Text Size

১৯৮২১১১৫ শ্রীমদ্ভাগবতম ৩.১৫.১৯

15 Nov 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|Kathmandu, Nepal

নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী ১৫ নভেম্বর, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, নেপালে প্রদান করেছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৩য় স্কন্ধ, ১৫ অধ্যায়, ১৯তম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

যদিও মন্দার, কুন্দ, কুরবক, উৎপল, চম্পক, অর্ণ, পুন্নাগ, নাগকেশর, বকুল, কমল, ও পারিজাত বৃক্ষসমূহ অপ্রাকৃত সৌরভমণ্ডিত পুষ্পে পূর্ণ, তবুও তারা তুলসীর তপশ্চর্যার জন্য তাঁকে বহু সম্মান করে। কেননা ভগবান তুলসীকে বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শন করেছেন, এবং তিনি স্বয়ং তুলসীপত্রের মালা কণ্ঠে ধারণ করেন।

তাৎপর্য: তুলসীপত্রের মাহাত্ম্য এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তুলসীর বৃক্ষ ও তার পাতা ভগবদ্ভক্তিতে অত্যন্ত মহত্ত্বপূর্ণ। ভক্তদের প্রতিদিন তুলসীকে জল দান করা এবং ভগবানের পূজার জন্যে তুলসীপত্র চয়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক সময় এক নাস্তিক স্বামী মন্তব্য করেছিল, “তুলসী গাছে জল দিয়ে কি লাভ? তার থেকে বরং বেগুন গাছে জল দেওয়া ভাল। বেগুন গাছে জল দিলে বেগুন পাওয়া যায়, কিন্তু তুলসীতে জল দিয়ে কি লাভ হবে?” এই সমস্ত মূর্খ প্রাণীরা ভগবদ্ভক্তির তত্ত্ব না জেনে, জনসাধারণের শিক্ষার ব্যাপারে সর্বনাশ সাধন করে।

চিৎ-জগতে সবচাইতে মহত্ত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, সেখানে ভক্তদের মধ্যে কোন রকম মাৎসর্য নেই। তা ফুলেদের ক্ষেত্রেও সত্য, যারা সকলেই তুলসীর মহিমা সম্বন্ধে অবগত। যে বৈকুণ্ঠলোকে চার কুমারেরা প্রবেশ করেছিলেন, সেখানকার পক্ষী ও ফুলেরাও ভগবানের সেবার ভাবনায় ভাবিত ছিলেন।

ইতি শ্রীমদ্ভাগবতের ৩য় স্কন্ধ, ১৫ অধ্যায়, ১৯তম শ্লোকের তাৎপর্য সমাপ্ত।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
   যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রীগুরুং দীন তারণম
   পরমানন্দমাধবম্ শ্রীচৈতন্য ঈশ্বরম্
   হরি ওঁ তৎ সৎ

ইতি শ্রীমদ্ভাগবতের ‘ভগবদ্ধামের বর্ণনা’ নামক অধ্যায়ের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত। 

জয়পতাকা স্বামী: আমরা সবাই হচ্ছি আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের সদস্য, এর অর্থ হচ্ছে আমরা কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত। আধ্যাত্মিক জগতে এমন কি পক্ষী এবং পুষ্পও ভগবানের সেবার ভাবনায় ভাবিত। দেখুন, কিন্তু এখানে কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘে আমাদেরও নিশ্চিতরূপে ভগবানের সেবার ভাবনায় ভাবিত হতে হবে। আসলে এখানে থাকার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটাই যে ভগবানের সেবার ভাবনায় ভাবিত হওয়া। যদি এমনকি আধ্যাত্মিক জগতে বৃক্ষ এবং পুষ্পরাও সেই চেতনাময় হন, তাহলে দেখুন আমরা বুঝতে পারি যে এই কৃষ্ণচেতনা কোন জাগতিক বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিক এবং এটি হচ্ছে এমন এক বস্তু যা আমাদের অর্জন করতে হবে, যদি আমরা প্রকৃতই শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করতে চাই তাহলে। যদি আমরা প্রকৃতই আমাদের নিত্য জ্ঞানময় ও আনন্দময় স্বাভাবিক স্থিতিতে উন্নীত হতে চাই তাহলে। 

মনে করুন, শ্রীল প্রভুপাদ বিভিন্ন ভক্তদেরকে কৃষ্ণভাবনামৃতের ব্যবহারিক দিকসমূহ বিষয়ক কতবার নির্দেশ প্রদান করেছেন, কিন্তু কেবল অজ্ঞানতার দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ায়, কৃষ্ণের সেবা সম্বন্ধীয় ভাবনায় ভাবিত না হওয়ায়, তারা সেবায় গড়বড় করে ফেলতেন। তারা সেটিকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে ফেলতেন। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে ভক্ত দিনের মধ্যে যা কিছু সেবাকার্য করেন, তা সে মেঝে ঝাড়ু দেওয়া হোক বা রন্ধন সেবা হোক বা প্রচার সেবা হোক, তা যান্ত্রিকভাবে করা ঠিক নয়, এটি সম্পূর্ণরূপে ভগবত সেবার ভাবনায় ভাবিত হয়ে সম্পন্ন করার কথা। যখন আমরা ঝাড়ু দেই, তখন আমরা চিন্তা করি কিভাবে আমাদের এই সেবা যথার্থরূপে করা যাবে। আমরা প্রতিটি ধূলি বের করি, কারণ আমরা ভগবানের প্রীতিবিধান করতে চাই। এইরকম নয় যে, “ওহঃ এই সেবা তত গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাই খুব তাড়াতাড়ি এই সেবাটি করা যাক।” আর আমরা অন্য কোন বিষয়ে চিন্তা করছি। না! সবকিছু যা আমরা করছি, আমাদের তা পূর্ণরূপে কৃষ্ণের প্রতি সেবা নিবেদনের চেতনায় মগ্ন হয়ে করা উচিত। দেখুন কিভাবে আমরা এর দ্বারা সরাসরি গুরু এবং কৃষ্ণের প্রীতিবিধানের চেষ্টা করছি। 

বৃক্ষরা, তারা এই চেতনাময়, “ওঃ তুলসী দেবী এক মহান ভক্ত, তাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণের অধিক কৃপা আছে।” এই জড় জগতে যদি কেউ মহান হয়, তাহলে প্রত্যেকেই সেই ব্যক্তির শক্তি হ্রাস করার চেষ্টা করে, তাকে নিচে নামাতে চায়, এটাই হচ্ছে জড় জগতের বৈশিষ্ট্য। কেউই অন্য কারও মহান হওয়ার বিষয়টি সহ্য করতে পারে না, কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতে সেখানে বিন্দুমাত্র মাৎসর্য নেই। তারা এই চেতনাময় যে, “ওঃ তুলসী দেবী তিনি বিশাল তপস্যা সাধন করেছেন, তাঁর মহৎ গুণাবলী আছে, সেইজন্য ভগবান তাঁকে পছন্দ করেন।” তারা তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত নন, তারা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাদের সেবা নিবেদনের চেষ্টা করছেন। যদি কেউ অধিক ভালো কিছু করেন, তাহলে তারা তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। একইভাবে এই আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘে একমাত্র যে উপায়ে আমরা পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারব, তা হচ্ছে এই সংস্থার মধ্যেকার সামান্যতম ঈর্ষাপরায়ণভাবও সম্পূর্ণরূপে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। কারণ ঈর্ষা হচ্ছে এমন কিছু যার আধ্যাত্মিক জগতে কোন অস্তিত্ব নেই। সেইজন্য একটি আধ্যাত্মিক সংস্থায় নিশ্চিতরূপে কোন ঈর্ষা থাকা উচিত নয়। ঈর্ষা অসহনীয়তার কোন রূপ গ্রহণ করে, অন্য ভক্ত অধিক প্রতিষ্ঠা লাভ করলে অথবা তিনি সেবা করার ক্ষেত্রে আরো উন্নত ধরনের সক্ষমতা লাভ করলে সেটি ঈর্ষার কারণ নয়, এর পরিবর্তে তা প্রশংসার কারণ হওয়া উচিত অথবা অনুকূল মনোভাবের কারণ হওয়া উচিত। 

ঈর্ষা হচ্ছে এমন কিছু যা আধ্যাত্মিক মনোভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। ঠিক যেমন আপনি সবকিছুকে নিযুক্ত করতে পারেন, কাম—তা আপনি কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করতে পারেন, ক্রোধ, লোভ, কখনো কখনো মানুষেরা কৃষ্ণের সেবার জন্য কোন কিছু পাওয়ার প্রতি অত্যন্ত লোভী হন। কাম, ক্রোধ, লোভ,… ক্রোধ হচ্ছে রাগান্বিত হওয়া। হনুমান সীতা দেবীর প্রতি অপরাধ দেখে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন। কখনো, এমন কি দ্বারকায় কিছুটা ক্রোধের মনোভাব দেখা যায় যে সত্যভামা রাগান্বিত হয়েছেন, কিন্তু সেটি হচ্ছে কিভাবে আরো ভালোভাবে ভগবানকে সন্তুষ্ট করা যাবে সেই জন্য। এইভাবে, ভক্তিমূলক সেবার বিভিন্ন ভাব আছে, সেই সবকিছু পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হতে পারে, তবে এই নির্দিষ্ট বিষয় যা হচ্ছে ঈর্ষা ভাব, অন্য ব্যক্তিকে নিচে নামানো, সেটা বাঞ্ছনীয় নয়, কারণ কিভাবে তা কৃষ্ণের প্রীতিবিধান করবে? এর পরিবর্তে কিভাবে সেবার মাধ্যমে কৃষ্ণকে অধিক প্রসন্ন করা যাবে সেটা হচ্ছে ব্যবহারিক পরিকল্পনা। যদি কেউ কৃষ্ণকে অধিক প্রসন্ন করতে পারেন, তাহলে আপনারা জানেন যে কৃষ্ণ সেই ভক্তের প্রশংসা করেন যিনি তাঁর ভক্তের প্রশংসা করেন। সেই ভক্তের প্রশংসা করার মাধ্যমে আপনি কৃষ্ণের সেবা করছেন। অন্যের প্রতি ঈর্ষা করা কিভাবে সেবা হতে পারে? এখানে আমরা দেখতে পারছি যে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে সেখানে ভক্তদের মাঝে কোন ঈর্ষা নেই। পুষ্প থেকে শুরু করে গোপী পর্যন্ত এবং অন্যান্য ভক্তদের সবার ক্ষেত্রেই তাই। এমন কি আমরা বুঝতে পারি যে, শ্রীমতী রাধারানী শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী, কিন্তু এমনকি তিনিও অন্য কোন গোপিকে কৃষ্ণের কাছে নিয়ে আসেন, তিনি কেবল নিজে কৃষ্ণকে লাভ করার প্রতি অধীর নন, সেই ভাব এইরকম যে যা কিছু কৃষ্ণকে অধিক প্রসন্ন করবে। 

যাই হোক, এই সমস্ত বিষয়গুলি অত্যন্ত উচ্চ বিষয়বস্তু, কিন্তু আমাদের আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়ে বোঝা উচিত। সেটির জড়জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কোন সম্পর্ক নেই। জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এমন কিছু যা পুরোপুরি ভিন্ন। এখানে কেউ শারীরিক প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে চিন্তামগ্ন থাকে, কেউ মানসিক প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে চিন্তায় থাকে, কেউ কৃষ্ণ সেবা ছাড়া অন্যান্য সমস্ত ভাবনায় ভাবিত থাকে। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছিলেন যে— এই জড়জগতে কোন কিছুরই ঘাটতি নেই, সেখানে আমাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য সবকিছুই আছে, কিন্তু প্রকৃত যেটির ঘাটতি আছে, তা হচ্ছে কৃষ্ণের সেবা। যখন মানুষেরা এই চেতনাময় হয় যে, “হ্যাঁ! আমার কৃষ্ণের সেবা করা উচিত।” যদি আপনি কৃষ্ণকে সেবা করার কথা বলেন, তখন নাস্তিকেরা বলবে যে, “কেন কৃষ্ণের সেবা করব? কে কৃষ্ণ? আমি কি করে জানব যে কৃষ্ণ আছেন? আমার কৃষ্ণের সেবা কেন করা উচিত? তার সেবা করার মাধ্যমে আমি কি পাব?” এই বিভিন্ন প্রশ্ন তারা তুলে ধরে, কারণ তাদের কোন ধারণা নেই যে তারা কে। তাদের কোন ধারণা নেই কৃষ্ণ কে, তাদের এর গুরুত্ব সম্বন্ধে ও কৃষ্ণের সেবার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক্ কোন চেতনা নেই। এই কারণেই তারা হচ্ছে মূঢ়। এই কারণেই তারা হচ্ছে সর্বাপেক্ষা দুর্ভাগ্যজনক। এই মনুষ্য সমাজ এই ধরনের তথাকথিত মূঢ়, যারা কেবল কৃষ্ণ সেবার চেতনা ধ্বংস করতে সাধুর পোশাক পড়ে আছে—তাদের দ্বারা বিপথে চালিত হচ্ছে। 

প্রত্যেকের এই ভাবনায় ভাবিত হওয়া উচিত যে, আমাদের কৃষ্ণের সেবা করা উচিত কারণ কৃষ্ণসেবার ভাবনা এত শক্তিশালী। এমন কি সাময়িক ধর্ম বিশ্বাসে তাদের চেতনা ভগবানকে সেবা করার প্রতি তত দৃঢ় নয়, যতটা ভগবানের থেকে নিজেদের প্রয়োজনের সরবরাহ লাভ করার প্রতি দৃঢ় — “হে স্বর্গস্থ পিতা, আপনার নাম পবিত্র হোক। আজ আমাদের প্রতিদিনের আহার দিন; আমাদের যা প্রয়োজন তা দিন।” যেমন দুর্গাপূজায়— “ধনং-দেয়া, প্রতিষ্ঠা-দেয়া শ্রীয়ং-দেয়া, পূজ্যম-দেয়া”—“আমাকে অর্থ দিন, আমাকে সম্পত্তি দিন, আমাকে শক্তি দিন, আমাকে শ্রী দিন। আমাকে দিন! আমাকে দিন!” এই চেতনা হচ্ছে আমাকে দিন, “ভগবান আমাকে সেবা করুন! সেবা করুন! ভগবান, এর দ্বারা আমার সেবা করুন! সেটি দেওয়ার দ্বারা আমাকে সেবা করুন! এটি প্রদান করে আমাকে সেবা করুন! সেটি প্রদান করে আমাকে সেবা করুন!” দেখুন এইভাবে আমরা চাই ভগবান যাতে আমাদের সেবা করেন, এটা হচ্ছে সাধারণ ধর্মীয় বিশ্বাস, কিন্তু এখানে শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্ভাবন। এখানে জীব এটি অনুধাবন করতে সক্ষম যে, “আমি কৃষ্ণের নিত্য দাস”—“জীবের ‘স্বরূপ’ হয়—কৃষ্ণের ‘নিত্যদাস’”। আমি কৃষ্ণের নিত্য সেবক — “র্গোপীভর্তুঃ পদকমলয়োর্দাসদাসানুদাসঃ।।” এবং কৃষ্ণের সেবা করা এটিই হচ্ছে পরিসমাপ্তি, এটিই হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায় যা প্রাপ্ত হওয়ার জন্য আমাদের লালায়িত হওয়া উচিত, কেবল কৃষ্ণের সেবা করা, কারণ কৃষ্ণের সেবা করাই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা অন্তরঙ্গ এবং সবথেকে গুহ্যতম উপলব্ধি, যার মধ্যে অন্যান্য সব উপলব্ধি অন্তর্ভুক্ত। 

যদি আপনি কৃষ্ণের সেবা করেন, তাহলে আপনি সবকিছুকেই উচ্চতর দিব্য দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা দর্শন করতে সক্ষম হবেন। আপনি দেখতে চান রাজত্বে কি হচ্ছে, রাজা ছাড়া অন্য কেউই ভালোভাবে জানেন না সেই সব পারিপার্শ্বিক বিষয়সমূহ, যা তার রাজত্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে, কারণ রাজার কাছে তার নিজের গুপ্তচর আছে, তার কাছে নিজস্ব বুদ্ধি আছে, সাধারণ মানুষ আছে, তার কাছে সরকারি ব্যক্তিবর্গ আছে, সবক্ষেত্রেই তার কাছে লোক আছে। তার পরিচালনার সক্ষমতা হচ্ছে, যদি তিনি একজন নিষ্ঠাবান রাজা হন, তাহলে তিনি পরিব্যাপ্তিশীল হবেন, তার সন্নিকটে যারাই থাকবেন, তাদের সবারই খুব ভালো দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে যে আসলে কি হচ্ছে এবং প্রত্যেকেই জানেন যে এটাই হচ্ছে সবথেকে শক্তিশালী পদ। একইভাবে, কৃষ্ণের সেবক হওয়া সেটাই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা উন্নত পদ। এটা কোন সাধারণ বিষয় নয়। যারা বুদ্ধিমান, তারা জানে যে ভগবানের বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গের প্রতি ঈর্ষা করার কোন ভালো ফল নেই, কারণ যদি আপনি তা করেন, তার অর্থ হচ্ছে আপনি বিশ্বাসযোগ্য নন, আপনি সেই অন্তরঙ্গ মণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য নন, এর মানে হচ্ছে আপনার নিশ্চয়ই অন্য কোন অভিসন্ধি আছে, কারণ একজন সত্যিকারের বিশ্বস্ত ব্যক্তি কেবল ভগবানের অনুকূলে কার্য করেন এবং যদি আপনার অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে আপনি তার প্রতি ক্রোধান্বিত হবেন। যদি ভগবানের ইচ্ছাই আপনার ইচ্ছা হয়, তাহলে আপনি অত্যন্ত প্রসন্ন থাকবেন যে, “ওঃ এই ভালো ব্যক্তি ভগবানের সেবা করছেন, এখন অবশেষে ভগবানের ভালো কিছু সেবা হচ্ছে।” কারণ ইচ্ছা এক, সেই জন্য আপনাকেও স্বীকার করা হয় যে, “ঠিক আছে! আপনি এখন অন্তরঙ্গ মণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত।” কৃষ্ণের প্রতি সেবা নিবেদন করাই হচ্ছে আসলে সর্বাপেক্ষা গুহ্যতম গোপনীয় বিষয়বস্তু। তা এমনকি বিশ্বের বেশিরভাগ ধর্মেই প্রকাশিত নয়। সেখানে কেবল এই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে আমাদের ভগবানকে ভালোবাসা উচিত। প্রেম মানে কি? তা হচ্ছে তাঁর প্রতি সেবা নিবেদন করা। সেবা নিবেদন করা কত গুরুত্বপূর্ণ। কি সেবা আমরা ভগবানের প্রতি করতে পারি? আমরা কি সেবা নিবেদন করতে পারি? অবশ্য তাঁর সবকিছু আছে, কিন্তু তিনি এত কৃপাময় যে যদিও তাঁর সবকিছু আছে, কিন্তু তবুও তিনি এমনকি তাঁর ভক্তের থেকে সরল কোন সেবা গ্রহণ করেন। আমরা এক পাত্র জলে তুলসী পাতা নিবেদনের মাধ্যমে এর প্রারম্ভ করতে পারি। “পত্রং পুষ্পং” — পত্রং মানে কি? সেটা হচ্ছে পাতা, পাতা হচ্ছে তুলসী পাতা। তোয়ং — আপনি তুলসী পাতা জলে দেবেন এবং ভগবান তা গ্রহণ করবেন। “পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং” — এই সরল বস্তু। প্রথম হচ্ছে পত্রং—পাতা, সেটা হচ্ছে তুলসী পাতা। যদি আমরা কৃষ্ণকে তা নিবেদন করি, যদি আমরা ভক্তি সহ তা নিবেদন করি, তাহলে আমরা তাঁকে প্রসন্ন করতে পারব। এটি হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের মহানতা, তাঁর উদারতা যে যদিও তিনি সর্বাপেক্ষা উন্নত পদে বিরাজমান, তাঁর ভীতির কোন কিছু নেই, তাঁর অভিশংসিত হওয়ার কিছু নেই, তিনি পদচ্যুত হবেন না, কোনভাবেই তাঁর প্রতি স্পর্ধা করা যাবে না, যদি কেউ তাঁর বিপরীতে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তিনি কেবল তাদেরকে জড়জগতে পাঠিয়ে দেন এবং তাকে তাঁর জড় শক্তির সাথে লড়াই করতে দেন। তাঁর কোন সমস্যাই নেই, তিনি এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি এই সবকিছু থেকে নির্লিপ্ত, তবে একই সাথে তাঁর কোন অবহেলার মনোভাব নেই, তিনি প্রেমময় এবং ভাব বিনিময়ের মনোভাবে আছেন। তিনি তাঁর ভক্তদের নিবেদন গ্রহণ করেন। দেখুন, এই জন্যই শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন অসাধারণ। যখন কেউ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অসাধারণ গুনাবলী সম্বন্ধে শ্রবণ করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কেউ এমন একজন মহান ব্যক্তিত্বের সেবা করতে চান। প্রত্যেকেই এমন একজন মহান ব্যক্তিত্বের সেবা করতে চান, কেবল অসুর, নাস্তিক ও সেই সমস্ত ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তিবর্গ বাদে, যারা নিজেদেরকে মহিমান্বিত করতে চায় এবং নিজেদের সেবা করতে চায় এবং যাদের সত্য সম্বন্ধে সব ধরনের ভুল ধারণা আছে। সেই জন্য আমরা ভগবদগীতা, শ্রীমদ্ভাগবতের প্রচার করি, কারণ যদি তারা আসলেই এটা বুঝতে পারে যে তারা কে, যদি তাদের সেই প্রকৃত জ্ঞান লাভ হয়, তাহলে তারা তাদের এই মিথ্যা পদ পরিত্যাগ করতে পারবে এবং তাদের ঈর্ষাভাব পরিত্যাগ করতে পারবে। 

ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদেরকে সেবা করার এক সরল পন্থা প্রদান করেছেন, যা শুরু হচ্ছে নাম-কীর্তন এবং শ্রবণের মাধ্যমে। এই নাম কীর্তন এবং শ্রবণ হচ্ছে, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র— “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে” নাম জপের মাধ্যমে খুব সহজেই [পাশে একজন ভক্তকে বললেন হরে কৃষ্ণ] কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রতি আমাদের স্বতঃস্ফূর্তভাব বিকশিত করা যায়। এখানে আমরা দেখতে পারছি যে আধ্যাত্মিক জগতে প্রত্যেকেরই এই চেতনা জাগ্রত। এমনকি পুষ্প, তারাও চেতনাময়। পক্ষী, তারাও চেতনাময়। এই জড়জগতে প্রত্যেকেই ভগবানের সাথে তাদের সম্বন্ধ বিষয়ে চেতনাহীন, তারা অত্যন্ত চেতনাময় সেই সব বিষয়ে যা নির্ভর করছে তাদের গুণের উপর, তারা নিজ স্বভাবের বৈশিষ্ট্য বা গুণের উপর নির্ভর করে সেই সব বিষয়ের প্রতি আপেক্ষিকভাবে অধিক চেতনাময় বা কম চেতনাময়। তাদের চেতনা হয় সত্ত্বগুণের— যারা অন্যদের সেবা করার প্রতি, উদারতা, শান্তি, সত্যবাদিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিমুখ। তারা হয়ত সত্য সম্বন্ধে বলার প্রতি অত্যন্ত চেতনাময়। তারা হয়ত ধর্মীয় ব্যক্তি হওয়ার প্রতি অত্যন্ত চেতনাময়। তারা হয়ত এইসব বিষয়ে চেতনাময় যে এটাই হচ্ছে সত্য এবং কোনো ব্যক্তি রজগুণের হলে, তিনি তার লাভ পাওয়ার প্রতি খুবই চেতনাময়। আনন্দ লাভের প্রতি এবং যে সমস্ত বিষয় তিনি চায়, সেইসবের প্রতি চেতনামায়। সেই ব্যক্তি প্রতি পরিস্থিতিতে যেকোনো শত্রুর বিনাশ করে অধিক থেকে অধিকতর সঞ্চয় করতে চায়, এটাই হচ্ছে রজগুণ এবং তমগুণে কোন ব্যক্তি খুবই অজ্ঞানতাপূর্ণ এবং তার চেতনা তুচ্ছ বিষয়ের প্রতি বিমুখ, যথা—নেশা করা, নিদ্রাচ্ছন্ন হওয়া, উন্মাদ গ্রস্ততা। তাই, এই তিন গুণের মধ্যে সাধারণত সত্ত্ব গুণ অধিক উন্নত, কিন্তু এমনকি সেক্ষেত্রেও এটা প্রয়োজনীয় নয় যে তাদের ভগবানের সেবা করার চেতনা আছে। এই জন্য জড়জাগতিক সত্ত্ব গুণ কাউকে আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। তাই কেউ সত্ত্বগুণ, রজগুণ বা তমগুণ, যে গুণেই থাকুক না কেন, ভগবানের সাথে আমাদের সম্বন্ধের বা ভগবানের প্রতি আমাদের সেবা মনোভাবের প্রকৃত চেতনা জাগ্রত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যক। যেহেতু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই আন্দোলন পরম শুদ্ধ দিব্য স্তরে স্থিত, সেই জন্য তিনি যেকোন কারও চেতনা জাগ্রত করতে পারেন, তা তারা সত্ত্ব গুণে থাকুক, বা রজ গুণে থাকুক বা তম গুণে থাকুক। 

সাধারণ বর্ণাশ্রম ধারণা অনুসারে, হিন্দু ধারণা হচ্ছে যে, যেহেতু তারা ভগবানের সেবা সম্বন্ধে জানে না, তারা সেই বিষয়ে চেতনাময় নয়, সেজন্য তারা মনে করে যে কোন ব্যক্তি যে গুণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, কারণ যেহেতু তারা দেখে যে সেটা সাধারণত একই থাকে, তাই তারা বলে যে এটি স্থায়ী বিষয়। তাদের এই বর্ণভিত্তিক অত্যন্ত দৃঢ় ধারণা আছে, এমনকি জড়জাগতিক জীবনেও এটি দেখা যায় যে কিছু ক্ষত্রিয়, কিছু রাজন্যবর্গ, যেমন বিশ্বামিত্র, তিনি একজন ক্ষত্রিয় হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তার বর্ণ ছিল ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয় মানে যোদ্ধার বর্ণ, কিন্তু তিনি একজন ব্রাহ্মণ হতে চেয়েছিলেন, তিনি একজন ঋষি হতে চেয়েছিলেন। সেইজন্য তিনি বিশাল তপস্যা করেছিলেন এবং সেই বিশাল তপস্যা করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি একজন ব্রাহ্মণের স্তরে উন্নীত হয়েছিলেন, তারপর তিনি ব্রাহ্মণ থেকে ঋষিতে পরিণত হয়েছিলেন, তারপর তিনি মহর্ষি হয়েছিলেন, তিনি একজন ব্রহ্মর্ষি হয়েছিলেন, অবশেষে তিনি যখন একজন ব্রহ্মর্ষি-র স্তর প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তখন তিনি তার যৌগিক শক্তির দ্বারা জড় বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন আশ্চর্যকর কার্য করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তাঁর পূর্বজন্ম স্মরণ করতে পারতেন, তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন, ব্রহ্মর্ষি হওয়ার দ্বারা তিনি আরো অনেক কিছু শক্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন গ্রহ লোকে ভ্রমণ করতে পারতেন, গ্রহলোক সৃষ্টি করতে পারতেন, তিনি তার যৌগিক শক্তির দ্বারা এই সব কিছু পেয়েছিলেন। সেই সময় বশিষ্ঠ মুনি, যিনি ছিলেন রামচন্দ্রের গুরু, তিনি প্রথম থেকেই জন্মগত ব্রাহ্মণ ছিল এবং তিনি পূর্বেই একজন ব্রহ্মর্ষি ছিলেন। সেখানে সবসময় একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, কারণ বিশ্বামিত্র সবসময় নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন যে তিনি বশিষ্ঠের মতো সমগুণসম্পন্ন, কিন্তু তিনি কখনই ব্রহ্মর্ষির সেই স্তরে আসতে পারছিলেন না, তিনি সবসময় নিম্নস্তরেই ছিলেন। অবশেষে যখন তিনি ব্রহ্মার থেকে ব্রহ্মর্ষি হওয়ার আশীর্বাদ প্রাপ্ত হন, তখন বশিষ্ঠ তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন যে, “হ্যাঁ! অবশ্যই তুমি একজন ব্রহ্মর্ষি, কিন্তু তুমি সর্বাপেক্ষা উচ্চ স্থিতিতে নও। তিনি বললেন, “কি? আমি একজন ঋষি, আমি সবার ঊর্ধ্বে।” তিনি বললেন, “না! আমি একজন ব্রহ্মর্ষি, আমি জানি এখন তুমিও অবশেষে একজন ব্রহ্মর্ষি হয়েছ, কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি যে তুমি চেতনার স্তর অর্জন করেছ, তুমি শক্তি অর্জন করেছ, কিন্তু তুমি সর্বোচ্চ স্থিতি লাভ করোনি। সর্বোচ্চ… আমাদের থেকে অনেক অনেক মহৎ হচ্ছেন ভগবান শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ সেবকবৃন্দ। এমনকি যদিও আমরা হচ্ছি ব্রহ্মর্ষি, তবুও আমাদের শক্তি হচ্ছে এই জড় জগতে সীমিত এবং তাদের শক্তি আধ্যাত্মিক বিস্তারের ঊর্ধ্বে।” বিশ্বামিত্র এর দ্বারা বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন, তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে—কিভাবে আমি এতকিছু করলাম একজন ব্রহ্মর্ষি হওয়ার জন্য, আর এখন দেখছি এর থেকেও মহৎ কিছু আছে। এটিও উল্লেখিত আছে যে যখন কেউ এমনকি ব্রহ্ম উপলব্ধি লাভ করে, তখন আপনি আধ্যাত্মিক, শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় যেতে পারবেন —

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙক্ষতি।
সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্।।
[গীতা ১৮.৫৪]

ব্রহ্ম উপলব্ধির পর এটি কারো পক্ষে সম্ভব যে শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হওয়া। 

সাধারণত একজন ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের যোগ পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যান, পূর্ণ উপলব্ধি লাভ করেন, সমস্ত প্রকার পাপ কর্মফল থেকে পূর্ণরূপে মুক্ত হন, তারপর আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হন এবং সেখান থেকে তিনি আসলে ভগবানের সেবায় প্রবেশ করতে পারেন। কারণ কেউ কিভাবে ভগবানের সেবা করতে পারবেন, যতক্ষণ না তিনি পূর্ণরূপে শুদ্ধ হচ্ছেন? এটি হচ্ছে বিশেষ সুযোগ, যা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রদান করেছেন এবং স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ কিছু পরিমাণে এই সুযোগ দিয়েছিলেন, যখন তিনি এই ধরাধামে প্রকট লীলাবিলাস করছিলেন যে— যদি কেউ ভগবানের প্রতি সরাসরি শরণাগত হন, তাহলে এমনকি যদিও কাউকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন তপস্যা ও প্রায়শ্চিত্তের মধ্যে দিয়ে মুক্তির স্তরে উন্নীত হতে হয়, তবে তা কেবল ভগবানের প্রতি শরণাগত হওয়ার মাধ্যমেই কেউ ভক্তিমূলক সেবার স্তর লাভ করতে পারবেন। এটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অধিক সহজ করেছেন যে, এমনটি শরণাগতি ছাড়াও যদি আপনি হরেকৃষ্ণ নাম জপ করেন, কারণ শ্রীকৃষ্ণের নাম এত মধুর এবং যেমন আমি গতকাল উল্লেখ করেছিলাম যে এর দ্বারা ধীরে ধীরে কেউ নাম জপের প্রতি রুচি বিকশিত করতে পারে, তা আস্বাদন করতে শুরু করে এবং শ্রীকৃষ্ণকে আস্বাদন করার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের কাছে যাওয়ার বাসনা ও শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার বাসনা হৃদয়ে স্থান গ্রহণ করে। তা ইতিমধ্যেই হৃদয় আছে, তবে তা আচ্ছাদিত অবস্থায় আছে এবং তখন কারও পক্ষে পরিপূর্ণতার স্তর প্রাপ্তি খুবই সহজ হয়। আধ্যাত্মিক জগতে প্রত্যেকেই ভগবানের প্রতি তাদের সেবার বিষয় চেতন এবং এই জড়জগতে আমাদের সেই চেতনার অভাব আছে। তাই, সেই প্রকৃত চেতনা অনাচ্ছাদিত করতে হবে, যেখানে আমরা এটি দেখতে সক্ষম হব যে জীবনের পরিপূর্ণতা হচ্ছে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত থাকা এবং সেই চেতনাই জাগ্রত হতে হবে। বৈকুন্ঠ লোকে তাদের ভগবানের প্রতি সেবা নিবেদনের রুচি এতই দৃঢ় যে এমনকি পুষ্পদের মধ্যেও এবং মৌমাছিদের মধ্যেও এবং পক্ষীদের মধ্যে ও অন্যান্য প্রজাতিদের মধ্যেও, এমনকি মানুষদের মধ্যেও বা যারা মনুষ্য নয়, সেখানে কেউই মনুষ্য নয়, তাদের মনুষ্যদের মতো স্বরূপ আছে, কিন্তু তারাই হচ্ছে প্রকৃত স্বরূপ যার অনুরূপ মনুষ্য দেহ সৃষ্টি হয়েছে। বৈকুন্ঠবাসিরা, এমনকি সেখানে স্বামী-স্ত্রী একত্রে বাস করেন, তবুও তাদের কৃষ্ণের প্রতি সেবা নিবেদন করার ক্ষেত্রে এতই রুচি, ভগবান নারায়নের প্রতি সেবা নিবেদনের বিষয়ে তারা এতই আনন্দময় যে আলিঙ্গন করা বা চুম্বন করা বা সহবাস করার ইচ্ছা কখনই তাদের হৃদয়ে প্রকট হয় না। তারা ইতিমধ্যেই এতটাই পরিতুষ্ট যে সেই সমস্ত বাসনার কোনো অস্তিত্ব নেই এবং এই জড়জগতে আমরা দেখতে পাই যে স্থুল যৌন জীবন থেকেই সাথে থাকার সমস্যার উদয় হয়। সেটা এমনকি সেখানে নেই, সেইজন্য সেখানে কোন জন্মের প্রয়োজনীয়তা নেই। সেখানে জড়জাগতিক যৌন জীবন নেই মানে, সেখানে কোন জন্ম নেই, জন্ম নেই মানে মৃত্যু নেই, প্রত্যেকেই পূর্ণ জ্ঞানময় ও আনন্দময় দিব্য স্থিতিতে নিত্য বিরাজমান। অবশ্য, এই সমস্ত কিছু অনুধাবন করা খুবই কঠিন, কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতে সবকিছুই আছে, তবে সেগুলি নিখুত। জড় জগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে যে সমস্ত জীবাত্মা অধঃপতিত হয়েছে, তাদেরকে এত কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে এটি নিশ্চিত করার জন্য যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে আরো অনেক জীবাত্মা এই স্থান লাভ করতে আসবে, তাদের জন্য তা বজায় রাখা। ঠিক যেমন খাদ্য, যদি খাবারের স্বাদ ভালো না হয়, তাহলে আমরা কেন খাব? বিষ সাধারনত খেতে ভালো নয়। যে সমস্ত কিছু পচা, বাজে, সেগুলির স্বাদ ভালো নয়। যা কিছু রস যুক্ত, আমাদের জন্য খুবই স্বাস্থ্যকর, সেগুলির স্বাদ ভালো। এইভাবে খাবারের ক্ষেত্রে যেহেতু হয়ত একজন সাধারন ব্যক্তি তা গ্রহণ করছে এর স্বাদ ভালো বলে, কিন্তু আসলে আমাদের দেহের জন্য খাবার খাওয়ার প্রয়োজন হয়। এটি আবশ্যক। এটি এমনভাবেই ঘটে থাকে যে প্রকৃতি…শ্রীকৃষ্ণ সবকিছু এত সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করেছেন যে ভালো বস্তুর স্বাদ ভালো। সাধারণ মানুষেরা তা গ্রহণ করে, কারণ এর ফলে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি হয়, কিন্তু এটি শরীরকে বজায় রাখে, নয়ত কিভাবে মানুষ নিজেদের রক্ষা করবে? যখন আমরা কষ্ট অনুভব করি, ঠিক যেমন যদি আমাদের কেটে যায়, তখন কষ্ট হয়। যদি আমরা কষ্ট অনুভব না করি, ঠিক যেমন কিছু নির্দিষ্ট মানুষ আছে যাদের রক্তপাত হতে থাকে, আপনারা তাদেরকে কি বলেন? নীল রক্ত বা এমন কিছু?

ভক্ত: হেমোফিলিয়া।

জয়পতাকা স্বামী: হেমোফিলিয়া, তাদের নিজেদের কেটে গেছে, তারা জানে না তারা হয়ত হেঁটে আসছে, আর তারা রক্তপাত হয়ে মারা যাবে। তারা ব্যথা অনুভব করে না কারণ তাদের স্নায়ুগত সেই অপূর্ণতা আছে। যখন তাদের কেটে যায়, যদি তারা লক্ষ্য না করে, যদি কেউ তাদেরকে তা না বলে দেয় বা যদি তারা আসলেই যে রক্তপাত হচ্ছে তা দেখতে না পারে, তাহলে তাদের কেবল রক্তপাতের কারণে মৃত্যু হয়, আর তারা তা বুঝতে পারেনা। তাই এটি আবশ্যক যে আমরা যাতে কষ্ট অনুভব করি, আমরা কিভাবে তা বুঝব যে আমাদের শরীরের মধ্যে কি কোন ত্রুটি আছে? ঠিক যেমন বড় জাম্ব জেট, যখন তা উড্ডয়নের জন্য উপরে ওঠে, তখন তাদের বিভিন্ন জরুরি ব্যবস্থাপনা থাকে, ছোট কোন লাইট জলে নেভে এবং তখন তারা বুঝতে পারে যে কিছু একটা হয়েছে, আমরা উপরে উঠতে চলেছি এবং তখন জেটটি উপরে উঠলে চালককে বলা হয় যে, “তোমার কার্গো দরজা খোলা আছে!” তখন জ্বালানি অপসারিত হয় এবং তারপর তারা ভূমিতে প্রদক্ষিণ করে ও নিচে নেমে আসে, কারণ কার্গো দরজা খোলা ছিল, তাই তারা আটলান্টিক যেতে পারবে না, কারণ সেই একটি ছোট সুইচ-এর জন্য জেট কাজ করল না এবং তা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পরল। একইভাবে আমাদের শরীরে আমাদের অনেক অনুভূতিজাত, বিভিন্ন মানসিক, অনেক শারীরিক সতর্কতার ব্যবস্থা আছে এবং যদি আমরা সেই বিষয়ে চেতন হই, তাহলে চরমে সর্বশ্রেষ্ঠ সতর্ক ব্যবস্থা হচ্ছে হৃদয় থাকা পরমাত্মা। তিনি আমাদেরকে বলেন। কখনো কখনো এটিকে বলা হয় বিবেক, যা আমাদেরকে বলে যে কখন আমাদের কোনকিছু করা উচিত, বা তিনি আমাদেরকে বলেন যে কখন আমাদের কোনকিছু করা উচিত নয়। কিন্তু আমরা বদ্ধজীবনে পরমাত্মার বিষয়ে সচেতন নই, এমনকি যদিও তিনি হয়ত আমাদেরকে বলেন— “এটা করো! ওটা করোনা! এটা তোমার ভালোর জন্য!” যাই হোক না কেন, আমরা এই নির্দেশের বিপরীতে গিয়ে তা করি বা আমরা নিজেদের অলসতার কারণে তা করি না। এমনকি যদিও আমাদেরকে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তবে অলসতার কারণে, আসক্তির কারণে, ঈর্ষার কারণে তা করি না। এজন্য জড়জাগতিক জীবনে কারও আধ্যাত্মিক গুরু থাকতে হবে, কারণ আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশের মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে তা সুনিশ্চিত করেন, যা আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের অভ্যন্তর থেকে শ্রবন করি। যখন কেউ প্রথম আধ্যাত্মিক গুরুর থেকে তা শোনে, তখন এমন নয় যে তিনি যা কিছু বলছেন তা সম্পূর্ণরূপে নতুন, কিন্তু তা প্রায় এমন মনে হয় যে আমরা এই ধরনের অন্তর্নিহিত সত্য আগে শুনেছি, যা দ্বারা আমরা সহজেই বুঝতে পারি এবং আমরা এমনকি অভ্যন্তর থেকে এই নিশ্চিতকরণ প্রাপ্ত হই যে, “হ্যাঁ! এই বিষয়টি অর্থপূর্ণ!” কারণ পরমাত্মা এবং গুরু অভিন্ন। পরমাত্মা দেহাভ্যন্তর থেকে চৈত্য গুরুরূপে বা গুরুরূপে বা বিবেকরূপে কার্য করেন, আর আধ্যাত্মিক গুরু বহির্ভাগ থেকে বাহ্যিকভাবে পথনির্দেশনার কার্য করেন। তাই, এই উভয়কে এক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও অবশ্য গুরুদেব কৃষ্ণের সেবকের মনোভাবে আছেন এবং এমনকি তিনি হচ্ছেন কৃষ্ণের সেবক কিন্তু শিষ্যের ক্ষেত্রে তারা দেখে যে তিনি হচ্ছেন সরাসরি শ্রীকৃষ্ণ, যিনি আমাকে গুরুর স্বরূপে সাহায্য করছেন। অভ্যন্তর এবং বহির্ভাগ থেকে তখন সেই ব্যক্তিকে মুক্তির জন্য পথ নির্দেশনা প্রদান করা হয়, যতক্ষণ না তার কৃষ্ণ সেবার চেতনা পুরোপুরিভাবে বিকশিত হচ্ছে। সেইসময় আধ্যাত্মিক গুরুর সাথে তার সম্বন্ধ থাকে, তবে এরপর তা আরো অধিক সখ্যভাব যুক্ত স্তরে উন্নীত হয়। তবে পূর্বে তা বিধিবৎ সেবা বা শ্রদ্ধাপূর্ণ স্তরে থাকে। আধ্যাত্মিক জগতে এমনকি আধ্যাত্মিক গুরুই কাউকে সরাসরি শ্রীকৃষ্ণের সেবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না কেউ সমস্ত জাগতিক ধ্যান-ধারণা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হচ্ছে। 

এখানে চতুষ্কুমার, তারা ইতিমধ্যেই ব্রহ্ম উপলব্ধি প্রাপ্ত। তারা ইতিমধ্যেই সেই উপলব্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন, পরম সত্যকে নির্বিশেষ স্বরূপে উপলব্ধি করেছেন। এটি নির্বাণ ধারণার উর্ধ্বে। তারা তাদের আত্মাকে দেখতে পারেন এবং তারা সেই আধ্যাত্মিক আলো দর্শন করতে পারেন, যার অংশ হচ্ছে আত্মা, কিন্তু তাদের তখনও পর্যন্ত কৃষ্ণের বিষয়ে সরাসরি উপলব্ধি হয়নি। তাই তাদের এই বাসনা ছিল যে সেখানে গমন করে, বৈকুন্ঠ জগৎ দর্শন করবেন। তারা সেই আলো থেকে বৈকুন্ঠ জগতে গিয়েছিলেন। এখন তারা বৈকুন্ঠে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন এবং এটা দর্শন করছেন, তারা দেখছেন যে এমনকি পুষ্পরা, তারা চেতন। তারা হচ্ছে চেতন জীবাত্মা। তারা দেখছেন যে কিভাবে পুষ্পদেরও চেতনা আছে এবং তারা দেখতে পারছেন যে পুষ্পরা নিজেদের মধ্যে তুলসী বৃক্ষকে তাদের থেকে অধিক উন্নত বিবেচনা করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন এবং কিভাবে তারা সেবায় নিযুক্ত আছেন। তারা দেখছেন যে মৌমাছির রাজা উচ্চস্বরে গুণগান করছেন, তারা ভগবানের মহিমা কীর্তন করছেন এবং পায়রা, কোকিল, সারস, চক্রবাক, রাজহাঁস, তোতাপাখি, তিতির এবং ময়ূরের স্বরধ্বনি তখন সাময়িকভাবে নীরব। এই ধরনের দিব্য পাখিরা কেবল ভগবানের মহিমা শ্রবনের জন্য নিজেদের গান করা বন্ধ করে দিয়েছে। যখন একজন গুণকীর্তন করেন, তখন অন্যান্যরা তা শ্রবণ করার জন্য থেমে যান— “ওঃ এই পাখিরা কি গুণ মহিমা বলছে?” অন্যভাবে বলতে গেলে, হয়ত পাখিরা তারা কেবল কিছু গান করছিলেন, কিন্তু পাখিরা তারা সেই ভাষা জানে, তারা আসলে ভগবানের গুণকীর্তন করছিলেন এবং এক্ষেত্রেও আবার দেখা যায় যে কোন ঈর্ষা নেই। একটি পাখি কীর্তন করছেন,  “ঠিক আছে!” অন্যান্যরা তা শ্রবন করছেন। যখন তিনি থেমে যান, তখন অন্য আরেকজন শুরু করেন। এইভাবে সকলেই ভগবানের গুণমহিমা কীর্তন করে। এই হচ্ছে বর্ণনা। যখন কুমারগণ প্রথমবারের জন্য বৈকুন্ঠ লোকে এসেছিলেন, তখন তারা এসব কিছু দর্শন করছিলেন যে বৈকুন্ঠ লোকের বাসিন্দারা তাদের নিজেদের বিমানে নিজেদের স্ত্রী এবং সঙ্গিসহ উড়ন্ত, তারা নিত্য ভগবানের গুণাবলী এবং কার্যাবলীর মহিমা কীর্তন করছেন, যা সকল প্রকার অশুভ গুণ রহিত। ভগবানের মহিমা গাইতে গাইতে, তারা সুগন্ধযুক্ত ও মধুতে পরিপূর্ণ প্রস্ফুটিত মাধবী ফুলের উপস্থিতিরও উপহাস করে। বৈমানিকাঃ, বিমান উড়ছে। এটি হচ্ছে সংস্কৃত বৈমানিকাঃ। এটি ৫০০০ বছর আগে লিখিত, এটা কোন কল্পবিজ্ঞান নয়। হয়ত তারা ভাবে যে কে ছিল ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট বা কে ছিল প্রথম ব্যক্তি যে উদ্ভাবন করেছিল উড়ন্ত বিমান… কে ছিল সেই প্রথম ব্যক্তি?

ভক্ত: উইলবার্ট এবং অরভিল রাইট।

জয়পতাকা স্বামী: অরভিল রাইট, এবং তারপর ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট, যিনি পার হয়েছিলেন।

ভক্ত: না, ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট উইসকনসিনের একজন স্থপতি।

জয়পতাকা স্বামী: ওহ, কে উড়ে এসে পার হয়েছিলেন...

ভক্ত: লিন্ডবার্গ। (লিন্ডবার্গ, লিন্ডবার্গ হ্যাঁ।)

জয়পতাকা স্বামী: ফ্রাঙ্ক লয়েড রাইট স্থপতি। (হাসি) অরভিল রাইট প্রথম বিমানের উদ্ভাবন করেছিল, কিন্তু আসলে এমনকি এর পূর্বেও বিমানের অস্তিত্ব ছিল…নিত্য, তা আধ্যাত্মিক জগতে আছে। সেখানে মানুষেরা চারিদিকে বিমানে করে উড়ে যান, এমনকি উর্ধ্বলোকেও তা দেখা যায় এটি সেখানে আছে। অবশ্য এখন আপনারা এমন বিমান পেয়েছেন যা পেট্রোলিয়ামে এবং তরল হাইড্রোজেনে চলমান। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন ধরনের বিমান আছে, তবে যাই হোক না কেন সেখানে বিমান আছে তা এই শ্লোক থেকে বোঝা যায়, শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন বৈকুন্ঠ লোক হচ্ছে পূর্ণ ঐশ্বর্যময়। এই সমস্ত বিমানে করে আধ্যাত্মিক জগতের বাসিন্দারা তাদের সঙ্গীদের সাথে ভ্রমণ করেন। সেখানে প্রস্ফুটিত পুষ্পের সুগন্ধ বাতাসে ভেসে আসে এবং সেই বাতাস এতই অপূর্ব এবং তা পুষ্পের মধুরতা বহন করে। বৈকুন্ঠবাসীদের ভগবানের গুণকীর্তনের প্রতি আগ্রহ এতই যে তারা ভগবানের গুণ মহিমা কীর্তন করার সময় এমন সুগন্ধযুক্ত বাতাসের উত্তেজনাও পছন্দ করেন না। অন্যভাবে বলতে গেলে, তারা হচ্ছেন শুদ্ধ ভক্ত, তারা নিজেদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির থেকে ভগবানের গুণকীর্তন করাকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। বৈকুন্ঠালোকে ইন্দ্রিয়তৃপ্তির কোন প্রশ্নই ওঠে না। প্রস্ফুটিত পুষ্পের সুগন্ধ ঘ্রান করা নিশ্চিতরূপে খুবই সুন্দর অনুভূতি, কিন্তু এটা কেবল ইন্দ্রিয়তৃপ্তি। তাই বৈকন্ঠবাসীরা প্রথম অগ্রাধিকার ভগবানের সেবার প্রতি প্রদান করেন,  তাদের নিজেদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির প্রতি নয়। দিব্য প্রেম সহ ভগবানের সেবা করার ফলে এমন দিব্য আনন্দ লাভ করা যায় যে তার সঙ্গে তুলনা করলে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি হচ্ছে এক তুচ্ছ বিষয়। 

এমন বহু বর্ণনা আছে, যে সমস্ত মহান জীবাত্মার যারা জড়জগৎ পরিত্যাগ করেছেন। চতুষ্কুমার জড়জগতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তারা এই জড়জগৎ পরিত্যাগ করেছিলেন, তারা ঊর্ধ্বলোক দর্শন করেছিলেন, তারা নির্বিশেষ ব্রহ্ম দর্শন করেছিলেন, তারা আধ্যাত্মিক জগতে গিয়েছিলেন এবং এই সমস্ত বর্ণনা এখানে নথিভুক্ত আছে। চতুষ্কুমারের পুরো শিষ্য পরম্পরা আছে, তারা ফিরে এসেছিলেন এবং তারা গুরু বর্গকে দীক্ষা প্রদান করেছিলেন, এবং তারা এসব কিছু বর্ণনা করেছিলেন। এই সমস্ত বর্ণনাসমূহ হচ্ছে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক গুরুবর্গের, যারা এইসব উপলব্ধি অর্জন করেছেন এবং এই জ্ঞান তাদের কাছে  নিম্মে অবতরিত হয়েছে এবং অবশ্য হয়ত কেউ বলতে পারে, “আমি কি করে জানবো যে এটা এইরকম?” হয়ত সন্দেহ করতে চাইবে, অবশ্য এমন কোন পন্থা নেই যার দ্বারা কেউ বলতে সক্ষম হবে যে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উর্ধ্বে কি আছে। আপনি এমন কি বলতে পারবেন না যে আসলে কি আছে প্লুটো বা ইউরেনিয়াম-এ বা অন্যান্য কোন… ইউরেনাস বা যেসব গ্রহলোক এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আছে, তাতে। কেউ এমনকি এটি বলতে পারবে না যে এর মধ্যে কি আছে। জড়জাগতিক বৈজ্ঞানিকেরা এখনও এটি খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে যে বৃহস্পতি গ্রহে কি আছে, বৃহস্পতির এই সব বলয় আছে? 

ভক্ত: শনি।

জয়পতাকা স্বামী: শনির বলায় আছে। তারা জানে না যে সেই বলয় কি দিয়ে তৈরি। এখন তারা এমনকি শনি গ্রহ থেকে শুনতে পাচ্ছে, তারা গান শুনতে পাচ্ছে, (ভক্তবৃন্দ হাসছেন) এবং তারা প্রকৃতপক্ষে জানেনা যে কি ঘটছে। তারা বলছে যে এটি নিশ্চয়ই সংগীত। আপনি বলতে পারেন যে এর একটি খুবই সুর পরিবর্তনশীল, নির্দিষ্ট পুনরাবৃত্তিমূলক কম্পাঙ্ক রয়েছে এবং এটি সঙ্গীত বলে মনে হচ্ছে, অথবা এটি হচ্ছে এক প্রকার স্পন্দনের মতো। অবশ্য, তারা জানে না এটা আসলে কি, কারণ তারা সবাই দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা অনুসন্ধানী উপগ্রহ বা এমন কোন কিছুর সাহায্যে এটি বোঝার চেষ্টা করছে, যার দ্বারা ব্যবহারিকভাবে প্রকৃতই কোন স্পষ্ট ধারণা লাভ করা অসম্ভব। যোগীরা তারা তাদের আধ্যাত্মিক স্বরূপে, তাদের আধ্যাত্মিক দেহে তারা দেখতে পান…কেবলমাত্র এই ব্রহ্মাণ্ড নয়, তবে এর ঊর্ধ জগৎও। অবশ্য এছাড়া এটি জানার আর কোন পথ নেই যে এর উর্ধ্বে কি আছে, অন্তত তারা এতটাই দয়াশীল যে তারা ফিরে এসে মৌলিক ধাপগুলি পর-পর ব্যাখ্যা করেন, যাতে কেউ আধ্যাত্মিক দেহের উপলব্ধি লাভ করতে পারেন। যদিও তারা চরম উপলব্ধি হিসেবে যা ব্যাখ্যা করেন, আপনি সেক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ হ্যাঁ বা না বলতে পারবেন না, কিন্তু তারা আমাদেরকে প্রাথমিক স্তর থেকে, প্রারম্ভ স্তর থেকে নিয়ে যাচ্ছে, এর ফলে আমরা জানতে পারি যে তারা যা ব্যাখ্যা করছেন যে, আপনি এখান থেকে যান, এরপর এটা করুন এবং তারপর আপনি পরবর্তী ধাপে উত্থিত হন। কেউ সেটি করেন, তা করতে পারেন। যেমন আপনি হরে কৃষ্ণ নাম করেন, সেক্ষেত্রে সর্বপ্রথম আপনি ভক্তদের সঙ্গ করেন, আপনি হরে কৃষ্ণ নাম করেন, তারপর আপনি পরবর্তী স্তরে আসেন যেখানে আপনি অনেক বিভিন্ন জড়জাগতিক বিক্ষুব্ধতা এবং কামনা-বাসনা থেকে শুদ্ধ হন এবং ধীরে ধীরে আপনি অধিক স্থির হন, আপনি আরও অধিক স্থিরতার এক নির্দিষ্ট স্তরে উন্নীত হন। পরবর্তী স্তরে এক ধরনের আনন্দ, এক রুচি বিকশিত হয়। নিশ্চিতরূপে যখন তা আসে, তখন কেউ আসক্ত হয়, তখন সেই আসক্তি ভগবানের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার কিছু অনুভূতির আরেক ধরনের দিব্য আনন্দ নিয়ে আসে। এবং প্রত্যেক স্তরে, এটি বলা হয়— তা কাউকে বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, পারিপার্শ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে অনুভব করাতে পারে, এছাড়া সূক্ষ্ম লক্ষণসমূহ আছে যে কিভাবে মন ধীরে ধীরে পরিবর্তন হওয়া শুরু করে, কিভাবে একজন ব্যক্তি ভক্তিমূলক সেবায় উন্নতি সাধন করলে কোন সময় নষ্ট করেন না, কিভাবে তিনি সর্বদা ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত থাকেন, কিভাবে তিনি কৃষ্ণের সাথে তাঁর সম্বন্ধের বিষয়ে অধিক থেকে অধিকতর দৃঢ় হয়ে ওঠেন। এই সমস্ত কিছু অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে। চরমে কেউ যদি এই পন্থা অনুসরণ করেন, তাহলে পথ ইতিমধ্যেই তৈরি করা আছে, পথ চিহ্নিত করা আছে। এই সমস্ত নির্দেশনগুলি ইতিমধ্যেই আছে। যে কখনো যায়নি…ঠিক যেমন কলম্বাস, তিনি প্রত্যেককে বলেছিলেন, “আমি আমেরিকা গিয়েছি এবং এটাই আমি দেখেছি।” “আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি না, আমরা তা দেখিনি।” তখন তারপর তিনি ফিরে গিয়েছিলেন এবং একটি গাছ এনেছিলেন বা এমনকিছু করেছিলেন যে— “দেখো এটা এখানকার নয়!” একইভাবে তারা ফিরে গিয়ে অন্যকোন কিছুর থেকে অনেক মহৎ কিছু ফিরিয়ে এনেছেন, তারা আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে কি ফিরিয়ে এনেছেন? সেটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক আনন্দ। যখনই কেউ সেই আনন্দ অনুভূতির একবিন্দু আস্বাদন করেন, তখন  তৎক্ষণাৎ কেউ বুঝতে পারেন যে তা এই জগতের নয়, এটি এই জগতের ঊর্ধ্বে, এটি এমন কিছু যা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং যখনই আপনি তার স্বাদ আস্বাদন করবেন, এমনকি আধ্যাত্মিক আনন্দের এক বিন্দু আস্বাদন করবেন, তখন বুঝতে পারবেন যে আসলে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন যা কিছু প্রদান করছে, তা এই জগতের নয়। আসলে এই সমস্ত মহান আধ্যাত্মিক গুরুবর্গ জড়জগৎ অতিক্রম করেছেন এবং তাঁরা সেই বস্তু নিয়ে ফিরেছেন, যা জড়জগতে অপ্রাপ্য। এই হচ্ছে সাধারণ ধারণা। এমনকি যদি একজন ব্যক্তি এই জীবনে কৃষ্ণভাবনামৃতে সামান্য অগ্রগতি লাভ করেন, সেক্ষেত্রে আমরা আধ্যাত্মিক জগতে একেবারে পৌঁছাতে সক্ষম হই বা না হই… এমন কি যদি আপনি সামান্যতম অগ্রগতি লাভ করেন, তা আমাদেরকে ভবিষ্যৎ অগ্রগতির নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং কত বিভিন্ন মহাবিপদ থেকে রক্ষা করে। ঠিক যেমন, আজকে সকালে আমরা প্রার্থনা করছিলাম যে শ্রীকৃষ্ণের অভিষেকের জল(চরণামৃত) গ্রহণ করলে, তা কাউকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করে। তা চরমে অকাল মৃত্যু হরণং … সেই শ্লোকটি কি?

ভক্ত: অকাল মৃত্যু হরণং সর্ববিধিবিনাশনং।

জয়পতাকা স্বামী: এটি কাউকে সব ধরনের ব্যাধি আদি বিষয়সমূহ থেকে রক্ষা করে। তাই এমনকি এই জীবনকালে যদি কেউ জড়জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পূর্ণ আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্তরে যেতে না পারে, তাহলে তবুও এর অসীম পার্শ্বিক লাভ আছে। অবশ্য সেই সমস্ত পার্শ্বিক লাভ বিষয়ী ব্যক্তিদের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে তারা চরম প্রাপ্তির বিষয়টি বিস্মৃত হয়। 

সম্পূর্ণ বৈদিক সংস্কৃতিতে শাস্ত্র সবসময় এটিই বলে যে চরম প্রাপ্তি কি, কিন্তু যেহেতু মানুষেরা সাধারণত এটি বুঝতে পারেনা, তাই তাদেরকে পার্শ্বিক লাভ প্রদান করা হয়। যদি আপনি শ্রীমদ্ভাগবতম পড়েন, তাহলে এর পরবর্তী জন্মে আপনি হাজার হাজার গাভী লাভ করতে পারবেন, আপনি একজন মহান রাজা হতে পারবেন বা আপনি স্বর্গলোকে যেতে পারবেন বা আপনি এইরকম কিছু লাভ করতে পারবেন। সেই কারণে মানুষেরা অধিক থেকে অধিকতর জড়জাগতিক হয়ে পড়ে এবং এখন তারা এমনকি এটা চিন্তাও করে না যে চরম লক্ষ্য কি। তারা মনে করছে যে আপনি শ্রীমদ্ভাগবতম পড়বেন যাতে ভালো স্ত্রী, ভালো স্বামী লাভ করতে পারেন, দীর্ঘজীবন লাভ করতে পারেন, কারণ তারা কেবল এটাই দেখছে। তবে এই সমস্ত বিষয়ে মুখ্য বিষয় নয়, এগুলি হচ্ছে পারিপার্শ্বিক লাভ এমনকি এই বিষয়গুলি সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতমেও উল্লেখ করা নেই। এগুলি সাধারণত নিন্মস্তরীয় শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে। যদিও কখনো কখনো শ্রীমদ্ভাগবতমে কিছু প্রসঙ্গ উল্লেখিত আছে, কিন্তু সেগুলি সেইভাবে বর্ণিত নেই, কারণ শ্রীমদ্ভাগবতম সরাসরি কাউকে চরম লক্ষ্যে উপনীত করার প্রয়াসে রত। কিন্তু এর অগণনীয় পারিপার্শ্বিক লাভ আছে, যা স্বাভাবিকভাবেই লাভ হয়ে যায়। এমনকি যদি কেউ এই জীবনে এটি সুসম্পন্ন না করতে পারেন, তাহলে কোন ক্ষতি নেই। এমনকি এর অনেক পারিপার্শ্বিক লাভ এবং আরো অনেক কিছু লাভ আছে যে, কেউ যদি তা অনুশীলন করে নিজেকে উন্নত করে, তাহলে পরবর্তী জীবনে আপনি যেখানে ছেড়েছিলেন সেখান থেকে শুরু করতে পারবেন এবং পুনরায় অধিক উন্নতি করতে পারবেন। যা কিছু জড় কামনা-বাসনা আছে, সেই সব সমাপ্ত হওয়ার জন্য আপনি সেইসব বিষয়ক অধিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন, কারণ এইরূপে দুইভাবেই কেউ তাড়াতাড়ি কৃষ্ণকে লাভ করার ক্ষেত্রে সাহায্য লাভ করে, আবার এর ফলে কারও সমস্ত বাসনা তুষ্ট হয়। অবশ্য বাসনা একের পর এক আসতেই থাকে, যখন কেউ আরো অধিক থেকে অধিকতর আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত হয়, তখন ঘন ঘন নতুন ইচ্ছা জাগ্রত হয় না। ব্যক্তি আংশিকভাবে কৃষ্ণকে লাভ করার ইচ্ছা করছে ও আংশিকভাবে তার কত কত সঞ্চিত কামনাও আছে, যা সে পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়, কিন্তু তবুও সেই সমস্ত সঞ্চিত ইচ্ছাসমূহ কেউ অর্জন করে এটি উপলব্ধি করে যে, “এটাই হচ্ছে সেই একটি বিষয় যা আমি চাইছিলাম! তা ঠিক এটা নয় যা আমি চাইছিলাম! ঠিক এটা নয় যেটি আমি চাইছিলাম!” তারপর অবশেষে অধিক থেকে অধিকতরভাবে কেউ কৃষ্ণকে লাভ করার প্রতি আরো অধিক শক্তি লাভ করে, “হয়ত কৃষ্ণ হচ্ছেন প্রকৃত বিষয় যা আমি চাই।” এরপর, “ঠিক আছে, না আমি এটা পাওয়ার চেষ্টা করি!” তারপর আবার তারা সেটার প্রয়াস করে, তারা তা পায়, কিন্তু “ওঃ এটা ঠিক তা নয়, হয়ত কৃষ্ণকেই আমি চাই!” তারপর এইভাবে কৃষ্ণের প্রতি আরো অধিক সেবা করে এবং এইভাবে ক্রোমান্নয়ে …এটি খুবই ধীর পদ্ধতি, কারণ কেউ তখনও আসক্তিবশত জড়জগৎ উপভোগ করার চেষ্টা করে, কিন্তু কেবল কৃষ্ণের সঙ্গলাভের মাধ্যমেই এমনকি কেউ বিভিন্নভাবে সুরক্ষা প্রাপ্ত হয় এবং চরমে কেউ সেই পদ লাভ করতে পারে যে কৃষ্ণ তার প্রতি নিজেকে জোর করে চাপিয়ে দেবেন না। ভক্তরা, আমরা হয়ত সামান্য অধিক আপত্তিকর হতে পারি, কিন্তু কৃষ্ণ এমন নন, তিনি নিজেকে কারো উপর চাপিয়ে দেন না, তিনি কাউকে তখনই তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেন, যখন আসলেই তারা আসতে চায়, যখন তাদের আর কোন কামনা থাকে না। তিনি প্রথমে তাদেরকে অন্যান্য সবকিছু দেন এবং এরপর যখন আপনি আর কিছু চাইবেন না, কারণ একবার যদি আপনার কাছে কৃষ্ণ থাকেন, তাহলে আর কোনকিছুই চাওয়ার নেই। যখন আপনি কৃষ্ণকে উপলব্ধি করবেন, তখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন যে সবকিছুই কৃষ্ণের মধ্যে আছে, তখন দ্বৈত মনোভাব পোষণের বা কোনপ্রকার দ্বৈততার কোন সম্ভাবনা নেই, যা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধীয় বিষয় ছাড়া সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। তাই, হয় সবকিছু কৃষ্ণ সেবা সম্বন্ধীয় এবং না হয় এমন কিছু যা কৃষ্ণ সেবা সম্বন্ধীয় নয়, তাহলে তখন আপনাকে জাগতিক চেতনাময় হতে হবে। যাই হোক, এটি হচ্ছে সূক্ষ্ম বিষয়, কিন্তু কোন না কোনভাবে কৃষ্ণ প্রথমে তিনি অন্য যেকোনো ইচ্ছার অনুমতি দেন, এরপর কেউ বিশেষ কৃপা প্রাপ্ত হন, আর তখন কারও এই ইচ্ছা হয় যে— “শ্রীকৃষ্ণ, আপনি দয়া করে আমার যাই ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, কোন না কোনভাবে আপনি আমাকে আপনার প্রতি আকর্ষণ করুন।” যতক্ষণ না কেউ কোনো না কোনোভাবে এই ধরনের.... শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনেক ভক্তরা এরকম প্রার্থনা করেছেন যে—“এমন কি যদিও আমি পতিত, দয়া করে আপনি আমাকে আপনার কাছে টেনে নিন, আপনি আমাকে আপনার কৃপা প্রদান করুন। এই সমস্ত কিছু থেকে বের হতে আমার দীর্ঘ সময় লাগবে, তাই আপনি আমাকে আপনার পরমশুদ্ধ দিব্য আনন্দ দ্বারা প্লাবিত করুন। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমি নিন্ম আকর্ষণের থেকে নিরাপদ থাকব।” এটাই হচ্ছে বিশেষ দ্রুত কৃপা, যা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং নিত্যানন্দ প্রভু প্রদান করেন, তাঁরা তৎক্ষণাৎ আধ্যাত্মিক জগতের অমৃত প্রদান করেন, যা এতই আকর্ষণীয় যে, যদি কেউ তার এক বিন্দু আস্বাদন করেন, তখন তৎক্ষণাৎ তার জীবনের পুরো দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে যায় এবং তখন কোন ব্যক্তি এতকিছু জড়জাগতিক আসক্তি, এত কিছু জড়জাগতিক সমস্যা থেকে নিরাপদ থাকে এবং যতই কেউ এই দিব্য আনন্দ আস্বাদন করে, ততই কেউ পরমার্থিক আনন্দে সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে পড়ে এবং পূর্ণ কৃষ্ণভাবনামৃত অর্জন করে। হরে কৃষ্ণ!

কোন প্রশ্ন আছে? হ্যাঁ! হ্যাঁ! 

ভক্ত: মায়াবাদী এবং ব্রহ্মবাদীদের মধ্যে পার্থক্য কি? সেই কুমারেরা ছিলেন ব্রহ্ম উপলব্ধ, তাই তাদের সাথে মায়াবাদীদের কি পার্থক্য আছে?

জয়পতাকা স্বামী: চতুষ্কুমার ইতিমধ্যেই ব্রহ্ম উপলব্ধ ছিলেন। মায়াবাদীরা হয়ত ব্রহ্মা উপলব্ধ নয়, কিন্তু তারা ব্রহ্ম কি, মায়া কি সেই বিষয়ে জল্পনা-কল্পনা করে। তারা ব্রহ্মবাদী হতে চায় কিন্তু তারা সেটি করছে অনেক ভ্রান্ত ধারণাসহ। তবে চতুষ্কুমার, তাদের কোন আরোহ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ধারণা ছিল না। এমনকি যেমন বুদ্ধ, তিনি কখনও বলেননি যে ভগবান নেই, তিনি বলেছেন—“কেন তোমরা এইসব বিষয় উত্থাপন করো? আমি যা জানি সেটাই জানি এবং সেটাই যথেষ্ট। তোমাদেরর অধিক কিছু প্রশ্ন করার দরকার নেই।” এই বলে তিনি সম্পূর্ণ বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। চতুষ্কুমার তারা অপরাধজনক ছিলেন না। মায়াবাদীরা ব্রহ্ম উপলব্ধি করতে চায়, কিন্তু তারা আসলে কৃষ্ণের বিরুদ্ধে। চতুষ্কুমারগণ কৃষ্ণের বিরুদ্ধে ছিলেন না। এটা এমন কোন বিষয় ছিল না যা নিয়ে তারা চিন্তান্বিত ছিলেন, তারা কৃষ্ণকে অনুধাবন করেননি। কিন্তু তা এমন কোনকিছু ছিল না যা, তাদের ক্ষেত্রে জরুরিকার্য। তারা এই বিষয়ে আচ্ছন্ন ছিলেন না, তারা ব্রহ্ম বিষয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক যেমন জড়জগতে এমন অনেক ব্যক্তিরা আছে, যারা জড়জাগতিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু তারা কৃষ্ণের বিরুদ্ধে নয়, তবে তারা কেবল জাগতিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত।

ভক্ত: আমরা কি তুলসী সরাসরি গুরুদেবকে নিবেদন করতে পারি, নাকি কেবল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহেই তা নিবেদন করা যাবে?

জয়পতাকা স্বামী: অবশ্যই, আপনি নৈবেদ্য গুরুদেবকে নিবেদন করেন এই ধারণা নিয়ে যে তিনি সেই সবকিছু শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদন করবেন, বা কেউ যদি গুরুকে নিবেদন করেন, তাহলে সেটি হচ্ছে আসলে এই ধারণার ভিত্তিতে যে প্রকৃতপক্ষে তিনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের বাহ্যিক প্রকাশ, কিন্তু যখন আমরা অর্চন করি, তখন আমরা গুরুদেবের শ্রীহস্তে বা শ্রীমস্তকে এবং কেবলমাত্র শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে তুলসী নিবেদন করি।

ভক্ত: সেবার বিষয় কি বলবেন?

জয়পতাকা স্বামী: ভক্তিমূলক সেবা—শ্রবনং, কীর্তনং, স্মরণং, যেই ব্যক্তি পবিত্র নামের  কাছে অতি প্রিয়, সেই ব্যক্তির প্রতি কোন অপরাধ হলে, তা হচ্ছে পবিত্র নামের প্রতি অপরাধ। যেমন যখন আপনি সেবার বিষয় উল্লেখ করলেন, তখন তৎক্ষণাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তুলসী সহ জল বা এমন কিছু নিবেদনের উল্লেখ করা যায়, কেবল শ্রীকৃষ্ণের সম্বন্ধে শ্রবণ করা, সেটা কি যথেষ্ট সেবা? কেবল তা কি কাউকে উন্নত করার জন্য যথেষ্ট? এটি পরীক্ষিত মহারাজের জন্য যথেষ্ট ছিল। তা যথেষ্ট! যদি আপনি শ্রবণ করেন আর অন্য কোন কাজে লিপ্ত না হন, তাহলে কেবল শ্রবণই যথেষ্ট। ঠিক যেমন, তিনি যা করেছিলেন তা হচ্ছে শ্রবণ, অবিরত ৭ দিন ধরে শ্রবণ করেছিলেন এবং এরপর নিজ দেহত্যাগ করেছিলেন।

ভক্ত: এটি শুনে মনে হচ্ছে এক সহজ সেবা, যে কেউ এতে নিযুক্ত হতে পারেন।

জয়পতাকা স্বামী: সহজ? তিনি কোন খাবার গ্রহণ করেননি বা কোনকিছু পান করেন নি। তিনি কেবল সেবা করেছিলেন বা শ্রবণ করেছিলেন। (একজন মহিলা অতিথির প্রতি) আপনি কেমন অনুভব করছেন?

মহিলা অতিথি: ঠিক আছি, আমার কাশি হল।

জয়পতাকা স্বামী: কোন প্রশ্ন আছে, আজকে?

মহিলা অতিথি: ওহ, হ্যাঁ! আমার আছে। গতকাল আপনি নাম জপের প্রতি অপরাধের বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন, আপনি কি তা ব্যাখ্যা করতে পারবেন?

জয়পতাকা স্বামী: পবিত্র নামের প্রতি ১০টি অপরাধ আছে। আপনি কি প্রত্যেকটি অপরাধ সম্বন্ধে জানতে চান?

মহিলা অতিথি: তাই আছে?

জয়পতাকা স্বামী: আমি সংক্ষেপে বলতে পারি, তবে সাধারণত পবিত্র নামের প্রতি দশবিধ অপরাধ হচ্ছে: প্রথমটি হচ্ছে—কোন ভক্তের প্রতি অপরাধ করা, যার অর্থ হচ্ছে ভক্ত বা শুদ্ধ ভক্ত, যিনি তাঁর জীবন পবিত্র নামের মহিমা প্রচারের ক্ষেত্রে উৎসর্গ করেছেন, তাঁর নিন্দা করা বা তাঁর শারীরিক কষ্টের কারণ হওয়া। সেই ব্যক্তি পবিত্র নামের কাছে খুবই প্রিয়, তাই সেটি হচ্ছে পবিত্র নামের প্রতি একটি অপরাধ। এরপরে দ্বিতীয় অপরাধ হচ্ছে—যে কোন দেবতা যেমন শিব বা ব্রহ্মা, দুর্গা, ইন্দ্র বা অন্য কারও নাম শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের নামের সমান মনে করা। যখন দেবতাদের নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন সেখানে হয়ত দেবতাদের নাম উচ্চারণের ক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট মন্ত্র থাকতে পারে এবং এর দ্বারা আপনি কোন জড়জাগতিক লাভ পেতে পারেন, এমনকি কোনো কোনো দেবতাদের থেকে যৌগিক শক্তিও অর্জন করা যেতে পারে, কিন্তু তবুও এমনকি শিব স্বয়ং বলেছেন, “শ্রীবিষ্ণু ছাড়া অন্য কেউ মুক্তি প্রদান করতে পারবেন না।” তাই কেউ যদি এইরূপ বিবেচনা করে যে অন্যান্যদের নাম শ্রীবিষ্ণুর নামের সমান, তাহলে সেটি হচ্ছে দ্বিতীয় অপরাধ। তৃতীয় অপরাধ হচ্ছে—আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ অবজ্ঞা করা। যদি আধ্যাত্মিক গুরু কাউকে কোন নির্দেশ দিয়ে থাকেন এবং তিনি যদি তা পালন না করেন, তাহলে সেটি একটি অপরাধ। চতুর্থ অপরাধ হচ্ছে—কোন শাস্ত্র বা সাহিত্য, যা পবিত্র নামের মহিমা বর্ণনা করে বা পবিত্র নামের মহিমা ব্যাখ্যা করে, সেটির নিন্দা করা। কোন ব্যক্তির এইসব শাস্ত্র অশ্রদ্ধা করা উচিত নয়। পঞ্চম হচ্ছে—কোন ধরনের মানসিক কল্পনাপ্রসূত অর্থ নাম জপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা। নাম জপের বর্ণনা দেওয়া আছে যে নাম জপ কি? কিন্তু যেমন অ্যালেন গিনসবার্গ, তিনি বলছিল—“এই নাম জপের মাধ্যমে মনে হয় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এটি আসলে এক ধরনের প্রাণায়াম।” এটি সম্পূর্ণ জল্পনা-কল্পনা ভিত্তিক। এটি হচ্ছে পঞ্চম অপরাধ যে অনুমোদিত ব্যাখ্যা যা আছে, তা গ্রহণ করার পরিবর্তে নিজের ধারণা প্রয়োগ করা। ষষ্ঠ অপরাধটি হচ্ছে—পবিত্র নামকে মনে করা...  পঞ্চম এবং ষষ্ঠ, কখনও কখনও আমি পিছনেরটা বলে ফেলি, ক্ষমা করবেন। আমি জানি না আমি এইবারেও সেটা করেছি নাকি, পঞ্চম ও ষষ্ঠ এই উভয়ই খুবই কাছাকাছি। ষষ্ঠ হচ্ছে পবিত্র নামকে কল্পনাপ্রসূত বলে মনে করা, অন্যভাবে বলতে গেলে, পবিত্র নামের এমন অনেক মহিমা আছে যা দ্বারা কেউ মনে করে, “ওহ এটা কিভাবে সম্ভব?” বা এমন কিছু, এটি একপ্রকার অপরাধ। এরপর সপ্তম অপরাধ হচ্ছে—নাম বলে অপরাধ করা। দেখুন অপরাধ এবং পাপ দুটি ভিন্ন বিষয়। পাপ মানে হচ্ছে বাজে কর্ম, অন্যভাবে বলতে গেলে, এই জড়জগতে আমরা যা কিছু করি, তার একটি প্রতিক্রিয়া আছে। তাই সেই সমস্ত প্রতিক্রিয়া লাভ করার দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করি। এটি হচ্ছে স্বাধীনতা, যা আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে এবং আমরা সেইভাবে এই জড়জগতে কার্য করতে পারি। আমরা পুণ্য কর্ম করতে পারি, এর ফলে আমরা পুণ্য কর্মের ফল প্রাপ্ত হই, অথবা আমরা পাপ কর্ম করতে পারি, যা হচ্ছে অন্যদের ক্ষতি বা নিজের শরীরকে কষ্ট দেয় এমন কিছু করা এবং তখন তার ফলে সেই যে কষ্ট বা দুর্ভোগ আসতে পারে সেটি। এখন যখন কেউ বুঝতে পারে যে নাম জপের ফলে আমি এইসব থেকে মুক্ত হতে পারব, আমি কর্মফল প্রতিরোধ করতে পারব, এটি হচ্ছে নাম জপের একটি গোপনীয়তা, তখন যদি সেই ব্যক্তি চিন্তা করে যে ঠিক আছে আমি এখন এটা করি, তারপর আমি হরেকৃষ্ণ নাম করব এবং তাহলে আমাকে এর জন্য কষ্ট ভোগ করতে হবে না, তাহলে সেটি হচ্ছে এক অপরাধ কারণ কৃষ্ণ নাম এবং কৃষ্ণ হচ্ছেন অভিন্ন, তিনি হচ্ছেন সবথেকে বুদ্ধিমান, তাই নিশ্চিতরূপে তিনি সেইভাবে এত বিচার-বুদ্ধিহীন হবেন না  যাতে একজন ব্যক্তি এইরকম কার্য করতে পারে। হয়ত কেউ করতে পারে, কর্মক্ষেত্রে কিছু কার্যকলাপ করতে পারে, এবং তবুও হরেকৃষ্ণ নামও করতে পারে, তাহলে তা একই বিষয় নয়, সেটি অপরাধ নয়। এই চেতনা, নাম জপের বলে অন্যায্য কাজ করা, এটিকে অপরাধজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদি কেউ যা কর্ম করছে, সেটির দায়িত্ব তবুও গ্রহণ করে, এবং এটি না বলে যে, “নাম জপের দ্বারা কোন না কোনভাবে আমি এইসব কর্ম থেকে বের হয়ে আসতে পারব।” তাহলে তা অপরাধ নয়, তখন তা অকৃত্রিম আচরণ। অষ্টম অপরাধ হচ্ছে—হরে কৃষ্ণ নাম জপকে কোন পুণ্য কর্মের সমান বলে মনে করা। ঠিক যেমন বৌদ্ধরা, তারা সবসময় পুণ্য কর্ম অর্জনের চেষ্টায় রত। তারা সাধুদের ভোজন করায়, তারা ভালো ফল বা পুণ্য বা যেমন সংস্কৃততে বলা হয়, ভালো কর্মফল লাভের জন্য কত পুণ্য কর্ম করে। তাই, কেউ যদি এটা মনে করে যে হরে কৃষ্ণ নাম জপ করা হচ্ছে ভালো কর্মের আরেকটি প্রকার, তাহলে সেটি হচ্ছে অপরাধ, কারণ হরে কৃষ্ণ নাম জপ পুণ্য বা পাপ কর্মের অনেক ঊর্ধ্বে। এটি আদপে এক সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক শব্দতরঙ্গ, যা কেবল ভালো কর্মফল প্রদান করে না, এটি এর থেকেও আরও অধিক কিছু প্রদান করতে পারে। এটি হচ্ছে ঠিক যেন অবমূল্যায়ন করা। যদি কোন একজন মহান ব্যক্তিত্ব থাকে, যেমন যদি আপনি রাজাকে দেখেন—আপনি হচ্ছেন আমার দেখা সবথেকে ভালো রাজমন্ত্রী বা এমনকিছু বলেন, তাহলে এটা সবথেকে বড় অন্যায়, আমি বলতে চাইছি ন্যূনোক্তি। এটা সবথেকে বড় অপরাধ নয়। আমি যা কিছু উল্লেখ করলাম, এর মধ্যে — সেই সমস্ত ভক্ত যারা প্রচারের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি অপরাধ করা এবং নাম বলে পাপ আচরণ করা হচ্ছে সব থেকে জঘন্য অপরাধ। এই দুটি খুব খুব গুরুতর, প্রথমটি হচ্ছে সবথেকে গুরুতর। অবশ্য সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত হচ্ছেন শ্রীগুরুদেব। যদি কেউ গুরুর প্রতি অপরাধ করে, তাহলে অবশ্য সেটাও ভালো নয়। গুরুর প্রতি অপরাধ করা এবং গুরুর কথা অমান্য করা, এই দুটি ভিন্ন অপরাধ। এরপর নবম অপরাধ হচ্ছে—অবিশ্বাসী ব্যক্তিদের কাছে প্রচার করা, পবিত্র নামের মহিমা বর্ণনা করা। এখানে দুটি অপরাধ উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কেউ পবিত্র নামের বর্ণনার প্রতি সন্দেহ করে অথবা যদি কেউ নাম বলে পাপ করে, এই সমস্ত বিষয়গুলি। এরপর যার শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রকৃতই তত শ্রদ্ধা নেই, তার কাছে যদি পবিত্র নামের বিষয়ে অনেক কিছু বর্ণনা করা হয়, তাহলে কখনো কখনো তারা অপরিপক্কভাবে বলে, যেহেতু তারা সত্যিই সেই তত্ত্বগত বা আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্তরে আসেনি, তাই তারা হয়ত এই একটি অপরাধ করবে যে, “এটা কিভাবে সম্ভব?” সেই অর্থে সেই ব্যক্তি যে পবিত্র নামের গুচ্ছতম বিষয়সমূহ শোনার জন্য প্রকৃতই প্রস্তুত নয়, তাকে সেই সবকিছু বলা হলে সেক্ষেত্রে প্রচারক সামান্য দায়ী। সেই ঝুঁকি প্রচারকেরা সবসময় গ্রহণ করে, প্রচারকদের ক্ষেত্রে যে কি করতে হবে, কি করতে হবে, সেই বিষয়ে কিছু ভিন্ন নির্দেশাবলী দেওয়া হয়েছে। দশম অপরাধ হচ্ছে—নাম জপ করার সময় অমনোযোগী হওয়া, এর অর্থ হচ্ছে যে কেউ যত বেশি পবিত্র নাম সম্বন্ধে জানতে পারে, পবিত্র নাম-এর বিভিন্ন অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করতে পারে, তখনও যদি কেউ পবিত্র নাম জপের ক্ষেত্রে খুব মনোযোগী না হয়, নাম জপের ক্ষেত্রে খুব বেশি আন্তরিক না হয়, তাহলে যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ যে এতকিছু বিশেষ কৃপা করছেন, পবিত্র নাম প্রদান করেছেন, সেক্ষেত্রে অলস হওয়ায় বা আলস্যের কারণে সেটির প্রতি অবজ্ঞাভাব, সেটি এক ধরনের অপরাধজনক মানসিকতা। বাস্তবে প্রত্যেকেই কমবেশি এই অপরাধ করে, যদি না কেউ সম্পূর্ণরূপে শুদ্ধ হন। প্রাথমিক স্তরে এই হচ্ছে অপরাধসমূহ। কর্ম এবং অপরাধের মধ্যে পার্থক্য আছে, কারণ অপরাধ হচ্ছে সরাসরি কৃষ্ণ সম্বন্ধীয়। ঠিক যেমন, যাইহোক, আপনি কি অপরাধ এবং কর্মের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পেরেছেন?

মহিলা অতিথি: হ্যাঁ…  আমি …

জয়পতাকা স্বামী: এটা এমনই, ধরো আপনাদের মধ্যে কেউ একজন বাইরে গিয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালানোর একটা টিকিট পেল। তার ফলে কিছু সমস্যা তৈরি হতে পারে, কিন্তু সাধারণভাবে বললে, সেটা দুইজনের সম্পর্ককে ধ্বংস করবে না। ব্যাপারটা এমন, “আপনি  কেন এটা করলেন?”—ওই টিকিট পাওয়ার জন্য আপনাকেই কষ্ট ভোগ করতে হবে। কিন্তু যদি কেউ এমন কিছু করেন যা সরাসরি... সরাসরি কাউকে কষ্ট দেয়, (জোরে শব্দ) তখন সেটা আলাদা বিষয়। তাই, কর্ম সরাসরি কৃষ্ণের সম্বন্ধীয় নয়, এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে থাকে। কিন্তু অপরাধ, সেবা এবং অপরাধ এই বিষয়গুলি সরাসরি সম্পর্কিত। এই কারণে, যাই হোক না কেন যদি কোন ব্যক্তির অনেক খারাপ কর্ম থাকে, কিন্তু যদি তিনি কৃষ্ণের সেবা করেন, সেই সেবা সমস্ত কর্ম ভেদ করে সেই ব্যক্তিকে উন্নত স্তরে নিয়ে আসতে সক্ষম। একমাত্র বিষয় যা কৃষ্ণ সেবা সম্পাদন বন্ধ করতে পারে, তা হচ্ছে অপরাধ, যা সরাসরি শ্রীকৃষ্ণের কাছে বেদনাদায়ক। তাই, কখনো কখনো মানুষেরা বলে, “এটি বিপদজনক, তাই নাম জপ না করা ভালো।” কারণ আমি অনেক অপরাধ করব, কিন্তু এটি বলা হয়েছে যে তিনটি স্তর আছে—অপরাধজনক স্তর, যেখানে আমরা অপরাধ কম করতে শুরু করি এবং তারপর কেউ সম্পূর্ণরূপে অপরাধ মুক্ত হতে পারে এবং সেটা হয় কারণ শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত কৃপাময়। ঠিক যেমন একজন ছোট শিশু অভিভাবকের প্রতি কত কিছু অপরাধ করে, হয়ত সে তাদের প্রতি চিৎকার করে বা তাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করে বা বসে পড়ে, অনেক কিছুর জন্য কান্না করে বা হয়ত কোন কিছু মেঝেতে ছুড়ে ফেলে, কিন্তু তবুও অপরাধজনক হলেও তা ভালো, কারণ অন্তত সেখানে সেই শিশুর একটি সম্বন্ধ আছে এবং এইভাবে ধীরে ধীরে সেই স্তর থেকে কেউ অগ্রগতি লাভ করে, তাই নাম জপ না করার থেকে অপরাধজনক হলেও এমনকি তখনও নাম জপ করা ভালো। যদিও এর থেকে ভালো হচ্ছে অপরাধ কম করা এবং তারপর অপরাধ মুক্ত নাম জপের স্তরে আশা, যা আমাদের নিজেদের প্রচেষ্টার দ্বারা পুরোপুরি অসম্ভব। তাই আমরা যা করতে পারি তা হচ্ছে, আমরা অপরাধ কম করতে পারি এবং সেখান থেকে অপরাধ মুক্ত নাম জপের স্তর অর্জন করতে পারি। তখন এর অর্থ এই যে আমরা কৃষ্ণের সম্পূর্ণ উপলব্ধি প্রাপ্ত হয়েছি এবং সেই স্তর থেকে তখন কেউ অধঃপতিত হয় না, এটাই হচ্ছে আসলে অপরাধমুক্ত নাম জপের পরিপূর্ণতা। হ্যাঁ!

ভক্ত: কি হবে যদি কেউ অপরাধ মুক্তভাবে নাম করে, কিন্তু তারপর তিনি যদি অপরাধ করে ফেলে? ঠিক যেমন যদি কেউ শ্রীবিগ্রহের দিকে পিছন করে বসে, সেটিও একটি অপরাধের মধ্যে পড়ে, আমি নিজেই এটা করছিলাম। অবশ্য আমি অপরাধযুক্ত ভাবেই নাম জপ করি কিন্তু ধরুন … শ্রীবিগ্রহের প্রতি অপরাধ নাম অপরাধের তুলনায় কতটা গুরুতর?

জয়পতাকা স্বামী: কতটা জটিল? (ভক্তরা হাসছেন)

ভক্ত: অন্য কোন পন্থার থেকে?

জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ!

ভক্ত: আমি বুঝতে পারছি।

জয়পতাকা স্বামী: আমরা যাই পারি, তা আমাদের চেষ্টা করা উচিত। আমরা যতটা যা কিছু কৃষ্ণের সেবা করতে পারি। অপরাধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা উচিত। এই কারণেই বলা হয় যে খুব বেশি গ্রন্থ না পড়া ভালো, যদি আপনি না জানেন সেই সম্পর্কে যে এটি একটি অপরাধ, তাহলে এমনকি যদিও এটা একটি অপরাধ এবং তা আপনি করছেন, কিন্তু আপনি সেইভাবে দায়ী নন। (ভক্তরা হাসছেন)

মহিলা ভক্ত: অজ্ঞানতা হচ্ছে আনন্দপূর্ণ।

জয়পতাকা স্বামী: পুরোপুরি নয়, কিন্তু ঠিক যেমন আপনি বলছেন শ্রীবিগ্রহের দিকে পিছন করে বসা, কিন্তু আপনি শ্রীবিগ্রহের দিকে পিছন করে নেই, কারণ এখানকার নিয়মটা হচ্ছে যে শ্রীল প্রভুপাদ থেকে শ্রীবিগ্রহ পর্যন্ত আমরা একটি সারি করে থাকি। তাই এইভাবে আমরা সবাই বসে আছি এবং মূলত আমরা শ্রীবিগ্রহের দিক করে বসে আছি। এখানে এই নিয়মটি আছে, কিন্তু কেউ যদি একটু এই বিষয়টি পড়ে যে, “ওহ শ্রীবিগ্রহের দিকে পিছন করে বসা, আমি তো তাদের দিকে মুখ করে ছিলাম না!” এইভাবে এক্ষেত্রে আমরা কেবল আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ গ্রহণ করি, এরপর যদি আমরা সেই কার্য করি, তাহলে তিনি এর জন্য দায়ী। যদি সেখানে কোন অপরাধ থেকে থাকে, তাহলে তিনি দায়ী। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা দায়িত্ব হিসেবে কোন কাজ করছি। ঠিক যেমন সেনার ক্ষেত্রে, যদি সৈনিককে বলা হয় যে— “তুমি এটি করো!” এবং তিনি যদি সেটি করেন, তাহলে তিনি তার জন্য দায়ী নয়, যা কিছু ঠিক বা ভুল, এটা যিনি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি এর জন্য দায়ী।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 04.07.2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions