প্রদত্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ২৭ জুন, ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের মধ্যলীলা ৭.৮৭ - ১০৯ শ্লোক পাঠের মাধ্যমে, ইংল্যান্ডের নামহট্ট রামফর্ডে দিয়েছেন।
বন্দেহহং শ্রীগুরোঃ শ্রীযুতপদকমলং শ্রীগুরু বৈষ্ণবাংশ চ
শ্রীরুপং সাগ্রজাতং সহগণ রঘুনাথম্বিতং তং সজীবম্।।
সদ্বৈতং সাবধৃতং পরিজন সহিতং কৃষ্ণ চৈতন্যদেবং।
শ্রীরাধাকৃষ্ণপাদান সহগণ ললিতা্ শ্রীবিশাখাণ্বিতংশ্চ।।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এবং তাদের আর সঙ্গ লাভ হবে না, সেইজন্য একদিন নিত্যানন্দ প্রভু এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু উভয়ই জগন্নাথপুরীতে উপস্থিত ছিলেন এবং তাই দুই প্রভুর ভোজনের জন্য প্রসাদ আনা হয়েছিল ও উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে সেই উচ্ছিষ্ট প্রসাদ বিতরণ করা হয়েছিল।
শ্লোক ৮৭
শুনি’ শুনি’ লোক-সব আসি’ বহির্দ্বারে।
‘হরি’ ‘হরি’ বলি' লোক কোলাহল করে।।
লোকমুখে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথা শুনে বহুলোক বহির্দ্বারে সমবেত হল, এবং ‘হরি’ ‘হরি’ বলে কোলাহল করতে লাগল।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: তারা কি বলছে? ভক্তগণ: হরি! হরি! শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: হরি! হরি! ভক্তগণ: হরি! হরি! শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: হরি! হরি! ভক্তগণ: হরি! হরি! শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এইভাবে সেখানে এক বিশাল শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল।
শ্লোক ৮৮
তবে মহাপ্রভু দ্বার করাইল মোচন।
আনন্দে আসিয়া লোক পাইল দরশন।।
মধ্যাহ্ন ভোজনের পর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দ্বার খুলে দিতে বললেন। তখন আনন্দে উদ্বেল হয়ে সকলে তাঁর দর্শন লাভ করল।
শ্লোক ৮৯
এইমত সন্ধ্যা পর্যন্ত লোক আসে, যায়।
‘বৈষ্ণব’ হইল লোক, সবে নাচে, গায়।।
এইভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোক যাতায়াত করতে লাগল, এবং তাদের সকলেই বৈষ্ণব-ভক্তে পরিণত হয়ে নৃত্যগীত করতে লাগলেন।
শ্লোক ৯০
এইরূপে সেই ঠাঞি ভক্তগণ-সঙ্গে।
সেই রাত্রি গোঙাইলা কৃষ্ণকথা-রঙ্গে ।। ৯০।।
এইভাবে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভক্তদের সঙ্গে মহা আনন্দে কৃষ্ণকথা আলোচনা করে সেই রাত্রি কাটালেন।
শ্লোক ৯১
প্রাতঃকালে স্নান করি’ করিলা গমন।
ভক্তগণে বিদায় দিলা করি’ আলিঙ্গন।।
পরের দিন সকাল বেলা স্নান করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভক্তদের আলিঙ্গন করে — তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দক্ষিণ-ভারত ভ্রমণে যাত্রা করলেন।
শ্লোক ৯২
মূর্ছিত হঞা সবে ভূমিতে পড়িলা।
তাঁহা-সবা পানে প্রভু ফিরি’ না চাহিলা।।
তখন তারা সকলে মূর্ছিত হয়ে ভূমিতে পড়লেন, কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাদের দিকে ফিরেও তাকালেন না।
শ্লোক ৯৩
বিচ্ছেদে ব্যাকুল প্রভু চলিলা দুঃখী হঞা।
পাছে কৃষ্ণদাস যায় জলপাত্র লঞা।।
বিচ্ছেদে ব্যাকুল হয়ে দুঃখিত অন্তরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এগিয়ে চললেন, আর তাঁর ভৃত্য কৃষ্ণদাস জলপাত্র নিয়ে তাঁর পিছন পিছন চলতে লাগলেন।
শ্লোক ৯৪
ভক্তগণ উপবাসী তাহাই রহিলা।
আর দিনে দুঃখী হঞা নীলাচলে আইলা।।
সেইদিন উপবাসী হয়ে ভক্তরা সেখানেই রইলেন এবং তার পরের দিন দুঃখিত অন্তরে তারা নীলাচলে ফিরে গেলেন।
শ্লোক ৯৫
মত্তসিংহ-প্রায় প্রভু করিলা গমন।
প্রেমাবেশে যায় করি’ নাম-সংকীর্তন।।
মত্তসিংহের মতো মহাপ্রভু চলতে লাগলেন এবং ভগবৎ-প্রেমে আবিষ্ট হয়ে নাম সংকীর্তন করতে লাগলেন।
শ্লোক ৯৬
কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! হে।
কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! হে ।।
কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! রক্ষ মাম্।
কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! পাহি মাম্ ।।
রাম! রাঘব! রাম! রাঘব! রাম! রাঘব! রক্ষ মাম্।
কৃষ্ণ! কেশব! কৃষ্ণ! কেশব! কৃষ্ণ! কেশব! পাহি মাম্ ।।
শব্দার্থ: কৃষ্ণ — হে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ; হে — হে ; রক্ষ — দয়া করে রক্ষা করুন ; মাম — আমাকে ; পাহি — দয়া করে পালন করুন ; রাম — ভগবান রাম ; রাঘব — রাজা রঘুর বংশধর ; কেশব — অসুর কেশীর হন্তা।
মহাপ্রভু পথ চলতে চলতে গাইছিলেন — “হে কৃষ্ণ, দয়া করে আমাকে তুমি রক্ষা কর! আমাকে তুমি পালন কর! হে রাম, হে রাঘব, দয়া করে তুমি আমাকে পালন কর।”
শ্লোক ৯৭
এই শ্লোক পড়ি’ পথে চলিলা গৌরহরি।
লোক দেখি’ পথে কহে, বল ‘হরি’ ‘হরি’।।
এই শ্লোক আবৃত্তি করতে করতে গৌরহরি পথ চলতে লাগলেন, পথে কাউকে দেখলেই বলেন, ‘হরি’ ‘হরি’ বল! (ভক্তরা: হরি! হরি!)
শ্লোক ৯৮
সেই লোক প্রেমমত্ত হঞা বলে ‘হরি’ ‘কৃষ্ণ’।
প্রভুর পাছে সঙ্গে যায় দর্শন-সতৃষ্ণ।।
সেই লোক তখন প্রেমোন্মত্ত হয়ে ‘হরি’ ‘কৃষ্ণ’ বলতে লাগলেন, (ভক্তরা: হরি! হরি!) এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শনের জন্য আকুল হয়ে তাঁর পিছন পিছন চলতে লাগলেন।
শ্লোক ৯৯
কতক্ষণে রহি’ প্রভু তারে আলিঙ্গিয়া।
বিদায় করিল তারে শক্তি সঞ্চারিয়া।।
কিছুক্ষণ পর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাকে আলিঙ্গন করে তার মধ্যে শক্তি সঞ্চার করে তাকে ঘরে ফিরে যেতে নির্দেশ দিতেন।
তাৎপর্য: শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর অমৃতপ্রবাহ ভাষ্যে বিশ্লেষণ করেছেন — “হ্লাদিনী শক্তির সারভাগ ও সম্বিৎ শক্তির সারভাগ, দুই একত্রে ‘ভক্তিশক্তি’ হয়।” কৃষ্ণ বা ভক্ত কৃপা করে সেই শক্তি যাকে সঞ্চার করেন, তিনি ‘পরম ভক্ত’ হন। মহাপ্রভু যাকে কৃপা করতেন, তার মধ্যে সেই শক্তি সঞ্চার করে তাকে বৈষ্ণব-ধর্ম প্রচারের ভার অর্পণ করতেন।
শ্লোক ১০০
সেইজন নিজ-গ্রামে করিয়া গমন।
‘কৃষ্ণ’ বলি’ হাসে, কান্দে, নাচে অনুক্ষণ।।
সেই ব্যক্তি তখন তার গ্রামে ফিরে গিয়ে সর্বক্ষণ কৃষ্ণনাম কীর্তন করে কখনও হাসতেন, কখনও কাঁদতেন এবং কখনও নৃত্য করতেন।
শ্লোক ১০১
যারে দেখে, তারে কহে, কহ কৃষ্ণনাম।
এইমত ‘বৈষ্ণব’ কৈল সব নিজ-গ্রাম।।
যাকেই তারা দেখতেন, তাকেই তারা বলতেন, — “কৃষ্ণনাম কীর্তন কর।” এইভাবে তারা সকলে তাদের নিজেদের গ্রামের সমস্ত অধিবাসীদের বৈষ্ণবে পরিণত করলেন।
তাৎপর্য: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপার প্রভাবে এবং তাঁর ভক্ত শ্রীগুরুদেবের কৃপার প্রভাবেই কেবল শক্ত্যাবিষ্ট প্রচারক হওয়া যায়। সকলকেই ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করতে অনুরোধ করা উচিত। এমনি করে, কিভাবে ভগবানের শুদ্ধভক্ত হতে হয় তা তাদের দেখিয়ে, তাদের বৈষ্ণবে পরিণত করতে হয়।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন প্রসারিত হয়েছে। প্রথমে তা ছিল গোষ্ঠীর আন্দোলন, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ব্যক্তিগতভাবে কোন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি কেবল মানুষদের ‘হরি’ ‘হরি’ কীর্তন করতে অনুরোধ করেছিলেন।
ভক্তগণ: হরি! হরি! হরে কৃষ্ণ! হরে কৃষ্ণ!
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: সেই ব্যক্তিরা কৃষ্ণ প্রেমে আবিষ্টচিত্ত হয়ে উঠতেন এবং তারপর তারা ফিরে গিয়ে তাদের পরিবার, তাদের বন্ধু-বান্ধব এবং তাদের প্রতিবেশীদের কাছেও কীর্তন করতেন। সমগ্র গ্রাম কীর্তন করতেন এবং এইভাবে সংকীর্তন আন্দোলন ছড়িয়েছিল। এটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় যে কিভাবে দক্ষিণ ভারতে একটা গ্রাম ছিল এবং সেই গ্রামে তারা বলছিলেন:
জয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ।।
(ভক্তরাও মহামন্ত্র উচ্চারণে যোগ দিলেন)
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
তারা যতদূর স্মরণ করতে পারছিলেন, তা বলছিলেন। তা ১০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। এবং যখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হল যে ওনারা এটা কোথা থেকে শিখেছেন, তখন ওনারা তা মনে করতে পারছিলেন না। কেউ একজন তাদের পূর্বপুরুষকে শিখিয়েছিলেন এবং সেই সময় থেকে তারা এই মন্ত্র বলে আসছে এবং তারা কখনও তা বলা থামায়নি। এইভাবে কিছু প্রত্যন্ত গ্রাম আছে যেখানে চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী পৌঁছেছিল এবং সেখানে ব্যক্তিরা নাম কীর্তন করা শুরু করেছিলেন ও তারা আজও পর্যন্ত নামকীর্তন করে চলেছেন। হয়ত সেখানে কোন পথ নেই বা কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই, কেউই জানে না, কিন্তু আমরা এইরকম কিছু গ্রাম খুঁজে পেয়েছিলাম যেখানে ৫০০০ বছর ধরে তারা এখনও হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করে চলেছেন। এবং তাদের মধ্যে কিছুজনের চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দিরও ছিল। যদিও সাধারণত দক্ষিণ ভারতে চৈতন্য মহাপ্রভুর পূজা হয় না, তিনি কেবল সেখানে ছ’বছর ছিলেন কিন্তু তিনি সেখানে এক বড় প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এটাই হচ্ছে সাধারণ পন্থা : কীভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত বিস্তার করা যাবে। নিত্য শক্তি এবং আনন্দ শক্তি লাভ করার জন্য আমাদের চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা দরকার। যদি আমাদের দিব্য আনন্দ থাকে, যদি আমাদের নিত্য উপলব্ধি থাকে, তাহলে আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় কৃষ্ণভাবনামৃত বিস্তার করতে পারব। ঠিক যেমন আজ আপনারা সবাই রমফোর্ড অনুষ্ঠানে নাম কীর্তন করছেন, যে সমস্ত মানুষেরা তা দেখছে তাদের উপর এর এক বিশাল আধ্যাত্মিক প্রভাব পড়বে। এইভাবেই মানুষেরা কোন না কোন ভাবে হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করে। এমনকি প্রথমে হয়ত কখনো কখনো মানুষেরা হাসে বা নিন্দা করে বা অন্য কোনভাবে এটাকে ভাবে, কিন্তু একবার যখন তারা আসলে হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করা শুরু করে, তখন তারা দেখে যে এটা কত সুন্দর, ভক্তরা কত ভালো এবং তখন তাদের ধারণা বদলে যায়। চৈতন্য চরিতামৃতে একটি শ্লোক আছে, যেখানে বলা হয়েছে, যেসব মানুষেরা নিন্দা বা অভিযোগ করত, পরে তারা তাদের মন্ত্র পরিবর্তন করে বলত “ভালো! ভালো!” কখনও কখনও মানুষেরা নাম গ্রহণ করার ক্ষেত্রে খুবই মায়া আবৃত হয়, কিন্তু যখন তারা ধীরে ধীরে কিছু প্রসাদ পায় ও শ্রবণ করে, তখন কিছু সময় পর তারা হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করার অধিক সৌভাগ্যবান হয়। এইভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি একাকী ভ্রমণ করছিলেন, তিনি অবিরত ভ্রমণ করছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে কিভাবে সংকীর্তন আন্দোলন প্রসারিত হচ্ছিল।
শ্লোক ১০২
গ্রামান্তর হৈতে দেখিতে আইল যত জন।
তাঁর দর্শন-কৃপায় হয় তাঁর সম।।
গ্রামান্তর থেকে যারা এই শক্ত্যাবিষ্ট প্রচারককে দর্শন করতে আসতেন, তারাও তাঁর দর্শনের কৃপায় তাঁরই মতো বৈষ্ণবে পরিণত হতেন।
শ্লোক ১০৩
সেই যাই’ গ্রামের লোক বৈষ্ণব করয়।
অন্যগ্রামী আসি’ তাঁরে দেখি’ বৈষ্ণব হয়।।
তারা যখন তাদের গ্রামে ফিরে যেতেন, তখন তারা সেই গ্রামের অধিবাসীদের ভগবদ্ভক্ত-বৈষ্ণবে পরিণত করতেন। আর অন্য গ্রামের লোকেরা যখন তাদের দেখতে আসতেন, তখন তারাও বৈষ্ণবে পরিণত হতেন।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এখানে এটি হচ্ছে যেন একই প্রভাববিস্তারকারী পরিস্থিতি। কেউ একজন চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করেছেন, তিনি কৃষ্ণের প্রতি উন্মাদ হয়ে গেছেন এবং হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করছেন, হাসছেন, নৃত্য করছেন, ক্রন্দন করছেন, কীর্তন করছেন, আর তারপর আবার অন্য কেউ তাকে দেখেছেন, তখন তিনি তার বাসস্থানে ফিরে আসলে সেখানকার গ্রামের বা শহরের মানুষেরাও নাম কীর্তন করতে শুরু করেছেন এবং তারপর পাশের শহর বা গ্রামের মানুষেরা তাদেরকে দেখেছেন ও তাদের থেকে শিখে নিয়ে তারাও নাম কীর্তন করতে শুরু করেছেন। তারপর অন্য একজন কেউ তার নিজের স্থানে ফিরে গেলে, সেখানেও তারা নাম কীর্তন করতে শুরু করেছেন, এইভাবে ধীরে ধীরে তা প্রসারিত হতে শুরু করেছিল।
শ্লোক ১০৪
সেই যাই’ আর গ্রামে করে উপদেশ।
এইমত ‘বৈষ্ণব’ হৈল সব দক্ষিণ-দেশ।।
এইভাবে যখন তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষ্ণকথা উপদেশ করতে লাগলেন, তখন সমস্ত দক্ষিণ ভারতের অধিবাসীরা বৈষ্ণবে পরিণত হলেন।
শ্লোক ১০৫
এইমত পথে যাইতে শত শত জন।
‘বৈষ্ণব’ করেন তাঁরে করি’ আলিঙ্গন।।
এইভাবে পথে যেতে যেতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শত শত মানুষকে আলিঙ্গন করে বৈষ্ণবে পরিণত করেছিলেন।
শ্লোক ১০৬
যেই গ্রামে রহি’ ভিক্ষা করেন যাঁর ঘরে।
সেই গ্রামের যত লোক আইসে দেখিবারে।।
যেই গ্রামে মহাপ্রভু ভিক্ষা করার জন্য থামতেন, সেই গ্রামের সমস্ত লোক তাঁকে দর্শন করতে আসতেন।
শ্লোক ১০৭
প্রভুর কৃপায় হয় মহাভাগবত।
সেই সব আচার্য হঞা তারিল জগৎ।।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় তারা সকলে মহাভাগবতে পরিণত হলেন। পরে তারা সকলে আচার্য হয়ে সমস্ত জগৎ উদ্ধার করলেন।
শ্লোক ১০৮
এইমত কৈলা যাবৎ গেলা সেতুবন্ধে।
সর্বদেশ ‘বৈষ্ণব’ হৈল প্রভুর সম্বন্ধে।।
এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেতুবন্ধ পর্যন্ত গেলেন এবং তাঁর প্রভাবে সমগ্র দক্ষিণ-দেশ বৈষ্ণবে পরিণত হল।
শ্লোক ১০৯
নবদ্বীপে যেই শক্তি না কৈলা প্রকাশে।
সে শক্তি প্রকাশি’ নিস্তারিল দক্ষিণদেশে।।
যে শক্তি, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপে প্রকাশ করেন নি, সেই শক্তি প্রকাশ করে তিনি সমগ্র দক্ষিণ ভারত উদ্ধার করলেন।
তাৎপর্য: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান নবদ্বীপ ধাম হলেও তখন ন্যায় ও স্মৃতি-শাস্ত্রের বিশেষ প্রবলতা থাকায়, সেই সেই শাস্ত্রের অধ্যাপকদের মধ্যে অনেকগুলি বহির্মুখ লোক ছিল, তাদের উদ্ধার করার জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কোন বিশেষ শক্তি প্রকাশ করেননি; তাই গ্রন্থকার মন্তব্য করেছেন যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দক্ষিণ-ভারতে যে শক্তি প্রকাশ করেছিলেন, নবদ্বীপে তিনি তা করেননি। তাই দক্ষিণ-ভারতে সকলে বৈষ্ণব হয়েছিলেন। এর থেকে বুঝতে হবে যে, মানুষ স্বাভাবিকভাবে অনুকূল পরিবেশে প্রচার করতে উৎসাহী। যাদের কাছে প্রচার করা হচ্ছে তারা যদি আগ্রহী না হয়, তা হলে প্রচারক তাদের কাছে ভগবানের কথা প্রচার না-ও করতে পারেন। অনুকূল পরিবেশে প্রচার করতে যাওয়াই শ্রেয়। প্রথমে ভারতবর্ষে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন প্রচার করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু ভারতবর্ষের মানুষেরা রাজনৈতিক চিন্তায় মগ্ন থাকায়, তা গ্রহণ করেনি। তারা রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তাই আমরা আমাদের গুরুমহারাজের নির্দেশ অনুসারে, পাশ্চাত্যে গিয়েছি এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপার প্রভাবে এই আন্দোলন সফল হয়েছে।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এটি শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক ছোট মন্তব্য। তিনি এই উদাহরণ ব্যবহার করছেন যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করার জন্য নবদ্বীপ থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন, যেহেতু সেটাই ছিল অত্যন্ত অনুকূল। তেমনি যখন শ্রীল প্রভুপাদ ভারতে প্রচার করার চেষ্টা করেছিলেন, সেই সময়টি ছিল ভারতের স্বাধীনতার ২০ বছর পর। তখন ভারতীয় মানুষেরা রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিল, সেই জন্য তারা কৃষ্ণভাবনামৃতকে খুব একটা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করছিল না। তাই, শ্রীল প্রভুপাদ পাশ্চাত্যে এসেছিলেন এবং সেখানে তিনি দেখেছিলেন যে মানুষদের কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রয়োজন আছে ও তারা এটিকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই জন্য প্রচারকেরা যে কোন স্থানে যেতে পারেন, যে স্থানের ক্রেতারা তাদের দ্রব্য ক্রয় করার প্রতি অধিক আগ্রহী। অবশ্য ভগবানের এই সমস্ত লীলা সমূহ বুঝতে হলে যিনি ভক্ত তিনি এটির প্রশংসা করতে পারবেন যে কিভাবে ভগবান কোন ব্যক্তিকে শক্ত্যাবিষ্ট করেন। উদাহরণস্বরূপ, সোভিয়েত ইউনিয়নে কেউ একজন প্রভুপাদের গ্রন্থ পেয়েছিল এবং তিনি জাপানের খুব কাছের এক শহরে থাকতেন। তখন ছিল কমিউনিস্ট শাসনকাল, বলশেভিক-এর সময়কাল, এরপর তা সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে গিয়েছিল। সেই কমিউনিস্ট শাসনকাল, তখন তিনি একটি ভাগবতম, একটি ভগবদগীতা মস্কো বইমেলা থেকে পেয়েছিলেন। তিনি কোরিয়ার পশ্চিম উপকূলের দ্বীপে তা নিয়ে গিয়েছিলেন। তার কাছে শুধু ভগবদগীতা ছিল, তার কোন ভক্তদের সাথে কখনও সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি ভগবদগীতা পড়েছিলেন এবং এই প্রচারের বিষয়ে বিশ্বাসী হয়েছিলেন, আর এরপর সেই স্থানে ৬০ জন ব্যক্তিরা ১৬ মালা হরে কৃষ্ণ জপ করতে শুরু করেন, প্রতিদিনের অনুষ্ঠান কর্মসূচি ও সমস্ত কিছু করতে শুরু করেন — এটা কেবল সেই এক ভগবদগীতা থেকে শুরু হয়! যখন এই আন্দোলন রাশিয়াতে বৈধ হয়েছিল, তখন ভক্তরা জনসমক্ষে মানুষদের কাছে গ্রন্থ বিতরণ করা শুরু করেছিলেন। সেই সময় তিনি একজন ভক্তের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বলেন যে, “ওহ আপনি হচ্ছেন প্রথম ভক্ত যার সাথে আমার সাক্ষাৎ হল। আমি কত বছর ধরে এগুলি অনুশীলন করছি, আমি ভগবদগীতা পেয়েছিলাম। তবে আমি একটা জিনিস জানতে চাইছিলাম, আপনি কি আমাকে একবার হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র বলতে পারবেন যাতে আমি তা শুনতে পারি। আপনি কি আমার টা শুনবেন যে আমি তা ঠিক বলছি কিনা? কারণ আমি কখনও কোন ভক্তের থেকে এটা শুনিনি।” তারপর তারা সেখানে গিয়েছিলেন, বিষ্ণু স্বামী মহারাজ সেখানে গিয়েছিলেন এবং দেখেছিলেন যে ষাট জন ভক্ত সহ এক বড় দল কীর্তন করছেন, প্রবল উদ্যম সহ। তাই, কিভাবে কেবল প্রভুপাদের গ্রন্থ লাভ করার মাধ্যমে তিনি শক্ত্যাবিষ্ট হয়েছিলেন। অবশ্য তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ সবকিছু জানতেন না যে কিভাবে তিলক সেবা করতে হয় ও আরো অন্যান্য বিষয় যা আপনি ব্যক্তিগতভাবে ভক্তদের থেকেই শিখতে পারেন, কিন্তু মূলত নামকীর্তন এবং গ্রন্থ অধ্যয়ন সেটা তারা অনুশীলন করছিলেন।
এখন ইন্দ্রদুম্ন মহারাজ সবেমাত্র বিভিন্ন সোভিয়েত ইউনিয়ন দেশ থেকে ফিরে এসেছেন এবং তিনি বললেন যে, এমনকি যদিও সেখানে বিধিবৎ কোন মন্দির নেই, তবে তিনি প্রত্যেক শহরে গিয়েছিলেন। যে সব স্থানে তিনি গিয়েছিলেন, সেখানে প্রায় ৩০০ থেকে ৬০০ ভক্ত বিমানবন্দরে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, এটা এমন ছিল যে মানুষেরা তা দেখছিল যে এই আন্দোলন এই বিভিন্ন ভক্তরা ও এই সব কিছুর মাধ্যমে প্রসারিত হচ্ছে। সমগ্র দেশে তা শুরু হয়েছিল শ্রীল প্রভুপাদের ১ বা ২ জন শিষ্যের দ্বারা। তাই, কেউ যদি শ্রীল প্রভুপাদের দ্বারা শক্ত্যাবিষ্ট হন, তাহলে তা সম্ভব। শ্রীল প্রভুপাদ বিভিন্ন প্রচারককে বিভিন্ন স্থানে প্রচার করতে পাঠাতেন এবং তারা অসাধারণ প্রচার করতে পারতেন ও এখনও এইভাবে অসাধারণ প্রচারকার্য করে চলেছেন, তাই কোন ব্যক্তির চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা দরকার, গুরু কৃপা দরকার, তাহলে সেই কৃপার মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই তাদের নির্দেশ পালন করতে পারবেন। যেমন, এই একজন গ্রন্থ পেয়েছিলেন, তিনি সেই নির্দেশ গ্রহণ করেছিলেন ও যথাযথভাবে তা পালন করা শুরু করেছিলেন, তারপর মানুষেরা পরিবর্তন হতে শুরু করে, তাদের হৃদয় পরিবর্তন হওয়া শুরু করে, তাই এটা অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে যখন মানুষের হৃদয় প্রকৃতই পরিবর্তন হয়, তখন এটা কেবল কোন হুজুকের বিষয় নয়, তখন আসলেই মানুষেরা উন্নত উপলব্ধি, ভক্তিমূলক সেবার স্বাদ পাচ্ছেন। আপনারা তা দেখতে পারেন, এটা এক খুবই চমৎকার ব্যাপার। যদি কেউ শক্ত্যাবিষ্ট হয়, যদি তারা তা লাভ করে ও শিক্ষা পায় যে কিভাবে যথার্থভাবে করতে হয়, তাহলে তারা সহজেই কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করতে পারে, তারা অনুশীলন করতে পারে।
কখনো কখনো অন্যান্য পরম্পরা বা অন্যান্য যোগ পদ্ধতির মানুষেরা, যেমন হঠ যোগ, অষ্টাঙ্গ যোগ, জ্ঞানযোগ বা কর্মকাণ্ড অনুশীলনকারী, তারা ভক্তরা যা করছেন তাতে কোন পার্থক্য দেখতে পায় না, কিন্তু আসলে ভক্তরা যে অনুশীলন করছেন তা অত্যন্ত বিশেষ। এটি করার এক কৌশল আছে যা আমাদের শাস্ত্র, গুরু এবং ভক্তদের থেকে শিখতে হবে। এইভাবে আরেকটি উদাহরণ আছে যে একসময় একজন কুমার ছিলেন এবং তার একজন বন্ধু ছিল কামার। তারা একটা সময় বার করে একসাথে পিকনিক করার জন্য যে তারা তাদের পরিবারের সাথে বাইরে গিয়ে আনন্দ করবে। কুমারকে মাটির পাত্র বানানোর কাজ শেষ করতে হত, তারপরে সে বেরোতে পারবে, সেই জন্য তার মাটির পাত্র বানানোর চাকা ঘুরছিল এবং সে পাত্র বানাচ্ছিল। কুমার যা ব্যবহার করে তা হচ্ছে তার এক কাঠের হাতুড়ি থাকে এবং খুব সতর্কভাবে তারা মাটির এক নির্দিষ্ট জায়গায় মৃদু আঘাত করে এবং এইভাবে তারা যেরকম গরণ দরকার তা পেতে পারে। যখন কামার তা দেখেছিল, সে বলল, “আমি সব সময় হাতুড়ি দিয়ে কাজ করি তাই আমি তোমাকে এতে সাহায্য করতে পারব, কোন অসুবিধা নেই, তাহলে আমরা তাড়াতাড়ি বেরোতে পারব।” তখন সে বসে এবং সেই হাতুড়ি তুলে নেয় তারপর (জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ভাঙ্গার আওয়াজ করেন) সে আরেকখানা ভেঙে ফেলে, “দাঁড়াও দাঁড়াও” “ঠিক আছে আমি এটা করতে পারব।” কুমারের হাতুড়ির ব্যবহার এবং কামারের ব্যবহার। কামার হাতুড়ি তুলে ইস্পাত ভাঙ্গতে জানে আর কুমার কেবল মৃত্তিকা সমতলের জন্য টোকা মারে, এটা হচ্ছে হাতুড়ির এক অত্যন্ত কৌশলের সাথে প্রয়োগ, যেক্ষেত্রে কামারের হাতুড়ির প্রয়োগ খুবই কৌশলহীন ও কঠোর। তাই ভক্তিমূলক সেবা অন্যান্য কিছুর মত মনে হয় যা পর্যবেক্ষককে জানতে দেয় না ও এটা সাধারণ কিছু বলে মনে হয়। কিন্তু হয়ত তা এইরকম নয়, যা পুরোপুরি জানতে হবে, তবে দেখতে সাধারণের মতো লাগে। তারা বুঝতে পারে না যে ভক্তরা যখন তাদের ভক্তিমূলক সেবা করে, তখন তারা আসলে কৃষ্ণের কথা চিন্তা করেন, তারা তাদের গুরুর প্রসন্নতার কথা চিন্তা করেন। তাদের আধ্যাত্মিক গুরুকে সন্তুষ্ট করেন। তারা সেইসব সেবা এক নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, নির্দিষ্ট কারণে করেন। আরও বিস্তারিত কিছু বলা যেতে পারে — যেমন তারা কৃষ্ণ প্রসাদ গ্রহণ করে, তারা ভোগ গ্রহণ করে না, তারা হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করে, আরো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয় আছে যা হয়ত একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কাছেও পুরোপুরি দৃষ্টিগোচর হয় না। তারা এটা দেখতে পারবে না, কিন্তু আপনি এইসব ছোট খাটো নিগূঢ়তা গুলো জানেন যে কিভাবে ভক্ত তার কৃষ্ণভাবনামৃত বজায় রাখেন। আর তারা মনে করে — ঠিক যেমন এই কামার ভেবেছিল যে আমি এটা ব্যবহার করি, হাতুড়ি তুলি আর ব্যবহার করি, তেমনি এটাও অন্য কিছুরই মত।
আরেকটি উদাহরণ আছে, সম্ভবত তা আপনারা হয়ত শুনেছেন। কাঠের মিস্ত্রি এবং বাঘ। এই নাটকটি হচ্ছে এক ভারতীয় কাহিনী যা আমাদের পূর্ববর্তী আচার্যগণ বলেছেন। একসময় বাংলায় এক কাঠের মিস্ত্রি ছিল, আমার মনে হয় (পাশে) এক বাঙালি মহিলা চলে গেলেন, তাকে ঘরে যেতেই হত। সে সুন্দরবনে গিয়েছিল এটা হচ্ছে বাংলা, বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশ। এটি দুটো দেশেই আছে। এটিকে বলা হয় সুন্দরবন। সুন্দর মানে সুন্দর, আর বন মানে জঙ্গল বা বন। এই সুন্দরবন মানে অপরূপ বন। সম্ভবত তা খুবই সুন্দর, সেখানে অনেক বড় বড় গাছ আছে, অনেক নদী আছে যা সমুদ্রের সাথে যুক্ত। তাই, সেখানে জোয়ার ভাটার জল আসে, সেখানে অনেক বাঘও আছে। এটা হচ্ছে সমগ্র বিশ্বের একমাত্র স্থান যেখানে রয়াল বেঙ্গল বাঘ আছে। সমগ্র বিশ্বের সবথেকে লম্বা বিড়াল, সিংহের থেকেও লম্বা। আমি ঠিক জানিনা, আমি সেখানে ছিলাম, আমাদের সেখানে এক নামহট্ট অনুষ্ঠান হয়েছিল। জাতীয় অরণ্য শুরু হওয়ার আগের শেষ সভ্যতা, শেষ গ্রামে, এবং সেখানে আমরা সমগ্র বিশ্বের প্রায় ১৫ জন ভক্তকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয় ডেকলেন সেখানে ছিল। সে এখানে নেই, কিন্তু সে সেখানে ছিল। ( ভক্তরা হাসছেন)
ভক্তগণ: মানুষেরা বেদ অনুশীলন করছে না, তারা কৃষ্ণকে অনুসরণ করছে না।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: (পাশে) তুমি তাৎপর্যে কি পড়লে?
ভক্তগণ: আমি তাৎপর্য পড়েছি কিন্তু আমি তবুও বুঝতে পারছি না। বলা হচ্ছে যে মানুষেরা যজ্ঞ অনুষ্ঠান করত।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: (পাশে) বেশিরভাগই সবাই অন্য স্থান ছেড়ে এসেছিল এবং সমগ্র বিশ্বের আরও বিভিন্ন ভক্তরা ছিল। (পাশে) তুমি সেখানে ছিলে না? হ্যাঁ, আমি জানতাম সেখানে কয়েকজন ব্রিটিশ প্রতিনিধি ছিল (ভক্তরা হাসছেন) অবশ্য সব ভক্তরা বাস থেকে নেমে গিয়েছিল, আর তখন সব স্থানীয় লোকেরা তাদের বাঘের কাহিনী বলতে শুরু করে এবং সবাই ভয়াতুর হতে শুরু করে। (ভক্তরা হাসছেন) যখন তারা অনুষ্ঠান থেকে বাড়ি ফিরবে, তাদের টর্চলাইট নিশ্চয়ই প্রস্তুত থাকতে হবে, কিন্তু বাঘেরা বলছিল, একটা নদী সেখানে আছে আর বাঘেরা ছিল নদীর অপরপ্রান্তে, কিন্তু আপনি কখনও কখনও তাদের আওয়াজ শুনতে পারবেন না এবং যেহেতু পাশে আপনি ততটা জঙ্গল দেখতে পারবেন না, তাই তারা আমাদেরকে নৌকায় করে গভীর জঙ্গল দেখানোর জন্য নিয়ে যেত কিন্তু আমাদের যথেষ্ট সময় ছিল না, খুবই ব্যস্ত কার্যক্রম ছিল। তাই এইবার আমি তাদেরকে নৌকায় করে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে যেতে পারিনি। তিনি আমাদেরকে বলছিলেন যে কিভাবে সেই রাতে আমাদের প্যান্ডেল অনুষ্ঠানের জন্য ৩০,০০০ মানুষেরা সমবেত হয়েছিল। এক বড় প্যান্ডেল হয়েছিল, আর মানুষেরা সেখানে অনুষ্ঠানে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত ও আবার সকাল পর্যন্ত ছিল। ভক্তরা বেশ কিছু ঘন্টা যাত্রা করেছিলেন এবং তারপর মধ্যাহ্নভোজ, রাতের প্রসাদ নিয়েছিলেন, তারপর তারা মঞ্চে গিয়েছিলেন এবং আমাদের গৌর আরতি হয়েছিল, আমাদের ভজন হয়েছিল, এক নতুন ভক্তের দ্বারা ছোট করে ভগবদগীতার প্রবচন হয়েছিল, মানে দশ মিনিটের আহ্বান করার প্রবচন, ভগবদগীতা পাঠ, তারপর এক আমন্ত্রণ বাক্য বলা হল। কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি, মেয়র বা অন্যকেউ ছিল। না মেয়র নয়, যেহেতু তা শহর নয় একটি গ্রাম, তাই কোন গোষ্ঠীর নেতা। আমার মনে হয় দশটি গ্রাম থেকে তাদের গ্রাম্য গোষ্ঠী বলা হয়। “উপজিলা” উপজেলার নেতা, তিনি এসেছিলেন ও এক আমন্ত্রণমূলক বার্তা দিয়েছিলেন, কারণ সেই এলাকায় যদিও বাংলাদেশের তা ইসলামিক গণতন্ত্র, সেখানে কেবল ২০% হিন্দুরা আছে, তবে সেই নির্দিষ্ট এলাকায় প্রায় ৪০% হিন্দু এবং ৬০% মুসলিম আছে। তাই রাজনীতিবিদদের কাছে হিন্দুদের ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে তারা সব সময় আমাদের অনুষ্ঠানে আসে, অনেক ভিড় হয়। আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তারা কিছু স্বাগতম বার্তা দেয়, কিছু রাজনৈতিক প্রচার “আমাকে ভোট দিতে ভুলবেন না” বা এমন কিছু। তারা খুবই চতুর, এইভাবে আমাদের প্রবচন হয়েছিল দুজন ভক্ত বলেছিলেন, একের পর এক দুজন ভক্ত ১৫ মিনিট ধরে বলেছিলেন যে কিভাবে তারা এসেছিলেন ও কিভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত এগিয়ে চলেছে এবং তারা কোত্থেকে এসেছেন। (পাশে একজন ভক্তকে) তুমি কি বলেছিলে? প্রত্যেকে! প্রত্যেক ভক্ত সেখানে প্রচার করেছিলেন। (পাশে একজন ভক্তকে) এত বড় লোকসমাগমে প্রচার করে কেমন অনুভব হচ্ছিল? মানুষেরা শুনতে চায়, তারা সম্পূর্ণ মনোযোগী ছিলেন, তারপর কিছু ভজন, কিছু কীর্তন হয় ও আবার দুজন বলবে, তখন ভক্তিতীর্থ মহারাজ কিছুদিন গিয়েছিলেন, আমি কিছুদিন গিয়েছিলাম।
এই নির্দিষ্ট গ্রামটি হচ্ছে জঙ্গলের ঠিক প্রান্তে, নদীর ঠিক অপর প্রান্তে। সেই গৃহস্থরা আমাদেরকে বলছিলেন, এখন হচ্ছে শুষ্ক ঋতু, তাই ভয়ের কোন কারণ নেই, কিন্তু বর্ষা ঋতুতে কখনও কখনও জঙ্গল থেকে কুমির চলে আসে এবং আমাদের ছোট পুকুরে চলে আসে যেখানে আমরা সাঁতার কাটতে যাই, কিন্তু ভয় পাবেন না এখন সেখানে কোন কুমির নেই। (ভক্তরা হাসছেন) শুধু একটু ঠাট্টা করার জন্য বললাম। রাতে বেশ শান্ত পরিবেশ ছিল কিন্তু আমার মনে পড়ে সেই দিন, তার পরের দিন কেউ একজন আমাদেরকে বলেছিলেন যেহেতু আমি তাদেরকে পুকুর এবং বাঘের কাহিনী বলেছিলাম, তোমরা সেই কাহিনী ভালোভাবে শুনেছ? (ভক্তরা হাসছেন) আসলে আমি সেই গল্পের পরে ফিরে আসব কারণ একই সময়ে এত কাহিনী বললে আমি শৃঙ্খল হারিয়ে ফেলছি। (ভক্তরা হাসছেন) আমি সেই কাহিনীটি বলেছি (পাশে) তুমি কখনও পুকুর আর বাঘের গল্প শোনোনি? (ভক্তরা হাসছেন)
সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ সে সব ধরনের সংস্কৃত জানত। সে সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেছিল এবং তার গ্রামে ফিরে আসছিল। সে বিকেলে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছোট রাস্তায় যেতে চাইছিল, তখন একজন গ্রামবাসী তাকে বলল, “এই ছোট পথ ধরে যাবেন না।” সে জিজ্ঞেস করল, “কেন নয়? আমি তাড়াতাড়ি ঘরে পৌঁছাতে চাই।” “কারণ জঙ্গলে একটা বাঘ দেখা গেছে।” সে বলল, “তুমি বাঘ জানো না? এটা একটা সংস্কৃত শব্দ, যার মানে হচ্ছে ব্যাঘ্র। সংস্কৃতিতে ব্যাঘ্র শব্দের ক্ষেত্রে এটি কতগুলি বর্ণ দিয়ে গঠিত — “ব্যা-আহ-রাঃ” সে প্রত্যেক বর্ণকে বিভক্ত করল প্রত্যেক বর্ণের অর্থ কি, কিভাবে তা শক্তিশালী, এই ওই সেই ব্যক্তিকে এইসব বলে গেল। সে ছিল এক সরল গ্রামবাসী, যে খুব ভাল ছিল, কিন্তু সে বলল, “আমি এত সংস্কৃত জানিনা, কিন্তু যাইহোক ভালো হবে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে না গেলে, কারণ সেখানে বাঘ আপনাকে খেয়ে ফেলবে। “আপনি এখানে তা পাবেন না, খাওয়ার বিভিন্ন সংজ্ঞা কি?” (ভক্তরা হাসছেন) “আমি জানিনা এর কোন সংজ্ঞা আছে নাকি কিন্তু এটা জানা কথা যে তারা মানুষ খায়।” (ভক্তরা হাসছেন) তারপর সেই সংস্কৃত পণ্ডিত বলল, “দেখুন আমি একজন ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণরা হচ্ছে অন্যদের সেবা করার জন্য, তাই বাঘ যদি আমার কাছে আসে, তাহলে আমি বাঘের সেবা করব তাই নয় কি?” তিনি বললেন, “মহাশয় আমি জানতাম না যে ব্রাহ্মণেরা হচ্ছে বাঘের খাবার। তাই আমার মনে হয় গ্রামের পথ ধরে যাওয়া ভালো। তাতে একটু বেশি সময় লাগলেও আপনি নিরাপদে গৃহে পৌঁছাবেন কারণ এই মুহূর্তে সেই জঙ্গল বিপদজনক। একজন ব্রাহ্মণ হিসেবে আমাদের আপনার সাহায্য দরকার, আপনাকে বাঘে খেয়ে ফেলছে সেটা আমরা দেখতে চাই না। অবশ্য এটা আপনার ওপর নির্ভর করছে আপনি পণ্ডিত — আপনি যা করতে চান তাই করতে পারেন।” তখন সেই পণ্ডিত বলল, “না না ঠিক আছে!” সে জঙ্গলে চলে গেল এইসব সংস্কৃত শ্লোক আর ব্যাকরণ মনে করতে করতে, তারপর সেই জঙ্গলে গেল আর হঠাৎ করে সেখানে ছোট ছোট চোখ তাকে দেখছে, আর তারপর (জয়পতাকা স্বামী গর্জনের আওয়াজ করলেন) (ভক্তরা হাসছেন) বাঘ লাফিয়ে এসে তার উপর ঝাঁপ দিল, তার পা কামড়ালো এবং সে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করছিল, তখন হঠাৎ করে সে মনে করল, “আমার এটা মনে পড়েনি যে সংস্কৃত ব্যাঘ্র শব্দের আরেকটি অর্থ আছে — ‘যে অন্যদের খেয়ে বেঁচে থাকে।’ কেন সেই সময় আমার এই অর্থ মনে পড়েনি?” (ভক্তরা হাসছেন) তারপর শেষে। তাই মূল বিষয় হচ্ছে যে কখনও কখনও মানুষেরা তারা একটু শিক্ষিত হলে, একটু শাস্ত্র জানলে, তারা অহংকারী হয়ে পড়ে এবং ভাবে আমার কারও উপদেশ প্রয়োজন নেই। আমার কোন আশ্রয় দরকার নেই। ঠিক যেমন সেই গ্রামবাসী, তিনি অত্যন্ত বাস্তব বুদ্ধিযুক্ত ছিলেন, তিনি সেই অর্থে কিভাবে তার আধ্যাত্মিক জীবন ও জড়জাগতিক জীবনের সমস্যা এড়িয়ে চলা যাবে সেটার প্রয়োগীয় উপদেশ দিচ্ছিলেন, তেমনই গুরু-বৈষ্ণব হয়ত কাউকে এই উপদেশ দিতে পারেন যে কিভাবে কিছু সমস্যা এড়িয়ে চলা যাবে, কিন্তু কেউ যদি বইয়ের শিক্ষার সাহায্য নেয়, বাস্তবিক অভিজ্ঞতা ছাড়া, তাহলে তারা হয়ত মনে করতে পারে, “না আমাকে এই নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে না।” এইভাবে তারা সমস্যায় পড়ে। এই জন্য আমাদের কেবল গ্রন্থ পড়াই দরকার নয়, আমাদের সাহায্যের জন্য বরিষ্ঠ ভক্তদের থেকে, গরুর থেকে বাস্তবিক উপদেশ প্রয়োজন এবং যদি আমরা খুব গর্বিত হই এবং সেই উপদেশ না গ্রহন করি, তাহলে আমরা সমস্যায় পড়ব।
যেমন আমি বলছিলাম বাংলাদেশের পাশে সুন্দরবনে সেই গ্রামে এক বড় জনসমাগম ছিল, পরের দিন সকালে যে স্থানে আমরা থাকছিলাম, সেখানে কোন বিদ্যুৎ ছিল না। অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের জেনারেটর ছিল, কিন্তু আমরা যেখানে থাকছিলাম, সেখানে কোন বিদ্যুৎ ছিল না। আমাদের শুধু মোমবাতি ছিল, আর ঘাসের কুটির ছিল, তা বেশ আসল ছিল। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এখনকার সাথে ৫০০ বছর আগের বা ৫০০০ বছর আগের সেই রকম কোন পার্থক্য নেই। কেবল পাশে কিছু টিনের পাত আছে, এই ছাড়া সাধারণত সব কুটির ছিল তৃণ ঘাস ও বাঁশের। খুব ভালো, খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। তারা ভক্তদের জন্য এক বড় মহাভোজ রন্ধন করেছিলেন। প্রায় আটটি বিভিন্ন সবজির পদ ছিল। অন্ন এবং ডাল, চাটনি অন্যান্য কিছু ছিল। আর এরই মাঝে আপনাকে ৪ ঘন্টার সোজা যাত্রা করতে হত, নিকটবর্তী শহর থেকে ও সোজা দক্ষিণ অগ্রসর হওয়া। আমরা পাকা রাস্তা ছেড়ে ইটের রাস্তা দিয়ে প্রায় এক ঘন্টা গিয়েছিলাম, এরপর ইটের রাস্তা ছেড়ে মাটির রাস্তা দিয়ে প্রায় আরো এক ঘন্টা গিয়েছিলাম, তারপর জঙ্গলের শেষ জায়গায় আসি, সেখানে অনুষ্ঠান ছিল। পরের দিন সকালে একটি আমাদেরকে বলছিলেন যে মনে করুন কাল রাতে আপনি আমাদেরকে বাঘের গল্প বলেছিলেন, গতরাতে জঙ্গলে সেখানে একজন ব্যক্তি ছিল যে জানত যে প্রত্যেকেই আপনাদের অনুষ্ঠানে যাচ্ছে, তাই সে ভেবেছিল জঙ্গল দিয়ে যাবে যেখানে কোন প্রতিযোগিতা নেই এবং সে মধু সংগ্রহ করবে। জঙ্গলে বড় মৌচাক হয়েছিল, যা ছিল আমাদের অনুষ্ঠানের স্থান থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে। সেই ব্যক্তি অনুষ্ঠানে না এসে মধু সংগ্রহ করতে গিয়েছিল এবং তাকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। আমাদের কাছে তা এক বড় ধাক্কা ছিল, সাধারণত তারা অনেক দূরে থাকে, কিন্তু এটা ছিল কেবল ৪ কিলোমিটার দূরে। সেজন্য এরপরে আর কারও হরে কৃষ্ণ অনুষ্ঠাণে অংশগ্রহণ না করা উচিত নয় (ভক্তরা হাসছেন) আমার মনে পড়ে সেই গ্রামে হেলিকপ্টার পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল ও প্রত্যেককেই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশে হেলিকপ্টার? কিভাবে আপনি হেলিকপ্টার পরিষেবা পেতে পারেন? সেখানে রাস্তা এত বাজে যে যে সমস্ত মানুষেরা সাইকেলে করে যায়, তারা তাদের বসার জায়গার সামনে লোক নেয়, তাদের পেছনেও কাঠের বসার জায়গা থাকে ও পিছনে দুজন বসে। এই ভাবে সাইকেলে তাদেরকে বহন করে আনে আর এটাকেই তারা বলে হেলিকপ্টার পরিষেবা” (জয়পতাকা স্বামী এবং ভক্তরা হাসছেন)
আসল ঘটনায় ফিরে আসা যাক, যা হচ্ছে এক কাঠের মিস্ত্রি, যে জঙ্গলে যাচ্ছিল। যখনই আমি জঙ্গলের কথা মনে করি, সেই ছবি মনে পড়ে, আমরা সেই জায়গায় গিয়েছিলাম, আমি আরো গভীরে যেতে চাই। তারা একবার বলছিলেন যে এটা খুবই সুন্দর, কিন্তু সেখানে আপনি কি বা প্রচারের সুযোগ পাবেন? কারণ সেখানে কোন মানুষ থাকে না, সেই কাঠের মিস্ত্রি সেই কাঠ আনার জন্য যাচ্ছিল এবং কোনো না কোনোভাবে আরেকজন বয়স্ক কাঠের মিস্ত্রী তাকে বলেছিল –- “এই সুন্দরবন খুব সুন্দর জায়গা, অনেক বড় বড় গাছ আছে, তুমি সেখান থেকে অনেক কাঠ পেতে পারো, কিন্তু একটা ব্যাপার হচ্ছে সেখানে অনেক জন্তু জানোয়ার আছে, তাই তোমার নিজের সাথে কোন অস্ত্র নিয়ে যেও নয়তো তুমি আক্রান্ত হতে পারো।” সে বলল এই বুড়ো মানুষ কি আর বলছে, তারা কি বা জানে, মানে যদি আপনি জঙ্গলে যান, পুরো জঙ্গল গাছে ভর্তি, সেই সব গাছ কি দিয়ে তৈরি? কাঠ! তাই জঙ্গলে অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার কি দরকার আছে? যদি আমি কোন বাঘকে দেখি, তাহলে আমি গাছের কোন ডাল কাটব, আর সেটাকেই আমার প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহার করব। আমি সেই গাছের ডাল আমার মাথায় বাধবো, আর বাঘ আমার থেকে মাইল দূরে থাকবে। তারা আমার কাছে আসবে না অস্ত্র কেন নিয়ে যাব? যেকোনো সময় আমি গাছের ডাল কেটে নিতে পারি, আমি তো এক কাঠের মিস্ত্রি তাই না! এরপর সে জঙ্গলে গিয়েছে। অবশ্য, একটা ব্যাপার সে ভাবেনি যে যখন কোন বাঘ আপনার উপর ঝাঁপ দেবে, তখন গাছের ডাল কাটার আর তত সময় থাকবে না (ভক্তরা হাসছেন) বাঘেরা আপনাকে এই ব্যাপারে ভাবার মত তত সময় দেবে না (ভক্তরা হাসছেন।) সেই গ্রামবাসীরা কত বাঘের গল্প বলছিলেন, আমি বাকি রাত বাঘের গল্প বলে যেতে পারি। (ভক্তরা হাসছেন) এক্ষেত্রে তারা বলে যে এইসব বাঘেরা এত বড়, তারা বলে এরা হচ্ছে ১৫ ফিট লম্বা, আর তাদের লেজ আরো বড় তোমরা জানো? আমি জানিনা আমাকে দেখতে হবে। কখনো কখনো এটা যেন গ্রামের কাহিনী, আমি জানিনা তারা সত্যি কতটা বড়, কিন্তু যেভাবে তারা বলে, তারা বলে যে “বিশাল বড়” (ভক্তরা হাসছে) আমার মনে হয় না বেশ বড়। আমার মনে পড়ে যে বাঘেরা খুব খুব বড়। এই সমস্ত বাংলার বাঘেরা অন্তত আমার বুদ্ধিতে ১০ ফিট হওয়ার কথা কিন্তু তারা বলে, এমনকি আরও বড়, তবে তারা এটা বলে যে এই সমস্ত বাঘেরা নিজেদেরকে বিড়ালের মত ছোট করতে পারে। আপনারা জানেন যে তারা ঝোপের মধ্যে কিভাবে বসে ও ঝোপঝাড় ডোরাকাটা দাগ বিশিষ্ট হয়। পাতা থাকে, আর তো আপনারা জানেন (ভক্তরা আসছেন) তারা শুধু সেখানে বসে থাকে, সব মানুষেরা ডোঙায় করে যায় আর এইসব জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হেটে যায়। ডোঙায় করে মৌমাছি খোঁজ করতে যায়, যেখানে মৌমাছি আছে, সেখানে সেই কাঠ আছে যা তারা চায় এবং সেই বাঘেরা বেশ চতুর, তারা জানে যে কেবল একটা পথ আছে যেখানে তারা যেতে পারে, তাই তারা যতক্ষণ না সেখানে আসছে ততক্ষণ এরা সেখানে ঝোপের আড়ালে অপেক্ষা করে এবং যখন তারা সেখানে যায় (শ্রীল জয়পতাকা স্বামী হুশ করে আওয়াজ করেন) তারপর তারা লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসে এবং যখন তারা লাফ দেয়, তারা এত বিশাল যে আপনি কল্পনা করতে পারবেন না তারা এত বড়, কিন্তু তারা কোন আওয়াজ করে না, পুরোপুরি নিরবে আসতে পারে। এই বোকা কাঠের মিস্ত্রী কারও কথার শোনেনি। সে কোন অস্ত্র ছাড়াই জঙ্গলে গিয়েছিল। এবং সেখানে যখন সে এক ছোট্ট বাঘ দেখেছিল, বড় নয়, কেবল ছোট একটা ৮ ফুট লম্বা বাঘ, ছোট বাচ্চা (ভক্তরা হাসছেন) তার দিকে দৌড়ে আসছে, সে তখন তাড়াতাড়ি গাছের উপর উঠে ডাল কাটতে চেষ্টা করেছিল! (ভক্তরা হাসছেন) ব্যাস শেষ! সে আর কখনই তা পেতে পারেনি।
এরই মাঝে কোনভাবে একজন ভক্ত সেই গ্রামে এসেছিলেন এবং তিনি হরিনাম করেছিলেন ও প্রত্যেককে দিয়েই হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করাচ্ছিলেন এবং তার কাউকে জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি জঙ্গলে গিয়েছিলেন, হরিনাম করেছিলেন। গ্রামবাসীরা মনে করেছিল সেই ভক্ত সেখানে যাচ্ছে বাঘ তাকে আক্রমণ করতে পারে, তাই আমাদের তাকে রক্ষা করা উচিত। সেই জন্য তারা তার পিছন পিছন অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিল এবং তারা তাকে অনুসরণ করেছিল যে যদি কোন কিছু হয় তাহলে তারা তাকে রক্ষা করবে, কিন্তু তারা দেখল যে যেহেতু তার হৃদয় হিংসা নেই এবং তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ এক শুদ্ধ ভক্ত, তিনি জঙ্গলে হরে কৃষ্ণ নাম করছিলেন, তাই জঙ্গলের জীবজন্তুরাও শান্ত হয়েছিল। এমনকি যখন তিনি কোন পশু দেখেছিলেন, তিনি সেই পশুকে বলেছিলেন, “হরিবোল! হরে কৃষ্ণ বলো” এবং সেই পশুরাও নিজেরা এইরকম করতে শুরু করে, “হরিবোল! হরিবোল!” তারা নৃত্য করছিল, তারাও আনন্দে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। তারা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে কি হচ্ছে! পুরো জঙ্গল হরিনামে মুখরিত হয়ে উঠেছে এবং সেখানে পশু পাখিরা তারাও এভাবে আচরণ করছে, যা খুবই অসাধারণ, নাম কীর্তন করা এবং নৃত্য করা। তা গল্পের মূল শিক্ষা কি? কেউ কি বলতে পারবে? (ভক্তরা বলছেন “হরেকৃষ্ণ নাম কর”) এটা হচ্ছে সুন্দর নিদর্শনের মধ্যে একটি যা আমাদের শিখতে হবে। আরেকটি হচ্ছে কে কাঠের মিস্ত্রি? অস্ত্রসহ কে গ্রামবাসীরা? এবং কে সেই শুদ্ধ ভক্ত? তাদের কিসের সাথে তুলনা করা হয়েছে? কেউ কি বলতে পারবে? সেই কাঠের মিস্ত্রি হচ্ছে যোগী, বিশ্বাস করুন বা না করুন। (ভক্তরা হাসছেন) অষ্টাঙ্গ যোগীদের দেখবেন, তারা মনে করে যে আমি নিজের শক্তির দ্বারা নিজেকে রক্ষা করব। আমি নিজের যোগশক্তি প্রয়োগ করব, আমি নিজের প্রাণায়াম করব, আমি হঠযোগ করব। যদি কখনো আমি কোন আধ্যাত্মিক বাধার দ্বারা আক্রান্ত হই, সেই সময় আমি তাড়াতাড়ি যোগ করতে বসব বা কোন কিছু করে আমাকে রক্ষা করব। যখন কিছু হবে, তখন আমি প্রাণায়াম বা কিছু করব। আমি কোন না কোনভাবে সেই সময় আমার নিজের প্রচেষ্টায় নিজেকে রক্ষা করব। কিন্তু আসলে এই সমস্ত যোগীরা যদি তাদেরকে এমনকি ছোট বা অল্প কাম, ক্রোধ, লোভ, উন্মত্ততা বা ভ্রম আক্রমণ করে, তাহলে সেটা তাদেরকে গ্রাস করে, তারা খুব একটা সুরক্ষিত নয় যতক্ষণ না সম্পূর্ণ পরিপূর্ণতা লাভ করছে। তারা দুর্বল, তাদের কোন অস্ত্র নেই, আর তাদের তা পাওয়ার কোন সময়ও থাকেনা। যে সমস্ত গ্রামবাসীরা অস্ত্রসহ ভক্তের পিছন পিছন এসেছিল, তারা হচ্ছে কর্মী, তারা হচ্ছে জড়জাগতিক ব্যক্তি। তাদের অস্ত্রটা, ঠিক আছে খুশি থাকার জন্য তাদের কিছু ইন্দ্রিয়তৃপ্তি আছে। এবং যদি তা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে ঠিক আছে এইভাবে তারা বেঁচে থাকে। কোনো না কোনোভাবে তাদের জড়জাগতিক আনন্দে যদি তারা সুখ পায়, তাহলে তারা ঠিক অনুভব করে। আপেক্ষিক ভাবে বলতে গেলে, যদি তাদেরকে ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়, তাহলে তারা সব সময় ভীত থাকে এবং তারা ততটা নিরাপদ নয়, তারা বাঘের ভয়ে আছে কিন্তু ভক্ত তিনি হচ্ছেন একজন ভক্ত এবং তিনি হরিনাম করেন ও সম্পূর্ণ কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল। কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষ্ণ তাকে রক্ষা করেন এবং সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হওয়ায় তিনি ষড়রিপু থেকে আসা বিভিন্ন ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা খুব ভালোভাবে আমাদের কোন জড়জাগতিক প্রচেষ্টার দ্বারা কেবল এই সমস্ত রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না, কিন্তু যদি আমরা নিজেদেরকে পুরোপুরি কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করি, আমাদের মন, আমাদের ইন্দ্রিয় এবং আমাদের শরীর কৃষ্ণের সেবায় লাগাই — “গৃহে থাকো বনে থাকো সদা হরি বলে ডাকো” যেমন গৃহে থাকুন বা বনে থাকুন, যেখানেই আপনি থাকুন না কেন প্রত্যেকের হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করা উচিত এবং এই ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত করার মাধ্যমেই আমরা এইসব মায়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাব। আমাদের সেই সুরক্ষা প্রয়োজন এবং আমরা সেই সুরক্ষা লাভ করি যখন আমরা পুরোপুরি কৃষ্ণের ওপর নির্ভর করি, কোন যোগ বা এমনকি কর্মের উপর নয়। এমনকি অস্ত্রসহ অন্যান্য ব্যক্তিরা, কখনো কখনো বাঘ তাদেরকেও বোকা বানায়, তারাও খুব একটা নিরাপদ স্থিতিতে নেই, তারা নিজেদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করে কিন্তু ভক্ত তিনি এইসব বন্য পশুদের উপর বিজয়প্রাপ্ত। বলা হয়েছে যে একজন ভক্ত এই রিপু গুলির উপরও বিজয় লাভ করেন, কারণ ভক্ত এই সমস্ত রিপু কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহার করেন। আমরা কামকে কিভাবে কৃষ্ণের জন্য ব্যবহার করতে পারি? কাম মানে এক শক্তিশালী ইচ্ছা, কারও হয়ত কৃষ্ণের সেবা করার অত্যন্ত শক্তিশালী ইচ্ছা আছে, খুব শক্তিশালী ইচ্ছা আছে কাউকে কৃষ্ণভাবনামমৃতে নিয়ে আসার, কৃষ্ণকে কোন কিছু নিবেদন করার। কৃষ্ণকে কোন কিছু প্রদান করার ইচ্ছার কামুকতা, উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে কত সুন্দর এক বাড়ি, কত ভালো হবে এটা যদি কৃষ্ণের জন্য থাকে। কত ভালো একজন ব্যক্তি, কত ভালো হবে যদি তিনি একজন কৃষ্ণ ভক্ত হন। যা কিছু আমরা নিজেদের জন্য কামনা করতে পারতাম, তা আমরা কৃষ্ণের জন্য কামনা করতে পারি। এটাই হচ্ছে শুদ্ধ কাম-ক্রোধ-লোভ। কাম এবং লোভ, লোভ হচ্ছে যেন কাম অনেক গুণ বৃদ্ধি হলে হয়, যেমন আপনি তা ধরে রাখতে চান, কিভাবে পুরো শহরকে ভক্তে পরিণত করা যাবে, কিভাবে অনেক মানুষকে ভক্ত করা যাবে, আরও আরও ভালো কিছু কৃষ্ণকে দেওয়া যাবে। সাধারণত আপনার যা কিছু আছে তা তারা আপনি সন্তুষ্ট নয়, কেন? এর কারণ আছে কারণ আমরা কৃষ্ণের জন্য লোভী, আমরা কৃষ্ণের জন্য আরো কিছু চাই। ভালো জায়গা, ভালো সুযোগ-সুবিধা, অনেক ভক্তদের বিতরণের জন্য অনেক প্রসাদ ও আরো কিছু। এটা হচ্ছে কৃষ্ণের জন্য, তাহলে এটা ভালো। মানুষদের আরও ভোজন করানো, মানুষদের কৃষ্ণভাবনামৃতে খুশি করার মধ্যে কি খারাপ আছে? সেই ধরনের লোভ বাধা নয়, যদি তা শুদ্ধ লোভ হয়। আমরা লোভী কিন্তু তা ভালো কারণের জন্য, এর মধ্যে কোন ভুল নেই, কিন্তু ক্রোধের ক্ষেত্রে কেউ যদি এসে মন্দির নষ্ট করতে চায় বা ভক্তের ক্ষতি করতে চায়, তখন আপনি ক্রোধ করবেন এবং কৃষ্ণকে রক্ষা করবেন। সেইজন্য সেই ক্রোধও খারাপ নয়, তেমনই উন্মত্ততা হচ্ছে ভক্তরা হরেকৃষ্ণ নাম করে, কখনো কখনো তারা ভাবে উন্মাদ হয়ে যায়। সেই ধরনের উন্মত্ততা খারাপ নয় বরং কখনো কখনো ভাবে বিভোর হয়ে তারা সময় ভুলে যায়, তারা কোন কিছু ভুলে যায় বা এইরকম একটু কিছু হয়ে থাকে, সেটা কোন গুরুতর সমস্যা নয়, এটা ভক্তিমূলক সেবার ক্ষেত্রে কোন বড় সমস্যা নয়। হিংসা –- ভক্তরা প্রত্যেককে কৃপা দিতে চান, তারা চান প্রত্যেকেই যাতে উন্নত হয়, তাই এখানে হিংসার কোন প্রশ্নই নেই। তারা কারও প্রতি হিংসা অনুভব করে না। এইভাবে কোন রিপুই ভক্তকে আটকাতে পারবেনা, কারণ হিংসা যার তার সাথে কোনোভাবেই সম্বন্ধ নেই, সেটা ছাড়া ভক্তরা সব কিছুকে শুদ্ধ করছেন ও এইভাবে আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় শুদ্ধ হতে পারি।
সেই রকম সাধু হওয়ার জন্য,জীবজন্তুদের দিয়ে হরিনাম করানোর ক্ষেত্রে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে তত শক্ত্যবিষ্ট হওয়া হয়ত কঠিন হতে পারে, যেমন চৈতন্য মহাপ্রভু ও কিছু ভক্তরা এমনকি জীবজন্তুদেরও দিয়েও হরিনাম করিয়েছিলেন। এটা ইতিহাসে দেখা গেছে, তবে প্রভুপাদ বলছিলেন যে অন্তত তুমি যাতে মানুষদের দিয়ে হরিনাম করাতে পারো, আমরা সেই প্রচেষ্টা করতে পারি। আমরা হয়ত পশুদের দিয়ে হরিনাম করাতে পারব না কিন্তু আমরা অন্তত মানুষদের দিয়ে তা করাতে পারি। তাই চৈতন্য মহাপ্রভু এই ধরনের প্রচারের জন্য দক্ষিণ ভারতে অনেক শক্তি প্রদান করেছিলেন। এছারাও এখানে বাংলায় শ্রীল প্রভুপাদ অনেক ভক্তকে শক্তি প্রদান করেছিলেন এবং সেই সমস্ত ভক্তরা শক্ত্যবিষ্ট হয়েছেন ও এইভাবে এটি প্রসারিত হচ্ছে। এখানে আমরা দেখি কত ভক্তরা চৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বারা শক্ত্যবিষ্ট এবং তারা অন্যান্য ভক্তদের শক্তি প্রদান করছেন। আমরা আশা করি এইভাবে নামহট্ট আন্দোলন সমগ্র লন্ডনে এবং বহু দূরে খুব তাড়াতাড়ি প্রতি নগর ও গ্রামে প্রসারিত হবে, তাতে অনেক মানুষেরা হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন-এর অমৃত লাভ করবে। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ! কোন প্রশ্ন আছে?
ভক্ত: আমরা কৃষ্ণের জন্য লোভী হতে পারি, কামুক হতে পারি, তবে বলা যাক আপনি রেগে আছেন, সেটাকে খুব সহজে সেবায় লাগানো কঠিন কারণ আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য কোন কিছু খুঁজতে হবে (ভক্তরা হাসছেন) — আপনি কিভাবে এর সমাধান করবেন? অন্যান্যগুলি খুবই সহজ (৪৭:১০ থেকে শ্রুতিহীন)
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এটা হচ্ছে কলিযুগ, এখানে সাধারণত যথেষ্ট সুযোগ আছে। ক্রোধ সেইরকম বিষয় নয়, এটা এমন নয় হিরনাক্ষ সে ক্রোধের সময় সবসময় যুদ্ধ করার জন্য কাউকে খুঁজত। যদি সে যুদ্ধ করার মতো কাউকে খুঁজে না পেত, তাহলে সে গিয়ে যুদ্ধ চর্চার জন্য পর্বত ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে আসত। যদি আপনি সেই রকম ব্যক্তি হন, তাহলে বিপদ না আসা পর্যন্ত পাহাড় ভাঙতে দেওয়া বেশ কঠিন। (ভক্তরা হাসছেন) আশা করি বেশিরভাগ মানুষেরা এখন সবসময় সেই রকম রেগে থাকে না। আমি বলতে চাইছি, তাদের হয়তো একটু রাগের স্বভাব আছে এবং কখনো কখনো মন্দির রক্ষা করা ক্ষেত্রে যদি কোন কিছু আসে, তাহলে তারা সেই মুহূর্তে তাদের ক্রোধকে ব্যবহার করতে পারে এবং এরপর পরবর্তী সুযোগ না আসা পর্যন্ত তাদের তা ধরে রাখা উচিত (ভক্তরা হাসছেন) এখন যদি আমরা এমন কোন পরিস্থিতি পাই যেখানে সমগ্র বিশ্ব খুবই শান্তিময় এবং এখানে কোন হিংসুক ব্যক্তি নেই, তাহলে ক্রোধ প্রকাশের কোন উপায় নেই, তখন আমাদেরকে কুস্তি খেলা বা এরকম কিছু করতে হবে বা আরও ভালোভাবে সমাধান করতে হবে। (ভক্তরা এবং শ্রীল জয়পতাকা স্বামী হাসছেন) শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ছাড়া আমি বলতে চাইছি এটা কেবলমাত্র শারীরিক বিষয় নয়। তবে অনেক সময় একজন ব্যক্তি এসে হয়ত কোন অপরাধজনক বা মূর্খতাপূর্ণ কথা বলবে, তখনও আপনি তর্কের মাধ্যমে কৃষ্ণকে সমর্থন করতে পারেন, (শ্রুতিহীন ৪৮:৪২) আলোচনার মাধ্যমেও আপনি কৃষ্ণকে সমর্থন করতে পারেন। সেই প্রতিরক্ষার স্বভাবের অর্থ মূলত হিংসামূলক আচরণ নয়, তবে আপনি তাও পারেন, যদি কেউ আক্রমণ করে তাহলে তা কেবলমাত্র এক প্রতি-উত্তর হতে পারে। সাধারণত মানুষেরা তত আক্রমনাত্মক নয়, কেবল কথার মাধ্যমে কিছু ধরনের আক্রমণ হতে পারে, আর আপনিও রাগ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, অজ্ঞানতার কারণে অনেকভাবে মানুষেরা কৃষ্ণের কৃপা লাভ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এইভাবে তারা কষ্ট ভোগ করছে। সেই ব্যক্তি হয়ত এই সব মানুষদের কষ্ট ভোগ দেখে ক্রোধ করতে পারে যে তারা ভুল পথে চালিত হচ্ছে এবং প্রতারিত হচ্ছে ও আরো অন্যান্য কিছু হচ্ছে এবং আপনি সেই সমস্যা থেকে এসব ব্যক্তিদেরকে সাহায্য করতে চান, তখন যদিও কাউকে তা করতে বেশ সুকৌশলী হতে হবে, তবে এটাও এক প্রকার ক্রোধ যে মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখা এবং তাদেরকে রক্ষা করতে চাওয়া। এটা হচ্ছে ক্রোধ এবং একই সময়ে অনুকম্পার সংমিশ্রণ। এইভাবে সেখানে ক্রোধ আছে, আপনি জানেন যে তারা ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে এবং আপনি তাদেরকে রক্ষা করতে চান। কৃষ্ণভাবনামৃত ক্রোধ অন্ধ নয়, এটা ধ্বংসাত্মক নয়, এক্ষেত্রে এই শক্তি চুঙ্গি দিয়ে এই লক্ষ্যে রাখা হয় যাতে তা গঠনমূলক হবে, যা মানুষদের বিপদ থেকে রক্ষা করবে। এখানে বিপদের অভাব নেই, ভ্রমিত হয়ে মানুষেরা কৃষ্ণভাবনাময় না হয়েই মৃত্যুবরণ করছে, এর কি কোন অভাব আছে? নিশ্চিতরূপে মানুষেরা বিপথে চালিত হচ্ছে এবং অজ্ঞতার কারণে তাদের নিত্য জীবনে প্রতারিত হচ্ছে। তাই কেউ এটাকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখতে পারে। যদি আপনার মধ্যে অনেক ক্রোধ থাকে, তাহলে আপনি এমনকি সেটিকে সামান্য ক্রোধ করার দিক থেকেও দেখতে পারেন, আর এরপর তার সাথে কিছুটা কৃপা মিশ্রিত করুন ও মানুষদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করুন। প্রভুপাদ, অবশ্যই কখনো কখনো একটু কড়া প্রচার করতেন, আপনি বলতে পারেন প্রায় ক্রোধকে ছুঁয়ে যাওয়া, কিন্তু তার বিভিন্ন মনোভাব ছিল, কখনো কখনো অত্যন্ত করুণা, কখনো অত্যন্ত জোর দিয়ে করা। আধুনিক সমাজের ক্ষেত্রে কখনও কখনও তিনি কড়া হতেন। আধুনিক জগত, আধুনিক শিক্ষা, আধুনিক লক্ষ্যসমূহ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কড়া বাক্য বলতেন। যখন তিনি দেখতেন যে মানুষেরা ভুল পথে চালিত হচ্ছে, তখন তিনি তাদেরকে রক্ষা করতে চাইতেন। তাই এটা স্থায়ী ব্যাপার ছিল না, তিনি ছিলেন কখনো কড়া আবার কখনো অধিক কোমল।
Lecture Suggetions
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ