Text Size

১৯৮২১০৩১ শ্রীমদ্ভাগবতম ২.১.১৪

31 Oct 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|Bangkok, Thailand

নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী ৩১ অক্টোবর, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, ব্যাংকক, থাইল্যান্ডে প্রদান করেছেন। এই প্রবচনটি শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ২য় স্কন্ধ, ১ম অধ্যায়, ১৪তম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

অনুবাদ: হে কুরুবংশ-প্রদীপ মহারাজ পরীক্ষিৎ! আপনার আয়ুষ্কালের আর মাত্র সাতদিন অবশিষ্ট আছে। অতএব এই সময়ের মধ্যেই আপনার পারলৌকিক উদ্দেশ্য সাধন করুন। 

তাৎপর্য: যিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন, সেই মহারাজ খট্বাঙ্গের দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করে শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতকে এই বলে উৎসাহিত করেছিলেন যে তাঁর জীবনের আর সাতদিন মাত্র অবশিষ্ট আছে এবং তিনি অনায়াসে সেই সময়ের সদ্ব্যবহার করে পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন। পরোক্ষভাবে শ্রীল শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতকে বলেছিলেন যে তিনি যেন তাঁর জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলিতে, ভগবানের শব্দরূপী প্রকাশ বা শব্দব্রহ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং ভববন্ধন থেকে মুক্ত হন। অর্থাৎ শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতকে যে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করে শুনিয়েছিলেন, কেবলমাত্র তা শ্রবণ করার মাধ্যমেই সকলে তাঁদের পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন। এই আচার কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, অধিকন্তু সেগুলি অনুকূলভাবে সম্পাদন করতে হয়। এ বিষয়ে এখানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইতি কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক ‘ভগবদ্-উপলব্ধির প্রথম স্তর’ নামক শ্রীমদ্ভাগবতের ২য় স্কন্ধ, ১ম অধ্যায়, ১৪তম শ্লোক সমাপ্ত। 

তবাপ্যেতর্হি কৌরব্য সপ্তাহং জীবিতাবধিঃ।
উপকল্পয় তৎসর্বং তাবদ্যৎ সাম্পরায়িকম্॥

জয়পতাকা স্বামী: মহারাজ খট্বাঙ্গ এক মুহূর্তে পরিপূর্ণতা লাভ করতে পেরেছিলেন। এইভাবে, শ্রীল শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিতকে উৎসাহিত করছিলেন যে তাঁর কাছে ৭ দিন সময় আছে। সেজন্য তিনিও অতি সহজেই পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারবেন। যদি কোন ব্যক্তি এমন কি এক মুহূর্তে তা লাভ করতে পারেন, তাহলে ৭ দিনে তা লাভ করা যাবে না কেন?

অবশ্য, একটি কথা আছে—“মন্যন মন্যন”—(আগামীকাল আগামীকাল) পাশ্চাত্যে প্রত্যেকেই কোন কিছুকে আগামীকালের জন্য স্থগিত রাখতে পছন্দ করে—“আমি কালকে করব! আমি আগামীকাল করব!” এইভাবে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের কাছে কতগুলি বছর থাকে, কিন্তু আমরা চিন্তা করি, “ঠিক আছে, বাল্যকালের পর আমি করব। তরুণ অবস্থার পর আমি করব। বিবাহিত হওয়ার পর আমি করব।” এইভাবে অবশেষে আমরা বার্ধক্য জীবনে প্রবেশ করি এবং তখন যদি আমরা করতেও চাই, তবুও আমাদের কাছে আর শক্তি থাকে না। আমরা দেখেছি যে কখনও কখনও বৃদ্ধ ব্যক্তিরা আমাদের শ্রীধাম মায়াপুর মন্দিরে যুক্ত হতে আসেন এবং সেই সময় তারা ইতিমধ্যেই ৬০-৭০ বছর বয়সী, তাদের শরীর কাঁপে, তারা সেরকম চোখে দেখতে পান না। তাদের খুব প্রভাবশালীভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলনের সেই শক্তি থাকে না। এটি তাদের কাছে খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু তাদের সন্তান-সন্ততি, তাদের নাতি-নাতনি, তারা আসে এবং আবার তাদেরকে পারিবারিক কার্যকলাপে নিযুক্ত করে। 

একজন আজীবন সদস্য যার কাছে তখন প্রায় লক্ষাধিক অর্থ ছিল, তবুও তিনি চিন্তা করছিলেন—“আমি মায়াপুরে গিয়ে অবসর গ্রহণ করতে চাই, কিন্তু প্রতি মাসেই আমাকে আসতে হবে ও কিছুদিনের জন্য নিজের পরিবারকে দেখতে হবে এবং আমাকে কিছু সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে হবে।” সেইসময়, তিনি সেইসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য কোন অর্থ দিতে চাইছিলেন না। তিনি দরাদরি করার চেষ্টা করছিলেন, আমরা বলেছি, “ঠিক আছে, আপনি প্রতিমাসে ৩০ ডলার অনুদান দিন। একদিনের জন্য ১ ডলার এবং তাহলে আমরা আপনাকে ভোজন করাব।” তিনি বললেন, “না! না! এটা অনেক।” ও আরও বিভিন্ন কিছু বললেন। তিনি ইতিমধ্যেই বৃদ্ধ, তিনি তার ব্যবসা তার সন্তানদেরকে দিয়ে দিয়েছেন, তবুও তিনি কত আসক্ত! কখনো কখনো মানুষেরা এমনকি তারা মনে করে যে, তাদের কখনোই মৃত্যু হবে না। তারা মনে করে যে, এই জীবন সবসময় থাকবে এবং তারা সেই মতো ব্যবস্থাপনা করে। এমনকি তারা বৃদ্ধ হয়েছে, মৃত্যুর সমস্ত ধরনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তবুও তারা চিন্তা করছে না যে শীঘ্রই তাদের যাওয়া উচিত। তারা কেবল অর্থ মজুত করে রাখছে, কিন্তু পরবর্তী জীবনের জন্য কোন প্রস্তুতি করছে না। 

কখনও কখনও মানুষেরা হয়ত বলে, “কেন কৃষ্ণ আমাদেরকে বৃদ্ধাবস্থা দিয়েছেন?” বৃদ্ধাবস্থা কৃষ্ণের এক বিশেষ কৃপা। যদি আমরা কোন দেওয়ালের উপর লেখা দেখি যে— শীঘ্রই আমরা এই শরীরের সমাপ্তি পর্যায়ে আসতে চলেছি, তখন আমরা পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করব। এটি হচ্ছে ঠিক যেমন, যখন আপনি পথের একেবারে শেষে চলে আসবেন, তখন তারা একটি ইঙ্গিত দেখায় “শেষ প্রান্ত”, এটা হচ্ছে সরকারের এক অনুগ্রহ। দরজার উপর এই চিহ্ন থাকে “সামনে বাঁক”, অথবা রাস্তার মধ্যে এই চিহ্ন থাকে “সামনে বাঁক”, “পিছল রাস্তা” এবং আরো অন্যান্য কিছু ইঙ্গিত থাকে। আমাদের জীবনের রাস্তায় এটি হচ্ছে প্রকৃতির ইঙ্গিত যে—যখন আমরা নিজেদের দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করি; যখন আমাদের দাঁত পড়ে যায়; যখন আমরা আমাদের হাড়ে ব্যথা অনুভব করি; যখন আমাদের চামড়া কুঁচকে যায়; যখন আমাদের চুল সাদা হতে থাকে; তখন আমরা এটি বুঝতে পারি যে শারীরিকভাবে আমাদের এই শরীরটি শেষপর্যায়ে আসতে চলেছে। তাই, অন্তত জীবনের সেই শেষ মুহূর্তে আমাদের কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, যেহেতু জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে বা মধ্য জীবনে এমন সংস্কৃতি ছিল না, তাই জীবনের শেষসময়েও তা সম্ভব হয় না। হঠাৎ করে জীবনের গতিবিধি পরিবর্তন করা, হঠাৎ করে জীবন সম্পর্কিত নিজস্ব সম্পূর্ণ ধারণা পরিবর্তন করা এবং কেবল মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া তত সহজ হয় না। এটি পরীক্ষিত মহারাজের মত মহাত্মাগণের দ্বারা সম্ভব, কারণ তাঁরা আবির্ভাব কাল থেকেই এই চেতনায় প্রস্তুত ছিলেন। সেজন্যই, এমনকি গর্ভের মধ্যে থাকাকালীন সময়ে, এমনকি জন্মগ্রহণ করার পূর্বাবস্থা থেকেই অভিভাবকের দেখা উচিত যে তাদের সন্তান যেন শিশুকাল থেকেই আধ্যাত্মিক চেতনা বিকশিত করার প্রত্যেক সুযোগ লাভ করতে পারে এবং তাহলে যখন তারা যৌবন অবস্থা, কৈশোর অবস্থা বা পারিবারিক জীবনের কঠিন সময়ের মধ্যে পড়বে, তখন যাতে তাদের শৈশবকালীন আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সেই শক্তি থাকে, যা তাদেরকে রক্ষা করবে। তাই এই সব বিষয়গুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

আজকাল, বর্তমান সমাজে, প্রত্যেকেই এমনকি তথাকথিত বৌদ্ধ এবং হিন্দু রাষ্ট্রে যেখানে মানুষেরা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি কারণে জানে যে আমরা এই শরীর নই, আমরা হচ্ছি আত্মা, আমরা বহু জন্মগ্রহণ করি, কিন্তু তবুও প্রত্যেকেই ভারতীয় চেতনায়, ব্রহ্মদেশীয় চেতনায়, থাইল্যান্ডবাসীর চেতনায়, সিংহলি বা শ্রীলংকাবাসীর চেতনায় প্রশিক্ষিত। তারা এইভাবে প্রশিক্ষিত হচ্ছে, এমনকি যদিও তারা জানে যে এই জীবনে তারা হয়ত থাইল্যান্ডবাসী বা হয়ত একজন ভারতীয় বা হয়ত একজন চীনা, কিন্তু তাদের পূর্ব জীবন কি ছিল? পরবর্তী জীবন কি হবে? 

তাই, যদিও মানুষেরা এক নির্দিষ্ট বিশ্বাস নিয়ে চলছে, কিন্তু বাস্তবিক জীবনে তারা সম্পূর্ণরূপে নিজেদেরকে কেবল নিজেদের শরীর দ্বারা সনাক্ত করছে। শরীর দ্বারা সনাক্ত করা হলে, তা এই জগতে কোন শান্তি আনবে না। সেইজন্য আপনাদের কিছু দেশ আছে, যারা খুবই শক্তিশালী, যারা অর্থনৈতিকভাবে খুবই শক্তিশালী, তারা মনে করছে—“গরিব দেশগুলির জন্য কেবলমাত্র সামান্য অনুদান দেওয়া ছাড়া আর অন্য কোন কিছু কেন করা উচিত? যতক্ষণ পর্যন্ত না তা আমাদের স্বার্থে আঘাত হানছে বা যতক্ষণ পর্যন্ত তা আমাদের স্বার্থে হিত করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অন্যদেরকে সাহায্য করতে পারি।” এইভাবে কোনোভাবেই এই জগতে আপনি সবার মধ্যে প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের ভাব, বিশ্বশান্তির ভাব আনতে পারবেন না। বরঞ্চ দেশীয় চেতনা বিভিন্ন দেশের মধ্যে শত্রুতার মনোভাব সৃষ্টি করে। 

একটি দেশের অন্য দেশের প্রতি সবসময় প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকবে এবং এই প্রতিযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, তবে তা রাজনৈতিক, সামরিক, কত বিভিন্ন দিকে পরিবর্তিত হয়। এই জগৎ বিভিন্ন ধরনের উষ্ণ ও ঠান্ডা যুদ্ধ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ দ্বারা পরিপূর্ণ, এইভাবে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ হয়ে চলেছে। তবুও মানুষেরা বিশ্ব শান্তির, বিশ্বভ্রাতৃত্বের কথা বলে, কিন্তু তা কেবল তখনই সম্ভব যদি আসলে প্রকৃত আধ্যাত্মিক সত্যতা বা জীবনের আধ্যাত্মিক দিকটি উপলব্ধি করা যায়, দেহাত্মবুদ্ধির দ্বারা কার্য করার পরিবর্তে, যদি নিত্য জীবাত্মা হিসেবে, পরমেশ্বর ভগবানের অংশ-এই চেতনা নিয়ে কার্য করা যায়। মানুষেরা এক ধরনের আংশিক চেতনা থেকে আরেক ধরনের আংশিক চেতনায় পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে, কিন্তু মানুষদেরকে প্রকৃত চেতনায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা কোথায় হচ্ছে? 

ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন এক মহান রাজা, কিন্তু তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বেদুর যখন দেখলেন যে তিনি এক মহান রাজা কিন্তু তার বার্ধক্যে... তিনি ইতিমধ্যেই জন্মান্ধ, উপরন্ত তার কাশি হচ্ছে, জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে, তার দাঁত পড়ে যাচ্ছে, সে খুব কষ্টে কোনোকিছু শুনতে পারছে—এই সমস্ত কিছু হচ্ছে আসন্ন মৃত্যুর ইঙ্গিত। তখন তিনি এসে তাকে ভৎসনা করেছিলেন যে—“তুমি ঠিক একটি কুকুরের মত। তুমি সেইসব ব্যক্তিদের কাছে ভিক্ষা করছ, যারা তোমার সন্তানদের হত্যা করেছে। তোমার দাঁত পড়ে যাচ্ছে, চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে, যে কোন মুহূর্তে তোমার মৃত্যু হবে এবং তবুও এই জীবনের শেষেও তুমি তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতার পুত্রদের অর্থে কুকুরের মত ভিক্ষা করে বেঁচে আছ। কেন তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও না ও আত্ম-উপলব্ধির প্রয়াস করো না?” এইভাবে কঠোর শব্দবাণ প্রয়োগ করে আধ্যাত্মিক গুরুরূপী বিদুর, এমনকি যদিও তিনি তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, তবুও তিনি সেইমুহূর্তে তার আধ্যাত্মিক গুরুরূপে কার্য করেছিলেন। তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে তার মিথ্যা পদ পরিত্যাগ করতে এবং বনে গিয়ে ধ্যান মগ্ন হতে প্ররোচিত করেছিলেন। যার ফলে তিনি এই জীবনের জন্য তার জড়জাগতিক কার্যকলাপ সমাপ্ত করে, যোগের কিছু পরিপূর্ণতা অর্জন করেছিলেন। এইভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির উন্নতির এক ভিন্ন স্তর আছে। কখনো কখনো হয়ত ব্যক্তিকে অতিরিক্ত সাহায্য করার দরকার হয়, যেমন বলা যেতে পারে খুবই ভালোভাবে কিছু আধ্যাত্মিক উপদেশ প্রদান করতে হয়। আবার কখনো কখনো কোনো ব্যক্তিকে হয়ত কঠোর বাক্য দ্বারা আক্রমণ করার দরকার হয়, ঠিক যেমন বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে কঠোর বাক্য দ্বারা বল প্রয়োগ করেছিলেন। দেখুন যদি প্রচারক ও ব্যক্তির মধ্যে এক ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়, তাহলে সেটি তাকে এই বল প্রয়োগের সুযোগ প্রদান করে, যাতে প্রয়োজনে যখন পরিস্থিতি শেষ পর্যায়ে চলে যাবে, তখন যাতে সেই ব্যক্তিকে জাগতিক পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা যায়। 

এখানে মহারাজ পরীক্ষিত, তার কাছে আর শেষ সাত দিন আছে। তিনি তার বীমা চুক্তি নিয়ে ভাবছেন না, তিনি তার গাড়ির অর্থ প্রদান সম্পর্কে ভাবছেন না বা রঙিন টেলিভিশন নিয়ে ভাবছেন না, তিনি এই সমস্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবছেন না, যা অন্য কোন মানুষ ভাবতে পারত যে, “ওহ আমার কাছে ৭ দিন আছে, আমি কিভাবে সমস্ত অর্থ প্রদান করতে পারব?” তিনি উপলব্ধি করেছেন, আমার কাছে ৭ দিন আছে—“ঠিক আছে! এখন আমাকে পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।” যদি আপনাকে একটি স্থান থেকে উত্ক্ষাত করা হয়, তাহলে আপনাকে চিন্তা করতে হবে, “পরবর্তী স্থান কোথায়? আমি কোথায় যাব?” যদি আপনি একটি বাসস্থানে বাস করেন, ও  হঠাৎ করে সেখানে উত্ক্ষাত পত্র পান, তাহলে আপনি চিন্তা করবেন—“আমি এখন কোথায় যাব?  আমি রাস্তায় থাকতে চাই না।” মানুষেরা তারা চিন্তা করে যে এই শরীর হচ্ছে তাদের অর্জিত বস্তু বা এমন কিছু। এই শরীর আমাদের অর্জিত নয়, যদি এটি আমাদের অর্জিত হত, তাহলে আমরা চিরকাল এভাবেই থাকতে পারতাম। 

প্রত্যেকেই জানে যে তারা এখানে কেবল নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য আছে, কিন্তু পাশ্চাত্য জগতে তারা মূর্খতাবশত এমনভাবে কার্যকলাপ করে যেন তারা এখানে চিরকালের জন্য থাকবে। পাশ্চাত্যে মানুষদের এতে বিশ্বাসী করানো খুবই কঠিন যে মৃত্যুর পরেও জীবন আছে। তারা এমনকি সেটিও বিশ্বাস করে না। যদিও তারা হয়ত বলতে পারে… কিছু মানুষেরা হয়ত খ্রিস্টান বা অন্যান্য ধর্মীয়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এমনকি এটাও বিশ্বাস করে না যে মৃত্যুর পরেও জীবন আছে। তারা মনে করে, “যখন আমার মৃত্যু হবে, তখন জীবন শেষ।” তারা চিন্তা করে যে যখন জীবনের পর মৃত্যু হবে, তখন তারা ভাবে যে, “ঠিক আছে! একটি জীবন এবং তারপর সেই ব্যক্তি সমগ্র জড়জগৎ ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে এবং এরপর গাব্রেইল পরী শিঙ্গা বাজিয়ে তার বিচারের সময় ঘোষণা করেন, এবং যেহেতু ব্যক্তি যীশুখ্রীষ্টে বিশ্বাসী, তাই তার উদ্ধার নিশ্চিত। সেই জন্য পরবর্তী জীবন সম্বন্ধে চিন্তা করার কিছু নেই, কেবল আহার-পানীয় গ্রহণ করে, উল্লাসিতভাবে জীবনযাপন করলেই হবে এবং যীশু খ্রীষ্টের বলিদানকে মান্য করে চলতে হবে, তাহলেই সবকিছুর ঠিক ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এইভাবে তারা এইরকম ধারণা করে নেয়, যাতে আপনাকে আপনার পরবর্তী জীবন সম্বন্ধে চিন্তা করতে না হয়। এটি হচ্ছে তাদের মূর্খতা এবং বড় বড় বিষয়ী ব্যক্তিরা, তারা বর্তমানে এত প্রদর্শনী তৈরি করছে মানুষদেরকে শুধু এটি বিশ্বাস করানোর জন্য যে এই জীবনই হচ্ছে সবকিছু— “দেখুন এমন কি যদিও এই জীবনের শেষে আপনি মৃত্যুবরণ করবেন, কিন্তু তবুও আপনার ভালো কার্যের জন্য আপনার সন্তান এবং নাতি-নাতনিরা এক উন্নত বিশ্বে থাকবে।” দেখুন এটা পুরোপুরি অসন্তোষমূলক! আপনি মারা যাবেন, কিন্তু আপনার সন্তানেরা উন্নত বিশ্বে থাকবে—এই সবকিছুই দেহাত্মবুদ্ধির উপর নির্ভরশীল। 

এই কারণে শ্রীমদ্ভাগবত কত গুরুত্বপূর্ণ যে কিভাবে একজন ভক্ত আচরণ করেন, যখন তিনি জানেন যে তার কাছে সাত দিন সময় আছে। তৎক্ষণাৎ তিনি চিন্তা করছেন—“আমার পরবর্তী জীবন কি? আমি কিভাবে আমার পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করব? কিভাবে নিজেকে পরবর্তী গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত করব?” এটি আধুনিক বিশ্বের সম্পূর্ণ বিপরীত।

একটি ব্যাপার হচ্ছে, এখানে থাইল্যান্ডে আমাদের এক বড় সুযোগ আছে কারণ এখানে মানুষেরা ইতিমধ্যেই পুনর্জন্মে বিশ্বাসী, তারা কর্মে বিশ্বাসী, তারা এই সমস্ত বিষয় জানে। এক্ষুনি আপনি তাদেরকে এটি বলুন যে, “কেন আপনারা থাইল্যান্ড নিবাসী হওয়ায় অত্যন্ত গর্বিত? আপনি কেন মনে করেন যে আপনি একজন থাইল্যান্ডবাসী? আপনি কি আপনার পূর্ব জীবনেও থাইল্যান্ডে ছিলেন? আর আপনার পরবর্তী জীবন কি হবে?” যদি তারা এমনকি বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী থাকে, তবুও তারা এটি উপলব্ধি করতে পারবে যে এই সব কিছু যে বলা হচ্ছে, তা বৌদ্ধ দর্শনের বিরুদ্ধে। মানুষদের দেহাত্ম চেতনার ঊর্ধ্বে তোলর চেষ্টা করুন এবং তারপর হরে কৃষ্ণ নাম জপের মাধ্যমে, ভক্তদের সঙ্গ করার মাধ্যমে, কৃষ্ণ প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে, শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্পর্কের পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে তা খুবই সহজ হবে। এইভাবে ধাপে ধাপে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মানুষদের পক্ষে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন করা খুবই সহজ হবে। অবশ্য, এটি সাধারণত সহজ নয়, কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় এমনকি অলৌকিক কিছুও সম্ভব। অলৌকিক কার্যাবলী সম্ভব কেবল এই নাম-কীর্তন এর দ্বারা: 

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
 হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
  

জগাই, মাধাই, তারা পুরোপুরি হিংসুক ব্যক্তি ছিল। কিন্তু তবুও তাদের উদ্ধার হয়েছিল। 

পাপী-তাপী যত ছিল হরিনামে উদ্ধারিল
 তার সাক্ষী জগাই ও মাধাই 

যখন জগাই মাধাই উদ্ধার লাভ করেছেন, তাহলে এত লোকেরা কেন উদ্ধার পাবে না, যারা কৃষ্ণের প্রতি ঈর্ষান্বিত নয়? বেশিরভাগ মানুষেরা তারা হচ্ছে নির্দোষ, তারা কেবল বিপথগামী, তারা সন্তুষ্ট নয়, তারা খোঁজ করছে, তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে। যখন তারা ভক্তদের নাম-কীর্তন করতে দেখে এবং আনন্দে বিভোর হতে দেখে, তখন তৎক্ষণা তারাও এর দ্বারা আকৃষ্ট হয় যে, “সেখানে মানুষেরা কত খুশি!” সেই শব্দতরঙ্গের দ্বারা তাদের জীবাত্মা জাগরিত হয়। সেইজন্য আমাদের বিশ্বাস হারানো উচিত নয়। এর পরিবর্তে আমাদের হরে কৃষ্ণ নাম জপের শক্তির উপর পূর্ণ বিশ্বাস থাকা উচিত। কেবল শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণের মাধ্যমে, নাম জপের মাধ্যমে, প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমেই মানুষদের প্রকৃত চেতনা জাগ্রত হবে। আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থার প্রতি বিশ্বাস থাকা উচিত এবং মানুষদের নাম-কীর্তনে, প্রসাদ গ্রহণে, শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়নে নিযুক্ত করা উচিত। আমরা কোন স্থান-কালে আছি, এর সাথে এই পন্থার কোন সম্পর্ক নেই। সময় এবং স্থানভেদে আমাদের সেই মানসিকতার সাথে খাপ খাইয়ে এক নির্দিষ্টভাবে তা উপস্থাপন করতে হবে, কিন্তু এই পন্থা যেকোন জড়জাগতিক পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে। যে ব্যক্তি এই নাম-কীর্তনের সংস্পর্শে আসবে, কৃষ্ণভাবনামৃতের মাধ্যমে, ভক্তিমূলক সেবার মাধ্যমে তারা শুদ্ধ হবে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা ব্যতীত অন্য কোন কিছুই অধিক শক্তিশালী নয়। তাই, এটিই হচ্ছে এক মহৎ সুযোগ। 

মহারাজ পরীক্ষিত ছিলেন এক অত্যন্ত উন্নত জীবাত্মা। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজেকে পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। একইভাবে আপনার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া কোন কোন ব্যক্তি খুবই উন্নত, আবার কোন কোন ব্যক্তি খুবই জড়জাগতিক, কিন্তু আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে প্রার্থনা করি যে তিনি যেন আমাদেরকে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন। নিত্যানন্দ প্রভু, শ্রীঅদ্বৈত প্রভু যাতে আমাদেরকে সেই অনুকম্পার দ্বারা অনুপ্রেরণা দেন। কিভাবে অদ্বৈত প্রভু, তিনি ক্রন্দন করেছিলেন তিনি বদ্ধ জীবদের জন্য ক্রন্দন করেছিলেন যে—“তারা বহির্মুখ হয়ে পড়েছে, তারা জড়জাগতিক হয়ে পড়েছে, তারা কৃষ্ণকে বিস্মৃত হয়েছে। এমনকি নবদ্বীপ, বাংলায়, ভারতবর্ষেও। তারা কেবল সাময়িক শারীরিক আনন্দের জন্য বেঁচে আছে। তারা রাত্রে ৮টা পর্যন্ত জেগে থাকে, আর এমনকি সূর্যোদয় পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে। তারা কত জড়জাগতিক কার্য করে। তারা ভক্তি দ্বারা কৃষ্ণ পূজা করে না, এর পরিবর্তে জড়জাগতিক উদ্দেশ্যে তারা ভগবানের পূজা করে এবং কেবল স্বর্গলোকে উন্নীত হওয়ার জন্য ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে।” তারা এতই জড়জাগতিক যে অদ্বৈত প্রভু শ্রীকৃষ্ণের অবতরণের জন্য ক্রন্দন করছিলেন, যাতে তিনি তাদেরকে শুদ্ধ প্রেম দ্বারা অনুপ্রাণিত করেন। অবশ্য আজকাল যে জড়জাগতিকতা আছে, তার তুলনায় তখন কেমন জড়জাগতিকতা ছিল! আপনারা বুঝতেই পারছেন যে কিভাবে অদ্বৈত গোঁসাই সেই সমস্ত জীবদের জন্য ক্রন্দন  করেছিলেন, যাদের অবস্থা ছিল পুরোপুরি শোচনীয়। 

আলোচনার্থে বলা যেতে পারে, এখানে থাইল্যান্ডে মানুষদের একাধিক স্ত্রী থাকা খুবই সাধারণ ব্যাপার। একজন ব্যক্তি এখানে এসেছিলেন, তার দুই স্ত্রী আছে, যদিও দুই স্ত্রী একে অপরের সাথে মিলেমিশে থাকে, কিন্তু তার দুটি বাড়ি আছে, বড় অর্থনৈতিক সমস্যা আছে, খুবই মানসিক চাপ আছে। তিনি চান… তিনি তার জড়জাগতিক সুখ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে, কিন্তু এর পরিবর্তে তার মানসিক চাপ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই, তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন যে, “আমার কি করা উচিত?” “হরেকৃষ্ণ জপ করো!” গত রাত্রে সেই ব্যক্তি একজন সাধারণ মানুষের মতো অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তিনি একজন বড় ব্যবসায়ী, যিনি দুর্ভাগ্যক্রমে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছেন। আর এখন তিনি ট্যাক্সি চালক হয়েছেন, তিনি তিন দিন পর গতরাত্রে এখানে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন এবং তিনি ভক্তদের সাথে নাম জপ করছিলেন। কেবল যেহেতু আমরা তার কি সমস্যা হচ্ছে তা শোনার প্রতি এবং সেই ব্যক্তিকে বোঝানোর জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করার প্রতি আগ্রহী ছিলাম, সেই জন্য তিনি নাম কীর্তন করেছিলেন। অবশ্য, তিনি নিশ্চিত কিছু অনুভব করেছেন, নয়ত আবার কেন তিনি দুদিন পর আসবেন?

এমন নয় যে তিনি কোন সাধারণ ট্যাক্সি চালক ছিলেন, তিনি আগে একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু মানসিক জল্পনার পিছনে নিজের অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন (হাসি) এবং এইভাবে তিনি সবকিছু হারিয়ে ফেলেন, যা এইক্ষেত্রে সাধারণ ব্যাপার! যাইহোক, এই জন্য আমাদেরকে জুয়া খেলতে বারন করা হয়েছে। এই জড়জগতে মানুষেরা কষ্ট ভোগ করছে এবং তারা মনে করছে যে তারা চিরকাল বেঁচে থাকবে! কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দ্বারা প্রদত্ত এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হচ্ছে এইজন্য যে মানুষেরা যাতে তাদের দুঃখের অবসান করতে পারে এবং কৃষ্ণের সাথে প্রকৃত সম্বন্ধ স্থাপনে আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে যেতে পারে। এটি তাদের কাছে বিশাল এক সুযোগ! এটি অবিশ্বাস্যনীয় যে কিভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর কৃপা প্রদান করছেন। আমরা তা কল্পনাও করতে পারি না! যদি আপনি এই বিষয়ে পড়েন যে সত্য যুগ কি ছিল, দ্বাপর যুগ কি ছিল, ত্রেতা যুগ কি ছিল, এই তিনটি ভিন্ন যুগ কি ছিল, সেখানে কাউকে কতটা কষ্ট করতে হত, এমনকি সেইসময় তাদেরকে হাজার বছর ধরে, শত শত বছর ধরে মুক্তি লাভের জন্য আত্ম-উপলব্ধির অনুশীলন করতে হত, কিন্তু কিভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু কৃষ্ণ প্রেমের কৃপা প্রদান করছেন, যা এমনকি স্বয়ং কৃষ্ণ তত সহজে প্রদান করেননি, কিন্তু তিনি কিভাবে তা অকাতরে বিতরণ করছেন। এমন কৃপার কথা আমরা এমনকি কল্পনাও করতে পারি না! প্রত্যেকেই ইতিমধ্যে মুক্ত, তারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় ইতিমধ্যেই মুক্ত, কেবল দেখতে হবে যে কতজন ব্যক্তিদেরকে আমরা হরে কৃষ্ণ নাম জপ করাতে পারব, তাহলে তারা এমনকি মুক্তির ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে এবং আসলেই কৃষ্ণ প্রেম লাভ করতে পারবে। ঠিক যেমন এমনকি তারা রামজান বলছে, এর মধ্যে হয়ত কত অপরাধ আছে, তারা এটি বলার মাধ্যমে কৃষ্ণপ্রেম বিকশিত করতে পারবে না, কিন্তু তারা নামাভাসে ‘রাম’ কথাটি বলছে এবং এর দ্বারা তারা কত আধ্যাত্মিক কৃপা লাভ করতে পারছে, এমনকি এই এক নামই তাদের মুক্তির জন্য যথেষ্ট। চৈতন্য চরিতামৃতে উল্লেখিত শ্রীল হরিদাস ঠাকুরের মতানুসারে, এমনকি নামাভাস কাউকে মুক্তি প্রদান করতে পারে, কিন্তু আমরা সেটি লাভ করার প্রতি আগ্রহী নই! আসলে আমরা চাই যে মানুষের কৃষ্ণ প্রেম বিকশিত হওয়া উচিত। সেটি সম্ভব কেবল তখনই, যদি আমরা নিজেদেরকে নাম-কীর্তনে নিযুক্ত করি—

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
 

এবং

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ॥

আমাদের তত্ত্ব হচ্ছে কেবল মানুষদের দিয়ে নাম জপ করানো। যদি তারা ২৪ ঘন্টা হরিনাম করতে না পারে, তাহলে বাকি সময়টা সেবায় নিযুক্ত থাকতে পারে। 

যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রাম পণ্ডিতকে পাঠিয়েছিলেন অদ্বৈত গোঁসাইকে নিয়ে আসার জন্য, অদ্বৈত গোঁসাইকে এটি বলার জন্য যে—“আপনি যে ভগবানের জন্য ক্রন্দন করেছিলেন, যেই ভগবানের জন্য উচ্চস্বরে নাম করেছিলেন, হুংকার করেছিলেন, উপবাস ছিলেন, গঙ্গা জল ও তুলসী দিয়ে শালগ্রাম পূজা করেছিলেন; তিনি নদীয়ায় এসেছেন।” শ্রীরাম পণ্ডিত, অর্থাৎ শ্রীবাস ঠাকুরের কনিষ্ঠ ভ্রাতা, তাঁকে পাঠান হয়েছিল এবং তিনি অদ্বৈত গোঁসাইকে তা বলেছিলেন। অদ্বৈত গোঁসাই উপর-নিচ উল্লম্ফন করছিলেন, “হরিবোল! হরিবোল! ভগবান এসেছেন! ভগবান এসেছেন!” তারপর তিনি বললেন, “আমি কি করে বুঝব যে চৈতন্য মহাপ্রভু এসেছেন? আমি কি করে বুঝব? আমি কি করে বুঝব যে কৃষ্ণ এসেছেন? কীভাবে বুঝব তিনি হচ্ছেন আমার প্রাণের ভগবান? প্রাণাত্মা, পরমাত্মা? কি প্রমাণ আছে? না! তুমি তাঁকে গিয়ে বল যে আমি তাঁকে দর্শন করতে আসছি না! আমি সেখানে যাব ও লুকিয়ে থাকব এবং তাঁকে পরীক্ষা করব। যদি তিনি আমাকে ডাকেন, যদি তিনি আমাকে তাঁর প্রকৃত আধ্যাত্মিক স্বরূপ দর্শন করান, যদি তিনি তাঁর শ্রীপাদপদ্ম আমার মস্তকে রাখেন, তাহলে আমি জানব যে বাস্তবে তিনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, যিনি আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে এসেছেন। তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান, নয়ত আমি কিভাবে এটি বিশ্বাস করব যে তিনি হচ্ছেন পরমাত্মা এবং তিনি আমার ডাকে এসেছেন? আমি তাঁকে এটা বলব না।” 

এরই মধ্যে তাঁর স্ত্রী সীতা দেবী পূজার থালি প্রস্তুত করেছিলেন, যদি এটি সত্যি হয় তাই। তখন তারা দৌড়ে যান এবং তারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যেখানে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের ভাবে বিরাজ করছিলেন, তারই নিকটস্থ এক স্থানে থাকেন। প্রথমবার তিনি তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্তবৃন্দের সামনে ‘ঈশ্বর-ভাব’ প্রকাশ করেছিলেন এবং তারপর তিনি ডাকলেন, “নাড়া! নাড়া! অদ্বৈত! অদ্বৈত! কেন তুমি লুকিয়ে আছ?” যখনই শ্রীরাম পণ্ডিত সেখানে উপস্থিত হলেন, তখনই তিনি ডেকে উঠলেন, “কেন অদ্বৈত লুকিয়ে আছে? বেরিয়ে এসো! এসো!” অদ্বৈত ভয়ে ভীত হলেন, তিনি বেরিয়ে এলেন, এবং তিনি দেখলেন যে—শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই স্থানে আছেন ও অনতিদূরে তিনি তাঁকে প্রণতী নিবেদন করলেন। যখন তিনি উপরে তাকালেন, তখন তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আর আগের মতো দর্শন করতে পারলেন না। তিনি এমন এক স্বরূপ দর্শন করলেন, যা লক্ষাধিক সূর্যের থেকেও অধিক দীপ্তিময়! তিনি দেখলেন যে, সমগ্র জগতের ব্রহ্মজ্যোতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর থেকে প্রকাশিত হচ্ছে এবং তিনি তাঁর পূর্ণ আধ্যাত্মিক স্বরূপ প্রকাশ করেছিলেন। নিত্যানন্দ প্রভু, শ্রীবাস, যাঁরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পাশে ছিলেন, কেবল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সহ সেই সব পার্ষদবর্গই দৃশ্যমান ছিলেন, আর বাকি সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মজ্যোতির তেজে অন্ধকারময় হয়ে গিয়েছিল। তিনি এই সবকিছু আধ্যাত্মিক স্তর থেকে দর্শন করছিলেন, যেখান তিনি দিব্যস্তরে স্থিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু আদি সকলকে দর্শন করতে পারছিলেন। 

দেবতারা এসেছিলেন, এবং তারা চৈতন্য মহাপ্রভুকে তাঁদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন। তিনি তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন। তখন তিনি অদ্বৈতকে বললেন… অদ্বৈত সেখানে এলেন এবং তিনি তাঁর শ্রীপাদপদ্ম অদ্বৈতের মস্তকে স্পর্শ করলেন ও বললেন—“অদ্বৈত তোমার ডাকে, তোমার হুংকারের কারণে আমি এসেছি। যখন আমি আধ্যাত্মিক জগতে ছিলাম, তখন তুমি আমাকে বিক্ষুব্ধ করেছিলে। তোমার কারনে আমি নিম্নে অবতীর্ণ হয়েছি। তোমার পূজার কারণে, তোমার ইচ্ছার কারণে আমি এসেছি। এখন তুমি কি চাও? তুমি আমাকে বল যে তুমি কি চাও?” তখন অদ্বৈত গোঁসাই উল্লম্ফন করতে করতে হুংকার করলেন, “হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল! ভগবান এসেছেন, আমি ভগবানকে নিন্মে নিয়ে এসেছি! তিনি আমার ডাকে এসেছেন! হরিবোল! হরিবোল!” তিনি উল্লম্ফন করছিলেন এবং নৃত্য করছিলেন, তিনি কিছুটা আধ্যাত্মিক গর্ব অনুভব করছিলেন। তিনি উল্লম্ফন করে হুংকার করছিলেন, “হরিবোল! হরিবোল!” কিভাবে ভগবান কত করুণাময় যে তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন, এই ভেবে তিনি বারংবার ভূপতিত হয়ে তাঁকে প্রণতি জ্ঞাপন করছিলেন। এরপর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “এখন তোমাকে আমার থেকে একটি আশীর্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তুমি কি চাও?”

“না! না! আপনি এসেছেন এটাই যথেষ্ট, এতেই সবকিছু পূর্ণ হয়ে গেছে…”

“না! তোমাকে আমার থেকে একটি আশীর্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। তুমি কি চাও? মুক্তি চাও? তুমি কি অন্যকিছু চাও? তুমি কেবল আমাকে বল যে তুমি কি চাও?”

“না! না! না! না! আপনি এসেছেন এটাই যথেষ্ট!”

“না! না! তোমাকে একটি আশীর্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।”

“ঠিক আছে!” অনেক জোরাজুরি করার পর অবশেষে অদ্বৈত সহমত হলেন, “ঠিক আছে, আমাকে আপনার থেকে একটি আশীর্বাদ গ্রহণ করতে হবে, তাহলে এটাই হচ্ছে আমার ইচ্ছা যে— আপনি দয়া করে সেই সমস্ত জীবদের কৃপা করুন, যাদের সাধারণত ভগবৎ চেতনাময় হওয়ার সুযোগ নেই, আপনার প্রতি শুদ্ধ প্রেম বিকশিত করার সুযোগ নেই, যারা সাধারণত দুর্ভাগ্যজনক,  যারা সাধারণত এই সুযোগ পায় না, তারাই যেন আপনার বিশেষ কৃপাপাত্র হয়। তারা যেন আপনার কৃপা লাভ করতে পারে এবং জীবনের এই সর্বোচ্চ আশীর্বাদ লাভ করতে পারে। এটাই হচ্ছে আমার বিশেষ অনুরোধ।”

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “তথাস্ত—তাই হোক!”

তখন শ্রীঅদ্বৈত গোঁসাই বললেন, “না! না! শুধু এটাই নয়। এটি কেবল আমার প্রার্থনার প্রথম অর্ধেক অংশ ছিল। পরবর্তী অর্ধেকাংশ আছে।” তিনি বললেন যে—“যেই ব্যক্তিরা অত্যন্ত আধ্যাত্মিক, মহান ভক্ত হিসেবে খুবই গর্বিত, মহান ব্রাহ্মণ বা রাজা হিসেবে গর্বিত এবং যারা মনে করে যে তাদের জড়জাগতিক পদের কারণে, তথাকথিত প্রতিষ্ঠার কারণে, তারা আপনার কৃপা লাভের যোগ্য, যারা দম্ভবশত ভগবানের ভক্তদের অবজ্ঞা করে, দম্ভবশত ভগবানের ভক্তদের প্রতি অপরাধ করে, যারা মনে করে যে তারা আপনার কৃপা পাওয়ার যোগ্য; তাদেরকে আপনার কৃপা প্রদান করবেন না। সেই সমস্ত দাম্ভিক ব্যক্তিদের আপনি কৃপা প্রদান করবেন না।” তখন এতেও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সহমত হয়েছিলেন। 

মহারাজ প্রতাপ রুদ্র একজন রাজা হওয়ায়, তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে চাইতেন। কিন্তু তিনি(মহাপ্রভু) বললেন, “না! আমি তাকে দর্শন করব না, আমি তাকে দর্শন করব না, আমি কোন রাজাকে দর্শন করব না।” যখন তিনি এসেছিলেন ও অত্যন্ত বিনয়ভাবে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের সন্মুখস্থ পথ ঝাড়ু দিয়েছিলেন, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর প্রতি করুণ হয়েছিলেন। যখন তিনি একজন বৈষ্ণবরূপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন, তখন তিনি কৃপা লাভ করেছিলেন। এমন নয় যে আপনি এমনভাবে আসতে পারেন যে, “ওহ চৈতন্য মহাপ্রভু, আমি রাজা আমাকে আপনার প্রদান করুন।” না! আপনাকে খুবই বিনয়ীভাবে আসতে হবে, তাহলে আপনি এমনকিছু লাভ করবেন যা সাধারণত এমনকি বড় বড় দেবতাগণ যেমন ব্রহ্মা, শিব, তাঁরাও অতি সহজে লাভ করতে পারেন না। এটাই হচ্ছে বিশেষ কৃপা যে এমনকি যাদের ক্ষেত্রে মনে হয় কোন আশা নেই, যারা দুর্ভাগ্যজনক, তারাও কেবল কোন ভক্তের কৃপায়, কোন ভক্তের বিশেষ প্রার্থনায় তা লাভ করতে পারেন।… প্রচারকদের শ্রীল প্রভুপাদের কাছে প্রার্থনা করা উচিত। যে সমস্ত ব্যক্তিদের তারা প্রচার করছে, তাদেরকে যদি তারা উদ্ধার লাভ করতে দেখতে চায়, তাহলে তাদের জন্য শ্রীকৃষ্ণের কাছে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে, শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে প্রার্থনা করা উচিত। সেই সমস্ত জীবাত্মাদের জন্য প্রার্থনা করুন, যারা সাহায্যের অর্থ বোঝে, কোন ভক্তের কৃপার শক্তি বোঝে। আমরা এই আশীর্বাদ করি না যে—আপনি বড় ব্যবসায়ী হন বা জড়জাগতিকভাবে কোন কিছু হন, আমরা ব্যক্তিদের বিশেষত কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার আশীর্বাদ করি। এটিই হচ্ছে বিশেষত সেই আশীর্বাদ যা প্রদান করা হয়েছে। ভক্তরা যখন তারা প্রচার করেন, তাদের এটা চিন্তা করা উচিত যে কিভাবে এই জীবাত্মাকে জড়জাগতিক চেতনা থেকে উর্ধ্বে তোলা যাবে এবং এমনকি প্রচারকদের বিভিন্ন ব্যক্তিদের উপর বিশেষ কৃপা আকর্ষণের চেষ্টা করা উচিত। আপনারা কি মনে করেন যে শ্রীল প্রভুপাদ এই প্রার্থনা করেননি যে মানুষেরা যাতে উদ্ধার লাভ করেন? তিনি লোকেদের সৌভাগ্য করে দিয়েছেন, এমনকি যদিও তাদের কোন সৌভাগ্য ছিল না। একইভাবে, ভক্তরা এমনকি সেইসব ব্যক্তিদের সৌভাগ্য করে দিতে পারেন, যাদের কোনো সৌভাগ্য নেই। 

নারদ মুনি শিকারি মৃগালের সৌভাগ্য করে দিয়েছিলেন। তার কোন আশা ছিল না। তিনি দস্যুরত্নাকরের সৌভাগ্য করে দিয়েছিলেন, সেই জন্য সেই তস্কর ব্যক্তিও বাল্মিকী হতে পেরেছিলেন এবং ‘রামায়ণ’ বলতে পেরেছিলেন। একইভাবে ভক্তবৃন্দ, তাদের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা লাভের চেষ্টা করে মানুষদেরকে সৌভাগ্যবান করার ক্ষেত্রে যন্ত্ররূপে কাজ করা উচিত। মানুষ সৌভাগ্যবান হতে পারে বিশেষত ভগবানের ভক্তের হস্তক্ষেপের দ্বারাই। এইভাবে, যদি কোন ব্যক্তি অন্যান্যদেরকে কৃষ্ণভাবনামৃতে নিয়ে আসতে সাহায্য করার প্রচেষ্টা করে, তখন তার কাছে জড়জাগতিক দুঃখ-দুর্দশা বা জড়জগতিক কামনা-বাসনার প্রতি মনোযোগী হওয়ার জন্য কোন সময় থাকে না।

যখনই আপনি মুক্তির বিষয়ে, জড়জাগতিক ভোগবাসনার বিষয়ে চিন্তা করতে শুরু করেন, তৎক্ষণাৎ আপনি অশান্ত হয়ে পড়েন। কৃষ্ণভক্ত — নিষ্কাম, অতএব ‘শান্ত’ (চৈ. চ. মধ্য ১৯.১৪৯) শ্রীকৃষ্ণের ভক্তরা কেবল চিন্তা করেন যে কিভাবে শ্রীকৃষ্ণের প্রীতিবিধান করা যাবে এবং কৃষ্ণ এখানে কি অসাধারণ ইচ্ছা প্রকাশ করছেন? তিনি যেটি চান তা হচ্ছে, “সকলে আমার সেবা করুক।” শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, “মানুষেরা আনন্দপূর্ণভাবে নৃত্য ও কীর্তন করুক।” যদি কোন ব্যক্তি নিজেকে কেবলমাত্র চৈতন্য মহাপ্রভুর সেবায় নিমগ্ন রাখেন, কৃপা বিতরণ করেন, তাহলে জড়জাগতিক উদ্বিগ্নতা বা দুঃখ দুর্দশার জন্য কোনো সময় নেই। তার একমাত্র উদ্বিগ্নতা হচ্ছে কিভাবে মানুষদের কৃষ্ণভাবনামৃতে আনা যাবে, সেই উদ্বিগ্নতা প্রচারকের মধ্যে কৃষ্ণ-প্রেম উৎপন্ন করে এবং এর ফলে প্রচারের মাধ্যমে ভক্ত কৃষ্ণ-প্রেম বিকশিত করতে পারেন। ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি—কামী সকলি ‘অশান্ত’ (চৈ. চ. মধ্য ১৯.১৪৯) যারা জড়জাগতিক উন্নতি, জন্ম-মৃত্যু থেকে মুক্তি চায়, যৌগিক শক্তি চায়, তারা সবাই অশান্ত। তারা অশান্ত, তারা বিক্ষুব্ধ, তারা উদ্বিগ্ন যে, “কখন আমি মুক্তি পাব? কখন আমি... ?” তবে একজন ভক্তের উদ্বিগ্নতা হচ্ছে— “কখন এইসব ব্যক্তিরা কৃষ্ণভাবনাময় হবে? কিভাবে আমি তাদেরকে কৃষ্ণভাবনাময় হতে সাহায্য করতে পারব?” সেই ইচ্ছা যেহেতু কৃষ্ণের ইচ্ছা, তাই আসলে তার নিজস্ব কোন বাসনা নেই। এটি হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণের সাথে সমন্বয়সাধন করা। এর ফলে তা কোন ব্যক্তিকে শ্রীকৃষ্ণের আরো নিকট থেকে নিকটতর করে তোলে। তা কাউকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ ভক্ত করে তোলে, যার অর্থ হচ্ছে তখন কেউ ইতিমধ্যেই কর্মের আইনের, জড়জগতের ঊর্ধ্বে।

মাং চ যোঽব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে ।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে॥
[গীতা ১৪.২৬]

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙক্ষতি।
সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্॥
[গীতা ১৮.৫৪]

তৎক্ষণাৎ কেউ ব্রহ্ম স্তরে উন্নত হয়, তিনি দেখেন না যে এই ব্যক্তি সাদা বা হলুদ বা সবুজ বা নীল বা চীনা বা থাইল্যান্ডবাসী বা আমেরিকান বা ভারতীয় নাকি। তিনি দেখেন যে এই জীবন ভ্রমের দ্বারা আচ্ছাদিত আছে। ইনি হচ্ছেন কৃষ্ণের অংশ। যতক্ষণ না আমরা কৃষ্ণের প্রতি ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হচ্ছি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রেম করছি, ততক্ষণ জীবাত্মা কখনই সন্তুষ্ট হবে না। কখনই সন্তুষ্ট হতে পারবে না। তাই ভক্ত ব্রহ্মস্তরে, তৎক্ষণাৎ আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হন কেবল প্রত্যেককে কৃষ্ণের অংশ হিসেবে দেখার মাধ্যমে এবং তাদের সকলকে তাদের সক্ষমতা, প্রবৃত্তি, প্রকৃতি এবং সম্ভাবনা অনুসারে কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করার মাধ্যমে। এটাই হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিশেষ কৃপা। শ্রীল প্রভুপাদ ব্যক্তিগতভাবে আমাদেরকে দেখিয়েছেন যে, “আমি যা করি তাই করো।”  তিনি পাশ্চাত্যে তা দেখিয়েছিলেন, তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে তা দেখিয়েছিলেন, তিনি সব মানুষদের কেবল নিযুক্ত করার প্রয়াস করেছিলেন। রাশিয়ায় তাদেরকে একভাবে নিযুক্ত করো ও  অন্য দেশে অন্যভাবে নিযুক্ত করো, এইভাবে আমাদেরকে কেবল ব্যক্তিদেরকে কীর্তন, নৃত্য, গ্রন্থ অধ্যয়ন, প্রসাদ সেবায় নিযুক্ত করতে হবে এবং তাহলেই তারা কৃপা লাভ করবেন।

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ॥ 

হরিবোল! কোন প্রশ্ন আছে?

[তুমি কি নিশ্চিত দেখেছ যে প্রসাদ প্রস্তুত আছে? আমি যখনই এখান থেকে বের হব, ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে আমি প্রসাদ পেতে চাই।]

ভক্ত: আপনি বলছিলেন যে প্রত্যেকেই ইতিমধ্যে মুক্ত, (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ, যখন তিনি চাইবেন… শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন যে প্রতি নগর ও গ্রামে যেন এই নাম-কীর্তন শোনা যায়। এর অর্থ হচ্ছে, ঠিক যেমন ‘হরেকৃষ্ণ’ ইতিমধ্যেই আমেরিকাতে এক পরিচিত নাম। প্রত্যেকেই ‘হরেকৃষ্ণ’ শুনেছে। কেবল ‘হরেকৃষ্ণ’ বলার মাধ্যমে, ‘হরেকৃষ্ণ’ শোনার মাধ্যমেই তারা মুক্তি পেতে পারে, কিন্তু আমরা মুক্তি লাভের প্রতি আগ্রহী নই। তারা মুক্তি লাভ করে ব্রহ্মজ্যোতিতে হারিয়ে যাওয়ার পূর্বেই আমরা চাই যে তারা যেন আসলে কৃষ্ণপ্রেম প্রাপ্ত হন।

আমাদের সহানুভূতি…বাস্তবিকভাবে বলতে গেলে তাদের মুক্তি লাভে কোনো সমস্যা হবে না। অবশ্য তাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, তবে তৎক্ষনাৎ তাদের মুক্তি নিশ্চিত। কতগুলি জন্ম লাগবে, সেটা ঠিক যেমন...ধরুন, তাদেরকে ইতিমধ্যেই মুক্তির দিকে অগ্রসরের পথে রাখা হয়েছে, এটি হচ্ছে ঠিক যেন উল্টো গননা চলছে—১০, ৯, ৮, ৭, ৬, ৫, ৪, ৩, ২, ১... “শু-উপ!” এইভাবে তারা ইতিমধ্যেই উল্টো গননায় চলে গেছে। এটা যেন ধীরে ধীরে জীবন পরিবর্তন হওয়া, যেমন ইউরেনিয়ামের রাসায়নিক ধর্ম প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়ে যায়—ধীরে-ধীরে ধীরে-ধীরে এভাবে অবশেষে সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়। সেরকমই, তারা ইতিমধ্যেই কাউন্টডাউনে চলে গেছে। তারা ইতিমধ্যেই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করেছে। এখন প্রশ্ন শুধু হয় এই জন্মে মুক্তি লাভ হবে না হয় কয়েক জন্ম পরে, কিন্তু যাই হোক না কেন, তারা ইতিমধ্যেই জপ করছে। তাই যতক্ষণ না তারা ভক্তদের প্রতি কোনো অপরাধ করছে, ততক্ষণ তাদের মুক্তি নিশ্চিত।

ভক্ত: আপনি বললেন যে পাশ্চাত্যে তারা প্রদর্শনী করছে, ধনী ব্যক্তিরা... (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ! ওয়াল্ট ডিজনি ভবিষ্যৎ সমাজের এক বিরাট প্রদর্শনী করেছিল... ১০০ কোটি ডলারের প্রদর্শনী। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেখানে সেটি দেখতে গিয়েছিলাম। তারা কেবল এটা দেখাচ্ছে যে জড়জাগতিক বিজ্ঞানই হচ্ছে ভগবান, কিভাবে মানুষ ফটোপ্লাস্টমিক ক্রাফট-এর ধারণা থেকে উন্নতি করেছে, গুহা মানবের পর্যায় থেকে উন্নত হয়েছে এবং এখন ভবিষ্যতে তারা মহাকাশে যাত্রা করতে চলেছে।

ভক্ত: ডিজনিল্যান্ড?

জয়পতাকা স্বামী: না! না! ডিজনিল্যান্ড বাচ্চাদের জন্য। এটা অন্য। এটা ডিজনি ওয়ার্ল্ড-এর পরে, পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বিশেষত পুরো ৬০০ একর এলাকা জুড়ে প্রদর্শনী করা হয়েছে। এক বিলিয়ন ডলার। প্রত্যেকটি প্রদর্শনী বেল টেলিফোন, এক্সন, ইনফো, ক্র্যাফট ইত্যাদি সব বিশাল বহুজাতিক আমেরিকান কোম্পানিগুলির দ্বারা করা হয়েছে এবং তারা কিছু অর্থও দিয়েছে, যাতে তাদের নাম সেখানে থাকে। এই পুরো বিষয়টি ওয়াল্ট ডিজনি-এর দ্বারা পরিকল্পিত। এটা হচ্ছে জগতের শক্তির প্রদর্শনী যে আমাদের কর্পোরেশন দরকার…এটা হচ্ছে ঠিক যেন, “এখন সবাই একসাথে একটি দল—বিজ্ঞান, জনতা, শিল্প” (হাসি) একটা দল। শিল্পপতিরা বিজ্ঞানীদের ভাড়া করে, আর জনতা সমস্ত অর্থ ব্যয় করে (হাসি) এবং তারা সেই সব লাভ গ্রহণ করে। (হাসি) বিরাট দলীয় কার্যক্রম! এবং সবশেষে লোকেরা আবার হাততালিও দেয়! তারা সবাই উঠে দাঁড়ায়, এক হাজার মানুষেরা সবশেষে তারিফও করে, তবে পিছনের সারির কিছু মানুষেরা বমি করে, কারণ তাদের সেখানে এরকম গাড়ির ব্যবস্থা ছিল, যা আপনাকে ডাইনোসরের সময়কার বিশ্বে নিয়ে যাবে, যেখানে তারা ডাইনোসরের যুদ্ধ দেখায়, কেবল এটি বোঝানোর জন্য যে বহুবছর আগে ডাইনোসরদের দেহ মাটিতে পড়ে তেল তৈরি হয়েছে, নয়ত এছাড়া এর আর কোন মানে নেই। এটাই তারা বলে! তারা এগুলি দেখায়, তারা আপনাকে ডাইনোসর, গুহার মানুষের মতো এই সমস্ত জিনিসের কাছে নিয়ে যাবে এবং এরপর আপনি ফিরে এলে তারা আপনাকে দেখাবে যে এখন আধুনিক বিশ্বে আমাদের কাছে কি কি আছে। আমরা ডাইনোসরের যুগ থেকে অগ্রগতি সাধন করেছি। তখন মানুষেরা মনে করে, “কি দারুন! আমাদের সত্যিই অগ্রগতি হয়েছে। আমি একটা ডাইনোসর ছিলাম, বা যাই হোক এমন কিছু ছিলাম, কিন্তু এখন আমরা সত্যিই উন্নতি করেছি।”  এবং সবশেষে তারা আপনাকে এক বিশেষ অনুভূতির মধ্যে ফেলবে, “দেখুন আমরা অতীতের কত কত বছর পার করে অগ্রসর হয়ে, এখন বর্তমানে এই অবস্থায় আছি!” এবং তারপর তারা বিরতি দেবে রক এন্ড রোলের গানের মাধ্যমে— টুমরো টাটা টাটা টাটা ঠা! (ড্রামের শব্দ নকল করলেন) এবং তারপর, (গিটারের আওয়াজ নকল করলেন) এইভাবে রক এন্ড রোলের পুরো গান হবে — টুমরো দি ডে অফ ফিউচার, হ্যাপিনেস, ব্লিস (ড্রামের আওয়াজ) টুমরো… 

এরপর তারা আপনাদের আলোক প্রদর্শনী দেখাবে, লেজার রশ্মির। তারা এমন চিত্র দেখায় যে একটি ভ্রূণ থেকে জন্ম হল, এরপর একটি শিশু হল, তারপর তা থেকে কিশোরী কন্যা, তারপর পরিবর্তন হয়ে ১২ বছর বয়সী, ১৬ বছর বয়সী মেয়ে, এইভাবে শরীর পরিবর্তন হল। এরপর কি?  বার্ধক্য? মৃত্যু? না! না! বার্ধক্য নয়! মৃত্যু নয়! তারপর হঠাৎ করে তিনি মহাকাশযাত্রী মহিলায় পরিবর্তিত হবে, এরপর সেখানে একজন মহাকাশযাত্রী পুরুষও থাকবে এবং তাদের মহাকাশ যাত্রার পোশাক আছে, যা হচ্ছে লেজার রশ্মির এবং সেখান থেকে আলো, রশ্মি বেরিয়ে আসছে। স্পেস ম্যান! (গান করছেন) টুমোরো! (গানের আওয়াজ নকল করছেন) দিস ফিউচার হোল্ডস টুমোরো! এরপর তারা আরো আলোর মধ্যে চারিদিকে ঘোরে এবং সবকিছু এক বড় ফ্ল্যাশ আলোর মধ্যে মিশে যায়। এটাই হচ্ছে সমাপ্তি। শক্তির জগত। 

এরপর সব মানুষেরা উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। প্রত্যেক প্রদর্শনীর শেষে একটি করে রক এন্ড রোল গান আছে ও “টুমোরো টুমোরো” এবং আমরা যখন চতুর্থ প্রদর্শনী দেখেছিলাম, তখন তিনি বলে উঠেছিলেন, “ওহ না! আবার সেই আলো আর টুমোরো গান।” আমরা অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাসতে শুরু করলাম। আমরা যাতায়াতের পথেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লাম। প্রথম চারটি প্রদর্শনীর সময় আমি খুব রেগেছিলাম। প্রত্যেকেই বলছিলেন, “কিভাবে এইসব মানুষদের প্রতারণা করা হচ্ছে। তারা প্রতারিত হচ্ছে! এইসব জড়বাদীদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে!” অবশেষে তা এত হাস্যকর হয়ে উঠেছিল যে আমরা আর কিছু না করতে পেরে, হাসছিলাম—“কিভাবে মানুষ এত বোকা হতে পারে? এবং কিভাবে তারা এসব কিছু উপস্থাপনা করছে?” 

তারা অতীতের দশ বছর খুব তাড়াতাড়ি দেখিয়ে দেয়, কারণ তাহলে সব অপরাধ, ড্রাগ নেওয়া, সেই জীবন এবং রাজনৈতিক অশান্তি, গণহত্যা ও এইসব বিভিন্ন জিনিসগুলির কথা মনে পড়বে কারণ এগুলো সবেমাত্র সবাই পার করে এসেছে, তাই এই সব ধারণাগুলি খুবই তরতাজা আছে, সেই জন্য তারা ১৯৫০,৬০-এর দশকের পরই শুপ! আপনাকে টুমোরো ওয়ার্ল্ড এর গানের মধ্যে নিয়ে আসবে (হাসি), যেটা হচ্ছে শুধুই আলোক প্রদর্শনী এবং রক এন্ড রোল গান। 

সেখানে কোন বাচ্চা নেই। এটা ডিজনি নয়। সেখানে প্রত্যেকেই বড় কলেজের ছাত্র ছাত্রীর বয়সী, হয়ত কেবল ৫% লোকেরা তাদের সাথে বাচ্চাকে নিয়ে এসেছে, কারণ তাদের কাছে শিশুর যত্ন নেওয়ার জন্য আয়া বা এমন কোন ব্যবস্থা নেই। তাই সেখানে সবাই বয়স্ক মানুষ, কলেজ ছাত্র-ছাত্রী, মধ্যবয়সী মানুষ, এবং তারা এটা গ্রহণ করছে! 

ভক্ত: এর মানে তাদের এই সংস্কৃতি আছে (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: ও হ্যাঁ! আমাদেরকে এটা সুনিশ্চিত করতে হবে যে তাদের প্রতি যাতে লক্ষ্য থাকে। তারা পুরোপুরি পাশ্চাত্য প্রযুক্তি, আধুনিক বিজ্ঞানের ভোক্তা। এটাই হচ্ছে মূল বিষয়।

ভক্ত: তারা সম্ভবত, এটা হচ্ছে একটা পন্থা (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: তারা কেবল মনোরঞ্জনের জন্য যায় যে সেখানে গিয়ে আনন্দ করবে, কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে যে তারা এটা উপলব্ধি করে না যে এটি হচ্ছে এক ভ্রান্ত প্রচারণা। তারা কেবল মনে করে এটা হচ্ছে এক প্রদর্শনী বা এমন কিছু, শিক্ষামূলক ব্যাপার বা এমন কিছু। কারণ তারা মনে করে যে এটাই বিশ্ব। প্রতিদিন তারা টেলিভিশনের মাধ্যমে যা কিছু দেখছে, এর দ্বারাই এটির শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে। সেটিই হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রচারণা। ঠিক যেমন ওয়াল্ট ডিজনি-এর কম্পিউটারের মাধ্যমে চলন্ত মূর্তি এবং রোবট, আলোক প্রদর্শনী বা গণমাধ্যম এবং থ্রিডি মুভি ও এই সব ধরনের প্রযুক্তি আছে। যা বিস্ময়কর!

আমাদেরকে কেবল এরকম একটি প্রদর্শনী দেওয়া হোক, তাহলে আমরা সেটির মাধ্যমে পুনর্জন্মের বিষয়টি উপস্থাপন করব, আমরা কৃষ্ণভাবনাময় তত্ত্ব উপস্থাপন করব। জীবনের প্রতি সেই ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হবে। এর প্রভাব বেশিদিন থাকবে না কারণ আপনারা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে পারেন কিন্তু তবুও তারা বৃদ্ধ হবে তবুও তারা মারা যাবে।  টুমোরো… কে এই টুমোরোকে পাত্তা দিচ্ছে? টুমরো আই এম গোইং টু বি ডেড (গান) এটা হচ্ছে কেবল আবেগ, “অলরাইট, হান্ড্রেড ইয়ার্স ফ্রম নাও…” তারা এটাই চালাতে থাকে, “উই আর গনা ওভারকাম ওল্ড এজ, উই আর গনা ওভারকাম ডেথ।”  

ভক্ত: (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: তাদের সেখানে ওয়াল্ট ডিজনিকে এখনো হিমঘরে রাখা আছে। এই প্রচারণা হচ্ছে। এটা কাউকেই সন্তুষ্ট করে না, এমনকি মানুষেরা সেখানে হেঁটে যায়, তারা পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, পুরো দিন ধরে মাইল মাইল পথ হাঁটতে হয়, আর আপনাকে এসব কিছু দেখার জন্য ১৫ ডলার টাকা দিতে হবে। যখন তারা সেখানে থাকে, আর প্রবেশ করে, তখন তারা অন্তত ১০-২০ ডলার এইভাবে খরচ করে, অন্তত ১৫ ডলার অর্থ খরচ করে। এইভাবে তারা প্রতিদিন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করছে, কখনো কখনো ২ লক্ষ মানুষ আসে।… 

(পাশে) কতজন মানুষ?

হয়ত দুই লক্ষ মানুষ প্রথম কিছুদিন গিয়েছিল, কিন্তু আমার মনে হয় না এটাই তাদের প্রতিদিনের গড়। আমি জানিনা, তাদের গড় কত, কিন্তু আপনি হিসাব করুন যে তারা কত অবিশ্বাসযোগ্য অর্থ আয় করছে। বাস্তবে তারা তাদের বিনিয়োগ অর্থ প্রথম বছরেই ফিরে পেয়েছে। দেখুন সেখানে ৬০,০০০ মানুষ কাজ করে। ওয়াল্ট ডিজনির মধ্যে ৬০,০০০ কর্মচারী আছে। তাই সেখানে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ আসে।

ভক্ত: (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: সেই শহরটির ডিজনির নিজেদের। ডিজনি ওয়ার্ল্ডের তাদের নিজস্ব জায়গা আছে। ৬০ বা ৩০ হাজার কর্মচারী আছে। ৩০ হাজার কর্মচারী সেখানে কাজ করে, যাদেরকে আলাদাভাবে নিযুক্ত করা হয়েছে। এটা হচ্ছে অরল্যান্ডের কাছাকাছি অবস্থিত। ঠিক যেমন আসলে আমরা বানাতে চাইছিলাম… অবশ্য তাদের ভিন্ন পরিকল্পনা ছিল যে ডিজনি নমুনা বানাতে চেয়েছিল। EPCOT এর অর্থ হচ্ছে “Experimental prototype community of the future” (ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীর পরীক্ষামূলক নমুনা) তিনি একটি জীবন্ত জনগোষ্ঠী তৈরি করতে চেয়েছিল, যেখানে মানুষ বাস করবে এবং একটি নিখুঁত সমাজের প্রদর্শন করবে, সমাজতান্ত্রিক বা এমন ধরনের ব্যবস্থার মতো। কিন্তু এর পরিবর্তে তারা শিল্পের সাথে যুক্ত করে সেটিকে বাণিজ্যিকীকরণ করে ফেলেছে। আসলে আমাদের নমুনা, যা আমরা মায়াপুরে করছি, আমরাই ভবিষ্যতের প্রকৃত নমুনা তৈরি করছি। আমরা একটি আদর্শ গ্রাম এবং আদর্শ শহরের নমুনা প্রস্তুত করছি যা সবসময় বিদ্যমান এবং আমাদের অনেকগুলি বড় প্রদর্শনী হবে ও এটাই হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনা যে সমগ্র বিশ্ব থেকে যেন মানুষেরা সেখানে আসে।

ভক্ত: (শ্রীবাস ঠাকুর সম্পর্কিত প্রশ্নটি শোনা যায়নি)

জয়পতাকা স্বামী: তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর থেকে বরিষ্ঠ।

ভক্ত: (শ্রীবাস ঠাকুরের ধুতি রং বিষয়ক প্রশ্নটি শোনা যায়নি।)

জয়পতাকা স্বামী: তিনিও হচ্ছেন গৃহস্থ, তারা প্রত্যেকের ধুতি ভিন্ন রং-এর করে। তুমি শ্রীল রামেশ্বরকে কেন চিঠি লেখ  না?

ভক্ত: (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: তারা রঙিন ধুতি পড়তেন। এমনকি দক্ষিণ ভারতেও ব্রাহ্মণেরা নীল ধুতি, বেগুনি ধুতি, বেগুনি সিল্কের, নীল সিল্কের, হলুদ সিল্কের খুব সুন্দর ধুতি পড়েন। সাধারণত তিনি হলুদ ধুতি পড়া থাকেন। আমি জানি না কেন তারা গেরুয়া পড়িয়েছেন। অন্যান্য কোন রং, লাল হতে পারে। কে জানে?

ভক্ত: (শ্রুতিহীন)

জয়পতাকা স্বামী: শ্রীমান বিরলা বলেছেন যে, তিনি ডিজনি ওয়ার্ল্ড-এর মত প্রদর্শনী ৫০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৫০০ কোটি টাকায় কলকাতার কাছাকাছি করতে চান। মূল বিষয় হচ্ছে যে, ইসকনের তত্ত্বগত ব্যাখ্যা যুক্ত করে এই ধরনের প্রদর্শনী করা যেতে পারে। এর জন্য তিনি পাশ্চাত্য থেকে কিছু প্রযুক্তি আনায়ন করতে চান। যদি কেবল বিনোদনের জন্য পার্ক থাকে, তাহলে সেখানে জনগণের প্রতি কোন বার্তা নেই। তখন এর লাভ কি?

ভক্ত: কে?

জয়পতাকা স্বামী: এ. কে. বিরলা খবরের কাগজে এটি দিয়েছেন যে তিনি এমন একটি পার্ক তৈরি করতে চান। তার এটি মায়াপুরে তৈরি করা উচিত। তখন সেখানে সবাই আসবে। আমরা যদিও তা তৈরি করব, কিন্তু আমি বলতে চাইছি যে—যদি আমরা এরকম সাহায্য পেতে পারি, ভারতীয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানে আমেরিকান ট্রিলিয়ন, বিলিয়ন ডলারের সমান। তাই যদি তিনি কেবল প্রযুক্তির উপস্থাপনের জন্য তা করেন, তাহলে তা ভারতীয়দেরই ক্ষতি করবে।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 11/07/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions