Text Size

২০২১০৫২৫ নরসিংহ চতুর্দশী উপলক্ষে সন্ধ্যায় প্রদত্ত প্রবচন

25 May 2021|Duration: 01:25:52|Bengali|Others|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
 
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
 
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
 
হরি ওঁ তৎ সৎ

জয়পতাকা স্বামী:- আজ ভগবান নরসিংহদেবের শুভ আবির্ভাব তিথি। আসলে, প্রহ্লাদ মহারাজ, তার প্রার্থনার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথা বলছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতম ৭.৯.৩৮, তিনি বলেছেন :

ইত্থং নৃতির্যগৃষিদেবঝষাবতারৈ-
র্লোকান্‌ বিভাবয়সি হংসি জগৎপ্রতীপান্‌
ধর্মং
মহাপুরুষ পাসি যুগানুবৃত্তং
ছন্নঃ
কলৌ যদভবস্ত্রিযুগোঽথ ত্বম্‌ ।।

হে ভগবান, এইভাবে আগনি নর, পশু, ঋষি, দেবতা, মৎস্য অথবা কৃর্মরূপে অবতরণ করে সমগ্র জগৎ পালন করেন এবং অসুরদের সংহার করেন। হে ভগবান, আপনি যুগ অনুসারে ধর্মকে রক্ষা করেন। কিন্তু কলিযুগে আপনি আপনার ভগবত্তা প্রকাশ করেন না, তাই আপনাকে ত্রিযুগ বলা হয়।

ভগবান যেভাবে মধু-কৈটভের আক্রমণ থেকে ব্রহ্মাকে রক্ষা করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন, ঠিক সেইভাবে তিনি তাঁর পরম ভক্ত প্রহ্লাদ মহারাজকে রক্ষা করার জন্যও আবির্ভূত হয়েছিলেন। ঠিক সেইভাবে, কলিযুগের অধঃপতিত জীবদের রক্ষা করার জন্য ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি, এই চারটি যুগ রয়েছে। কলিযুগ ছাড়া অন্য তিনটি যুগে ভগবান তাঁর ভগবত্তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য অবতরণ করেন, কিন্তু কলিযুগে যদিও তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হন, কিন্ত তিনি তাঁর ভগবত্তা প্রকাশ করেন না। পক্ষান্তরে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভূকে যখন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলে সম্বোধন করা হত, তখন তিনি তাঁর হাত দিয়ে কান ঢেকে সেই কথা অস্বীকার করতেন, কারণ তিনি ভক্তরূপে লীলা করছিলেন। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জানতেন যে কলিযুগে বহু ভণ্ড নিজেদেরকে ভগবান বলে প্রচার করার চেষ্টা করবে, এবং তাই তিনি নিজেকে ভগবান বলে প্রকাশ করেননি। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে স্বয়ং ভগবান, সেই কথা বহু বৈদিক শাস্ত্রে স্বীকৃত হয়েছে, বিশেষ করে শ্রীমদ্ভাগবতমে (১১/৫/৩২)

কৃষ্ণবর্ণং তৃষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্‌
যজ্ঞৈঃ
সঙ্কীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ ।।

কলি যুগে বুদ্ধিমান মানুষেরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপী ভগবানের আরাধনা করবেন, যিনি সর্বদা নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, গদাধর, শ্রীবাস আদি পার্ষদ পরিবৃত হয়ে থাকেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রবর্তিত এই সংকীর্তন যজ্ঞের উপর সমগ্র কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত। তাই যিনি সংকীর্তন আন্দোলনের মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগবানকে জানার চেষ্টা করেন, তিনি সব কিছুই যথাযথভাবে অবগত হন, তিনি সুমেধসঃ অর্থাৎ অত্যন্ত বুদ্ধিমান।

 

জয়পতাকা স্বামী:- এইভাবে ভগবান, তিনি সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর যুগে কে ছিলেন, তা আড়াল করেননি। কিন্তু কলিযুগে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু এক ভক্তরূপে ছিলেন এবং তিনি নিজেকে পরম পুরুষোত্তম ভগবানরূপে প্রকাশিত করেননি। কেবল কয়েকজন ভক্তের কাছেই তিনি তাঁর আসল পরিচয় উন্মোচন করেছিলেন, কিন্তু তিনি তাদেরকে এই সত্য তাদের মধ্যেই রাখতে বলেছিলেন। এবং সাধারণ সকলের সামনে তিনি নিজের অবস্থা প্রকাশ করেননি। তিনি তাঁর ভক্তদের প্রতি অত্যন্ত কৃপাময়, তিনি সেই ব্যক্তির বিনাশ না করে তার মধ্যে থাকা আসুরিক প্রবৃত্তির বিনাশ করেন এবং চৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যলীলা, ৮.৬ এই শ্লোকে এটি বর্ণনা করা হয়েছে :

উগ্রোঽপ্যনুগ্র এবায়ং স্বভক্তানাং নৃকেশরী।
কেশরীব স্বপোতানামন্যেষামুগ্রবিক্রমঃ ৬॥

কেশরী যেমন উগ্রবিক্রম হওয়া সত্ত্বেও স্বীয় সন্তানদের প্রতি শান্ত এবং কোমল, নৃসিংহদেবও তেমনই হিরণ্যকশিপু প্রভৃতি অসুরদের প্রতি উগ্র হলেও প্রহ্লাদ আদি ভক্তের প্রতি অনুগ্র (স্নেহপূর্ণ)।

তাৎপর্য: এই শ্লোকটি শ্রীমদ্ভাগবতের টীকায় (৭/৯/১) শ্রীধর স্বামীপাদ রচনা করেছেন।

জয়পতাকা স্বামী: আমরা দেখি যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অত্যন্ত কৃপালু এবং শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে স্মরণ করিয়েছিলেন যে, এই কলি যুগে তিনি কোন হিংসার অস্ত্র ধারণ করবেন না। অতএব জগাই মাধাই হল তার প্রমাণ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাদের আসুরিক প্রবৃত্তির বিনাশ করেছিলেন এবং তাদের উদ্ধার করেছিলেন।

সাম্প্রতিক একটি লীলা অমোঘের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে কিভাবে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু অমোঘের অপরাধের প্রতি অত্যন্ত সহনশীল ছিলেন। কারণ সে ছিল সার্বভৌম ভট্টাচার্যের সাথে সম্পর্কিত, এই কারণে তিনি তাকে তাঁর কৃপা প্রদান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর প্রিয় ভক্তদের ক্ষেত্রে, এমনকি তাদের চাকর, সহচর; এমনকি কুকুর এরাও তাঁর কাছে প্রিয়। তাহলে নির্ভরশীল আত্মীয়দের সম্পর্কে আর কি বলার আছে? এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রদর্শন করেছিলেন যে তিনি তার ভক্তদের প্রতি কত কৃপাপরায়ণ এবং তিনি অমোঘের হৃদয় পরিবর্তন করেছিলেন। তাকে এক ভক্ত, বৈষ্ণব করে তুলেছিলেন। 

এই কারণে আমাদের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা নেওয়া উচিত। আজকে আমাদেরকে স্মরণ করানো হয়েছে যে ভগবান নরসিংহদেব, তাঁর ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিলেন এবং অসুর হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করেছিলেন। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভক্তদের রক্ষা করেন। কিন্তু অসুরদের হত্যা করার পরিবর্তে, তিনি তাদের মধ্যে থাকা আসুরিক প্রবৃত্তির বিনাশ করেন। এই হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অবতারের বিশেষতা। আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই সংকীর্তন আন্দোলনে থাকতে পেরে অত্যন্ত ভাগ্যবান। আসলে, কলিযুগে মানুষেরা অত্যন্ত পতিত এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা আমাদেরকে আসা প্রদান করে। আসলে তাঁর কৃপা এত মহান যে দেবতারাও প্রার্থনা করেন যাতে তারা এই কলিযুগে জন্ম গ্রহণ করতে পারেন, যাতে তারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হতে পারেন। এই মনুষ্য জীবন অত্যন্ত বিরল এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কদাচিৎ কখনো আবির্ভূত হন। শ্রী কৃষ্ণ ব্রহ্মার একদিনে অবতীর্ণ হন, যা হল ১০০০ চতুর্যুগ এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কেবল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পরে, কখনো কখনো আবির্ভূত হন, প্রতি বার নয়। তাই, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব এর পরে কলিযুগে থাকা এক বিশেষ কৃপা, কারণ একজন অত্যন্ত সহজেই শুদ্ধ ভক্তি প্রাপ্ত হতে পারে।

অতএব, ভগবানের ভক্ত হয়ে আমরা দেখি যে তিনি কিভাবে বিভিন্নভাবে তাঁর ভক্তদের রক্ষা করেন। আসলে সাধারণত ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ তারা সেই সুযোগ পায়, কিন্তু কলিযুগে এমনকি মানুষেরা খুব পতিত হলেও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তিনি তাঁর কৃপা প্রত্যেককে প্রদান করেন। কেবল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় নয়, বৈশ্য, শূদ্র এমনকি যারা শূদ্রের থেকেও নিচ, তারা সকলেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা পেতে পারেন। তাই, এটি আমাদের সকলের জন্য এক মহান সুযোগ। আমাদেরকেও প্রহ্লাদ মহারাজের্ মত হওয়া উচিত। তিনি গোষ্টিয়ানন্দী ছিলেন, তিনি অন্যান্য অসুরদের আসুরিক সন্তানদের প্রচার করতেন এবং তাদেরকে মনুষ্য জীবনের মূল্যবান উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতেন। তারা সকলেও হরে কৃষ্ণ জপ করতো এবং এইভাবে তিনি প্রত্যেকের জীবনকে সার্থক করে তুলেছিলেন। তাই, সেখানকার শিক্ষকেরা হিরণ্যকোশিপুর কাছে যায় এবং অভিযোগ জানায় যে সকলে কৃষ্ণভাবনামৃতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তখন হিরণ্যকোশিপু সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তার সন্তানকে হত্যা করবেন। এটি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ বিষয়। যখন আমরা কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করি, তখন আমরাও হয়তো অনেক বাধার সম্মুখীন হই। কিন্তু যেমন প্রহ্লাদ, তাকে এইসবের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাই এটি সাধারণ যে অসুরেরা কৃষ্ণভাবনামৃতের বিরোধী। কিন্তু মানুষদের মনুষ্য জীবনের আসল উদ্দেশ্য বোঝানোর জন্য আমাদেরকে অত্যন্ত বিনীত এবং ক্ষমাশীল হতে হবে। আসলে, ধর্ম কৃষ্ণ কর্তৃক প্রদান করা হয়েছে। যে কোন পরম্পরা ভিত্তিক ধর্ম, কৃষ্ণ, যিনি পরম পুরুষোত্তম ভগবান, তাঁর প্রতি প্রেম বিকশিত করতে উৎসাহিত করে। এবং তা কিভাবে করা যায়, সেটি অনেকের কাছে রহস্যের। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তিযোগের পন্থার শিক্ষা দিয়েছেন। শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র বিশ্বের কাছে তা প্রচার করেছেন। এইভাবে সমগ্র বিশ্বের মানুষেরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী গ্রহণ করছেন এবং পরম পুরুষোত্তম ভগবানের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত প্রেম প্রাপ্ত হচ্ছেন। হরে কৃষ্ণ!

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions