Text Size

২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ

20 Jul 2021|Duration: 00:59:07|Bengali|শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য গ্রন্থ|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ কর্তৃক সংকলিত শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য গ্রন্থ। ২০শে জুলাই ২০২১, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারতবর্ষ। 

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎ-কৃপা তম্ অহং বন্দে শ্রী-গুরুং দীন-তারণম্
পরমানন্দং মাধবং শ্রী চৈতন্য ইশ্বরম্
হরিঃ ওঁ তৎ সৎ

ভূমিকা: আজ আমরা শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামক গ্রন্থের ক্রমাগত সংকলন বজায় রাখব।

ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ 

এই বিভাগাধীন: ভগবানের শ্রীবৃন্দাবনে গমণের প্রয়াস।

শ্রীশ্রীচৈতন্য-ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩১

মহাপ্রভুর প্রেমহুঙ্কার ও নৃত্য—
নৃত্য করে মহাপ্রভু করি’ সিংহনাদ।
সে নাদ শ্রবণে খণ্ডে সকল বিষাদ

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: কোন কোন সময় শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে নৃত্য করতেন। তিনি নিজেই তাঁর নিজের প্রেমে প্রেমাবিষ্ট হয়ে থাকতেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন নৃত্য করতেন তখন সিংহের ন্যায় গর্জন করতেন। বিলাপকারীরা যখন তাঁর কম্পন শ্রবণ করতেন, তাদের সেই বিলাপ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমাবিষ্ট হয়ে নৃত্য ও উচ্চস্বরে হরিবোল গর্জন যারাই ইহা শ্রবণ করতেন, তাদের সমস্ত বিলাপ ও জড়জাগতিক ক্লেশ দূরীভূত হয়ে যেত। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩২

যাঁর রসে মত্ত—বস্ত্র না জানে শঙ্কর।
 হেন প্রভু নাচে সর্ব লোকের ভিতর

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: শঙ্কর যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমের রসাদ্বাদন করে প্রেমাবিষ্ট হয়ে এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নৃত্য করছেন, তিনি এতই উন্মত্ত হলেন যে তিনি তাঁর বসনের কথাও ভুলে গেলেন। স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান যে তাঁর সমস্ত ভক্তদের সাথে নৃত্য করেন, সাধারণ মানুষের সাথে থাকতে পারেন তা কিছুটা চমকপ্রদ। এমনকি তারা স্বপ্নেও বিবেচনা করতে পারেননি যে পরমেশ্বর ভগবান তাঁদের সাথে নৃত্য করবেন। এই লীলাটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অসীম করুণা প্রদর্শন করছে, আর যাঁরা দিব্য নাম কীর্তন করছিলেন তিনি সেই সকল মানুষের সাথে নৃত্য করে কতই না আনন্দিত হচ্ছেন এবং সেই সমস্ত মানুষও কতই না আনন্দিত হয়েছিলেন যে তিনি তাঁদের সাথে নৃত্য করছেন! 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩৩

অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড হয় যাঁ’র শক্তিবশে।
সে প্রভু নাচয়ে পৃথিবীতে প্রেমরসে

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: যে প্রভুর শক্তিতে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড পরিচালিত তিনিই এখন এই ধরনীতে এসে প্রেমের রসে আবিষ্ট হয়ে নৃত্য করছেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩৪

যে প্রভু দেখিতে সর্ব দেবে কাম্য করে।
সে প্রভু নাচয়ে সর্বগণের গোচরে

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: পরমেশ্বর ভগবান, যিনি অনন্ত মহাবিশ্বের উৎস যিনি সমস্ত দেবতার ইষ্ট, তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু রূপে নৃত্য করছিলেন, আর দেবতাগণ তাঁকে দর্শন করবার বাসনা করেছিলেন। আর এখন সেই পরমেশ্বর ভগবান হরিনাম সঙ্কীর্তনের মাঝে সাধারণ মানুষদের সাথে নৃত্য করছেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩৫

এই মত সর্বলোক মহানন্দে ভাসে।
সংসার তরিল চৈতন্যের পরকাশে

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: এইভাবে সবাই প্রেমানন্দে ভেসেছিলেন। সমগ্র বিশ্ব জগত তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের কারণে উদ্ধার হয়েছিল। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং কুলিয়ায় সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে হরিনাম সঙ্কীর্তনের দলগুলির সাথে নৃত্য করছেন। অনুরূপভাবেই, শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র বিশ্বজুড়ে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্কীর্তন আন্দোলনকে নিয়ে এসেছেন, আর মহাপ্রভুর ভবিষ্যৎ বাণী রয়েছে যে বিশ্বের প্রতিটি নগর ও গ্রাম এই দিব্যনাম কীর্তন করবে। শ্রীশ্রীনিতাই-গৌরের তথা পূর্বতন আচার্যবর্গের কৃপায় সহজেই তা উপলব্ধি করতে পারা যেতে পারে। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩৬

যতেক আইসে লোক দশ দিক্‌ হৈতে।
সবেই আসিয়া দেখে প্রভুরে নাচিতে

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: দশদিক থেকেই মানুষেরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নৃত্য দর্শন করতে এসেছিল। দশ দিকের অর্থ হলো আটটি উল্লম্ব, উত্তর, উত্তর-পূর্ব, পূর্ব, দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব, পশ্চিম উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম এবং ঊর্দ্ধ ও অধঃ। তার অর্থ হ’ল এই যে অধঃলোক, ঊর্দ্ধলোক এবং এই ধরণীর সর্বদিক থেকে প্রেমাবিষ্ট হয়ে নৃত্যরত পরমেশ্বর ভগবানকে সবাই দর্শন করতে এসেছিলেন।

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩৭

বাহ্য নাহি প্রভুর বিহ্বল প্রেমরসে
দেখি’ সর্বলোক সুখ-সিন্ধু-মাঝে ভাসে

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: প্রেমের আবেশে বিহ্বল হয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর বাহ্যিক চেতনা হারালেন। তা দর্শন করে সকলেই আনন্দের সমুদ্রে ভাসলেন। পারমার্থিক জগতের মানই হ’ল প্রেম, কখনো কখনো লোকেরা বলে, ‘’ভগবানই প্রেম’। প্রকৃতপক্ষে, আমরা দেখছি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই প্রেমভাবের উদ্ভাবন করছেন আর সমস্ত জনগণ যাঁরা এই লীলাতে অংশগ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন, তাঁরা আনন্দ সমুদ্রে ভেসেছিলেন। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩৮

কুলিয়ায় পাপিকুলের উদ্ধার—
কুলিয়ার প্রকাশে যতেক পাপী ছিল।
উত্তম মধ্যম নীচ—সবে পার হৈল

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: কুলিয়া নগরীর স্বল্পপাপী, মধ্যমপাপী, ও মহাপাপী―সকল পাপীই উদ্ধার হয়ে গেল। 

শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর কৃত তাৎপর্য: শ্রীমায়াপুরের অপর পারে কুলিয়া গ্রামে বহুশ্রেণীর পাপিষ্ঠ বাস করিত। উত্তম, মধ্যম ও নীচভেদে ত্রিবিধ পাপিষ্ঠই প্রভুর কৃপায় অপরাধ হইতে মুক্ত হইয়াছিল 

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সুতরাং, ভগবানের করুণা প্রাপ্ত হতে গেলে সাধারণত মানুষকে কিছু না কিছু পুণ্যবান, অত্যন্ত পুণ্যবান হতে হয়, অথচ এখানে আমরা দেখতে পারি যে স্বল্পপাপী, মধ্যমশ্রেণীর পাপী, ও অত্যন্ত পাপীষ্ঠ লোক সকলেই উদ্ধার হয়েছিল। অতএব, কোন সীমাবদ্ধতা নেই, সকলেই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ কীর্তন করতে পারে। আর এভাবেই সকলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই অহৈতুকি কৃপা অর্জন করতে পারে। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৩৯

কুলিয়া গ্রামেতে চৈতন্যের পরকাশ।
ইহার শ্রবণে সর্ব-কর্ম-বন্ধ-নাশ

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রকাশের বিষয়ে যেই শ্রবণ করল, সে তার সকল প্রকারের কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে গেল। সুতরাং কেবল মাত্র শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অসীম করুণার বিষয়ে শ্রবণ করেই, বিভিন্ন কীর্তন দলের মধ্যে তাঁদের নৃত্য করা, সকলের মধ্যে কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ করা, এবং এইসকল লীলাগুলি শ্রবণের দ্বারা উত্তম, মধ্যম ও নীচভেদে সমস্ত পাপিষ্ঠদের কর্মফলের বন্ধন নষ্ট করে ফেলল আর এভাবে সকলেই অনায়াসেই ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারল। 

শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত অন্ত্যখণ্ড ৩/৪৪০-৪৪১

সকলজীবেরে প্রভু দরশন দিয়া।
সুখময়-চিত্তবৃত্তি সবার করিয়া

তবে সব আপন পার্ষদগণ লৈয়া।
বসিলেন মহাপ্রভু বাহ্য প্রকাশিয়া

শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী: সকলকে দর্শন দান করা এবং তাঁদের হৃদয় সুখে পরিপূর্ণ করার পরে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর পার্ষদগণকে নিয়ে বসলেন এবং তখন তাঁর বাহ্যিক চেতনায় ফিরে আসলেন। কুলিয়ার সমস্ত জনগণের শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সহিত হরিনাম সঙ্কীর্তনে যোগদান করার সুযোগ হলো এবং তাদের প্রতি মহাপ্রভুর করুণায় তারা পুরোপুরি আনন্দিত হয়েছিল। তারা মহাপ্রভু কর্তৃক উদ্ধার লাভের আকাঙ্ক্ষা করেছিল এবং ভগবান খুব সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে তা করেছিলেন। 

ভগবানের শ্রীবৃন্দাবনে গমণের প্রয়াস: এই বিভাগাধীন ‘ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল’ নামক এই অধ্যায়টি এভাবেই সমাপ্ত হয়েছে। 

সুতরাং, এই পাঠের সারসংক্ষেপটি মূলত এই যে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যে, তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে প্রচার করতেন আর তৎকালীন সময়ে এখনকার বাংলাদেশটিও ভারতবর্ষেরই একটি অংশ ছিল এবং তিনি বলেছিলেন যে, বিশ্বের বাকি অংশগুলিতে প্রচারকার্য করার জন্য তিনি তাঁর একজন সেনাপতি-ভক্তকে প্রেরণ করবেন। সুতরাং কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদ আবির্ভূত হয়েছেন এবং সমগ্র বিশ্বজুড়ে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করেছিলেন। অতএব এইভাবে লোকেরা কৃপাধন্য হচ্ছে আর আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু কুলিয়া নগরীতে বিভিন্ন সঙ্কীর্তন দলের মাঝে নৃত্য করেছেন আর তাঁরা তাঁদের বাহ্যিক চেতনা হারিয়েছিলেন, এবং তাঁরা সম্পূর্ণরূপে প্রেমময় অনুভূতিতে মগ্ন ছিলেন। ঠিক একই প্রকারে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্কীর্তন দলগুলিও আনন্দের সাথে কীর্তন ও নর্তনের দ্বারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপাপ্রাপ্ত হবে, আর এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর করুণার দ্বারা সমগ্র বিশ্ব তথা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড উদ্ধারিত হবে। 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by তপ অদ্বৈত দাস
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions