Text Size

২০২১১০২২৫ শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর মহিমা

25 Feb 2021|Bengali|Others|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

নিত্যানন্দ ত্রয়োদশীর বিশেষ প্রবচন

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।
 
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
 
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
 
হরি ওঁ তৎ সৎ

জয়পতাকা স্বামী:- আজকে সকালে আমি গিয়েছিলাম এবং শ্রীমন নিত্যানন্দ ধামের দর্শন করেছি। তারপর আমি ইস্‌কন একচক্র ধাম দেখলাম। শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাব স্থান দেখলাম। আপনারা শুনেছেন যে কিভাবে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু এখানে ছোটবেলায় অভিনয় করতেন এবং আমরা সেই স্থানও দর্শন করেছি। আমরা একচক্র গ্রামের সব স্থানগুলি দর্শন করেছি, আমি প্রায় ১৫ টি মন্দিরে গিয়েছি, যা শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অথবা যেখানে শ্রী বিগ্রহ শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক পূজিত হয়েছিলেন এবং নিতাই গৌরকে দর্শন করেছি। আমি সমগ্র বিশ্বের ইস্‌কনের এত নিতাই গৌর দেখে পারমার্থিক আনন্দে অভিভূত। শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু, তিনি বলরামের থেকে অভিন্ন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য রাধা কৃষ্ণ নাহি অন্য, বলরাম হইল নিতাই। তিনি সমগ্র ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন এবং এইভাবে তিনি বিভিন্ন তীর্থস্থানের পুনর্নবীকরণ করেছিলেন।

তারপর যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর সংকীর্তন লীলা প্রারম্ভ করেছিলেন, তখন তিনি নবদ্বীপে ফিরে আসেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভক্তদের বলেছিলেন যে তিনি একজনকে তাঁর গৃহের বাইরে এক বিশেষ রথে করে বেরিয়ে আসতে দেখেছেন এবং এইভাবে তিনি ডাকছিলেন, “কানাইয়া কোথায়? কানাইয়া কোথায়?” এইভাবে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু নবদ্বীপে আসেন এবং শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু সব ভক্তদেরকে তাঁকে খোঁজার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তাঁকে খুঁজে পায়নি আর চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন, “হ্যাঁ! আপনারা ভগবানকে খুঁজে পাবেন না, তাঁকে নিজেকে আপনাদের সামনে প্রকাশিত করতে হবে। তবে আমি তাকে খুঁজে পাবো!” তারপর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যান এবং শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভুকে নন্দন আচার্যের গৃহে খুঁজে পান, যা হলো আমাদের মন্দিরের পরে অবস্থিত গোস্বামী মঠ। সেখানে তিনি নিত্যানন্দ প্রভুকে দেখেন ও ক্রন্দন করে বলেন, “নিতাই!” নিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে দেখেন ও ক্রন্দন করে বলেন, “গৌর!” এইভাবে তারা দুজনে বলছিলেন গৌর নিতাই, গৌর নিতাই!তারপর তারা একে অপরকে আলিঙ্গন করেন এবং সমগ্র বিশ্ব ভাবেবিভোর হয়ে ওঠে। তারপর তারা সংকীর্তনে বেরিয়ে হন ও একসাথে কীর্তন করতে শুরু করেন। নবদ্বীপের মানুষেরা বলছিলেন, “একই দুজন! কিভাবে হচ্ছে!”

এইভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু প্রেম প্রদর্শন করেছিলেন, কিন্তু শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু কৃপা প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি তাঁর কৃপা বিতরণের জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কর্তৃক আদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি জগাই মাধাইকে উদ্ধার করেছিলেন এবং যদিও মাধাই তাঁকে আঘাত করেছিল এবং রক্ত বের করেছিল, তিনি বললেন, “যেহেতু তুমি আমায় আঘাত করে রক্ত বের করেছ, এর মানে এই নয় যে আমি তোমাকে ভগবত প্রেম প্রদান করব না।” তারপর আবার বলে, “তিনি কোন সাধারণ ব্যক্তি নয়, তুমি তাকে আঘাত করলে, তার রক্ত বের হচ্ছে কিন্তু তিনি তবুও প্রেমের কথা বলছেন।” মাধাই মাথা নিচু করে প্রণাম করেন, এই ভাবে নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপায় জগাই এবং মাধাই উদ্ধার প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি দক্ষিণ ভারতে যান। তবে নিত্যানন্দ প্রভুকে তিনি বাংলায় ফিরিয়ে দেন। তিনি গৃহস্থ আশ্রম পরিত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন, যদি ও শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু ছিলেন ব্রহ্মচারী, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁকে বিবাহ করতে বলেছিলেন। এইভাবে তিনি প্রদর্শন করছিলেন যে ব্রহ্মচারী বা সন্ন্যাসী বা গৃহস্ত আমরা যেকোনো অবস্থায় কৃষ্ণের সেবা করতে পারি। এবং শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর বলেছেন, গোলকের প্রেম ধন হরিনাম সংকীর্তন — এই আনন্দ, এই মহাভাব, এই প্রেম হল গোলকের ধন। কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপায় তা অবাধে আমাদের কাছে বিতরণ করা হচ্ছে। তাই এটি অভাবনীয় যে কিভাবে জীবনের সর্বোচ্চ আনন্দ ভগবান নিতাই কর্তৃক বিতরণ করা হচ্ছে, কিভাবে তিনি নবদ্বীপে নামহট্ট এবং সুরভীকুঞ্জ স্থাপন করেছিলেন। তিনি সূর্য দাস সরখেলের দুই কন্যা, জাহ্নবী এবং বসুধাকে বিবাহ করেছিলেন এবং কিভাবে বসুধার দুই সন্তান ছিল এবং তারা অবিরাম ঠাকুরের প্রণাম সহন করতে পেরেছিলেন। অবিরাম ঠাকুর তার পূর্ব সন্তানদের প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং তারা সকলে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর এই দুইজন সন্তান তারা বেঁচেছিলেন, যারা হলেন ক্ষীরদোকশায়ী বিষ্ণুর অবতার বীরচন্দ্র প্রভু এবং গঙ্গা মাই, যিনি গঙ্গা মাতা গোস্বামী নামে পরিচিত। গঙ্গা মাতা কিছু প্রসাদ সেবন করছিলেন না, তাই নিত্যানন্দ প্রভু জাহ্নবা দেবীকে তাকে দীক্ষা প্রদান করতে বলেন। এরপর জাহ্নবা তাকে দীক্ষা প্রদান করেন ও তারপর তিনি প্রসাদ পাওয়া শুরু করেছিলেন। এইভাবে পানিহাটিতে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর কৃপা প্রদান করেছিলেন, এখানে চিড়া দধি মহোৎসব হয়েছিল, তিনি সেখানে যান ও শ্যাম সুন্দরের বিভিন্ন শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, একটি খুব ছোট আরেকটি খুব বড়। তবে তারা ডানদিকে শ্যামসুন্দরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং অন্য দুইজন এখনো সেখানে রয়েছেন। কিন্তু তারা ভিন্ন স্থানে রয়েছেন।

এইভাবে অনুসরণ করে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদেশে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু সমগ্র বাংলায় কৃপা বিতরণ করেছিলেন এবং তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন, হরিনাম সংকীর্তন করেছিলেন, মানুষেরা অভিভূত হয়েছিলেন। এবং তারাও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে অনুসরণ করা শুরু করেন। এইভাবে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু বাজার প্লাবিত করেছিলেন এবং বাংলার মানুষেরা চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুসারী হয়ে ওঠেন।

আজকে হল শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভুর আবির্ভাব তিথি। আমরা কত কৃপা পাচ্ছি, সব কৃপা শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর মাধ্যমে, তিনি হলেন আদি আধ্যাত্মিক গুরু এবং সকল আধ্যাত্মিক গুরু বর্গ হলেন তাঁর প্রতিনিধি। তাই আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ এবং আমাদের প্রণতি নিবেদন করি। নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপায় আমরা গুরুর কৃপা প্রাপ্ত হই, তাঁর কৃপার মাধ্যমে আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হই, তাঁর কৃপা ছাড়া আমরা রাধামাধবকে পাবো না কিন্তু তিনি এই কৃপা অবাধে বিতরণ করছেন, কে যোগ্য কে অযোগ্য এই বিচার ছাড়াই। তাই আমাদের শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর শ্রী চরণপদ্মের ধুলি নিজেদের মস্তকে ধারণ করা উচিত।

আমি নিতাই গৌরের বিভিন্ন শ্রী বিগ্রহ দর্শন করার চেষ্টা করছিলাম এবং কিছু কিছু স্থানে তাঁরা দৃশ্যমান, কিছু স্থানে তাদের দর্শন পাওয়া কঠিন। মানুষেরা উপলব্ধি করতে পারে না যে, নিতাই গৌরের কৃপার মাধ্যমে আমরা রাধাকৃষ্ণের কৃপা পাই। তারা নিতাই গৌর শ্রীগ্রহ দেখায় না, আসলে তাঁদের কৃপায় সবকিছু সম্ভব। অতএব, আমরা এই তত্ব প্রচার করতে পারি যে কিভাবে প্রত্যেকে সুখের পিছনে ছুটছে কিন্তু এটি হল সবথেকে সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ। হয়তো কেউ শারীরিক সুখের প্রতি আসক্ত, তাই তারা অগ্রগতি প্রাপ্ত হয় না। এটি হয়তো তাদের মনের বদ্ধমূল ধারণা, কিন্তু ধীরে ধীরে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপায় তারা উপলব্ধি করবে যে কিভাবে এই জড়জাগতিক আনন্দ, ইন্দ্রিয় তৃপ্তি খুব খুব তুচ্ছ।

সাধারণত কেউ এই সুযোগ পায় না, পূর্ববর্তী যুগে তারা বিভিন্ন যোগ অনুশীলন করতেন, কৃষ্ণ প্রেম প্রাপ্ত হওয়া এত সহজ ছিল না। নিতাই গৌরের কৃপায় কলিযুগে আমরা সেই প্রেম পাচ্ছি, যা অন্য কোনভাবে পাওয়া অসম্ভব এবং আমরা শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে বারংবার প্রনতি নিবেদন করি। আমরা ধারণা করতে পারিনা যে তাঁরা কত কৃপাময়। আটলান্টা ইস্‌কনে শ্রীল প্রভুপাদ কীর্তন করতে শুরু করেছিলেন: “পরম করুণা পঁহু দুই জনা নিতাই গৌরচন্দ্র” তিনি রীতিমতো ক্রন্দন করছিলেন এবং তিনি বলছিলেন যে নিতাই গৌর কত কৃপাময়! আমাদেরকে প্রত্যেককে কৃষ্ণ প্রেম প্রদানের এই যে মহান সুযোগ প্রদান করা হচ্ছে সেটির  সদ্ব্যবহার করা উচিত।

শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু হলেন বিশেষত কৃপা অবতার, তিনি কে যোগ্য কে অযোগ্য এই বিচার ছাড়াই তাঁর কৃপা প্রদান করেন। তিনি প্রত্যেককে তা প্রদান করেন, তাই শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু অত্যন্ত কৃপাময় এবং তিনি মানুষদের কীর্তনে যুক্ত করেন, এখন সমগ্র বিশ্বে আমাদের ভক্তরা কীর্তন এবং নৃত্য করে। আমাদের বোঝা উচিত যে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু কত কৃপাময় এবং এই উপহার কত বিরল! এটি হল আমাদের নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হওয়ার মহান সুযোগ। 

তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর যাওয়ার পর নবদ্বীপে এসেছিলেন এবং সেখানে সংকীর্তন আন্দোলনের মাধ্যমে প্রচার অব্যাহত রেখেছিলেন। এইভাবে সমগ্র বাংলা প্লাবিত হয়েছিল, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন অদ্বৈত গোঁসাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, “কি খবর” তখন অদ্বৈত গোঁসাই বলেছিলেন, “বাজার প্লাবিত হয়েছে!” এত প্রচার যে তা যেন প্লাবিত হয়েছে। এটি এমন যে আপনি যদি বাজারে এমন কিছু দেখেন, যেটির তত সরবরাহ নেই। সেই পরিস্থিতিতে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু এই হরিনাম বিতরণ করেছিলেন এবং সব মানুষেরা তা গ্রহণ করেছিলেন ও এইভাবে সেই পুরো বাজার প্লাবিত হয়েছিল।

এইভাবে, কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং তা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন আমাদেরকে দেখতে হবে যে সেই কৃপা যাতে প্রত্যেকের কাছে পৌঁছায়। মানুষেরা তারা জানে না যে তারা যদি নিতাই গৌরের কৃপা প্রাপ্ত হয়, তাহলে তারা কত খুশি হবে এবং তারা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করবে এবং শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হবে। এই কারণে অন্যান্য গ্রহের মানুষেরা কলিযুগের এই সময়ে এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে চায়, যাতে তারা হরিনাম সংকীর্তনের অংশ হতে পারে এবং এটি নিত্যানন্দ প্রভুর বিশেষ কৃপা। বিভিন্ন মন্দিরের নিতাই গৌরের শ্রী বিগ্রহ দর্শন করছি, আমি কেবল ১৮-২০ মন্দিরে গেছি, কিন্তু আমি অভিভূত হয়েছিলাম যে শ্রীল প্রভুপাদ তিনি ১০৮টি মন্দির স্থাপন করেছিলেন এবং এখন আমাদের প্রায় ৮০০ মন্দির রয়েছে। তবে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে আমাদের ১০০০০ মন্দির গড়তে হবে। সমস্ত গৌরব নিতাইয়ের! নিতাই গৌর হরিবোল!

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions