Text Size

২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্‌ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন

26 Jul 2021|Duration: 00:56:56|Bengali|শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য গ্রন্থ|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ কর্তৃক সংকলিত শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য গ্রন্থ। ২৬শে জুলাই ২০২১, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারতবর্ষ।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎ-কৃপা তম্ অহং বন্দে শ্রী-গুরুং দীন-তারণম্
পরমানন্দং মাধবং শ্রী চৈতন্য ইশ্বরম্
হরিঃ ওঁ তৎ সৎ

ভূমিকা:- আজ আমরা শ্রীচৈতন্য গ্রন্থের সংকলন ক্রমাগত রাখব, যে অধ্যায়ের শিরোনাম দেওয়া রয়েছে:

নবাব হুসেন শাহ্‌ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন

এই বিভাগাধীন : মহাপ্রভুর শ্রীবৃন্দাবনে গমণের প্রয়াস।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/৩

হেন মতে প্রভু সর্ব জীব উদ্ধারিয়া।
মথুরায় চলিলেন ভক্তগোষ্ঠি লৈয়া॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: এইভাবে সকল জীব উদ্ধারের পরে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভক্তগণের সহিত মথূরার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/৪

গঙ্গাতীরে-তীরে প্রভু লইলেন পথ।
স্নান-পানে পূরান গঙ্গার মনোরথ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গঙ্গাতীরবর্তী পথ ধরে চললেন, এবং গঙ্গা নদীতে স্নান ও বারি পান করার মাধ্যমে তিনি গঙ্গাদেবীর মনোবাসনা পূর্ণ করলেন।

শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য-লীলা, ১/১৬৬

ঐছে চলি’ আইলা প্রভু ‘রামকেলি’ গ্রাম।
গৌড়ের নিকট গ্রাম অতি অনুপম॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ঘটনাক্রমে রামকেলি নামক এক গ্রামে পৌঁছালেন। এই গ্রামটি বাংলার সীমান্তে অবস্থিত এবং অত্যন্ত মনোরম।

তাৎপর্য: রামকেলিগ্রাম—রামকেলি গ্রামটি বাংলার সীমান্তবর্তী গঙ্গাতীরে অবস্থিত, সেখানে শ্রীল রূপ ও শ্রীল সনাতন গোস্বামীর তৎকালীন বাসস্থান ছিল।

শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য-লীলা, ১/১৬৭

তাঁহা নৃত্য করে প্রভু প্রেমে অচেতন।
কোটি কোটি লোক আইসে দেখিতে চরণ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: রামকেলি গ্রামে যখন সঙ্কীর্তন চলছিল, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেখানে নৃত্য করেছিলেন এবং কখনো বা তিনি ভগবৎ প্রেমে প্রেমাবিষ্ট হয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন। আর তখন রামকেলি গ্রামে অগণিত মানুষ তাঁর শ্রীপাদপদ্ম দর্শন করতে এসেছিলেন।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/৫

রামকেলিতে ৪/৫ দিবস গুপ্তভাবে স্থিতি—
গৌড়ের নিকটে গঙ্গাতীরে এক গ্রাম।
ব্রাহ্মণ-সমাজ—তার ‘রামকেলি’ নাম॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: গৌড়ের রাজধানীর কাছে গঙ্গার তীরে রামকেলি নামক একটি গ্রাম রয়েছে। এই গ্রামের বাসিন্দারা সকলেই ছিলেন ব্রাহ্মণ।

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: শ্রীরামকেলি বর্তমান মালদহ সহরের ইঁরেজবাজার হইতে প্রায় সাড়ে আট মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এই স্থানে একটি পাকা বাঁধান উচ্চ ভিটার উপর মধ্যদেশে একটি বিস্তৃত তমাল বৃক্ষ ও দুই পার্শ্বে দুইটী দুইটী করিয়া একত্রে চারিটী কেলিকদম্ব বৃক্ষ শোভা পাইতেছে। দক্ষিণের কেলিকদম্ব বৃক্ষদ্বয় শ্রীঅদ্বৈত প্রভু ,মধ্যদেশের তমাল বৃক্ষটী শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর ও বাম প্রদেশের কদম্ব বৃক্ষদ্বয় শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুরূপে বিরাজিত বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া থাকে। প্রবাদ, এই বৃক্ষের তলদেশে শ্রীমন্মহাপ্রভুর সহিত নিশীথে শ্রীল রূপ শ্রীল সনাতন গোস্বামী প্রভুর প্রথম মিলন হয়। এই স্থানে বসিয়াই শ্রীমন্মহাপ্রভু শ্রীসনাতনকে তাঁহার নিকট গমন করিবার উপদেশ প্রদান করেন। শ্রীকেলিকদম্বের অতি সন্নিকটে শ্রীমদনমোহনদেব একটী ক্ষুদ্র শ্রীমন্দিরে বিরাজিত আছেন। শ্ৰীশ্ৰীমদনমোহন শ্রীশ্রীরূপসনাতন-কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত শ্রীবিগ্রহ। শ্রীমন্দির মধ্যে চারিটী যুগল বিগ্রহ বিরাজিত, তন্মধ্যে একটীতে শ্রীবলদেব রেবতীর সহিত বিরাজিত। শ্রীবিগ্রহগণের নাম (বামদিক হইতে), (১) ব্রজমোহন (শ্রীমতী সহিত), (২) রেবতীরমণ (রেবতীর সহিত), (৩) মদনমোহন ও (৪) গোপীনাথ (উভয়েই শ্ৰীমতীর সহিত)। শ্রীশালগ্রামও বিরাজিত আছেন। শ্ৰীযুগলবিগ্রহের মধ্যদেশে শ্রীগৌরসুন্দরের দুইটী শ্ৰীমূর্তি, একটী শ্রীঅদ্বৈত প্রভুর ও একটী শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর শ্রীমূর্তি অবস্থিত। সেবার জন্য ১২৫ বিঘা জমির বন্দোবস্ত আছে। প্রজার নিকট হইতে ১২২ টাকা খাজনা পাওয়া যায়, তন্মধ্যে ৮০ টাকা সরকারকে জমা দিতে হয়।

শ্রীমদনমোহনের শ্রীমন্দিরের নিকট হইতে এক রাস্তার ভিতরে উত্তরদিকে শ্রীসনাতন-কুণ্ড। নিকটবর্তী স্থানে রাধাকুণ্ড, শ্যামকুণ্ড, ললিতাকুণ্ড, বিশাখাকুণ্ড প্রভৃতি অষ্টকুণ্ড। ঐ স্থান হইতে কিঞ্চিৎ দূরে শ্রীরূপসাগর, শ্রীল রূপগোস্বামী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটী বৃহৎ সরোবর। শ্রীমদনমোহনের মন্দির ছাড়িয়াই হোসেন সা’র কাছারীর দিকে যাইবার মধ্যরাস্তায় এই রূপসাগরটী দেখিতে-পাওয়া যায়। রূপসাগরের ঘাট প্রস্তর দ্বারা বাঁধান। একটী প্রস্তরের গায়ে এই কথাগুলি খোদিত রহিয়াছে :— “সন ১২৬৮ সাল, জেলা মালদহ বঙ্গদেশির (বানিয়া) সমূহ বাইসি (দণ্ডের টাকা) হইতে শ্রীরামকেলির রূপসাগরঘাট কৃত হইল; তাং ৩২ জ্যৈষ্ঠ।’’ জল ১০ বিঘা, পাড়সহ কুড়ি বিঘা।

শ্রীরামকেলি হইতে প্রায় তিন রশি দক্ষিণে প্রস্তর নির্মিত বারটী দ্বার বিশিষ্ট ‘বার দুয়ারী’ নামে একটী বিরাট দরবার গৃহ। ১৮০১ খৃষ্টাব্দে ক্রেন্ট সাহেবের সময় ইহার গুম্বূজগুলি সোনার পাত দ্বারা মণ্ডিত ছিল। ইহা হোসেন সাহের কাছারী বাড়ী বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া থাকে। প্রবাদ, এই স্থানেই নাকি শ্রীদবির খাস কাছারী করিতেন। এই কাছারী বাড়ীর চারিদিকে চারিটী তোরণদ্বার। প্রবাদ এই যে, ‘হাওয়াসখানার’ ঘাটে বাদশাহ ‘হাওয়া’ অর্থাৎ বায়ু সেবন করিতেন। কিংবদন্তী, শ্রীসনাতন যখন ‘যবন রক্ষককে’ সাত হাজার মুদ্রা প্রদান করিয়া কারাগার হইতে নির্মুক্ত হইলেন এবং রাত্রে গঙ্গা পার হইলেন, তখন সনাতন এই স্থানে আসিয়া “শ্রীগৌরাঙ্গ, শ্রীগৌরাঙ্গ” বলিয়া ডাকিতে থাকেন, সেই সময়ে একটী কুম্ভীর আসিয়া শ্রীসনাতনকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে। শ্রীসনাতন ঐ কুম্ভীরের পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া গঙ্গা পার হন। শ্রীমদনমোহনের মন্দির হইতে অর্ধ মাইলের মধ্যে শ্রীগঙ্গাদেবী বর্তমানে প্রবাহিতা। ইহা ব্যতীত হোসেন সা’ বাদসাহের অনেক কীর্তি এই স্থানে বর্তমান রহিয়াছে। দখল দরওয়াজা, পরিখা, ফিরোজ খাঁ (উচ্চ মনুমেন্ট, ইহার উপর চড়িলে প্রাচীন গৌড় সহরটী দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ভগ্নাবশেষ), টাকশাল, পাঠাগার, লোটন মস্‌জিদ (একটী শ্রেষ্ঠ ভাস্কর কার্যের নিদর্শন) প্রভৃতির ভগ্নাবশেষ বর্তমান রহিয়াছে। এই স্থানে লক্ষ্মণসেনের রাজধানী লক্ষ্মণাবতী মুসলমান অধিকারের পূর্বে অবস্থিত ছিল, উহার ভগ্নাবশেষ এখনও নির্দিষ্ট হইয়া থাকে।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী : শ্রীশ্রীরাধা-মদনমোহন সহ উল্লেখিত সমস্ত শ্রীবিগ্রহ এখনো সেখানে বিরাজমান, এটি পরিষ্কার জানা নেই যে এখনো সেখানে তাঁদের হাতে ৪২ একর ভূমি আছে কিনা। আমি জানি না এখনও এই শ্রীবিগ্রহগণের কতটা ভূমি রয়েছে। ইসকন সেখানে রূপ-সাগরের দক্ষিণ দিকে কয়েক বিঘা প্রায় ২ একর জমি খুঁজছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব স্থানে কিছু প্রচার করার সুবিধা তৈরী করতে চায়। তৎকালীন সময়ে শ্রীল সনাতন গোস্বামী ছিলেন নবাব হুসেন শাহের প্রধানমন্ত্রী আর শ্রীল রূপ গোস্বামী ছিলেন অর্থমন্ত্রী এবং এই সমস্ত কাঠামো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। শ্রীল জীব গোস্বামীও এখানেই আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাই এই ক্ষেত্রটি হ’ল অত্যন্ত তাৎপর্যপূণ আর এখানেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীল রূপ ও সনাতন গোস্বামীদ্বয়কে দীক্ষা প্রদান করেছিলেন এবং তাঁদের শ্রীরূপ ও শ্রীসনাতন নাম প্রদান করেছিলেন, অন্যথায় তাঁরা ‘দবির খাস’ ও ‘সাকের মল্লিক’ নামে পরিচিত ছিলেন। তারা ছিলেন মূলতঃ কর্ণাটকের ব্রহ্মণ, বাংলাদেশের যশোর জেলায় তাঁরা আবির্ভূত হয়েছিলেন। যেভাবেই হোক তাঁরা হুসেন শাহের অধীনে এসে মুসলমান নাম গ্রহণ করেছিলেন। তো, তৎকালীন সময়ে এই স্থানটি ছিল বাংলার রাজধানী। বাংলার ইতিহাসে এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্য পরম্পরার অন্তর্গত।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/৬

দিন-চারি-পাঁচ প্রভু সেই পুণ্যস্থানে।
আসিয়া রহিলা যেন কেহ নাহি জানে॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই পবিত্র স্থানে এসেছিলেন এবং অন্যান্যদের অজান্তে সেখানে তিনি ৪/৫ দিন অবস্থান করেছিলেন।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/৭

প্রভুর আত্মগোপন-চেষ্টা-সত্ত্বেও সর্বত্র প্রকাশ—
সূর্যের উদয় কি কখন গোপ্য হয়? 
সর্ব লোক শুনিলেন চৈতন্য-বিজয়॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: উদিয়মান সুর্য্যকে কিভাবে আড়ালে রাখা সম্ভব? শীঘ্রই সবাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আগমনের কথা জেনে গেল।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/৮

সর্বলোকের প্রভু-দর্শনার্থ আগমন—
সর্ব লোক দেখিতে আইসে হর্ষ-মনে।
স্ত্রী-বালক বৃদ্ধ-আদি সজ্জন-দুর্জনে॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করবার জন্য প্রত্যেকেই―মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ মানুষরা, ধার্মিক ব্যক্তিরা, ও পাপীরাও―আনন্দের সাথে এসেছিল।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/৯

প্রভুর প্রেমোন্মাদ—
নিরবধি প্রভুর আবেশময় অঙ্গ।
প্রেম-ভক্তি বিনা আর নাহি কোন রঙ্গ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পুরোপুরিভাবে প্রেমাবেশে মগ্ন ছিলেন। তিনি প্রেমভক্তিমূলক সেবা ভিন্ন আর অন্য কিছুর আস্বাদন করেননি।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১০

হুঙ্কার, গর্জন, কম্প, পুলক, ক্রন্দন।
নিরন্তর আছাড় পড়য়ে ঘনে ঘন॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হুঙ্কার ও গর্জন করেছিলেন, তাঁর শরীর কম্পিত হচ্ছিল এবং অশ্রুধারা নির্গত হচ্ছিল। তাঁর শরীরের রোমগুলি খাঁড়া হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি সজোরে বারংবার ভূমিতে পতিত হচ্ছিলেন।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১১

কীর্তন ব্যতীত ভক্তগণের অন্য কৃত্য নাই—
নিরবধি ভক্তগণ করেন কীর্তন।
তিলার্ধেকো অন্য কর্ম নাহি কোন ক্ষণ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সমস্ত ভক্তরা একটানা কীর্তন (সঙ্ঘবদ্ধভাবে দিব্যনাম কীর্তন) পরিবেশন করে চলেছিলেন। এক মুহুর্তের জন্যও তাঁরা আর কিছু করেননি।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১২

প্রভুর উচচ-ক্রন্দন—
হেন সে ক্ৰদন প্রভু করেন ডাকিয়া।
লোকে শুনে ক্রোশেকের পথেতে থাকিয়া॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এতই উচ্চস্বরে চিৎকার করেছিলেন যে দুই মাইল দূরের লোকেরাও তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পারছিল। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমাবেশের উপসর্গগুলি এতটাই তীব্র ছিল যে লোকেরা এমনকি দুই মাইল বা পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকেই তাঁর ক্রন্দন শুনতে পেল।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১৩

ভক্তিরসে অজ্ঞ হইলেও প্রভুর দর্শনে সকলের আনন্দ—
যদ্যপিহ ভক্তি-রসে অজ্ঞ সর্ব লোক।
তথাপিহ প্রভু দেখি’ সবার সন্তোষ॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: লোকেরা যদিও ভক্তিমূলক সেবার রসাস্বাদন সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, তারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হ’ল।

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: অন্যাভিলাষ, কর্ম, জ্ঞান, যোগ, ব্রত ও তপস্যা প্রভৃতিতে অনেকেই অগ্রসর হওয়ায় ভগবদ্ভক্তিরসে তাঁহারা অর্বাচীন ছিলেন; শ্রীমহাপ্রভুকে দেখিয়া তাদৃশ অজ্ঞজনগণও সন্তুষ্ট হইতেন।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: এটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর আন্দোলন সম্পর্কে আশ্চর্যজনক বিষয়, যেমন করে লোকেরা কেবল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করেই সন্তুষ্ট হয়েছিল ঠিক তেমনই আবার সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ভক্তদের মহামন্ত্র কীর্তন করতে দেখেও সন্তুষ্ট হয়েছিল।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১৪

সকলের দূর হইতে দণ্ডবৎ ও হরিধ্বনি—
দূরে থাকি’ সর্বলোক দণ্ডবৎ করি।
সবে মেলি' উচ্চ করি’ বলে ‘হরি হরি’॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: লোকেরা দূর থেকেই ভুমিষ্ট হয়ে প্রণাম নিবেদন করল এবং একত্রে উচ্চস্বরে হরিনাম কীর্তন করল। হরিবোল!

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১৫

প্রভুর লোক-মুখে হরিনাম-শ্রবণে অধিকতর উল্লাস-বৃদ্ধি—
শুনি মাত্র প্রভু হরিনাম’ লোকমুখে।
বিশেষে উল্লাস বাড়ে প্রেমানন্দ সুখে॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখনি সমস্ত লোকের মুখে হরিনাম শ্রবণ করলেন, তিনি যে চিন্ময় প্রেম-সুখের রসাস্বাদন করছিলেন তা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেল।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১৬

‘বোল বোল বোল’ প্রভু বলে বাহু তুলি।
বিশেষে বোলেন সবে হয়ে কুতূহলী॥১৬॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর বাহুযুগল ঊর্ধে তুললেন এবং উদ্দীপ্ত হয়ে বললেন, “হরিবোল! হরিবোল!” আর লোকেরাও পরমোৎসাহের সাথে তাতে সাড়া দিল।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১৭

মহাপ্রভুর কৃপায় বিধর্মীর মুখেও হরিনাম ও তাহাদের মহাপ্রভুকে দূর হইতে প্রণতি—
হেন সে আনন্দ প্রকাশেন গৌর-রায়।
যবনেও বলে ‘হরি’ অন্যের কি দায়॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এমন ভাব প্রকাশ করলেন যে অন্যদের কথা আর কি বলব, এমনকি যবনরাও হরিনাম কীর্তন করল। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এমন প্রেমাবেশের প্রকাশ করছিলেন যে প্রত্যেকেই শ্রীহরির পবিত্র নাম উচ্চারণ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১৮

যবনেও দূরে থাকি’ করে নমস্কার।
হেন গৌরচন্দ্রের কারুণ্য-অবতার॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: এমনকি যবনরাও দূর থেকে প্রণতি নিবেদন করল। এমনই ভগবান শ্রীগৌরচন্দ্রের করুণাময় অবতার!

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/১৯

সংকীর্তন-প্রচার ব্যতীত প্রভুর অন্য কোনও কৃত্য নাই—
তিলার্ধেকো প্রভুর নাহিক অন্য কর্ম।
নিরন্তর লওয়ায়েন সংকীর্তন-ধর্ম॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: প্রত্যেককে সঙ্কীর্তন আন্দোলনে (সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে দিব্যনাম কীর্তন করতে) নিযুক্ত করা ভিন্ন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আর কোন প্রবৃত্তি ছিল না।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/২০

চতুর্দিকাগত লোকের প্রভুর দর্শনোৎকণ্ঠা ও সঙ্গত্যাগে অনিচ্ছা এবং সকলের মুখে হরিধ্বনি—
চতুর্দিক হৈতে লোক আইসে দেখিতে।
দেখিয়া কাহারো চিত্ত না লয় যাইতে॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: চারিদিক থেকে লোকেরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে এসেছিল। তাঁকে দর্শন করার পর তাদের আর ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়নি।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/২১

সবে মেলি’ আনন্দে করেন হরিধ্বনি।
নিরন্তর চতুর্দিকে আর নাহি শুনি॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: তারা আনন্দের সহিত ভগবান শ্রীহরির নাম কীর্তন করেছিল। চতুর্দিক থেকে হরিনাম ভিন্ন আর কোন শব্দ শোনা গেল না। সকলেই হক্মম হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে অতি আনন্দের সাথে কীর্তন করছিল এবং সর্বত্রই এই কীর্তনের ধ্বনী শোনা যাচ্ছিল। এমনকি আজও আমি যখন আমেরিকার শুল্ক বিভাগে আসছিলাম, একজন সরকারী আধিকারিক আমাকে কীর্তন দল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছিলেন সাম্প্রতিক কালে যাঁদের তিনি দেখতে পাচ্ছেন না, যে কীর্তনের লোকেরা আসতেন এবং কীর্তনের মধ্যে মজে যেতেন এবং তাঁরা তা ছেড়ে যেতে চাইতেন না।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/২২

বিধর্মী রাজার জন্যও হৃদয়ে ভয় নাই—
নিকটে যবনরাজ-পরম দুর্বার॥
তথাপিহ চিত্তে ভয় না জন্মে কাহার॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: যদিও সবচেয়ে নিষ্ঠুর যবন রাজা কাছাকাছিই বাস করতেন, তবুও কেউ তাতে কোনরকম ভীত হয়নি।

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: রামকেলির নিকটেই যবনরাজগণের ‘বারদুয়ারী’ স্থান এবং পরবর্তিকালে যবনরাজগণই সেনবংশীয়গণের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন। তাহারা বৈদিক ধর্মের প্রতি স্বভাবতঃই আক্রমণ করিবে জানিয়া সাধারণ লোকেরা অতিশয় আশঙ্কা করিত। কিন্তু শ্রীগৌরসুন্দরের কৃপায় তদীয় ভক্তগণ উচ্চৈঃস্বরে হরিনাম করিয়াও ভীত হইতেন না।

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: এটিই হ’ল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিশেষ করুণ যে যিনিই এই দিব্য-পবিত্র নাম কীর্তন করেন তিনিই নির্ভীক বোধ করেন এবং এমনকি আজকের দিনেও কীর্তনের সেই উৎসাহ বিদ্যমান।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/২৩

নির্ভয় হইয়া সর্বলোকে বলে “হরি”
দুঃখ-শোক-গৃহ-কর্ম সকল পাসরি॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: লোকেরা তাদের কষ্ট, অনুশোচনা, ও গৃহ কর্তব্য ভুলে গিয়েছিল যখন তারা নির্ভীকভাবে ভগবান শ্রীহরির নাম কীর্তন করেছিল।

শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, ১/১৬৮

গৌড়েশ্বর যবন-রাজা প্রভাব শুনিঞা।
কহিতে লাগিল কিছু বিস্মিত হঞা॥

অনুবাদ:  গৌড়ের মুসলমান রাজা যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অসংখ্য মানুষকে আকৃষ্ট করার প্রভাবের কথা শুনলেন, তখন তিনি বস্মিত হয়ে বললেন―

তাৎপর্য: সেই সময়ে বাংলার মুসলমান রাজা ছিলেন নবাব হুসেন শাহ বাদশাহ।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৪/২৪

কোতোয়াল-কর্তৃক রাজার স্থানে প্রভুর মহিমা বর্ণন—
কোতোয়াল গিয়া কহিলেক রাজস্থানে।
এক ন্যাসী আসিয়াছে রামকেলি-গ্রামে॥২৪॥

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: স্থানীয় পাহারাদার গিয়ে বাদশাহকে সূচনা দিল, “রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী এসেছেন।” বাদশাহের স্বাভাবিকভাবেই বুদ্ধি ছিল, তাই তিনি যখন শুনলেন যে তাঁর প্রাসাদের কাছেই একজন সন্ন্যাসী হিন্দুনাম কীর্তন করছেন, তিনি সেই তথ্য পেলেন, তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরিত্র সম্পর্কে শুনে অবাক হয়ে গেলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা এমনই চমৎকার।

মহাপ্রভুর শ্রীবৃন্দাবনে গমণের প্রয়াস:  এই বিভাগাধীন নবাব হুসেন শাহ্‌ বাদশাহ তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন নামক এই অধ্যায়টি এভাবেই এখানে স্মপূর্ণ হয়েছে।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by তপ অদ্বৈত দাস
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions