Text Size

২০২১০৭৩১ শ্রীমদ্ভাগবতম্‌ ১,১০,৪

31 Jul 2021|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

নিম্নলিখিত ক্লাসটি শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ২০২১ সালের ৩১শে জুলাই ভারতবর্ষের শ্রীধাম মায়াপুরে দিয়েছিলেন। এই ক্লাসটি শ্রীমদ্ভাগবতমের ১.১০.৪ শ্লোক পাঠের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।

সর্বোষধি-হরিনাম সংকীর্তন

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
 যৎ কৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
 পরমানন্দমাধবম্ শ্রীচৈতন্য ঈশ্বরম্
 হরি ওঁ তৎ সৎ

ঔঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়!
ঔঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়!
ঔঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়!

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: আজ আমরা শ্রীমদ্ভাগবতম থেকে পাঠ করছি। আমরা ভীষ্মদেবের কাহিনী সম্বন্ধে পাঠ করছি। যুধিষ্ঠির মহারাজ যখন সম্রাট ছিলেন সেই সময়ের পৃথিবীর পরিস্থিতির সম্বন্ধে এখন আমরা শ্রবণ করছি। বৃষ্টি যথাযথভাবে হোত, খাদ্যশষ্যের যথেষ্ট উৎপাদন হোত। গাভীদের দুগ্ধথলি এতো পূর্ণ থাকত যে জমি সিদ্ধ হোত। সুতরাং পৃথিবীর পরিস্থিতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং অত্যন্ত সুন্দর ছিল।বর্তমানে পৃথিবীর পরিস্থিতি এমন যে কোথাও বণ্যা আর কোথাও খরা। ভূমিকম্প, আগ্রেয়গিরি হোল অন্যান্য সমস্যা। এখন ভগবৎচেতনা বিষয়ে মানুষের চেতনা অত্যন্ত অল্প। যেমন কোভিড-১৯ মহামারী চলছে। পূর্বে আলফা ছিল এখন সেখানে ডেল্টা। ভবিষ্যতে কি হবে তার ভবিষ্যৎবাণী আমরা করতে পারিনা।

কলিযুগে মানুষ হরিনাম করতে পারে। হরিনাম, ভগবানের দিব্যনামের সামূহিক জপ একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, যে যদি একজন হরে কৃষ্ণ জপ করেন সেটি ভালো, কিন্তু যদি কেউ ভগবানের অন্য নাম জপ করে তাও ভালো। যেভাবেই হোক আমাদের এখন মানুষকে দিব্য নাম জপ করাতে হবে। শ্রীল প্রভুপাদ বলেন যে ১৯০০ শতকে কলকাতায় প্লেগ হয়েছিল। একজন বাবাজী যিনি প্রত্যেককে একত্রে দিব্যনাম জপ করিয়ে কলকাতাকে রক্ষা করেছিলেন। স্বাস্থ্যের জন্য জপ করা একটি জাগতিক উদ্দেশ্য, সেটি নামের প্রতি অপরাধ, কিন্তু শাস্ত্রে কথিত আছে যে জড়বাদীদের জন্য যদি তারা অপরাধেও ভগবানের নাম জপ করে তাও একেবারে জপ না করার থেকে ভালো। আমরা জপ করতে পারি একথা বলে যে, যদি ভগবান প্রসন্ন হন। জড়বাদীরাও জপ করতে পারে। যেভাবেই হোক আমাদের মানুষকে জপ করাতে হবে সেটি সমগ্র পৃথিবীর পক্ষে মঙ্গলময় হবে। ইউরোপে তারা ২০৫০ সাল পর্যন্ত কার্বন নির্গমন বন্ধ করতে চায় না। কিন্তু তারা অনেক প্রাণী হত্যা করছে। তার ফলে অনেক রোগ এবং সমস্যা হচ্ছে। সেইজন্য আমরা চাই পৃথিবী ভগবৎ চেতনাময় হয়ে উঠুক। অতএব আমরা যদি সমগ্র পরিস্থিতিকে রক্ষা করতে চাই তাহলে আমাদের প্রত্যেককে কৃষ্ণভাবনাময় করে তুলতে হবে। সেই জন্য আমাদের প্রত্যেককে দিব্যনাম জপ করাতে হবে। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রদত্ত এই মহামন্ত্র সমগ্র পৃথিবীকে উদ্ধার করতে পারে। সুতরাং ভগবানের নাম এই মহামন্ত্র জপ করে একটি অধিকতর বিশুদ্ধ জীবন যাপন কর্রা উচিত। সেই কারণে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন আমাদের দশ হাজার একশ হাজার, মিলিয়ন আধ্যাত্মিক গুরু প্রয়োজন। অতএব আমরা আশা করি যে সবাই শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করবেন। এইভাবে ভবিষ্যতের আধ্যাত্মিক গুরুরূপে যোগ্যতা অর্জন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন প্রচার করবেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম, সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম। ( চৈ.চ অন্ত্য ৪,১২৬) শ্রীচৈতন্যদেব ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে পৃথিবীর প্রতি নগরাদি গ্রামে, এই দিব্য নামের সামূহিক জপ হবে। অতএব এই পরিপ্রেক্ষিতে, শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছেন যে প্রত্যেকে গুরু হবে। পূর্বে নিয়ম ছিল এক আশ্রম, এক গুরু।কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদের পরিকল্পনা ছিল যে লক্ষ গুরু থাকা প্রয়োজন। সুতরাং তার কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দৃষ্টিভঙ্গী ছিল।

অতএব এইভাবে যুধিষ্ঠির মহারাজের রাজত্বে সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী পবিত্রতা ছিল। যদি আমরা কৃষ্ণভাবণামৃত প্রচার করি তা হলে একই পরিস্থিতি তৈরী করতে পারব। সুতরাং আমাদের খাদ্যশস্য, দুগ্ধ এবং বস্ত্র ও অনুরূপ জিনিষ প্রয়োজন। বর্তমানে তাদের চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহ, অবৈধ যৌনসঙ্গ, বেশ্যালয় এবং মাংসাশী হোটেল আছে। যুক্তরাজ্যে তারা নিষেধ তুলে দিয়েছে। আমি এই খবর দেখে বিস্মিত যে কিভাবে নৈশক্লাবগুলিতে বৃদ্ধ লোকের সমাগম হচ্ছে। আমাদের ভক্ত প্রয়োজন যারা অধিক বিশুদ্ধ জীবন শৈলী উপস্থাপণ করবে।

সুতরাং বর্তমানে পৃথিবীর পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ। যখন আমরা হত্যা করি, আমরা একসময়ে একটি করি, পরে একটার পর আরেকটা। কিন্তু যখন শ্রীকৃষ্ণ নিধন করেন, তিনি লাখে লাখে নিধন করেন, গণনিধন। সেইজন্য তারা ঘোষণা করেছিল যে মহামারীকে পরাজিত করা গেছে। এখন তারা বলছে যে ডেল্টা প্রজাতি এসেছে এবং এটি একটি নতুন সমস্যা। এমন কি অস্ট্রেলিয়া, যা আগে মুক্ত ছিল, তারাও এই মহামারীর কবলে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় এটি একটি ভয়ানক সমস্যা। যাই হোক, আমরা যদি মানুষকে দিব্য নাম জপ করাতে পারি, তা একটি নতুন পরিবর্তন আনয়ন করবে। শ্রীল প্রভুপাদকে কেউ বলেছিলেন, আমি একজন খ্রীষ্টান, শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, আচ্ছা আমাদেরও যীশু খ্রীষ্টের প্রতি অসীম বিশ্বাস আছে। “কিন্তু আপনি কি মাংস খান?” শ্রীল প্রভুপাদ তাকে জিজ্ঞাসা করেন। “হ্যা, আমি খাই।”  “তাহলে আপনি খ্রীষ্টান নন,” শ্রীল প্রভুপাদ বলেন! টেন কমাণ্ডমেন্টে বলা হয়েছে যে দাউ শ্যাল নট কিল। কিন্তু আপনি প্রাণী হত্যা করছেন। সুতরাং আপনি খ্রীষ্টান নন। শ্রীল প্রভুপাদ একজন অত্যন্ত শক্তিশালী প্রচারক ছিলেন।

যুধিষ্টির মহারাজার কালে সেখানে কোন স্লটার হাউস ছিল না। এবং আধুনিক সমাজে স্লটার হাউস, সিনেমা হল, এই সব বস্তু। এই কি উন্নতি? বর্তমানে মানুষ পশুরও অধম জীবন যাপন করছে। আমি দেখি যে ভক্তরা, গৃহস্থগণ তাদের গৃহে বহু বিগ্রহ রাখেন। তারা ভোগ নিবেদন করে প্রসাদম পায়। তারা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুখী। গৃহস্থ জীবনে সম্পর্ক রাখা পাপকর্ম নয়। অবশ্য যদি সন্তানলাভের উদ্দেশ্যে হয় তাহলে সেটি ভক্তিমূলক সেবা। কিন্তু মানুষ বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কে থাকলে সেটি পাপ।

সুতরাং চৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি দেখালেন যে হরিনাম সংকীর্তনে আমরা সর্বোচ্চ আনন্দ লাভ করতে পারি। কখনও কখনও তিনি উচ্ছ্বাসে থাকতেন, তিনি ছয় ঘন্টা হাসতেন। উচ্চৈস্বরে হাসতেন। তিনি  ক্রন্দন করতেন, তাঁর রোম খাঁড়া হয়ে যেত। মানুষ তাঁকে দেখতে আসতেন এবং একবার তারা এলে আর যেতে চাইত না। দবীর খাস, যিনি ছিলেন রূপ গোস্বামী তিনি নবাব হুসেন শাহের কাজে কাজ করতেন যিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন চৈতন্য কে? তারা বলে যে আপনি একজন রাজা, আপনি ভগবানের একজন প্রতিনিধি, তাঁর সম্বন্ধে আপনি কি ভাবেন? তিনি বললেন যে যাকে কৃষ্ণ বলেন এবং আমরা আল্লা বলি তিনি সেই একই। এবং তিনি বললেন, কেন মানুষ আমার সেবা করবে? আমার সৈন্য, আমার সেনাপতি, আমার মন্ত্রী। তারা বলছে আপনি নবাব, আপনি মহারাজা। যদি আমি তাদের ছয়মাস বেতন না দিই তারা আমাকে ছুড়ে ফেলবে। উপহার না দিলে আমার রানীরাও আমার সাথে থাকবে না। প্রত্যেকে শ্রীচৈতন্যের কাছে আসে কিন্তু তিনি তাদের কোন আর্থিক লাভ দেন না। সুতরাং আমি ভাবি যে আল্লা বা কৃষ্ণ না হলে এটি সম্ভব নয়। আমার রাজ্যে, আমার নির্দেশ পালিত হয়। কিন্তু তাঁর নির্দেশ সর্বত্র পালিত হয়। গৌরাঙ্গ। গৌ……রাঙ্গ! সুতরাং আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই যে জগতে প্রত্যেকে শ্রীচৈতন্যকে অনুসরণ করে। এইভাবে, তারা ভগবানের নাম কীর্তন করবে এবং সুখী হবে। এইভাবে তারা তমোগুণে কিছু চাইবে না। সুতরাং আমাদের সমগ্র পৃথিবী কৃষ্ণ ভাবনামৃতে ভাসিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দিবা-রাত্র নৃত্য কীর্তন করতেন। সেইজন্য কিছু মানুষ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন এবং তারা ভাবলেন হয়তো হুসেন শাহ মন পরিবর্তন করতে পারেন, তার থেকে ভালো শ্রীচৈতন্যদেব অন্য কোথাও চলে যান। তারা এক ব্রাহ্মণকে দিয়ে শ্রীচৈতন্যদেবকে বলতে বললেন।  কিন্তু শ্রীচৈতন্যদেব নিরন্তর এমনভাবে সংকীর্তন করছেন যে তিনি কারো সাথে কথা বলার সুযোগ পেলেন না। ঘন্টার পর ঘন্টা ব্রাহ্মণ অপেক্ষা করলেন কিন্তু তিনি শ্রীচৈতন্যদেবের সাথে কথা বলার কোন সুযোগ পেরেন না। তারপর তিনি রামকেলীর মানুষ যারা শ্রীচৈতন্যদেবের সাথে কীর্তন করছিলেন তাদের বললেন বিপদ হতে পারে, শ্রীচৈতন্যদেবের স্থানত্যাগ করা উচিত। সুতরাং ক্রমে কীর্তন প্রভাবিত হোল। শ্রীচৈতন্যদেব থামলেন, তিনি বললেন, কোন ভয় নেই! আমি কোথাও যাচ্ছি না। পুনরায় তিনি সকল ভক্তদের সাথে সংকীর্তন শুরু করলেন।

যাই হোক, শ্রীল প্রভুপাদ বর্ণনা করছেন যুধিষ্ঠির মহারাজার অধীনে শাসনের রীতি কি ছিল। আমরা সেই রীতি প্রতিষ্ঠা করার আশা করতে পারিনা। কিন্তু আমরা সমাজকে উন্নত করতে পারি যাতে সমাজ আরও সাত্ত্বিক এবং ভগবৎচেতনাময় হয়। এইভাবে সেখানে অধিক সৎ এবং সাত্ত্বিক মানুষ থাকবেন। যাই হোক এই কলিযুগেই শ্রীচৈতন্যদেব সংকীতৃন আন্দোলন প্রচার করেছেন। আমরা পড়ছি কিভাবে যুধিষ্ঠির মহারাজের সময় এরূপ এক আদর্শ পরিস্থিতি ছিল। বর্তমানে আমরা শুধু আশা করতে পারি যে মানুষ ভগবৎ চেতনাময় হবে। এই সংকীর্তন যজ্ঞে অংশ গ্রহণের জন্যে আমি সকল ভক্তগণকে ধন্যবাদ জানাই। শ্রীচৈতন্যদেবের কৃপায় এই পৃথিবী পরিবর্তিত হতে পারে। সুতরাং আপনারা সবাই অভিলাষ রাখুন যেন আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অভিলাষ এবং ভবিষ্যৎবাণী পূরণ করতে পারি।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by শরণাগতি মাধবী দেবী দাসী 6/1/2026
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions