Text Size

১৯৮২১১২৫ শ্রীমদ্ভাগবতম ৪.২.১৪-১৫

25 Nov 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ২৫ নভেম্বর, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, শ্রীধাম মায়াপুরে প্রদান করেছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৪র্থ স্কন্ধ, ২য় অধ্যায়, ১৪-১৫তম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

শ্লোক ৪.২.১৪-১৫
প্রেতাবাসেষু ঘোরেষু প্রেতৈর্ভূতগণৈবৃতঃ।
অটত্যুন্মত্তবন্নগ্নো ব্যুপ্তকেশো হসন্ রুদন্॥ ১৪॥
চিতাভস্মকৃতস্নানঃ প্রেতস্রঙন্রস্থিভূষণঃ।
শিবাপদেশো হ্যশিবো মত্তো মত্তজনপ্রিয়ঃ।
পতিঃ প্রমথনাথানাং তমোমাত্রাত্মকাত্মনাম্॥ ১৫॥

অনুবাদ: সে শ্মশানের মতো অপবিত্র স্থানে বাস করে, এবং ভূত-প্রেতেরা হচ্ছে তার সহচর। সারা শরীরে চিতাভস্ম মেখে, উন্মাদের মতো নগ্ন হয়ে, সে কখনও হাসে এবং কখনও কাঁদে। সে নিয়মিতভাবে স্নান করে না, এবং তার অঙ্গের ভূষণ হচ্ছে মুণ্ডমালা এবং অস্থি। তাই সে কেবল নামেই শিব বা শুভ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, সে সব চাইতে উন্মত্ত এবং অশুভ। তাই সে তমোগুণাচ্ছন্ন উন্মাদ ব্যক্তিদের অত্যন্ত প্রিয়, এবং তাদের অধিপতি।

তাৎপর্য: যারা নিয়মিতভাবে স্নান করে না, তারা ভূত এবং উন্মাদ ব্যক্তিদের সহচর বলে বিবেচনা করা হয়। শিবকে ঠিক সেই রকমই মনে হয়, কিন্তু তাঁর শিব নামটি অত্যন্ত উপযুক্ত, কারণ তিনি তমোগুণাচ্ছন্ন ব্যক্তিদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু, যেমন যারা নিয়মিতভাবে স্নান করে না, সেই সমস্ত অশুচি নেশাখোরদের প্রতি শিব এতই কৃপালু যে, তিনি এই সমস্ত প্রাণীদের আশ্রয় প্রদান করেন এবং ধীরে ধীরে তাদের আধ্যাত্মিক চেতনায় উন্নীত করেন। যদিও এই প্রকার ব্যক্তিদের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্তরে উন্নীত করা অত্যন্ত কঠিন, তবুও শিব তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তাই বেদের বর্ণনা অনুসারে, তিনি হচ্ছেন শিব বা সর্ব মঙ্গলময়। এইভাবে তাঁর সঙ্গ প্রভাবে অধঃপতিত জীবেরা পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। কখনও কখনও দেখা যায় যে, মহান ব্যক্তিরা অত্যন্ত পতিত জীবদের সঙ্গ করছেন। তাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থে তাদের সঙ্গ করেন না, পক্ষান্তরে, সেই সমস্ত পতিত জীবদের মঙ্গলের জন্য তাদের সঙ্গ করেন। ভগবানের সৃষ্টিতে বিভিন্ন প্রকারের জীব রয়েছে। তাদের কেউ সত্ত্বগুণে, কেউ রজোগুণে এবং কেউ তমোগুণে রয়েছে। যাঁরা কৃষ্ণভাবনায় উন্নত বৈষ্ণব, তাঁদের দায়িত্ব ভগবান শ্রীবিষ্ণু গ্রহণ করেন, যারা জড়-জাগতিক কার্যকলাপে অত্যন্ত আসক্ত, তাদের দায়িত্বভার শ্রীব্রহ্মা গ্রহণ করেন, কিন্তু শিব এতই কৃপাময় যে, তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তাদের যারা ঘোর তমোগুণে আচ্ছন্ন এবং যাদের আচরণ পশুদের থেকেও অধম। তাই শিবকে বিশেষভাবে মঙ্গলময় বলা হয়।

ইতি কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কৃত ‘শিবের প্রতি দক্ষের অভিশাপ’ নামক অধ্যায়ের ১৪-১৫তম শ্লোকের তাৎপর্য।

জয়পতাকা স্বামী: এখানে আমরা দক্ষের শিবকে অভিশাপ দেওয়ার অংশটি পড়ছি। আসলে এটি যে কোন উন্নত বৈষ্ণবের ক্ষেত্রে শ্রবণ করা খুবই দুঃখজনক যে ভগবান শিবের মতো এমন একজন সর্বমঙ্গলময় আত্মা দক্ষের দ্বারা অভিশাপ প্রাপ্ত হয়েছেন। আসলে ভগবান শিব হচ্ছেন শুদ্ধ বৈষ্ণব, তিনি হচ্ছেন শ্রীবিষ্ণুর আংশিক প্রকাশও এবং তাঁকে কখনোই কারও অভিশাপ দেওয়া উচিত নয়, আর সেটি করা হলে, তা কেবল তাদের আয়ু, মর্যাদা, সৌভাগ্য, সবকিছুকে হ্রাস করবে।

প্রকৃতপক্ষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, বৈষ্ণবের প্রতি অপরাধ বা বৈষ্ণব অপরাধ হচ্ছে সবথেকে বিপদজনক বিষয়।

যদি বৈষ্ণব-অপরাধ উঠে হাতী মাতা।
উপাড়ে বা ছিণ্ডে, তার শুখি’ যায় পাতা॥

(চৈ. চ. মধ্য ১৯.১৫৬)

শুদ্ধ ভক্তের প্রতি অপরাধ করা হচ্ছে মত্ত হস্তীর অপরাধ। যদি কেউ মত্ত হস্তীর অপরাধ করে, তাহলে সেই মত্ত হস্তী তার ভক্তি জীবনের বাগিচায় প্রবেশ করে ভক্তি লতা সমূলে উৎপাটিত করে।

যখন আপনি কোন গাছকে সমূলে উৎপাটিত করবেন, তখন হয়ত কিছুদিনের জন্য গাছটি সবুজ থাকবে, তবে কিছু সময়ের মধ্যেই পাতাগুলি শুষ্ক হয়ে ঝরে পড়বে। তাই শুখি’ যায় পাতা — এর অর্থ হচ্ছে একবার বৈষ্ণব অপরাধ হলে, এমন কি অল্প সময়ের জন্য মনে হতে পারে যে আধ্যাত্মিক জীবনের হয়ত সম্ভাব্য অস্তিত্ব আছে, কিন্তু অতি শীঘ্রই তাদের সমস্ত পারমার্থিক সম্পদ নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং তারা আধ্যাত্মিকভাবে পূর্ণরূপে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সেই জন্য সকলের বিশেষত বৈষ্ণবের প্রতি, ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের প্রতি অপরাধ করা এড়িয়ে চলা উচিত।

মহাদেব শিবকে ভগবানের শুদ্ধভক্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। উন্নত বৈষ্ণবগণ কখনই শিবের বিরুদ্ধে বা কোনো শুদ্ধ ভক্তের বিরুদ্ধে কোন অপরাধকে সমর্থন করেন না। এই বৈষ্ণব অপরাধ প্রসঙ্গটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলায় বর্ণিত হয়েছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেককে তাদের বিভিন্ন অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দিচ্ছিলেন, তিনি প্রত্যেককে শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করছিলেন, এমনকি তিনি জগাই মাধাই-কেও শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করেছিলেন।

কিন্তু একদিন সকল ভক্তবৃন্দ তাঁকে অনুরোধ করলেন যে, “কৃপাপূর্বক আপনার মাতা যশোদা (শচী)-কেও আপনার কৃপা প্রদান করা উচিত। আপনি তাঁকেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ প্রেম প্রদান করুন।”

তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “না! আমি মাতা যশোদা(শচী)-কে শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেমের আশীর্বাদ প্রদান করতে পারব না, কারণ তিনি এর যোগ্য নন।”

“না! না! না! এটা কিভাবে হতে পারে? মাতা যশোদা(শচী) যোগ্য নন?” তারা সকলেই ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। তারা সকলেই… “মাতা যশোদা(শচী) হচ্ছেন এমন একজন…” আমি বলতে চাইছি শচী, শচীমাতা। আমাকে ক্ষমা করবেন। “শচীমাতা হচ্ছেন মাতা যশোদার পুনঃপ্রকাশ। তিনি কত উৎসর্গীকৃত, তিনি কত শুদ্ধ, তিনি সবসময় আপনার সেবা করছেন। তিনি সবসময় এত শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা সম্পাদন করছেন। তিনি কিভাবে অযোগ্য হতে পারেন?”

তারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে একা ছাড়ছিলেন না যতক্ষণ না অবশেষে তিনি বললেন যে, “তিনি যোগ্য নন, কারণ তিনি একজন শুদ্ধ ভক্তের শ্রীপাদপদ্মে এক বিরাট অপরাধ করেছেন।”

“কি!! তিনি কি করে একজন অপরাধী হতে পারেন?”

একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপিত হল যে, “মাতা যশোদা(শচী) কি অপরাধ করেছেন?”

[পাশে: আমি কেবল একটুখানি বাংলাতে বলব (হাসি)]

এখানে মহাদেব অপমান বা অভিশাপ দিচ্ছে দক্ষ। সেই অভিশাপ আসলে দক্ষের যত সৎ গুণ, যত ভাগ্য, আয়ু সব নষ্ট করে দেবে, কেননা এটা হচ্ছে বৈষ্ণব অপরাধ। মহাদেব হচ্ছেন শুদ্ধ বৈষ্ণব—“বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভুঃ” (শ্রী. ভা. ১২.১৩.১৬) এবং তিনি ভগবানের আংশিক প্রকাশ। তো বিশেষ বৈষ্ণব রূপে যে তাঁকে অপমান করা হচ্ছে বৈষ্ণব অপরাধ, চৈতন্যদেব বলেছেন বৈষ্ণব অপরাধ হচ্ছে ‘মত্ত হাতি’। মাতাল হাতি যদি বাগানের মধ্যে গিয়ে একেবারে গাছটা উপরে করে তুলবে, গোড়া শুদ্ধু, সেই হিসেবে সমস্ত পাতা শুকিয়ে যাবে। আমাদের যত ভক্তি, সঞ্চয় আছে, সেসব নষ্ট হয়ে যাবে বৈষ্ণব অপরাধ করলে। তাই এর থেকে বোঝা যাচ্ছে দক্ষর ভবিষ্যতে বিনাশ হওয়া সম্ভাবনা বা অবশ্যই ঘটনা হবে। তাই ছাড়া, এই বিষয়ে চৈতন্যদেব বলেছেন, মানে তিনি সবাইকে জগাই মাধাই নিয়ে শুদ্ধু প্রেম ভক্তি দান করেছেন। 

ভক্তবৃন্দ চৈতন্য ভাগবতে এটা অনুরোধ করেছিলেন যে—“শচীমাতাকে আশীর্বাদ করেন যেন তিনি শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারেন।”

তা চৈতন্যদেব অমান্য করেছিলেন যে, “না! দেবই না। আমি দেবই না!”

“কেন? মা শচীকে দেবেন না? তাকে দেবেন নিশ্চয়ই দেবেন।”

“না! দেবই না! কেননা তিনি এক বৈষ্ণব অপরাধী। বৈষ্ণব অপরাধী আমি কৃষ্ণপ্রেম-কে দেবই না।”

“বৈষ্ণব অপরাধী মা শচী? তিনি কি বা অপরাধ করতে পারেন?”

“তিনি বৈষ্ণব অপরাধী, সবাইকে দেব কিন্তু তাকে আমি দেবই না।” 

তাই সবাই আবার অবাক হয়ে পড়েছে, উপবাস করছে, হা! হা! করছে কি করে মা শচী কৃষ্ণের প্রেম পাবেন না! (১৩:০০) আমি আবার একটু ব্যাখ্যা করি ইংরেজি তারপর বাংলা বলছি। 

তখন, সকল ভক্তবৃন্দ সম্পূর্ণ দুঃখিত হয়ে পড়েছিলেন যে কিভাবে শচীমাতা শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম না লাভ করতে পারে? এটি অবিশ্বাস্যকর! কেউ কেউ উপবাস করছিলেন, কেউ ক্রন্দন করছিলেন, এইভাবে তারা চৈতন্য মহাপ্রভুকে বলতে অনুরোধ করছিলেন যে সেই অপরাধ কি, তিনি কি এমন মহা অপরাধ করেছেন?

অবশেষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ব্যাখ্যা করলেন যে—একসময় তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বিশ্বরূপ অদ্বৈত গোঁসাইয়ের ভাগবত প্রবচন শ্রবণ করছিলেন এবং শচীমাতা চৈতন্য মহাপ্রভুকেও সেখানে যেতে এবং বিশ্বরূপকে গৃহে ফিরিয়ে আনতে পাঠিয়েছিলেন। যখন চৈতন্য মহাপ্রভু, ছোট বালক নিমাই সেখানে উপস্থিত হন, তখন তিনিও সেখানে ভাগবত প্রবচন শ্রবণ করতে বসে যান। এইভাবে তাদের বিলম্ব হয়। তখন শচীমাতা ভীত হয়েছিলেন যে অদ্বৈত আচার্যের প্রচারের কারণে নিমাইও সন্ন্যাসী হয়ে যাবে, এবং সেই কারণে তিনি এক কুমন্তব্য করেছিলেন যে, “এই প্রচারের দ্বারা তারা আমার সন্তানকে নষ্ট করে দিচ্ছে এবং তাকে সন্ন্যাসী বা এমন কিছু বানিয়ে ফেলছে।” শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “এটি ছিল এক বিরাট বৈষ্ণব অপরাধ এবং সেই কারণে শচীমাতা ভগবত-প্রেম প্রাপ্ত হতে পারবেন না।” 

দেখুন এটি বোঝার জন্য কাউকে পবিত্র নাম কি সেই সম্বন্ধে কিছু বুঝতে হবে। আসলে শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম এতই শক্তিশালী যে তা যেকোন মাত্রায় পাপ কর্ম প্রতিক্রিয়া বিনষ্ট করতে পারে। যেকোন মাত্রায়! অজামিল এক মহা পাপী ছিল। তিনি তার যুব অবস্থায় ব্রাহ্মণ ছিল, তিনি বিষ্ণু পূজা করেছিল, কিন্তু তিনি তার পরিবারকে পরিত্যাগ করেছিল, তিনি সমাজে তার পদ পরিত্যাগ করেছিল ও সেইসবের পরিবর্তে তিনি এক পতিতা স্ত্রীকে বিবাহ করে চোর হয়েছিল এবং তিনি চুরি করত, মানুষদের হত্যা করত। তিনি এক মহা পাপী ছিল, তার ১০ জন সন্তান ছিল। যাইহোক না কেন তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের নাম ছিল নারায়ণ, তিনি সবসময় তার সন্তানকে ডাকত—“নারায়ন! নারায়ন এখানে এসো!” যখন তিনি ভোজন করত, নারায়ণ তার সাথে খেত। যখন তিনি জল পান করত, নারায়ন ও তার পাশে বসত এবং পান করত। এইভাবে, অবচেতনভাবে বারংবার এই নাম—“নারায়ণ! নারায়ণ!” বলার ফলে তিনি শুদ্ধ হয়েছিলেন। যখন তিনি এইভাবে অতি উচ্চস্বরে পূর্ণ উদ্বিগ্নতা সহ এই নাম ধরে ডেকেছিল, তখন তার আর কোন অপরাধ ছিল না, নারায়ণের প্রতি কোন অপরাধ ছিল না। তৎক্ষণাৎ চারজন বিষ্ণুদূত এসেছিলেন এবং তারা তাকে রক্ষা করেছিলেন। কেন? কারণ তিনি কোন অপরাধ ছাড়া নারায়ণের নাম উচ্চারণ করেছিলেন। 

পবিত্র নাম জপের ক্ষেত্রে দশবিধ অপরাধ আছে। এটি বলা হয়েছে যে, কেউ যদি কোন অপরাধ ছাড়া তা জপ করেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ তিনি সমস্ত পাপ কর্মফল থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। কিন্তু ব্যক্তির অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত যে তিনি যাতে এই পবিত্র নাম জপ নিজ ইন্দ্রিয়তৃপ্তি অর্থাৎ আরও অধিক পাপকর্ম করার জন্য না করে। যদি কেউ অধিক পাপকর্ম সহজে সম্পাদনের জন্য এই নাম জপ করে, তাহলে সেই নাম জপের ফল বিলম্বিত হবে। নাম জপের ফল নিশ্চিতরূপে থাকবে, কিন্তু এর ফল লাভ হতে ভবিষ্যতে বিলম্ব হবে। তাই নাম জপ তৎক্ষণাৎ কার্যকর হয়, যখন তা অপরাধমুক্ত বা অতি সামান্য অপরাধ যুক্ত থাকে। কিন্তু অপরাধ সহ নাম করলে এর ফল বিলম্বিত হবে, আর এই অপরাধ মানে হচ্ছে—শুদ্ধ ভক্তের প্রতি অপরাধ করা, শ্রীগুরুদেবকে অমান্য করা, শাস্ত্রের প্রতি অপরাধ করা, নাম জপের ক্ষেত্রে জাগতিক কল্পনাপ্রসূত ধারণা প্রয়োগ করা, নাম জপ করার সময় অমনোযোগী হওয়া, এবং বিশেষত আরও অধিক পাপকর্ম করা যাবে সেই জন্য নাম করা, যেমন যদি কেউ চিন্তা করে যে, “এই নাম জপের মাধ্যমে আমি পাপ থেকে শুদ্ধ হব তাহলে পরে আমি আরও পাপ করতে পারব।” এই ধরনের মানসিকতাকে বলা হয় অপরাধ। তাই, বিশেষত শুদ্ধভক্তের প্রতি অপরাধ করলে তা কারও ভক্তিসম্পদ পূর্ণরূপে নিঃশেষিত করে দেয়। 

এটিই দক্ষের সাথে হয়েছিল, তিনি বৈষ্ণব অপরাধ করেছিল। এটাই শচীমাতার সাথে হয়েছিল যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন, তিনি তাঁকে এক দৃষ্টান্তরূপে ব্যবহার করেছেন যে তিনি বৈষ্ণবের প্রতি অপরাধ করেছেন সেজন্য তিনি ভগবতপ্রেম প্রাপ্ত হতে পারবেন না। যে সমস্ত অসুরেরা কৃষ্ণকে হত্যা করতে যেত, তারা মোক্ষ লাভ করে। তারা ভগবানের ব্রহ্ম জ্যোতিতে বা তাঁর শরীরের মধ্যে লীন হয়ে যাওয়ার মোক্ষ লাভ করে। এই লীন হয়ে যাওয়াকে অবশ্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় বলে বিবেচনা করা হয় না, কারণ তা এমন কি অসুরেরাও লাভ করতে পারে। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে কেবল কোন শুদ্ধভক্তের প্রেম প্রাপ্তি, নিশ্চিতরূপে মোক্ষ প্রাপ্তির সাধারণ ধারণা থেকেও অধিক সর্বোত্কৃষ্ট।

মোক্ষের পাঁচটি বিভাগ আছে—সারূপ্য, সামীপ্য, সায়ুজ্য, সালোক্য এবং আরেকটি কি?

ভক্ত: সার্ষ্টি। 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: সার্ষ্টি। এই চারটি ধরণ কখনো কখনো বৈষ্ণবগণের দ্বারা গৃহীত হয়, কিন্তু শুদ্ধ বৈষ্ণব মোক্ষ-র ঊর্ধ্বে শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম লাভ করেন। এটি বলা হয়েছে যে শ্রীকৃষ্ণ মোক্ষ অতি সহজেই প্রদান করেন, কিন্তু তাঁর থেকে শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম প্রাপ্ত হওয়া খুবই কঠিন বা অতি বিরল, কারণ যখন তিনি কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করেন, তখন তিনি তার দ্বারা বন্ধনগ্রস্ত হন। অনেক পুরাণে এটি উল্লেখ করা হয়েছে যে শ্রীকৃষ্ণ সহজেই মুক্তি প্রদান করেন, কিন্তু তিনি ভক্তি বা প্রেম প্রদান করেন তা খুবই বিরল।

ঠিক যেমন কোন ব্যক্তি যদি কাউকে সন্তান রূপে বা শিষ্য রূপে গ্রহণ করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কেউ তার উন্নতির বিষয়ে চিন্তাশীল হন যে কিভাবে তাকে রক্ষা করা যেতে পারে এবং প্রেমের সম্বন্ধের কারণে সেই ব্যক্তি কিছুটা অধিকার বিস্তার করে থাকেন। এটি বলা হয়েছে যে, কৃষ্ণ যদি কোন ভক্তকে প্রেম প্রদান করেন, তাহলে আসলে তিনি নির্দিষ্টভাবে বিভিন্ন প্রেমপূর্ণভাবের দ্বারা বন্ধনগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অবশ্য তিনি সর্বদাই স্বরাট। আমাদের কখনই এমন চিন্তা করা উচিত নয় যে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন, তবে কখনও কখনও তিনি প্রেমবশত নিজেকে তাঁর ভক্তের অধীন হতে দেন, কিন্তু তিনি কখনই কোন মুক্ত জীবাত্মা বা মুক্তাত্মার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন না, কেবল শুদ্ধভক্তের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন।

যেহেতু শচীমাতা … শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মাতা বৈষ্ণব অপরাধ করেছিলেন। 

[পাশে: একটু কমিয়ে দিন।] 

“যেহেতু তিনি বৈষ্ণব অপরাধ করেছেন, সেই জন্য তিনি কৃষ্ণপ্রেম লাভ করার যোগ্য নন। তিনি মোক্ষ লাভ করতে পারেন, কিন্তু শুদ্ধ কৃষ্ণ প্রেম নয়।” সেজন্য সকল ভক্তরা বিলাপ করছিলেন! তারপর এই পরিকল্পনা করা হল যে কিভাবে শচীমাতা অদ্বৈত গোঁসাইয়ের প্রতি হওয়া অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারেন। তখন সব ভক্তরা অদ্বৈত গোঁসাইয়ের সমীপে গেলেন তাঁকে রাজি করানোর জন্য যে তিনি যাতে শচীমাতাকে তাঁর অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দেন এবং শচীমাতা ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও তাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন এবং সেটি ছিল সবথেকে এক চমৎকারী সাক্ষাৎকার। এক অসাধারণ ঘটনা ঘটেছিল, যখন ভক্তবৃন্দ অদ্বৈত গোঁসাইকে শচী মাতাকে তাঁর অপরাধের জন্য ক্ষমা করতে বলেছিলেন। 

আমি একটু বাংলায় ব্যাখ্যা করব। হরে কৃষ্ণ!

এইভাবে ভক্তবৃন্দ জানতে চেয়েছে যে মা শচী কি অপরাধ করেছে। তখন চৈতন্যদেব বলেছেন যে, “যাইহোক, বাল্যকাল আমি অদ্বৈত গোঁসাই পাঠ শুনতে গিয়ে, বিশ্বরূপকে আনতে গিয়ে, তিনি যে আমাকে সন্ন্যাস করে বানাবে ইত্যাদি কিছু অপমান, ভুল ভ্রান্তি কথা অদ্বৈত গোঁসাই-এর লক্ষ্যে বলেছিলেন। তাই এটা অপরাধ, আমি তাঁকে প্রেম ভক্তি দিতে পারি না।” এখন প্রেমভক্তি যে কি সেটা জানার জন্য আমাদের একটু জানতে হবে নামের মাহাত্ম্য বিষয়। নাম যত পাপ একজন করতে পারে, এক নামের দ্বারা সেটা (২২:৪০) পড়তে পারে। কিন্তু সেটা যখন নিরপরাধ নাম হয়। আমি যদি পাপ করি আর নাম করি, আবার যাতে পাপ করতে পারি, তাহলে সেই নামের খুব দেরিতে কাজ হবে। এবং আমি যদি কোন বৈষ্ণব অপরাধ করি নাম করে, তাহলে সে আমাদের সেই নামের প্রভাব ঐ অপরাধের দ্বারা, ওই বৈষ্ণব অপরাধের দ্বারা আমাদের আধ্যাত্মিক যত অ্যাসেট বা আমাদের যাকে বলে সঞ্চয় সব নষ্ট হয়ে যাবে। ওইভাবে সব ভক্তবৃন্দকে আমি অজামিলের উদাহরণ দিয়েছি যে কিভাবে অজামিল নারায়ণকে ডেকে তার ছোট বাচ্চাকে নাম ধরে, সেই অনুসারে বিষ্ণুদূত তাকে রক্ষা করতে এসেছিলেন, যেহেতু নিরপরাধে নাম করেছে। সেই হিসেবে সব ভক্তবৃন্দ বলেছেন চৈতন্যদেবকে যে—কি করে শচী মা অপরাধ থেকে মোচন হবে? তাই সবাই একসাথে অদ্বৈত গোঁসাইয়ের কাছে গিয়ে, অদ্বৈত গোঁসাই-এর কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে শচীমাতা কি অপরাধ বা করেছে? তখন অদ্বৈত গোঁসাই মাতাল হয়ে নৃত্য করছেন যে—“কি অপরাধ বা করেছেন মা শচী? আমার মা! আমার পূজনীয়া! কি ভক্তি! কি গুণ! কি সব আছে!” সেই ভাবে প্রায় পাগল হয়ে গেল সেই শচী মা-র গুনোগান কীর্তন করে নৃত্য করেছিলেন। 

আমি আবার একটু ইংরেজিতে ব্যাখ্যা করি তারপরে আবার আমি বলছি। 

তখন যখন অদ্বৈত গোঁসাই শুনলেন যে তারা বলছেন, “দয়া করে শচীমাতাকে তাঁর অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দিন। আপনি মহান বৈষ্ণব, তিনি মহা অপরাধী, দয়া করে তাকে ক্ষমা করে দিন।” তখন অদ্বৈত গোঁসাই বললেন, “কি! আমি শচীমাতাকে ক্ষমা করব? আমি কে? আমি তো কিছুই নই! আমি এমনকি ভক্তও নই! আমি সবথেকে নীচ! আমি কিভাবে ক্ষমা করব? তিনি মহান বৈষ্ণবী। তিনি সবসময় পূজনীয়া! তিনি সবসময় সেবা করেন, তিনি সবসময় শ্রীবিগ্রহ অর্চন করেন। তিনি সবসময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেবা করেন, তিনি সব সময় নামজপ করেন…” এবং এইভাবে শচীমায়ের মহিমা কীর্তন করতে করতে তিনি আনন্দে বিভোর হয়ে পড়েন। তিনি উল্লম্ফন করতে থাকেন ও আনন্দে নৃত্য করতে থাকেন, “মা যশ…” আমাকে ক্ষমা করবেন। “মা শচী কত অসাধারণ ভক্ত!” এবং এইভাবে তিনি বলেই যাচ্ছিলেন, তাঁর মহান গুণসমূহের প্রশংসা করেই যাচ্ছিলেন ও আনন্দে নৃত্য করে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি এত আনন্দের মধ্যে চিন্তা করছিলেন যে তিনি কত নীচ এবং শচীমাতা কত মহান, এই ভেবে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান ও অচেতন হয়ে পড়েন। সেই সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শচীমাতাকে বললেন, “এখন তাড়াতাড়ি যাও, তাঁর শ্রীচরণ ধরো তাহলে তুমি অপরাধ থেকে মুক্ত হবে।” তখন যখন তিনি অচেতন ছিলেন, নয়ত তিনি কখনোই তাঁকে তাঁর চরণ, শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করতে দিতেন না। স্বেচ্ছায় তিনি সেই বিনম্র পদটি গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় তিনি দৌড়ে যান ও তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্পর্শ করেন এবং তাঁর তথাকথিত অপরাধ থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হন। এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ভক্তকে এক দৃষ্টান্তরূপে ব্যবহার করেছিলেন। 

এটি ভগবদগীতাতে বলা হয়েছে যে ভগবান তাঁর ভক্তকে ব্যবহার করেন। গীতার তাৎপর্যে বলা হয়েছে যে ভগবান সমগ্র বিশ্বকে আধ্যাত্মিক জীবন শেখানোর জন্য তাঁর ভক্তকে ব্যবহার করেন। অর্জুনকে মায়ার দ্বারা মোহগ্রস্ত করা হয়েছিল যাতে আমরা ভগবদগীতা শ্রবণ করতে পারি। এইভাবে শচীমাতাকে কৃষ্ণপ্রেম প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, যাতে আমরা তাঁর কার্যকলাপের মাধ্যমে কখনও শুদ্ধ বৈষ্ণবের প্রতি অপরাধ না করা এবং পবিত্র নামের প্রতি অপরাধ খুব দৃঢ়ভাবে এড়িয়ে চলার এই নির্দেশ গ্রহণ করতে পারি। পবিত্র নামের প্রতি অপরাধ করা হচ্ছে নিজের জন্য সবথেকে খারাপ। একবার আমরা পবিত্র নাম জপ করতে শুরু করলে, তখন আমাদের সবকিছুই কৃষ্ণের প্রীতিবিধানের জন্য করা উচিত। আমাদেরকে একসাথে নিজ দেহ ও মনের ভালো পরিস্থিতি বজায় রাখতে হবে। অবশ্য কৃষ্ণ রুষ্ট হন না, তবে সেই সাথে আমাদেরও খুবই সতর্ক থাকতে হবে পবিত্র নামকে জাগতিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তির উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করার প্রতি, কারণ তাহলে নাম জপের প্রভাব বিলম্বিত হবে। তবুও আমাদের নাম-জপ করা উচিত। এমনকি যদি আমরা কোন অপরাধ করছি, তাহলে তবুও এমন কি অপরাধ সহ নাম করলেও এর প্রভাব থাকে, তবে তাতে দেরি হয়। 

একমাত্র একটি অপরাধ যেটির প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ পরাঙ্মুখ হত্তয়া উচিত, যা আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের প্রগতিকে পূর্ণরূপে স্তব্ধ করতে পারে, তা হচ্ছে ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের প্রতি অপরাধ করা। এভাবে দক্ষ এবং মহাদেব শিবের লীলা থেকে আমরা দেখতে পারছি, পরবর্তী শ্লোকগুলিতে বলা হয়েছে যে দক্ষ তার পদ হারিয়েছিল এবং ভগবানের মহান ভক্তদেরকে জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা দর্শন করার জন্য শাস্তি পেয়েছিল। আসলে কেন ভক্ত এত উন্নত? কারণ তাঁর হৃদয় এবং আত্মা ভগবানের প্রতি উৎসর্গীকৃত। অম্বরিষ মহারাজের লীলায় ভগবান শ্রীবিষ্ণু দুর্বাসাকে বলেছিলেন যে—“আমার হৃদয় হচ্ছে আমার ভক্তদের এবং আমার ভক্তদের হৃদয় হচ্ছে আমি।” যেহেতু ভক্ত সর্বদা ভগবানের কথা চিন্তা করেন, তাই ভগবান ভক্তের হৃদয়ে বাস করেন এবং যেহেতু ভক্ত ভগবানের কথা চিন্তা করেন, তাই ভগবান তাঁর ভক্তের কথা চিন্তা করেন। সেইজন্য তাঁর হৃদয় হচ্ছে ভক্তের। তিনি দুর্বাসাকে বলেছিলেন, “তুমি ভক্তের প্রতি অপরাধ করেছ, তাই তোমাকে তাঁর থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হতে হবে, আমি কিছুই করতে পারব না।” ভক্ত এতই উন্নত যে এমন কি মহান যোগী যেমন দুর্বাসা মুনিকেও বহিঃবিশ্বে ভ্রমণ করতে হয়েছিল এবং বিনম্র গৃহস্থ অম্বরিষ-এর কাছে ফিরে আসতে হয়েছিল, যিনি ছিলেন এক মহান রাজর্ষি। তিনি সমগ্র বিশ্বের রাজা ছিলেন, তিনি শ্রীকৃষ্ণের প্রীতিবিধানের জন্য সমগ্র বিশ্ব শাসন করছিলেন। তিনি বিশ্ব পরিচালনা করছিলেন যাতে মানুষেরা ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক জীবনে আসতে পারে। এমনকি অম্বরিষ কখনো কখনো শিব, দুর্গা আদি দেবতাদেরও পূজা করতেন, কেবল সাধারণ মানুষের কাছে এই দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য যে কিভাবে বিভিন্ন বৈদিক রীতি পালন করতে হয়, কিন্তু তার মনে, তার আলোচনা দ্বারা তিনি সবসময় ব্যাখ্যা করতেন যে কিভাবে দেবতাগণ হচ্ছেন শ্রীবিষ্ণুর অংশ এবং তিনি তাদেরকে স্বাধীন মনে করতেন না, তিনি তাঁদেরকে ভগবানের বিশ্বরূপের বিভিন্ন অঙ্গ রূপে পূজা করতেন। এইভাবে তাঁর রাজকীয় কার্যকলাপে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে, তাঁর জীবনের বিভিন্ন স্তরে তিনি সবসময় শ্রীবিষ্ণু, কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত ছিলেন। সেই জন্য এমনকি মহান যোগী যেমন দূর্বাশা যখন তাঁর প্রতি অপরাধ করতে চেষ্টা করেছিল, তখন সুদর্শন চক্র দ্বারা শাস্তি পেয়েছিল ও তাকে ব্যক্তিগতভাবে মহারাজ অম্বরিষের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইতে হয়েছিল। 

তিনি বলেছিল, “আমি ভেবেছিলাম আপনি একজন গৃহস্ত, আমি ভেবেছিলাম আপনি একজন সাধারন গৃহস্ত, কিন্তু এখন আমি দেখতে পারছি যে আপনি এক মহান যোগী। আপনি আমার থেকেও এক মহান যোগী; আপনি ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত।” তাই ভক্তিযোগ সর্বশ্রেষ্ঠ যৌগিক শক্তি প্রদান করে। এমনকি সাধারণ যোগীদের যৌগিক পন্থা দ্বারা লব্ধ যৌগিক শক্তির থেকেও তা মহান। এইভাবে আমরা বুঝতে পারি যে ভক্তিযোগের এই গোপন রহস্য সর্বাপেক্ষা গোপনীয় তত্ত্ব এবং রাজ বিদ্যা—রাজ গুহ্যম, রাজ বিদ্যা।

এছাড়াও এটি হচ্ছে—“রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্” (গীতা ৪.৩)। কত শ্লোকে এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে ভক্তিমূলক সেবার পন্থা কত মহান। আমাদের এটি খুব আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা উচিত, অপরাধ এড়িয়ে হরেকৃষ্ণ নাম জপ করা উচিত, কৃষ্ণের প্রতি আমাদের সেবা সম্পাদন করা উচিত। সাধারণ কার্যকলাপ এমনভাবে করা উচিত, যা চরমে আমাদেরকে কৃষ্ণের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর করে তুলবে। আমরা যাই হই না কেন—“গৃহে থাকো বনে থাকো সদা হরি বলে ডাকো”— গৃহস্ত বা ব্রহ্মচারী বা সন্ন্যাসী বা বানপ্রস্থি বা পুরুষ বা মহিলা যাই হই না কেন, আমাদের নিজেদের সেবা এমনভাবে করা উচিত যাতে তা ভগবানকে প্রসন্ন করে। তাহলে এইভাবে আমরা চৈতন্য মহাপ্রভু, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত সর্বোচ্চ আশির্বাদ লাভ করতে পারব, যা হচ্ছে কৃষ্ণ প্রেম, যা হচ্ছে সকল প্রকার মোক্ষের সার্থকতা, যা কাউকে পূর্ণতৃপ্তি প্রদান করে। 

স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে ।
অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি।।
(শ্রী. ভা. ১.২.৬)

হরে কৃষ্ণ! এটাই বাংলাতে বলছি। 

ঐরকম অদ্বৈত গোঁসাই নৃত্য নৃত্য করতে করতে একবারে মূর্ছ হয়ে পড়েছেন শচী মায়ের গুনোগান করে, সেই অবস্থায় চৈতন্যদেব শচীমাকে বলেছেন—“এবার চরণ ধরো!” তখন শচী মা ওই চরণকে ধরে সেই অপরাধ থেকে মুক্ত হলেন। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে, তখন তিনি প্রেম পেয়েছেন চৈতন্যদেবের কাছ থেকে। এভাবে আমরা বৈষ্ণব অপরাধ করলে বৈষ্ণবের কাছে এসে ক্ষমা আমাদের চাইতে হয়। এবং আমরা হরে কৃষ্ণ নাম করিল, আমাদের ঠিক যত্ন করে দেখা উচিত কোন যেন অপরাধ না হয়। যদি অন্য কোন অপরাধ হয় তবু ভবিষ্যতে কাজ হবে, তাহলেও নাম করা উচিত আমাদের, কিন্তু বৈষ্ণব অপরাধ করলে, ক্ষমা না চাইলে, ক্ষমা না পেলে, আমরা সেখানে আমাদের যদি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ হয়, তাহলে আমাদের ভক্তি পাবার আমাদের সম্ভাবনা যতক্ষণ আমরা সেই অপরাধ থেকে মুক্ত না হই, আমাদের হবে না। 

এইভাবে অম্বরিষ এর লীলা একটু ব্যাখ্যা করেছি ইংরেজি যে কিভাবে অম্বরিষ গৃহস্থ হয়ে, দুর্বাসা মুনির কাছে বুঝতে পারেননি, তার কাছে অপরাধ করে শেষকালে সুদর্শন চক্র তাকে ধরার জন্য ধরেছে। তখন আবার বিষ্ণু পর্যন্ত গিয়ে, বিষ্ণু তাকে বলেছিলেন যে—“আমার হৃদয় হচ্ছে সাধু আর সাধুর হৃদয় আমি। তাই তুমি সাধুর কাছে গিয়ে অপরাধ ক্ষমা চাও, আমি কিছু করতে পারব না।” তখন অম্বরিষের কাছে ফিরে গিয়ে, অম্বরিষ মহারাজের কাছে ক্ষমা চেয়েছে যে, “আমি এভাবে অপরাধ করেছি। আমি আপনাকে বুঝতে পারিনি যে আপনি সাধারণ গৃহস্থ নয়, সাধারণ মনুষ্য নয়, আপনি হচ্ছেন ভগবানের প্রিয় ভক্ত। প্রিয় ভক্ত হচ্ছে সবথেকে শক্তিশালী এবং প্রিয় ভক্ত হচ্ছে সব থেকে গুণশালী। তাই আমি ক্ষমা চাচ্ছি, আমি অবুঝ, এবার বুঝতে পেরেছি ভক্ত কি গুণ আর ভগবানের ভক্ত কি স্তর। আমি ক্ষুদ্র একটা সিদ্ধি যোগী, আমার আপনার কাছে কিছুই নাই। অপরাধ দয়া করে ক্ষমা করবেন, এবার থেকে আমি বৈষ্ণবের গুনগান করব, আমি তাদের অপরাধ কোনদিন আর করব না।” এভাবে আমরা চেষ্টা করা উচিত কোন বৈষ্ণব অপরাধ না করা, বৈষ্ণব সেবা বরং আমাদের করা উচিত, বৈষ্ণবের সেবা দ্বারা আমরা ভবিষ্যতে ভগবানের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হব এবং সেইভাবে আমাদের নিত্য শাশ্বত জীবনে স্থাপিত হবে, আমরা সেই নিত্য শাশ্বত জীবন ভেতরে আমাদের চির আনন্দ থাকবে, আত্মসাত হবে, এই আমাদের আর কোন আশা অপূর্ণ থাকবে না, যেহেতু শাস্ত্র আমাদের ভাগবত এই বিষয়ে প্রমাণ দিচ্ছে—

স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে ।
অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি।।
(শ্রী. ভা. ১.২.৬)

সম্পূর্ণ আত্মা সুপ্রসীদতি হইবে অহৈতুকি, নির্বন্ধন ভক্তি দ্বারা শ্রীবিষ্ণু, বাসুদেব কৃষ্ণ কাছে। 

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

কোন প্রশ্ন আছে? হ্যাঁ?

প্রশ্ন: (৩৭:১০)

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: যেহেতু তিনি মহাদেব শিবকে অভিশাপ দিয়েছিল, তাই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। তার মস্তক ছিন্ন করে, তাকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু মহাদেব শিবের কৃপায় একটি ছাগলের মস্তক তার মস্তকের স্থানে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল এবং তার জীবন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা যতদূর জানি যে তিনি এখনও ছাগলের মস্তক সহ জীবিত আছে। হরে কৃষ্ণ! তিনি ছাগলের মস্তক সহ আছে... এরপর তিনি এটি উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে তিনি বৈষ্ণবের প্রতি এক মহা অপরাধ করেছে। যখন তার জীবন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তিনি মহাদেব শিবের প্রতি প্রার্থনা করেছিল, যা আপনারা পরবর্তীতে পড়বেন ও এই সবকিছু ভাগবতে বিস্তারিত বর্ণিত আছে। 

এটি এক বিরাট ইতিহাস, এটি পূর্ণ দুটি স্কন্ধতে বা অন্তত পুরো একটি স্কন্ধ আছে, অথবা  আরেকটু কিছু আছে সেই পুরো ইতিহাস বিষয়ে যে কিভাবে দক্ষ শিবকে অভিশাপ দিয়েছিল, কিভাবে সতী প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিলেন, কিভাবে অবশেষে তিনি তাঁর দেহ ত্যাগ করেছিলেন, কিভাবে শিব সেই স্থানে, দক্ষযজ্ঞে আক্রমণ করেছিলেন, কিভাবে বিভিন্ন ব্রাহ্মণেরা বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তি পেয়েছিল, এই সব কিছু বর্ণিত আছে এবং অবশেষে কিভাবে ভগবান শিব তাদের সকলকে ক্ষমা করেছিলেন ও তাদেরকে তাদের নিজেদের প্রকৃত অবস্থানে ফিরিয়ে এনেছিলেন, তাও বলা আছে। 

মূল বিষয় হচ্ছে, এই ধরনের অভিশাপ কেবল অত্যন্ত কনিষ্ঠ স্তরের ব্যক্তির দ্বারাই দেওয়া হয়। যেহেতু দক্ষ খুবই আসক্ত ছিল, খুবই আসক্ত গৃহমেধি, এমনকি যদিও তিনি এক উন্নত পদে স্থিত কিন্তু তিনি তার জাগতিক পদের প্রতি খুব আসক্ত ছিল, সে জন্য তিনি শিবের গুণসমূহ দেখতে পারেনি। তাই আমাদের খুব সতর্ক হওয়া উচিত যে আমরা যেন নিজেদের জাগতিক পদের প্রতি, জাগতিক প্রসিদ্ধি, জাগতিক ধন, শক্তি বা সৌন্দর্য অথবা শিক্ষার প্রতি খুব বেশি আসক্ত না হই। কারণ এগুলি আমাদেরকে মিথ্যাভাবে অহংকারী করে তুলতে পারে এবং তখন আমাদের যদি সামান্য অবজ্ঞা করা হয়, তাহলে আমরা বৈষ্ণবদের প্রতি অপরাধজনক হতে শুরু করব এবং সেটি খুবই বিপদজনক। 

দক্ষ তার জাগতিক মর্যাদায় ব্রহ্মার পুত্র, প্রজাপতি, ও মহাদেব শিবের শশুর। শিব ধ্যানে ছিলেন, সমাধিতে ছিলেন। তিনি জানতেন না যে দক্ষ সেখানে আছে কিনা। তিনি একজন এত মহান ব্যক্তি, তিনি দক্ষের জন্য দাঁড়াতে পারতেন, এতে ক্ষতি কি? এমন কি যদিও আসলে তিনি দক্ষের থেকে অধিক মহান, কিন্তু তাঁর মহানতাবশত তিনি এমন করতেন। তবে যেহেতু তিনি ধ্যানে ছিলেন, সমাধিতে ছিলেন, তিনি জানতেন না দক্ষ সেখানে আছে কিনা। ভগবান শিব হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত, সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী, তিনি পূর্ণ সমাধিতে ছিলেন। তিনি বাহ্যিক জগতের বিষয়ে চেতন ছিলেন না। যতক্ষণ না তিনি তার সমাধি থেকে বের হয়েছিলেন, তিনি জানতেন না এই সবকিছু ঘটছে। তিনি এই সবকিছু ঘটনা শ্রবণ করেছিলেন এবং দক্ষ অভিশাপ দিচ্ছিল, ব্রাহ্মণেরা অভিশাপ দিচ্ছিল, এরপর নন্দীশ্বর ও তার পার্ষদরা অভিশাপ দিচ্ছিল, তারপর তিনি বললেন— “না! না!” এরপর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সেই স্থান ছেড়ে চলে গেলেন, তিনি জানতেন না যে এই সবকিছু হচ্ছে। তিনি সমাধিতে ছিলেন এবং দক্ষ যেহেতু তিনি কিছু বলছেন না তাই দেখে ক্রোধান্বিত হয়ে অভিশাপ দেওয়া শুরু করেছিল। তাই আমাদের কোন জাগতিক পদ, জাগতিক স্থিতি বা গুণ এর দ্বারা মিথ্যাভাবে অহংকারী হওয়ার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক হতে হবে, কারণ মিথ্যা অহংকারের ফলে আমরা ভক্তের প্রতি অপরাধ করতে পারি, যা আমাদের আধ্যাত্মিক প্রগতিকে নিঃশেষিত করার মতো ক্ষতি করতে পারে। হরে কৃষ্ণ! 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 25/07/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions