Text Size

২০২৫০১২৬ শ্রীমদ্ভাগবতম ৩.১৩.২৮

26 Jan 2025|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী ২৬শে জানুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারতে প্রদান করেছেন। এই প্রবচনটি শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৩য় স্কন্ধ, ১৩ অধ্যায়, ২৮ নং শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
 যৎ কৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
 পরমানন্দমাধবম্ শ্রীচৈতন্য ঈশ্বরম্
 হরি ওঁ তৎ সৎ


ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়

শ্লোক ২৮
ঘ্রাণেন পৃথ্যাঃ পদবীং বিজিঘ্রন্
ক্রোড়াপদেশঃ স্বয়মঞ্চরাঙ্গঃ।
করালদংষ্ট্রোইপ্যকরালদৃভ্যা-
মুদ্বীক্ষ্য বিপ্রান্ গৃণতোহবিশৎকম্॥

অনুবাদ: তিনি ছিলেন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু এবং তাই তিনি চিন্ময়, তবুও শূকর-শরীর ধারণ করার জন্য তিনি ঘ্রাণের দ্বারা পৃথিবীর অন্বেষণ করেছিলেন। তাঁর দশন ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর, এবং তিনি তাঁর স্তবকারী ব্রাহ্মণ ভক্তদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছিলেন। এইভাবে তিনি জলে প্রবেশ করেছিলেন।

তাৎপর্য: আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে যে, শূকরের শরীর যদিও জড়, কিন্তু ভগবানের বরাহরূপ জড় কলুষের দ্বারা কলুষিত ছিল না। পৃথিবীর কোন শূকরের পক্ষে সত্যলোক থেকে শুরু করে সমগ্র আকাশ জুড়ে বিস্তৃত একটি বিশাল শরীর ধারণ করা সম্ভব নয়। তাঁর শরীর সর্ব অবস্থাতেই চিন্ময়; তাই তাঁর পক্ষে বরাহরূপ ধারণ করা কেবল একটি লীলা মাত্র। তাঁর শরীর হচ্ছে সমস্ত বেদ, অর্থাৎ অপ্রাকৃত। কিন্তু যেহেতু তিনি একটি শূকরের রূপ পরিগ্রহ করেছিলেন, তাই তিনি ঠিক একটি শূকরের মতো ঘ্রাণ গ্রহণ করতে করতে পৃথিবীর অন্বেষণ করেছিলেন। ভগবান যে কোন জীবের ভূমিকা পূর্ণরূপে অভিনয় করতে পারেন। বরাহদেবের বিরাট আকৃতি অবশ্যই সমস্ত অভক্তদের কাছে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ছিল, কিন্তু তাঁর শুদ্ধ ভক্তদের কাছে তা মোটেই ভয়ঙ্কর ছিল না; পক্ষান্তরে, তিনি তাঁর ভক্তদের প্রতি এত প্রসন্নতা সহকারে দৃষ্টিপাত করেছিলেন যে, তার ফলে তাঁরা সকলে দিব্য আনন্দ অনুভব করেছিলেন।

***

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: ব্রহ্মাজীর নাসারন্ধ্র দিয়ে ভগবান বরাহদেবের এই আবির্ভাব লীলাটি অত্যন্ত চমৎকার। ঠিক যেভাবে আমরা হাঁচি দিলে কখনো কখনো আমাদের হাঁচির সঙ্গে খানিক শ্লেষা নির্গত হয়ে থাকে। ঠিক তদ্রূপভাবে ব্রহ্মাজীর নাসারন্ধ্র থেকে এক বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিমাণ মাপের বরাহদেব আবির্ভূত হয়েছিলেন। এরপর সৃষ্টির প্রথম বদ্ধ জীব ব্রহ্মা জি যখন তাঁকে দর্শন করেছিলেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে তাঁর আকৃতি বর্ধিত করতে থাকে এবং এক সময় একটি হাতির ন্যায় বিরাট রূপ ধারণ করেন, আর তারপরও বর্ধিত হতে থাকেন আর এভাবে তার শরীর সত্যলোক থেকে মহরলোক আদি লোকসমূহ জুড়ে বিস্তার লাভ করে। তখন ভগবান বরাহদেবকে দর্শন করে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা স্তব-স্তুতি নিবেদন করেন। এভাবে কৃষ্ণ যেকোন যুগেই আসতে পারেন যদি তিনি আসতে চান। যেমনটা তিনি ভগবদগীতাতে বলেছেন যে—আমি যুগে যুগে আসি। কৃষ্ণের শরীর অপ্রাকৃত, এইজন্য উনি বড় হতে পারেন, ছোট হতে পারেন।

এই পৃথিবী গর্ভসমুদ্রের তলদেশে নিমজ্জিত হয়েছিল। তাই ব্রহ্মাজি চিন্তা করছিলেন যে কিভাবে পৃথিবীকে সেই সমুদ্রের তলদেশ থেকে উদ্ধার করে আনা যায়। এই চিন্তার মধ্যেই তিনি হাঁচি দিলেন আর তাঁর নাসারন্ধ্র থেকে ভগবান বরাহদেব আবির্ভূত হলেন। কৃষ্ণ যেকোন রূপে আবির্ভূত হতে পারেন। তবে তাঁর কোন রূপই জড়জাগতিক নয়, তা ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তিসম্ভূত। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে কোন জড় দেহধারী জীবের পক্ষে এরকম একটি গোটা গ্রহকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কৃষ্ণই এসব দেহ সৃষ্টি করতে পারেন এবং তাঁর মাধ্যমে যেকোন অদ্ভুত কার্য সম্পাদন করতে পারেন। তিনি যখন শুকর রূপে আসেন, তখন তিনি শুকরের মত আচরণ করতে পারেন।  যেভাবে একটা শুকর কাদা ঘ্রাণ নেয়, সেভাবে তিনি সমুদ্রের কাদার ঘ্রাণ নিচ্ছিলেন। এই ব্রহ্মাণ্ডের অর্ধভাগ জলে পূর্ণ। তো কোন কারণে এই পৃথিবী গ্রহ তার কক্ষচ্যুত হয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সেই সমুদ্রের তলদেশে পতিত হয়। তবে ভগবান যে রূপেই আসুন না কেন তাঁর প্রত্যেক রূপই অপ্রাকৃত। আর যদিও ভগবানের বহুরূপ রয়েছে, তবে তাঁদের প্রত্যেকটাই একে অপরের থেকে অভিন্ন। তো তিনি ব্রহ্মাণ্ডের সমুদ্রের কাদার মধ্যে পৃথিবীকে অন্বেষণ করছিলেন। বর্তমানে আমরা পৃথিবীর গর্ভ থেকে কয়লা খনিজ তেল প্রভৃতি উত্তোলন করি। আমরা জানি না কি হতে পারে যদি এরকম করতে করতে পৃথিবী তার কক্ষপথ থেকে পড়ে যায়।

যেমনটা বলা হয় যে, সারা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ খনিজ তেল আমেরিকাতে সঞ্চিত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “আমরা এই সঞ্চিত তেলের সবটাই উত্তোলন করব!” কিন্তু কখনো যদি পৃথিবী কক্ষচ্যুত হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়ে যায়, তাহলে কি সে পৃথিবীকে উত্তোলন করতে পারবে? বর্তমানে এই পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে। তাই আমাদের ভগবানের অপরিসীম শক্তির ওপর অত্যন্ত আকৃষ্ট হওয়া উচিত। আর এ কারণেই আমাদের পরমেশ্বর ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত। তিনি মূলত তার ভক্তদের রক্ষা করার জন্যই আবির্ভূত হন। ঠিক যেরকম পূর্বে প্রহ্লাদ মহারাজকে রক্ষা করতে এবং তাকে সন্তুষ্ট করতে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবকিকে কংসের হাত থেকে রক্ষা করতে। তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন পৃথিবীকে হিরন্যাক্ষর হাত থেকে রক্ষা করতে।

এভাবে শাস্ত্রে উল্লেখিত বহু অবতার গ্রহণ করে তিনি অবতীর্ণ হন। তাদের মধ্যে কিছু পুরুষ অবতার, কিছু লীলা অবতার, কিছু শক্ত্যাবেশ অবতার, কিছু গুণাবতার, কিছু মন্বন্তর অবতার, কিছু যুগাবতার। আমাদের মন্দিরে আমরা ওঁনাকে পাই অর্চা-অবতার রূপে। এই অর্চা-অবতার রূপে প্রাথমিকভাবে তাঁকে জড়বস্তু দ্বারা নির্মিত বলে মনে হলেও, তিনি স্বয়ং কৃষ্ণ থেকে অভিন্ন। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তার একটি গ্রন্থে বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণের কোন না কোন অবতারের প্রতি আমাদের মনকে নিবদ্ধ করা উচিত। আমরা সকল অবতারের অবতারি কৃষ্ণের প্রতি আমাদের মনকে নিবদ্ধ করি। এই কলিযুগে ভগবান তাঁর ছন্ন অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে, গৌরাঙ্গ রূপে আবির্ভূত হন। গৌরাঙ্গ! এবং তিনি সর্বদা ভগবান শ্রীনিত্যানন্দের সঙ্গে অবতীর্ণ হন, নিত্যানন্দ!

এই যুগে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অসুরদের হত্যা করেন না, তিনি তাদের অন্তরে থাকা আসুরিক প্রবৃত্তিকে বিনাশ করেন। আমাদের সকলের মধ্যে দৈব এবং আসুরিক উভয় প্রকৃতিই রয়েছে। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদেরকে পবিত্র করেন, যার ফলে আমাদের অন্তরে থাকা আসুরিক প্রবৃত্তি বিনাশপ্রাপ্ত হয়। কৃষ্ণ পরম করুণাময়, কিন্তু তিনি কাউকে সহজে কৃষ্ণপ্রেম দান করেন না। কিন্তু ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সংকীর্তন আন্দোলনের বিস্তারের মাধ্যমে সেই সুদুর্লভ কৃষ্ণপ্রেমকে অকাতরে বিলিয়ে দেন। তাই আমাদের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই কৃপার সুযোগ গ্রহণ করা উচিত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই যে দয়া দিচ্ছেন, তার মাধ্যমে এক জীবনের মধ্যেই কৃষ্ণপ্রেম পাওয়া যায়। যোগীদের, পণ্ডিতদের এই কৃষ্ণপ্রেম প্রাপ্ত হতে বহু বহু জন্ম লাগে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, সহস্র জন্ম পর, সহস্র অগ্নিহোত্র যজ্ঞ ও পুণ্য কর্ম সম্পাদনের পরও কেউ কৃষ্ণভক্তি লাভ করতে পারে না, কিন্তু ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপার মাধ্যমে আমরা সেই প্রেমভক্তি খুব তাড়াতাড়ি লাভ করতে পারি। তবে তা লাভ করার জন্য আমাদের লোলুপ হতে হবে, প্রচেষ্টা করতে হবে, তাহলে আমরা এই জন্মেই তা পেতে পারি। তবে হয়তো তার জন্য কুড়ি বছর, ত্রিশ বছর, চল্লিশ বছর লাগতে পারে, তা আমরা জানি না যে কত বছর লাগবে। এক জন ব্যাক্তিকে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, “যদি তুমি অকপটে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে কৃষ্ণের জন্য ক্রন্দন করতে পারো, তাহলে এক মুহুর্তেই তুমি তোমার সুপ্ত কৃষ্ণচেতনাকে পুনর্জাগরিত করতে পারবেন। হরিবোল! 

ভগবান শ্রীবরাহদেব সম্পর্কে, বরাহ রূপে অথবা নৃসিংহ রূপে তাঁর আবির্ভাব সম্পর্কে শ্রবণ করা খুবই চমৎকার। যদি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই কৃষ্ণ, তবে কেন তিনি এই রূপে অবতীর্ণ হন? প্রত্যেক ভক্তেরই এবিষয়ে অবগত থাকা উচিত।

আমি শুনছিলাম গতকাল ৪১,০০০ দর্শনার্থী এসেছিলেন। দুপুর ১:৩০টা নাগাদ আমি কলকাতা ভক্তিবৃক্ষ থেকে ফিরেছিলাম। রাধামাধব, পঞ্চতত্ব মন্দিরের বাইরে বহু ভক্ত ছিলেন যেহেতু ১টার সময় মন্দির বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা ১১:৩০টা নাগাদ কলকাতা ভক্তিবৃক্ষ প্যান্ডেলে গিয়েছিলাম, সেই সম্মেলনে তো হাজার খানেক ভক্ত ছিলই আর যখন ফিরছি তখন ১.৩০টা বাজছিল, তাই মন্দির বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু ভক্তরা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। যেহেতু কো-ডিরেক্টরদের সাথে আমার একটা মিটিং ছিল, তাই আমার খানিক দেরি হয়েছিল। কখনো কখনো আমরা যখন এরকম ভিড় দেখি, আমরা সেসময় সেখানে অনেক গ্রন্থ বিতরণ করতে পারি, হরিনাম সংকীর্তন এবং আরও প্রচারমূলক অন্য অনেক কিছু করতে পারি।

গতকাল ছিল ষটতিলা একাদশী। রাতে ছাদের উপর আমি ভক্তদের জিজ্ঞেস করছিলাম আপনারা কতরকম ভাবে আজ তিলের ব্যবহার করেছেন? তারা কেউ কিছুই করেনি! কেউ করেনি! তখন আমি তাদের মধ্যে কিছু তিল বিতরণ করলাম। তবে সারাদিন আমি শাস্ত্রে উল্লিখিত ছয় রকম ভাবেই তিল গ্রহণ করেছিলাম। সবচেয়ে সহজ হচ্ছে কিছু তিল খাওয়া! আমি প্রায় ৫০টা তিলের লাড্ডু বিতরণ করেছি! বলা হয়েছে যে আপনি তিল দ্বারা স্নান করতে পারেন, তিল মালিশ করতে পারেন ইত্যাদি। এক ভক্ত মাটিতে পড়ার আগেই খানিকটা গোবর ধরে তিলের সাথে মিশিয়ে লাড্ডু তৈরি করেছিল, তবে তা খাওয়ার জন্য নয়! সে সেগুলিকে যজ্ঞে আহুতি দিয়েছিল। এভাবে মায়াপুরে বিভিন্ন উৎসব পালিত হয়, আমাদের এই প্রত্যেকটির যথার্থ সদ্ব্যবহার করা উচিত। 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by পায়েল চন্দ্র 4/4/2026
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions