Text Size

২০২১১০০৯ শ্রীমদ্ভাগবতম ১.১১.৩৪

9 Oct 2021|Duration: 00:39:54|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ 

ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
    ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
    ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!

শ্রীমদ্ভাগবতম ১/১১/৩৪
এবং নৃপাণাং ক্ষিতিভারজন্মনা-
মক্ষৌহিণীভিঃ পরিবৃত্ততেজসাম্‌।
বিধায় বৈরং শ্বসনো যথানলং
মিথো বধেনোপরতো নিরায়ুধঃ॥

 

অনুবাদ:- বায়ু যেমন বাঁশে বাঁশে পরস্পর সংঘর্ষণের দ্বারা অগ্নি উৎপন করে বাঁশ বনকে দগ্ধ করে, ঠিক তেমনই পৃথিবীর ভারস্বরূপ অশ্ব, গজ, রথ পদাতিক সমন্বিত বহু অক্ষৌহিণী সেনাযুক্ত দাম্ভিক রাজাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা উৎপাদনপূর্বক ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাদের বধ করেছিলেন।

 

তাৎপর্য:- পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভগবানের সৃষ্টিরূপে প্রকাশিত হয়েছে যে সমস্ত বস্ত, সেগুলির প্রকৃত ভোক্তা জীব নয়। ভগবানই তাঁর সৃষ্টিতে প্রকাশিত সব কিছুর ঈশ্বর এবং ভোক্তা। দুর্ভাগ্যবশত মায়াশক্তির প্রভাবে, প্রকৃতির গুণের দ্বারা পরিচালিত হয়ে জীব মিথ্যা ভোক্তায় পরিণত হয়। ভগবান হওয়ার এই ভ্রান্ত ভাবনার গর্বে গর্বিত হয়ে মায়াচ্ছন্ন জীব নানা কার্যের দ্বারা তার জড়া শক্তি বৃদ্ধি করে এবং তার ফলে পৃথিবীর ভার এমনভাবে বর্ধিত করে যে তখন এই পৃথিবী প্রকৃতিস্থ মানুষদের পক্ষে বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে যায়। সেই অবস্থাকে বলা হয় ধর্মস্য গ্লানি বা মানুষের শক্তির অসদ্ব্যবহার। এই প্রকার ধর্মের গ্লানি যখন অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে, তখন পৃথিবীর ভারস্বরূপ সেই নিষ্ঠুর প্রশাসকদের প্রভাবে এমন এক দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে সৎ প্রবৃত্তিসম্পন্ন মানুষেরা তখন অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। সেই সমস্ত সাধুদের পরিত্রাণের জন্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আসুরিক প্রশাসকদের দ্বারা উৎপন্ন ভূ-ভার হরণ করার জন্য ভগবান তাঁর অন্তরঙ্গা-শক্তির প্রভাবে আবির্ভূত হন। তিনি সেই অবাঞ্ছিত প্রশাসকদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন না। পক্ষান্তরে তিনি তাঁর শক্তির প্রভাবে তাদের মধ্যে শত্রুতা উৎপাদন করেন, ঠিক যেমন বায়ুর প্রভাবে বাশের ঘর্ষণের ফলে অরণ্যে দাবানল ভুলে ওঠে। অরণ্যে বায়ুর প্রভাবে আপনা থেকেই দাবানল জ্বলে ওঠে, সেইরকম ভগবানের অদৃশ্য পরিকল্পনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। অবাঞ্ছিত শাসকেরা, তাদের ভ্রান্ত ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক শক্তির গর্বে গর্বিত হয়ে আদর্শগত বিরোধের ফলে পরস্পরের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত হয় এবং তার ফলে তাদের সমস্ত ক্ষমতা ক্ষয় হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাস ভগবানের এই ইচ্ছাশক্তিকে প্রতিফলিত করে, এবং জীব যতক্ষণ পর্যন্ত না ভগবানের সেবায় যুক্ত হয় ততক্ষণ তা ঘটতে থাকবে। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় (৭/১৪) সেই তথ্যটি অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে —মায়া আমার শক্তি, এবং সেই গুণময়ী মায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া আশ্রিত জীবের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যারা আমার (পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের) শরণাগত হয়, তারা অনায়াসে এই মায়ার সমুদ্র অতিক্রম করতে পারে।তার অর্থ হচ্ছে যে কেউই সকাম কর্মের দ্বারা অথবা জল্পনা-কল্পনা প্রসূত দর্শনের দ্বারা অথবা আদর্শের দ্বারা এই জগতে শান্তি এবং সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। একমাত্র উপায় হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হওয়া এবং তার ফলেই কেবল মায়ার মোহময়ী প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া যায়।

 

দুর্ভাগ্যবশত যে সমস্ত মানুষেরা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত, তারা পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হতে পারে না। তারা সকলেই হচ্ছে মহামূর্খ, তারা নরাধম; আপাতদৃষ্টিতে যদিও তাদের শিক্ষিত বলে মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে। তারা সকলেই আসুরিক মনোভাবাপন্ন, এবং তাই তারা সর্বদা ভগবানের পরম শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতা করে। যারা অত্যন্ত জড়বাদী, তারা সর্বদা জড় ক্ষমতা এবং শক্তির জন্য লালায়িত। নিঃসন্দেহে তারা হচ্ছে সব চাইতে বড় মূর্খ, কেননা তাদের জীবনীশক্তি সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই। পারমার্থিক বিজ্ঞান সম্বন্ধে অজ্ঞতার ফলে তারা জড় বিজ্ঞানে মগ্ন থাকে, যা জড় দেহের সঙ্গে সঙ্গে বিনাশশ্রাপ্ত হয়। তারা হচ্ছে নরাধম, কেননা মনুষ্য জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবানের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা; আর জড়জাগতিক কার্যকলাপে যুক্ত থেকে তারা সেই সুযোগটি হারায়। তাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে, কেননা দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পরেও তারা পরমেশ্বর ভগবানকে জানতে পারে না, যিনি হচ্ছেন সবকিছুর সারাতিসার। আর তারা সকলেই আসুরিক ভাবাপন্ন; এবং তাই তাদের রাবণ, হিরণ্যকশিপু, কংস আদি জড়বাদী অসুরদের পরিণতি ভোগ করতে হয়।

***

জয়পতাকা স্বামী:- আমাদের মনে আছে যে ভূমি দেবী তিনি ব্রহ্মা দেবের কাছে প্রার্থনা করলেন যে বেশি সৈন্যবাহিনী পৃথিবীতে আছে। ব্রহ্মাদেব কে বলছেন, ব্রহ্মা এই ক্ষীর সমুদ্রের কাছে গিয়ে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেন, “কি করা যায়।?” ওনাকে তখন প্রত্যুত্তরে বলা হয়েছিল যে কৃষ্ণ, বলরাম আবির্ভূত হবেন। এবং দ্বাপর যুগের শেষে কৃষ্ণ, বলরাম আবির্ভূত হয়েছিলেন। একটা বিশেষ কাজ ছিল যে এই সমস্ত যে রাজা বাহিনী কমিয়ে দিতে।এখন তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরে, পাণ্ডবদের সাথে সময় অতিবাহিত করার পর দ্বারকায় ফিরে এলেন। দূর্যোধন অত্যন্ত গর্বান্বিত ছিল যে তাদের বড় সৈন্যবাহিনী আছে, তার কাছে ভীষ্ম দেব আছে, তার কাছে দ্রোণাচার্য আছে, আর কৃষ্ণ ব্যক্তিগতভাবে শান্তির দূত হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি দূর্যোধনকে বলেছিলেন তাদেরকে পাঁচটি গ্রাম দিন, যাতে তারা শাসন করতে পারে, কিন্তু দূর্যোধন বলেছিল যে সে এমনকি তাদেরকে একটি সুচ পরিমান ভূমি ও দেবে না। দুর্যোধন কৃষ্ণকে আটক করার চেষ্টা করেছিল, যদিও তিনি আচরণ বিধি দ্বারা সুরক্ষিত ছিলেন। কৃষ্ণ দুর্যোধনকে এক প্রকার বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন এবং সে সেই স্থান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাই যদিও দুর্যোধনের কাছে শান্তি বজায় রাখার প্রত্যেক সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু অহংকারের জন্য সে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল। এটা আমরা বর্তমান জগতে গ্রিস, তুর্কি,  আমেরিকাতে দেখতে পাচ্ছি সেখানে অনেক দাবানল হয়, এই দাবানল কিভাবে শুরু হয় কেউ জানে না। বলা হয়েছে যে বাতাস বয়ে চলে সেই কারণে দুটি বাঁশ গাছের ঘর্ষণের ফলে আগুন জ্বলে ওঠে, এইভাবে কৃষ্ণ ব্যক্তিগতভাবে এর মধ্যে জড়িত ছিলেন না, কিন্তু সেই বাতাসের মতো তিনি তাদের যুদ্ধে রত করিয়েছিলেন। এইভাবে আশুরিক রাজারা একে অপরকে হত্যা করেছিল। এবং কৃষ্ণ ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ করেছিলেন না, সেই রাজারা কৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারতেন, তাঁর শান্তির বার্তা গ্রহণ করার মাধ্যমে, কিন্তু এর পরিবর্তে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে একে অপরকে হত্যা করেছিল, এইভাবে মনুষ্য জন্ম পেয়ে তারা অপব্যবহার করেছিল।

 

চৈতন্য মহাপ্রভু এসেছেন সবার মনুষ্য জন্ম সার্থক করার জন্য। চৈতন্য মহাপ্রভু মানুষদের হৃদয় পরিবর্তন করেছেন। তিনি অসুরদের হত্যা করেননি, তিনি তাদের আসুরিক প্রবৃত্তিকে হত্যা করেছিলেন। তাই চৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন এক বিশেষ অবতার। এবং আমাদের তাঁর এই আন্দোলনে থাকার এক মহান সুযোগ রয়েছে এবং শ্রীল প্রভুপাদ চৈতন্য মহাপ্রভুর এই বার্তা সমগ্র বিশ্বের কাছে এনেছেন। এমনকি যদি মানুষদের তাঁর সম্পর্কে অন্য কোন ধারণাও থাকে, যদি তারা হরে কৃষ্ণ জপ করে, তাহলে তারা শুদ্ধ হবে। ধ্রুব মহারাজ চেয়েছেন তার বাবার থেকে বড় একটা রাজার আসন পাওয়ার কিন্তু একবার যখন ভগবানকে পেয়েছেনতিনি বুঝতে পেরেছেন যে এটা কিছু নয়। তারপর পরবর্তীতে তিনি শুদ্ধ ভক্ত হয়ে যান। তিনি বৈকুন্ঠ চলে গেলেন বিষ্ণুলোকে। এখন ধ্রুবলোক আমরা বলি, সেটা হচ্ছে বিষ্ণু লোক। ধ্রুব মহারাজ অনেক তপস্যা করে উদ্ধার হয়েছেন, আমরা ধ্রুব মহারাজের মত এত তপস্যা করতে সক্ষম নই, যদি আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুকে অনুসরণ করিতাহলে আমরা খুব সহজেই শুদ্ধভক্তি লাভ করতে পারব। হয়ত এই মহামারী থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা জপ করতে পারি। তবে তারপর চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় আমরা শুদ্ধ হতে পারব। প্রভুপাদ একবার বলছিলেন, যদি আমরা আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে থাকি সেখানে ঢেউ আমাদের এদিক ওদিক করবে, যদি আমরা বলি যে আমরা চাই আটলান্টিক মহাসাগর যেন খুব শান্ত হয়ে যায়, সেটা আটলান্টিক মহাসাগরের স্বভাব, যে এটা তরঙ্গাকুল। তাই সমাধান হচ্ছে ওই সেই মহাসাগর থেকে বেরিয়ে আসা। আমরা যদি মনে করি এই পৃথিবীতে শান্তি চাই, এটা কোন অসুবিধা হবে না, এটা সম্ভব নয়। জড় জগতের স্বভাবই হচ্ছে সেখানে সমস্যা থাকবে। বৈজ্ঞানিকেরা যতই জল্পনা কল্পনা করুক ও বিভিন্ন উপায় বার করুক, তবু আমাদের যারা ব্যাধি, মৃত্যু, জরা থাকবে এবং তারপর পুনর্জন্ম। তাই প্রকৃত সমাধান হচ্ছে এই জগত থেকে বাহিরে যাওয়া। তা আমরা করতে পারব যদি আমরা কৃষ্ণের প্রতি আত্মসমর্পণ করি, এখন কৃষ্ণের কাছে শরণম করতে গেলে অন্য যুগে সেটা অসুবিধা ছিল, কিন্তু চৈতন্যদেবের কৃপাতে এই কলিযুগে অনেক সহজ হয়ে গেছে। তিনি দেখেন না যে কে যোগ্য, কে অযোগ্য তিনি প্রত্যেককে কৃপা প্রদান করেন। এমনকি বেনারসের মায়াবাদীদেরকেও তিনি বৈষ্ণবে রূপান্তরিত করেছিলেন।

 

বৃন্দাবনে একজন ব্রাহ্মণ চৈতন্য মহাপ্রভুকে বলেছিলেন, “তারা বলে প্রকৃতপক্ষে আপনি হচ্ছেন কৃষ্ণতিনি বললেন যদি কোনো মহিলা বা শিশু বা বৃদ্ধ বা এমনকি কুকুরভোজনকারী ব্যক্তিরা ওঁনাকে একবার দর্শন করে, তাহলে তারা এই সমগ্র বিশ্বের আধ্যাত্মিক গুরু হতে পারবে। কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুকে একবার দর্শন করা মাত্র! এবং পরবর্তী শ্লোকে আছে কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর নাম শ্রবণের মাধ্যমে কেউ সমগ্র জগতকে উদ্ধার করতে পারবে। এত দয়া চৈতন্য মহাপ্রভুর! বর্তমানে পৃথিবীতে আমরা কত জলবায়ু সম্বন্ধীয় সমস্যা দেখতে পারছি — দাবানল, অগ্নুৎপাত, ভূমিকম্প, সাইক্লোন, হারিকেন, মহামারী, তাই এই জগত হচ্ছে এক অতি বিপদজনক স্থান। কিন্তু বৈজ্ঞানিকেরা সকলকে একটা ভবিষ্যতের আশ্বাস দিচ্ছে যে তারা এই সমস্ত সমস্যার সমাধান করবে। আমরা এমনকি দেখছি যে মানুষেরা যারা দুটো ভ্যাকসিন পেয়েছেতারাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে, তারা পশুদের দ্বারা দংশিত হচ্ছে, এবং আরো বিভিন্ন ধরনের সমস্যা আছে যেমন গাড়ি দুর্ঘটনা। তাই এই জরজগতে সব সময় সমস্যা থাকবে, আমাদের কৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করা উচিত ও এই জগৎ ছেড়ে যাওয়া উচিত। এবং এর সহজতম পন্থা হচ্ছে পবিত্র নাম জপ করা — 

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

আমরা চেষ্টা করছি সবাই যাতে ভগবানের নাম কীর্তন করে। প্রভুপাদ বলছিলেন যে “হরের নাম” মানে হচ্ছে ভগবানের নাম। যদি মানুষেরা হরে কৃষ্ণ জব করতে না চায় তাহলে তারা ভগবানের যে কোন নাম জপ করতে পারে, তারা আল্লাহ, জাহবা, কৃষ্ণ বা রাম জপ করতে পারে। সংস্কৃততে ভগবানের নাম হচ্ছে কৃষ্ণ এবং সংস্কৃত হচ্ছে আমাদের মাতৃভাষা, সমস্ত ভাষা সংস্কৃত থেকে এসেছে। কৃষ্ণের মানে হচ্ছে সর্ব আকর্ষক, সকল আনন্দের উৎস, যার অর্থ হচ্ছে পরম পুরুষোত্তম ভগবান। সেই জন্য কৃষ্ণ বললে কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু যদি তারা অন্য কোন নাম জপ করতে চায়, আর যদি তা ভগবানের নাম হয় তাহলে ঠিক আছে।

 

আমার দক্ষিণ আমেরিকার একজন নানের সাথে পরিচয় ছিল যে যিশুখ্রিস্টের নাম জপ করছিল, কিন্তু তারপর সে ভাবল কেন আমি হরে কৃষ্ণ জব করার চেষ্টা করব না? তারপর সে দেখলে যে এটি যিশুখ্রিস্টের নাম জপ করার মতই, তবে তার থেকেও আরো ভালো। এইভাবে আমরা প্রচেষ্টা করছি মানুষেরা যাতে ভগবানের পবিত্র নামের আশ্রয় গ্রহণ করে, এটাই ছিল চৈতন্যদেবের আন্দোলন। আমি সেই সকল ভক্তদের ধন্যবাদ জানাই যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর আশ্রয় গ্রহণ করছেন। আশা করি সবাই চেষ্টা করবে এই ভাবে ভগবানের নামের মধ্যে আশ্রয় নিতে। কলিযুগে এটাই হচ্ছে একমাত্র পন্থা।  “হরের নাম হরের নাম  হরের নামৈবকেবলম” — এই কলিযুগে এটিই হচ্ছে একমাত্র পন্থা! একমাত্র পন্থা! একমাত্র পন্থা! তাই এই বিষয়ে তর্ক করার কোন কারণ নেই, জপ করুন। শ্রীল প্রভুপাদ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছিলেন যে কেউ একজন বলছিল, “জপ করো! জপ করো! জপ করো!” কিন্তু সেই জড়বাদী ব্যক্তি প্রত্যুত্তরে বলছিল, “আমি পারবো না! আমি পারবো না! আমি পারবো না!” একটু যদি করত, তার জীবন সার্থক হত।

 

একজন কাজী ছিল, একজন ভক্ত তাকে বলছে যে, “তুমি বড় রাজনৈতিক, তুমি দেখতে সুন্দর, তুমি বুদ্ধিমান, ধার্মিক। আমার একটা কথা বলার আছে।”

 

সে বলল, “ঠিক আছে বলো”

 

“সব ভুলে যান, হরে কৃষ্ণ বলুন”

 

সে বলল, “আমি কালকে হরে কৃষ্ণ বলব।”

 

সেই বৈষ্ণব বললেন, “তুমি ইতিমধ্যেই তা বলা শুরু করে দিয়েছ, এখন থামবে না!” হা! হা! হা!

 

যেহেতু তিনি বলেছিলেন আমি কাল থেকেহরে কৃষ্ণবলব; তাই সেই বৈষ্ণব বলছে যে তুমি হরে কৃষ্ণ বলেছ, এখন থামবে না। তাই কোন না কোনভাবে আমরা যদি মানুষদের দিয়ে জপ করাতে পারি, নয়ত আমরা দেখি যে এই জড় জগতে কত সমস্যা আছে, তাই আমরা ভগবানের নাম কীর্তন করব এবং এই ভগবানের কাছে ফিরে যাব।  

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

গৌর হরি!  

 

প্রশ্ন:- আপনি বললেন যে যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা পেয়েছে, তাদের অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ থাকা উচিত। আমরা কিভাবে বুঝতে পারব যে আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা পেয়েছি কিনা

 

জয়পতাকা স্বামী:- এই প্রশ্নটি এমন যেন, যদি আমরা দুপুরের ভোজ খাই, তাহলে আমরা কি করে বুঝতে পারব যে আমরা দুপুরে খাবার খেয়েছি কিনা! চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় তুমি বুঝতে পারবে যে তুমি তাঁর কৃপা পেয়েছ, যদি তুমি এখনও পর্যন্ত তা বুঝতে না পার, তাহলে তুমি এখনও নবীন স্তরে আছ। তুমি যদি জপ করতে থাক ও অভ্যাস অনুশীলন করতে থাক, তাহলে তা তোমার কাছে প্রকাশিত হবে। চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি এত ভাবে বিভোর হতেন যে তাঁর শ্রীমুখ থেকে ফেনা বের হত এবং তার তাঁর চক্ষু থেকে অশ্রু ধারা বইত। হরিণ এসে তাঁর শ্রীমুখ থেকে সেই ফেনা লেহন করে নিত এবং পাখিরা এসে তাঁর চোখের জল পান করত। সেই হরিণ ও পাখিরা বুঝতে পেরেছিল, তাহলে তুমি কেন পারবে না? 

 

প্রশ্ন:- আমরা কিভাবে জড় জগতের বিপদের মোকাবিলা করব? আমাদেরকে কেবল ভক্তিমূলক সেবায় সক্রিয় থাকা উচিত এবং বাদবাকি সবকিছু গৌরাঙ্গের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত

 

জয়পতাকা স্বামী:- চৈতন্য মহাপ্রভু নির্দেশ দিয়েছেন, তোমার হৃদয়ে সর্বদা ভগবান কৃষ্ণকে রাখ ও এই ভাবে খুব দায়িত্ব সহকারে তোমার কার্য কর। আমি উল্লেখ করেছিলাম যে যদি কেউ সাগরে পড়ে যায় এবং যদি সে মনে করে যে সাগর শান্ত হয়ে যাবে, তাহলে তা সম্ভব নয়। আটলান্টিক মহাসাগর সাগরই থাকে, তেমনি এই জড় জগৎ হচ্ছে দুঃখের স্থান। ভগবদ্‌গীতাতে বলা হচ্ছে দূঃখালয়মাশাশ্বতম্। এটি দুঃখ পাওয়ার স্থান ও এটি ক্ষণস্থায়ী। তাই তোমার যদি কম দুঃখ থাকে, তাহলে তুমি হয়ত মনে করতে পার যে এটি খুব ভালো স্থান। যদি তোমার খুব বেশি দুঃখ থাকে, তাহলে তুমি মনে করবে যে না এটা খুবই বাজে স্থান। কিন্তু প্রকৃত সমাধান হচ্ছে এই স্থান ছেড়ে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া।

 

সুবাহু শচীসূত দাস:- ভক্তদের প্রচারের কারণে অনেকেই কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করছে, কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই তরুণ বালক, যারা পড়াশোনা করছে। তারা পড়াশোনার পিছনে অনেক অর্থ ব্যয় করে এবং পরিবার ও অভিভাবকদের থেকে আর্থিক সুবিধা পায়, আপনি কি মনে করেন যে এদেরকে আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান করার প্রস্তাব দেওয়া ঠিক হবে? এই বিষয়ে আপনার কি অভিমত?

  

জয়পতাকা স্বামী:- শ্রীল প্রভুপাদ যখন বিদেশে গিয়েছিলেন, তখন কেউ যদি শিক্ষা দেওয়া শুরু করত, তাহলে তিনি তাদেরকে আসতে বলতেন কারণ তিনি কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য সহায়তাকারী চেয়েছিলেন কিন্তু যদি মানুষেরা ইতিমধ্যেই তাদের শিক্ষায় উন্নত থাকে, তাহলে আমরা তাদেরকে চলে যেতে বলি এবং এসব বন্ধ করতে বলি। তাই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আমরা ছাত্রাবাস তৈরি করেছি, এটি এক রকমের আধ্যাত্মিক হোস্টেল যেখানে থেকে তারা হরে কৃষ্ণ জপ করতে পারবে এবং আমরা তা করেও থাকি। পড়াশোনার জন্য অর্থ দেওয়ার বিষয়ে আমি কখন শুনিনি, এখন আমরা মানুষদের তাদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করি না, কিন্তু আমরা বলি যে কিভাবে তাদের মনে কৃষ্ণকে রাখতে হবে এবং তাদের মধ্যে অনেকে গৃহস্থ হয় ও কেউ কেউ ব্রহ্মচারী হয়। আমরা তাদেরকে শিক্ষা দেই যে কিভাবে যেকোনো পরিস্থিতিতে কৃষ্ণের সেবা করতে হবে। তাই, যতক্ষণ না আমাদের অনেক অর্থ থাকবে, ততক্ষণ অর্থ সাহায্য দেওয়ার প্রশ্নই আসছে না। তবে যাই হোক, যদি আমরা তাদের পড়াশোনার জন্য অর্থ দেই, তাহলে কি নিশ্চয়তা আছে যে তারা কৃষ্ণভাবনাময় হবে? যদি আমাদের কাছে তাদের জন্য কার্য থাকে, তাহলে আমরা তাদেরকে অর্থ দিই, যেমন কোন ব্যবসার ক্ষেত্রে স্কলারশিপ দেওয়া হয়, কিন্তু তাকে সেই ব্যবসার জন্য কার্য করতে হবে। তাই, ভবিষ্যতে আমরা এই বিষয়ে এমন কিছু বিবেচনা করতে পারি।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 9/9/23
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions