Text Size

২০২৩০৫১৯ আগমনী প্রবচন

19 May 2023|Duration: 02:13:59|Bengali|Arrival Address

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

জয়পতাকা স্বামী:- আমি দেখলাম যে এই স্থানকে একচক্র ধাম বলে ডাকা হচ্ছিল। তাই আমার কি একচক্র ধাম সম্পর্কে কিছু বলা উচিত? দেখুন, একচক্র ধামে গর্ভবাস নামক একটি স্থান আছে, যেখানে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর মাতার গর্ভে ছিলেন ও সেই স্থানে আবির্ভূত হয়েছিলেন। একচক্র গ্রাম এক অতি পুরাতন স্থান। পাণ্ডবেরা মায়াপুরে ছিলেন, তারা মায়াপুর থেকে একচক্রে গিয়েছিলেন।  সেখানে একচক্রে এখনও একটি স্থান পাণ্ডবদের ক্ষেত্র নামে পরিচিত। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে আমার স্ট্রোক হয়েছিল, আমার অর্ধেক মুখ প্যারালাইজড, তাই আমি যা বলছি তা তিনি পুনরাবৃত্তি করে বলছেন। কারণ কেউ কেউ হয়তো আমি কি বলছি তা বুঝতে পারবে না, এর দ্বারা তারা বুঝতে সক্ষম হবে। 

সেখানে এক রাক্ষস ছিল, তার নাম ছিল হিড়িম্বা। সে সেখানে এসে গ্রামবাসীদের ভক্ষণ করত। সে ছিল এক রাক্ষসী। যেহেতু সকল গ্রামবাসীরা তাকে ভয় পাচ্ছিল, তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রত্যেকদিন তার ভোজনের জন্য একজন গ্রামবাসীকে তার খাদ্য হিসেবে পাঠানো হবে। আর পাণ্ডবরা যেই পরিবারের সাথে থাকছিলেন, সেই সময় সেই পরিবারের কোন এক সদস্যকে হিড়িম্বার আহার হিসেবে দেওয়ার পালা ছিল। সেই পরিবারের সকল সদস্যরা বলছিল, “আমি যাব!পিতা বলছিল, “আমি যাব!মাতা বলছিল, “আমি যাবো!সেই পরিবারের এক একজন তাদের কারণ বলছিল যে কেন তাকে বলি হওয়ার জন্য যাওয়া উচিত। সাধারণত আমরা ভাবি কেউ চাইবে অপরজন যাতে যায়, কিন্তু এই পরিবারের তারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি এত সমর্পিত ছিল যে তা পাণ্ডবদের মুগ্ধ করেছিল। ভীম বললেন, “আমি যাব!তারপর তারা বলদের গাড়ি ভর্তি খাবার পাঠায় এবং তখন ভীম সেই বলদের গাড়ির ভিতর বসেছিলেন আর তিনি ছিলেন সেই রাক্ষসের খাদ্য। এরপর ভীম সেই সব খাবার খেয়ে নেয়, তিনি বৃকোদর নামে পরিচিত। তার মধ্যে এক ভয়ংকর ক্ষুধা আছে, তিনি ১০,০০০  হাতির সমান শক্তিশালী। সেই রাক্ষস বলল, “এই তুমি আমার খাবার খাচ্ছ?” এই বলে সে ভীমের পিছনে আঘাত করতে থাকে, ভীম খাবার শেষ করে পিছন দিকে ফেরে ও তার সাথে এক বিরাট যুদ্ধ করে। অবশেষে তিনি সেই রাক্ষসকে হত্যা করেছিলেন। অর্থাৎ সেই রাক্ষস মারা যায়। যাই হোক, এই একচক্র ধামকে পুরাতন এক অতি পবিত্র স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চৈতন্য মহাপ্রভু হলেনশ্রীকৃষ্ণচৈতন্য রাধা কৃষ্ণ নহে অন্যএবং শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু হলেনবলরাম হইল নিতাইকৃষ্ণলীলায় শ্রীবলরাম জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং রামলীলায় তিনি কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষণ রূপে এসেছিলেন। শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলেন আর প্রত্যেক দিন তিনি তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ক্রীড়া করতেন, যারা প্রকৃতপক্ষে দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণের সখা ছিলেন। আমরা হয়তো গুলিয়ে ফেলেছি, যেই রাক্ষসের সাথে ভীম যুদ্ধ করেছিলেন, সে ছিল একজন পুরুষ। আর যেই রাক্ষসী একচক্রে এসেছিল, সে ছিল নরকাসুরের পুত্রি। এর আরেকটি লীলা আছে যে নরকাসুরের পুত্রী . . . (১:২৬:০৫ - ১:২৬:১৭)। 

নিত্যানন্দ প্রভু একচক্রে তাঁর সখাদের সাথে বিভিন্ন ধরনের লীলার নাট্যক্রীড়া করতেন। তাঁরা কৃষ্ণ এবং তাঁর অন্যান্য অবতারের বিভিন্ন লীলা অভিনয় করে খেলত। মানুষেরা তা দেখে অভিভূত হয়ে যেত যে কিভাবে এই বালকেরা এই লীলাগুলি এত বিস্তারিতভাবে জানে। তারা ছিল ঠিক এমন ছোট শিশুদের মতো! ছোট বালকেরা সেই লীলাগুলি হৃদয় দিয়ে জানত। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, একসময় তারা রামলীলা অভিনয় করছিল, আর শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু লক্ষণের অভিনয় করেছিলেন। সেখানে ইন্দ্রজিৎ তাকে তীর বিদ্ধ করে ও তারপর লক্ষণ অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর হনুমানকে তাকে সুস্থ করার জন্য ঔষধি আনতে হতো। সেই সময় পদ্মাবতী দেবী, নিত্যানন্দ প্রভুর মাতা এসে তাদেরকে বলেন, “এখন প্রসাদের সময়! প্রসাদ পেতে এসো!কিন্তু তারা যাচ্ছিল না, যেহেতু নিত্যানন্দ প্রভু নিচে শায়িত অবস্থায় ছিলেন। তিনি শ্বাস-প্রশাস নিচ্ছিলেন না। মাতা পদ্মাবতী এসে বললেন, “কি হচ্ছে?” তারপর তিনি তার স্বামী, নিত্যানন্দের পিতাকে ডাক দেন।কি হয়েছে?” তিনিও দুঃখিত যে কি হয়েছে, তারপর তারা কবিরাজকে ডাকে। তিনিও বুঝতে পারছিলেন না যে বালকের কি হয়েছে, তারপর নিতাইয়ের পিতা জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছিল? তোমরা কি করছিলে?” তখন তারা বলল যে তারা রামলীলা নাটক করছিল, “এরপর কি হয়েছিল?” তারা সব বলল যে নিত্যানন্দ লক্ষণের অভিনয় করছিলেন, তিনি ইন্দ্রজিতের দ্বারা তীর বিদ্ধ হয়, এবং হনুমানকে ওষুধ আনতে হতো।এর পরবর্তীতে কি আছে?” তারপর সেই বালকেরা বলল যে হনুমানকে পর্বত থেকে ঔষধ নিয়ে আসতে হত, সে জানে না কোন ঔষধ, তাই পুরো পর্বত তুলে নিয়ে আসবে। তখন তা লক্ষণের নাকে সামনে ধরা হবে। তারপর হাঁড়াই ওঝা, তার পিতা বললেন, “হনুমান কোথায়?” যে বালক হনুমানের অভিনয় করছিল, সে বলল, “এই খানে!” “ঔষধ নিয়ে এসো!সেই তরুণ বালক যে হনুমানের অভিনয় করছিল, সে গিয়ে পর্বত তুলে আনে ও ঔষধ নিয়ে আসে। তারপর নিতাই তাঁর চেতনায় ফেরেন। হরি বোল! এইভাবে তারা প্রত্যেকদিন লীলা অভিনয় করত, তবে তাদের অভিনয় ছিল অত্যন্ত ঐকান্তিক। 

তারা যেই বৃক্ষের তলায় লীলা নাটক অভিনয় করে খেলত, সেই বৃক্ষটি অনন্ত শেষ বৃক্ষ নামে পরিচিত। সেই বৃক্ষটি অনন্ত শেষের ফণার মতো ঝুঁকে আছে, সেখানে রাস্তার অপরদিকে বঙ্কিম রায় মন্দির আছে। সেই মন্দিরের ভিতরে নিতাই শ্রীবিগ্রহের মধ্যে প্রবেশ করে এই জগত থেকে অপ্রকট হয়েছিলেন। এটি অত্যন্ত বিশেষ স্থান। এটি রাঢ় দেশের অন্তবর্তী, যে স্থানে গঙ্গা প্রবাহিত হয় না। 

আমি শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর সব লীলা বলতে পারব না, কারণ কিছু কিছু লীলা অত্যন্ত হৃদয় বিদারক। তিনি সমগ্র ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন ও বলা হয় যে তিনি হয় মাধবেন্দ্রপুরী বা নয়তো তার গুরুর থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। 

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন সংকীর্তন আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তখন তাতে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর সাথে যুক্ত হন। আপনারা হয়তো ভাববেন যে এর প্রকৃত কারণ কি? কেন শ্রীকৃষ্ণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রূপে এসেছিলেন? দেখুন দ্বারকাতে রুক্মিণী দেবী শ্রীকৃষ্ণের সাথে বাক্যালাপ করছিলেন, তিনি বলছিলেন, “কৃষ্ণ আপনি সবকিছু জানেন, আপনি জানেন যে ব্রহ্মাাদেব সত্যলোকে কি করছেন, আপনি জানেন দেবাদীদেব শিব কৈলাসে কি করছেন, অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডে কি হচ্ছে তা আপনি সব জানেন, আপনি জানেন জড়জগত ও আধ্যাত্মিক জগতে কি হচ্ছে, কিন্তু একটি বিষয় আছে যা আপনি জানেন না। আমি জানি, রাধারানী জানেন, কিন্তু আপনি জানেন না।এর আগে কৃষ্ণকে কখনো কেউ এমন কথা বলেনি। তিনি বললেন, “সেটা কি?” “দেখুন, আপনার ঊর্ধ্বে কেউ নেই। আপনি হচ্ছেন পরম পুরুষ, আপনি পরম পুরুষোত্তম ভগবান। আপনি জানেন না যে আপনার ভক্তরা আপনাকে কত ভালোবাসে! আপনি জানেন না আমরা আপনাকে কিভাবে ভালোবাসি!তিনি সেই বিষয়ে ভাবলেন ও বললেন, “আমি কলিযুগে ভক্তরূপে অবতীর্ণ হব! আমি কলিযুগে ভক্তরূপে অবতীর্ণ হব! আমি কলিযুগে ভক্তরূপে অবতীর্ণ হব!সেই তিনি হলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল! গৌরাঙ্গ! নিত্যানন্দ! 

শ্রীমদ্ভাগবতমের একাদশ স্কন্ধে উল্লেখ আছে : 

কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্‌।
 যজ্ঞৈঃ সঙ্কীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ
।। 

কৃষ্ণ শ্যাম বর্ণ নিয়ে আবির্ভূত হবেন না, তিনি তাঁর প্রকাশ, শক্তি, ভক্ত, পার্ষদ, অস্ত্র ইত্যাদি সবকিছু নিয়ে আবির্ভূত হবেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রথম প্রকাশ হচ্ছেন শ্রীমন বলরাম এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রকাশ হচ্ছেন শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু। একদিন শ্রীমতী রাধারানী মায়াপুরে বংশীবাদন করছিলেন, তিনি এত সুন্দরভাবে বংশী বাজাচ্ছিলেন যে শ্রীকৃষ্ণ ভাবতে লাগলেন, “কে বংশী বাজাচ্ছে?” তখন তিনি নবদ্বীপে প্রকটিত হন। তিনি বললেন, “তুমি আমার জন্য এই ধাম সৃষ্টি করেছ, এটি অত্যন্ত সুন্দর!” নয় দীপ যুক্ত — সীমন্ত দ্বীপ, মধ্য দ্বীপ, কোল দ্বীপ, ঋতু দ্বীপ, রুদ্র দ্বীপ, গোদ্রুম দ্বীপ, জাহ্নু দ্বীপ, মোদাদ্রুম দ্বীপ, অন্তর্দ্বীপ। তিনি বললেন, “এই স্থান বৃন্দাবন থেকে অভিন্ন হবে। আমি এই স্থানে সকল পবিত্র তীর্থকে আমন্ত্রণ করবো।দেখুন শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে কৃষ্ণ এবং রাধা রূপে প্রকাশিত করেছেন আর এখানে তিনি শ্রীমতি রাধারানীর হৃদয় ও অঙ্গকান্তি নিয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে প্রকাশিত হয়েছেন। প্রথমে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তারপর তাঁর প্রকাশ শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু, অদ্বৈত তারাও সবাই এখানে নবদ্বীপে আসেন। তাঁর শক্তি হলেন লক্ষ্মীপ্রিয়া এবং বিষ্ণুপ্রিয়া যাঁরা হছেন শ্রীদেবী, ভূদেবী। নবদ্বীপ ধাম হচ্ছে নীলা দেবী। 

যে স্থানে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু আবির্ভূত হয়েছিলেন, সেটি একচক্র ধাম। যেসব স্থানে ভগবান এবং তাঁর পার্ষদরা তাদের লীলা করেছেন, সেগুলি শ্রীপাট নামে পরিচিত। আমি দুবাই থেকে লস এঞ্জেলসে বিমানে করে এসেছি, আমি ভাবছিলাম যে শ্রীল প্রভুপাদ ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্ট ১০৮টি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি ডেট্রয়েটে মন্দির করেছিলেন, দেবসাধন। তিনি লস এঞ্জেলেসেও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মায়াপুরে ও অন্যান্য অনেক স্থানে শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দক্ষিণ ভারতে তাদের ১০৮টি দিব্য-দেশম আছে। এর মধ্যে মথুরা এবং দ্বারকাও পড়ে। তারা বলে যে যদি আপনি এই ১০৮টি মন্দির দর্শন করেন, তাহলে ভগবত ধামে ফিরে যাবেন। আমি ভাবছিলাম যে আমাদেরও শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই ১০৮টি মন্দির থাকা উচিত, এগুলির বিশেষ কিছু নাম থাকা উচিত বা অন্তত এগুলিকে শ্রীপাট বলা উচিত। শ্রীপাট ডেট্রয়েট, হরিবোল! এই মন্দিরটি শ্রীশ্রীমৎ রাধানাথ স্বামীর শিষ্যদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই জন্য আমরা তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমরা জানি যে ভবিষ্যতে সমগ্র বিশ্বে হাজার হাজার মন্দির হবে, কারণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন —পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম, সর্বত্র প্রচারিত হইবে মোর নাম” [চৈ.ভা. অন্ত্য খন্ড ৪.১২৬] —প্রতি নগর ও গ্রামে তাঁর পবিত্র নাম কীর্তিত হবে। তাই যে সমস্ত মন্দির শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেই মন্দিরগুলিতে তিনি প্রথম শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ও তাঁদের সেবা করেছিলেন, সেগুলির বিশেষ গুরুত্ব আছে। আমি ভাবছিলাম একদিন আমাদের নিজেদের এমন থাকা উচিত, আমাদের নিজেদের “দিব্য দেশম” — আপনারা কি মনে করেন? হরিবোল! সমস্ত বিমান সংস্থার মালিকেরা তা খুবই পছন্দ করবে। আমি এক বছরে সমগ্র বিশ্বে ৫-৬ বার ভ্রমন করেছি। আমার কাছে ইউনাইটেড ও ব্রিটিশ বিমান সংস্থার আজীবন গোল্ড মেম্বার কার্ড আছে। আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেটি পেয়েছে, কাউকে তা পেতে লক্ষ লক্ষ মাইল ভ্রমণ করতে হবে কিন্তু আমি লক্ষ মাইল পূর্তির জন্য বিমানে করে যাইনি, আমি শ্রীল প্রভুপাদের প্রীতিবিধানের জন্য বিমানে করে বিভিন্ন স্থানে গেছি। আমি এত ভক্তদের এখানে উপস্থিত দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। হরে কৃষ্ণ! 

আসলে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু যখন জগন্নাথপুরীতে ছিলেন, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁকে বলেছিলেন যে, “আমাদের দুজনেরই এখানে পুরীতে থাকা উচিত নয়, বাংলায় যে পর্যন্ত প্রচার হয়েছিল, তোমার গিয়ে আবার সেখান থেকে প্রচার শুরু করা উচিত।তখন পৃথক দেশ ছিল না, বাংলাদেশ ছিল না, কেবল বাংলা ছিল।আমরা বলেছি যে আমরা চারধরনের মানুষদের উদ্ধার করব, যারা সাধারনত উদ্ধার প্রাপ্ত হয় না — মূর্খ, যারা মনে করে তারা এই দেহ; নিচ, যারা নিম্ন কূলে কোন সংস্কৃতি ছাড়াই জন্ম গ্রহণ করে, কোন আধ্যাত্মিক জীবন নেই; পতিত, যারা নিয়মনীতি ভঙ্গ করে, যেমন আমিষ আহার ও অন্যান্য বাজে কর্ম করে আর দুঃখী।তাই আপনারা কেউ কি এমন আছেন? আপনারা আপনাদের জীবনে কি এমন কাউকে দেখেছেন? এমনকি কারো এর মধ্যে যেকোনো একটি বৈশিষ্ট থাকতে পারে। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর প্রতিনিধি হয়ে এই চার ধরনের মানুষদের উদ্ধার করতে এসেছিলেন। আপনারা সকলে হয়তো অত্যন্ত পূর্ণবান ব্যক্তি, কিন্তু আমেরিকাতে থেকে আপনারা জানেন যে এখানকার মানুষদের আচার-ব্যবহার খুব একটা আধ্যাত্মিক নয় এবং শ্রীল প্রভুপাদ মানুষদের সেই পারমার্থিক উপলব্ধি প্রদান করতে এসেছিলেন। তারা যোগ অনুশীলন করছিল, তবে তিনি সমস্ত যোগ পন্থার শ্রেষ্ঠ ভক্তিযোগ প্রদান করেছেন। 

যাইহোক আমাদের দেরি হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক আমার চর্ম ক্যান্সার রোগ ধরা পড়েছে, তাই সপ্তাহের কাজের দিনগুলিতে আমি থেরাপি নেই, ছুটির দিনগুলি প্রচারের জন্য রাখি। আমি মিচিগান এসেছিলাম, গান – মিচিগান, গান মানে সংগীত, আমরা সকলে গান গাই —হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরেএটি একটি গান, এছাড়া গণ মানে মানুষদের বোঝায়। যাইহোক, আমরা চাই মানুষেরা যাতে কৃষ্ণভাবনাময় হয়। 

আমরা দেখেছি যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর প্রথমার্ধ জীবন নবদ্বীপে কাটিয়েছেন, দ্বিতীয়ার্ধাংশে তিনি সন্ন্যাস নিয়েছেন এবং ছয় বছর সমগ্র ভারত — দক্ষিণ ভারত, পূর্ব ভারত, উত্তর ভারতের প্রত্যেক স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে খোঁজার অজুহাতে গিয়েছিলেন, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন, “আমি একা যাব, কারণ নিত্যানন্দ প্রভু আমার দণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছে, তাই আমি আর তাঁকে বিশ্বাস করি না।তাই ভক্তরা তাঁকে জোরাজুরি করতে থাকে যে দয়া করে কেবল আপনার জিনিসপত্র বহন করার জন্য সাথে অন্তত একজন ভক্তকে নিয়ে যান। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দক্ষিণ ভারতে এমন কিছু করেছিলেন, যা তিনি নবদ্বীপেও করেননি। আপনারা জানেন সেটি কি? আপনারা কি জানেন তিনি কি করেছিলেন? রাস্তায় যাদের সাথে তাঁর দেখা হতো, তিনি তাদের প্রত্যেককে আলিঙ্গন করতেন ও ভগবত প্রেম প্রদান করতেন। সে স্মার্ত হোক বা অন্য কোন জাতির, তিনি কোন বিভেদ করতেন না, তিনি কেবল প্রত্যেককে আলিঙ্গন করতেন আর সেই সময় নিতাই বাংলায় প্রচার করছিলেন। 

যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জগন্নাথপুরীতে ফিরে এলেন, তখন সকল ভক্তরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখার জন্য বাংলা থেকে হেঁটে জগন্নাথপুরীতে এসেছিলেন। তারা রথ যাত্রার আগে এসেছিলেন, তারপর তাঁর সাথে গুণ্ডিচা মার্জন করে রথযাত্রা মহোৎসবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পুরীর রাজা প্রতাপরুদ্র মহারাজ, গজপতি মহারাজ তিনি প্রথাগতভাবে রথযাত্রার শুভারাম্ভের জন্য রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে তারপর তার প্রাসাদের ছাদে গিয়েছিলেন, তিনি সেই বৃহৎ রাস্তায় মানুষের ভিড় দেখেছিলেন ও তাদেরকে সেই তিনটি রথের সামনে দেখেছিলেন। তিনি এক অত্যন্ত অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখেন যে সেখানে সাতটি কীর্তনের দল ছিল — সামনে, পাশে, পিছনে এইভাবে। তিনি দেখছিলেন যে ৭জন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেক কীর্তন দলের মধ্যে নৃত্য করছিলেন, তিনি তা দেখতে পারছিলেন কিন্তু অন্যরা তা দেখতে পারছিল না। কিছু কিছু ভক্তরা যেমন রামানন্দ রায় দেখতে পারছিলেন, তারা বিস্মিত হয়েছিলেন যে রাজা তা দেখতে পারছেন, তার সেই দৃশ্য দর্শনের মহান সুযোগ হয়েছে ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাকে অতি বিশেষ দর্শন প্রদান করছেন। 

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কত লীলা আছে। নবদ্বীপে তাঁর বাল্যলীলা আছে, তারপর গয়াতে তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে ও পিতার পিন্ড দান করতে গিয়েছিলেন, সেখানেই তিনি ঈশ্বরপুরী মহারাজের থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ও এরপর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেম প্রকাশিত করেছিলেন। তার আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন নিমাই পণ্ডিত, তিনি কীর্তন করতেন না, তিনি তার গৃহের শ্রীবিগ্রহের পূজা করতেন, তিনি মূলত ভক্ত ছিলেন না। তিনি শ্রীবাস ঠাকুরের মতো বৈষ্ণবদের শ্রদ্ধা করতেন এবং তাদেরকে তাঁকে আশীর্বাদ করতে বলতেন যে তার যাতে কোন গুরু থাকে আর তিনি যাতে কৃষ্ণকে বুঝতে পারেন। তারপর দীক্ষার পরবর্তীতে তিনি কৃষ্ণভক্তি প্রকাশ করতে শুরু করেন। গয়া থেকে বাংলায় ফেরার পথে তিনি কানাই নাটশালায় থেমেছিলেন, এটি গঙ্গার ধারের একটি পবিত্র স্থান। সেখানে একটু দূরে তিনি এক গোপবালককে বংশী বাজাতে দেখেন, ধীরে ধীরে সে আরও নিকটে আসে। তারপর তিনি দেখলেন যে সে আসলে কৃষ্ণ, তাঁর মাথার পাগড়ীতে ময়ূরপুচ্ছ। সে বংশী বাজাচ্ছিল ও নৃত্য করতে শুরু করে, তৃভঙ্গ ললিত রূপ। তিনি তাঁর কাছে যান, “এই যে কৃষ্ণ! এই যে কৃষ্ণ!তাঁর রোম হর্ষিত হয়, তাঁকে দেখতে এত সুন্দর! কৃষ্ণ তাঁর কাছে এসে তাঁকে আলিঙ্গন করেন, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই সব কিছু বর্ণনা করার কোন ভাষা ছিল না, এবং তারপর কৃষ্ণ দৌড়ে চলে যান। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর পিছনে ধাবিত হন তবে তিনি গাছের পিছনে অদৃশ্য হয়ে যান। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই বিরহে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন, সেই স্থানটি এখনও আছে। কানাইনাটশালার মহান্ত ইস্‌কনে এসেছিলেন, তাকে তাদের পূর্ববর্তী আচার্য বলেছিলেন যে, “যদি আমরা এই শ্রীবিগ্রহের পরিচর্যা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের এই স্থান গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের ভক্তদের ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।সেখানে শ্রীবিগ্রহগণ চুরি হয়ে গিয়েছিল। শ্রীবিগ্রহ চুরি হওয়ার থেকে খারাপ আর কি হতে পারে? তারপর তিনি আমাদের কাছে আসেন, সেই মহান্ত শুনেছিলেন যে গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের সুবিখ্যাত ও মহান প্রচারক হচ্ছেন শ্রীল প্রভুপাদ, তাই তিনি ইস্‌কনে এসে সেই স্থান ইস্‌কন মন্দিরকে অর্পণ করেছিলেন। কারণ সেই মন্দিরের চূড়াটি চিনা মাটি দিয়ে তৈরি, চিনামাটি অত্যন্ত মূল্যবান, লক্ষ লক্ষ ডলার। তিনি তার শিষ্যদের বিশ্বাস করেননি যে তারা হয়তো তার চলে যাওয়ার পর এটি বিক্রি করে দিতে পারে, তাই তিনি যেহেতু শ্রীল প্রভুপাদকে গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রচারক দেখেছিলেন, তাই তিনি তা ইস্‌কনকে প্রদান করেছিলেন। যাইহোক আমি জানিনা এই সপ্তাহের ছুটির দিনটিতে কি পরিকল্পনা আছে। 

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গয়া থেকে ফিরে আসার পর সংকীর্তন আন্দোলনের প্রারম্ভ করেছিলেন, তিনি এত ভাবে বিভোর থাকতেন, যে মানুষেরা ভাবত তার হয়তো মানসিক কোন রোগ হয়েছে। শচীমাতা তাঁকে ডাকছিলেন, “গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! দুপুরের প্রসাদ পেতে এসো! নিমাই! নিমাই!তারপর তিনজন প্রতিবেশী সেখানে এসে বলতে লাগে, “আপনার ছেলের মানসিকভাবে পীড়িত, বায়ু দোষ! তার প্রাণবায়ু ভারসাম্যবিহীন।তারপর একজন বলল, “তার মাথা ঠান্ডা হওয়ার জন্য তাকে কচি ডাবের জল দিনআরেকজন বলল, “না না সেটা যথেষ্ট নয়, আপনার তাকে দশ ধরনের শিকড়ের তেল, দশমূল তৈল দেওয়া উচিত। সেটি তার মাথায় মালিশ করুন।তৃতীয়জন বলল, “সেটিও কাজ করবে না, সে নিয়ন্ত্রণের বাইরে, আপনার তাঁকে বেঁধে রাখা উচিত।শচীমাতা বললেন, “আমার ছেলের কিছুই হয়নি!প্রত্যেকে বলতে লাগে যে চৈতন্য মহাপ্রভু উন্মত্ত হয়ে গিয়েছেন, তিনি মানসিক স্থিতি হারিয়েছেন। তারপর তিনি শ্রীবাস ঠাকুরের কাছে যান, তিনি বললেন, “আমি কি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি?” শ্রীবাস ঠাকুর বললেন, “কেন নয়!” “মানুষেরা বলছে আমার রোগ হয়েছে, আমি অসুস্থ, আমার কি কোন রোগ হয়েছে?” শ্রীবাস ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি কি লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ?” তিনি বললেন, “যখনই আমি শ্রীকৃষ্ণের নাম শ্রবণ বা উচ্চারণ করি, তখন আমার কন্ঠরোধ হয়ে যায়, আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে, আমার সারা শরীরে রোম শিহরিত হয়, আমি মাটিতে মূর্ছিত হয়ে পড়ি। মানুষেরা বলে আমি অসুস্থ। তাই আমার কি কোন রোগ হয়েছে?” শ্রীবাস বললেন, “আপনার একটি রোগ আছে, আমিও সেই রোগ চাই। আপনার ভগবত প্রেমের রোগ আছে!আপনারা কতজন সেই রোগ চান? হরিবোল! অনেকেই তাদের হাত তুলছে না!

আমি শুনলাম যে ডেট্রয়েটে ঝড় হয়েছিল, তা আমার সচিব ও সঙ্গী ভক্তদের বিমান ক্লিভল্যান্ড ওহিও অভিমুখী করে দিয়েছিল! আমায় ক্ষমা করবেন, আমি জানি অনেক রাত হয়ে গেছে। আমি যখন নিতাই গৌরের কথা বলি, তখন সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলি! 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী (13/6/2023)
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions