Text Size

২০২১০৪২৩ শ্রীমদ্ভাগবতম ১.১.২২ (শ্রী ব্যাস-পূজা প্রবচন)

23 Apr 2021|Duration: 00:35:43|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

প্রদত্ত প্রবচনটি শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ২৩ এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারতে প্রদান করেছেন। এই ক্লাস শ্রীমদ্ভাগবতের ১.১.২২ শ্লোক পাঠের মাধ্যমে শুরু হয়েছে।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
 ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায় 

শ্রীমদ্ভাগবতম ১.১.২২ 
ত্বং নঃ সংদর্শিতো ধাত্রা দুস্তরং নিসতিতর্যোতাম।
কলিং সত্তহরং পুংসং কর্ণধার ইবারনবং।।
 

অনুবাদ:- আমরা মানুষের সদ্ গুণ অপহরণকারী কলিকাল-রূপ দুর্লভ সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে ইচ্ছুক। সমুদ্রের পরপারে গমন করতে ইচ্ছুক মানুষের কাছে কর্ণধার সদৃশ আপনাকে বিধাতাই আমাদের কাছে পাঠিয়ে আপনার দর্শন লাভ ঘটিয়েছেন।

তাৎপর্য:- এই কলি যুগ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। মানব জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মজ্ঞান লাভ করা। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর যুগের প্রভাবে মানুষ তার জীবনের এই উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃত হয়েছে। এই যুগে মানুষের আয়ু ক্রমে ক্রমে কমে আসবে। মানুষের স্মৃতি, সূক্ষ্ম অনুভূতি, বল, বীর্য এবং সমস্ত সদ্ গুণ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাবে। এই যুগের ভয়ঙ্কর অবস্থা শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বাদশ স্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং যে সমস্ত মানুষ আত্মজ্ঞান লাভের চেষ্টায় তাদের জীবন সার্থক করতে চান, তাদের পক্ষে এ যুগ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। এই যুগের মানুষ ইন্দ্রিয় তৃপ্তির প্রচেষ্টায় এত ব্যস্ত যে তারা আত্মজ্ঞান লাভের প্রয়োজনীয়তা সম্পূর্ণভাবে বিস্মৃত হয়েছে। উন্মাদের মতো তারা খোলাখুলিভাবে বলে যে, আত্মজ্ঞান লাভের প্রচেষ্টা করার কোন প্রয়োজন নেই; কারণ তারা বুঝতে পারে না যে এই ক্ষণস্থায়ী জীবন হচ্ছে আত্মজ্ঞান লাভের দীর্ঘ যাত্রাপথের স্বল্পক্ষণ মাত্র। আধুনিক যুগের শিক্ষা-ব্যবস্থায় মানুষকে কেবল ইন্দ্রিয় তৃপ্তির শিক্ষাই দেওয়া হয় এবং যে কোনও চিন্তাশিল মানুষ ই যদি একটু চিন্তা করে দেখেন তা হলেই তিনি বুঝতে পারবেন যে এই যুগের শিশুরা কিভাবে ইচ্ছা কৃত ভাবে তথাকথিত শিক্ষার কসাইখানায় বলি হওয়ার জন্য প্রেরিত হচ্ছে। তাই শিক্ষিত মানুষের কর্তব্য হচ্ছে যে এই যুগ সম্মন্ধে সচেতন হওয়া এবং তারা যদি এই কলিযুগ রুপী দূর্লংহ সমুদ্র উত্তির্ন্ন হতে চান, তা হলে অবশ্যই তাদের নৈমিসারন্যের ঋষিদের পদাঙ্ক অনুসরন করে শ্রীল সূত গোস্বামী অথবা তার উপযুক্ত প্রতিনিধিকে তাদের তরুণীর কর্ণধার রূপে গ্রহণ করতে হবে। সেই তরণীটি হচ্ছে ভগবদগীতা অথবা শ্রীমদ্ভাগবত রূপী পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী।

***

জয়পতাকা স্বামী:- আমি ইংরেজিতে বলব। কারণ একই সাথে হিন্দি ও বাংলাতে অনুবাদ করা হচ্ছে। এই শ্লোকে শ্রীল প্রভুপাদ বলছেন যে কিভাবে মানুষেরা ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে মগ্ন। সেই জন্য তারা এই মনুষ্য জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য যে আত্ম উপলব্ধি করা, তা ভুলে গেছে। একবার এক বিবিসি রিপোর্টার এসেছিল এবং মায়াপুরের ছবি তুলছিল, আমি তাকে একটা নৌকায় করে নিয়ে যাচ্ছিলাম ও কোন না কোনভাবে আমি এই আলোচনায় আসি যে কিভাবে মানুষেরা ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে মগ্ন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে এতে কি ভুল আছে? দেখুন, বর্তমান জগতে এটাই চিন্তাভাবনা হয়ে গেছে যে মানুষদের তাদের ইন্দ্রিয় সন্তুষ্ট করতেই হবে, আমরা জানি যে তারা আসলে তাদের ইন্দ্রিয় সেবা করছে, তারা হচ্ছে গোদাস। আমরা তাদেরকে গোস্বামী করতে চাই, তাদের ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রিত করতে চাই, ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রিত হতে দিতে চাই না। 

শ্রীল প্রভুপাদ অত বৃদ্ধ বয়সে পাশ্চাত্যে যাওয়ার মতো এই এত বড় কষ্ট গ্রহণ করেছিলেন, তিনি বৃন্দাবনে থাকতে পারতেন এবং মোক্ষ লাভ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুদেবের আদেশ ও চৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ পরিপূর্ণ হতে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি এই তপস্যা করে পাশ্চাত্যে গিয়েছিলেন এবং তাঁর কাছে কোন অর্থ ছিল না, যা কিছু ছিল তাতে আপনি আমেরিকাতে খুব বেশি কেবল একদিনের খাবার খেতে পারবেন, তার কাছে কোনো সহায়তা ছিল না, তিনি বিদেশে ছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে কৃষ্ণ ছিলেন, তিনি বদ্ধ জীবদের আত্ম উপলব্ধি করতে, কৃষ্ণকে অনুধাবন করতে পথনির্দেশ দিচ্ছিলেন। চৈতন্য মহাপ্রভুর তিনটি নির্দেশ ছিল—"বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, কর কৃষ্ণ শিক্ষা।" হরে কৃষ্ণ জপ করা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা ও সেবা করা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা অধ্যয়ন করা। শিক্ষার মধ্যে ভগবদগীতা হচ্ছে কৃষ্ণ কর্তৃক কথিত এবং শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে কৃষ্ণ সম্পর্কে বলা। তিনি শ্রীমদ্ভাগবত ও ভগবতগীতা যথাযথের জন্য অক্লান্তভাবে কার্য করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে সেই সময় ভগবদগীতার ৪০০টি সংস্করণ আছে, কিন্তু প্রত্যেক সংস্করণে কম-বেশি তাদের নিজেদের মন গড়া ব্যাখ্যা দেওয়া আছে, একটা আরেকটার থেকে ভালো, কিন্তু কোনোটাতেই এটার উল্লেখ ছিল না যে কৃষ্ণ কি নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই জন্য শ্রীল প্রভুপাদ ভগবদগীতা যথাযথ লিখেছিলেন। 

এবং আমার মনে পড়ে যে, আমি দীক্ষা নেওয়ার আগে ১০বার তা পড়েছিলাম। শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন যে তাঁর গ্রন্থ যাতে পড়া হয়। আমি আশা করি সব শিষ্যরা, সব ভক্তরা, শ্রীল প্রভুপাদের সকল অনুসারীরা পড়বে ও তাঁর গ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করবে। তিনি ভবিষ্যতের দান হিসেবে তাঁর গ্রন্থগুলি রেখে গেছেন এবং আমি দেখেছি যে কিভাবে তিনি মধ্যরাত্রে উঠে যেতেন ও সারারাত অনুবাদ করতেন। তারপর সকালে ৫টার সময় হাঁটতে বের হতেন, এরপর ৬টা বা ৭টায় মন্দিরে ফিরে আসতেন। তারপর শ্রীবিগ্রহ পরিক্রমা করার পর শ্রীমদ্ভাগবত প্রবচন দিতেন। তিনি অত্যন্ত নিয়মমাফিক ছিলেন। এবং কমবেশি প্রত্যেকদিন এই একই কার্য পরিকল্পনা থাকত। কখন তিনি চিঠি পড়বেন, কখন তিনি মানুষদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন, কখন তিনি প্রসাদ পাবেন, কখন মালিশ নেবেন, এইসবে তিনি অত্যন্ত নিয়মমাফিক ছিলেন। এইভাবে আমাদের মায়াপুরে তাঁর সঙ্গ লাভের সৌভাগ্য হয়েছিল। আমি আমেরিকা, কানাডা, ক্যালিফোর্নিয়াতেও তাঁর সঙ্গ পেয়েছিলাম। যেভাবে সূত গোস্বামীকে জাহাজের কাপ্তান হিসেবে পেয়ে সাধুরা অনেক আনন্দিত ছিলেন, একইভাবে আমরাও এই কলিযুগে সম্পূর্ণ পথভ্রষ্ট ছিলাম এবং প্রভুপাদ আমাদের জাহাজের কাপ্তান হিসেবে এসেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তুমি কৃষ্ণের সেনাবাহিনীর সৈনিক। তাই আমি গত ৫০ বছর ধরে তা করার চেষ্টা করছি। 

এই শ্লোকে বলা হচ্ছে যে কিভাবে আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুদেব থাকা উচিত, যিনি হচ্ছেন আমাদের জাহাজের কাপ্তান। আমরা দেখি যে কিভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, যাতে তিনি এই সংকীর্তন আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। তিনি হচ্ছেন জাহাজের মূল কাপ্তান। এটি গুরু পরম্পরার মাধ্যমে হস্তান্তরিত হচ্ছে। তাই আমাদের সকলকে নিজেদের জাহাজের কাপ্তান গ্রহণ করতে হবে। বিমানে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স থাকে। যাদেরকে সেই বিমান উড়ে যাচ্ছে তা দেখতে হবে, সেটি একটি স্তরের, আর যারা বাতাসের মধ্যে উড়তে পারে, কিন্তু দেখতে পারে না, তারা তাদের যন্ত্রপাতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। তাদের শরীর হয়তো তাদেরকে বোকা বানাতে পারে এবং তারা অনুভব করতে পারে যে উপরে যাচ্ছে নাকি নিচে, কিন্তু যন্ত্রপাতি অন্য কিছু দেখায়। তাই তাদেরকে যন্ত্রপাতির নির্দেশ মত চলতে হয়। এইভাবে আমাদেরকে নিজেদের আধ্যাত্মিক গুরুদেবের নির্দেশের উপর নির্ভর করতে হবে। তিনি হচ্ছেন আমাদের জাহাজের কাপ্তান। আমরা হয়ত অন্য কিছু অনুভব করতে পারি, কিন্তু তবুও আমাদের গুরু কৃষ্ণের নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। শ্রীল প্রভুপাদ কৃষ্ণের এই সব নির্দেশ আমাদের কাছে ছেড়ে গেছেন এবং আধ্যাত্মিক গুরু তা আমাদের জীবনে প্রয়োগ করেন। এইভাবে আমরা কলির সমুদ্র পার করি। এক অর্থে কলি যুগ খুব বিপজ্জনক। কারণ যদি কারো আধ্যাত্মিক গুরু না থাকে, জাহাজের আধ্যাত্মিক কাপ্তান না থাকে, তাহলে সে ধীরে ধীরে মনুষ্যের ভালো গুণাবলী হারিয়ে ফেলবে, কিন্তু যদি তাদের আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ থাকে, তাহলে তিনি তাদেরকে এই বিপদজনক কলির সমুদ্রের মধ্যে পথ নির্দেশ দিতে পারবেন। আসলে কলিযুগে একটি বিশেষ আশীর্বাদ আছে। কারণ কলিযুগে আমরা তা লাভ করতে পারি, যা আপনি এর আগে করতে পারতেন না। চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রবাহমান। এবং কিছু কিছু মানুষেরা এই ভিক্ষা চায়, প্রার্থনা করে যে তারা যাতে কলিযুগে জন্মগ্রহণ করতে পারে, যাতে তারা হরে কৃষ্ণ জপ করতে পারে, ভক্তিযোগে অনুশীলন করতে পারে। চৈতন্য মহাপ্রভু যখন কীর্তন করতেন, তখন সেই শব্দতরঙ্গ সমগ্র জগতের বাইরে এমনকি আধ্যাত্মিক জগতে পৌঁছে যায়। যখন ইন্দ্র সেই কীর্তন শোনেন, তখন তিনি এবং অন্য দেবতারা নিম্নে তা দেখতে আসেন এবং যখন তারা দেখেন যে চৈতন্য মহাপ্রভু নৃত্য কীর্তন করছেন এবং ক্রন্দন করছেন ও প্রেমের বিভিন্ন ভাব প্রকাশ করছেন, তখন তারা চমৎকৃত হয়েছিলেন। তারা মূর্ছিত হয়েছিলেন এবং যখন আবার তাদের চেতনা ফেরে, তখন তারা মনুষ্য রূপ নিয়ে সেই কীর্তনে প্রবেশ করেছিলেন। হরিবোল! হরিবোল! এইভাবে সমগ্র বিশ্বের মানুষেরা চাঁদ কাজীর কাছে যাওয়ার জন্য চৈতন্য মহাপ্রভুর এই বিশাল কীর্তনে যুক্ত হয়েছিলেন।

মহাপ্রভু যখন জগন্নাথপুরীতে ছিলেন, তিনি জগন্নাথের রথের সামনে কীর্তন করতেন। সেই সময় তিনি রাধারানীর ভাবে ছিলেন এবং তার প্রার্থনা ছিল যেন রাধারানীর কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণের সাথে সাক্ষাৎ এবং তাঁকে বৃন্দাবনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। রথযাত্রা হচ্ছে কৃষ্ণ দ্বারকা ছেড়ে বৃন্দাবনে ফিরে যাচ্ছেন। এই কারণে আমরা জগন্নাথের কাছে কীর্তন করি যে — নীলাচলচন্দ্র আমার প্রভু জগন্নাথ। এই নীলাচল হচ্ছে দ্বারকা এবং গুণ্ডিচা হচ্ছে বৃন্দাবন। সেই জন্য তারা গুণ্ডিচাকে বলে সুন্দরাচল। সুন্দরাচল চন্দ্র প্রভু আমার জগন্নাথ! জয় জগন্নাথ! সুন্দরাচল চন্দ্র প্রভু আমার জগন্নাথ! বৃন্দাবনের ভগবান, সুন্দরাচলের ভগবান নীলাচল থেকে সুন্দরাচল যাচ্ছেন। দ্বারকা থেকে বৃন্দাবন যাচ্ছেন। কৃষ্ণলীলার এই মহা আনন্দময় ভাব এমন ছিল যা চৈতন্য মহাপ্রভু প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করছিলেন এবং এটা বদ্ধ জীবেরা যারা পরমেশ্বর ভগবানকে জানে না, তাদের কাছে এটা এক দুর্লভ বিষয়। চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় আমরাও তাঁর অত্যন্ত গুহ্য লীলায় প্রবেশ করতে পারি। এটি আমাদের কাছে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ উদঘাটন করেছেন। তাই তিনি নবদ্বীপ লীলা বা নীলাচল লীলা বা ভারতে পরিভ্রমণ করেন, বিশেষত দক্ষিণ ভারতে। এছাড়াও বৃন্দাবন, দ্বারকা, পান্ডারপুর এই সবগুলিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা আছে। এগুলি অত্যন্ত বিশেষ এবং তা শ্রীল প্রভুপাদ দ্বারা উদঘাটিত হয়েছে এবং সেগুলি চৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বারা কার্য করা হয়েছে। 

যেমন এই কলিযুগে মনুষ্য হিসেবে আমাদের কোন আধ্যাত্মিক অনুরক্তি নেই, তাই আমাদের মনুষ্য গুণাবলী বলে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাবে এবং আমরা পশুর মত হয়ে যাব। সেজন্য সূত গোস্বামী তিনি নৈমিষারণ্যের সব সাধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তারা তাকে তাদের জাহাজের পারমার্থিক পথনির্দেশক হিসেবে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন, তারা তাকে সেখানে আসার জন্য ও পথনির্দেশ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। এই কলিযুগে আমাদের গুরু পরম্পরার কোন প্রতিনিধির শরণ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে আমরাও মনুষ্য জীবনের পূর্ণ সার্থকতা অর্জন করতে পারি।

সকালবেলা মঙ্গল আরতিতে অংশগ্রহণ করার পর আমি বিভিন্ন মন্দির দেখি কিন্তু এইবার আমি কিছু মন্দির দেখলাম, আমি জানিনা যে তারা সবাই অ্যান্ড্রয়েড বা এপেলে জয়পতাকা স্বামী অ্যাপটা ডাউনলোড করেছে নাকি। সেখানে আমি দেখলাম যে জেপিএস ব্যাস পূজা ২০২১-র ভারত থেকে  মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও কানাডা থেকে বিভিন্ন ব্যাস পূজা শ্রদ্ধাঞ্জলি আসছে। আমি এতকিছু শুনতে পারিনি, আমি দেখলাম ও কিছু কিছু শুনেছি। আমার এই সবকিছু শুনতে কিছু সময় লাগবে। 

এইভাবে পাঁচ হাজার বছর আগে যখন নৈমিষারণ্যের সাধুরা সূত গোস্বামীর সাথে কথা বলছিলেন। তারা নৈমিষারণ্যে গিয়েছিলেন, সেই স্থানটি হচ্ছে মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু এবং তারা সেখানে এই কলিযুগের মানুষদের সাহায্য করার জন্য ছিলেন, কিন্তু এখন কলিযুগে আমরা অগ্রশীল হয়েছি, আমাদের কাছে ইন্টারনেট আছে, আসলে অনেক মানুষেরা ইন্টারনেটকে বিভিন্ন ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য ব্যবহার করে, কিন্তু আমরা দেখি যে আমরাও এটিকে কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহার করতে পারি। আমি দেখতে পারছি যে কত ভালো হয়েছে সমগ্র বিশ্বের মানুষেরা অংশগ্রহণ করছে, আমি চিন্তা করছিলাম যে শ্রীল প্রভুপাদের ১২৫তম আবির্ভাব বার্ষিকী উপলক্ষে আমরা বিশেষ কিছু করতে পারি। আর এর পরিকল্পনাটা হচ্ছে যে, তিনি হচ্ছেন আমাদের কাপ্তান, প্রভুপাদ হচ্ছেন আমাদের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য, তিনি হচ্ছেন মূল শিক্ষা গুরু। যেমন নৌবহরে অনেক জাহাজ থাকে, সেখানে প্রধান নৌসেনাপতি থাকে, এবং তিনি পুরো নৌবহরে জাহাজ সমূহকে নির্দেশ দেয়। এবং প্রত্যেক জাহাজে একজন কাপ্তান থাকে, কিন্তু তারা সবাই নৌ সেনাপতিকে অনুসরণ করে। এইভাবে, শ্রীল প্রভুপাদ পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন এবং বিভিন্ন জাহাজ তা অনুসরণ করছে। কোনভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি আমাদেরকে কৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়ার এই সুযোগ দিয়েছেন এবং এইভাবে আমাদের ভক্তিমূলক সেবার ক্ষেত্রে পরিপক্ক হওয়ার প্রতি সতর্ক হওয়া উচিত এবং এই যুগে জাহাজের প্রকৃত কাপ্তান হওয়া উচিত। আসলে ভক্তিযোগ শেখার জন্য এই মনুষ্য জীবন হচ্ছে এক বড় সুযোগ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে প্রত্যেকে শিক্ষা পাচ্ছে, শিশুরা শিক্ষা পাচ্ছে যে কিভাবে দক্ষ ইন্দ্রিয় তৃপ্তিকারী হওয়া যাবে। কিন্তু আসলে এতে কোন আনন্দ নেই, খুবই অল্প আনন্দ। যেই প্রকৃত আনন্দ আমরা খুঁজছি, তা হচ্ছে কৃষ্ণের শুদ্ধ প্রেম লাভ করা। এই জড়জাগতিক জীবন হচ্ছে অন্ধ কূপের মত কারাগৃহের মধ্যে থাকা, কিন্তু কোন না কোনভাবে আমরা মনে করছি যে আমরা হচ্ছি এই জগতে কর্তা, কিন্তু আসলে আমরা আধ্যাত্মিক জগতের, যেখানে কোন জন্ম মৃত্যু জরা ব্যাধি নেই। তাই, আমরা সরাসরি কৃষ্ণের ব্যক্তিগত সেবায় নিযুক্ত হতে পারি এবং শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে আমাদের এই খারাপ বস্তুরও ভালো ব্যবহার করা উচিত। যতক্ষণ আমরা এই জড়জগতে আছি, এই জড়জাগতিক শরীরে আছি, আমরা সেই শরীর কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহার করি এবং এইভাবে আমরা এই খারাপ বস্তুরও সবথেকে ভালো ব্যবহার করতে পারব এবং কৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম লাভ করতে পারব। আমরা ধীরে ধীরে কৃষ্ণের প্রতি আমাদের শুদ্ধ প্রেম জাগরিত করতে পারব। 

যদি স্বামী, স্ত্রী তারা একে অপরকে কৃষ্ণের সেবায় সাহায্য করে, সেটাই হচ্ছে আদর্শ অবস্থা। এইভাবে আমরা কৃষ্ণকে আমাদের জীবনের কেন্দ্রে রাখতে চাই, আমরা চাই শিশুরাও যাতে কৃষ্ণের প্রতি তাদের সুপ্ত প্রেম জাগরিত করে। এইভাবে ভবিষ্যতে আমরা দেখব যে পুরো বিশ্ব ইন্দ্রিয় সেবার পরিবর্তে ভগবত-সেবা ভিত্তিক হয়ে উঠবে। এখন মানুষেরা ধীরে ধীরে কিছু পরোপকারী পরিকল্পনা করছে, তাই এটা আবার ভগবত চেতনায় সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। এখন মানুষেরা বাস্তুসংস্থান দেখতে চায়, এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে চায়, তারা দেখতে চায় যে সব মানুষ, সব লিঙ্গের সব ধরনের ভৌতিক শরীরের সকলকে দেখতে। এই শ্লোকে ভক্তিমূলক সেবার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে—“সর্বোপাধি বিনির্মুক্ত”—সকল জড়জাগতিক পদ থেকে মুক্ত এবং এইভাবে সমগ্র বিশ্ব একত্রিত হতে পারবে। তাই কলির এই সমুদ্র পার হওয়ার জন্য আমাদের জাহাজের একজন যথাযথ কাপ্তান থাকা ও মনুষ্য জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরে কৃষ্ণ!

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 6/FEB/2024
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions