Text Size

২০২১১০০৩ শ্রীমদ্ভাগবতম ১.১১.২৮

3 Oct 2021|Duration: 00:43:34|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

 মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ 

ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
    ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
    ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!

শ্রীমদ্ভাগবতম ১/১১/২৮
প্রবিষ্টস্ত গৃহং পিত্রোঃ পরিষূক্তঃ স্বমাতৃভিঃ।
ববন্দে শিরসা সপ্ত দেবকীপ্রমুখা মুদা ॥

 

অনুবাদ:- তারপর তাঁর পিতার আলয়ে প্রবেশ করে তিনি দেবকী আদি তাঁর মাতাদের দ্বারা আলিঙ্গিত হলেন এবং তিনি মস্তক অবনত করে তাঁদের প্রণতি নিবেদন করলেন।

 

তাৎপর্য:- এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেবের আলাদা বাসস্থান ছিল, যেখানে তিনি তাঁর আঠার জন পত্নীসহ বাস করতেন, তাঁদের মধ্যে শ্রীমতী দেবকী হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত মাতা। কিন্তু তা সত্বেও অন্য সমস্ত বিমাতারা তাঁর প্রতি সমান স্লেহশীলা ছিলেন, যা পরবর্তী শ্লোকে স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রকৃত মাতা এবং বিমাতাদের মধ্যে কোন ভেদভাব রাখতেন না, এবং তিনি সেখানে উপস্থিত বসুদেবের সমস্ত পত্নীদের প্রতি সমান শ্রদ্ধা সহকারে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। শাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে সাত প্রকার মাতা রয়েছেন — ১) প্রকৃত মাতা, ২) গুরু-পত্নী, ৩) রাহ্মণ-পত্নী, ৪) রাজার পত্নী, ৫) গাভী, ৬) ধাত্রী, এবং ৭) পৃথিবী। এঁরা সকলেই মাতা। শাস্ত্রের এই নির্দেশ অনুসারে, পিতার পত্নী হওয়ার ফলে বিমাতাও মাতারই মতো, কেননা পিতা হচ্ছেন গুরু। ব্রহ্মাণ্ড পতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিমাতার প্রতি কিভাবে আচরণ করতে হয় সেই শিক্ষা দেওয়ার জন্য একজন আদর্শ পুত্রের ভূমিকায় লীলা বিলাস করেছেন।

***

জয়পতাকা স্বামী:- এটি জানতে পারা খুব আকর্ষণীয় যে কিভাবে কৃষ্ণকে যাঁরা স্বাগত জানাতে এসেছিলেন, তিনি তাঁদের সকলের সাথে ভাব বিনিময় করেছিলেন। মহান ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে অত্যন্ত নিচ ব্যক্তি পর্যন্ত সকলেই কৃষ্ণ কর্তৃক অভ্যর্থিত হয়েছিল, যথাযোগ্যভাবে। যখন কৃষ্ণ তাঁর বাবার বাড়িতে প্রবেশ করলেন, বাসুদেব এবং দেবকী ছিলেন, কিন্তু বাসুদেবের ১৮ জন স্ত্রীও ছিলেন, যদিও সেই সকল স্ত্রীয়েরা কৃষ্ণের বিমাতা ছিলেন, কিন্তু তাঁরাও কৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত স্নেহ পূর্ণ ছিলেন। এবং কৃষ্ণ তাঁদের কাছে মাথা নত করে প্রণাম করেছিলেন। ভগবান গীতাতে বলেছেন যে মহান ব্যক্তিরা যা করেন, অন্যান্য মানুষেরা সেই মতো তাকে অনুসরণ করেন। তাই কৃষ্ণ নিজের দৃষ্টান্তরূপে শিক্ষা প্রদান করেছিলেন। চৈতন্য-চরিতামৃতে চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, “আপনি আচারি ধর্ম— এইভাবে চৈতন্যদেব বলছিলেন নিজের উদাহরন করে শিখাতে হয় অন্যকে। যদিও কৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান কিন্তু তিনি অন্যদেরকে শেখানোর জন্য এইভাবে দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করছেন। আমরা দেখি যে কৃষ্ণের অবতারের ক্ষেত্রেও তাঁরা তাদের পিতা-মাতার সাথে সম্মান দিয়ে ব্যবহার করেন। রামচন্দ্র লীলার মধ্যে তাঁর বাবা ১৪ বছর বনবাসের কথা বলেছেন, তিনি মেনে নিয়েছেন। আমি শ্রীল প্রভুপাদকে আমার গুরু পিতা হিসেবে গ্রহণ করেছি। যখন আমি আমার বাবাকে বলেছিলাম যে আমি ভক্তিযোগ গ্রহণ করেছি, তখন তিনি বললেন, “তুমি সেটি ছেড়ে এখনই গৃহে ফিরে আসো, নয়ত আমি তোমার নাম আমেরিকান সেনাদলে দিয়ে দেব, আর তুমি যুদ্ধে ভিয়েতনামে মারা যাবে।তা আমার বাবা বলেছিল, আমার মা নয়। তখন আমি শ্রীল প্রভুপাদকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার কি করা উচিত?”  প্রভুপাদ বললেন, “ ভালো হয় তুমি কৃষ্ণের সৈনিকের মধ্যে থাকোএইভাবে আমি কৃষ্ণের সৈন দলের মধ্যে গত ৫৩ বছর রয়েছে। যাইহোক, তোমরা দেখো যে কত সুন্দরভাবে কৃষ্ণ তাঁর প্রত্যেক মাতার সাথে ব্যবহার করছেন। আমরা পড়ছিলাম যে কিভাবে মা যশোদা তিনি কৃষ্ণকে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে না দেখে কি করে থাকতে পারব?” তাই যদিও বাস্তবিক ক্ষেত্রে কৃষ্ণ হচ্ছেন দেবকীর সন্তান, কিন্তু তিনি যশোদা ও নন্দ মহারাজের পরিবারে বর্ধিত হয়েছেন। তাঁর বাল্যলীলা উপভোগ করতে পেরেছেন যশোদা এবং নন্দ মহারাজ। যা ছিল অতীব অসাধারণ পরিস্থিতি! যদিও কৃষ্ণ হচ্ছেন আদি পুরুষ, তাঁর কোন মাতা বা পিতা নেই, কিন্তু বিভিন্ন লীলার ক্ষেত্রে তিনি কাউকে তাঁর মাতা ও পিতা হিসেবে গ্রহণ করেন। সাম্প্রতিক আমাদের বামন দ্বাদশীর উৎসব ছিল, এবং বামনদেব অদিতি ও কাশ্যপ মুনির সন্তানরূপে এসেছিলেন। কপিল মুনি, তিনি দেবহুতি ও কর্দম মুনির সন্তানরূপে এসেছিলেন। এই পিতা-মাতারা পরমেশ্বর ভগবানের অভিভাবক হতে পেরেছিলেন। সুনীতি মাতা, ধ্রুব মহারাজের মা, তিনি এক মহান ভক্তের মা হয়েছিলেন। এইজন্য ধ্রুব মহারাজ যখন বৈকুন্ঠ চলে গেলেন, সুনীতি দেখলেন তার আগে চলে গেছেন। আমি দেখছি যে অনেক কৃষ্ণ ভাবনাময় পরিবারে তারা বিগ্রহের কাছে প্রার্থনা করছে যাতে তারা শুদ্ধ ভক্ত সন্তান লাভ করে। এবং শ্রীল প্রভুপাদ চিঠিতে লিখলেন যে, “এইসব সন্তান কৃষ্ণের দ্বারা পাঠানো হইল, তারা হচ্ছে বৈকুন্ঠ শিশু। তাই পিতা-মাতার তাদের সন্তানদের যত্ন নেওয়া উচিত।” রাজা উত্তানপদ ধ্রুব হয়ত মারা গেছে এই ভেবে অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে পড়েছিলেন, নারদ মুনি এসছেন এবং উত্তানপদকে বলছিলেন, “ধ্রুব ভগবানের দ্বারা রক্ষিত, ওঁনার কোন অসুবিধা হয় নাই।” তাই এইসব ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পারি যে সেই মাতার অনেক উচ্চ স্থিতি আছে। আমরা আশা করি যে আমাদের সকল ভক্ত নারীদেরও কৃষ্ণভাবনাময় সন্তান হবে। একজন ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে তার সকল সন্তানেরা অভক্ত, এইজন্য আমি খুব দুঃখ পাচ্ছি। একজনকে ভক্ত করে তোলা খুব একটা সহজ নয়। আমাদের সন্তানদের সাথে স্নেহপূর্ণ আচরণের সুযোগ গ্রহণ করা উচিত, আমরা দেখছি যে কৃষ্ণের বিমাতারাও তাঁর প্রতি অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ ছিলেন এবং তাঁকে আলিঙ্গন করলেন। তাঁরা অতীব সৌভাগ্যবতী যে তাঁরা কৃষ্ণের মাতা হতে পেরেছেন। আমরা জানি যে পাঁচটি মুখ্য রস আছে — শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মাধুর্য। দেবকী এবং অন্যান্য মায়েরা বাৎসল্যরসের, তারা মায়ের মত কৃষ্ণের সুচিন্তন করেন। যেভাবে হোক না কেন কৃষ্ণের সাথে একটা সম্পর্কের মধ্যে সেবা করতে হয়। কৃষ্ণ এত কৃপালু যে তাঁর লীলার সময় তাঁর সাথে বিভিন্ন সম্পর্কের বিভিন্ন ভক্তরা ছিলেন। সাধারণত এই ব্রজবাসী, মথুরাবাসী, দ্বারকাবাসীদের এই সুযোগ লাভ হয়েছিল, কিন্তু চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় প্রত্যেকে সেই সুযোগ পাচ্ছে, তিনি কৃষ্ণ প্রেমের কৃপা অবাধে বিতরণ করছেন। যদি কেউ চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি আকর্ষিত হয়, তাহলে তারা হয়ত মাধুর্য রসের ভক্ত। যদি কেউ নিত্যানন্দ প্রভুর প্রতি আকর্ষিত হয়, তাহলে তারা হয়ত বাৎসল্য রসের ভক্ত, যদি কেউ অদ্বৈত আচার্যের প্রতি আকর্ষিত হয়, তাহলে তারা হয়ত সখ্য রসের ভক্ত, যদি কেউ শ্রীবাসের প্রতি আকর্ষিত হয়, তাহলে তারা হয়ত দাস্য রসের। যাইহোক এটি বলা কঠিন, কখনো কখনো শ্রীল প্রভুপাদ বলতেন যে, “যদি তুমি ষড় গোস্বামীর প্রতি আকর্ষিত হও, তাহলে তুমি হয়ত মাধুর্য রসের ভক্ত, কিন্তু তা পরে দেখা যাবে।” কিন্তু কি হচ্ছে যে চৈতন্যদেবের কৃপাতে আমরা কৃষ্ণের বিপ্রলম্ভ মধ্যে সেবা করতে পারিশুদ্ধ কৃষ্ণ প্রেম উদয় হয়।

আমরা সেই লীলা পড়ছি যেখানে কৃষ্ণ কংসের মল্লযুদ্ধের স্থানে যাচ্ছেন, প্রত্যেকেই কৃষ্ণকে তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে দর্শন করেছিলেন। কংস কৃষ্ণকে স্বয়ং মৃত্যু রূপে দেখেছিলেন। গোপবালকরা কৃষ্ণ বলরামকে তাদের মত একজন রূপে দেখেছিলেন, দেবকী ও বাসুদেব দেখেছিলেন যে তাদের সন্তান এসছে, সাধারণ লোকেরা ভাবছিল যে এটি সঠিক নয় যে এই তরুণ বালকদের সাথে এই মল্লযোদ্ধারা যুদ্ধ করছে, এটি যেন অত্যন্ত ভারীবস্তুর সাথে পাখির পালকের সংঘর্ষ। তারা কংস কে ছিঃ ছিঃ করছিল যে, “কিভাবে আপনি এমন এক মূল্য যুদ্ধের আয়োজন করতে পারলেন?” যোগীরা কৃষ্ণকে পরম পুরুষোত্তম ভগবান রূপে দর্শন করলেন, মূর্খ মানুষেরা মনে করলেন যে এটি হচ্ছে বিশ্বরূপ বা তার থেকেও নগণ্য। সেই মল্লযোদ্ধারা কৃষ্ণ বলরামকে তেজস্বী বজ্রের মতো দেখেছিল, প্রত্যেকেই কৃষ্ণকে তাদের নিজেদের উপলব্ধির দ্বারা দর্শন করেছিলেন, এবং তা ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়! 

মানুষেরা বলে আমি ভগবানকে বিশ্বাস করিনা, যতক্ষণ না আমাকে দেখাবে, ততক্ষণ আমি বিশ্বাস করব না। কিন্তু ভগবান যখন ছিলেন বিভিন্ন চোখে ওনাকে দেখেছিলেন। ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে আমাদের চক্ষুতে ভক্তি অঞ্জন লাগতে হবে, তারপর হয়ত আমরা কৃষ্ণকে যথাযথরূপে দর্শন করতে পারব। গোপীরা যেভাবে কৃষ্ণকে দর্শন করেছিলেন, ব্রজবাসীরা যেভাবে কৃষ্ণকে দর্শন করেছিলেন, তা অন্যদের থেকে ভিন্ন ছিল। চৈতন্যদেব আশীর্বাদ দিচ্ছেন যেন আমরা সকলে ভক্তি চোখে দেখতে পাই। চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় আমরা কৃষ্ণের নাম জপ করতে পারি ও আমরা এই জীবনেই কৃষ্ণকে লাভ করতে পারি। প্রত্যেকেই তাদের জড় ইন্দ্রিয় তৃপ্তি করার চেষ্টা করছে, কিন্তু ভক্ত তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন, তারা চেষ্টা করছে কৃষ্ণের ইন্দ্রিয়কে সন্তুষ্ট করতে।  তাই সমস্ত ভক্ত ২৪ ঘন্টাই কৃষ্ণ সেবায় থাকে। 

শ্রীল প্রভুপাদের ব্যাস পুজায় আমরা চেন্নাইতে তরুণদের একটি নাটক দেখেছিলাম। দুজন ছিল যমদূত আর একজন ছিল যমরাজ। যমদূত অভিযোগ করছে যমরাজের কাছে, “আমরা নরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত কিন্তু তারা পবিত্র নাম জপ করছে।” অন্য আরেকটা যমদূত বলল, “তাদের গৃহে শ্রীবিগ্রহ আছে।” অপরজনের বলল, “তাদের গৃহে গীতা, ভাগবত আছে, আমরা তাদেরকে কিভাবে নরকে নিয়ে যাব? আমাদের অন্য একটা চাকরি পাওয়া ভালো।” তাই আমরা যদি দেখি যে আমাদের ভক্তরা যমদূতদের থেকে বেঁচে গেছে, তাহলে তা খুব ভালো হবে।

একটি পরিবারে সকল ব্যক্তিরা — মা, সন্তানেরা দীক্ষা নিয়েছে, কিন্তু বাবা তিনি এসবের বিরুদ্ধে ছিলেন। ধরা পড়েছিল যে তার ক্যান্সারের চতুর্থ স্তর চলছে। এটি একটি সত্য ঘটনা। তারপর তিনি দেখলেন বড় দাঁত আর লোমশ শরীর নিয়ে দুজন ব্যক্তি তার ঘরের দেওয়াল থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসছে, সে বলল, “না! না! না! না! না! আমি না! আমি না! না!তারপর তারা অদৃশ্য হয়ে গেল। এই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ডাকল, “আমাকে ভগবদ্‌গীতা দাও, তুলসী কন্ঠি দাও, জপমালা দাও।” আমরা এতগুলি বছর ধরে যা করাতে পারিনি, যমদূতেরা এক মিনিট তা করে দেখিয়েছে। এক মিনিটের মধ্যে এসে ভক্ত হয়ে গেল! আমরা সকলকে যমদূতদের হাত থেকে রক্ষা করতে চাই, আমরা চাই সবাই কৃষ্ণভক্তির মধুরতা আস্বাদন করে। যদি তোমরা কৃপা লাভ কর, তাহলে তোমরাও কৃষ্ণ লীলায় অংশ হতে পারবে। চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের পরে এই মনুষ্য জীবন ভাগ্যবান হয়ে উঠেছে। এই হচ্ছে চৈতন্য মহাপ্রভুর বিশেষ কৃপা।  

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 9/9/23
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions