Text Size

২০২৩০৫১১ সান্ধ্য প্রবচন

11 May 2023|Duration: 00:39:56|Bengali|Evening Darśana|Houston, Texas, USA

প্রদত্ত প্রবচনটি শ্রী শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ১১ মে, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ, ইস্‌কন হসটন, টেক্সাস, আমেরিকায় প্রদান করেছেন।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

জয়পতাকা স্বামী:- আমি কি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা বলব নাকি শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর? আপনারা নিশ্চিত তো? কোন বড় লীলা বলব নাকি ছোট লীলা? (বড় লীলা) দেখুন, আমার ২০০৮ সালে স্ট্রোক হওয়ায় অর্ধেক মুখ প্যারালাইজড আছে, আমি কি বলছি তা কারোর বুঝতে অসুবিধা হতে পারে, তাই তিনি আমার কথার পুনরাবৃত্তি করবেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তিনি নিত্যানন্দ প্রভুকে একদিকে টেনে এনে বললেন, “আমাদের দুজনের জগন্নাথপুরীতে থাকা ঠিক নয়। তোমার বাংলায় ফিরে যাওয়া উচিত এবং সেখানে আমি যে আন্দোলন প্রারম্ভ করেছিলাম, তা অব্যাহত রাখা উচিত। যখন আমরা আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলাম, তখন আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আমরা চার ধরনের ব্যক্তিদের উদ্ধার করব, যারা সাধারণত উদ্ধার প্রাপ্ত হয় না — নিচ; মূর্খ, যারা তাদের শরীরকে নিজের স্বরূপ বলে মনে করে উপলব্ধি করতে পারে না যে তারা নিত্য শাশ্বত জীবাত্মা; পতিত, যারা নিয়ম ভঙ্গ করে এবং দুঃখী, যারা জড় জাগতিক যন্ত্রনা ভোগ করে।এমন কি কোন ব্যক্তি আছেন? অবশ্য আপনারা সকলেই উন্নত জীব কিন্তু এই জড় জগতে থাকা মানে, এখানে কোন না কোন কষ্ট থাকবেই। শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে বলেছিলেন যে, “আমার কিছু লোকবল প্রয়োজন।তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর সাথে ৪০ থেকে ৫০ জন ভক্তকে পাঠিয়েছিলেন। সাধারণত জগন্নাথপুরী থেকে বাংলায় হেঁটে আসতে ২-৩ সপ্তাহ সময় লাগে, কিন্তু তাঁদের আসতে প্রায় তিন মাস লেগে গিয়েছিল কারণ তাঁরা আসার পথে কৃষ্ণলীলা অভিনয় করতেন এবং রাস্তা হারিয়ে ফেলতেন। তাঁরা এত ভাবে বিভোর থাকতেন যে সম্পূর্ণ ভুলে যেতেন, “আমরা কোথায় আছি? বাংলায় যাওয়ার পথটি কোন দিকে?” কেউ একজন বলেছিলেন যে, “ওই দিকে দশ মাইল!তারা সেই পথ ধরে এগিয়ে যান, তারা এত ভাবে বিভোর ছিলেন যে সেই রাস্তা অতিক্রম করে চলে যান, আবার তারা রাস্তা হারিয়ে ফেলেন।আমরা কোথায় আছি?” কেউ একজন আবার বলেন —বাংলায় যাওয়ার রাস্তা ওই দিকে দশ মাইলতাঁরা সেই পথ দিয়ে যেতে থাকেন ও অবশেষে পানিহাটি এসে পৌঁছান। রাঘব পণ্ডিত জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কতজন এসেছেন?” “৪০-৫০ জন।” “ঠিক আছে! আপনারা এক ঘন্টার মধ্যে গঙ্গাস্নান করে আসুন, আমি আপনাদের জন্য মহাভোজ প্রস্তুত রাখবো।এখানে কি আপনাদের মধ্যে কেউ রাঁধুনি আছেন? আপনারা কি এক ঘন্টার মধ্যে ৫০ জন ভক্তের জন্য মহাভোজ প্রস্তুত করতে পারবেন? এটি করা কঠিন! তবে রাঘব পণ্ডিত ও তার বোন দময়ন্তী ছিলেন অতি সুদক্ষ। তারা শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু এবং তাঁর পার্ষদদের জন্য এক বড় ভোজের ব্যবস্থা করেছিলেন, তারপর তাঁরা একটু বিশ্রাম নিয়ে কীর্তন শুরু করেছিলেন। তাঁরা খড়দহ, আদি সপ্তগ্রাম হয়ে অবশেষে নবদ্বীপে এসছিলেন। সেখানে তারা শচীমাতাকে দেখতে পান ও শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু তাকে তার পুত্র নিমাইয়ের কথা বলেন। তিনি তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন দয়া করে নবদ্বীপে কিছু সময় থাকার জন্য যাতে, “আমি তোমাকে দেখতে পাবো ও তোমার থেকে নিমাইয়ের কিছু খবর পাবো।” 

শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর জীবন ছিল কঠোর তপস্যার। কিন্তু তিনি নিত্যানন্দ প্রভুকে বলেছিলেন যে, “তোমার একজন রাজার মতো থাকা উচিত!শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু মুক্তাহার, হীরের কর্ণকুণ্ডল, প্রতি অঙ্গুলিতে রত্নের আংটি, রুপার নুপুর ও সব ধরনের ভুজআভরণ দ্বারা সুসজ্জিত ছিলেন এবং তিনি অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী ছিলেন। তিনি তাঁর পার্ষদদের সাথে বিভিন্ন স্থানে যেতেন ও তাঁরা কীর্তন করতেন। তিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিলেন। এরপর একদল ডাকাত, তারা ভাবল যে এই ব্যক্তির লক্ষ লক্ষ টাকা আছে —চণ্ডী দেবী আমাদের কৃপা করেছেন, এইজন্য একজায়গায় সব ধন পেয়েছি। চল নেওয়া যাক!সেই ডাকাত দলের নেতা ছিল এক পাপী ব্রাহ্মণ, যদিও সে ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহণ করেছিল, কিন্তু সব সময় বাজে সঙ্গে থাকত। সে ছিল সেনাপতি, সেই চোরেদের নেতা। তারা চুরি করার জন্য এক পরিকল্পনা করে এবং সে বলে, “আজকে আমরা নিত্যানন্দ প্রভুর থেকে চুরি করতে যাব।প্রথমে তারা সেখানে এক গুপ্তচর পাঠায় যে কি হচ্ছে তা দেখার জন্য, শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু প্রসাদ পাচ্ছিলেন এবং তাঁকে ঘিরে সব ভক্তবৃন্দ নৃত্য কীর্তন করছিলেন, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। সেই গুপ্তচর ফিরে আসে ও বলে —ভাত খাচ্ছে।অতি অমার্জিতভাবে বলে, আমরা সাধারণত এমন বলি না। যাই হোক তারা ছিল ডাকাত, ওই কথার মানে হল তিনি অন্ন প্রসাদ পাচ্ছেন। সে বললসেখানে অনেক লোক জেগে আছে, আমি জানিনা তবে তারা কিছু একটা গাইছে।তখন সেই ব্রাহ্মণ বলল, “ঠিক আছে! তারা খাবার খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়বে, আমরা অপেক্ষা করব।তারা একটি গাছের নিচে অপেক্ষা করছিল, তারা নিত্যানন্দ প্রভুর থেকে সেই সবকিছু চুরি করার জন্য সেখানে অপেক্ষা করতেই থাকে। কেউ একজন বলল, “আমি তাঁর কানের দুল নিতে চাই।আরেকজন বলল হীরের কথা, “আহা চমত্কার!আরেকজন বলল, “আমি তাঁর মুক্তহার নিতে চাই।পরোক্ষভাবে তারা শ্রীমন নিত্যানন্দের প্রভুর ধ্যান করছিল, আরেকজন বলল, “আমি তাঁর নুপুর নিতে চাইতার কিছুক্ষণ পর, নাসিকাধ্বনি! নাসিকাধ্বনি! তারা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। 

শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রকাশ, তিনি বলরাম। আর যোগ মায়া তাঁর সেবা করছেন, তাই তিনি তাদের সকলকে নিদ্রিত করে দেন, এমনকি যখন সূর্য ওঠে তখনও তারা নাক ডাকছিল, যখন কাক ডাকতে শুরু করে কা! কা! তখন তারা জেগে ওঠে। তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে, “এই তুমি ঘুমাচ্ছ।অন্য আরেকজন বলে, “তুমি কি করছিলে?” তাদের সবার কাছে অস্ত্র ছিল, তারা তাদের সাথে তলোয়ার, ত্রিশূল এবং অন্যান্য সবকিছু এনেছিল, তাই তারা সেখান থেকে যেতে পারছিল না। তখন তাদেরকে তাড়াতাড়ি সেই সবকিছু লুকাতে হল। নয়তো লোকেরা তাদের বুঝে ফেলত, তাই তারা সেগুলি লুকিয়ে দেয় এবং তখন তাদের একজন বলে যে, “এমন হলো কারণ আমরা চণ্ডী দেবীর পূজা করিনি, আজ রাতে আমাদের তাকে মদ মাংস নিবেদন করা উচিত।তারা ছিল ডাকাত, তারা অত্যন্ত পাপী। সেই সন্ধ্যায় তারা এক বড় পূজা করে তারপর নিতাইয়ের থেকে চুরি করতে বের হয়। কিন্তু এ কি! তারা দেখে যে গৃহের চারিপাশে সৈন্য আছে। এরা শক্তিশালী, সুস্বাস্থ্যবান, তাদের গলায় তুলসীর মালা আর কপালে তিলক আছে এবং সাথে অস্ত্রও আছে, তারা কীর্তন করছেন হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। তাদের প্রত্যেককে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তারা অন্য কোন জগৎ থেকে এসেছে, তারা এত শক্তিশালী। তাদের এক এক জন সহজেই ১০০ জনকে পরাস্ত করতে সক্ষম। তারপর তারা দৌড়ে তাড়াতাড়ি করে সেখান থেকে চলে আসে —তারা হয়তো আমাদেরকে দেখে ফেলতে পারে, তাহলে আমরা এক বড় সমস্যায় পরবো! আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে, কোন রাজা বা কেউ হয়তো সেই অবধূতের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছে ও সেইজন্যই চারিদিকে এত সৈন্য, আমরা এক বা দুই সপ্তাহ পর আবার আসবো।এরপর যখন তারা আসে, তখন চারিদিকে মেঘ ছেয়ে যায় ও সেই পরিবেশ অনেক অন্ধকারময় হয়ে ওঠে। তারা কোনকিছুই দেখতে পারছিল না, তারা সেই অন্ধকারে অন্ধসম হয়ে যায়। সেখানে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি হতে থাকে আর তখন কেউ খালে পড়ে যায়, কেউ সকলের ফেলা আবর্জনার স্তূপে পড়ে যায়, জোঁকে তাদের রক্ত শুষে নেয় ওউ! তাদের কারো কারো হাড় ভেঙ্গে যায়, আর সেই গৃহের চারিদিকে ছিল নর্দমা, কেউ সেই নর্দমায় পড়ে যায়! এত কষ্টকর পরিস্থিতি। শিলা বৃষ্টি হচ্ছিল, ইন্দ্রদেব শিলাবর্ষণ করছিলেন। 

অবশেষে সেই পাপী ব্রাহ্মণ অনুভব করে যে যা কিছু হচ্ছে তা কোন দুর্ঘটনা নয়, তিনি আসলে পরম পুরুষোত্তম ভগবান। তিনি ভগবান এই কারণে এই সবকিছু হচ্ছে। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় বলেছেন যে তিনি স্মৃতি ও বিস্মৃতি প্রদান করেন। আমরা জানি যে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু অত্যন্ত রসিক, এখানে সেই ডাকাতের দল শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর থেকে চুরি করতে চেয়েছিল, তা ঠিক আছে, তিনি তাদের সাথে ক্রীড়া করছিলেন, অবশেষে তিনি তাদের এক কঠিন ক্রীড়ায় শিক্ষা দিলেন। তারাও তাদের তলোয়ার, ত্রিশূল নিয়ে এসেছিল তবে পরে তারা উপলব্ধি করেছিল যে আমরা ভুল মানুষের সাথে দ্বন্দ করছি এবং সেই ব্রাহ্মণ এসে কাঁদতে শুরু করে, সে বলছিল, “যখন আমরা হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যাই, তখন আমাদেরকে সেই মাটিরই আশ্রয় গ্রহণ করে উঠে দাঁড়াতে হয়। তাই আমরা আপনার প্রতি অপরাধ করেছি কিন্তু আমাদেরকে আপনারই শরণ গ্রহণ করতে হবে।তখন সেখানকার সকল ভক্তবৃন্দ বলছিলেন যে, “আপনি এই চোরদের বিশ্বাস করতে পারবেন না, হয়তো সে এই সব কিছু বলে এর সুযোগ নিতে চায়।” বাংলায় একটি কথা আছে, ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণশুদ্ধ ভক্ত হতে কিছু সময় লাগে, তাহলে কিভাবে এই চোর এই রাতেই আত্মসমর্পণ করছে এবং কান্না করছে?” শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু তাকে বললেন, “আমাকে তোমার উপলব্ধি বলো।সে বলল, “দেখুন, আমি আপনার ক্ষতি করতে এসেছিলাম, আমি আপনার থেকে চুরি করতে এসেছিলাম, আমি অত্যন্ত পাপী মানুষ। আমি আমার পুরো জীবন কেবল বাজে কাজ করেছি। কিন্তু আপনার কৃপায় আমি উপলব্ধি করেছি যে আপনি হচ্ছেন অসীম করুণাময়।এইভাবে সে সবকিছু তাঁকে ব্যাখ্যা করে বলে। চোরেরা সাধারণত সবকিছু ব্যাখ্যা করে বলে না, তারা কখনো বলে না যে আমি আপনার থেকে চুরি করতে এসেছিলাম কিন্তু সে প্রকাশ করছিল যে তাদের পরিকল্পনা কি ছিল, কিভাবে তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল এবং তারপর গৃহের চারপাশে সৈন্যদের দেখেছিল, খাদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল ও শিলাবৃষ্টি হচ্ছিল।আমার গঙ্গায় গিয়ে দেহ ত্যাগ করা উচিত, আমি এত পাপী ব্যক্তি।তখন শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “আমি তোমাকে তোমার সব পাপের জন্য ক্ষমা করব। কিন্তু তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তুমি আর এইরকম পাপকার্য করবে না। তুমি অন্যান্য চোরেদের দলকে নিয়ে এসো ও তাদেরকেও আত্মসমর্পণ করাও।এইভাবে তারা সকলে পবিত্র নাম কীর্তন করা শুরু করে —হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! নিত্যানন্দ! নিত্যানন্দ! নিত্যানন্দ! 

শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপায় চোরেদের পুরো দল সংকীর্তন আন্দোলনের এক অংশ হয়ে যায়। আপনারা সকলে অত্যন্ত ভাগ্যবান যে আপনাদের এখানে গৌর নিতাই, নিতাই গৌরচন্দ্র এবং নিতাই চৈতন্যচন্দ্র আছে ও তাঁদের কৃপায় আপনাদের কাছে রাধা নীলমাধব, রাধা গিরিধারী আছেন। সাধারণত মানুষেরা মনে করে যে তারা এই দেহ, তারা কেবল প্রার্থনা করে। আমি হপকিন্সে আমার ডাক্তারকেআত্মজ্ঞান লাভের পন্থাবইটি উপহার দিয়েছিলাম। সে বলেছে, “সাধারণত আমি ভগবানের কাছে আমাকে কিছু দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করি। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করেছি যে আমি ইতিমধ্যেই কত কিছু পেয়েছি, তাই আমার ভগবানকে সেবা করার প্রার্থনা করা উচিত।এটাই হচ্ছে ভক্তিযোগের পূর্ণ রহস্য। আমাদের কৃষ্ণের সেবা করা উচিত, তাই হচ্ছে প্রকৃত আনন্দ। জাগতিক আনন্দ অত্যন্ত বাহ্য স্তরের এবং তা আমাদের আনন্দ দেয় ও দুঃখও দেয়। তা আসলে আত্মিক স্তরের নয়। আমরা যদি কৃষ্ণের সেবা করি, তাহলে আমরা আধ্যাত্মিক আনন্দ পাই, আমরা আনন্দিত  হই। সাম্প্রতিক আমরা পড়ছিলাম, আমি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সকল গ্রন্থ, তিথি সব এক বইতে সংকলন করার চেষ্টা করছি, এখন সেই বইটি প্রায় শেষের মুখে। আমরা জানি যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারানীর মিলিত তনু, শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতি রাধারানীর হৃদয় ও অঙ্গ কান্তি নিয়ে গৌরাঙ্গরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন, শেষ দিকে তিনি শ্রীমতি রাধারানীর ভাব অনুভব করার চেষ্টা করেছিলেন। শ্রীল তমাল কৃষ্ণ গোস্বামী আমাদের কাছে চৈতন্য চরিতামৃতের এইসব লীলা পাঠ করতেন। ইস্‌কনের নেতৃবর্গের প্রতি তাঁর এক বিরাট অবদান আছে। 

চৈতন্য মহাপ্রভু পুরীর সমুদ্রতটে বালির স্তুপ দেখে মনে করতেন তা গোবর্ধনের চাতক পর্বত, তিনি সেই দিকে ধাবিত হতেন, ও রোমাঞ্চিত হয়ে পড়তেন। সাধারণত কেউ একের পর এক সাত্ত্বিক বিকার অনুভব করে, ক্রন্দন, রুদ্ধ স্বর, হাস্য, ঘর্মাক্ত হওয়া, রোমাঞ্চ, রোম শিহরিত হওয়া কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই অষ্টসাত্ত্বিক বিকার একই সময়ে অনুভব করতেন। অবিশ্বাস্য! তিনি এমনভাবে ঘর্মাক্ত হতেন যে রক্ত বের হয়ে আসত, তিনি ক্রন্দন করতেন। তা অবিশ্বাস্য! মানুষেরা সেই সব দেখলে মনে করবে তিনি হয়তো কষ্ট পাচ্ছেন বা এমন কিছু! তিনি মাটিতে মূর্ছিত হয়ে পড়তেন, তখন স্বরূপ দামোদর গোস্বামী কীর্তন শুরু করতেন ও প্রত্যেকেই সেই সাথে সজোরে কীর্তন করতেন, তারপর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাহ্যিক চেতনা ফিরত। তিনি চারিদিকে দেখতেন, “আমি এখানে কেন? আমি গোবর্ধনে ছিলাম, আমি রাধা কৃষ্ণের সাথে ছিলাম ও গোপীরা আমাকে কৃষ্ণের জন্য ফুল তুলতে বলেছিলেন। আপনারা আমাকে এখানে ফিরিয়ে এনেছেন কেন? আমি সেখানে কত আনন্দে ছিলাম, আমি আবার এখানে পুরীর সমুদ্রতটে চলে এলাম!” চৈতন্য মহাপ্রভু এই মহাভাব উপলব্ধি করতেন এবং বলা হয়েছে যে আমরা যদি তা শ্রবণ করি, তাহলে স্বাভাবিকভাবে আমাদের কৃষ্ণ প্রেম বিকশিত হবে। আমরা কৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করতে চাই, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রকাশ করছেন যে শ্রীমতি রাধারানী কৃষ্ণের জন্য কি অনুভব করেন। আমি এখানে সমাপ্ত করব। 

রুক্মিণী কৃষ্ণকে বললেন, “আপনি সবকিছু জানেন, আপনি জানেন ব্রহ্মা সত্যলোকে কি করছেন, আপনি জানেন দেবাদিদেব শিব কৈলাসে কি করছেন, আপনি জানেন যে অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ডে কি হচ্ছে, কিন্তু একটি বিষয় আছে যা আপনি জানেন না। আমি জানি, রাধারানী জানেন কিন্তু আপনি জানেন না, আপনি জানেন না।কেউ কখনো কৃষ্ণকে এই কথা বলেনি যে এমন কিছু আছে যা তিনি জানেন না, “সেটি কি?” “আপনি সবকিছু জানেন তবে আপনার ঊর্ধ্বে কেউ নেই, কিন্তু একটি বিষয় আছে যা আমি জানি, রাধারানী জানেন কিন্তু আপনি জানেন না।” “সেটি কি?” “আপনার ভক্তরা আপনাকে কত ভালোবাসে, তারা আপনাকে কিভাবে ভালোবাসে তা আপনি জানেন না।তারপর তিনি বললেন, “আমি কলিযুগে নিজ ভক্তরূপে আসবো! আমি কলিযুগে ভক্তরূপে আসবো! আমি ভক্তরূপে আসব!এই কারণে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এসেছিলেন, তিনি তাঁর ভক্তরূপে এসেছিলেন, তিনি স্বয়ং কৃষ্ণ তবে তিনি এসেছেন ভক্তরূপে। যে কারণে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন তা হল — সংকীর্তন আন্দোলনের প্রারম্ভ করা, প্রেম বা ভক্তদের আনন্দ উপলব্ধি করা এবং আরেকটি গুহ্য কারণ আছে, আপনারা কি জানেন? হয়ত আমার বলা উচিত নয়। আপনারা কি জানেন? সব থেকে গুহ্য কারণ যে কেন তিনি আসেন, আপনারা কি তা জানেন? তিনি অন্বেষণ করতে আসেন যে কেন রাধারানী তাঁর থেকেও বেশি আনন্দ অনুভব করেন। এই কারণে চৈতন্যচরিতামৃতের শেষে শ্রীচৈতন্য লীলায় তিনি প্রকাশ করছিলেন যে তিনি কৃষ্ণের জন্য উন্মত্ত, তিনি আসলে রাধারানী কৃষ্ণের জন্য কি অনুভব করেন তা প্রকাশ করছিলেন। এই সমস্ত বিষয়গুলি অত্যন্ত গুহ্য এবং আপনারা তা জানতে পারছেন, আপনাদের কাছে তা উপলব্ধ। লক্ষ লক্ষ পুণ্যবান ব্যক্তিদের মধ্যে একজন উপলব্ধি করতে পারে যে তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান পেতে চান, সেই রকম লক্ষ লক্ষ জ্ঞানীর মধ্যে একজন আধ্যাত্মিক জ্ঞান পায় ও মুক্ত হয়, তিনি মুক্তি লাভ করেন। সেই রকম লক্ষ লক্ষ মুক্ত জীবদের মধ্যে একজন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হলেন অমূল্য রত্ন, তিনি বিচার করেন না কে যোগ্য কে অযোগ্য, যদি আপনি চান তাহলে তিনি আপনাকে তা প্রদান করবেন। তিনি এমনকি যারা প্রেম চায় না তাদেরকেও তা প্রদান করেন। নিতাই সেই চোরেদের তা প্রদান করেছিলেন, তারা তাঁর মুক্তাহার, তাঁর হীরের কর্ণকুণ্ডল চেয়েছিল কিন্তু তারা ভগবত প্রেম প্রাপ্ত হলো, তাহলে কে জিতল? তারা এমন কিছু প্রাপ্ত হল যা আরো অধিক মূল্যবান! 

যাই হোক, আমি এখানে আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। আমাকে বলা হয়েছিল আমি যাতে আপনাদের আশীর্বাদ প্রদান করি। আমার কাছে শ্রী জগন্নাথের দন্তবুরুশ আছে। সাধারনত আমরা ভাবি, ওহ! দন্তবুরুশ? কিন্তু ভগবানের দন্তবুরুশও অত্যন্ত শুদ্ধ। আমি তা দিয়ে আশীর্বাদ দিতে পারি। মহিলারা এই দিক দিয়ে আসুন ও পুরুষরা অপরদিক দিয়ে আসুন। 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী (12/6/2023)
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions