মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
শ্রীমদ্ভাগবতম ৪.৯.১১
ভক্তিং মুহুঃ প্রবহতাং ত্বয়ি মে প্রসঙ্গো
ভূয়াদনন্ত মহতামমলাশয়ানাম্ ।
যেনাঞ্জসোল্বণমুরুব্যসনং ভবাব্ধিং
নেষ্যে ভবদ্গুণকথামৃতপানমত্তঃ॥
অনুবাদ:- ধ্রুব মহারাজ বলতে লাগলেন — হে অনন্ত ভগবান! কৃপা করে আপনি আমাকে আশীর্বাদ করুন, যেন নিরন্তর আপনার সেবায় যুক্ত শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গ আমি লাভ করতে পারি। এই প্রকার দিব্য ভক্তরা সম্পূর্ণরূপে নিম্বলুষ। আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে যে, ভগবদ্ভক্তির প্রভাবে আমি জলন্ত অগ্নির তরঙ্গ-সমন্বিত ভয়ঙ্কর ভবসমুদ্র পার হতে পারব। তা আমার পক্ষে অত্যন্ত সহজ হবে, কেননা আমি আপনার শাশ্বত দিব্য গুণাবলী এবং লীলাসমূহ শ্রবণ করার জন্য উন্মত্ত হয়েছি।
তাৎপর্য:- ধ্রব মহারাজের উক্তির বিশেষ বক্তব্য হচ্ছে যে, তিনি শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গ করতে চেয়েছেন। ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ ব্যতীত চিন্ময় ভগবদ্ভক্তি পূর্ণ হতে পারে না অথবা আস্বাদ্য হতে পারে না। তাই আমরা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছি। যারা এই কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ থেকে পৃথক হয়ে কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত হতে চায়, তারা এই মহা মোহের দ্বারা আচ্ছন্ন, কেননা তা সম্ভব নয়। ধ্রুব মহারাজের এই উক্তিটি থেকে স্পষ্টই বোঝা যার যে, ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ ব্যতীত ভগবদ্ভক্তি পুষ্ট হতে পারে না; জড় কার্যকলাপ থেকে তা পৃথক হয় না। ভগবান বলেছেন, “সতাং প্রসঙ্গান্ মম বীর্য-সংবিদো ভবন্তি হৃৎ-কর্ণ-রসায়নাঃ” (শ্রীমদ্ভাগবত ৩/২৫/২৫) শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তের সঙ্গেই কেবল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী পূর্ণ শক্তিসমন্ধিত হয় এবং হৃদয় ও কর্ণের আস্বাদনীয় হয়। ধুব মহারাজ ঐকান্তিকভাবে ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ করতে চেয়েছেন। ভক্তিকার্যে ভক্তের সঙ্গ ঠিক একটি প্রবহমান নদীর ঢেউয়ের মতো। আমাদের কৃষ্ঠভাবনামৃত সংঘে দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই আমাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। আমাদের সময়ের প্রতিটি ক্ষণ ভগবানের সেবায় নিয়োজিত রাখতে হয়। একে বলা হয় অপ্রতিহতা ভক্তি।
মায়াবাদীরা প্রশ্ন করতে পারে, “আপনারা ভগবদ্ভক্তের সঙ্গে অত্ন্ত প্রসন্ন থাকতে পারেন, কিন্তু ভবসাগর পার হওয়ার জন্য আপনারা কি করছেন?” সেই প্রসঙ্গে ধুব মহারাজ উত্তর দিয়েছেন যে, তা খুব একটা কঠিন নয়। তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, ভগবানের মহিমা শ্রবণে উন্মত্ত হওয়ার ফলে, অনায়াসেই এই সাগর উত্তীর্ণ হওয়া যায়। ভবদ্-গুণ-কথা — যিনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাবত এবং চৈতন্য চরিতামৃত থেকে ভগবানের কথা শ্রবণে ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী, এবং যিনি প্রকৃতপক্ষে সেই পন্থার প্রতি ঠিক একজন নেশাখোরের মতো আসক্ত, তাঁর পক্ষে অজ্ঞানরূপী সংসার উত্তীর্ণ হওয়া অত্যন্ত সহজ। তমসাচ্ছন্ন ভবসাগরকে প্রজ্বলিত অগ্নির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, কিন্তু ভগবদ্ভক্তের পক্ষে এই অগ্নি নিতান্তই নগণ্য কারণ তিনি সম্পূর্ণরূপে ভক্তিতে মগ্ন থাকেন। যদিও এই জড়জগৎ প্রজ্বলিত অগ্নির মতো, কিন্তু ভক্তের কাছে তা পূর্ণ আনন্দময় বলে প্রতীত হয় (বিশ্বং পূর্ণসুখায়তে)।
ধুব মহারাজের উক্তির এই তাৎপর্য হচ্ছে যে, ভক্তসঙ্গে ভগবানের সেবাই হচ্ছে ভগবদ্ভক্তিতে উন্নতি সাধনের উপায়। ভগবদ্ভক্তির প্রভাবেই কেবল অপ্রাকৃত গোলোক বৃন্দাবনে উন্নীত হওয়া যায়, এবং সেখানেও ভগবদ্ভক্তিই সম্পাদন করতে হয়, কারণ এই জগতে এবং চিন্ময় জগতে ভগবদ্ভক্তির কার্যকলাপ এক এবং অভিন্ন। ভক্তির কখনও পরিবর্তন হয় না। এই সূত্রে একটি আমের দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। একটি আম কাঁচা অবস্থাতেও আম, এবং যখন তা পাকে, তখন তা আমই থাকে, তবে তা আরও সুস্বাদু এবং আস্বাদ্য হয়ে ওঠে! তেমনই, সদ্গুরুর নির্দেশে এবং শাস্ত্রবিধির নির্দেশ অনুসারে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন হয়, আবার চিৎ-জগতে সরাসরিভাবে ভগবানের সঙ্গ করে ভগবানের সেবা হয়। কিন্তু তা উভয়ই এক। তাতে কোন পরিবর্তন হয় না। পার্থক্য কেবল একটি স্তরে তা অপক্ক এবং অন্য স্তরে তা সুপক্ক এবং অধিকতর আস্বাদ্য। ভগবদ্ভক্তের সঙ্গ প্রভাবেই কেবল ভক্তির পরিপক্ক অবস্থা লাভ করা যায়।
***
জয়পতাকা স্বামী:- যেহেতু ২০০৮ সালে আমার স্ট্রোক হয়েছিল, তাই আমার অর্ধেক মুখ প্যারালাইজড, সে কারণে অভয়চরণ নিমাই দাস আমি যা বলছি তা পুনরাবৃত্তি করছে, কারণ কখনও কখনও আমি কি বলছি তা মানুষেরা বুঝতে পারেনা ।
সমস্ত গৌরব শ্রীল প্রভুপাদের! এখানে শ্রীল প্রভুপাদ ভক্ত সঙ্গের গুরুত্ব বর্ণনা করছেন। এটি অতি প্রাসঙ্গিক কেননা এটিও সাধুসঙ্গ। আপনারা সকলেই সাধু! এবং আপনাদের সকলের সঙ্গ করার দ্বারা আমরা উন্নত হতে পারব। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মূলত কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং আমরা দেখতে পাই যে তাঁর সাথে অন্যান্য বিভিন্ন ভক্তরাও এসেছিলেন, যেমন শ্রীমদ্ভাগতমের একাদশ স্কন্ধে (১১.৫.৩২) শ্লোকটি বর্ণিত আছে —
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্ ।
যজ্ঞৈঃ সন্কীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ।।
সাঙ্গ মানে তাঁর বিষ্ণু তত্ত্বের অংশ। সহ-অঙ্গ এবং বলরাম নিত্যানন্দ রূপে এসেছিলেন ও মহাবিষ্ণু, সদা শিব অদ্বৈত গোঁসাই রূপে এসেছিলেন। এছারা বক্রেশ্বর পণ্ডিত ছিলেন চতুর্ব্যুহের অনিরুদ্ধ। পার্ষদম্ – নারদ মুনি শ্রীবাস ঠাকুর হিসেবে এসেছিলেন, আর গদাধর হচ্ছেন ভগবানের শক্তি রাধারানী। অগণিত ভক্তগণ ও ভগবানের পার্ষদবর্গ আধ্যাত্মিক জগত থেকে এসেছিলেন।
ভগবান বিভিন্ন কারণে আবির্ভূত হয়েছিলেন – প্রাথমিক কারণটি হচ্ছে সংকীর্তন আন্দোলনের প্রারম্ভ করা এবং শ্রীল প্রভুপাদ এই আন্দোলনকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর জীবনের প্রারম্ভে, শিক্ষা নিয়ে আনন্দমগ্ন ছিলেন এবং তিনি নিমাই পণ্ডিতরূপে লীলা উপভোগ করছিলেন। তারপর তিনি গয়াতে যান, সেখানে ঈশ্বরপুরী মহারাজের দ্বারা দীক্ষা প্রাপ্ত হন এবং তারপর তাঁর সংকীর্তন লীলা প্রারম্ভ করেছিলেন। তিনি আসলে কানাই নাটশালাতে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেছিলেন, তিনি দেখলেন যে একটু দূরে একজন গোপবালক বংশী বাজাচ্ছেন, নৃত্য করছেন এবং তার আরও নিকটে আসছেন, তিনি দেখলেন উনি কৃষ্ণ! তিনি হলুদ ধুতি পরিহিত, তাঁর মাথায় পাগড়ী আছে ও তাতে ময়ূর পুচ্ছ আছে, কৌস্তুভ মনি, শ্রীবত্স চিহ্ন আছে, তিনি হাসছেন ও নৃত্য করছেন। তারপর তিনি তাঁর আরো নিকটে এসে দৌড়ে চৈতন্য মহাপ্রভুকে আলিঙ্গন করলেন। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু তখন উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিলেন! কৃষ্ণ তাঁকে আলিঙ্গন করলেন, আর তারপরে দৌড়ে চলে গেলেন। তখন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু তাঁর পিছনে ধাবিত হলেন, তবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গাছের পিছনে চলে গিয়েছিলেন এবং চৈতন্য মহাপ্রভু সেখানে যান গিয়ে আর তাঁকে দেখতে পেলেন না। তাই, বিরহে তিনি মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন, এই স্থানটি এখনও আছে। কৃষ্ণের কৃপায় এখন এই স্থান ইস্কন সেবার তত্ত্বাবধানে আছে। গৌরাঙ্গ! তাই যখন আপনারা ভারতে যাবেন, দয়া করে কানাই নাটশালা দর্শন করবেন।
তারপর, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপে ফিরে যান এবং সংকীর্তন আন্দোলন শুরু করেন। তিনি সকল ভক্তকে ডাকলেন ও তাদেরকে বললেন যে তারা অত্যন্ত ভাগ্যবান কারণ তারা আগে থেকেই ভক্ত, তবে তিনি তাঁর জীবন অযথা নষ্ট করেছেন, তিনি ক্রন্দন করছিলেন ও তাদেরকে এই কথা বলছিলেন — “আপনারা জানেন না কৃষ্ণকে পেয়ে আবার তাঁকে হারিয়ে ফেলার অনুভূতি কিরকম।” তিনি ক্রন্দন করেই যাচ্ছিলেন। মানুষেরা বলছিল যে নিমাই পণ্ডিত রোগগ্রস্থ হয়েছেন, তাই পরে তিনি শ্রীবাস ঠাকুরের কাছে যান ও জিজ্ঞেস করেন, “আমি কি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি?” শ্রীবাস ঠাকুর বললেন, “অবশ্যই! কি প্রশ্ন?” শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “আমার কি কোন রোগ হয়েছে?” শ্রীবাস ঠাকুর বললেন, “আপনার কি কি লক্ষণ দেখা যাচ্ছে?” চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “আমি যখন কৃষ্ণের নাম শুনি, তখন আমার নৃত্য করতে ইচ্ছা হয়, আমার চোখ দিয়ে অশ্রু বেয়ে পড়ে, আমার রোম শিহরিত হয়, কখনও কখনও আমি অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাসি, কখনও আমার স্বর রোধ হয়ে আসে, কখনও কখনও আমি হতবাক হয়ে যাই ও মূর্ছিত হয়ে পড়ি। আমার কি কোন রোগ আছে?” শ্রীবাস ঠাকুর বললেন, “হ্যাঁ, আপনার একটি রোগ আছে, আমিও সেই রোগ চাই।” হরিবোল! “আপনার কৃষ্ণ প্রেমের রোগ আছে।” গৌরাঙ্গ! সাধারণত মানুষেরা আপনার ভাব বুঝতে পারবে না কারণ এটি তাদের বোধশক্তির বাইরে। কিন্তু আমি আপনাকে সন্ধ্যায় আমার অঙ্গিনায় আসার নিমন্ত্রণ জানাই। আমি সেই সকল ভক্তদের ডাকব, যারা আপনার ভাবের প্রশংসা করবে। এইভাবে শ্রীবাস অঙ্গনে সমগ্র রাত্রিযাবৎ কীর্তন প্রারম্ভ হয়। অনেক মানুষেরা সেখানে যেত, তারা দেখতে পেত না যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিমাই পণ্ডিত কিভাবে ভক্ত হয়ে গেছেন। তারা সকলে কীর্তন করতেন, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে! অনেক হিংসুক ব্যক্তিরা বলত, “ওহ! আপনারা এখানে কি করছেন? তারা কি মদ্যপান বা এমন কিছু করছে?” কেউ একজন বলল, “তারা হরে কৃষ্ণ কীর্তন করছে।” “ওহ! তুমি কি সেই হরে কৃষ্ণদের জানো নাকি? না না এই ব্যক্তিরা পাগল হয়ে গেছে!”
জাত ব্রাহ্মণেরা চাঁদ কাজীর কাছে গিয়ে নালিশ জানায় যে, “নিমাই পণ্ডিত (যেমন আপনারা জানেন গৌর হরি) পবিত্র নাম কীর্তন করে, জনসমক্ষে উচ্চস্বরে হরিনাম কীর্তন করে। এটি অপরাধ জনক, ভগবানের নাম উচ্চস্বরে জপ করতে নেই, আপনাকে নিরবে নামে ধ্যানস্ত হতে হবে।” চাঁদ কাজী মুসলিমদের থেকেও অভিযোগ পেয়েছিল, এখন এমনকি হিন্দুরাও অভিযোগ জানাচ্ছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এক কীর্তন দলকে হরিনাম কীর্তনে পাঠিয়েছিলেন, চাঁদ কাজী তাদের মৃদঙ্গ ভেঙে দেয় ও তাদেরকে আবার কীর্তন করতে নিষেধ করে। তারপর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই বিষয়টি শুনে বললেন যে, “কেউ সংকীর্তন আন্দোলনকে বন্ধ করতে পারে না!” আর এরপর তিনি গণ অমান্য আন্দোলনের আয়োজন করেছিলেন। চারটি দল নবদ্বীপের বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিল। একটিতে অদ্বৈত গোঁসাই নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, একটিতে শ্রীবাস ঠাকুর, একটিতে হরিদাস ঠাকুর আর আরেকটিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর দুই দিকে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু ও গদাধর পণ্ডিত ছিলেন। তাঁরা নবদ্বীপ নগরের চারিদিকে গিয়েছিলেন। সেখানে জন সমাজ বেরিয়ে আসে, শ্রীচৈতন্য ভাগবতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমের কথা বলা হয়েছে। যাই হোক, তারা তাতে বেরিয়ে আসে এবং আমরা দেখি যে কৃষ্ণলীলায় তিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ করেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ রাসলীলায় অগণিত গোপীদের সাথে নৃত্য করেছিলেন, এই রকমই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু লক্ষ লক্ষ ভক্তের সাথে নৃত্য কীর্তন করেছিলেন এবং সেই শব্দ তরঙ্গ ছিল দিব্য, তা ১৪ ভুবন পেরিয়ে এমনকি বৈকুন্ঠলোক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। তারা চারিদিকে গিয়েছিলেন ও আরো মানুষেরা সমবেত হয়েছিল। তাই ইন্দ্র দেব, বায়ু দেব, তারা কি হচ্ছে তা দেখার জন্য নিম্মে নেমে আসেন। যখন তারা দেখতে পান যে পরম পুরুষোত্তম ভগবান নৃত্য কীর্তন করছেন ও ক্রন্দন করছেন, তখন তারা অভিভূত হয়ে যান, তারা বিস্ময়বিহল হয়ে পড়েন! এবং মূর্ছিত হয়ে পড়ে যান! স্বর্গ থেকে অপ্সরাগণ পুষ্প বর্ষণ করছিলেন। এত অপূর্ব কীর্তন ছিল! কৃষ্ণদাস কবিরাজ বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধা পরায়ণ ছিলেন, তাই তিনি সেই কীর্তন সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা করেননি, তিনি আশা করেছেন যে সকলে চৈতন্য ভাগবত অধ্যয়ন করবে, আমি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সব লীলাগুলি একসাথে করার চেষ্টা করছি। তা আট - নয়টি ভিন্ন গ্রন্থ থেকে গৃহীত এবং আমি প্রায় এটি সংকলনের শেষের মুখে।
এইভাবে কীর্তন চলছিল এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দুইপাশে ছিলেন নিত্যানন্দ প্রভু ও গদাধর। তিনি উল্লম্ফন করছিলেন ও মূর্ছিত হয়ে পড়ছিলেন। কেবল গদাধর ও নিত্যানন্দ তাঁকে ধরতে পারছিলেন। কীর্তন চলছিল ও একদল পণ্ডিত, নাস্তিকরা ভক্তদের দেখে হাসছিল “হা! হা!” তারা কীর্তনে হাসছিল, কিন্তু তারপর যখন তারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে এইরকম ভাবে বিভোর হয়ে নৃত্য-কীর্তন করতে দেখেছিল, তখন তারাও পরিবর্তিত হয়েছিল। ভক্তদের সঙ্গে তারাও কীর্তন করতে শুরু করেছিল, তারাও মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল, তাই এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কীর্তনের এক মহান প্রভাব ছিল। যখন অবশেষে এই জনসমুদ্র চাঁদ কাজীর গৃহের বাইরে পৌঁছায়, তখন চাঁদ কাজী যখন সেই কীর্তন শোনে, তখন তিনি জিজ্ঞেস করে যে, “এটি কি? এ কি কোন হিন্দু বিবাহ অনুষ্ঠান হচ্ছে?” তিনি তার সৈন্যদের সেখানে গিয়ে তা থামাতে বলে। যখন সেই সৈন্যরা বেরিয়ে এসে সেই জনসমুদ্র দেখে, তখন তারা ভয়ে ভীত হয়, তাই তারা তাদের মাথায় পাগড়ি পড়ে নিয়েছিল ও দাড়ি ঢেকে দিয়েছিল, আর দুই বাহু উর্দ্ধে প্রসারিত করেছিল। হরিবোল! কারণ তারা ভীত হয়েছিল। আপনারা সেই লীলাটি জানেন যে যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং চাঁদ কাজী আলোচনায় বসেছিলেন, তখন চাঁদ কাজী অবশেষে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, “কেউ, এমনকি আমার পরিবারের কেউও সংকীর্তন আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করবে না।” এর পাঁচশো বছর পরেও, আমি চাঁদ কাজীর পরিবারের সর্বশেষ সদস্যের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম, তিনিও অত্যন্ত অনুকূল ছিলেন। তার নাম ছিল শাহ জাহান শেখ।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপে ২৪ বছর থাকার পর সন্ন্যাস গ্রহণ করে জগন্নাথ পুরীতে চলে যান, সেখানে রাজা প্রতাপ রুদ্র রামানন্দ রায়ের সাথে ছাদে ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, “এই ভক্তরা কারা? এরা কত দীপ্তিমান দেখাচ্ছে!” রামানন্দ রায় প্রত্যেককে চিনিয়ে দিচ্ছিলেন যে, “ওহ! ইনি শিবানন্দ সেন, তিনি বাংলা থেকে ভক্ত দলকে নিয়ে এসেছেন। তিনি অদ্বৈত গোঁসাই।” রাজা বললেন, “তিনি অত্যন্ত বিশেষ দেখাচ্ছেন।” এইভাবে তিনি প্রত্যেক ভক্তকে চিনিয়ে দিচ্ছিলেন। সেই সময় রাজার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখার অনুমতি ছিল না, কারণ চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন যে তিনি রাজাকে দেখতে চান না, যেহেতু তারা অত্যন্ত জড় জাগতিক হয়। তবে রাজা ভক্তদের সেবার প্রতি অনুপ্রাণিত ছিলেন, তিনি তার মন্দিরের প্রধানকে ভক্তদের থাকার জায়গা ও প্রসাদের ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন। তিনি সাধু ও শুদ্ধ ভক্তদের প্রশংসা করছিলেন এবং তারপর তাকে বলা হয়েছিল যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তদের নিয়ে জগন্নাথদেবের দর্শন করবেন। তিনি তাদের সকলকে প্রসাদ দিয়েছিলেন, সেবা করেছিলেন, তার হাত এত বড় ছিল যে তিনি এত প্রসাদ দিতেন যা ২-৩ জন পেতে পারবে। স্বরূপ দামোদর গোস্বামী চৈতন্য মহাপ্রভুকে বলেছিলেন যে এখন আর কেউ প্রসাদ পাবে না, আপনি বসুন কারণ তারা আপনার আগে প্রসাদ গ্রহণ করবেন না। এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বসে অন্যান্য সন্ন্যাসীদের সাথে প্রসাদ পেয়েছিলেন, তাঁর সাথে অন্যান্য ভক্তরাও প্রসাদ পেয়েছিলেন। তারা বিশ্রাম গ্রহণ করে আবার ফিরে আসেন।
এরপর চৈতন্য মহাপ্রভু জগন্নাথ মন্দিরে প্রদক্ষিণ করতে করতে একটি কীর্তন শুরু করেছিলেন। চারটি দলের আটটি মৃদঙ্গ এবং ৩২টি করতাল ও চারজন নর্তক ছিল। অদ্বৈত গোঁসাই, বক্রেশ্বর পণ্ডিত, গদাধর এবং শ্রীবাস। এই নর্তকবৃন্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। আমরা আমাদের কিছু অপূর্ব নর্তকদের দেখেছি, আমি সব নর্তকদের জানিনা কিন্তু রাধানাথ স্বামী, চন্দ্রামলি স্বামী, শচীনন্দন স্বামী এবং অন্যরা তারা নৃত্য করে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেন! বক্রেশ্বর পণ্ডিত অবিরাম ৭২ ঘন্টা নৃত্য করতে সক্ষম ছিলেন, তিন দিন ধরে। যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মন্দির পরিদর্শন করতেন, তখন তিনি মধ্যখানে নৃত্য করতেন, আর তার চারপাশে চারটি দলে নৃত্য করত। এরপর মহাপ্রভু সেই অলৌকিক কান্ড ঘটিয়েছিলেন, প্রত্যেক দল ভাবছিল যে তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন! শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে এই অলৌকিক কান্ড করেছিলেন, যখন তিনি গোপবালকদের সাথে বনভোজন করছিলেন, তখন প্রত্যেক বালক ভাবছিল যে কৃষ্ণ তার দিকে তাকিয়ে আছেন, সেটি কিভাবে সম্ভব? কৃষ্ণের দ্বারা সবকিছুই সম্ভব। রাজা প্রতাপরুদ্র দেখেছিলেন যে কীর্তন চলছে ও তাতে তার চৈতন্য মহাপ্রভুকে ব্যক্তিগতভাবে দর্শন করার অভিলাশ আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমাদের সকল ভক্তদের নৃত্য কীর্তন করতে দেখে শ্রীল প্রভুপাদও বলেছিলেন যে এটি সেই কৃপা। যাইহোক, এই ভক্তবৃন্দ মন্দিরের চারপাশে যান, যে দলই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে আসছিলেন, তিনি তাদেরকে আলিঙ্গন করছিলেন, এইভাবে তাদের কীর্তনের শব্দতরঙ্গ ১৪ ভুবনে পরিব্যপ্ত হয়েছিল। ওড়িশার মানুষেরা যখন সেই কীর্তন দেখেছিল, তখন তারা হতবাক হয়ে পড়েছিল। চৈতন্য মহাপ্রভু সব অষ্টসাত্ত্বিকভাব অনুভব করছিলেন! তিনি ক্রন্দন করছিলেন এবং তাঁর চক্ষু থেকে ঝরনার মতো অশ্রুধারা বেরিয়ে আসছিল। চৈতন্য মহাপ্রভুর অশ্রুধারায় ভক্তরা জলসিক্ত হয়ে যেতেন! তিনি ক্রন্দন করতেন এবং তাঁর রোম শিহরিত হত ও বিভিন্ন ভাব প্রকাশিত হত। সেখানে ছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু, অদ্বৈত আচার্য, বক্রেশ্বর পণ্ডিত এবং শ্রীবাস ঠাকুর।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিত্যানন্দ প্রভুকে বলেছিলেন যে, “আমরা আধ্যাত্মিক জগত থেকে চার ধরনের মানুষদের উদ্ধার করতে এসেছি, যারা সাধারণত উদ্ধার প্রাপ্ত হয় না — মূর্খ, যারা তাদের শরীরকে নিজের স্বরূপ বলে মনে করে; নিচ; পতিত, যারা নিয়মনীতি ভঙ্গ করে এবং দুঃখী, যারা জড় জাগতিক ক্লেশ ভোগ করছে।” আপনারা কি এমন কাউকে জানেন? আপনার কি এমন কারো সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে? হা! তিনি নিত্যানন্দ প্রভুকে বলেছিলেন যে, “বাংলায় ফিরে যাও এবং আমরা যে স্থান পর্যন্ত প্রচার করেছি তারপর থেকে প্রচার শুরু করো এবং এই সমস্ত মানুষদের উদ্ধার কর।” শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে কিছু ভক্তদের তার সাথে পাঠাতে বললেন। চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁকে প্রায় ৫০ জন ভক্ত সাথে পাঠান এবং তিনি তাদের সাথে বাংলায় ফিরে যান, সাধারণত যত সময় লাগে, তার থেকে বেশি সময় লেগেছিল। সরাসরি আসার পরিবর্তে, তারা এত ভাবে বিভোর হয়ে পড়েছিলেন যে তারা এই পথ, ওই পথ ধরে কৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা অভিনয় করতে করতে এসেছিলেন। তারা পানিহাটি আসেন ও রাঘব পণ্ডিত এবং তার বোন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনারা কত মূর্তি? আপনারা কতজন?” তারা বললেন, “প্রায় ৫০ জন!” তিনি বললেন, “ঠিক আছে, গঙ্গা থেকে স্নান করে আসুন এবং এক ঘন্টার মধ্যে আপনাদের মহাভোজ প্রস্তুত হয়ে যাবে।” আমি রান্নাঘরে গিয়েছিলাম এবং দেখছিলাম যে কিভাবে ভক্তরা আপনাদের সকলের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা করছেন। তারা খুব ভালো যজ্ঞ করছেন। রান্না! প্রসাদ কেমন ছিল?
শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু প্রথমে পানিহাটি গিয়েছিলেন এবং সেখানে কীর্তন প্রারম্ভ করেছিলেন। তিনি বীরাসনে বসেছিলেন, আমি জানিনা আপনারা হঠযোগ সম্পর্কে জানেন কিনা, যে বীরাসন কি। তখন প্রত্যেক ভক্ত তাঁর সামনে আসছিলেন ও নৃত্য করছিলেন, একের পর এক কীর্তন চলছিল এবং সকলে তাঁর সামনে এসে নৃত্য করছিলেন। তারপরে তিনি নৃত্য করতে শুরু করলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন যে, “যখন নিতাই নৃত্য করে, আমি সেখানে থাকি।” এটি এমন কিছু যা না দেখে থাকতে পারা যাবে না। এটি অপ্রাকৃত! নিতাই গৌর! যখন শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু নৃত্য করতে শুরু করলেন, তখন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু দক্ষিণ ভারতে ছিলেন, তবে তিনি তৎক্ষণাৎ সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু তিনি নিতাই ব্যতীত সকলের কাছে অদৃশ্য ছিলেন। নিতাই প্রত্যেককে বললেন যে, চৈতন্য মহাপ্রভু এসেছেন কিন্তু আপনারা তাঁকে দেখতে পারবেন না, তবে তিনি দক্ষিণ ভারতের একটি পুষ্পমালা পরিধান করে আছেন, আপনারা সেই সুঘ্রান নিতে পারেন। প্রত্যেকে নাক দিয়ে শুঁকে সেই ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কেউ একজন সেই সুঘ্রান পান, তারপর তিনি ভাবে বিভোর হয়ে পড়েন। হা! হা! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! এইভাবে তা ছিল যেন প্রেম ধূম্র। ভক্তরা সেই সুঘ্রাণ পাচ্ছিলেন ও কীর্তন চলতেই থাকছিল। শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু যে সকল ভক্তরা অবিরাম কীর্তন করছিল, তাদের কীর্তনে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিছু কিছু ভক্তরা এক মহাশক্তি লাভ করেন, একজন ভক্ত বেলুনের মতো এক বৃক্ষ থেকে অন্য বৃক্ষে লাফ দিচ্ছিলেন, আরেকজন ভক্ত এত শক্তিশালী হয়ে ওঠেন যে এক বিরাট বৃক্ষ হাতে তুলে সেটির সাথে নৃত্য করতে থাকেন, তারপর অবিরাম ঠাকুর তিনি ৬০ ফুট লম্বা বাঁশ তুলে ধরে তা বাশির মতো বাজাতে থাকেন! ৬০ ফুট লম্বা বাঁশ একদিকে ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন, অসম্ভব কান্ড! এইভাবে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু কীর্তন করছিলেন। মানুষেরা সেখানে আসছিলেন এবং অনেক লোকেরা নৃত্য কীর্তন করছিলেন আর তারা এমনভাবে প্রভাবিত হয়ে কীর্তনে যোগ দিয়েছিলেন। তারা এত প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন যে সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন, ২-৩ দিন ধরে সেখানে থেকেছিলেন। তারপর যখন তারা চলে যান, মানুষেরা তাদের জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে? তুমি কোথায় ছিলে?” তারা কেবল যা বলতে পারতেন তা হল, “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে!” এইভাবে শ্রীমন নিতাই সমগ্র বাংলায় সংকীর্তন আন্দোলন প্রসারিত করেছিলেন। তিনি আদি সপ্তগ্রাম গিয়েছিলেন, যেখানে স্বর্ণ ও রত্ন ব্যবসায়ীরা ছিল, তারা সাধারণত পয়সা রোজগারে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু তিনি তাদের গৃহে কীর্তন করেছিলেন ও সেই সব ব্যবসায়ীদের দিয়ে কীর্তন করিয়েছিলেন। অপূর্ব লীলা!
যাইহোক, আমি ভাবছিলাম কিভাবে সকল ভক্তরা এই সাধু সঙ্গে সমবেত হয়েছে, শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা নিয়ে সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করতে এসেছিলেন, শ্রীল প্রভুপাদ নবম স্কন্ধ ১৪ অধ্যায় ৩৬ নম্বর শ্লোকের তাৎপর্যে বলেছেন যে, যদি কেউ তার আধ্যাত্মিক জীবনে কৃষ্ণ ভাবনামৃতের স্তরে পৌঁছে যায়, তাহলে নারী, পুরুষ, শূদ্র, তারা সকলেই সমান। হরিবোল! তিনি সমগ্র বিশ্বের কাছে এই পন্থা নিয়ে এসেছেন। তিনি একবার বলেছিলেন নারদ মুনি এবং তাঁর এক মিত্র নিউইয়র্কে এসেছেন এবং তারা উপভোগ করছেন যে কিভাবে ম্লেচ্ছরা হরেকৃষ্ণ জপ কীর্তন করছে। যাই হোক, আমার মনে হয়, আমরা জানি না আপনাদের মধ্যে কারা কোন গ্রহ থেকে ছদ্মবেশে এখানে সাধু সঙ্গ উপভোগ করার জন্য এসেছেন। এইবার আমি এখানে প্রথম এসেছি, শ্রী শ্রীমৎ ইন্দ্রদুম্ন স্বামী আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, আমি শুনেছি গতকাল তারা ব্যাস পূজা উদযাপন করেছিল। আমাদেরকে বলা হয়নি, তাই আমরা তাতে যোগদান দিতে পারিনি, তবে আমি দেখেছি যে ইউক্রেন যুদ্ধের আগে তিনি পোল্যান্ডে এক মহোৎসব করেছিলেন ও দক্ষিণ আফ্রিকার দূরবানে রথযাত্রা উদযাপন করেছিলেন। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে তিনি এখানে আমেরিকাতে সাধুসঙ্গ আয়োজন করেছেন। তোমাদের কাছে যদি কোন মালা থাকে তাহলে আমি তা ওনাকে নিবেদন করতে চাই।
আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুকে বিশ্ব বিখ্যাত করতে চাই। তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে সমগ্র বিশ্বের প্রতি নগর ও গ্রামে তাঁর পবিত্র নাম কীর্তিত হবে। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই আন্দোলন সমগ্র বিশ্বে প্রচারিত করেছিলেন, তিনি কখনও মানুষদের ধর্মান্তরিত হতে বলেন নি, তিনি কখনও মানুষদেরকে তাদের পূর্ব বিশ্বাস ত্যাগ করতে বলেননি, সেটি জিউ, খ্রিস্টান, মুসলিম, বৌদ্ধ প্রত্যেকের ক্ষেত্রে। তিনি বর্ণনা করেছিলেন যে কৃষ্ণভাবনামৃত হচ্ছে স্নাতকোত্তর শিক্ষা। প্রত্যেক ধর্মে বলা হয় যে আপনার ভগবানকে ভালোবাসা উচিত, তবে কৃষ্ণভাবনামৃত আপনাকে শিক্ষা দেয় যে কিভাবে তা করতে হবে। হরে কৃষ্ণ জপ করুন এবং ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলন করুন, ভক্তিযোগ অনুশীলন করুন। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই বাণী সর্বত্র প্রদান করেছেন, তাই আমরা চাই মানুষেরা যাতে চৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হয়, এই কারণে আমরা মায়াপুরে মন্দির নির্মাণ করছি, কারণ নিত্যানন্দ প্রভু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে — “এক অদ্ভুত মন্দির হইবে প্রকাশ, গৌরাঙ্গের নৃত্য সেবা হইবে বিকাশ” — চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের জন্য এক অদ্ভুত মন্দির প্রকাশিত হবে, তাই যদি আমরা তা করতে পারি। বৈশ্বেসিকা প্রভু আমাদেরকে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ বিতরণে উৎসাহিত করছেন, ২০২৬-এর মধ্যে আমরা এক লক্ষ শ্রীমদ্ভাগবতম বিতরণ করতে চাই। আমার মনে হয়, এই বছর আমাদের লক্ষ্য ছিল ৫৫,০০০? আমার সঠিক সংখ্যা মনে পড়ছে না তবে আমার সেই স্লোগানটি মনে পড়ছে — “মনে করো এটি সম্ভব!” আমি আশা করি প্রত্যেকে এই সাধুসঙ্গ থেকে অনেক শক্তি পাচ্ছেন এবং বাইরে গিয়ে শ্রীল প্রভুপাদের বাণী প্রচার বৃদ্ধি করবেন। হরে কৃষ্ণ!
(প্রথমে শ্রী শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ শ্রী শ্রীমৎ ইন্দ্রদুম্ন স্বামী মহারাজকে মালা পরালেন, তারপর ইন্দ্রদুম্ন স্বামী মহারাজ ওঁনাকে মালা পরালেন। )
ইন্দ্রদুম্ন স্বামী :- আমরা জয়পতাকা স্বামী মহারাজকে এখানে এসে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠানে আমাদের অনুগ্রহ করার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। এটি সর্বদা আমার ইচ্ছা ছিল যে তিনি যাতে এখানে আসেন, কিন্তু তিনি সমগ্র বিশ্বে এত সক্রিয় একজন প্রচারক যে তিনি আসতে পারেননি। কিন্তু এখন তিনি এসেছেন, এটি এক অসাধারণ প্রবচন ছিল! আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান অনুভব করছি এবং মহারাজ আমরা আপনাকে প্রত্যেক বছরের জন্য এখানে নিমন্ত্রণ করতে চাই, কারণ আমরা ২০২৪, ২৫, ২৬, ২৭-এও সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠানটি করতে চাই। জয়পতাকা স্বামী মহারাজের জয়! শ্রীল প্রভুপাদের জয়! সাধুসঙ্গ উৎসবের জয়! নিতাই গৌর প্রেমানন্দে!
শচীনন্দন স্বামী:- সমস্যাটি হচ্ছে, আমাদের সাথে শ্রী শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ আছেন, আর অবশ্যই আমরা প্রশ্ন-উত্তর পর্ব করার চেষ্টায় ছিলাম যাতে ভক্তদের সাথে কিছু কথোপকথন হতে পারে, তবে সময় নামক এক নিষ্ঠুর বস্তু আছে, আমরা আপনাকে আরো চাই। আমরা এখন কি করতে পারি? আমি বিভ্রান্ত। ঠিক আছে মহারাজ, আমার একটি প্রশ্ন আছে যা এই প্রবচনে ছিল। আমি কি এই প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করতে পারি? আপনি কেমন আছেন?
জয়পতাকা স্বামী:- হা! হা! শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় আমি কৃষ্ণভাবনামৃতে অত্যন্ত আনন্দিত আছি, শারীরিকভাবে আমি একরকম অক্ষম ব্যক্তি, হা! হা! হুইল চেয়ারে চলতে হয়, ঠিকভাবে কথা বলতে পারি না, আমার যকৃত ও মুত্রাশয় প্রতিস্থাপন হয়েছে, স্ট্রোক হয়েছে, এখন আমি ত্বকের থেরাপি নিচ্ছি, তবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত আছি, হা! হা! বিশেষত এই সুন্দর সঙ্গ লাভ করে! হরে কৃষ্ণ! আমার মনে হয় আপনাদের তাড়াতাড়ি গিয়ে প্রসাদ পাওয়া উচিত!
শচীনন্দন স্বামী:- ধন্যবাদ মহারাজ। এটি এত সুন্দর এক দৃষ্টান্ত যে কৃষ্ণভাবনামৃত কোন ভক্তকে জড়জাগতিক বাঁধা-বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে শক্তি প্রদান করে। ধন্যবাদ এখানে আসার জন্য ও এই গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পথ প্রদর্শিত করার জন্য, যে যখন কেউ কৃষ্ণভাবনায় আছে বা কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন তিনি জড় জাগতিক বাঁধা-বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে পারে। আমরা চাই আরো ভাব বিনিময় হোক, কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে আপনারা এখন গিয়ে প্রসাদ পান এবং এরপর সর্বাধিক কীর্তন হবে, আমরা ৯টার সময় মঞ্চে তা শুরু করব।
Lecture Suggetions
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ