক্রমে বৈষ্ণবনিন্দার প্রায়শ্চিত্ত-সর্বতোভাবে চিরদিনের জন্য বৈষ্ণবনিন্দা পরিত্যাগপূর্বক বিষ্ণুবৈষ্ণবের নিরন্তর গুণকীর্তন—

আর যদি নিন্দ্য-কর্ম কভু না আচরে।
নিরন্তর বিষ্ণু-বৈষ্ণবের স্তুতি করে॥

এ সকল পাপ ঘুচে এই সে উপায়।
কোটি প্রায়শ্চিত্তেও অন্যথা নাহি যায়॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “আমি আপনাদের সত্যটি বলছি। কেউ যদি অজ্ঞতার বশে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অথবা বৈষ্ণবের নিন্দা করে তারা মুক্তি পেতে পারে যদি তারা সর্বদাই ভগবান শ্রীবিষ্ণু ও বৈষ্ণবের মহিমা কীর্তন করতে থাকে এবং পুনরায় আর কখনোই নিন্দায় জড়িয়ে না পড়ে। এমনকি লক্ষ লক্ষবার প্রায়শ্চিত্ত তাদের মুক্তি দিতে পারেনা। সুতরাং, সুতরাং, কীভাবে অপরাধ বা নিন্দা করা থেকে মুক্তি পেতে হবে এটি তার রহস্য। কেউ যদি কেবল তার জিহ্বা ব্যবহার করে, ভগবান শ্রীবিষ্ণু ও বৈষ্ণবের গুণকীর্তন করার জন্য তার মুখ ব্যবহার করে তা হলে সে তার অপরাধগুলি থেকে মুক্তি পেতে পারে।” 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৫৯

প্রভুর দ্বিজকে ভক্তমহিমা বর্ণনার্থ আদেশ, তৎফলেই তাহার অপরাধ খণ্ডন সম্ভব—
চল দ্বিজ, কর’ গিয়া ভক্তের বর্ণন।
তবে সে তোমার সব-পাপবিমোচন॥”

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: “হে ব্রাহ্মণ, যাও, গিয়ে ভক্তদের মহিমা কীর্তন করো এবং তা হলেই তুমি সমস্ত পাপের ফল থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।”

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৬০

বৈষ্ণবগণের জয়ধ্বনি— 
সকল বৈষ্ণব শ্রীমুখের বাক্য শুনি।
আনন্দে করয়ে জয় জয় হরিধ্বনি॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: ভগবান শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীমুখপদ্ম হতে এই বাণী শ্রবণ করে সমস্ত বৈষ্ণবগণ আনন্দের সাথে কীর্তন করতে লাগলেন, “জয়! জয়! ভগবান শ্রীহরির জয় হোক! হরিবোল! 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৬১

শ্রীগৌরসুন্দরকর্তৃক নিন্দাপরাধের ব্যবস্থা—
নিন্দা-পাতকের এই প্রায়শ্চিত্ত সার।
কহিলেন শ্রীগৌরসুন্দর অবতার॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: ভগবান শ্রীগৌরসুন্দর এভাবেই পাপী মানুষ যারা নিন্দামূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে, তাদের জন্য সমস্ত প্রায়শ্চিত্তের সারমর্ম প্রকাশ করলেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৬২

উক্ত আজ্ঞা লঙ্ঘনকারীর দুঃখের অবধি নাই— 
এই আজ্ঞা যে না মানে’, নিন্দে’ সাধুজন।
দুঃখ-সিন্ধু-মাঝে ভাসে সেই পাপিগণ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সেই সমস্ত পাপী লোক যারা এই নির্দেশ গ্রহণ করে না এবং সাধুদিগের নিন্দা করে তারা দুঃখ-দুর্দশার সাগরে ভাসতে থাকে। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৬৩

বেদসার শ্রীচৈতন্যাজ্ঞাপালনে সুখে ভবসিন্ধু-উত্তরণ—
চৈতন্যের আজ্ঞা যে মানয়ে বেদসার। 
সুখে সেই জন হয় ভবসিন্ধু-পার॥ 

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সেই সমস্ত ব্যক্তি যাঁরা ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশগুলিকে বেদের সাররূপে গ্রহণ করেন তাঁরা আনন্দের সহিত জড়বন্ধনময় সমুদ্রকে অতিক্রম করে যান। 

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: যে সকল পাপী শ্রীচৈতন্যদেবের আদেশ পালন করে এবং তাঁহাকেই ধ্রুবসত্য জানিয়া বৈষ্ণবচরণে স্বীয় অপরাধ ক্ষমা করাইয়াই লয়, সেই সকল ব্যক্তিই ভবসিন্ধু পার হইয়া শ্রীচৈতন্যের বাক্যে আস্থা স্থাপন এবং নিজমঙ্গল লাভ করে।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সুতরাং, এই হচ্ছে কুলিয়াদ্বীপের মাহাত্য যেখানে কেউ যদি ক্ষমা ভিক্ষা করে এবং বৈষ্ণগণের মহিমা কীর্তন করে এবং এভাবে তাঁদের প্রতি নিন্দনীয় কাজ করা থেকে এড়িয়ে থাকে, তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারে। তাই নবদ্বীপ পরিক্রমাতে, আমরা যখন কোলদ্বীপে পৌঁছাই সেখানেই কুলিয়াদ্বীপ একটি স্থান রয়েছে, যেখানে সমস্ত অপরাধ খণ্ডন করা হয়। তাই আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশের সেই সুবিধা গ্রহণ করি, আমরা কুলিয়ায় যাই এবং সেখানে দিব্যনাম কীর্তন করি এবং বৈষ্ণবগণের মহিমা কীর্তন করি আর কোন প্রকারের অপরাধ করা থেকে এড়িয়ে চলি। 

ভগবানের শ্রীবৃন্দাবনে গমণের প্রয়াস: এই বিভাগাধীন, এভাবেই ভক্তের মহিমাকীর্তন করা এবং দিব্যনাম কীর্তন করার মাধ্যমে ভক্তদের অপরাধ ভঞ্জন নামক এই অধ্যায়টি এখানে সমাপ্ত হয়েছে। 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by তপ অদ্বৈত দাস
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions