Text Size

১৯৮২১২১৭ শ্রীমদ্ভাগবতম ৮.১৯.৪১

17 Dec 1982|Bengali||New Orleans, USA

১৯৮২১২১৭ শ্রীমদ্ভাগবতম ৮.১৯.৪১

 

নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, নিউ অরলেন্স, লউসিয়ানাতে প্রদান করেছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৮ম  স্কন্ধ, ১৯ অধ্যায়, ৪১তম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

শ্রীমদ্ভাগবতম ৮.১৯.৪১

পরাগ্ রিক্তমপূর্ণং বা অক্ষরং যৎ তদোমিতি।
যৎ কিঞ্চিদোমিতি ব্রূয়াৎ তেন রিচ্যেত বৈ পুমান্।
ভিক্ষবে সর্বমোঙ্কুর্বন্নালং কামেন চাত্মনে॥

অনুবাদ: ওঁ শব্দের উচ্চারণ মানুষের ধন-সম্পদের বিয়োগের সূচক, অর্থাৎ এই শব্দ উচ্চারণের ফলে মানুষ ধন-সম্পদের আসক্তি থেকে মুক্ত হয়, কারণ তা তার ধন-সম্পত্তিকে দূরে নিয়ে যায়। ধন শূন্য হওয়া অতৃপ্তিকর, কারণ তখন মানুষ তার বাসনা চরিতার্থ করতে পারে না। পক্ষান্তরে বলা যায় যে, ওঁ শব্দের ব্যবহারের ফলে মানুষ দারিদ্র্যগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে কেউ যখন দরিদ্র ব্যক্তি বা ভিক্ষুককে ওঁ শব্দ উচ্চারণ করে দান করে, তখন তার আত্ম উপলব্ধি এবং ইন্দ্রিয়তৃপ্তি অপূর্ণ থাকে।

তাৎপর্য: বলি মহারাজ ভিক্ষুকরূপে আগত বামনদেবকে সর্বস্ব দান করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বলি মহারাজের শৌক্র পরম্পরাগত কুলগুরু শুক্রাচার্য বলি মহারাজের প্রতিশ্রুতি সমর্থন করতে পারেননি। শুক্রাচার্য বৈদিক প্রমাণ প্রদর্শন করেছিলেন যে, দরিদ্র ব্যক্তিকে সর্বস্ব দান করা উচিত নয়। পক্ষান্তরে, দরিদ্র ব্যক্তি দানভিক্ষা করতে এলে তাকে মিথ্যা কথা বলা উচিত, “আমার কাছে যা কিছু ছিল তা সব আমি তোমাকে দিয়ে দিয়েছি। আমার কাছে আর কিছু নেই।” তাকে সর্বস্ব দান করা উচিত নয়। প্রকৃতপক্ষে ওঁ শব্দটির অর্থ ওঁ তৎ সৎ—পরম সত্য। ওঁকারের উদ্দেশ্য ধন-সম্পদের আসক্তি থেকে মুক্তি, কারণ ধন-সম্পদ ভগবানের উদ্দেশ্যে ব্যয় করা উচিত। আধুনিক সভ্যতায় মানুষের প্রবৃত্তি হচ্ছে দরিদ্রকে ধন-সম্পদ দান করা। এই প্রকার দানের কোন আধ্যাত্মিক মূল্য নেই, কারণ দরিদ্রদের জন্য বহু হাসপাতাল এবং অন্যান্য সংস্থা থাকলেও প্রকৃতির তিনগুণের প্রভাবে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ সর্বদাই থাকবে। বহু দাতব্য সংস্থা থাকলেও মানব-সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হয়নি। তাই এখানে বলা হয়েছে ভিক্ষবে সর্বমোঙ্কুর্বন্নালং কামেন চাত্মনে। দরিদ্র ভিক্ষুকদের সর্বস্ব দান করা উচিত নয়। মানব সমাজের এই সমস্যার সর্বশ্রেষ্ঠ সমাধান হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন। এই আন্দোলন সর্বদাই দরিদ্রদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। এই আন্দোলন কেবল দরিদ্রদের আহারের অন্নই দান করে তা নয়, কৃষ্ণভক্ত হওয়ার শিক্ষাদান করার মাধ্যমে তাদের দিব্যজ্ঞানও প্রদান করে। তাই ধনহীন এবং জ্ঞানহীন উভয় প্রকার দরিদ্রদেরই কৃষ্ণভাবনার অমৃত প্রদান করে তাদের চরিত্র সংশোধন করার জন্য আমরা সারা পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছি। এই অমৃতময় দিব্যজ্ঞান তাদের শিক্ষা দিচ্ছে কিভাবে অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ, নেশা, আমিষ আহার এবং দ্যূতক্রীড়া ত্যাগ করতে হয়। কারণ এই সমস্ত মহা পাপের ফলেই মানুষ জন্ম-জন্মান্তরে দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করে। ধন-সম্পদের সর্বশ্রেষ্ঠ সদ্ব্যবহার হচ্ছে এই ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে সকলেই একত্রে বসবাস করে তাদের চরিত্র সংশোধন করতে পারে। দেহের প্রয়োজনগুলি অস্বীকার না করে, আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে থেকে তারা সেখানে অতি সুখে-স্বচ্ছন্দে বাস করতে পারে এবং তাদের দুর্মূল্য সময় কৃষ্ণভাবনামৃতের উন্নতি সাধনে সদ্ব্যবহার করতে পারে। কারও যদি ধন-সম্পদ থাকে, তা হলে তা অনর্থক অপব্যয় করা উচিত নয়। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের প্রসারের জন্য তা ব্যবহার করা উচিত, যাতে সমস্ত মানব-সমাজ সুখ এবং সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে, এবং ভগবদ্ধামে উন্নীত হওয়ার আশা পোষণ করতে পারে। এই প্রসঙ্গে বৈদিক মন্ত্রে বলা হয়েছে—

       পরাগ্বা এতদ্রিক্তমক্ষরং যদেতদোমিতি তদ্‌ যৎ কিঞ্চিদোমিতি আহাত্রৈবাস্মৈ তদ্রিচ্যতে।
স যৎ সর্বমোঙ্কুর্যাদ্ রিচ্যাদাত্মানং স কামেভ্যো নালং স্যাৎ।

ইতি কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কৃত “বলি মহারাজের কাছে বামনদেবের দানভিক্ষা” নামক শ্রীমদ্ভাগবতের ৮ম স্কন্ধ, ১৯ অধ্যায়, ৪১তম শ্লোকের তাৎপর্য। 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এখন আমরা বুঝতে পারছি যে কেন ভারতবর্ষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। এত বেশি ওঁ বলে, কিন্তু যথেষ্ট হরে কৃষ্ণ বলে না। (হাসি) হিন্দু সম্মেলন, হিন্দু মেলার জনসমাবেশে তারা সব মানুষদের দিয়ে একত্রে ‘ওঁ’ বলে চিৎকার করায়। যখন তারা ভোট চায়, তাদের সমর্থনকারীরা ওঁ বলে। এরপর তারা কৃষ্ণভাবনাময় ব্যক্তিদের অনুদান না দিয়ে, কেবল ভিক্ষুকদের জন্য হাসপাতাল খোলে, এই সমস্ত কার্য করে। 

এখানে আমরা দেখতে পারছি যে শুক্রাচার্য ভাবছিলেন, তারা তাদের সমস্ত ধন-সম্পত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন। এই কারণেই মানুষেরা এত দরিদ্র যে শঙ্করাচার্যের তত্ত্ব-দর্শন, নির্বিশেষ তত্ত্বের কারণে তারা শ্রীকৃষ্ণের সেবা করা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু আসলে শ্রীকৃষ্ণ যেখানে অবস্থান করেন, লক্ষ্মী দেবীও সেখানেই থাকেন। লক্ষ্মী দেবী বা সৌভাগ্য দেবী, যিনি সকল ধন ও ঐশ্বর্যের প্রতিনিধিত্ব করেন, বিষয়ী ব্যক্তিরা সবসময় তাঁর কামনা করে, তারা সবসময় লক্ষী দেবীর কাছে তাঁকে তাদের সাথে থাকার জন্য প্রার্থনা করে, বিশেষত জুয়ারীরা ও ব্যবসায়ীরা প্রার্থনা করে যে সৌভাগ্য যেন তাদের সাথে থাকে। তিনি চঞ্চলা হিসেবে পরিচিতা। তিনি খুবই চঞ্চল। তিনি কোথায় অবস্থান করবেন, সেই বিষয়ে তিনি খুবই খামখেয়ালি। তিনি কেবল এক স্থানেই থাকেন না, তিনি চঞ্চল প্রকৃতির, তিনি এক স্থানে দীর্ঘক্ষন থাকেন না। তিনি কিছুক্ষণ থাকেন ও তারপর সেই স্থান ছেড়ে চলে যান, কিন্তু একটি স্থানে তিনি সর্বদা বিরাজ করেন, সেটি হচ্ছে—শ্রীকৃষ্ণের বক্ষস্থল, নারায়নের বক্ষস্থল। তিনি সর্বদা হয় তাঁর শ্রীপাদপদ্মের সেবা করছেন, অথবা তাঁর বক্ষস্থানে অবস্থান করছেন। তিনি সবসময় নারায়নের সাথে বিরাজ করেন।

যদি কেউ সৌভাগ্য লক্ষ্মীকে পেতে চায়, তাহলে সবথেকে সহজতর পন্থা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণকে আকর্ষণ করা। আমরা সংকীর্তনে নিযুক্ত হলে, শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করলে, এর দ্বারা তিনি অতি সহজেই আকর্ষিত হন। যখন অনেক ভক্ত একত্রে মহিমা কীর্তন করেন, তখন তা হচ্ছে সংকীর্তন। যখন কয়েকজন একত্রে তা করেন, সেটি হচ্ছে কীর্তন। যখন একজন আলাদাভাবে করেন, তখন এটি হচ্ছে জপ অথবা কীর্তন। ঠিক যেমন এখন সমগ্র বিশ্বে ভক্তরা হয়ত শারীরিকভাবে এক স্থানে নেই; কিন্তু তাদের চেতনার দ্বারা তারা সকলে একত্রে আছেন। তারা সকলেই সংকীর্তন যজ্ঞে নিযুক্ত এবং সকলেই শ্রীকৃষ্ণের মহিমা-কীর্তন যুক্ত আছেন। তাই এই সংকীর্তন যজ্ঞ, শ্রীকৃষ্ণের মহিমা-কীর্তন আসলে সকল মানুষের জন্য জড়জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় ক্ষেত্রেই সৌভাগ্য আনায়ন করে। এমনকি যদি কোন ব্যক্তি কোন না কোনভাবে অজ্ঞানতাবশত শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত হন, যা হচ্ছে অজ্ঞান সুকৃতি বা অজ্ঞাত সুকৃতি, শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নিবেদিত অজ্ঞাত সেবা, তাহলে এর অর্থ ঘটনাচক্রে ব্যাক্তি তা সম্পাদন করলে, এমনকি তিনিও এর দ্বারা লাভবান হবেন।

বেদে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে যে—একটি ঘৃত সলতে প্রায় প্রশমিত হওয়ার অবস্থায় ছিল এবং সেই মুহূর্তে আমার মনে হয় একটি ছোট ইদুর, ইদুর অথবা আরশোলা বা এমন কোন কিছু ছিল। আমার মনে হয় সেই সময় একটি ইঁদুর এসেছিল এবং সেই ছোট্ট কাপড়ের সলতে-র মধ্যে যা কিছু ঘি লেগে ছিল, তা খাওয়ার জন্য সে সেটিকে ঠেলেছিল। কিন্তু তখনও সেই অগ্নিশিখা দপদপ করছিল ও প্রায় নিভে যাওয়ার মুহূর্তে ছিল, কিন্তু যখনই সেই ইঁদুর তা খাওয়ার জন্য ঠেলা দিয়েছিল, তখন তা জ্বলে ওঠে, কারণ সেই অগ্নিশিখা জ্বলে ওঠার জন্য আরো কিছুটা সলতের অংশ পেয়েছিল, এবং তাই এতে আগুন জ্বলে উঠেছিল। এর ফলে সেই ইঁদুর ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। পরে সেই ইঁদুরটি বৈকুন্ঠ লোকে উন্নীত হয়েছিল। যেহেতু সে সেই সেবা করেছিল, তাই তাকে আর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয়নি। সেই সেবার পরেই ইদুরটি মারা যায় ও এই ঘটনাটিকে এইভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল যে—সে ভগবানকে আরতি করেছিল, তার ঠেলা দেওয়ার কারণে অগ্নিশিখা জ্বলে উঠেছিল। তা নিভে যাওয়ার মুহূর্তে ছিল, তবে সে এই কার্য করেছিল, অবশ্য ইঁদুরের এই সম্পর্ক কোন ধারণাই ছিল না। এটি হচ্ছে অজ্ঞাত-সুকৃতি। 

অন্যভাবে বলতে গেলে, এমন কি সামান্য সেবা, বিশেষত তা যদি সরাসরি ভগবানের জন্য সম্পাদিত হয়, তাহলে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! এমনকি, বিশেষত ব্রহ্মচারীদের দায়িত্ব হচ্ছে বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিক গুরুর জন্য ভিক্ষা করা। ভারতে, শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে এই উদাহরণ দিয়েছিলেন যে ব্রহ্মচারীদের প্রত্যেকদিন গৃহস্থের দ্বারে দ্বারে যাওয়া উচিত এবং ভিক্ষা গ্রহণ করা উচিত এবং আধ্যাত্মিক গুরুদেবের কাছে তা ফিরিয়ে নিয়ে আসা উচিত। তিনি আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন যে কিভাবে তাদের ভিক্ষার ক্ষেত্রে… একসময় প্রথমদিকে যখন তারা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের জন্য প্রচার করছিলেন, সেই সময় কলকাতায় গৌড়ীয় মঠ সবে প্রারম্ভ হয়েছে, তখন এত অল্প ভিক্ষা পাওয়া যেত যে তা সবার জন্য যথেষ্ট ছিল না, তা যথেষ্ট ছিল না। কেবল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের হয়ে সামান্য কিছুই বাঁচত। তারা প্রথমত সবকিছু প্রস্তুত করতেন এবং তা সবকিছু আধ্যাত্মিক গুরুদেবকে প্রদান করতেন। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর ক্রন্দন করতেন যে কিভাবে এর দ্বারা হবে ও তিনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে আরো কিছু ভিক্ষা দানের জন্য প্রার্থনা করতেন, কারণ তা সকলের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এটি ছিল এক বড় তপস্যার বিষয়। এটি ছিল কৃষ্ণ কর্তৃক পরীক্ষা, কিন্তু এইভাবেই তারা চলতে থাকেন ও অবশ্য অবশেষে গৌড়ীয় মঠে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের প্রচারের কারণে, তাঁর শুদ্ধতার কারণে প্রচার আরো আরো অধিকমাত্রায় প্রসারিত হয়েছিল, এবং তারা সেই সমস্ত কঠিনতা অতিক্রম করেছিলেন। তাই কখনো কখনো কঠিন পরিস্থিতি থাকে এবং কখনো কখনো কিছু ভালো পরিস্থিতি থাকে, কিন্তু বিনম্রতা, দৃঢ়তার গুণ বিকশিত করার জন্য ও নিরাসক্ত হওয়ার জন্য ভক্তের এরূপ তপস্যা করার কথা। কোন ব্যক্তি কিছু প্রদান করুন বা না করুন, ভক্ত কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করা বা পরের জনের থেকে ভিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করা বন্ধ করেন না। ভক্ত এই সুযোগ প্রদান করেন, তিনি আরো আরো নিখুঁতভাবে ইতিবাচক পদ্ধতিতে কৃষ্ণসেবার দিকটি উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন, কিন্তু সেই ব্যক্তি সেবায় নিযুক্ত হবেন কিনা সেটি সেই ব্যক্তির সৌভাগ্যের উপর, ভক্তের ইচ্ছার উপর ও ভগবানের কৃপার উপর নির্ভর করে। যারা ভক্তের কৃপায় কোন না কোনভাবে ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হতে পেরেছেন, এটি হচ্ছে তাদের চিরস্থায়ী লাভ।

আমরা পড়েছি যে কিভাবে কোন ব্যক্তি কৃষ্ণভাবনামৃতে এলে, এর জন্য তাদের পূর্ববর্তী কোনো সুকৃতি দরকার। অবশ্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিশেষ কৃপা হচ্ছে যে, এমনকি কোন ব্যক্তি সুকৃতি ব্যতীতও এই আন্দোলনে যুক্ত হতে পারেন। কিন্তু তা কিভাবে হবে? এটি হয় ভক্তের কোন ব্যক্তিকে সেবায় নিযুক্ত করার মাধ্যমে। এর দ্বারা তাদের আধ্যাত্মিক সুকৃতি সঞ্চিত হতে শুরু করে। যদি ব্যক্তি সবেমাত্র মন্দিরে আসেন এবং তৎক্ষণাৎ যদি তার মধ্যে ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হওয়ার আগ্রহ থাকে, শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে শ্রবণ করার প্রতি আগ্রহ থাকে, হরিনাম করার প্রতি আকর্ষণ থাকে, তাহলে তা এক অতি উন্নত স্তর। যদি কোন ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ও তার মধ্যে এই সমস্ত লক্ষণ আছে, তাহলে এটি এই ইঙ্গিত দেয় যে সম্ভবত সেই ব্যক্তি তার পূর্ববর্তী জীবনে কোন ধরনের ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত ছিলেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষেরা আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি খুব একটা আগ্রহী হয় না, এই বিষয়ে তাদের তত বেশি আকর্ষণ থাকে না এবং মূলত তারা তাদের জাগতিক চিন্তাভাবনা এবং জড়বিষয়ী কার্যকলাপের মধ্যেই নিমগ্ন থাকে। যদি কোন ভক্ত অহৈতুকি কৃপাবশত বাইরে বের হন ও এই সমস্ত ব্যক্তিদের সেবায় নিযুক্ত করেন, তাদের থেকে অনুদান গ্রহণ করেন, তাদেরকে শাস্ত্রগ্রন্থ প্রদান করেন ও সেই সংগৃহীত অর্থ কৃষ্ণকে প্রদান করেন বা কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য ব্যবহার করেন, তাহলে সেই সমস্ত ব্যক্তিদের জন্য তা সর্বশ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ। লক্ষ্মীকে ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়, তা কেবল ভগবানের শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবার জন্যই ব্যবহৃত হওয়া উচিত। 

শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি অনুদান গ্রহণ করে, ও সেই অর্থ নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য ব্যবহার করে, তাহলে যে ব্যক্তি অনুদান দিয়েছেন, তিনি তার প্রতি ঋণী হয়ে যায়  এবং এর ফলস্বরূপ সেই ব্যক্তিকে তার অর্থের ঋণ পরিশোধ করার জন্য ভবিষ্যৎ জন্মে তাকে হয়ত সেই ব্যক্তিকে তার পুত্র বা কন্যা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য, কর্মের দিক থেকে বিচার করলে, ভিক্ষা গ্রহণের বৃত্তি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু একজন কৃষ্ণভাবনাময় ভক্ত সেই অর্থ নিজ ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য ব্যবহার করেন না, তিনি তা গুরু কৃষ্ণের সেবায় প্রদান করেন। সেই ব্যক্তির যা কিছু কর্ম হয়, তখন সেই অর্থে তার ঋণের পরিবর্তে শ্রীকৃষ্ণ অনুদাতার প্রতি ঋণী হন। সেজন্য সেই ব্যক্তি(অনুদাতা) শ্রীকৃষ্ণের আরো আরো সেবা করার সুযোগ পান এবং চরমে তিনি পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন। অবশ্য কোন ভক্ত যদি সেই চক্র সম্পন্ন না করেন, তাহলে অবশ্য ভবিষ্যতে তাকে হয়ত তেমন অস্বাভাবিক কোন সন্তান গ্রহণ করতে হবে। এটি বলা কঠিন, তবে সেক্ষেত্রে এই বিষয়ে তার কর্ম বিজড়িত হয়েছে।

কখনো কখনো মানুষেরা খুবই কৃপণ হয়, তারা কোন অর্থ প্রদান করতে চায় না। আমার মনে পড়ে, একসময় একজন ভক্ত কলকাতাতে প্রচার করছিলেন এবং সেই ব্যক্তি খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল, “ওহ আপনারা মহান ভক্তগণ! আপনারা আমার বাড়ি ধন্য করলেন।” খুব খুব আগ্রহী ভারতীয় ব্যক্তি। এক ঘণ্টা ধরে তার সাথে কথা বলার পর ও খুবই বন্ধুত্বপূর্ণভাবে প্রচার করার পর, সেই ভক্ত জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তিনি এক টাকা দিয়ে সেই ম্যাগাজিনটি কিনতে পারেন। তিনি তাকে একটি ম্যাগাজিন দিয়েছিলেন, “ওহ খুব সুন্দর ম্যাগাজিন! খুবই অসাধারণ!” তার বড় বাড়ি আছে এবং তারপর ভক্ত তাকে বললেন, “আপনি কি এর ছাপানোর মূল্য হিসেবে ১ টাকা অনুদান দিতে পারবেন?”
“ওহ এটা বিনামূল্যে নয়?”
এরপর তিনি সেই ম্যাগাজিন ফেরত দিয়ে দেয়। তিনি তাকে বলল, “দয়া করে, দয়া করে এক গ্লাস জল খেয়ে যান।”
“না! না! ঠিক আছে।”
“না! না! দয়া করে এক গ্লাস জল খেয়ে যান।”

তিনি তাকে ১ গ্লাস জল খাওয়ার জন্য জোর করছিল, “না! না! না!” তিনি তাকে ১ গ্লাস জল দিল ও অবশেষে ভক্ত বললেন, “ঠিক আছে, আপনি জল দিতে পারেন, আমি একটু জল গ্রহণ করব,” (হাসি) তাই কখনো কখনো আপনি এমন ব্যক্তিদের সম্মুখীন হবেন, যারা এত কৃপণ যে আসলে তারা কৃষ্ণের ভক্তিমূলক সেবার জন্য কোনো অর্থ দিতে চায় না। তারা সবকিছু করতে আগ্রহী, কিন্তু আসলে তাদের কাছে যেটা প্রিয় তা হচ্ছে—তাদের অর্থ, তাদের লক্ষ্মী, তা তারা দেবে না, সেটা কৃষ্ণের সেবায় প্রদান করা হোক।

আরেকটি ঘটনা শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে বলেছিলেন যে, একজন ব্রহ্মচারী ছিলেন, যিনি দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভিক্ষা করতেন, কিন্তু কেউই তাকে কোন অনুদান দিত না, কেউই কোন কিছু দিত না, কিছুই নয়। তিনি প্রত্যেক স্থানে যেতেন, আর তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করত। অবশেষে তিনি একটি গৃহে গেলেন এবং গৃহের মহিলা বাইরে এল এবং তিনি তাকে বললেন, “আপনি কি আমাকে গুরু-কৃষ্ণের সেবার জন্য কোন অনুদান দিতে পারেন?” তার স্বামী, যে বসে খাবার গ্রহণ করছিল, সে(স্ত্রী) তাকে বলল—“একজন ব্রহ্মচারী এসেছেন, তিনি জানতে চান যে আমাদের কাছে তাকে দেওয়ার মতো কিছু আছে নাকি।”
সে বলল, “আমাদের কাছে কিছু নেই।”
“কিচ্ছু নেই? কোন একটু কিছু?”
সে বলল, “কিছুই নেই। আমাদের কাছে কি কিছু আছে? তাকে বলো তিনি আমাদের উনান থেকে ছাই পেতে পারেন।” সে(স্ত্রী) বলল, “ওহ আপনি আমাদের উনান থেকে ছাই গ্রহণ করতে পারেন।” ছাই এর কি মূল্য আছে? এর কোন মূল্য নেই! এটা হচ্ছে যেন বলা যাক—আপনি সিগারেটের ছাই ফেলার পাত্র থেকে সেই ছাইগুলো গ্রহণ করতে পারেন। এটা তো মূল্যহীন। তখন সেই ব্রহ্মচারী বললেন—কেউই কোন কিছুই দিচ্ছেন না, অন্তত তারা কিছু একটা দিচ্ছেন। তিনি বললেন, “ঠিক আছে আমাকে তাই দিন। আপনারা দিচ্ছেন না কেন? আপনারা কেন কেবল বলছেন?” (হাসি) তারপর প্রভুপাদ এই বলে হাসছিলেন যে, “আমাকে আপনাদের ছাই দিন, এই ব্যাপারে কথা বলা বন্ধ করুন।” (হাসি) বিষয়টি হচ্ছে যে এমনকি যদি তারা এই বিষয়টি বলে ও এরপর তা প্রদান করে, তাহলে অন্তত তারা কোন কিছু দেওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে, এর দ্বারা তারা লাভবান হবে। সাধারণত গৃহস্থরা… আমরা এখানে দেখি শুক্রাচার্য, তার যে মনোভাব, তিনি বলছেন, “ঠিক আছে অনুদান দাও, কিন্তু তাঁকে বলো যে তোমার কাছে শুধু এটাই আছে। কেবল সামান্য পরিমাণ দান দাও, সব কিছু দিও না। ইনি হচ্ছেন বিষ্ণু, ইনি তোমার সবকিছু হরণ করে নেবেন।” এটাই তিনি বলছিলেন, তার যুক্তি কোনো সাধারণ ভিক্ষুকের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু অবশ্য ইনি হচ্ছেন বিষ্ণু। তিনি বিষ্ণু, তিনি সবকিছু গ্রহণ করে নেবেন। তখন বলি মহারাজ, তাঁর হৃদয় ছিল এক ভক্তের। তাঁর পিতামহ ছিলেন প্রহ্লাদ মহারাজ। তিনি জানতেন যে—“সবকিছু বিষ্ণুকে প্রদান করা আমার কর্তব্য। তিনি হচ্ছেন সবকিছুর মালিক। তিনি আমার থেকে ভিক্ষা করছেন এবং আমি তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। তাহলে এখন আমি কিভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি?”

শুক্রাচার্য সাধারণ নৈতিকতা, বেদের সাধারণ যুক্তি ব্যবহার করছিলেন—“যদি কোন ভিক্ষুক আসে, তাহলে অবশ্যই তুমি তোমার সবকিছু সেই ভিক্ষুককে প্রদান করবে না, কারণ তাহলে সে তোমার সবকিছু গ্রহণ করবে এবং সে হয়ত এর অপব্যবহার করবে। তখন তোমার কাছে আর কোন অর্থ থাকবে না, তাহলে তুমি জাগতিকভাবে কিভাবে ক্রিয়াশীল থাকবে? কিভাবে আধ্যাত্মিকভাবে নিজেকে কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করতে পারবে?” এটি হচ্ছে বেদের জাগতিক নৈতিকতা, সাধারণ ক্ষেত্রে ব্যবহারিক নির্দেশ, কিন্তু এই ঘটনাটি সাধারন নয়। এক্ষেত্রে শ্রীবিষ্ণু স্বয়ং এসেছেন। একইভাবে এই সমস্ত মানুষেরা হয়ত চিন্তা করতে পারে যে আমি এই ভক্তদেরকে কোন কিছু দেব, এই ব্যক্তিদেরকে কিছু দেব। কিন্তু আসলে এমনকি যদি তারা সবকিছু তাদেরকে দান করে, তাহলেও তারা কোন কিছুই হারাবে না। যদি তারা কোন সাধারন ভিক্ষুককে সবকিছু প্রদান করে, তাহলে হয়ত তারা সব হারিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তারা যদি কোন ভক্তকে সবকিছু প্রদান করে, তাহলে এমনকি যদিও সাধারন অর্থে তারা যা যথাযোগ্য মনে করে, তার থেকে অধিক দান করছে, কিন্তু তবুও আসলে তারাই অসীম লাভবান হচ্ছে বা আরও অধিক লাভ পাচ্ছে। 

এমনকি কলকাতায় একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের প্রতি অত্যন্ত ভক্তিযুক্ত ছিলেন এবং তার জীবনের শেষ পর্যায়ে যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর মায়াপুরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্য একটি মন্দির নির্মাণ করতে চান, তখন তিনি তার শেষ অর্থও দিয়ে দিয়েছিলেন, লক্ষ লক্ষ টাকা, সবকিছু দিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন, যাকে বলা হয় লাখপতি, সেই সময় তখনকার দিনে তা হচ্ছে কোটিপতির মত এবং তিনি তার শেষ অর্থ, শেষ পয়সা, সব কিছু ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরকে দিয়ে দিয়েছিলেন। এবং তখন ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর, আমার মনে হয় কেবল তাকেই তিনি বাবাজি উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি, যাকে তিনি বাবাজি উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি তত বেশি প্রচার করতে সক্ষম ছিলেন না, তিনি সবসময় ব্যবসা করতেন, তিনি বৃদ্ধ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে—“তুমি এখানে থাকো।” তিনি তাদের মন্দিরের পাশে ছিলেন এবং সারা জীবন জপ করেছিলেন ও মন্দিরের জন্য কিছু সেবা করেছিলেন। আপনারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব স্থানের প্রবেশদ্বারের কাছে গেলে, দেখবেন বাম পাশে একটি ছোট মন্দির আছে এবং সেই ব্যক্তির শ্রীমূর্তি সেখানে আছে। আমার মনে হয় তারা সেই শ্রীমূর্তি এবং তার সমাধিও সেখানে রেখেছেন। নিশ্চয়ই সমাধি বা সেখানে কোন মন্দির আছে, এবং এটিই হচ্ছে সেই ব্যক্তির ইতিহাস। তিনি তার সবকিছু দিয়ে দিয়েছিলেন। আসলে সবকিছু এইভাবে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েছিলেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই শ্রীকৃষ্ণ—“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্” (গীতা ৪.১১) কৃষ্ণ বলেছেন, “ব্যক্তি যেমন ভাবসহ আমার প্রতি শরণাগত হয়, আমি তার সাথে তেমনভাবেই ভাব-বিনিময় করি” স্বাভাবিকভাবেই সেই ব্যক্তি সবকিছু শ্রীকৃষ্ণকে প্রদান করেছেন, তাই শ্রীকৃষ্ণও তাকে সবকিছু প্রদান করবেন, তাঁর নিত্য ভক্তিমূলক সেবা প্রদান করবেন। কৃষ্ণ দেখেন আমরা কতটা নিজের কাছে ধরে রাখছি। যদি আমরা কোন কিছুই নিজের কাছে ধরে না রাখি, যদি আমরা চেষ্টা করি বা অন্তত এই বাসনা করি বা কোন কিছু নিজের কাছে না ধরে রাখার চেষ্টা করি, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কৃষ্ণ পূর্ণরূপে ভাব-বিনিময় করবেন। তাই প্রত্যেক সেবার ক্ষেত্রেই কিছু নির্দিষ্ট সময় আসে, যখন পূর্ণরূপে শরণাগতির অতি উচ্চ সুযোগ লাভ হয়।

মন্দির অধ্যক্ষের সেবার ক্ষেত্রেও এমন অনেক সময় থাকে, যখন সেই ব্যক্তির উপর অনেক চাপ পড়ে। বিভিন্ন প্রচারের ক্ষেত্রে, সংকীর্তনের ক্ষেত্রেও এইরকম চাপের পরিস্থিতি থাকে। অবশ্য এক্ষেত্রে ম্যারাথনের সময় সবথেকে চাপ পরে। তখন সবাই সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত পুরো শক্তি এটির প্রতি কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করেন এবং বিশেষত পাশ্চাত্যে যে ভালো সুযোগ আসে, তা হচ্ছে ক্রিস্টমাসের সময়, যখন মানুষেরা তবুও কিছুটা দান দেওয়ার মতো দয়ালু মনোভাবে থাকে। এবং আসলে সাধারণত তারা ভিক্ষুকদের দান দেয় বা সাধারণত তারা নিজেদের পরিবারের সদস্যদেরকে বিভিন্ন কিছু প্রদান করে। দান গৃহ থেকে শুরু হয় এবং সম্ভবত সাধারণত সেখানেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সাধারণ অর্থে তারা তখন একটু দান দেওয়ার মনোভাবে থাকে। তখন তারা কিছু অতিরিক্ত পারিশ্রমিক বা অতিরিক্ত বেতন পায়। ভক্তদের ক্ষেত্রে অনেক ব্যক্তিদের জন্য অসীম সুকৃতি, আধ্যাত্মিক সম্পদ তৈরি করে দেওয়ার এটি একটি সুযোগ, এমনকি সেই ব্যক্তিরা এই সম্বন্ধে জানুক বা না জানুক। যদি তারা জেনে বুঝে তা প্রদান করেন যে এটি কৃষ্ণের জন্য, তাহলে তারা এমনকি তাদের চেতনার জন্য আরও অধিক লাভ পাবেন। কিন্তু এমনকি যদি অজ্ঞাতভাবেও তারা দান দেয়, তাহলে তবুও তারা এর লাভ পাবে, যতক্ষণ আমরা খুব সতর্কতা সহ এটি লক্ষ্য রাখব যে সবকিছু যেন কৃষ্ণের সেবায় যায়। এমনকি যদি একজন ব্যক্তি জ্ঞানত তা প্রদান করেন, কিন্তু ভক্ত যদি ষেই অনুদান প্রদান না করেন, তাহলে এমনকি তবুও সেই ব্যক্তি লাভবান হবেন। প্রভুপাদ বলেছিলেন যে—“তখন সেই ভক্তের এক অপরাধ হবে।” কিন্তু তারা যদি অজ্ঞাতভাবে অনুদান দেন, তাহলে অবশ্য এটা সেই ভক্তের উপর নির্ভর করছে যে তিনি সেটি কি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন, তাহলে সেই মতো তাদের সাথে ভাব-বিনিময় হবে।

অতএব, এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে সবাই সবকিছু কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য প্রদান করছেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, এর দ্বারা এক অসীম, সীমাহীন প্রতিদান লাভ হয়। একজন ভক্ত যিনি কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করছেন, এর অর্থ যে সমস্ত ব্যক্তিদের উদ্ধার হচ্ছে, বলা যাক তার জন্য একজন ব্যক্তির অবদান আছে, তাহলে সেই প্রচারের জন্য তিনি কৃপার ভাগ লাভ করেন, যা হচ্ছে অসীম। প্রচারের অর্থ হচ্ছে জীবাত্মাকে জাগতিক জন্ম-মৃত্যু থেকে মুক্ত করা।  এইভাবে তারা এত কৃপা লাভ করেন, যা যে কোন প্রকার গণনার ঊর্ধ্বে। তাই এটি এক মহৎ সুযোগ। সেজন্য যদি ভক্ত প্রত্যেক সম্ভাব্য ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর প্রতি খুবই উৎসাহী হন, হয়ত সামান্য বেশি উৎসাহ, সামান্য বেশি কেন্দ্রীভূত প্রচেষ্টা থাকলেও অন্য ১০ জন, ২০জন ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো যাবে। অবশ্য এইভাবে আমরা লক্ষ্মীও প্রাপ্ত হই, যা আমাদের প্রচারের জন্য, অনুষ্ঠানাদির জন্য, গ্রন্থ বিতরণের জন্য প্রয়োজন। এমন নয় যে আমরা বিমূর্ত, অর্থ থেকে বিচ্ছিন্ন। আমার মনে পড়ে, একসময় শ্রীল প্রভুপাদ একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন যে—ভারতে একজন সাধু ছিল, যিনি লক্ষ লক্ষ টাকা, অনেক অর্থ সংগ্রহ করত, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি তা স্পর্শ করত না। তিনি সবকিছু সামনে রাখত এবং তার হাত এইভাবে পিছনে সরিয়ে নিত ও সেই সবকিছু সামনে রাখত ও তার সচিবকে দিয়ে সব অর্থ তুলিয়ে নিত, কিন্তু তিনি নিজে কোন অর্থ স্পর্শ করত না। তখন শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, “আমি এমন করব না যে নিজের হাত পিছনে করে রাখব, আমি এমন করব যে—‘দুই হাত পেতে আছি, দান করুন।’ (হাসি) আপনি যত ইচ্ছা অর্থ দিন, কারণ আমি এই সবকিছু কৃষ্ণের জন্য ব্যবহার করব।” আমরা নির্বিশেষবাদী নই, আসলে নির্বিশেষবাদী, তার কিসের জন্য অর্থ দরকার? তাদের অর্থের কোন প্রকৃত ব্যবহার নেই। তবুও তারা অর্থ সংগ্রহ করছে, মন্দির তৈরি করছে, এমনকি যদিও তারা আসলে প্রচার করছে না। তারা যে কার্য করছে তা হাস্যকর। এই কৃষ্ণভাবনামৃত খুবই স্পষ্টভাষী, এমন নয় যে আমরা কোন বিষয়ে লাজুক। আমাদের পূর্ণ অধিকার আছে, আমরা হচ্ছি করগ্রাহক। আমাদের বিষয়ী ব্যক্তিদের হাত থেকে লক্ষী গ্রহণ করে তা কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করার পূর্ণ অধিকার আছে।

অবশ্য একজন প্রচারক হচ্ছে ঠিক সাদা পাতার মত, এর অর্থ যেকোনো ধরনের কালিমা বা যেকোনো ধরনের অভিযোগ ভবিষ্যতে অনেক কিছু বিষয় তুলে ধরবে ও প্রচারকে আরো আরো কঠিন করে তুলবে। সেজন্য ভক্তকে ভবিষ্যতে অনুদান গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের মনে কোন ধরনের কলঙ্ক সৃষ্টি করার বিষয়টি এড়িয়ে চলতে হবে। যার অর্থ হচ্ছে এই যে, কাউকে বিভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা বিচক্ষণতা দেখাতে হবে। একইসাথে কেউ যত বেশি সম্ভব মানুষদেরকে নিযুক্ত করার চেষ্টা করবে। এর ফলে একজন প্রকৃতপক্ষেই তাদের প্রতি এক বিরাট সেবা সম্পাদন করছেন এবং এর মাধ্যমে এত এত গ্রন্থ মুদ্রণ করা, ভগবানের বিভিন্ন ভক্তিমূলক সেবা করার সুযোগও হচ্ছে। এটিই হচ্ছে সাধারণ ধারণা।

এখানে শুক্রাচার্য ধন সংরক্ষণের বিষয়ে খুবই সচেতন, কিন্তু আমরা শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশাবলীর মাধ্যমে বুঝতে পারি যে—আমাদের অধিক সচেতন এটি দেখার বিষয়ে হওয়া উচিত যে সমস্ত সম্পদ যেন কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহৃত হয়। তাহলে কারও সৌভাগ্য, আধ্যাত্মিক ও জাগতিকভাবে জীবনের সফলতা, সব দিক রক্ষিত হবে। ঠিক যেমন শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেছেন, “যোগক্ষেমং বহাম্যহম্” (গীতা ৯.২২)—“আমি তোমার প্রাপ্ত বস্তু সংরক্ষণ করব এবং প্রয়োজনীয় বস্তু প্রদান করব।” এটি হচ্ছে ভক্তদের জন্য। তাই ভক্ত হচ্ছেন সরল, তার একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে কেবল এটি দেখা যে তার প্রতিটি চিন্তা, শব্দ এবং কার্য যেন ভগবানের সেবায় নিযুক্ত থাকে এবং কৃষ্ণ তিনি ভক্তের যত্ন গ্রহণ করেন। আমরা কৃষ্ণের প্রতি যত নির্ভরশীল হব, ততই কৃষ্ণ সেই ভাব-বিনিময় করেন। এই নির্ভরশীলতার অর্থ এই নয় যে কোন কাজ না করা, এর অর্থ সক্রিয় নির্ভরশীলতা অর্থাৎ গরুদেবের নির্দেশ, বৈষ্ণবগণের নির্দেশ ও আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার অনুবর্তী হয়ে কৃষ্ণ সেবার উদ্যোগ গ্রহণ করা। এবং সেই সেবা সম্পাদনের সময়ও কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল থাকার, কৃষ্ণের থেকে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা গ্রহণের শিক্ষা গ্রহণ করা, কোন জাগতিক বিষয় থেকে নয় যা হয়ত উপস্থিত থাকতে পারে অথবা না-ও থাকতে পারে। এইভাবে কেউ অত্যন্ত অবিচলিত হয়ে ওঠেন  এবং কৃষ্ণভাবনামৃতে স্থির হওয়ার প্রতি অতি অতি দৃঢ় মনস্থ হয়ে ওঠেন।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

কোন প্রশ্ন আছে? হ্যাঁ?

ভক্ত: চরমে সংকীর্তনের যে মূল উদ্দেশ্য (শ্রুতিহীন)

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: তারা কি বলে? ভালো, আরও ভালো এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। এর একটি দিক হচ্ছে যে একজন ভক্ত কত আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করছেন। যদি সেই ব্যক্তি চেষ্টা করেন, ও তার শক্তিকে অন্য কোন দিকে বিক্ষিপ্ত না করেন, সেক্ষেত্রে সব কিছুরই নিজস্ব প্রবলতা আছে। একজন ব্যক্তি হয়ত পুরো সময় সেবায় নিযুক্ত, কিন্তু তার বেগ বা তার প্রেরণা হয়ত তার সম্ভাব্য কার্যকরী শক্তির বেগের অর্ধেক।

ঠিক যেমন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিকে তার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। আপনি রামায়ণ পড়ুন যে কিভাবে হনুমান ও এই সমস্ত ব্যক্তিরা সেই সব অসুরদের, রাবণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সেই যুদ্ধ এতই আক্রমণাত্মক ছিল যে তারা পর্বত তুলেছিলেন, তাদের হাত কাটা গিয়েছিল, তারা পূর্ণশক্তি সহ এগিয়েছিলেন। দিনের পর দিন এই যুদ্ধ চলেছিল। রাবণ তার পক্ষের অসুরদের একের পর এক পাঠাচ্ছিল, তার পুত্রকে পাঠাচ্ছিল, সে তাদের পাঠাচ্ছিল এবং তারা সবাই যুদ্ধ করছিল। অবশ্য, একের পর এক রাবণের পক্ষের সবাই হত্যাও হচ্ছিল কিন্তু শ্রীরামের পক্ষের ক্ষেত্রেও অনেক হতাহাতের ঘটনা ঘটেছিল। অবশ্য, কোনো এক যৌগিক বলে তারা প্রত্যেকে বাঁচাতে সক্ষম হচ্ছিলেন, কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের উপর অনেক ধকল ছিল।

এমনকি মা যশোদার ক্ষেত্রেও দেখুন যে তাঁর কৃষ্ণকে সেবা করার তীব্রতা এত বেশি ছিল, গোপিকাদের শ্রীকৃষ্ণকে সেবা করার তীব্রতা এত মহৎ যে যখন উদ্ভব সেখানে গিয়েছিলেন, তিনি এটি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে কিভাবে তারা প্রতিটি মুহূর্তে কেবল কৃষ্ণের কথা চিন্তা করছেন, তারা কৃষ্ণের সম্বন্ধে এতটাই চিন্তামগ্ন ছিলেন যে তারা কৃষ্ণের জন্য উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, শ্রীমতী রাধারানী মৌমাছির সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমরা দেখি যে যশোদা তিনি সবসময় কৃষ্ণের সেবা করার প্রতি পূর্ণরূপে উদ্বিগ্ন ছিলেন। জড়বাদীরা, এমনকি মহান নির্বেশেষবাদীরা, বা যোগীরাও এই ধরনের উদ্বিগ্নতার বিষয়ে বুঝতে অক্ষম। তারা কিভাবে সেই উদ্বিগ্নতাকে এক আধ্যাত্মিক সম্পদ হিসেবে বুঝতে পারবে? তবে কৃষ্ণের সেবার জন্য উদ্বিগ্ন হওয়া, কৃষ্ণের সেবার প্রতি উৎসাহী হওয়ার বিষয়টি হচ্ছে দিব্য। এবং এর প্রমাণ হচ্ছে যে—সেই সমস্ত ভক্তরা কখনই সেই উদ্বিগ্নতাকে তাদের কষ্ট হিসেবে প্রকাশ করেননি। যদি আপনি কাউকে এই প্রস্তাব দেন… বর্তমানে তারা কি গ্রহণ করে? লিথিয়াম বা এমন কিছু। লিথিয়াম…তারা ছোট ছোট বড়ি হিসেবে দেয়, যাই হোক না কেন… ভিলিয়াম…আপনার উদ্বিগ্নতা সারানোর জন্য এই ভিলিয়াম গ্রহণ করুন! তাহলে তখন তারা বলবে, উদ্বিগ্নতার থেকে এটা অনেক ভালো! আমাকে কেবল একটি বড়ি গ্রহণ করতে হবে, অথবা তারা অন্য কোন কিছু গ্রহণ করবে, মদ্যপান করবে বা এমন কোন কিছু করবে। প্রত্যেকেই উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু এই সমস্ত ভক্তরা তারা কখনোই তাদের উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্তি চান না, কারণ এই ভাব কৃষ্ণপ্রেমে পরিপূর্ণ। অবশ্য, ভক্তের উদাসীন হওয়া উচিত নয় বা গুরুত্ব না দেওয়া উচিত নয়। অবশ্যই সবসময় আরো বেশি অবিচলিত থাকার, আরো বেশি উৎসাহী হওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে। উৎসাহ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় না, এটি স্থির নয়, উৎসাহের সবসময় উচ্চ থেকে উচ্চতর মাত্রা থাকে। সেই অর্থে একজন ভক্ত কখনোই আত্ম-সন্তুষ্টি অনুভব করেন না যে—“আমি ইতিমধ্যেই এখন সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছিয়ে গিয়েছি। এখন আমি সর্বশ্রেষ্ঠ স্তরে আছি। আমি কার্যসিদ্ধি করে ফেলেছি। এর থেকে ঊর্ধ্বে আর কোন স্তর নেই যেই পর্যায়ে আমাকে যেতে হবে।” ভক্তিমূলক সেবার ক্ষেত্রে সেই মনোভাব নেই। এটি পন্থা চিরন্তন উর্ধ্বগামী কিন্তু এক নির্দিষ্ট স্তরে উন্নীত হলে তা এতই উন্নত হয় যে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি বুঝতে পারবেন যে সেই ব্যক্তি ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ মুক্ত, তিনি তার সমস্ত শক্তি কেবল কৃষ্ণের প্রতি অর্পণ করছেন এবং সেই জন্য তার আর কোন কর্ম হচ্ছে না।

প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের ভক্তিমূলক সেবায় হয়ত কম তীব্রতা থাকতে পারে, এমনকি আমরা হয়তো কম-বেশি আমাদের চেতনা ঠিক রাখতে পারি, কিন্তু এটি হচ্ছে ঠিক উত্তাপের মত। আপনার কাছে জল আছে, আপনি কিছুটা উত্তপ্ত করুন, এইভাবে দেখবেন যখন তা ফুটন্ত হওয়ার পর্যায়ে আসবে, তখন সেই জল কত তাড়াতাড়ি উত্থাপিত হবে। এর মধ্যে আপনি ছোট অন্নের দানা ফেললে দেখবেন তা চারিদিকে ঘুরতে থাকবে এবং অবশেষে যখন তা ফুটে উঠবে, তখন জলের প্রসারণ ঘটে। এইভাবে ভক্তিমূলক সেবার ক্ষেত্রে আপনি তা যত বেশি উত্তপ্ত করবেন, ততই দেখবেন যে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ছি, আমরা কৃষ্ণের সাথে সেই গভীর সংযোগ বর্ধিত করতেই থাকছি, সেজন্য কারও এই বিষয়টি গুরুত্বহীন মনে করা উচিত নয়, ভক্তের সবসময় আরো অধিক প্রচেষ্টা থাকা উচিত।

কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি আন্তরিকভাবে প্রয়াস করেন, যদি তিনি অন্য কোন কাজে নিযুক্ত না হন, তার মন যদি সেবায় নিমগ্ন থাকে, অবশ্য সেই তীব্রতা, কৃষ্ণের প্রতি স্থিরতার জন্য আরো আরো অধিক করার প্রয়াস করা উচিত, তাহলে এটি সম্পূর্ণ দিব্য এবং পরম কল্যানকর, এতে ভুল কিছু নেই। এখন যদি সেই ব্যক্তি তা আরো বর্ধিত করতে পারেন, বলা যাক আপনার অনেক ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ হয়, ঠিক যেমন একজন ১০০ জন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতে সক্ষম হতে পারেন এবং তারা যদি কৃষ্ণের জন্য কোন কিছু প্রদান করেন, তাহলে তা কত অসাধারণ! এক্ষেত্রে ভুল বলার কিছু নেই। সেই ব্যক্তি অন্যান্য মহান যোগী ও অন্যান্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে মহিমান্বিত হওয়া উচিত, কিন্তু যদি অন্য কোন ব্যক্তি সেই একই সুযোগ ব্যবহার করে সেই ১০০ জন ব্যক্তিকে দ্বিগুণ নিযুক্ত করতে পারেন বা সেই একই সময়ে ২০০ জন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতে সক্ষম হন, তাহলে তা আরো ভালো। এমন নয় যে আমরা বলব না এটি আরো ভালো। নিশ্চয়ই আমরা বলব তা আরো ভালো। যদি কৃষ্ণ বিচার করেন, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির হয়ত একটি সক্ষমতা আছে, হয়ত সেই ব্যক্তি এমনকি তার সক্ষমতার কেবল অর্ধেক শক্তি দিয়ে কাজ করছেন। জাগতিকভাবে কোন ব্যক্তির হয়ত সেই মতো শারীরিক শক্তি থাকতে পারে যে তিনি ১০০ জন ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর জন্য পূর্ণসক্ষমতা সহ কাজ করছেন, আবার অন্য ব্যক্তি হয়ত শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে এত শক্তিশালী যে তিনি ৫০০ জনের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম, কিন্তু তিনি ২৫০ জনের কাছে পৌছিয়েছেন, তখন কৃষ্ণ চরমে এটিও বিচার করবেন যে সেই ব্যক্তির জাগতিকভাবেও কি সক্ষমতা আছে। ঠিক যেমন কখনো কখনো কোনো বিকলাঙ্গ ব্যক্তি বা এমন কেউ এমন ভক্তিমূলক সেবা করেন যে মানুষেরা অবাক হয়ে যায়, “ওহ সেই ব্যক্তি বিকলাঙ্গ, তিনি কিভাবে এটি করলেন!” জাগতিকভাবে তার সক্ষমতা কম আছে, কিন্তু তবুও তিনি তা করছেন, তাই কৃষ্ণও  ভালো, খুব ভালো এবং সর্বশ্রেষ্ঠ-র বিচার করবেন।

সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে অবশ্য যদি কেউ পূর্ণরূপে নিমগ্ন থাকেন। এক নির্দিষ্ট পর্যায়ে, অন্তত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই ব্যক্তি যদি পূর্ণরূপে মগ্ন থাকেন, শক্তি কোন প্রকারে অন্য কোনভাবে ব্যয় না হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি অবিরতভাবে কৃষ্ণের প্রতিদান গ্রহণ করতে সক্ষম হন এবং সেই ব্যক্তি কেবল তার শক্তি প্রয়োগেই নিযুক্ত নয়, আসলেই তিনি কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হওয়া ও হরে কৃষ্ণ নাম-জপের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাই আমরা নিজেদের ভক্তিমূলক সেবার দৃঢ়তার ক্ষেত্রে আরও অধিক উচ্চ থেকে উচ্চতর পর্যায়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু আমরা এই বিষয়টিকে জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি না। যদি কোন ব্যক্তির সেই একই সক্ষমতা না থাকে, কিন্তু তবুও সেই ব্যক্তি যদি কঠোর প্রচেষ্টা করেন, তাহলে সেই ব্যক্তিও মহিমান্বিত। আপনি আসলে সেই স্তর থেকে এটির বিবেচনা করতে পারবেন না। 

অবশ্য একজন নেত্রী বা বরিষ্ঠ ব্যক্তি, যিনি সেই ব্যক্তিকে ভক্তিমূলক সেবায় সাহায্য করার প্রতি দায়িত্বশীল, তাদের এটি দেখা উচিত যে সেই ব্যক্তি তার পূর্ণক্ষমতা অনুসারে সেবা করছে নাকি। যদি তারা এমনকি আরো বেশি ক্ষমতা সহ সেবা করেন, তাহলে সেই অধিক শক্তি প্রয়োগের জন্য কৃষ্ণও তাদের সাথে অধিক ভাব-বিনিময় করবেন এবং একমাত্র যেভাবে আপনি এটি বুঝতে পারবেন, তা হচ্ছে কখনো কখনো একটু বেশি চাপ প্রয়োগ করতে হয় এবং তখন আপনি বিষয়টি লক্ষ্য করতে পারবেন। যেমন ব্যবসার ক্ষেত্রে তারা কোন ব্যক্তিকে আরো আরো বেশি দায়িত্ব প্রদান করে, যতক্ষণ না অবশেষে সেই ব্যক্তি সেই দায়িত্বভার পালনে অক্ষম না হয়। তখন তারা তার দায়িত্ব কমিয়ে দেয়। এর জন্য তাদের কাছে একটি পদ থাকে, তারা ব্যক্তির পদোন্নয়ন করতে থাকে, যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি সিনিয়র সহ-সভাপতি হয়ে সেই দায়িত্বভার পালনে অক্ষম না হচ্ছে। এরপর তার অবস্থা শেষ, এবং এরপর তার আর কখনো পদোন্নয়ন হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যক্তি আরো আরো অধিক দায়িত্ব গ্রহণ করে তা পালন করতে পারেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা তার পদোন্নয়ন করতে থাকে। এবং যখন তিনি তার সক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায় ও এর থেকে বেশি আর দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম না হয়, তখন “ঠিক আছে আপনি এই পদে অধিষ্ঠিত থাকুন।” এরপর তাদের পক্ষে আরো উন্নত পদ লাভ করা খুবই কঠিন। ভক্তিমূলক সেবায়ও আমরা এইভাবেই অগ্রসর হই। একমাত্র যেই উপায়ে আমরা আমাদের ক্ষমতা জানতে পারব, তা হচ্ছে আরেকটু অধিক দায়িত্ব গ্রহণ করে। যদি আপনি দেখেন যে আপনার চেতনা আন্তরিকতা শূন্য হয়ে পড়ছে ও অনেক বেশি চিত্তবিক্ষেপ হচ্ছে, তাহলে তখন আমরা বিনম্রভাব গ্রহণ করি ও আমরা যে স্তরের, সেই স্তরটি বজায় রাখার চেষ্টা করি। এই ধরনের প্রচন্ড চাপ গ্রহণ করা হলে, আমরা ক্ষমতাও গড়তে পারি। এটি হচ্ছে ওজন-উত্তোলনের মত, তা আমাদের ক্ষমতাও গড়ে তোলে। কখনো কখনো আমরা স্বল্প কিছু সময়ের জন্য অনেক বেশি দায়িত্ব গ্রহণ করি। আমরা একটু বেশি চাপ গ্রহণ করি। সবসময় হয়ত আমরা তা করতে পারব না, কিন্তু অল্প কিছু সময়ের জন্য আপনি তা করতে পারেন, এবং তা আসলে আমাদের সক্ষমতা অধিক থেকে অধিকতর বর্ধিত করে।

দিল্লিতে আয়োজিত এশিয়ান গেমস-এ একজন ব্যক্তি কোন কিছু সংকুচিত করেছিল বা ভেঙ্গেছিল, আমি ঠিক নিশ্চিত নই। তিনি ওজন উত্তোলন করেছিল, তিনি ৩৫৮ কিলো ওজন তুলে বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছিল। অলিম্পিকের ক্ষেত্রে তাদের তিনটি সুযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি প্রথমবারেই রেকর্ড ভেঙেছিল। তারপর অন্য ব্যক্তি বলল, “আমি একটি সুযোগ চাই।” কারণ তিনি ৩৫৭ কিলো বা এর কাছাকাছি কোনো ওজন তুলতে পেরেছিল। যেহেতু ষেই ব্যাক্তি ইতিমধ্যেই অধিক ওজন উত্তোলন করেছিল, তাই সেই প্রতিযোগিতাটি শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কেবল রেকর্ড গড়ার জন্য তা হয়েছিল, কারণ সমস্ত বিচারকেরা সেখানে ছিলেন এবং সরকারিভাবেই এটি হয়েছিল। এরপর ঐ ব্যক্তি ৩৮৫.৫ (৩৫৮.৫) কিলো উত্তোলন করে, ০.৫ কিলো অধিক তুলে তাকে মাত দিয়েছিল।  তখন অন্য আরেকজন ব্যক্তি বলে, “আমি আরেকটি সুযোগ চাই।” তিনি ৩৫০ কিলো বা এমন ভার তুলেছিলেন যা ছিল আংশিকভাবে আরেকটু বেশি। যেহেতু সেই সময় সেখানে পরিস্থিতির চাপ এত বেশি ছিল, তাই তারা বিশেষত আরো অধিক…

যে সময় আমি কোন পরিস্থিতিতে যখন আটকে পড়তাম, তখন আমি সেই চাপ সহ্য করতাম এবং তার মধ্যেই সেবা করে শ্রীল প্রভুপাদ যা দায়িত্ব দিয়েছেন তা পূর্ণ করার চেষ্টা করতাম। সেই সময় গুলিতে আমি যখন চাপের মধ্যে শরণাগত হতাম, এসব সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলতাম, লড়াই করার চেষ্টা না করে এর পরিবর্তে শরণাগত হওয়ার চেষ্টা করতাম ও এইসবের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলতাম, তখন আমি পূর্ববর্তী আচার্যবর্গ এবং শ্রীকৃষ্ণের থেকে গভীর প্রতিদানের অনুভূতি লাভ করতাম। তাই সাধারণত আমাদের চেতনায় আমাদের ক্ষুদ্র নিয়ন্ত্রক আছে যে, কতটা আমরা কৃষ্ণকে প্রদান করতে চাই। আমরা সেটি উপলব্ধি করি না, কিন্তু আমাদের এক নিয়ন্ত্রক আছে, আমাদের ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধতা আছে যে—আমরা একটি পর্যায় পর্যন্ত চিন্তা করি ও তারপর কৃষ্ণ আমাদেরকে সেই স্তর থেকে উর্দ্ধে নিয়ে যান, তবে আমরা সেই স্তরের ঊর্ধ্বে আর আত্মসমর্পণ করতে চাই না, কিন্তু যদি আমরা আত্মসমর্পণ করি, তখন আমরা উপলব্ধি করব যে এইভাবে আমরা কৃষ্ণের সাথে ভাব-বিনিময়ের মাধ্যমে আরও অধিক থেকে অধিকতর উচ্চস্তরে উন্নীত হতে পারি। কেউ কখনো কখনো বাহ্যিকভাবে শরণাগত হয়, কিন্তু কখনো কখনো অধিক মানসিক আসক্তি ও অন্যান্য বিষয় থাকে। এই কারণে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনটি হচ্ছে, যেটিকে আপনারা বলেন ঘি উত্তপ্ত করা বা এমন কিছু। এখানে আসলেই মানুষ শরণাগত হতে বাধ্য হয়। বিষয়ী ও অভক্তদের ক্ষেত্রে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে থাকা খুবই কঠিন, ঠিক যেমন এখানে বিভিন্ন ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু কিছু সময় পরে তারা সবাই দূরে পালিয়ে যায় যে এটি খুবই কঠিন, কারণ কৃষ্ণ প্রত্যেক ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন অথবা ব্যক্তি এটিকে অসঙ্গত মনে করে। অবশ্য সাধারণত ভক্ত সঙ্গে মানুষেরা যখন আন্তরিকভাবে ভগবত চেতনাময় হওয়ার, পরম সত্যকে লাভ করার ইচ্ছা করেন, তখন তারা এই পন্থাকে ব্যবহারযোগ্য অনুভব করেন। তারা ভক্তিতে উন্নত হতে থাকেন, কিন্তু যদি কোন ব্যক্তি আন্তরিক না হয়, তাহলে সেই ব্যক্তির মনে কিছু না কিছু দ্বন্দ্ব চলতে থাকবে। সেই ব্যক্তি তা থেকে বের হওয়ার অনেক সুযোগ পাবেন, এবং যদি সেই ব্যক্তি এই সমস্ত ছোট ছোট দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে পারেন, তাহলে তিনি এমনকি এই জীবনে কৃষ্ণকে লাভ করতে সক্ষম হবেন।

হরে কৃষ্ণ! শ্রীবিগ্রহ সম্পর্কিত আরো প্রশ্ন। আরও প্রশ্ন আছে?

ভক্ত: যখন কেউ তার ভক্তিমূলক সেবা বর্ধন করে, তখন মানসিক চাপ কোথা থেকে আসে? কেন মানসিক চাপ আসে?

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: আসক্তি। কখনো কখনো মানসিক চাপ হচ্ছে বাহ্যিক। কখনো কখনো অসুরদের দ্বারা বাধা দেওয়া হয়। তখন তা একপ্রকার কষ্টদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, কিন্তু যদি তিনি সেই সময় কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, সহনশীল হতে পারে;..   আমাদেরকে সহনশীল হওয়ার শিক্ষা নিতেই হবে, এটি হচ্ছে এমন কিছু যা আমরা বিস্মৃত হয়েছি। এই সহনশীলতার স্তর গড়ে তুলতে হবে, ঠিক যেমন বিমানে, আমি সিঙ্গাপুর এয়ার লাইনে যাত্রা করছিলাম, সেখানে একজন ব্যক্তি বিমান যাত্রীসেবকের সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করছিল, কিন্তু সেই যাত্রীসেবক সম্পূর্ণ শান্ত ছিল ও এই বলে ফিরে গেল, “হ্যাঁ! মহাশয় আমি দেখছি।” সেই ব্যক্তি ছিল পুরোপুরি জঘন্য, খুবই অদ্ভুত, কিন্তু সেই ব্যক্তি তার প্রতিক্রিয়ার দ্বারা পুরোপুরি শান্ত হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি খুব ভদ্রভাবে সেই ব্যক্তিকে প্রতি-উত্তর দিয়েছিল। আমি ইস্টার্ন এয়ারওয়েজে ছিলাম, সেখানে একজন একটু মদ খেয়ে কিছু একটা বলেছিল, তখন একজন আমেরিকান ব্যক্তি বলল, “তুমি আর পানীয় গ্রহণ করতে পারছ না! তুমি কি প্লেনে থাকতে চাও? তাহলে আর পান করতে পারবে না, নয়ত নেমে যাও!” এইভাবে সে ব্যাবহার করছিল। তিনি সেই পরিস্থিতি ভালোভাবে সামলাতে পারত যে, “শুনুন, আপনি অনেক পানীয় গ্রহণ করেছেন, এখন শান্ত হন।” কিন্তু না সেই ব্যক্তি এতই উত্তেজিত ছিল যে সেই যাত্রীসেবক এটি বলল, ও তৎক্ষণাৎ সেই ব্যক্তি রেগে গেল। 

এটি হচ্ছে প্রশিক্ষণের প্রশ্ন, সেজন্য সমগ্র বিশ্বে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন ১ নম্বর রেটিং(মূল্যায়ন) পেয়েছে এবং ইস্টার্ন, আমেরিকার রেটিং তালিকাতেই নেই। তারা এমন কি এক থেকে দশের মধ্যেও নেই, কিন্তু এটি মনে করা হয় যে সিঙ্গাপুর এবং সুইস সমগ্র বিশ্বে এয়ারলাইনের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ সেবা দেয়, কারণ সেখানে যাত্রী সেবকরা এতই প্রশিক্ষিত।

তাই আমরাও সহনশীলতার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত হতে পারি, সাধারণত আমেরিকাতে আমরা কোন ধরনের তপস্যা সহ্য করার প্রতি খুব একটা প্রশিক্ষিত নই, এর পরিবর্তে আমরা নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করি যে কিভাবে কোন ধরনের তপস্যার পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা যাবে। ভারতে বসবাস করার ক্ষেত্রে কাউকে সবসময় কিছু না কিছু তপস্যা করতে হবে, কারণ সেখানে সবক্ষেত্রে অনেক সুযোগ-সুবিধা নেই, তবে তপস্যা আছে। এক্ষেত্রে বলতে গেলে সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তেমন নেই। অন্যান্য কারণবশত আমি পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে তা খুবই তপস্যাকর মনে করি, বিভিন্ন ধরনের তপস্যা আছে, যাইহোক এই সব কিছুই আপেক্ষিক। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে এই সব ধরনের কঠিনতা, যা হয়ত আমাদের জীবনে আসতে পারে, সেইসব গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সহনশীল হতে হবে। এইসব পরিস্থিতির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত অনুভব করে বা দৈহিক চেতনা বা মানসিক চেতনায় থেকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এর দ্বারা বিক্ষুব্ধ হওয়ার পরিবর্তে, আমরা আমাদের মনকে শ্রীকৃষ্ণে স্থির করার মাধ্যমে এগুলিকে অতিক্রম করি।

হ্যাঁ?

ভক্ত: আমি শুনলাম যে আপনি সেই মানসিক চাপ সহ্য করেছিলেন ও সেবা অব্যাহত রেখেছিলেন, এর অর্থ আপনার আসক্তি চলে গিয়েছিল? 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ! বিশেষত যদি আপনি তা সহ্য করেন, ঠিক যেমন ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে এটি বলা হয়েছে যে—আপনার পায়ে ব্যথা লাগলে, সেই মুহূর্তে ‘আউচ’ বা অন্য কোন কিছু বলার পরিবর্তে ‘কৃষ্ণ’ বলুন। এর ফলে আপনাকে আরেকটি জন্মগ্রহণ করতে হবে না… শুধু এর ফলেই আপনি মুক্তি লাভ করতে পারবেন। মূল বিষয় হচ্ছে যে যখন আপনি দুঃখে আছেন, তখন আপনি কার দিকে তাকান? আপনি আপনার মনের আশ্রয় খোঁজেন বা আপনি অন্য কোন আশ্রয়ের খোঁজ করেন? আপনি কোথায় আশ্রয় গ্রহণ করছেন? যখন মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, তখন আপনি আশ্রয় লাভের জন্য কোথায় যান? আমি এমন ভক্তদেরকে জানি, যারা হরে কৃষ্ণ নাম জপ করছে, কিন্তু যখন পরিস্থিতি কঠিন হয়, তখন তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। যখন তাদের কঠিন পরিস্থিতি আসে, তারা এই সব থেকে সরে গিয়ে ড্রাগ গ্রহণ করে। তারা পথভ্রষ্ট, কিছুটা পথভ্রষ্ট, এখন তারা খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। যদি কোন কঠিন পরিস্থিতি আসে, তাহলে তা থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না, তারা কৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করে না, এর পরিবর্তে তারা ড্রাগ গ্রহণ করে। তারা মারিজুয়ানা বা এমন কিছু গ্রহণ করে। অবশ্য এই ধরনের ব্যক্তিরা মুলত আমাদের মন্দিরে নেই, কিন্তু আমি জানি যে এমন কিছু ব্যক্তি আছে। যখনই তারা কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়, তারা মায়ার কাছে আত্মসমর্পণ করে। তখন আরো আন্তরিকভাবে নাম জপ করা, অধিক সতর্কতা সহ শ্রবণ করা, শাস্ত্র অধ্যয়ন করার দ্বারা আশ্রয় গ্রহণের পরিবর্তে, তারা এই কার্য করে।

আমার মন কোন কিছু দ্বারা বিক্ষুব্ধ হচ্ছে, তা হয় আমার নিজের দেহের কারণে বা বাহ্যিক কারণে হচ্ছে, কিন্তু সেই সময় আসলে কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল হওয়া বা তাঁর শরণ গ্রহণ করা, এটিই হচ্ছে আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণ। যদি কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করি, তাহলে মৃত্যুর সময় যখন চূড়ান্ত পরীক্ষা উপস্থিত হবে, যখন মৃত্যু আমাদের সম্মুখীন, তখন আমরা অন্য কিছুর দিকে তাকাব না যে, “ওহ আমি এখন খুব বড় সমস্যায় আছি। আমাকে এটি দিন, আমাকে সেটি দিন।” না! কেবল কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হব, তখন আমরা কৃষ্ণের কাছে ফিরে যেতে পারব। মৃত্যু খুবই যন্ত্রণাদায়ক, যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি। আমরা কিভাবে এর সম্মুখীন হব, তা হচ্ছে যদি আমরা ইতিমধ্যেই এতসব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে সবসময় কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল থাকার প্রতি পুরোপুরি অভ্যস্ত হই, তাহলে তখন যদি এটির প্রতিফলন হয়। সেজন্য যে কোন কঠিন পরিস্থিতি এলে আমরা কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল হতে শিক্ষা পাই, তখন স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর সময়ও আমরা কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল হই, প্রত্যেক পরিস্থিতিতে আমরা কৃষ্ণের প্রতি নির্ভরশীল হই। সেজন্য ভক্তরা সর্বদা সুরক্ষিত থাকেন। যদি আমরা অন্য কোন জাগতিক বিষয়ের প্রতি নির্ভরশীল হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করি, তাহলে আমাদেরকে আবার ফিরে আসতে হবে, যতক্ষণ না আমরা কৃষ্ণ ব্যতীত অন্য কোন উপাধি বা অন্য কোন কিছুর প্রতি নির্ভর না করার শিক্ষা গ্রহণ করছি। গুরু এবং কৃষ্ণ, তাঁরা হচ্ছেন আমাদের একমাত্র অবলম্বন, তাঁরা হচ্ছেন আমাদের পথপ্রদর্শক। গুরুদেবের বাণী স্মরণ করুন। ঠিক আছে?

ভক্ত: জয়!

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: মানুষেরা সবসময় এত কিছু অবলম্বন তৈরি করে। আমেরিকা হচ্ছে অবলম্বন নির্মাণ ভূমি। (হাসি) বড় বড় নেত্রীরা একদিনে কত মদের উপর নির্ভর করে এবং কত ওষুধ গ্রহণ করে, কত কিছু এটা ওটা গ্রহণ করে, যদি তাদের কাছে তা না থাকে, তাহলে কত সিগারেট গ্রহণ করে। আসলে আমাদের তত্ত্ব হচ্ছে—“সরল জীবন উচ্চ চিন্তা” অর্থাৎ আমরা অপ্রয়োজনীয় অবলম্বন দূর করি, আমরা ইতিমধ্যেই সীমাবদ্ধ কারণ আমাদেরকে এই শরীরের প্রতি নির্ভর করতেই হবে। যদি শরীর চলাচল করতে না পারে, অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে আমরা চলতে পারব না। এইভাবে আমরা ইতিমধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই আমাদের নিজেদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে আমরা যতটা সম্ভব কৃষ্ণের প্রতি নির্ভর করি, তারা বলে এটি হচ্ছে এক অবলম্বন। কিন্তু এটিই হচ্ছে প্রকৃত বস্তু, এটিই হচ্ছে প্রকৃত অবলম্বন।

যদি আপনি ভগবানের প্রতি বিশ্বাসী না হন, তাহলে আপনি বলতে পারেন যে ভগবানের প্রতি নির্ভরশীল হওয়া হচ্ছে অস্তিত্বহীন অবলম্বনের মতো। সেক্ষেত্রে আমাদের কোন অবলম্বন নেই এবং আপনি ভগবানের প্রতি বিশ্বাসী না হলে, অবলম্বন কোথায় আছে? যদি আমি বিশ্বাস করি যে এই অবলম্বনের কোন অস্তিত্ব নেই, তাহলে এর অর্থ আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ, যদি আপনি নাস্তিক হন। ঠিক তো? এবং যদি ভগবানের অস্তিত্ব থাকে, তাহলেও ক্ষতি কি? তিনিই আসলে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড ও সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁকে অবলম্বনে ক্ষতি কি? আসলে সবকিছুই তাঁর ওপরই নির্ভর করছে, ভগবানই হচ্ছেন ভিত্তি, তিনিই পরম কারণ এবং সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তাই তাঁর প্রতি নির্ভরশীল হওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। সবকিছুই তাঁর উপরই নির্ভরশীল, তাই আপনি ভগবানে প্রতি নির্ভরশীলতার বিষয়টি বিশ্বাস করুন বা না করুন, এতে কোন ভুল নেই। এটি হচ্ছে কারও অন্য কোন কিছুর প্রতি অনির্ভরশীলতা, অর্থাৎ তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ।

হরে কৃষ্ণ!

ভক্তবৃন্দ: জয় শ্রীল আচার্যপাদ!

ভক্ত: শ্রীল আচার্যপাদ কি?

ভক্তবৃন্দ: জয়! 

 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 30/07/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions