Text Size

প্রশ্নোত্তর পর্ব — ৬ জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

6 Jul 2022|Duration: 02:06:57|Bengali|Question and Answer Session|Durgapur, India

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

প্রশ্ন:- আমি ১৬ মালা জপ করি ও ৪ নিয়ম পালন করি, এবং ভক্তিশাস্ত্রী ও ভক্ত প্রযত্ন কোর্সটি করছি। আধ্যাত্মিক জীবনে অগ্রসর হওয়ার জন্য আর কি করতে হবে?

জয়পতাকা স্বামী:- তিনি কোন দীক্ষা প্রাপ্ত? (হরিনাম) ভদবদ্‌গীতা পড়তে পারে এবং ভাগবত প্রথম তিনটা স্কন্ধ পড়ে দ্বিতীয় দীক্ষা নিতে পারে। তারপরে প্রথম ৬ স্কন্ধ ভাগবতে ভক্তিবৈভব ডিগ্রী হয়। দ্বিতীয় ৬ স্কন্ধ সব থেকে বড়, সেটা হচ্ছে ভক্তিবেদান্ত। এখন একটা মেয়ে দেখেছি সে বৃন্দাবন থেকে ভক্তি বৈভব, ভক্তিবেদান্ত ডিগ্রী পেয়েছে। ভক্তিবেদান্ত একটা সেমিস্টার শেষ। কিন্তু মাত্র ৩ মাসের মধ্যে পরীক্ষা হবে। এখন তার ইচ্ছা ভক্তি সর্বভৌম করবে। এছাড়া, কৃষ্ণসেবা যত পারো করো। আমাদের চৈতন্যদেব আজ্ঞা দিলেন:

যারে দেখ, তারে কহ ‘কৃষ্ণ’-উপদেশ।
আমার আজ্ঞায় গুরু হঞা তার’ এই দেশ ।।

প্রশ্ন:- আমি উল্টো রথ যাত্রার গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাই। যেমন আমরা জানি যে প্রভু জগন্নাথ বলদেব এবং সুভদ্রা মাতা সহ গুণ্ডিচায় আসেন যেটি বৃন্দাবন ধামের থেকে অভিন্ন। এবং আমরা রথ টেনে ভগবানকে বৃন্দাবনে নিয়ে আসি। যখন আমরা ভগবানকে গুণ্ডিচা থেকে দ্বারকায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই, তখন ভক্তদের মনোভাব কেমন হওয়া উচিত? আমরা কখনও শুনি না যে ভক্তরা কৃষ্ণকে দ্বারকাতে ফিরিয়ে নিয়ে যান।

জয়পতাকা স্বামী:- এই প্রশ্নটি ইংরেজিতে, তাই আমি ইংরেজিতে উত্তর দেব। ওড়িশায় তারা কীর্তন করে:  নীলাচল চন্দ্র আমার প্রভু জগন্নাথ, জয় জগন্নাথ, সুন্দরাচল চন্দ্র আমার প্রভু জগন্নাথ! সুন্দরাচল চন্দ্র আমার প্রভু জগন্নাথ। সুন্দরাচল হলো গুণ্ডিচা। আপনারা সকলে গুণ্ডিচায় বসে আছেন। এর মানে আপনারা বৃন্দাবনে আছেন! প্রশ্ন ছিল আমাদের মনোভাব কি রকম হওয়া উচিত যখন আমরা ভগবানকে নীলাচলে ফিরিয়ে নিয়ে যাই? আসলে, এতে বৃন্দাবনের ভাব থাকতে পারে না কারণ ব্রজবাসীরা কৃষ্ণকে বৃন্দাবনের বাইরে নিয়ে যেতে চান না। কিন্তু এখানে দুর্গাপুরে আমি একটি মন্দির দেখেছি যেখানে জগন্নাথ বলদেব সুভদ্রা সুদর্শন চক্র রাধাকৃষ্ণ এবং চৈতন্য মহাপ্রভু আছেন। এখানে আপনি জগন্নাথ দেবকে বৃন্দাবন থেকে বৃন্দাবনে নিয়ে যাচ্ছেন! কিন্তু জগন্নাথ পুরীতে নীলাচল এবং সুন্দরাচল আছে কিন্তু এখানে দুটিই হল বৃন্দাবন।

প্রশ্ন:- প্রচারের ক্ষেত্রে কখনো কখনো প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকে। কিন্তু আমি কিছুটা ঈর্ষান্বিত হচ্ছি আমি কিভাবে এর থেকে বের হতে পারব?

জয়পতাকা স্বামী:- পরমার্থিক জগতে প্রতিযোগিতা থাকে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা হচ্ছে কে কৃষ্ণকে আরো বেশি সন্তুষ্ট করতে পারে। এখন, মৎসরতা বা মাৎসর্য জড় জগতে হয়। কিন্তু পরমার্থিক জগতে করলে কৃষ্ণ খুশি হবে না। একজন ভালো করলে, অন্যজন সেটার প্রশংসা করে—খুব ভালো করলেন, কৃষ্ণ খুশি হবেন। আপনারা প্রচারের সময় ঈর্ষার মধ্যে যাবেন না।

প্রশ্ন:- আমি যতই বলি আপনার চরণে আমার জীবন সমর্পন করব, কিন্তু জড়জগতের প্রতি আমি এতই আসক্ত যে আমি মাঝে মাঝে তা ভুলে যাই। আপনাকে দেওয়ার মতো আমার মত অধমের কিছুই নেই, তাই আপনার চরণে আমার জীবন পুরোপুরি সমর্পণ করতে চাই। কিভাবে আপনাকে আমার জীবন পুরোপুরি সমর্পণ করব কৃপা করে বলুন।

জয়পতাকা স্বামী:- চৈতন্য দেব বলেছেন—“গৃহে থাকো বনে থাকো সদা হরি বলে ডাকো!” আমরা এই জড়জগতে যা কিছু করি, কৃষ্ণের সন্তুষ্ট করার জন্য করা উচিত। একে বলা হয় যুক্ত বৈরাগ্য। সবকিছু কৃষ্ণের খুশি করার জন্য করা। এই জড় জগতে থাকলে সুখ হয় দুঃখ হয়। কিন্তু যে সুখ হয় সেটা তেমন কিছু নয়। খুব তুচ্ছ, ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু যাই হোক কিছু সুখ না পেলে আমাদের এই জীবনধারণ করতে কষ্ট হয়। কিন্তু ভক্তিসেবা দ্বারা উচ্চস্তরের আনন্দ পাওয়া উচিত।  সেই আনন্দ সকলের জন্য, নিরানন্দ নেই। একটা ভজন আছে অধিবাস কীর্তনের—“আনন্দের সীমা নাই! আনন্দের সীমা নাই! আনন্দের সীমা নাই! নিরানন্দ দূরে যায়! নিরানন্দ দূরে যায়!” আমি আশা করি যে কৃষ্ণসেবা দ্বারা ‘আনন্দের সীমা নাই’ এমন আনন্দ পাবেন। এখন এই জড় জগতে থাকলে সহ্য করতে হয়।

আমি কর্ণাটক প্রদেশে তারা বলছে এখানে পহেলা বৈশাখ হয়, তারা বলে উগাদী। উগাদীতে লাড্ডু দেয়! লাড্ডু মিষ্টি বাহ! কিন্তু মুখে দিলেন, এটা এমন লাড্ডু যে নিম পাতা দেয়। নিম আর মিষ্টি। এই হচ্ছে জীবন! জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি। এটাই জীবনে আছে। জন্মে একটা মায়ের গর্ভের মধ্যে ৯-১০ মাস থাকতে হবে, শুধু একটা বস্তার মধ্যে থাকে আর কৃমি খাবে। মা যদি ঝাল খায়, আহঃ! জ্বালা করে! নারদ মুনি যখন হিরণ্যকশিপুর স্ত্রী গর্ভবতী ছিল, তখন তিনি উপদেশ দিয়েছেন। মা ভুলে গেছেন, কিন্তু প্রহ্লাদ মহারাজ সব মনে রেখেছেন। তাঁর জন্ম হইল এবং কৃষ্ণজ্ঞান ছিল। যাইহোক, মনুষ্য জন্ম পেয়ে আমাদের একটি পশুর থেকেও আরাম আছে। পশু দেখা যাচ্ছে দিনরাত খোঁজে—কোথায় খাব? কোথায় শোবো? বা অপর ব্যক্তির সঙ্গে লড়াই করছে, এখানে সেখানে মৈথুন করছে। এটা হচ্ছে পশু জীবন। এখন মনুষ্য যদি এইভাবে জীবনযাপন করে, সেটা কি হল? রাজ রাজার মত সুন্দর হোটেলে খাচ্ছে বা কামরার মধ্যে শুয়ে থাকে। আহার, নিদ্রা, মৈথুন, ভয় —এই চারটে জিনিস পশুর আছে মানুষেরও আছে। কিন্তু আইন করছে, বাঁদিকে চলো ইত্যাদি যেসব আইন আছে, লাল বাতি হলে থামাতে হবে, হলুদ হলে যেতে পারবে। পশু সেটা জানে নাই, মনুষ্য জানে। এখন পশু যদি এটা না মেনে চলে যায় তো পুলিশ ধরবে কি?—এই তুমি কেন গেছো? এটা মনুষ্য়ের জন্য। ধর্ম কী? ভগবান আইন করেছেন মনুষ্য়ের জন্য যে কিভাবে তারা বৈকুন্ঠ চলে যেতে পারবে। ধর্মং তু সাক্ষাদ্ভগবতপ্রণিতং [ভাগবতম ৬.৩.১৯] এইভাবে চেষ্টা করব ভগবানের আইন পালন করার জন্য। সেইভাবে ভগবান সন্তুষ্ট হলে আমরা ভগবদ্ধাম ফিরে যাব। 

প্রশ্ন:- আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নতির জন্য আমরা কি কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করতে পারি শুদ্ধ ভক্ত কৃষ্ণ কাছে কোনকিছু চান না কিন্তু ইতিহাসে আমরা দেখি যে দ্রৌপদী, গজেন্দ্র, পাণ্ডবগণ, কুন্তীর মতো ভক্তরা যখন তারা কষ্টে ছিলেন তারা কৃষ্ণকে ডাকতেন। আমরা এটিকে কিভাবে বুঝব?

জয়পতাকা স্বামী:- দেখুন এমন নয় যে আমরা ভগবানের কাছে কোন কিছুর জন্য প্রার্থনা করতে পারব না। আমরা পারমার্থিক আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে পারি। যা কিছু কৃষ্ণভাবনাময়, আমরা তার জন্য প্রার্থনা করতে পারি। কিন্তু আমরা জড় জাগতিক কিছুর জন্য প্রার্থনা করতে পছন্দ করি না। যেমন যদি আমাদের গুরু অসুস্থ হন তাহলে আমরা কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করি, নরসিংহ দেব যদি এটি আপনাকে প্রসন্ন করে, তাহলে আমাদের গুরুকে আরোগ্য প্রদান করুন। তাই সাধারণত ভক্তরা এই কথাটি যুক্ত করে, যদি আপনি তা চান, যদি এটি আপনাকে প্রসন্ন করে। কিন্তু এটি স্বাভাবিক একজন মায়ের জন্য যে তিনি তার সন্তানের জন্য প্রার্থনা করে। তাই কুন্তী দেবী কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন দয়া করে দেখুন যাতে আমার পুত্রেরা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসে। এই ভাবে কিছু মায়েরা তারা কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করে তাদের সন্তানকে রক্ষা করার জন্য। কৃষ্ণ বলেছেন চার ধরনের মানুষেরা তার কাছে আসেন। যারা অর্থ চায়, যারা কিছু সমস্যায় পড়ে, যারা জিজ্ঞাসু এবং জ্ঞানীরা, যারা জ্ঞানবান, তারা উপলব্ধি করেন যে কৃষ্ণ হলেন সবকিছু। কিন্তু তারা যারা অর্থ চায়, সমস্যা থেকে মুক্ত হতে চায়, একবার যখন তারা অর্থ লাভ করে, যখন তারা সমস্যা থেকে মুক্ত হয়, তারা কৃষ্ণ কে ভুলে যায়। যারা জিজ্ঞাসু এবং জ্ঞানবান তারা ভগবানের প্রতি স্থির থাকে। এরা হলো ধার্মিক মানুষ। অধার্মিক মানুষেরাও চার প্রকার ।

প্রশ্ন:- কৃষ্ণভাবনামৃতে এমনকি অনেক বছর থাকার পরেও কেন আমি ইন্দ্রিয়তৃপ্তির প্রতি অনুরক্ত?

জয়পতাকা স্বামী:- আমরা এই জগতে অনাদিকাল ধরে আছি। তাই স্বাভাবিকভাবে আমরা ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করতে অভ্যস্ত। আমাদের পারমার্থিক আনন্দের উচ্চতর স্বাদ লাভ করতে হবে। হরিবোল!

আর দুটো প্রশ্ন নেবো।

প্রশ্ন:- আমার অতীতের খারাপ গুণের কারণে আমার অন্যদের ত্রুটি দেখার দোষ আছে। আমি কিভাবে নিজেকে সংশোধন করতে পারব এবং এই দোষগুলি থেকে মুক্ত হতে পারব। যতবার ভাবি আমি নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করব, ততবারই শেষ অবধি আমি অন্যদের দোষ দেখার ভুল করে বসি।

জয়পতাকা স্বামী:- অপর ব্যক্তির মধ্যে ভালো গুন খুঁজুন। চৈতন্যদেব বলছেন—“আমানিন মানদেনা কীর্তনীয়া সদা হরিঃ” সবাইকে প্রশংসা করো ও নিজের প্রশংসা আশা করবে না। এখন আমাদের যদি ঘা থাকে ও একটা মাছি যদি গিয়ে বসে, মাছির মতো দোষ খোঁজা আমাদের উচিত নয়। আমরা লোকেদের ভালো গুন খুঁজে প্রশংসা করা উচিত। এটা দোষ আছে যে আমরা নিজেদের ভালো মনে করি আর অপরকে খারাপ। কিন্তু এটা চৈতন্যদেব বলছেন—অপরের গুণগাও আর নিজের জন্য আশা করবে না।

প্রশ্ন:- কেন জগন্নাথদেব শ্যাম বর্ণ, বলদেব শ্বেতবর্ণ ও সুভদ্রা স্বর্ণ বর্ণের?

জয়পতাকা স্বামী:- এটি তাঁদের রঙ। রামচন্দ্র এসেছেন তিনি সবুজ। গৌরাঙ্গ এসেছেন তিনি হলুদ, গৌর অঙ্গ। গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! নিতাই এসছেন লাল সোনার রঙ। নিতাই গৌরাঙ্গ! নিতাই গৌরাঙ্গ! নিতাই গৌরাঙ্গ! নিতাই গৌরাঙ্গ! নিতাই নিতাই নিতাই নিতাই! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! গৌরাঙ্গ! নিতাই গৌরাঙ্গ! নিতাই গৌরাঙ্গ! নিতাই গৌরাঙ্গ! নিতাই গৌরাঙ্গ!

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 23/03/2026
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions