Text Size

১৯৮২১০২৭ শ্রীমদ্ভাগবতম ১.৬.২৮

27 Oct 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam

শ্লোক ১.৬.২৮ 
প্রযুজ্যমানে ময়ি তাং শুদ্ধাং ভাগবতীং তনুম্ ।
আরব্ধকর্মনির্বাণো ন্যপতৎ পাঞ্চভৌতিকঃ।।  

আসলে প্রত্যেকটি অক্ষর যেমনভাবে লেখা আছে, তেমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে। যেহেতু আমরা জানি না এর আসলে অর্থ কি, সেজন্য পুরো শব্দ দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ার পরিবর্তে, কেবল প্রত্যেকটি অক্ষর উচ্চারণ করুন—প্র-যু-জ্য-মা-নে, ম-য়ি-তং—ঠিক যেমনটি দেখতে পাচ্ছেন, সেইভাবেই অক্ষর বিভাজন করে বলুন—প্র-যু-জ্য-মা-নে, ম-য়ি-তং, শু-দ্ধম, ভা-গ-ব-তীং, ত-নুম্, আ-র-ব্ধ, কর্ম-নি-র্বা-ণো,  ন্য-প-তৎ, পা-ঞ্চ, ভৌ-তি-কঃ। যদি আপনি পুরো শব্দ না দেখে কেবল প্রত্যেকটি অক্ষর দেখেন, স্বরধ্বনি সহ অক্ষরগুলি এইভাবে উচ্চারণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে তা খুবই সহজ হবে। কিন্তু যদি আপনি পুরো শব্দ দেখেন, তাহলে আপনি ভয় পেয়ে যাবেন। (হাসি) 

প্রযুজ্যমানে ময়ি তাং শুদ্ধাং ভাগবতীং তনুম্ ।
আরব্ধকর্মনির্বাণো ন্যপতৎ পাঞ্চভৌতিকঃ।।

আর কেউ বলার চেষ্টা করতে চায়?

অনুবাদ: পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গ করার উপযুক্ত একটি চিন্ময় শরীর লাভ করে আমি পঞ্চভৌতিক দেহটি ত্যাগ করি, এবং তার ফলে আমার সমস্ত কর্মফল নিবৃত্ত হয়।

তাৎপর্য: পরমেশ্বর ভগবানের কাছ থেকে নারদ মুনি প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গ করার উপযুক্ত শরীর তিনি পাবেন, এবং সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে নারদ মুনি তাঁর জাগতিক দেহটি ত্যাগ করা মাত্রই তাঁর চিন্ময় শরীর প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই চিন্ময় শরীর সব রকম জড় প্রভাব থেকে মুক্ত এবং তা তিনটি প্রধান চিন্ময় গুণের দ্বারা ভূষিত, যথা নিত্যত্ব, জড় গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত এবং সকাম কর্মের ফল থেকে মুক্ত। জড় শরীর সর্বদাই এই তিনটি গুণের অভাবে দুর্দশাগ্রস্ত। ভক্ত যখন ভগবানের অপ্রাকৃত সেবায় যুক্ত হন, তৎক্ষণাৎ তাঁর দেহ চিন্ময় গুণাবলীর দ্বারা সম্পৃক্ত হয়। এটি অনেকটা লোহার উপর চিন্তামণির স্পর্শের প্রভাবের মতো। চিন্তামণির স্পর্শে লোহা যেমন সোনা হয়ে যায়, ভগবদ্ভক্তির চিন্ময় প্রভাবে জীবও তেমন চিন্ময়ত্ব প্রাপ্ত হয়। তাই দেহত্যাগ মানে হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তের উপর জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের প্রভাব স্তব্ধ হওয়া। এই সম্পর্কে শাস্ত্রে বহু নিদর্শন রয়েছে। ধ্রুব মহারাজ, প্রহ্লাদ মহারাজ আদি বহু ভক্ত তাঁদের সেই শরীরেই পরমেশ্বর ভগবানকে দেখতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার অর্থ হচ্ছে যে তখন সেই ভক্তদের দেহ জড় থেকে চিন্ময়ত্ব প্রাপ্ত হয়েছিল। সেটিই হচ্ছে প্রামাণিক শাস্ত্রের মাধ্যমে তত্ত্বদ্রষ্টা গোস্বামীদের সিদ্ধান্ত। ব্রহ্ম-সংহিতায় বলা হয়েছে যে, ইন্দ্রগোপ থেকে শুরু করে দেবরাজ ইন্দ্র পর্যন্ত সমস্ত জীব কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ এবং তাদের কর্ম অনুসারে তারা সুখভোগ করে অথবা দুঃখভোগ করে। ভক্তরাই কেবল পরমেশ্বর ভগবানের অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে সেই প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত।

ইতি শ্রীমদ্ভাগবতের ‘নারদ মুনি এবং ব্যাসদেবের কথোপকথন’ নামক ১ম স্কন্ধ, ৬ষ্ঠ অধ্যায়, ২৮তম শ্লোকের অনুবাদ এবং ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত।  

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক, কারণ এটি আমাদেরকে বলছে যে আসলে ভৌতিক জীবনের স্থিতি কি, ভৌতিক শরীরের স্থিতি কি, এবং ভক্তিমূলক সেবা ও সমাধির পরিপূর্ণ স্তরে পৌঁছানো—এই সব বিষয় এই শ্লোকে আছে। এখানে শ্রীনারদ মুনি তাঁর জড় শরীর পরিবর্তন করে আধ্যাত্মিক শরীর লাভ করতে যাচ্ছেন। এটি বুঝতে পারা খুবই অসাধারণ যে, কিভাবে ভগবান তাঁকে বলেছিলেন—“আমি তোমাকে একটি আধ্যাত্মিক শরীর, দিব্য দেহ প্রদান করব, যা আমার সাথে সঙ্গ করার উপযুক্ত।” এবং সময়ের সাথে সাথে সেটিও হয়েছে। 

আমাদের জড় শরীর এবং আধ্যাত্মিক শরীরের মধ্যে পার্থক্য বোঝা উচিত। এই দুটি একই নয়। দেখুন জড় শরীর বিভিন্নভাবে যন্ত্রণা প্রাপ্ত হয়, তবে আধ্যাত্মিক শরীর অসাধারণ গুণাবলীযুক্ত। তিনটি গুণ-এর কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক শরীর বা নিত্য শরীর বা দিব্য দেহ, যা হচ্ছে নিত্য। এটি হচ্ছে প্রথম বিষয় যে জাগতিক শরীর নিত্য নয়, তা চিরকাল জীবিত থাকে না। কোন না কোন সময় আমাদেরকে এটি ত্যাগ করতেই হবে। সাধারণত যদি একজন ব্যক্তিকে বৈদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তিনি মানুষের নিরাময় করেন, তারা খুবই ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। আপনি কোন ব্যক্তিকে নিরাময় করতে পারেন এবং তাহলে সেই সাধারণ ব্যক্তি এসে আপনার পূজা করবে, যদি আপনি বলতে পারেন যে তাদের জীবন কেমন হবে, যদি আপনি তাদের ভবিষ্যত পড়তে পারেন বা কাউকে রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাময় করতে পারেন, তাহলে সাধারণ জীবনের ক্ষেত্রে সেটিকে এক বিশাল কোন ব্যাপার ভাবা হয়। এমনকি আপনারা দেখবেন যে বৌদ্ধ সাধুরা অনেক সময় এই দুটির কোন একটি করেন, হয় তারা আপনার ভবিষ্যৎ পড়ে  দেবেন, যেমন থাইল্যান্ডে অনেক সময় তারা আমাদের কাছে আসে এবং জিজ্ঞেস করে— “আপনি কি আমাকে লটারি কেনার শুভ নম্বর বলতে পারবেন?” (হাসি) এটা এক বিরাট ব্যাপার! এবং যদি আপনি কোন শুভ নম্বর বলে দিতে পারেন, তাহলে সবাই খুব খুশি (হাসি) এটাই হচ্ছে ধর্মীয় ব্যক্তির উদ্দেশ্য, আপনাকে শুভ কোন নম্বর বলে দেওয়া। (সবাই হাসছেন) এটাই মানুষেরা মনে করে বা হয়ত যদি আপনি তাদেরকে রোগ-ব্যাধি থেকে নিরাময় করতে পারেন, তা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু এখানে আমরা বুঝতে পারছি যে আসলে এই শরীর নিত্য নয়, আগে হোক অথবা পরে এটির মৃত্যু হবেই। 

কেউ কখনই এই দাবি করতে পারবে না যে কোনো এক সাধু ব্যক্তির আশীর্বাদে এই দেহ চিরকাল জীবিত ছিল এবং জড়জাগতিক বিজ্ঞানের আশীর্বাদে বা যে কোনোভাবেই হোক এই শরীরকে কেউই চিরকাল জীবিত রাখতে সক্ষম নয়। এটি হচ্ছে প্রাথমিক বিষয়, তবে যে দেহ নারদ মুনি লাভ করছেন, তা হচ্ছে দিব্য দেহ। প্রথম গুণটি হচ্ছে তা নিত্য, এর কখনই মৃত্যু হবে না। সেইজন্য এই শরীর অগ্নির মধ্যেও ভ্রমণ করতে সক্ষম, তা সূর্য-চন্দ্র ও সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অথবা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বাইরেও যেতে সক্ষম। এর জন্য নির্দিষ্ট বস্ত্রের প্রয়োজন নেই। বর্তমানে যদি আপনি বহিঃব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করেন, তাহলে আপনার এক মহাকাশে যাওয়ার পোশাক থাকবে। যদি আপনি সেই পোশাক খুলে ফেলেন, তাহলে আপনি শেষ। আপনি এক মুহূর্তের মধ্যে মারা যাবেন। সেই পরিবেশে আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন না, কিন্তু এই দিব্য দেহের অক্সিজেন বা এই সমস্ত কিছুর প্রয়োজনীয়তা নেই। তাই এই দেহ যেকোন স্থানে ভ্রমণ করতে সক্ষম, এটিই হচ্ছে প্রথম গুণ যে নারদ মুনির দিব্য দেহ নিত্য, কিন্তু এই দেহ নিত্য নয়।

একটি লীলা আছে, যা আপনারা হয়ত শুনেছেন যে কিভাবে একবার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কীর্তন করছিলেন এবং শ্রীবাস ঠাকুরের গৃহে থাকাকালীন যখন কীর্তন চলছিল, তখন গৃহাভ্যন্তরে শ্রীবাসের পুত্রের মৃত্যু হয়। সেই সময় শ্রীবাস, তিনি দেখতে এসেছিলেন যে কিসের এত কোলাহল হচ্ছে? সব মহিলারা বিলাপ করতে, ক্রন্দন করতে শুরু করেছিলেন যে পুত্র মারা গিয়েছে। এবং তারা বললেন, “আপনার পুত্র মারা গিয়েছে, তার মৃত্যু হয়েছে।” এবং তারা ক্রন্দন করছিলেন। “আপনার পুত্র মারা গিয়েছে, সে আর নেই…” স্বাভাবিকভাবেই তারা ক্রন্দন করছিলেন, কিন্তু তিনি তাদের সকলকে চুপ করতে বললেন, “তোমাদের কান্না থামাও! কেন তোমরা বিলাপ করছ? পুত্র কীর্তন চলাকালীন মারা গিয়েছে, অর্থাৎ এর অর্থ সে আধ্যাত্মিক দেহ লাভ করবে বা অন্তত খুবই উত্তম গতি প্রাপ্ত হবে। তাই ক্রন্দন করো না, বাইরে কীর্তনে বাধা দিও না।” (ভক্তরা হাসছেন) এরপর, সেইভাবে রাজি করানো যাচ্ছিল না দেখে তিনি তাকে (স্ত্রী) বললেন, “যদি তুমি কান্না না থামাও, তাহলে আমি গঙ্গাতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করব। আমিও মারা যাব! তখন তোমাকে পুত্র ও স্বামী উভয়ের জন্য কান্না করতে হবে।” তাই তারা ভীত হন এবং ক্রন্দন করা থামিয়ে দেন। তারা নীরব ছিলেন। এরপর শ্রীবাস আবার বাইরে যান এবং তিনি সব ভক্তদের সাথে কীর্তনে নৃত্য করছিলেন, যেন কিছুই হয়নি... তিনি সাধারণভাবেই নৃত্য করছিলেন। অবশ্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেকের হৃদয়ে অবস্থান করছেন, তাই তিনি জানতেন যে ভিতরে কি হয়েছে। তিনি কীর্তন করছিলেন, তাতে তিনি বাধা দেননি এবং এটি ছিল এক দিব্য আনন্দপূর্ণ কীর্তন। সকাল পর্যন্ত সারা রাত্রি ব্যাপী এই কীর্তন হয়েছিল। যখন সূর্যোদয় হয়, তখন তারা কীর্তনে বিরাম দেন এবং যখন কীর্তন বন্ধ হল, তখন তারা প্রণাম নিবেদন করছিলেন ও সেই সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করলেন—“আমার মনে হয় শ্রীবাসের গৃহে কিছু হয়েছে, আমি আমার হৃদয়ে কিছু অনুভব করছি যে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। কি হয়েছে?” তখন তারা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাথে কথা বলতে শুরু করেন এবং তারা বললেন, “শ্রীবাসের পুত্র মারা গেছে!”

“কি! সে কখন মারা গেছে?”

“সে গতকাল সন্ধ্যায় কীর্তন চলাকালীন মারা গেছে।”

“কেউ আমাকে তা বলেনি কেন?”

তখন শ্রীবাস বললেন, “আমি তোমার কীর্তনে বাধা দিতে চাইনি।”

তিনি বললেন, “কি! তুমি আমাকে এমন শোচনীয় ঘটনা ঘটেছে তা বললে না? এবং তুমি বললে না এই কারণ যে তুমি আমার কীর্তনে বাধা দিতে চাও নি? এটা কি? কেন আমাকে বলা হয়নি?”

“আমি জানিনা! তোমার কীর্তন চলছিল, আর সে ইতিমধ্যেই মারা গেছে, তাই আমরা তাতে কি করতে পারি? সেই জন্য কীর্তনে শান্তি ভঙ্গ না করাই ছিল উত্তম।”

তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীবাসকে আলিঙ্গন করলেন, “তুমি কেমন ভক্ত? আমি কিভাবে এমন একজন ভক্তকে ছাড়তে পারি! এমন ঘটনা ঘটেছে, তবুও সে এতই অপ্রভাবিত, এতই নিরাসক্ত যে সে কেবল চিন্তা করছে কিভাবে আমাকে খুশি করতে পারবে। সে তার পারিবারিক পরিস্থিতির বিষয়ে কোন চিন্তাই করছে না। তুমি আমার কাছে সেই মৃত দেহ নিয়ে এসো! সেই দেহ কোথায়? শ্রীবাসের পুত্র সন্তান কোথায়?”

তারা সেই শিশু পুত্রকে বাইরে প্রাঙ্গণে নিয়ে এলেন, তখন তিনি শ্রীবাসের পুত্রকে বললেন, “কেন তুমি চলে গিয়েছ? কেন তুমি শ্রীবাসকে ছেড়ে চলে গিয়েছ? এক্ষুনি ফিরে আসো, কথা বলো। কেন তুমি চলে গিয়েছ?”

তখন শ্রীবাসের পুত্র উঠে বসে, দাঁড়িয়ে তার প্রণাম নিবেদন করে কথা বলা শুরু করে। এই দেখে প্রত্যেকে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন! সে মৃত ছিল, তাহলে কিভাবে সে কথা বলতে পারে? সে জীবাত্মার স্তর থেকে, আত্মার স্তর থেকে কথা বলছিল।

সে সেই শরীরে ফিরে এসে কথা বলতে শুরু করল। 

“কেন তুমি তোমার পিতাকে ছেড়ে গিয়েছ?”

সে বলল , “কোন পিতা?” (ভক্তরা হাসছেন)  “আমার কত পিতা ছিল।”

“তোমার পিতা হচ্ছেন শ্রীবাস।”

“অবশ্যই এটি আপনার ইচ্ছা ছিল যে আমি যেন চলে যাই। সেই সময় আপনি আমাকে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন যে এই দেহে আমার সময় অতিক্রম হয়ে গিয়েছে! আমি আপনার ইচ্ছানুসারে এই দেহ ত্যাগ করেছি। এটি আপনার কৃপা যে আমি শ্রীবাস পণ্ডিতের গৃহে জন্মগ্রহণ করতে পেরেছিলাম এবং আপনার সেবা করতে পেরেছিলাম, এত মহান বৈষ্ণবদের সঙ্গ লাভ করতে পেরেছিলাম। তবে আপনার ইচ্ছানুসারেই আমাকে এই দেহ ছাড়তে হয়েছে, তাই আমি কেবল এই প্রার্থনা করছি যে— আপনার কৃপায় আমি যেন সর্বদা শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গ লাভ করতে পারি ও আপনার সেবা করতে পারি।”

এইভাবে সেখানে কথোপকথন চলেছিল, তারপর চৈতন্য মহাপ্রভু চারিদিকে তাকালেন ও দেখলেন যে সবাই খুবই খুশি যে তারা শ্রীবাসের পুত্রকে দেখতে পারছেন, যদিও সে তার দেহ ত্যাগ করেছে। কিন্তু সে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আশ্রয় প্রাপ্ত হয়েছিল, তাই আসলে বিলাপ করার মত কিছুই ছিল না। তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “ঠিক আছে!” আবার শ্রীবাসের পুত্র, পুত্রের শরীর ভূমিতে শায়িত হয়ে পড়ল এবং সে চলে গেল। তিনি দেহটি রক্ষা করেননি। যখন একজন ব্যক্তির সময় অতিক্রান্ত হয়, তাহলে যদি তিনি চায়, তাহলে আপনি তাকে আরো কিছু বছরের জন্য জীবিত রাখতে পারবেন, কিন্তু এর উপকারিতা কি আছে? মূল বিষয় হচ্ছে যে, যখন তারা শরীর ত্যাগ করে, তখন তারা যাতে যথার্থ গন্তব্যে পৌঁছায়। ঠিক যেমন, আপনি একটি ভাড়া বাড়িতে আছেন এবং আপনি একটি উৎখাত পত্র পেয়েছেন যে আপনাকে ১ মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে হবে, তখন আপনি সেই গৃহকর্তার সাথে কথা বলতে পারেন: “দয়া করে আমাকে আরো দুই মাস থাকতে দিন।” তিনি বলবেন, “ঠিক আছে দুই মাস থাকুন।” তাই, সেই গৃহে থাকার জন্য আরো দুই মাস সময় পাওয়া মূল বিষয় নয়, তবে আপনাকে পরবর্তী স্থান পেতে হবে, যেখানে আপনি থাকবেন, কারণ আপনি চাইবেন না যে আপনাকে উচ্ছেদ করে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হোক ও আপনার কাছে যাওয়ার মত অন্যত্র কোন স্থান না থাকুক। আপনাকে কোন একটা বস্তি বা কোথাও না কোথাও থাকতে হবে। আমার পরবর্তী গন্তব্য কোথায়? সেক্ষেত্রে আপনাকে দেখতে হবে সেই স্থান একই রকম বা এর থেকে ভালো নাকি। এইভাবে প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে এই শরীরে থাকার সময় বৃদ্ধি করার প্রতি খুবই উদ্বিগ্ন, কেউই চিন্তা করছে না যে—আমাদেরকে এই শরীর ত্যাগ করতে হবে এবং এরপরে পরবর্তী শরীর কি হবে। আপনাকে আপনার বাসস্থান থেকে উৎখাত করা হলে, আপনি জানতে চাইবেন পরবর্তী কোন বাড়িতে আমি থাকব। তাই কেন মানুষেরা এত মূর্খ যে তারা এটা মনে করে না যে আগে হোক বা পরে আমাকে উচ্ছেদ করা হবেই, তাই এখন পরের বাসস্থান সম্বন্ধে ভাবা যাক। তাই, এটা হচ্ছে তাদের বোকামি যে তারা সবকিছু করছে এই জীবনের জন্য, তারা তাদের বাসস্থানের বন্দোবস্ত করছে, যদিও তারা জানে যে যখন আর ভাড়া থাকবে না, তখন তাদেরকে উৎখাত করা হবে, তারা আর সেখানে থাকতে পারবে না। 

এইভাবে নারদ মুনি সর্বশ্রেষ্ঠ বস্তু লাভ করেছিলেন। সাধারণত যদি কোন ব্যক্তির নিজস্ব বাড়ি থাকে, তাহলে তা ভাড়া থাকার থেকে ভালো। কিন্তু আপনি কোন ভৌতিক শরীরের মালিক হতে পারবেন না। এটি আপনার নয়। এটি জড়াপ্রকৃতি আপনাকে প্রদান করেছেন। এটি জড়াপ্রকৃতির সম্পদ। আপনার প্রকৃতি হচ্ছে আধ্যাত্মিক, তাই আমরা জড় শরীরের মালিক হতে পারি না। আমরা কেবলমাত্র তা ভাড়া করতে পারি। আমরা কেবল সাময়িক কালের জন্য সেই শরীরে বেঁচে থাকতে পারি, কিন্তু তারপর আমাদেরকে তা ত্যাগ করতেই হবে, কারণ এটিই হচ্ছে আমাদের স্বাভাবিক স্থিতি। ঠিক যেমন হংকং, হংকং-এ তারা চিরকালের জন্য সেখানে থাকতে পারে না, কারণ এটি হচ্ছে চীনের সম্পত্তি। সবশেষে আগে হোক বা পরে, তারা সেই সুযোগ ফিরিয়ে নিতে চায়। যদিও প্রত্যেকেই আশা করে যে আরো যেন সময়সীমা বাড়ানো যায়, কিন্তু যদি তারা সেটি চায়, তাহলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে এর ফলস্বরূপ অতি কষ্ট ভোগ করতে হয়, যেমন সেখানে কোন বাস্তবিক সুরক্ষা নেই। যেকোনো সময় সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কোন উন্মাদ ব্যক্তি এসে যা কিছু করতে পারে, তাই তো? এটিই হচ্ছে পরিস্থিতি, কিন্তু আমরা সময়সীমা আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করতে চাই। কিন্তু যদি আপনি এই শরীরকে পরিবর্তিত করতে পারেন, তাহলে আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন। ঠিক যেমন, কোন না কোনভাবে যদিও এটি মূলত চীনের ছিল, কিন্তু তারা এটিকে পরিবর্তিত করে ব্রিটিশ কলনীর অন্তর্ভুক্ত করেছে। সেজন্য সেখানে সবকিছুই চীনের আইন অনুসারে পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে ব্রিটিশ আইনের অধীন। তাই, এরপর জাগতিক মানদণ্ড অনুসারে দেখতে গেলে সবকিছুর এক ভালো পরিস্থিতি হয়েছে। একইভাবে যদি আপনি কৃষ্ণের আনুগত্য লাভের মাধ্যমে আপনার শরীরকে পরিবর্তিত করতে পারেন, তাহলে ঠিক যেমন— চুম্বক, যদি আপনি লোহাকে চুম্বকের উপর রাখেন, তাহলে আপনি সেই লোহা দ্বারা অন্য লোহাকে তুলতে পারবেন, কারণ তখন সেই লোহাটি চুম্বকের সম্প্রসারিত অংশের মতো হয়ে পড়ে। ঠিক একইভাবে, যখন ভক্তিযোগের মাধ্যমে এই শরীরটি কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত হয়, তখন আপনি তৎক্ষণাৎ সমস্ত প্রকারের জাগতিক আইন থেকে ও অন্যান্য যেকোনো আইন যা সাধারণত অন্যান্য দেহকে প্রভাবিত করে, তা থেকে মুক্ত হয়ে পড়েন এবং সরাসরি আধ্যাত্মিকতার দিব্য মুক্ত স্থিতির অধীন হয়ে যান। সেই স্থিতিটি কিরকম? এটি পরবর্তী শ্লোকে উল্লেখ করা আছে। 

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে: জড়া প্রকৃতি থেকে মুক্তি। ভৌতিক শরীর সবসময় রজো গুণ, তমো গুণ, সত্ত্ব গুণের দ্বারা আক্রান্ত হয়। তমো, রজো, সত্ত্ব—এই তিনটি গুণ সবসময় শরীরকে প্রভাবিত করে। সেজন্য কেউই মুক্ত নয়। কখনো কখনো কেউ খুবই দানশীল হয়ে থাকে, অন্যান্যদেরকে সাহায্য করার প্রতি খুবই অনুগ্রহী হয়, সেটা হচ্ছে সত্ত্ব গুণ। কখনো কখনো কোনো ব্যক্তি খুবই লোভ অনুভব করে যে—“আমি আরো অর্থ চাই, আমি আরো উপভোগ করতে চাই, এক্ষুনি আমি এই সবকিছু আমার জন্য চাই।” তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয় ও সেই লাভ অর্জন করার প্রতি অতি আগ্রহী হয়। এটি হচ্ছে রজো গুণ। “আমি অন্য কাউকে কোন কিছু দিতে চাই না, আমি অন্য কাউকে কোন কষ্ট দিতে চাই না, আমার যা কিছু প্রয়োজন আমি শুধু তাই চাই। যতক্ষণ না কেউ আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, ততক্ষণ আমি কোন পরোয়া করি না। তবে আমার এটা চাই!”—এটি হচ্ছে রজো গুণ। তমো গুণ হচ্ছে খুবই ক্রোধযুক্ত, “আমি কোন পরোয়া করি না যে আমি কোন লাভ পাচ্ছি কিনা, তবে আমি কেবল তোমাকে হত্যা করতে চাই।” কখনো কখনো চলচ্চিত্রে তারা তমো গুণকে দেখায়, সে কোন পরোয়া করে না যে সে তার পুরো জীবন হারিয়ে ফেলবে নাকি, কিন্তু আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই। এটা হচ্ছে তমো গুণ, তারা ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোন কিছু চিন্তা করে না যে অন্তিমে তাদের কোন লাভ হবে নাকি। সেই জন্য অবশ্যই এই গুণ কারো ভালোর জন্য নয়। এটি হচ্ছে উন্মাদনা, উন্মত্ততা, ক্রোধ, এইরকম। তাই এই শরীরে আমারা যদি সম্পূর্ণরূপে ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত না হই, তাহলে আমরা তমো, রজো বা সত্ত্ব গুণ অথবা এই তিনের সংমিশ্রিত গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ব। 

আমরা যতটা বেশি ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হই, হরে কৃষ্ণ নাম জপ করি, তখন আমাদের শরীর ততই এই সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়। আমরা মুক্ত হয়ে সেই স্বাভাবিক স্বাধীনতা উপলব্ধি করতে পারি ও এর সাথে আমাদের জীবনে আনন্দ আসে। তাই, এমনকি একজন ব্যক্তি যদি এই সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়, তবুও আরেকটি প্রশ্ন আছে যে—আমরা পূর্বে যে কর্ম করেছি তার কি হবে? সেইসব কর্মফলের কি হবে? ঠিক যেমন, কত প্রাণী হত্যা করা হয়েছে যাতে আমরা তা খেতে পারি অথবা শাস্তি হিসেবে, কখনও কখনও ছোট শিশুরা তারা পোকামাকড়ের দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে দেয়, কখনও কখনও তারা সাপ নিয়ে খেলে, তাদের লেজ টুকরো টুকরো করে দেয়, কখনো কখনো তারা এই সম্পর্কে কোনকিছু না চিন্তা করেই এত নিষ্ঠুর কাজ করে এবং সেই সবকিছুর ফল ভবিষ্যতে পেতে হবে। এটাই হচ্ছে কর্মের আইন, যা থেকে কেউই পলায়ন করতে পারবে না। তাই এমন কি যদিও এখন আমরা ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হয়েছি, কিন্তু পূর্ববর্তী কর্মফল থেকে আমাদেরকে কি রক্ষা করবে? এখন এমনকি আমি প্রভাবিত হই না কিন্তু তবুও যা যা কর্ম আমি করে এসেছি, সেই ফলস্বরূপ আমাকে কষ্ট ভোগ করতে হবে বা আনন্দ উপভোগ করতে হবে। এবং এটিও আমাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তাই এটিও একটি প্রশ্ন। মানুষেরা তা থেকে মুক্ত হয় না, তারা যে কর্ম করেছে তার ফল ভোগ করে।  

প্ৰকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ।
অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে॥ 
(গীতা ৩.২৭)

ভগবদগীতাতে বর্ণিত হয়েছে: “প্ৰকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি”—জড়াপ্রকৃতি সমস্ত কার্য করছে। “গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ”... গুণৈঃ—“প্ৰকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ”— জড়জাগতিক রজো গুণ, তমো গুণ ও সত্ত্ব গুণ এবং বিভিন্ন কর্মের কারণে জড়াপ্রকৃতি প্রত্যেককে ভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেলছেন। এবং মূর্খ জীবাত্মাগণ চিন্তা করছে যে, “আমি সবকিছু করছি!” তারা দেখছে না যে, আপনি কঠোর পরিশ্রম করছেন ও ভালো ফল লাভ করছেন, তা আপনার পূর্বকর্মের জন্য, অথবা আপনি যতই কঠোর পরিশ্রম করুন না কেন, তবুও সবকিছু হারাতে পারেন, সেটিও পূর্ব কর্মের জন্য এবং আপনি কোন কিছু না করেও ভাগ্যবান হতে পারেন এবং আপনি অনেক ফল লাভ করতে পারেন, আপনি হয়ত কোন কাজই করেননি বা হয়ত অল্প কিছু করেছেন, তবু আপনি বিরাট কোনো ফল লাভ করলেন, সেটিও কর্মের কারণে হয়েছে। অথবা আপনি কোন কর্ম করলেন না ও কোন ফল লাভ করলেন না, সেটিও কর্মের কারণে হয়েছে। তাই এই জড়জগতে সবকিছুই কর্ম এবং গুণের কারণে হয়। কোনো ব্যক্তির যদি এমনকি ভালো কর্ম থাকে, তবুও তমো গুণের সংস্পর্শে থাকায় সে তার অর্থ দিয়ে কি করে? সে মধ্যপান করে, জুয়া খেলে এবং অনেক অর্থ অপব্যয় করে। তাকে এর জন্য কোন কিছু প্রমাণ দিতে হয় না। অথবা কোন ব্যক্তির যার ভালো কর্ম আছে, সে সত্ত্ব গুণ বা রজো গুণে থাকলে সেই অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করে। সত্ত্ব গুণে থাকলে সে অন্যদের সাহায্য করার জন্য তা ব্যয় করে, আর ভবিষ্যতে আরো পুণ্য কর্ম লাভ করে। এইভাবেই [পাশে: দরজা বন্ধ করে দাও।] সবকিছু এই জড়জগতে হয়ে চলেছে।

এখানে তৃতীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে: কর্মফল থেকে স্বাধীনতা। এই দিব্য দেহ এই সমস্ত জাগতিক কর্মফল থেকে মুক্ত। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রত্যেকেই তার কর্মের ফল থেকে মুক্ত হতে চায়। আমরা আমাদের জীবনে কত ভুল করেছি, তাই আমরা যদি শুদ্ধ স্তর থেকে সবকিছু শুরু করতে পারতাম, এটি আমাদের প্রয়োজন। আমাদেরকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু তবুও কর্মফল থেকে যায়। সেজন্য এতে এক খুবই কঠিন পরিস্থিতি হয়, আমরা কিভাবে অগ্রগতি লাভ করব? ঠিক যেমন, যোগের বিভিন্ন পন্থা আছে। এক অর্থে বৌদ্ধ পন্থাটি হচ্ছে পরোক্ষভাবে এক ধরনের যোগ-পদ্ধতি। যদিও সাধারণত আমরা এটিকে যোগ বলি না, আমরা তা বৌদ্ধ ধর্ম বলি, কিন্তু এটা হচ্ছে এক ধরনের উপলব্ধির পন্থা। এছাড়াও অবশ্য অন্যান্য পন্থা যেমন যৌগিক পন্থা, ভক্তি যোগের পন্থা, কর্ম যোগ, জ্ঞান যোগ ইত্যাদি আছে। তবে মূলত যৌগিক পন্থা এবং ভক্তি যোগ হচ্ছে দুটি মূল বিভাগ। বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে যেখানে কেউ বৈরাগ্যের অনুশীলন করে এবং এক ধরনের ধ্যান করে। বৌদ্ধ ইতিহাসে এই কাহিনীটি আছে যে কিভাবে এক অসুর ছিল, যার নাম ছিল অঙ্গুলিঅসুর। আমি পুরো বিস্তারিত সব জানি না, কিন্তু একটু কিছু জানি। সে যা করত তা হচ্ছে—সে ছিল এক অসুর এবং সে মানুষদের ছোট-ছোট আঙুলগুলি কেটে নিত এবং তা দিয়ে বড় মালা বানিয়ে নিজের গলায় পড়ত।

ভক্ত: অঙ্গুলি?

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: অঙ্গুলি অসুর, এবং তাই স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষেরা তাকে পছন্দ করত না। যখনই তারা তাকে দেখত, তারা দৌড়ে পালিয়ে যেত, কারণ নাহলে সে তাদেরকে ধরে ফেলবে এবং তাদের আঙ্গুল কেটে ফেলবে ও তার গলায় মালা করে পড়বে…

ভক্ত: অঙ্গুলি-মালা।

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: অঙ্গুলি-মালা, আপনি তার সম্পর্কে শুনেছেন। সে ছিল এক নিষ্ঠুর অসুর। তার সাথে বুদ্ধদেবের সাক্ষাৎ হয়েছিল, তখন সে তাঁর আঙ্গুলগুলি কাটতে চাইছিল, কিন্তু বুদ্ধদেবের সঙ্গ প্রভাবে সে বুঝতে পারছিল যে… এই পুরো জগৎ হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী জগত এবং সে এক খারাপ অবস্থায় আছে। তখন সে নিজে এক ভিক্ষুক, এক সাধু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল এই যে—যদিও সে একজন সাধু হয়েছে, বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছে, কিন্তু সে এই সমস্ত কর্মফল থেকে তৎক্ষণাৎ মুক্ত হয়নি। তার কর্মফল তখনও ছিল। সে এমন কর্ম করা বন্ধ করেছিল কিন্তু তার সাথে মানুষদের আঙুল কেটে ফেলার সেই স্তুপীকৃত পাপ কর্ম প্রতিক্রিয়া তখনও ছিল, যেটা থেকে সে মুক্ত হতে পারছিল না। যখন মানুষেরা তাকে এক সাধুবেশে দেখেছিল, তখনও তাদের হাতে আঙুল ছিল না, সেইজন্য তারা এই বিষয়ে খুশি ছিল না। তারা সবাই তাকে তাড়া করেছিল এবং মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত প্রহার করেছিল। অবশেষে তাকে হত্যা করা হয়। সে যাদেরকে নির্যাতন করেছিল, মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত তাকে তাদের থেকেই প্রহার পেতে হয়েছিল, কারণ যেহেতু সে সেই সমস্ত কর্ম থেকে মুক্ত ছিল না।

অতএব, এটিই হচ্ছে অন্যান্য যোগ পদ্ধতির ক্ষেত্রে অসুবিধা, কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যদি তুমি আমার শরণাগত হও—

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজো।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব— “মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ” (গীতা ১৮.৬৬) আমি তোমাকে মুক্ত করব। তুমি আমার কাছে এসো। এটি আমার প্রতিশ্রুতি। 

ঠিক যেমন মৃগাড়ি কত প্রাণী হত্যা করেছিল। ঠিক তো!! কিন্তু যখন নারদ মুনি, সেই একই নারদ মুনি এসেছিলেন, তখন তিনি মৃগাড়িকে কেবল একজন সাধুতে পরিবর্তিত করেননি, তিনি তাকে  সেই সমস্ত প্রাণীদের হত্যা করার কর্মফল থেকেও মুক্ত করেছিলেন, কারণ তিনি তাকে ভক্তিযোগের শিক্ষা দিয়েছিলেন যে কিভাবে এই সমস্ত কর্মফল থেকে মুক্ত হওয়া যাবে। একইভাবে সেখানে এক বড় দস্যু ও হত্যাকারী ছিল দস্যু রত্নাকর, সে অনেক মানুষকে হত্যা করত ও চুরি করত, এই একই নারদ মুনির সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। নারদ মুনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, কেননা তিনি হচ্ছেন গুরু, ভক্তিযোগের আধ্যাত্মিক গুরু। তিনি ‘নারদ পঞ্চরাত্রিক’ গ্রন্থ লিখেছেন এবং সেখানে শ্রীবিগ্রহ অর্চনের সম্পূর্ণ বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। শ্রীবিগ্রহ অর্চন আমরা নারদ পঞ্চরাত্রিক অনুসারে করি। 

আমরা দুটি পন্থা অনুসরণ করি—একটি হচ্ছে ভাগবত বিধি, যা হচ্ছে হরে কৃষ্ণ নাম জপ করা এবং অন্যান্য মন্ত্র উচ্চারণ করা। ভক্তির ক্ষেত্রে এই দুটি পন্থা আছে, অপরটি হচ্ছে শ্রীবিগ্রহ অর্চন। আমরা উভয়ই অনুশীলন করি। আমরা ভাগবত এবং নারদ পঞ্চরাত্রিক, উভয় পন্থায় অনুসরণ করি। নারদ মুনি প্রদত্ত পন্থাটি হচ্ছে নিয়ম-নীতি বিষয়ক এবং ভগবত পন্থাটি হচ্ছে নৃত্য-কীর্তনের মাধ্যমে শুদ্ধ ভক্তির অভিপ্রকাশ। তাই আমরা উভয়ই অনুশীলন করি, এই উভয় পন্থাই আমাদের সাহায্যের জন্য প্রয়োজন। 

দস্যু রত্নাকরের নারদ মুনির সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল, সেটাই হচ্ছে পুরো কাহিনী যে কিভাবে তিনি তাকে পরিবর্তিত করেছিলেন। অবশ্য আমি পুরো বিষয়টি বলব না, কিন্তু অনেক কিছু আলোচনার পর ও তাকে রাজি করানোর পর, তিনি কর্মফলের ব্যাপারে এই গোপনীয়তা প্রকাশ করেছিলেন।  সংক্ষেপে বলতে গেলে— সে বলেছিল যে সে এমন কি নারদ মুনির থেকেও চুরি করতে চেয়েছিল। নারদ বললেন, “আমি তোমাকে দিতে পারি।” তাঁর কাছে যা ছিল, তা হচ্ছে বীণা। আপনারা জানেন যে নারদ মুনির কাছে বীণা থাকে, তিনি তাকে কেবল সেটিই দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তাকে তা দিতে চাননি।

যাই হোক, তিনি বলেছিলেন—“তুমি যা চাও আমি তোমাকে তাই দেবো। কিন্তু প্রথমে তোমাকে আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যে, তুমি যে এই সবাইকে মেরে ফেলছ বা হত্যা করছ, তা তোমার এই কর্মফল আর কে গ্রহণ করবে? কে তোমার কর্মফল ভাগ করে নেবে? তোমাকে তো এর ফল ভোগ করতেই হবে, তাই কে তোমার ফল ভাগ করে নেবে?”

সে বলল, “আমার স্ত্রী, আমার দিদিমা, আমার মা, আমার বাবা, আমার সন্তানেরা—তারা সবাই ভাগ করে নেবে।”

“তুমি কি নিশ্চিত? তুমি যাও এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করো। এরপর আমাকে বলো যে কে তোমার কর্মফল ভাগ করে নেবে।”

দেখুন প্রযুক্তিগতভাবে কর্মের নিয়ম অনুসারে, যদি স্বামী কোন কিছু করে, তাহলে তার উপর যারা নির্ভরশীল, তারা সরাসরি সেই কর্মফল ভোগ করার প্রতি দায়বদ্ধ নয়, কারণ তারা তার প্রতি নির্ভরশীল। কিভাবে সেই ব্যক্তি তাদেরকে সহায়তা করছে, তাদের ভরণপোষণ করছে, সেটা তার চিন্তার বিষয়। তারা তার প্রতি নির্ভরশীল, তাই এর অর্থ হচ্ছে তারা সেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক নয়। তাই তাদেরকে কিভাবে এর জন্য দায়ী করা যেতে পারে? দেখুন যদি কোন এক শিশু থাকে, সেক্ষেত্রে তার বাবা চাকরি করুক বা চোর হোক, যাই হোক না কেন সেই শিশু তার বাবাকে চোর হতে বলেনি, সে তার প্রতি নির্ভরশীল, সেজন্য এটিই হচ্ছে কর্মের আইন। তখন সে ফিরে গিয়ে  তার বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করে, “তোমরা কি আমার কর্ম নেবে?”

তারা বলল, “শোনো, আমরা চেয়েছিলাম তুমি ডাক্তার বা আইনজীবী বা এমন কেউ হবে। (হাস্য) যাইহোক, তুমি এরকম হয়েছ, তাতে আমরা কি করতে পারি? আমরা তোমাকে প্রশিক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু…” তারা সেই স্থান-কাল অনুসারে সঠিক বলেছিল যে, “আমরা তোমাকে প্রশিক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তুমি চোর হয়েছ, তাতে আমরা কি করতে পারি? এখন আমরা বয়স্ক ও কর্মাক্ষম। তাই এখন তোমার পাপ কর্মভার আমাদের উপর আরোপ করো না, কারণ যখন আমাদের মৃত্যু হবে, তাহলে তখন আমাদেরকে কষ্ট ভোগ করতে হবে। যাইহোক,  আমরা এই কর্মের ভাগ নিতে পারব না।”

তারপর সে তার সন্তানদের জিজ্ঞেস করল, তারাও তা গ্রহণ করবে না—“আমরা হচ্ছি ছোট শিশু, তুমি আমাদেরকে এই জগতে এনেছ। তাই আমাদের উপর এই সমস্ত বোঝা চাপিয়ে দিও না। আমরা এক নতুন জীবন শুরু করছি, তাই আমাদের উপর এই সমস্ত কর্মফল আরোপিত করো না।” এইভাবে তারা প্রত্যাখ্যান করে।

এরপর সে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি আমার জীবনসঙ্গী, তাই তোমার আমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে আমি তোমার জন্য কত কিছু করছি, সবকিছু দিচ্ছি, সেজন্য তোমার এই ভাগ গ্রহণ করা উচিত।”

সে বলল, “তুমি কি বলতে চাইছ? কতদিন হয়ে গেছে আমার কাছে কোন নতুন বস্ত্র নেই, তুমি আমাকে কখনো বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাও না, আমরা সবসময় লুকিয়ে থাকি এবং তোমার মনে হয় আমি এই ধরনের জীবন পছন্দ করি? আমি কেনই-বা তোমার কর্মফলের ভাগ গ্রহণ করব? কারণ আমি ইতিমধ্যেই তোমার বস্ত্র ধুয়ে দিই, তোমার জন্য সব কিছু করছি, সন্তানদের বড় করছি, আর এখন তুমি চাও আমি যেন তোমার এইসব হত্যার পাপ ফল গ্রহণ করি?”

তখন তার বুদ্ধি ফেরে। অবশ্যই সে হতবাক হয়ে পড়েছিল! তারপর সে নারদ মুনির কাছে ফিরে যায় এবং বলে, “কেউ কোন কর্মের ভাগ গ্রহণ করবে না। কেউই আমার প্রতি কৃতজ্ঞ নয়। তারা সবাই অর্থ গ্রহণ করেছে, কিন্তু আমার কর্মের ভাগ গ্রহণ করছে না।” তখন নারদ মুনি তাকে হরে কৃষ্ণ নামজপ করার পন্থা প্রদান করেন। তিনি তাকে মন্ত্র দিয়ে বলেছিলেন, “তোমার ভগবানের নাম জপ করা উচিত।”

সে বলল, “না আপনি যা কিছু বলছেন আমি তা উচ্চারণ করতে পারবো না। আমি হিংসা ও হত্যা সম্বন্ধীয় কোন বিষয় ছাড়া অন্য কোন কিছু বলতে পারিনা  এবং আমি এই ধরনের কোন পবিত্র শব্দ উচ্চারণ করতে পারি না।” সে এমনকি ভগবান উচ্চারণ করতেও সক্ষম ছিল না। সে এমন কোনকিছুই বলতে পারত না, সে এই ধারণার বিরোধী ছিল, সে ভগবান বা কৃষ্ণ বা এমন কোনকিছু বলতে পারত না।

তখন নারদ মুনি তাকে বললেন, “তুমি কি এই শব্দটি বলতে পারো—‘মরা’ ‘মরা’?”

“ও হ্যাঁ! আমি সহজেই ‘মরা’ উচ্চারণ করতে পারি।”

“তাহলে তুমি ‘মরা’ ‘মরা’ ‘মরা’—উচ্চারণ করো, এটি সংস্কৃত। এটিই হচ্ছে আমার তোমার প্রতি প্রদত্ত মন্ত্র, তুমি ‘মরা’ ‘মরা’ ‘মরা’ জপ করতে থাকো।”

তখন, সে বলল, “হ্যাঁ, এই শব্দ আমি খুবই উৎসাহের সাথে জপ করতে পারব।” (সবাই হাসছে) ‘মরা’ ‘মরা’ ‘মরা’ কিন্তু সে উচ্চারণ করছে—‘মরা’ ‘মরা’ আর নারদ মুনি এতই চতুর যে, তিনি এমন অক্ষর বিন্যাস তাকে প্রদান করেছেন যে, তা যখন এক ধারায় উচ্চারণ করা হবে, তখন প্রথম ‘ম’ উচ্চারণের পর এটা উচ্চারিত হবে ‘রা-ম রা-ম রা-ম রা-ম রা-ম রা-ম’, তাই সে ‘রাম’ নাম উচ্চারণ করছিল।

এমনকি যদিও সে এই চিন্তা করে উচ্চারণ করছিল যে “মরা! মরা! মরা!” কিন্তু সেই শব্দতরঙ্গ বের হচ্ছিল—“রাম! রাম! রাম! রাম! রাম!” এইভাবে সে সেই সমস্ত কর্মফল থেকে মুক্ত হয়েছিল। এটিই হচ্ছে কৃষ্ণ নামের শক্তি, এটি এক বিশাল গোপনীয়তা, আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে তা মানুষদের বলি না যে নাম কত শক্তিশালী। মানুষেরা হয়ত তা বিশ্বাস করবে না বা তারা হয়ত অপরাধজনক কোন কিছু বলতে পারে, তাই আমরা প্রারম্ভিক পর্যায়ে নাম জপের সমস্ত গোপনীয়তা তাদেরকে বলি না। আমরা কেবল তাদেরকে এটা বলি যে আপনি সুস্বাস্থ্যবান ও আনন্দিত থাকবেন। যাইহোক, কিন্তু আসল গোপনীয়তা হচ্ছে যে তা তাদেরকে জড়াপ্রকৃতির এই সমস্ত গুণের প্রভাব থেকে ও কর্মবন্ধনের প্রভাব থেকে মুক্ত করবে। এটি তাদেরকে আধ্যাত্মিক শরীরে উন্নীত করবে, বিশেষত কেউ যখন আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি আত্মসমর্পণ করে এবং অপরাধমুক্তভাবে নাম জপ করে, তখন নাম জপের পূর্ণপ্রভাব প্রকাশিত হবে। 

তাই এটি অনুধাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে কিভাবে জড়জাগতিক দেহ আধ্যাত্মিক দেহ থেকে ভিন্ন। আরেকটি বিষয় যা শ্রীল প্রভুপাদ এখানে উল্লেখ করেছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে—ব্যক্তি অপ্রভাবিত হন, জাগতিক অনুরক্তি থেকে মুক্ত হয়ে যান। জাগতিক অনুরক্তি হচ্ছে এমন এক বিষয় যা আমরা পছন্দ করি। এটাই হচ্ছে এমন কিছু যার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আমরা আসক্ত। আপনি এই জগতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং আপনার মা-বাবা আপনার যত্ন গ্রহণ করেন। এইভাবে তাদের প্রতি আপনি আসক্ত হয়ে পড়েন, কারণ এটি এক অত্যন্ত অন্তরঙ্গ সম্বন্ধ, যেহেতু তারা আপনার ভরণপোষণ করছেন, আপনার যত্ন গ্রহণ করছেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক দেহভিত্তিক। আমাদের এই জড় শরীর আছে, এটি এই শরীর ভিত্তিক, কিন্তু আমরা সেই বিষয়টি চিন্তা করছি না। 

ঠিক যেমন শ্রীবাস, তাঁর পুত্র বলছিল, পূর্ব জীবনের কি হবে? তার মাতা এবং পিতা ছিল। এই জীবনেও আমাদের মা-বাবা আছে। আমাদের মৃত্যুর পর আমরা নতুন দেহ পাই, নতুন মাতা-পিতা  পাই। তাই এই জড় অনুরক্তি হচ্ছে এক ধরনের বন্ধন, এটি হচ্ছে আরেক ধরনের ভ্রম। এই অনুরক্তির কারণে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি না। এইভাবে এই সমস্ত সম্বন্ধের কারণে আমরা নিজেদেরকে আরও অধিক থেকে অধিকতর উদ্বিগ্নতা এবং সমস্যার মধ্যে ফেলি। ঠিক যেমন যদি আমাদের এক শিশু সন্তান থাকে। এখন যদি সেই শিশু অসুস্থ হয়, তাহলে মা-বাবা খুবই দুঃখিত হয়ে পড়ে। কারণ সেই সম্পর্ক এতই ঘনিষ্ঠ। এমনকি যদি আপনি কৃষ্ণভাবনাময় হন, তাহলে সেক্ষেত্রেও আপনার শিশু যখন অসুস্থ, তখন দুঃখ অনুভব না করা কঠিন। অন্তত আপনি সেটিকে পরিবর্তিত করতে পারেন যে, “আমি আমার সন্তানকে ভগবত চেতনাময়, কৃষ্ণ চেতনাময় হওয়ার জন্য বড় করে তুলছি। তাই আমাকে আমার সন্তানের যত্ন গ্রহণ করতেই হবে।” তখন সন্তানের প্রতি যে স্বাভাবিক প্রেম আছে, তা পরোক্ষভাবে কৃষ্ণের প্রতি নিবেদিত হয়ে যায়, অথবা প্রত্যক্ষভাবে সেই শিশু কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার প্রশিক্ষণ লাভ করছে, তবু কখনো কখনো এমন অনুভব থাকে। এমনকি সত্যি অনেক উন্নত যোগীদের মধ্যেও তা দেখা যায়, তাহলে বিষয়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে আর কি বলার আছে? যদি তাদের সন্তান বিপদে থাকে, তাহলে তারা অত্যন্ত কষ্টে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। 

এমনকি এক গাভী যদি তার বাছুরকে হারায়, তাহলে সে ক্রন্দন করতে থাকে, তার অশ্রু বের হয়। তাই এমন নয় যে এটি কেবল মনুষ্য গুণ। এমনকি গাভীও বাছুরকে হারালে সে উন্মাদের মতো ক্রন্দন করে। তাই কখনো কখনো ভারতে তারা যা করে তা হচ্ছে—কোন গাভী বাছুরকে হারালে সে দুধ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। গাভীরা একটু মূর্খ হয়, তারা জানে না শরীর এবং আত্মার মধ্যে কি পার্থক্য আছে। তাই তারা এটি করে যে— তারা সেই বাছুরকে নিয়ে যায়, তার চামড়া খুলে নেয়, ও এর মধ্যে খড় ভর্তি করে গাভীর সামনে রেখে দেয় এবং মা বাছুরের চামড়া লেহন করে, এমন কি যদিও সে মৃত আর সেখানে শুধু তার শরীরের চামড়া আছে, তবু তারা একটু মূর্খ যে তারা মনে করে আমার বাছুর এখনও জীবিত আছে। আমার বাছুর এখনও আছে। মানুষেরা জানে যে জীবিত দেহ এবং মৃতদেহের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু গাভীরা সেই পার্থক্য ভালোভাবে জানে না। মানুষেরা এটি চিন্তা করে যে ঠিক আছে, এটি জীবিত শরীর এবং এটি মৃত শরীর! কিন্তু এর মধ্যে পার্থক্য কি তারা তা জানে না। তারা জানে যে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে, সেইটুকু বুদ্ধিমত্তা আমাদের মধ্যে আছে, কিন্তু সেই পার্থক্য কি, তা আমরা জানিনা। আমাদের কত বড় বড় জেট আছে, বড় বড় নির্মাণ আছে, ওয়াকম্যান্স (টেপ রেকর্ডার) আছে, আমাদের সবকিছু আছে, ঠিক তো? কিন্তু আমরা জানি না জীবিত শরীর এবং মৃত শরীরের মধ্যে পার্থক্য কি। আমরা জানি যে পার্থক্য আছে, আমরা মনে করি যে আমাদের অবস্থা গাভীর থেকে উন্নত, কিন্তু কি পার্থক্য আছে তা আমরা জানিনা। এই জড়জগতে এখান থেকেই ভক্তিযোগ বা কৃষ্ণভাবনামৃতের জ্ঞান আসে। 

জীবিত দেহ এবং মৃতদেহের মধ্যে পার্থক্য কি? পার্থক্যটি হচ্ছে আত্মা সেই শরীরের মধ্যে নেই। আমরা হচ্ছি আত্মা। যখন আমরা নিজেকে এইরূপে শনাক্ত করি যে—“আমি এই দেহ নই, আমি আত্মা।” তখন তৎক্ষণাৎ আমরা উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্ত হই। যখনই আমরা নিজেদেরকে শরীর দ্বারা সনাক্ত করি যে আমাদের কত বিভিন্ন জনের সাথে সম্পর্ক আছে, তখন সেই সমস্ত অনুরাগ উদ্বিগ্নতা এবং দুঃখ নিয়ে আসে। সেইসব কিছু এমন মনবাসনা নিয়ে আসে, যা কখনও পূর্ণ হওয়ার নয়। যখনই আমরা এটি উপলব্ধি করি যে এই শরীর হচ্ছে একটি যন্ত্র, এটি হচ্ছে স্বচালিত যানবাহন, কেউই গাড়ির চালককে ক্ষুধার্ত রেখে অনেক বেশি অর্থ কেবল এই স্বচালিত যানবাহন পিছনে ব্যয় করবে না। প্রথমে তিনি নিজেকে আহার করাবেন, তার নিজস্ব বাসস্থান থাকবে, এরপর তিনি সেই স্বচালিত যানবাহন পিছনে অর্থ ব্যয় করবেন। এগুলি হচ্ছে অগ্রাধিকার! কখনোই একজন ব্যক্তি তার গাড়িতে পেট্রোল ভরবে ও দিনের পর দিন না খেয়ে ক্ষুধার্ত থেকে মারা যাবে না। কেউই তেমন কাজ করবে না, কিন্তু কেবল আমরা তা করছি। আমরা সবকিছু আমাদের শরীরকে দিচ্ছি, কিন্তু আসলে এই ভৌতিক জীবনে আধ্যাত্মিকভাবে আমরা মৃত। এটাই হচ্ছে প্রকৃতি। আমরা জানি না কিভাবে সন্তুষ্ট হতে হয়। তারা এই শরীরকে সুসজ্জিত করার জন্য, তা পরিষ্কার রাখার জন্য, তা দ্বারা বিষয় ভোগ করার জন্য কত কঠোর পরিশ্রম করছে, কিন্তু তবুও তারা সন্তুষ্ট নয়, কারণ গাড়ির চালক ক্ষুধার্ত, আত্মা ক্ষুধার্ত। আমাদের আত্মা এবং শরীরের মধ্যে পার্থক্য জানা উচিত এবং আসলে আমাদের নিত্য কালের জন্য এই জড় শরীরের প্রয়োজনীয়তা নেই। আমরা এই জড় শরীরকে ব্যবহার করতে পারি সেই লক্ষ্য অর্জন করার জন্য, যেমনটি নারদ মুনি করেছিলেন, তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক শরীর লাভ করেছিলেন। 

আরেকটি লীলা আছে, পরিসমাপ্তিতে বলছি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তিনি ভৌতিক দেহ ধারণ করে অবতীর্ণ হননি, তাঁর স্বরূপ ছিল দিব্য স্বরূপ। একইভাবে, তিনি তার পার্ষদবর্গ সহ আগমন করেছিলেন, ঠিক যেমন শ্রীবাস ও অন্যান্য পার্ষদবর্গ-এর মধ্যে—কেউ কেউ ছিলেন নিত্য মুক্ত জীবাত্মা, যারা তাদের আধ্যাত্মিক শরীর নিয়েই অবতীর্ণ হয়েছিলেন, আর কেউ কেউ ছিলেন জড়জাগতিক ব্যক্তি, যারা ভক্তিমূলক সেবার দ্বারা তাদের দেহকে আধ্যাত্মিক করেছিলেন। এই দুই রকমভেদ সেখানে ছিল। তাই শ্রীবাস হচ্ছেন আসলে নারদ মুনি, যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে সহায়তা করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর এই স্বরূপ, তাঁর এই শরীরও সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক স্বরূপ হিসেবে গৃহীত।

একসময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেককে বলেছিলেন যে, “আমি নৃত্য করব! আমরা একটি নাটক করব। লক্ষী দেবী, রুক্মিণী দেবী এবং শ্রী কৃষ্ণের। আমরা এই লীলানাটক করব।” তিনি তাঁর একজন ভক্তকে সমস্ত বস্ত্র এবং অন্যান্য সবকিছুর ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন যে, আমি আগামীকাল লক্ষ্মী হয়ে নৃত্য করব শ্রীকৃষ্ণকে আকৃষ্ট করার জন্য।” তখন প্রত্যেকেই ভাবছেন, “ওহ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু লক্ষ্মী দেবী হয়ে নৃত্য করবেন? অসাধারণ!! এটি তো অভাবনীয় বিষয়!” তিনি বলেছিলেন, “প্রত্যেকেই সেখানে আসতে পারে তবে কেবল যাদের এখনও জড়জাগতিক অনুরক্তি রয়েছে, তারা বাদে। তাদের তা দর্শন করা উচিত নয়।” তখন প্রত্যেকেই খুবই দুঃখিত হয়ে পড়েছিলেন, অবশ্য এক্ষেত্রে কেউই কিছু বলতে পারেনা, কিন্তু প্রত্যেকেই জানতেন যে অন্যরা কি চিন্তা করছেন। তাই তখন অদ্বৈত আচার্য ও শ্রীবাস কথা বললেন, “চৈতন্য মহাপ্রভু, আমরা অন্যান্যদের বিষয়ে জানিনা, কিন্তু আমরা জড়জাগতিক আসক্তি থেকে এখনও মুক্ত নই। তাহলে কি আমরা দর্শন করতে পারব না?” তারা সেই পদ গ্রহণ করেছিলেন, আসলে তারাই হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তিবর্গ যারা মুক্ত, কিন্তু তারা বদ্ধ জীবাত্মাদের পক্ষ হয়ে কথা বলছিলেন যে—“আমরা জড়জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্ত নই, তাহলে আমরা কি আপনার নৃত্য দেখতে পারব না? আমরা সেই পর্যায়ের নই।” তারা দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সেই পদ গ্রহণ করেছিলেন। তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “ঠিক আছে, আমার বিশেষ কৃপায় আগামীকাল সব ভক্তরা জড় অনুরক্তি, জড় আসক্তি থেকে মুক্ত হবে, যাতে যখন তোমরা এই নৃত্য দর্শন করবে, তখন তোমরা মায়ার দ্বারা বিভ্রান্ত হবে না।”

পরের দিন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রুক্মিণী দেবী, লক্ষী দেবীর মতো শৃঙ্গার করেছিলেন। তিনি শ্রীবাসকে বললেন—“তুমি নারদ মুনির মতো সজ্জিত হও।” অবশ্যই তিনিই নারদ মুনি, আসলে তাকে কোন পদ গ্রহণ করতে হয়নি। কিন্তু চৈতন্য মহাপ্রভুর এই কৌশল ছিল সবাইকে এটি দেখানো যে আসলে শ্রীবাস কে!

এরপর পরের দিন গদাধর রমা রূপে সজ্জিত হয়েছিলেন, যিনি হচ্ছেন অন্যান্য লক্ষ্মী স্বরূপের একটি বিস্তার এবং শ্রীবাস নারদ মুনি রূপে সজ্জিত হয়েছিলেন। তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর যৌগিক বলে সবাইকে সেখানে এনেছিলেন, যদিও তারা বেশ ধারণ করেছিলেন, তবে অন্যান্য ভক্তরা তাদেরকে কোন পরিচ্ছদ ছাড়া দর্শন করতে পারছিলেন, তারা সেইসব ব্যক্তিত্বের প্রকৃত স্বরূপ দর্শন করতে পারছিলেন। যখন শচীমাতা শ্রীবাসকে দেখলেন, তখন তিনি আসলে নারদ মুনিকে দর্শন করছিলেন। তিনি স্নেহবশত হতবাক হয়ে পড়েন ও আনন্দে মূর্ছিত হয়ে পড়েন। এইভাবে কত দিব্য লীলা সংঘটিত হয়েছিল এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন নৃত্য করছিলেন, তখন আরো কত জন লক্ষ্মী হিসেবে সুসজ্জিত ছিলেন, কিন্তু কেউই বলতে পারছিলেন না যে কোন জন  চৈতন্য মহাপ্রভু। সব লক্ষীগণ ছিলেন, আর নারদ মুনির ক্ষেত্রেও কেউই তাঁকে চিনতে পারছিলেন না। এমনকি শচীমাতাও বলতে পারছিলেন না যে কোন জন চৈতন্য মহাপ্রভু। তাঁরা সকলেই তাঁদের আধ্যাত্মিক স্বরূপ গ্রহণ করেছিলেন।

এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন যে— “কেন নারদ মুনি অবতীর্ণ হয়েছেন?” কারণ তিনি আধ্যাত্মিক জগতে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করতে গিয়েছিলেন এবং যখন তিনি সেখানে যান, তিনি দেখলেন যে সমগ্র আধ্যাত্মিক জগত জনশূন্য। শ্রীকৃষ্ণের ভবন ও সর্বস্থান জনশূন্য। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রত্যেকে কোথায় গেছে?” জানতে পারলেন তাঁরা সবাই নবদ্বীপে চলে এসেছেন, কারণ তাঁরা শুনেছেন যে শ্রীকৃষ্ণ লক্ষীদেবী রূপে নৃত্য করবেন। (সবাই হাসছে) তাই তখন তিনি এটি দেখার জন্য নিন্মে এসেছিলেন। 

ভক্ত: তিনি এসেছিলেন!

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এইভাবে কত লীলা হয়েছিল, কত দিব্য আনন্দ ছিল। তিনি হচ্ছেন নারদ মুনির প্রকৃত স্বরূপ। তিনি কেবল এক দাসীর শিশু পুত্ররূপে কাজ করেছিলেন—পাত্র ধোয়া ও অন্যান্য ভৃত্য কর্মে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন এক দাসীর পুত্র, সেই দাসীর সর্প দংশনে মৃত্যু হয়েছিল। তিনি মহান ভক্তদের গৃহে দাসী ছিলেন, সেজন্য তিনি সেই সব মহান ভক্তদের মহাপ্রসাদ গ্রহণ করতেন। কত যে পবিত্র ভক্তরা রয়েছেন, তা আমাদের কোন ধারনা নেই। যদিও আমরা মনে করি যে তারা ভৌতিক দেহে রয়েছেন, কিন্তু তবুও যেহেতু তারা তাদের দেহকে কেবল কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহার করছেন, তাই তাদের শরীর পবিত্র হয়ে গেছে। ঠিক যেমন চুম্বকিত হওয়া, তা দিব্য হয়ে গেছে। যদিও তা দেখে জড়জাগতিক দেহ বলে মনে হচ্ছে, কখনো কখনো এমনকি তা বৃদ্ধ বা তরুণ এর মত দেখতে মনে হতে পারে বা হয়ত অসুস্থ বা সুস্বাস্থ্য অথবা কৃশ বা স্থূলকায় অথবা শক্তিশালী বা দুর্বল বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এই সবকিছু হচ্ছে বাহ্যিক বিষয়, এর সাথে তার কোন সম্বন্ধ নেই। যেহেতু দেহ ইতিমধ্যেই কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত, তাই এমনকি যদিও দেখতে মনে হতে পারে যে এটি একটি ভৌতিক শরীর, কিন্তু এটি চুম্বকিত হয়ে গেছে, তা দিব্য হয়ে গেছে। সেজন্য সেটি শুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত। ঠিক যেমন গঙ্গাকে সবথেকে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু বর্ষা ঋতুতে তাতে কত বুদবুদ দেখা যায়, কখনো কখনো বন্যা হওয়ার কারণে নদীতে কর্দম মিশ্রিত হয়, কিন্তু তবুও একজন আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত ব্যাক্তি পবিত্র গঙ্গা নদীতে স্নান করেন। তিনি এটি চিন্তা করেন না যে এখন শীতকাল বা গ্রীষ্মকাল বা বর্ষাকাল। একইভাবে, ভক্তের দেহ, একজন ভক্ত যিনি শুদ্ধভাবে পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত, সেই শরীর সবসময় আধ্যাত্মিক। সেজন্য ভক্তদের ইতিমধ্যেই ভক্তিমূলক সেবার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গ লাভ করার দ্বারা আধ্যাত্মিক শরীর আছে। তাই আমরা ভক্তদের শ্রদ্ধা করি এবং আমরা তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করি ও তাদেরকে প্রণতি জ্ঞাপন করি। আমরা তাঁদের শ্রীচরণ স্পর্শ করি, এইভাবে আমরা বিশেষ পারমার্থিক কৃপা প্রাপ্ত হই যা আমাদেরকে আধ্যাত্মিক পথে অগ্রগতিতে সাহায্য করে। 

আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা আমরা জানতে পারি। আসলে এই শ্লোকটির উপর আমরা মাসের পর মাস বলে যেতে পারি, কারণ এর মধ্যে আমাদের জন্য এত বেশি আধ্যাত্মিক নির্দেশ আছে, কিন্তু মাত্র কিছু বিষয় আমি এখানে বর্ণনা করছি। আজকে বিশেষত আমরা এই সবকিছুর সারাংশ হিসেবে বলতে পারি যে—সবকিছুই হচ্ছে পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অহৈতুকি কৃপা যে তিনি আমাদেরকে তাঁর প্রতি পূর্ণরূপে আকৃষ্ট, আসক্ত হতে দিচ্ছেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ হতে দিচ্ছেন, যা হচ্ছে এই জগতের সাময়িক আকর্ষণ যা দীর্ঘকালে আমাদের জীবনে কেবল দুঃখের কারণ হয়, তার টিকাকরণ। এটি হচ্ছে বিশেষ কৃপা যে এমন কি যদিও আমরা জাগতিক চেতনায় আছি, কিন্তু তিনি আমাদেরকে আকৃষ্ট করছেন। তিনি আমাদেরকে আধ্যাত্মিক জীবনের আনন্দ আস্বাদন করতে অনুমোদন করছেন। তিনি আমাদেরকে এই জড় জগতের দুঃখ দুর্দশা থেকে এবং যে সমস্ত আসক্তি ভবিষ্যতে আমাদের কষ্টের কারণ হবে, তা থেকে মুক্ত করছেন। এটি হচ্ছে তাঁর বিশেষ কৃপা। সেজন্য আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সর্বদা আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি, যাঁর কৃপায় আমরা তাঁর আধ্যাত্মিক স্বরূপের প্রতি আসক্ত ও আকৃষ্ট হচ্ছি এবং জাগতিক দুঃখময় জীবন থেকে মুক্ত হতে পারছি।

 হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
 হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

কোন প্রশ্ন আছে? হ্যাঁ!

ভক্ত: কেউ হয়ত এটি চিন্তা করতে পারে যে—“ঠিক আছে, এগুলো শুনতে ভালো লাগছে, কিন্তু আসলে অনেক এমন বিষয় আছে যা প্রাথমিক এবং হয়ত পরে যখন আমার পরিস্থিতি ভালো থাকবে, তখন এই পন্থাটি গ্রহণ করা উচিত।” কেউ হয়ত এমন চিন্তা করতে পারে, এটা কি ভালো পরিকল্পনা যে প্রথমে কেবল নিজের জাগতিক বাধাগুলিতে নজর দেই, পরিবার ও অন্যান্য বিষয়ের খেয়াল রাখি ও পরে এই যোগ পদ্ধতি গ্রহণ করব?

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: মূল বিষয় হচ্ছে যে, ধারণাগতভাবে সেই ব্যক্তির কাছে কতটা সময় আছে সেটির উপর পুরো ব্যাপার নির্ভর করছে। ঠিক যেমন, যখন আমি এখানে ৬ মাস আগে এসেছিলাম, তখন হংকং-এ ডলারের মূল্য খুব বেশি ছিল। কিন্তু তারপর ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বেজিং এ যান [আমি জানি না বেজিং না বেকিং, যাই হোক] তারা এমন অনেক কিছু বলেছিল যে, চীনের সরকার তাদের অনেক কিছু বলেছিল যে, আমাদেরকে হয়ত পুরোপুরি উৎখাত করা হবে বা এটি করা হবে, সেটি করা হবে.. কোন না কোন কারনে তারা বল প্রয়োগ করছিল। এখন হংকং ডলার উপপস্… (হাঁপিয়েছেন) যেমন প্রত্যেকেই অর্থ অন্য কোন জায়গায় নিতে চাইছে, যেখানে তা সুরক্ষিত। তারা ভীত যে, “যদি তারা আমাদেরকে তাড়িয়ে দেয়, তাহলে কি হবে?  আমাদেরকে নিজেদের অর্থ অন্য কোথাও রাখতে হবে, যেখানে থাকলে কোন হানি হবে না, তা সুরক্ষিত থাকবে।” কারণ তারা চিন্তা করছিল যে হয়ত দীর্ঘদিন তারা এখানে থাকতে পারবে না, তবে আগে তারা চিন্তা করছিল যে সেখানে থাকার সময়সীমা বাড়ানো যাবে, কোন সমস্যা নেই, তাই তারা চিন্তিত ছিল না। কিন্তু এরপর তারা ভীত হয়েছিল যে—“যদি আমাদের কাছে তেমন সময় না থাকে, তাই আগেই কোন ব্যবস্থা করে রাখা ভালো।” এটিও হচ্ছে সেরকমই যে মানুষেরা চিন্তা করছে, “আমি এখন তরুণ, সেজন্য এখন আমার জাগতিক বিষয়ে যত্ন নেওয়া উচিত ও যখন আমি বৃদ্ধ হব, তখন আমি আমার আধ্যাত্মিক বিষয়ে যত্ন গ্রহণ করব।”

এক্ষেত্রে দুটি সমস্যা আছে, একটি সমস্যা হচ্ছে যে আমরা জানি না আমরা কতদিন বেঁচে থাকব। অবশ্য সাধারণত আমরা বার্ধক্য পর্যন্ত জীবিত থাকি, কিন্তু এমন নয় যে প্রত্যেকেই বার্ধক্য পর্যন্ত জীবিত থাকে। আমার কাছে অকাল মৃত্যু হওয়া ব্যক্তিদের শতাংশ হিসেব নেই, কিন্তু অন্তত বলতে গেলে ২৫ শতাংশের হয়ত এইভাবে মৃত্যু হয়। আসলে আমি সঠিক শতাংশ হার জানিনা, কিন্তু বেশ ভালো শতাংশ জনসংখ্যা আছে, সামান্যতম সংখ্যক নয়, বেশ ভালো মাত্রায় মানুষদের তরুণ বয়সে মৃত্যু হয়। তাই এই বিপদ সবসময় আছে যে হয়ত হঠাৎ করেই আমাদেরকে এই দেহ থেকে উৎখাত করা হবে। তখন আমাদের আর কোন আশা নেই! তাই আমাদের এমনকি এক্ষুনি কোন ব্যবস্থা করা উচিত। ঠিক যেমন ব্যাংকে অর্থ জমা করে রাখা হয়। এখন বিদেশের অন্যান্য অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যদি তা না করা হয়, তাহলে বুঝতেই পারছেন! হংকং হয়ত পরবর্তীতে কোন চুক্তি করতে পারে এবং কিছু সময়ের জন্য এখানে থাকতে পারে, এই বিষয়টি নিশ্চিত নয়, কিন্তু এটা সুনিশ্চিত যে আমাদেরকে নিশ্চিতরূপে এই শরীর ছাড়তেই হবে। আমি বলতে চাইছি, এটা নিশ্চিত ব্যাপার যে আগে হোক বা পরে এটি হবেই। সেজন্য এটি হচ্ছে এক সমস্যা যে তা কখন হবে সেটা আমরা জানিনা। অন্য সমস্যাটি হচ্ছে যে, এমনকি বলা যাক আমরা বৃদ্ধ বয়স বেঁচে থাকব পর্যন্ত কিন্তু আধ্যাত্মিক অনুশীলন এমন কিছু নয় যা আকস্মিকভাবেই সম্পাদন করা যাবে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা এটি অনুশীলন করছি, কিন্তু এমন নয় যে তা সহসা হয়ে যাবে। যদি কেউ তৎক্ষণাৎ তা অনুশীলন করতে পারে, তাহলে এটিও এক বিরাট সৌভাগ্য। এর অর্থ সেই ব্যক্তির উপর বিশাল আধ্যাত্মিক কৃপা আছে। 

প্রহ্লাদ মহারাজ এই উদাহরণ দিয়েছিলেন, যখন তাঁর বালক বন্ধুগণ তাকে এই একই কথা বলেছিল যে, “আমরা নাম জপ করতে চাই না, আমরা যোগ পদ্ধতি অনুশীলন করতে চাই না, আমরা এখন খেলা খেলতে চাই। আমরা ছোট বালক। যখন আমরা বৃদ্ধ হব, তখন আমরা এটি করব।” তিনি তাদেরকে বলেছিলেন যে—“পরবর্তী ১০ বছর তোমরা বালক হয়ে এমন খেলাধুলা করবে, তারপর তোমরা তোমাদের পাঠশালার কার্যক্রমে ও অন্যান্য খেলাধুলায় ব্যস্ত হয়ে যাবে। এরপর তোমরা পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করবে, তোমাদের সন্তান হবে, তোমরা তোমাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য, সন্তানদের বড় করে তোলার জন্য অর্থ উপার্জন করতে কঠোর পরিশ্রম করবে। এইভাবে তোমরা পারিবারিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, তারপর বার্ধক্যে তোমরা দুর্বল ও রোগগ্রস্থ হবে, তখন তোমাদের কাছে ভ্রমণ করার বা অন্য কোন কিছু করার আর কোন শক্তি থাকবে না এবং এমনিতেই তোমার তোমাদের জীবনের অর্ধেক সময়ই ঘুমিয়ে অতিবাহিত করছ। তাই সময় কোথায় আছে? সেজন্য—অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা—এখনই তোমার অনুসন্ধান করা উচিত।” “কৌমার আচরেৎ প্রাজ্ঞো”—তোমাদের অনুসন্ধান করা উচিত এবং এমনকি কুমার বয়সেই নিজেদেরকে প্রস্তুত করা উচিত।

যদি একজন ব্যক্তি ১৮ বা ২০ বছর বা ২৫ বছর বয়সী হয়, তার মানে ইতিমধ্যে ১৮ বছর নষ্ট হয়ে গেছে। এর অর্থ জীবনের এক চতুর্থাংশ ব্যর্থ হয়ে গেছে, কারণ আমরা সাধারণত ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে বেঁচে থাকি না, আর বেঁচে থাকলেও খুব বেশি ১০০ বছর জীবিত থাকি। তাই এর মানে জীবনের এক চতুর্থাংশ বা তারও বেশি ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি এখন আবার কত ভাগ নষ্ট করতে চান? যদি আপনি আরো এক ভাগ নষ্ট করেন, তাহলে আপনি পারিবারিক বিষয়ের প্রতি এতই জড়িয়ে পড়বেন যে তা বন্ধ করতে পারবেন না। এই কারণেই ব্যক্তির যোগ অনুশীলন করা শুরু করা উচিত হয় আংশিকভাবে নয়ত তৎক্ষণাৎ পূর্ণরূপে। যেই সময়টা ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে, আপনাকে তা পুষিয়ে নিতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি ৭৫ বছর বয়সে শুরু করে, তার মানে তাকে ৭৫ বছরের নষ্ট করা সময়টিও পুষিয়ে নিতে হবে, কিন্তু সেই সময় আপনি দুর্বল থাকবেন। তাই অন্তত যদি আপনি ২৫ বছর বয়সে শুরু করেন, তাহলে এর অর্থ ২৫ বছর নষ্ট হয়ে গেছে, তখন আপনার এই নষ্ট হওয়া সময়টি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য দ্বিগুণ গতিতে চেষ্টা করার মত যথেষ্ট শক্তি থাকে। সাধারণত আমরা দেখি যে আপনি হয় তরুণদের নয়ত বৃদ্ধদেরকে এই অনুশীলনের ক্ষেত্রে দেখতে পাবেন, কারণ মধ্য বয়স খুবই কঠিন, কারণ তারা ইতিমধ্যেই কত জড়জাগতিক বিষয়ের মধ্যে জড়িয়ে আছে, তাই তাদের কাছে কোন সময় নেই। যখন তারা তরুণ, তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে বা তাদের তখনও বিবাহ হয়নি বা পুরোপুরি পারিবারিক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করেনি, তাই তখন তাদের যোগ অনুশীলনের এই ভালো অভ্যাস শুরু করার উত্তম সুযোগ আছে। নয়ত এই জীবনের শেষে আমরা এতকিছু বাজে অভ্যাস গড়ে তুলি যে এমনকি যদি তারা যোগ অনুশীলন করতেও চায়, তবুও বার্ধক্যে তাদের তা শেখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ কুকুরকে নতুন কৌশল শেখানো খুবই কঠিন।

সেই জন্য এই দুটি কারণ আছে যে—একটি হচ্ছে আমরা জানি না আমরা কখন মারা যাব, দ্বিতীয় হচ্ছে যদি আমরা এটিকে বিলম্বিত করতে থাকি, তাহলে তা আরো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়বে এবং আমরা আরো অধিক থেকে অধিকতর সময় নষ্ট করব। এই দুই কারণে আমাদের যোগ অনুশীলন তৎক্ষণাৎ শুরু করা উচিত, যদি আমরা জড়জাগতিক সমস্যা থেকে মুক্ত হয়ে আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা অর্জন করতে চাই।

আর অন্য কোন প্রশ্ন আছে? আপনার কি কোন প্রশ্ন আছে?

ভক্ত: যখন শিষ্য গরুর থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে, তখন গুরু তার সব কর্ম দূর করে দেন, তাহলে কেন এমনকি দীক্ষার পরেও শিষ্য কষ্ট ভোগ করে? (শ্রুতিহীন)

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: গুরু তাদের কর্মের দায়ভার গ্রহণ করে এবং এটি নির্ভর করে শিষ্য কতটা শরণাগত তার উপর। কারণ তখন তার কর্ম কৃষ্ণের দ্বারা সরাসরি অপসৃত হয় অথবা ভগবান সেই শিষ্যকে কিছু সামান্য কর্মফল ভোগ করতে দেন যা শিষ্যকে যথার্থ মানসিক স্তরে আসতে সাহায্য করে, যার ফলে সেই সমস্ত কর্ম দূর হয়ে যাবে। এই পুরো দায়ভার আধ্যাত্মিক গুরুর দ্বারা গৃহীত হয়। এবং সেজন্য আপাতদৃষ্টিতে সমস্ত কর্মের ফল শিষ্যকে প্রদান করা হয় না, কিন্তু পূর্ববর্তী কার্যকলাপ ও এমন কিছু বাসনা থাকে এবং এমনকি দীক্ষা গ্রহণের পরও কখনো কখনো ভক্তরা তাদের প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে পাপকার্য করে এবং এই সমস্ত বিভিন্ন কারণবশত সেই ভক্ত সমস্যায় পড়ে।

একসময় শ্রীল প্রভুপাদ তার আঙুল কেটে ফেলেছিলেন এবং এক বিন্দু রক্ত বের হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন যে, আমার মাথা কেটে যাওয়া উচিত ছিল কিন্তু এর পরিবর্তে কৃষ্ণ আমাকে সামান্যতম দুর্ভোগ দিলেন, শুধু আমাকে এটি মনে করানোর জন্য যে আমাকে কত বিরাট পাপকর্মফল থেকে মুক্ত করা হয়েছে।” তাই একবার যখন আমরা দীক্ষা গ্রহণ করি, যদি আমরা আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি শরণাগত হই, তাহলে তখন আমরা কৃষ্ণের তত্ত্বাবধানে আছি। তখন আমাদেরকে বাস্তবে  ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলন করতে হবে এবং তাহলে আমরা এই সমস্ত কর্ম-প্রতিক্রিয়া থেকে আরও অধিক মাত্রায় মুক্ত হব। ঠিক যেমন, দীক্ষার পরবর্তী পর্যায়, আমরা যেটিকে বলি অনর্থ্য নিবৃত্তি স্তর, তখন এই সমস্ত কর্ম প্রতিক্রিয়া বিনষ্ট হয়ে যায়। এমন নয় যে তৎক্ষণাৎ সব বাজে অভ্যাস চলে যাবে। যদি আমরা তৎক্ষণাৎ পুরোপুরি নিজেদের মন, নিজেদের প্রতিটি চিন্তাভাবনা, বাক্য এবং কার্যকে কোনরকম জাগতিক আসক্তি ছাড়া সম্পূর্ণরূপে নিযুক্ত করতে পারি, নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে গুরুদেবের সেবায় নিমগ্ন করতে পারি, তাহলে আমরা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হবো। কিন্তু দীক্ষার পর এমন হয় না যে হঠাৎ ভক্ত তার মা-বাবাকে ভুলে যাবে বা জাগতিক সবকিছু ভুলে যাবে, তারা হয়ত একটু ভিন্ন প্রকৃতির হবে, হয়ত আরও বেশি নিরাসক্ত হয়ে পড়বে, কিন্তু তবুও সেখানে কিছু না কিছু আসক্তি থাকে। তাই সেই সব থেকে কিভাবে মুক্ত হওয়া যাবে? আমাদের যা কিছু আসক্তি আছে, তার সাথে আমাদের কর্মফল সংযুক্ত। আমরা যত আসক্তিহীন হব, সেটাই হচ্ছে আমাদের এই সমস্ত কর্ম প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্তি লাভ।

এই দুটি বিষয়ে আজকে বলা হয়েছে: ত্রিগুণাত্মিকা শক্তি আছে এবং তাদের প্রতিক্রিয়াও আছে। পরস্পর সংযুক্ত। আমাদের তিন গুণের প্রতি আসক্তি আছে এবং সেই তিনগুণ কর্মফলের সাথে সংযুক্ত। যখনই আমরা কর্ম প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত হই, তখনই আমরা এই সমস্ত আসক্তি থেকেও মুক্ত হই। ঠিক যেমন একজন ব্যক্তি ১০ লক্ষ ডলার অর্থ লাভের প্রতি খুবই আসক্ত, একবার তারা ১০ লক্ষ ডলার পেয়ে গেলে, তারা আর এর প্রতি আসক্ত নয়, হয় তারা ২০ লক্ষ ডলার চায় অথবা অন্য কিছু চায়, ঠিক যেমন হংকং, জাপানে, মানুষেরা তাদের জড়জাগতিক বিষয়ের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত। তারা এক নতুন টেপ রেকর্ডার চায়, তারা টেপ রেকর্ডার চায় কিন্তু কিছু সময় অতিবাহিত হলে তারা এর প্রতি বিরক্ত হয়ে যায়, তারা তা ছুড়ে ফেলে। একদম ভালো টেপ রেকর্ডার তারা আবর্জনা স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে। তারা বিরক্ত, এটাই হচ্ছে তাদের মনোভাব। তারা এটিকে ছুড়ে ফেলে দেয়। আপনি দেখতে পাবেন যে আবর্জনার মধ্যে ভালো টেপ রেকর্ডার পড়ে আছে। যখন আপনি কোন জিনিস লাভ করেন, তার মানে আপনার বাসনা পূর্ণ হয়েছে, এইভাবে জাগতিক কর্মফল লাভ করা মানে হচ্ছে আপনি যা চান তা লাভ করেছেন, এটিকে বলা হয় পুণ্য কর্মের ফল। এটিও আপনাকে কোন না কোনভাবে নিরাসক্ত করে, আপনি সেটির প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েন বা আপনি অন্য কোন কিছু লাভ করতে চান। আসক্তি থেকে মুক্তির আরেকটি পথ হচ্ছে দুঃখ দুর্দশার মাধ্যমে—অর্থাৎ যে বস্তু আপনি চান, তা আপনার কষ্টের কারণ হলে, তখন আপনি তা থেকে নিরাসক্ত হয়ে পড়েন। দুঃখ হোক বা আনন্দ, এই উভয় প্রতিক্রিয়াতেই ভক্ত এর দ্বারা নিরাসক্ত হয় কারণ যেহেতু এই উভয় ফলই জাগতিক আসক্তির কারণ। তারা আধ্যাত্মিক আনন্দ লাভ করতে চায়। ইতিমধ্যেই সেই সংযোগ ছিন্ন করা হয়েছে, যার ফলে আপনি আর নতুন কর্ম তৈরি করছেন না, এর দ্বারা আপনি মুক্ত হচ্ছেন এবং শ্রীকৃষ্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে—আপনি যত মাত্রায় শরণাগত হবেন তত মাত্রায় আপনাকে প্রতিদান দেওয়া হবে। তাই ইতিমধ্যেই আপনি প্রত্যক্ষ কর্ম প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত, যদি কোন কর্মফল প্রদান করা হয়, তার মানে আপনার এখনো কোন আসক্তি আছে এবং এটি আপনাকে আরো অধিক থেকে অধিকতর উন্নত হতে সাহায্য করছে। আপনি কেবল আপনার প্রাপ্য ফলের সামান্যতম লাভ করছেন।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 18/07/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions