Text Size

20221217 শ্রীমদ্ভাগবতম ২.২.৩৩

17 Dec 2022|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়

শ্রীমদ্ভাগবতম ২.২.৩৩

ন হ্যতোঽন্যঃ শিবঃ পন্থা বিশতঃ সংসৃতাবিহ।
বাসুদেবে ভগবতি ভক্তিযোগো যতো ভবেৎ ॥

অনুবাদ: ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রাম্যমান জীবদের ভগবানের প্রেমময়ী সেবার পন্থা ব্যতীত ভববন্ধন মোচনের আর কোন মঙ্গলময় পন্থা নেই।

তাৎপর্য: পরবর্তী শ্লোকে বিশ্লেষণ করা হবে, ভগবদ্ভক্তি বা প্রত্যক্ষভাবে ভগবানের সেবা করার পন্থাই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার একমাত্র মঙ্গলময় পথ। জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার নানারকম পরোক্ষ পন্থা রয়েছে, কিন্তু তাদের কোনটিই ভক্তিযোগের মতো এত সহজ এবং মঙ্গলময় নয়। জ্ঞান, যোগ এবং অন্য কোন পন্থা স্বতন্ত্রভাবে অনুষ্ঠানকারীকে উদ্ধার করতে পারে না। সেই সমস্ত পন্থাগুলি মানুষকে বহু বহু বছর অনুশীলনের পর ভক্তিযোগের স্তরে পৌঁছে দেয়। শ্রীমভগবদগীতায় (১২/৫) বলা হয়েছে, যারা পরম তত্বের নির্বিশেষ রূপের প্রতি আসক্ত, তারা তাদের উদ্দেশ্য সাধনের পথে নানা প্রকার ক্রেশ এবং দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে থাকে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৭/১৯) আরও বলা হয়েছে যে, জ্ঞানীরা বহু জন্ম-জন্মান্তরের পর পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবকে সর্বকারণের পরম কারণ বলে জানতে পারেন। যোগের পন্থা সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৬/৪৭) বলা হয়েছে যে, সমস্ত যোগীদের মধ্যে তিনিই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী যিনি সর্বদা পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় যুক্ত আর শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৮/৬৬) চরম উপদেশ হচ্ছে, সর্ব ধর্ম পরিত্যাগ করে, অর্থাৎ আত্ম-উপলব্ধির এবং জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার সমস্ত পশ্থা পরিত্যাগ করে কেবল পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হওয়া। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রের মূল বক্তব্য হচ্ছে সর্বতোভাবে পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়া।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম স্কন্ধে ইতিপূর্বেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, সবরকম সকাম কর্মের বাসনা পরিত্যাগ করে সরাসরিভাবে ভক্তিযোগের পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ট ধর্ম, অথবা সেই পথ অবলম্বন করা যা চরমে ভক্তিযোগে পর্যবসিত হবে। তাছাড়া আর সবকিছুই সময়ের অপচয় মাত্র।

শ্রীল শ্রীধর স্বামী এবং শ্রীল জীব গোস্বামী প্রমুখ সমস্ত আচার্ষেরা স্বীকার করে গেছেন যে, ভক্তিযোগ কেবল সহজ, সরল, স্বাভাবিক এবং ক্লেশমুক্তই নয়, তা সমগ্র মানবকুলের সবরকম সুখের একমাত্র উৎস।

* * *

জয়পতাকা স্বামী: আমার মনে হয় এটি আমার প্রতি বিশেষ কৃপা যে আমি আজকে এই শ্লোকটি পেয়েছি। এটি বর্ণনা করছে যে কিভাবে ভগবান কৃষ্ণের প্রতি সরাসরি ভক্তিমূলক সেবা হচ্ছে সর্বোত্তম পন্থা। মুক্তির মঙ্গলময় উপায়। অবশ্যই, আমরা মায়াপুর ধামে আসিযেটা হলো ঔদার্য দাম। এটা হচ্ছে বিশেষ দয়াময় ধাম। যা-কিছু ভক্তি সেবা এখানে করা হয় তা ১০০০ গুন। অবশ্যগঙ্গার কাছে থাকলেএকটি শ্লোক আছে যা বর্ণনা করে, যারা গঙ্গার থেকে এক ক্রোশ, দুই মাইল দূরে অবস্থান করছে, তারা একশত হাজার গুণ লাভ প্রাপ্ত হয়। ১০০০ কে ১০০০০০ দিয়ে গুন করুন। এবং তারপর যদি আবার দামোদর মাস হয় তাহলে আপনারা এর থেকে আরো শত গুণ বেশি লাভপ্রাপ্ত হন। কে অংকে ওস্তাদ? ১০০ গুন ১০০০০০ গুণ ১০০ কত। যাইহোক, এটা অনেক বড় সংখ্যা হবে। ১০০০০০০০০০০। কিন্তু আমি প্রভুপাদের একটা প্রবচন শুনছিলাম, যদি তোমার কাছে ১০০ কোটি থাকে ও তা যদি শূন্য দিয়ে গুণ করা হয় তাহলে তুমি কি পাবে? শূন্য! আমরা যে মায়াপুরে এসেছি তা হল বিশেষভাবে ভক্তিযুক্ত সেবা করার জন্য। এমনি এখানে যদি এসে কিছু না করে তাহলে লাভ কি হল? তাই আমরা এখানে উপস্থিত হয়েছি যতটা সম্ভব ততটা সুকৃতি অর্জন করতে। ৯ প্রকার ভক্তি সেবা আছে। শ্রবণ কীর্তন — নববিধা ভক্তিমূলক সেবার প্রথম ২ উপাদান। আমাদের প্রত্যেকটি অনুষ্ঠান, আরতিতে, এবং সবকিছুতে শ্রবণ কীর্তন আছে। এবং আমাদের প্রতিমুহূর্তে শ্রবণ এবং কীর্তনে মগ্ন হয়ে থাকার কথা। এখানে আমাদের এমআই (মায়াপুর ইনস্টিটিউট) আছে সেখানে গ্রন্থ অধ্যয়ন করা, এটিও এক প্রকার শ্রবণ। একজন ব্রহ্মচারী, তিনি এখানে দুই বছর যাবৎ রয়েছেন, তিনি ভক্তিবেদান্ত অধ্যয়ন শুরু করার জন্য আমার থেকে আশীর্বাদ চেয়েছেন। তাইযদি কেউ এমন ইচ্ছা করে তাহলে তারা খুব সহজেই এইসব উপাধি গুলি লাভ করতে পারে। আমার মনে হয় আমাদের এখানে কেশবি দাসী উপস্থিত, তার ভক্তি বেদান্ত উপাধি আছে। আমাদের শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যায়ন করা উচিত যেটি হল আমাদের শ্রবণের একটি অঙ্গ। এবং অপরটি হল আমরা গ্রন্থ বিতরণ করি এটা হচ্ছে আমাদের কীর্তন। ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর বলেছিলেনবৃহৎ মৃদঙ্গআমরা এখানে কীর্তন করতে পারি, যারা আসে শোনে। কিন্তু আমাদের এখানে যদি গ্রন্থ বিতরণ হয় তাহলে এটা কত দূর চলে যাবে। ভক্তি নিত্যানন্দ স্বামী যিনি মায়াপুর ধাম ছেড়ে চলে গেছেনতার পরিবারের কেউ একজন গ্রন্থ কিনেছিলেন ফলস্বরূপ সেই গ্রন্থটি তার বাড়িতে ছিল এবং অনেকেই তা পড়েছিল। নিত্যানন্দ স্বামীমুকুন্দ দাস ও অনেকেই তেলেঙ্গানা মন্দিরের অধ্যক্ষ ছিলেনএকটা গ্রন্থ দিয়ে অন্ততপক্ষে পাঁচজন ভক্ত হয়েছেন। এই ম্যারাথন মাসে গ্রন্থ বিতরণ করার জন্য আমরা সকল ভক্তদের কাছে কৃতজ্ঞ। এবং যে সমস্ত ভক্তরা গ্রন্থ অনলাইনে কিনছেন বা অনুদান দিচ্ছেন আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।  যে সকল বিভাগগুলি গ্রন্থ ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেছে আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এইভাবে, কমলাপতি শুনছি প্রতিদিন কত হাজার গ্রন্থ বিতরণ করছে। আমি জীবনাথ প্রভুর প্রতি তার ঘোষণার জন্য কৃতজ্ঞ। কিভাবে প্রত্যেকটি প্রসাদ হলে গ্রন্থ রাখা হচ্ছে এবং তা বিতরণ করা হচ্ছে। প্রভুপাদ বলতেন যে যোগপীঠ হলো জন্মস্থান এবং এটি হলো কর্মস্থান। ভগবদ্গীতায় একটি শ্লোক আছে, জন্ম কর্ম চ মে দিব্যম [গীতা ৪.৯] — প্রভুপাদ এই শ্লোকটি উদ্ধৃতি করেন এটি বলার জন্য যে ওটা হল জন্মস্থান, আর এটি কর্মস্থান। তাহলে আমাদেরকে কর্ম করতে হবে। যদি আমরা কৃষ্ণ সেবা করি তাহলে সেটি হল সর্ব মঙ্গলময়। আমি শুনেছি যে ব্রজধাম এ একটা পরিক্রমা পথ আছে। আমি নবদ্বীপ মাহাত্ম্য শুনছিলাম, এটি বলা হয়েছে যে, নিত্যানন্দ প্রভু প্রত্যেক একাদশীতে পঞ্চক্রোশ পরিক্রমা করতেন। আমরা মাধব হরি দাস এবং অন্যান্য ভক্তদেরকে বলছিলাম এটা দেখানোর জন্য যে কিভাবে আমরা পঞ্চক্রোশ পরিক্রমণ করতে পারি।

এইভাবে, মায়াপুর ধামে থেকে অপরাধ শূন্য থাকতে চাই এবং আমরা যত সম্ভব ভক্তিসেবা করতে চাই। এবং বিগত প্রবচনে আমি বলছিলাম যে কিভাবে আমাদেরকেঅপরাধ মুক্তথাকতে হবে। কারণ চৈতন্য মহাপ্রভু বৈষ্ণব অপরাধ বাদে অন্য কোনো অপরাধ গুরুতরভাবে গ্রহণ করেন না। শিশুদের প্রতি অত্যাচার, মহিলাদের প্রতি এবং যে কোন ধরনের বৈষ্ণব অপরাধ সেটা হল এমন কিছু যা আমরা মায়াপুর থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলতে চাই। চৈতন্য চরিতামৃতে বর্ণনা আছে — ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধিকামী— সকলেঅশান্ত’ , কৃষ্ণভক্ত নিষ্কাম অতএবশান্ত। তাই আসলে, কর্ম, জ্ঞান, যোগের সব পন্থা হতাশা সৃষ্টি করে। আমরা হলাম সবিশেষবাদী। আমরা পরমেশ্বর ভগবানকে অর্চনা করি তাঁর বিভিন্ন অবতারের মাধ্যমে। ভগবানের শ্রীবিগ্রহকে অর্চা অবতার বলা হয়। আমাদের এখানেপ্রতি দিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান শ্রী বিগ্রহকে পূজা করার জন্য। অনেকে মায়াপুরে আসেন কিন্তু এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন না। যখন আমি নির্মাণকার্য দেখছিলাম, আমি দ্বিগুণ সময় সেবা দেখছিলাম সকাল ছয়টা থেকে রাত্রি বারোটা পর্যন্ত। দুটো শিফট। ওয়ার্কাররা একটা সিফট কাজ করতো দুটো দলে। প্রভুপাদ বলছেন যে আমি কমপক্ষে প্রভুপাদের গুরু পূজায় যোগদান করি এটা সাফিশিয়েন্ট। আমি দেখছি যে হৃদয় চৈতন্য, ব্রজবিলাস তারা প্রতিদিন মঙ্গলারতি তে যোগদান করছে। আশা করি সমস্ত ভক্ত যোগদান করলে এখানে এত ভিড় হবে যে অভিযোগ হবে জায়গা নাই। আমাদেরকে বৈদিক তারামণ্ডল মন্দিরে খুব শীঘ্রই যেতে হবে। 

গতকাল, পানিহাটি থেকে আগত ৫৬ জন ভক্ত আমার সাথে দেখা করেছিল। এটি মজার ব্যাপার যে এই সময়ে আমরা চৈতন্যলীলা ক্লাসে পানিহাটি লীলা সম্পর্কে পাঠ করছি। এবং গতকাল ক্লাসে অধ্যায়ের শিরোনাম ছিলচৈতন্য মহাপ্রভু নিত্যকাল পানিহাটিতে অবস্থান করেন”  তারা সেখানে ৪০ কাটা জমি পেয়েছে। তারা আরো ২৪ কাটা জমি কিনতে চায়। তারা বললেন যে বাকি ২৪ কাটার জন্য তারা আড়াই কোটি টাকা চাইছে। তারা এক কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। তাদের আরো দেড় কোটি টাকা প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষেমায়াপুরের থেকে ওই স্থানে জমি সস্তা! অর্ধেক দাম! আমি এটা উল্লেখ করছি কারন যদি কারো কাছে অর্থ থাকে তাহলে তা অনুদান দিতে পারেন। আমার মনে পড়ছে যে, যখন নিত্যানন্দ প্রভুকে চৈতন্য মহাপ্রভু বাংলায় পাঠালেন, তখন তিনি প্রথম পানিহাটিতে যান। যখন নিত্যানন্দ প্রভু সেখানে এসেছেন রাঘব পণ্ডিত জিজ্ঞেস করলেনআপনারা কত মূর্তি? কয় জন? নিত্যানন্দ প্রভু বললেন৪০ বা ৫০ জন।  আপনারা সকলে গঙ্গায় স্নান করতে যান ও ততক্ষণে আমি আপনাদের জন্য প্রসাদ প্রস্তুত করছি। রাঘব পণ্ডিত এবং তার বোন দময়ন্তী ছিলেন দক্ষ রাধুনী। তিনি ৫০ জনের জন্য এক ঘন্টায় প্রসাদ প্রস্তুত করেছিলেন! তারপর তারা প্রসাদ গ্রহণ করেন, বিশ্রাম নেন ও এরপর তারা কীর্তন করেছিলেন। প্রভু নিত্যানন্দ সবাইকে নৃত্য করতে বলছিলেন। সবাই নৃত্য করলেন। তারপর নিত্যানন্দ প্রভু নৃত্য করলেন! তার নৃত্য হল সর্বাপেক্ষা মধুর, এই ত্রিভুবনে এর কোনো তুলনা হয় না! চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, “যেখানে তিনি নৃত্য করবেন, আমি সেখানে অবস্থান করবো! আমি এটি না দেখে থাকতে পারবো না!  আমি এটি না দেখে থাকতে পারবো না!চৈতন্য চরিতামৃতে এই শ্লোকটি আছে —  নৃত্যের মধুরী কেবা বর্ণিবারে পারে মহাপ্রভু আইসে যেই নৃত্য দেখিবারে —কেউই নিত্যানন্দ প্রভুর নৃত্যের মধুরতা সঠিকভাবে বর্ণনা করতে পারবে না। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং আসেন তা দেখার জন্য।চৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং তা দেখার জন্য আসেন। যখন নিত্যানন্দ প্রভু নৃত্য করেন, তিনি ভক্তদের বললেন চৈতন্য মহাপ্রভু আপনাদের মাঝে উপস্থিত, আপনারা তাকে দর্শন করতে পারছেন না, কিন্তু তিনি এখানে! তিনি দক্ষিণ ভারতের একটি মালা পরিধান করে আছে। আপনি সেই মালার গন্ধ পেতে পারেন। এবং ভক্তরা সেই ঘ্রাণ গ্রহণ করতে শুরু করেন! সেখানে সেই সুগন্ধ ছিল যেন প্রেম ধূম্র! সকলে ভাবে বিভোর হয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়ে! যখন সেই গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল্! 

এই শ্লোকটিতে বর্ণনা করা হয়েছে, মানুষ কেবল একটি উপায়ে সুখী হতে পারেন সেটি হল ভক্তিমূলক সেবা সম্পাদনের মাধ্যমে। শ্রীল শ্রীধর স্বামী এবং অন্যান্য আচার্য বর্গ, যেমন জীব গোস্বামী স্বীকার করেছেন যে ভক্তিযোগ কেবল সহজ, সরল, স্বাভাবিক এবং ক্লেশ মুক্তই নয়, বরং মানুষের সুখের একমাত্র উৎস। 

গতরাত্রে আমরা আলোচনা করছিলাম যে কিভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু এবং নিত্যানন্দ প্রভু একসাথে ছিলেন যদিও চৈতন্য মহাপ্রভু অপ্রকাশিত অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু রাঘব পণ্ডিত, তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখতে পারছিলেন। এবং তিনি দুজনকেই প্রসাদ দিচ্ছিলেন। এবং এটা বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে রান্না হয়েছে এবং পিঠা পানা ইত্যাদি দেওয়া হল। আমি চিন্তা করছিলাম যে কোন সাধারণ ব্যক্তি দীপক ঘোষ বা অন্য কেউ যদি এরকমভাবে বসে প্রসাদ পেতেন, তাহলে হয়তো আমরা এত আনন্দ অনুভব করতাম না। কিন্তু যখন আমি পড়লাম এবং শুনলাম যে নিত্যানন্দ প্রভু এবং চৈতন্য মহাপ্রভু প্রসাদ গ্রহণ করছেন এবং রাঘব পণ্ডিত তাদেরকে প্রসাদ নিবেদন করছেন। তখন আমি আনন্দিত হলাম! আমি জানিনা অন্যরাও আনন্দ পাচ্ছিলেন নাকি, আমার মনে হয় তারা আনন্দ পাচ্ছিলেন। ভগবান যা কিছু করেন তা দিব্য, ভগবানের লীলা অথবা তার ভক্তের লীলাগুলি পর্যবেক্ষণ করা সে সবকিছুই দিব্য। আমি খবরে দেখেছি কিভাবে একটি দল তারা বিশ্বকাপ জিতেছে। তাদের অনুসারীরা লাফিয়ে ওঠে এবং আনন্দ করে আহহহহহ! কিন্তু একটা ফুটবল খেলায় জেতার কি মানে আছে? যদি তারা হরে কৃষ্ণ জপকীর্তন করেন এবং উচ্ছাস করেনতাহলে তা কত লাভজনক! প্রতিদিন আমাদের ভক্তরা নৃত্য করে রাধামাধব পঞ্চতত্ত্ব ইত্যাদি আরতির সময়, এটায় কত পারমার্থিক উন্নতি হচ্ছে। আমরা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এইভাবে ভ্রমণ করি, আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান হই যখন আমরা ভগবান কৃষ্ণের প্রতি সেবা নিবেদনের সুযোগ পাই। 

ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোনো ভাগ্যবান্ জীব ।
গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা-বীজ ॥

[চৈ চ মধ্য ১৯.১৫১]

জীব তার কর্ম অনুসারে ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করে। কখনও সে উচ্চতর লোকে উন্নীত হয় এবং কখনও নিম্নতর লোকে অধঃপতিত হয়। এইভাবে ভ্রমণরত অসংখ্য জীবের মধ্যে কদাচিৎ কোন একটি জীব তার অসীম সৌভাগ্যের ফলে, শ্রীকৃষ্ণের কৃপায়, সদ্‌গুরুর সান্নিধ্য লাভ করে। এইভাবে, গুরু ও কৃষ্ণ, উভয়ের কৃপার প্রভাবে জীব ভক্তিলতার বীজ প্রাপ্ত হয়।”

ভক্তিমূলক সেবা হলো একটি বিশেষ জিনিস। সমস্ত যোগী, জ্ঞানী বহু জন্ম পরে তাদের জ্ঞান হয়, আত্মসমর্পণ করে বাসুদেবের কাছে। তাই আমাদের যখন এই পবিত্র ধামে থাকার সুযোগ হয় তখন আমাদের যতটা সম্ভব ততটা ভক্তিমূলক সেবা করা উচিত। ভক্তি যোগে বৈবাহিক জীবন মানে হলো ব্রহ্মচর্য এবং এটি স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে অবাধে সঙ্গ করা নয়। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে সম্পর্ক সেটি ভক্তিমূলক সেবা নয়। যদি তারা গর্ভধাণ সংস্কার করে এবং স্বামী স্ত্রী ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে কৃষ্ণভাবনাময় সন্তান লাভের জন্য তাহলে এটি ভক্তিমূলক সেবা। অনেক মানুষেরাআমি শুনেছি শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে মানুষেরা যদি কৃষ্ণভাবনাময় না হয়, তাহলে তারা পশু তুল্য। শ্রীল গোপাল ভট্ট গোস্বামীর সৎ-ক্রিয়া-সার-দীপিকাতে গর্ভধাণ সংস্কারের উল্লেখ রয়েছে। প্রভুপাদ বলেছেন যে তিনি তাঁর গৃহস্থ ভক্তদের পরমহংস স্তরে উন্নীত হতে দেখতে চান। এইভাবে, চেষ্টা করা উচিত স্বামী-স্ত্রী পরিবারে সবাই কৃষ্ণ ভক্তি করতে থাকবে। বিবাহ বন্ধন ছাড়া অন্য যে কোনো প্রকার সম্পর্ককে অবৈধ যৌন সঙ্গ বলা হয়েছে। একজন ব্রহ্মচারী হওয়া অথবা গৃহস্থ হওয়া যথেষ্ট নয়, আপনার দরকার যতটা সম্ভব ততটা সেবা করা। ভক্তি সেবা করলে আসলে খুশি হবে! হরিবোল! কোন প্রশ্ন বা মন্তব্য আছে?

প্রশ্ন: আমার প্রশ্ন হল সেবা করার সময় আমরা মন, শরীর এবং কার্য এই তিন মাধ্যমে অপরাধ করতে পারি। তাই কিভাবে আমরা এই অপরাধগুলি এড়াতে পারি যাতে আমরা ভগবানের ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হতে পারবো?

জয়পতাকা স্বামী: গতকাল কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি কি করি, আমি কিভাবে আমার রাগ নিয়ন্ত্রণ করি যখন আমার সেবকরা আমি যা চাই তা না করে? আমি মনে করতে পারছিলাম না এমন কোনো সময়ের কথা যখন আমি এমনভাবে আমার মেজাজ হারিয়েছিলাম! কিন্তু দীর্ঘকাল আগে নিশ্চই এমন একটা সময় ছিল! আমি বললাম যে আমরা জ্ঞানে বা অজ্ঞানে কৃষ্ণের কাছে অনেক অপরাধ করি, আমরা চাই কৃষ্ণ আমাদের ক্ষমা করে দিন। তাই, এইভাবে আমরা যদি অন্যদের ক্ষমা না করি, তাহলে আমরা কীভাবে আশা করতে পারি যে কৃষ্ণ আমাদের ক্ষমা করবেন? আপনার প্রশ্ন, আপনার প্রশ্নের মূল কারণ কি? কেউ যদি অন্য কাউকে ঘৃণা করে তবে তা অপরাধ। যদি এই ধরনের কোনো বিদ্বেষ না থাকে, তবে সেটি কেন অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে? এইভাবে অন্যের মধ্যে ভালো গুণ দেখে প্রশংসা করলে তাহলে কি করে অপরাধ হবেআমরা যদি মানুষের ভিন্ন গুণের প্রতি অসহণশীল হই, তাহলে অপরাধের সম্ভাবনা থাকে। আপনি যদি বৈষ্ণব বা গুরুর প্রতি কাউকে কোন অপরাধ করতে দেখেন তাহলে আপনার রাগ করা দরকার। কৃষ্ণের কাছে, আপনি যদি তাঁর প্রতি অপরাধ করেন, সাধারণত তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু আপনি যদি তাঁর ভক্তকে অসন্তুষ্ট করেন তবে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন।

অতুল কৃষ্ণ দাস: গুরুমহারাজ, আজ আপনি বর্ণনা করেছেন যে কীভাবে পবিত্র ধামে বাস করলে কোটি কোটি গুণ ফল লাভ হয়, আমার প্রশ্ন হল কৃপা করে বলুন এটি কিভাবে সম্ভব যে আপনার মতো মহা-ভাগবতরা ধামের বাইরে প্রচার করতে যান?

জয়পতাকা স্বামী: আমি প্রতি বছর ৫ বা ৬ বার সারা বিশ্ব ভ্রমণ করতাম। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে আমার আজীবন-গোল্ড-মেম্বারশিপ আছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে আমার এমারল্ড মেম্বারশিপ আছে, যেটা সোনার মতো। আমাকে প্লেনে যেতে হবে না, আমি প্রতি বছর এমনিই পাই। কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ প্রথমে বলেছিলেন যে একজন সন্ন্যাসী হিসেবে, আমার ভ্রমণ করা উচিত। কিন্তু এখন আমি মায়াপুরে বেশি সময় থাকি। শ্রীল প্রভুপাদ আমাকে মায়াপুরেও থাকতে বলেছিলেন এবং সহকারীদের সাহায্যে কার্য চালাতে বলেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে, তিনি আমাকে বিভিন্ন কথা বলেছেন। তাই, আমি মনে করি আমি যথেষ্ট ভ্রমণ করেছি। এখন আমি ভারতের মায়াপুরে বেশি সময় কাটাই। আমি বছরে এক বা দুবার ভ্রমণ করি! কিন্তু সেইভাবে দেখলে, আমি মনে করি আমি সমস্ত দেশে ভ্রমণ করতাম, দক্ষিণ আফ্রিকা, পোল্যান্ড, নাইজেরিয়া, ঘানা প্রভৃতি। ভক্তিতীর্থ স্বামী আমাকে মাঝে মাঝে পশ্চিম আফ্রিকা যেতে বলেছিলেন। আমি দু-তিনবার গিয়েছি। এই ভাবে, মহামারীর সময় আমি সারাক্ষণ মায়াপুরে থাকতাম। এই হল বিষয়, আমি শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশ পালন করার চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন: মায়াপুরে আমাদের ভক্তিমূলক সেবা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সুন্দর ব্যবস্থাপনা করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি বললেন যেমন শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে গৃহস্থদের পরমহংসের মতো হওয়া উচিত এর অর্থ কি? আমরা কি ভাবে বুঝবো যে পরমহংস মানে কি?

জয়পতাকা স্বামী: দেখুন শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তিনি একজন গৃহস্থ ছিলেন। এবং তাঁর পুত্র হলেন শ্রীল প্রভুপাদের আধ্যাত্মিক গুরুদেব, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর। শ্রীল প্রভুপাদ বলছিলেন যে গৃহস্থরা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মতো সন্তান লাভ করতে পারে এবং কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রসারের জন্য আমাদের এমন অনেক জীবাত্মা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের যদি সন্তান না হয়, তাহলে আমি মনে করি প্রচারের মাধ্যমে আমরা অনেককে কৃষ্ণভাবনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারি। আমাদের ভক্তদের দরকার বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করা যে কীভাবে কৃষ্ণভাবনার প্রসার ঘটাতে পারবে।

আজ আমরা একটু বেশি সময় নিয়েছি। হরিবোল !

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 21/DEC/2022
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions