Text Size

১৯৮২১০২২ শ্রীমদ্ভাগবতম ২.১০.৪৪

22 Oct 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam

নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ২২ অক্টোবর, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে দিয়েছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ২য় স্কন্ধ ১০ম অধ্যায় ৪৪তম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

শ্লোক ২.১০.৪৪
ইত্থংভাবেন কথিতো ভগবান্ ভগবত্তমঃ। 
নেত্থংভাবেন হি পরং দ্রষ্টুমর্হন্তি সূরয়ঃ॥

জয়পতাকা স্বামী: [বিরতি]

হরে কৃষ্ণ [বিরতি] … এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ।

প্রভুপাদ কর্তৃক অনুবাদ: মহান্ তত্ত্বজ্ঞানীরা এইভাবে পরমেশ্বর ভগবানের কার্যকলাপ বর্ণনা করেন, কিন্তু শুদ্ধ ভক্ত এই সমস্ত রূপের অতীত ভগবানের অধিক মহিমামণ্ডিত দিব্য কার্যকলাপ দর্শন করার উপযুক্ত।

তাৎপর্য: ভগবান তাঁর বিভিন্ন শক্তির মাধ্যমে এই জড় জগতের কেবল স্রষ্টা এবং সংহারকই নন, তিনি একজন সাধারণ স্রষ্টা এবং সংহারকের থেকেও অধিক আরো কিছু, কেননা তাঁর আনন্দময় রূপ রয়েছে। ভগবানের এই আনন্দময় রূপ শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তরাই কেবল উপলব্ধি করতে পারেন, অন্য আর কেউ পারে না। নির্বিশেষবাদীরা কেবল ভগবানের সর্বব্যাপী প্রভাব হৃদয়ঙ্গম করেই সন্তুষ্ট। তাকে বলা হয় ব্রহ্ম-উপলব্ধি। নির্বিশেষবাদীদের থেকে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে যোগী, যারা হৃদয়ে পরমাত্মারূপ ভগবানের অংশ প্রকাশ দর্শন করেই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু ভগবানের শুদ্ধ ভক্তেরা প্রেমময়ী সেবার দ্বারা বাস্তবিকভাবে ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমে ভগবানের হ্লাদিনী শক্তিতে সরাসরিভাবে অংশ গ্রহণ করেন।

বৈকুণ্ঠলোক নামক ভগবানের নিত্যধামে সর্বদা ভগবান তাঁর পার্ষদসহ বিরাজ করেন এবং বিভিন্ন চিন্ময় রসে সেবারত শুদ্ধ ভক্তদের অপ্রাকৃত প্রেমময়ী সেবা আস্বাদন করেন। ভগবানের শুদ্ধ ভক্তেরা এই জড় সৃষ্টির প্রকটকালে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলনের সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে ভগবদ্ধামে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় (১৮/৫৫) সে সম্বন্ধে বলা হয়েছে — 

ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান যশ্চাম্মি তত্ত্বতঃ।
ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্ ।।

শুদ্ধ ভক্তির বিকাশ করার মাধ্যমে যথাযথভাবে ভগবানকে জানা যায় এবং তার ফলে তাঁর সেবা করার শিক্ষা লাভ করে প্রত্যক্ষভাবে তাঁর সঙ্গ করার যোগ্যতা অর্জন করা যায়। ভগবানের সবচাইতে মহত্ত্বপূর্ণ সঙ্গ লাভ করা যায় গোলোক বৃন্দাবনে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ গোপিকাদের সঙ্গে এবং তাঁর প্রিয় সুরভী গাভীদের সঙ্গে পরম আনন্দ আস্বাদন করেন। শ্রীকৃষ্ণের এই অপ্রাকৃত ধামের বর্ণনা ব্রহ্ম-সংহিতাতে রয়েছে, সেটিকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবিষয়ে সবচাইতে প্রামাণিক শাস্ত্র বলে বিবেচনা করেছেন। 

ইতি ‘শ্রীমদ্ভাগবত সমস্ত প্রশ্নের উত্তর নামক’ শ্রীমদ্ভাগবতের ২য় স্কন্ধ ১০ম অধ্যায় ৪৪ শ্লোকের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত।

জয়পতাকা স্বামী: এখানে বিভিন্ন ভক্তদের, বিভিন্ন যোগীদের গুণ সম্বন্ধে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আমরা দ্বিতীয় স্কন্ধে আলোচনা করছিলাম যে কিভাবে শ্রীকৃষ্ণ এই জড়জগৎ সৃষ্টি করেন, কিভাবে তিনি তা ধ্বংস করেন। বেদে বিভিন্নভাবে তা বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু আসলে ভগবান এইসব কিছু স্বাভাবিকভাবেই করে থাকেন। এমন নয় যে এই সৃষ্টি কার্যের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন ধরনের শ্রমসাধ্য যন্ত্রবিদ্যার প্রয়োগ করেন, তবে কেবল তাঁর ইচ্ছার দ্বারা তা হয়ে থাকে এবং সেই ইচ্ছাই হচ্ছে মুখ্য পরিবর্তনীয় শক্তি, এরপর ধীরে ধীরে সবকিছু সংঘটিত হয়। এমনকি ব্রহ্মাণ্ডের  সর্বোত্তম জীব, তিনিও এই জড় জগতে তার নিজের ইচ্ছামত সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে স্বাধীন নন। তিনি জানেন না কি করতে হবে। তিনি জানেন না কিভাবে জড় জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, আর না তিনি জানেন যে তা কিভাবে তা সৃষ্টি করতে হয়। সেই জন্য, তিনি… এমনকি জানতেন না তিনি কে। যখন তার জন্ম হয়েছিল, তখন তিনি সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত ছিলেন। তাই অবশেষে আকাশ থেকে বা সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে দিব্য শব্দ ‘ত-প’ শোনা গিয়েছিল। তারপর তিনি বুঝতে পারলেন যে তাকে তার উৎস সম্বন্ধে উপলব্ধি করার জন্য তপস্যা করতে হবে। এরপর শ্রীকৃষ্ণ তার কাছে প্রকাশ করেছিলেন যে কিভাবে জড়জগৎ সৃষ্টি করতে হবে, কিভাবে জীবদের সৃষ্টি করতে হবে, ইত্যাদি বিষয়। তাই এই জড়জগতে এমন কেউ নেই যিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন। 

প্রত্যেকেই যা করতে চায়, তা কিভাবে করা যাবে সেই ধারণা তারা শ্রীকৃষ্ণের থেকে প্রাপ্ত হয়। সেই কথা ভগবদগীতাতে বলা হয়েছে, “স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ” কিভাবে কোন কিছু করতে হবে, এমনকি যদি তা কোন জঘন্য কর্মও হয় অথবা ভালো কর্ম হয়, সেই বুদ্ধি, চরমে তা স্মরণে রাখার অথবা চিন্তা করার ক্ষমতা, সবকিছুই শ্রীকৃষ্ণ প্রদান করেন। জীবের ইচ্ছা আছে, তাতে কৃষ্ণ অনুমোদন করেন — “ঠিক আছে!” যদি সেই ব্যক্তি তা পাওয়ার যোগ্য হয়, তাহলে যথার্থসময়ে তিনি সেই ব্যক্তিকে তার ইচ্ছা পূরণ করতে দেন। এমনকি ধর্ম অনুসারে সেই বাসনা যদি সঠিক কামনা নাও হয়, তবুও যথার্থসময়ে কৃষ্ণ সেই ইচ্ছাপূর্তিতে সাহায্য করেন, কিন্তু তাদেরকেই সেই কর্মফল ভোগ করতে হয়। এর জন্য তিনি(কৃষ্ণ) দায়ী নন। তিনি তাদেরকে সেটা করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন না, তারা করতে চায় ও সেই জন্য যেহেতু তারা বারংবার এই একই ইচ্ছা প্রকাশ করে, তাই অবশেষে তিনি (কৃষ্ণ) তাদেরকে বুদ্ধিমত্তা প্রদান করেন যে তারা যা চায় তা কিভাবে করা যাবে। পরমাত্মারূপে কৃষ্ণের কার্য হচ্ছে যে তিনি হচ্ছেন মূলত আজ্ঞা পরিপূরক। তিনি এই জগতের সৃষ্টি এবং পালনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। অবশ্য সম্ভবত মানুষদের ভগবান সম্বন্ধে এটাই সর্বোচ্চ ধারণা। তারা মনে করে যে ভগবান হচ্ছেন কেবল সৃষ্টিকর্তা বা তিনি কেবল এই জড়জগতের বিষয়ে চিন্তামগ্ন এবং সেই জন্য তারা মনে করে যে, ভগবানের কি হয়েছে? কেন এই জড়জগৎ এমন বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা এটা বুঝতে পারে না যে এটাই তাঁর সর্বক্ষণের ভাবনা নয়, ভগবানের প্রকৃত স্বরূপ সবসময় আধ্যাত্মিক জগতে আনন্দ উপভোগ করছেন এবং এই জড়জগৎ পালন করার জন্য, তিনি কেবল…  অংশ রূপে, কলা অংশ রূপে এই জড়জগতে আসেন ও সবকিছু দেখেন এবং যা কিছু হচ্ছে তা বজায় রাখেন। পর্যায়ক্রমে তিনি ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আবির্ভূত হন, একমাত্র যার দ্বারা তিনি মানব সভ্যতার যথার্থ স্থিতির আভাস দেন। 

নীতি সম্বন্ধীয়, সত্য সম্বন্ধীয় বা এমনকি অপরাধ বিষয়ক যা কিছু আইন আছে, তাতে আপনি দেখবেন যে যেইসব আইন প্রকৃতই অর্থপূর্ণ, সেই সব আইন মনুসংহিতা থেকে আসছে, সেগুলি সব বেদ থেকে আসছে। সেই সব শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত। এবং যেহেতু এখন আধুনিক জগতে তারা বিচ্ছিন্ন করছে — ধর্ম, শাস্ত্র এবং দেশকে, সেই জন্য এখন আইনগুলি ধীরে ধীরে অধিক থেকে অধিকতর পরিহাসনীয় এবং আরো আরো অধিক সরল প্রকৃতির হয়ে উঠছে। ক্যালিফোর্নিয়াতে কিছু দেশ এই আইন পাস করেছিল যে তাদের শহরে কোন নগ্ন নৃত্য হওয়া উচিত না। কিন্তু তারা সুপ্রিমকোর্টে এটির বিরুদ্ধে আবেদন করেছে যে, রেস্তোরাঁয় নগ্ন নৃত্য করা হচ্ছে এক ধরনের কলা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার অভিব্যক্তি, তাই এটা বন্ধ হওয়া উচিত নয়। এবং ফেনী অ্যানি, ডানলাপ, সে এর বিরুদ্ধ আবেদন করে বলেছে যে, এটা তার ব্যক্তিগত ভাব প্রকাশের অধিকার এবং কোন না কোনভাবে সে এই মামলা জিতে গেছে, আর ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্ট মোক্ষমভাবে এই বলে চুপ করিয়ে দিয়েছে যে, “হ্যাঁ, অবশ্যই নগ্ন নৃত্য হচ্ছে নিশ্চিতভাবে একপ্রকার ভাব প্রকাশের কলা, এটাকে আপনারা বন্ধ করতে পারেন না।” এটা শুঁড়িখানায় বা এইরকম অন্যান্য জায়গাতে হয়, যেখানে কেউই কলাবিদ্যা শেখার জন্য এটার দিকে তাকায় না। যাইহোক, মূল বিষয় হচ্ছে যে যখন আমাদের মনুষ্য-সৃষ্ট আইন থাকবে, তখন সবকিছুই পুরোপুরি উপহাস্য হয়ে ওঠে, কারণ তারা বোঝেনা কোনটা করা ঠিক আর কোনটা ঠিক নয়। তাদের কোন মানদণ্ড নেই। তারা জানে না কর্মের আইন কি, এসব যে বিভিন্ন কার্য করছে, এর ফলস্বরূপ কি হতে চলেছে তারা তা জানেনা। “কেন কৃষ্ণ বলেছেন যে বিবাহ হতে হবে? কেন কৃষ্ণ বেদে বলেছেন যে এতসব প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে?” এখন আমেরিকাতে হয়ত তারা এর একটা আভাস পাচ্ছে যে সব জায়গায় মহামারীর মত হারপিস রোগ হচ্ছে। এই হচ্ছে পুরো সমস্যা। কৃষ্ণ আমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন তা আসলে নিখুঁত কিন্তু এখন এই ধারণা হয়েছে যে, “না না যেহেতু এটা হচ্ছে এক ধর্ম, তাই আমরা এর মধ্যে পড়তে চাই না।” এখানে ধর্মের প্রশ্ন কোথায়? এটা কার্যকারিতার প্রশ্ন। এই জড়জগৎ কি? কোন আইন এটি চালনা করছে? আমরা যদি কোন কিছু করি, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদেরকে এর জন্য কষ্ট ভোগ করতে হবে, আমাদের তা জানা উচিত এবং একমাত্র যেখান থেকে আপনি তা জানতে পারবেন যে আপনি যা করেন তার প্রতিক্রিয়া কি হবে, তা হচ্ছে বেদ, তা হচ্ছে শাস্ত্রগ্রন্থ এবং যদি আমরা তা এই কারনে না পড়ি যে এটি শাস্ত্রগ্রন্থ, তাহলে তা পরিহসনীয়। সেখানে এই জড় জগতের বিজ্ঞান আছে। জাগতিক বৈজ্ঞানিকেরা যেহেতু তাদের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা তা উদঘাটিত করতে পারেনি, তাই সেই জন্য আপনি তা গ্রহণ করবেন না, এটা হচ্ছে জাগতিক ব্যক্তিদের এক বড় কুমন্ত্রণা, তাতে এখন একমাত্র অনুমোদিত রাষ্ট্রধর্ম হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিক মানসিক জল্পনা-কল্পনা। এটা বড় বড় অসুরদের বড় বড় ষড়যন্ত্র যে কিভাবে তারা তাদের বিজ্ঞানকে সামনে রাখছে যা পুরোপুরি মানসিক কল্পনা ও বিভিন্ন মতবাদ ভিত্তিক, আর আপনি আপনার সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতিক, দেশীয়, ও সবকিছু এর উপর ভিত্তি করে করছেন, কিন্তু শাস্ত্রে যদি কোন কিছু বলা থাকে, তাহলে সেটা আইন বিরুদ্ধ। আপনি তা তুলে আনতে পারবেন না। 

শ্রীল প্রভুপাদ এর পরিবর্তন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, “যখন ভগবদগীতা বলছে, “দেহিনোঽস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা” — আমরা শৈশব থেকে যৌবন থেকে বার্ধক্যের মাধ্যমে দেহ পরিবর্তন করি, সেটা কি কেবল কৃষ্ণভক্তদের জন্য বা হিন্দুদের জন্য?  কেবল কি তারা শৈশব থেকে যৌবন থেকে বার্ধক্য-এ দেহ পরিবর্তন করছে? খ্রিস্টান আর মুসলিমদের কি হয়? নাস্তিকদের কি হয়? কুকুরদের কী হয়? তারা কি শৈশব থেকে যৌবন ও তা থেকে বার্ধক্য-এ দেহ পরিবর্তন করে না? ভগবদগীতা কোন সাম্প্রদায়িক গ্রন্থ নয়। এটা হচ্ছে জীবের বিজ্ঞান। এটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিজ্ঞান। প্রত্যেকেই শৈশব থেকে যৌবন ও তা থেকে বার্ধক্য-এ পরিবর্তিত হয়। এটা কোন সাম্প্রদায়িক নির্দেশ নয়। এতে বলা হচ্ছে আত্মা কে। এতে খুব নির্দিষ্টভাবে, ক্রমঅনুসারে, বৈজ্ঞানিকভাবে, যথার্থ শব্দের মাধ্যমে আত্মা কি তা বলা হয়েছে।” অবশ্য, ভক্তরা এইসবের অনেক উর্ধ্বে পৌঁছায়। এইসব কিছু ভক্তদের জন্য শিশু বিদ্যালয় এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় বা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মত। এবং তারা চরমে ভগবানের অন্তরঙ্গ লীলা জানার পর্যায়ে উন্নীত হন। সাধারণ মানুষেরা কিভাবে অন্তরঙ্গ লীলা বুঝতে পারবে, যতক্ষণ না তারা এটা বুঝতে পারবে যে তারা এই শরীর নয়, যতক্ষণ না তারা বুঝতে পারবে যে তারা শুদ্ধ জীবাত্মা, যতক্ষণ না তারা বুঝতে পারবে যে ভগবানের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থিতি যে কিভাবে তিনি সবকিছু তাঁর দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে সৃষ্টি করেন, কিভাবে কেবল তাঁর স্বল্প ইচ্ছামাত্রই সবকিছু সংঘটিত হয়? যতক্ষণ না আপনি শ্রীকৃষ্ণের বিশাল শক্তি ও ক্ষমতা সম্বন্ধে বুঝতে পারবেন, ততক্ষণ আপনি তাঁর সৌন্দর্য এবং অন্তরঙ্গ, প্রেমময়, বিস্ময়কর এই বিষয়টির প্রশংসা করতে পারবেন না যে কিভাবে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে বিনম্র চিত্তে তাঁর ভক্তের পদ গ্রহণ করেছেন বা কিভাবে তিনি পার্থসারথী রূপে যখন অর্জুনের রথ চালিয়েছিলেন, তখন তাঁর ভক্তের সেবক পদ গ্রহণ করেছিলেন। আপনি এর প্রশংসা করতে পারবেন না। আমরা কিভাবে এটির প্রশংসা করতে পারব? যখন আমরা শুনি যে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি সাধারণের মাঝে নেমে এসেছেন এবং তিনি সাধারণ মানুষের মত কাজ করছেন, তখন সবাই তার তারিফ করে। যেহেতু তিনি হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি, তাই তার এইরকম কোন কিছু করার দরকার নেই, তবে তিনি সাধারণের স্তরে নেমে এসেছেন, সেটা একপ্রকার অসাধারণ এবং অসামান্য বিষয়। তাই না? কিন্তু যদি আমরা শুনি যে একজন সাধারন ব্যক্তি সাধারণের মত কোন কাজ করছে, তাহলে তাতে অসাধারণ কি আছে? এটা তেমন বড় কি ব্যাপার? সাধারণ মানুষেরা প্রতিদিনই সাধারণ কাজ করে থাকে। তারা একে অপরের সেবা করে,  তারা এইটা ওইটা করে থাকে। তেমনই যতক্ষণ না আপনি কৃষ্ণের স্থিতি বুঝতে পারবেন, ততক্ষণ তাঁর অন্তরঙ্গ লীলা যে কত অসাধারণ, সেটির  প্রশংসা করা খুবই কঠিন। 

আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সম্বন্ধে বর্ণনা করছিলাম যে কিভাবে তিনি.., অবশ্য কেউই তাঁর অবস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন না, কারণ তিনি প্রচ্ছন্নভাবে এসেছিলেন। যখন শ্রীকৃষ্ণ অবতরণ করেছিলেন, তখন তিনি অনেক অসুরদের হত্যা করা, গোবর্ধন পর্বত ধারণ করা-এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাঁর নিজের প্রকৃতি প্রকাশ করেছিলেন, তবে যোগমায়া দ্বারা তিনি বৃন্দাবনবাসীদের সেই উপলব্ধির বাইরে রাখতেন কারণ তিনি চাইতেন যে তারা যাতে তাঁকে তিনি যেইরকম, তেমনভাবেই ভালবাসেন, তিনি এত মহান বা তিনি এত শক্তিশালী সেইজন্য নয়। অন্যান্য ভক্তরা তারা কি হচ্ছে তা দেখতে পারছিলেন, তারা বুঝতে পারছিলেন যে শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান। বৃন্দাবনবাসীরা তারা এমনকি এর কিছুটা আভাস পাচ্ছিলেন, তবে আবার যোগমায়ার কারণে তারা বিস্মৃতির আধ্যাত্মিক ভ্রমে পতিত হতেন এবং তারা কেবল কৃষ্ণকে তাদের প্রিয়তম জন — তাদের সখা রূপে, তাদের প্রেমিক রূপে, তাদের পুত্ররূপে, ইত্যাদি সম্পর্কে দেখতেন। একইভাবে যখন চৈতন্য মহাপ্রভু নিন্মে অবতরণ করেছিলেন, তিনি নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখেছিলেন। আসলে ডজন ডজন বৈদিক তথ্যসূত্র আছে যে কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণ আসবেন, কিন্তু খুব কমই কেউ সেইসব খুঁজে পেয়েছিলেন বা তাঁর আগমনের পূর্বে সেইসব তুলে ধরেছিলেন, কারণ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর যোগমায়া শক্তির দ্বারা সেই সবকিছু আবৃত রেখেছিলেন। ঠিক যেমন যদি আপনি বলেন যে, “আজকে হনুলুলুর রাজ্যপাল হরেকৃষ্ণ মন্দিরে হঠাৎ দর্শনে আসবেন সেখানে কি হচ্ছে তা দেখার জন্য।” ঠিক আছে? যদি আপনি সেই সম্বন্ধে জানেন, তাহলে তা কোন অবাক করা বিষয় নয়। সেখানে প্রত্যেকেই মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, আরো অন্যান্য কিছু করবে, পুরো মন্দির সম্পূর্ণ চকচকে পরিষ্কার থাকবে। বা যদি আপনি বলেন যে রাষ্ট্রপতি রেগান আজকে ফিফ্থ এভিনিউতে হঠাৎ দর্শনে আসবেন ছদ্মবেশে, তাহলে সেই স্থানে সব মানুষের তাকে দেখার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। একমাত্র তখনই এটা পুরোপুরি অজ্ঞাত থাকবে, যদি কেউ এই সম্বন্ধে না জানে তাহলে। তাই, তিনি আসলে এটি বেদে উল্লেখ করেছেন, নয়ত পরবর্তীতে কিভাবে এটা প্রমাণিত হবে যে তিনিই সেই জন, সেইজন্য তিনি সেই সম্বন্ধে বেদে রেখেছেন, তবে যোগমায়ার কারণে মানুষেরা আসলে বুঝতে পারেননি এর অর্থ কি, তারা এক প্রকার ধীরে ধীরে এই ধারণা লাভ করছিলেন। যেমন আমরা একবার ভগবদগীতা পড়লাম এবং এর পরের বার যখন আপনি তা পড়বেন, আপনি বলবেন, “হে ভগবান! আমি কি এটা আগে পড়েছি?” কিছু না কিছু এমন আছে, যেটা মনে হবে যে আপনি প্রথমবার পড়ছেন বা এমনকি যদি আপনি আগে পড়েন বা মনেও রাখেন, তবুও দ্বিতীয়বার আপনি যখন পড়বেন, তখন পুরো ভিন্ন মানে ও ভিন্ন গূঢ় অর্থ বের হয়ে আসবে। তেমনই মানুষেরা তা পড়েছিলেন এবং তারা বাহ্যিকভাবে এই ধারণা পেয়েছিলেন যে, “হ্যাঁ পবিত্র নাম কলিযুগে থাকবেন এবং তিনি অবতরণ করবেন।” কিন্তু কোন না কোনভাবে মানুষেরা আসলে সেই বিষয়টি তুলে ধরেননি, তারা সেই বিশেষ সময়ে সেই বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেননি। এই ছিল বিশেষ ব্যবস্থা যাতে চৈতন্য মহাপ্রভু নিন্মে অবতরণ করতে পারেন এবং কোন প্রকার অসুবিধা ছাড়াই তাঁর লীলা সম্পাদন করতে পারেন। তিনি অবতরণ করেছিলেন এটি দেখানোর জন্য যে ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত হওয়া কাকে বলে। যদিও তিনি হচ্ছেন স্বয়ং কৃষ্ণ, কিন্তু তিনি নিন্মে অবতরণ করেছিলেন এটি প্রদর্শন করার জন্য। 

বিষয় হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কিভাবে অবতরণ করেছিলেন? কেন শ্রীকৃষ্ণ এই পৃথিবীতে এসেছিলেন? তিনি এমনভাবে অবতরণ করেন না যেমন পরমাত্মা সবকিছু বজায় রাখার জন্য অবতরিত হন। আসলে তিনি কৃষ্ণের অভিন্ন প্রকাশ এবং তিনি এতসব দুর্বৃত্তদের শায়েস্তা করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী, যেমন আমরা দেখেছি যে হীরনাক্ষ, হিরণ্যকশিপু আদি অসুরদের জন্য বিভিন্ন অবতারেরা এসেছিলেন, তাঁরা সর্ব শক্তিশালী। তবে শ্রীকৃষ্ণ যখন অবতরণ করেন, সেক্ষেত্রে শ্রীল প্রভুপাদ বর্ণনা করেছেন যে, “তিনি হচ্ছেন একমাত্র ভগবান যিনি তাঁর ভক্তদেরকে সন্তুষ্ট করেন।” ঠিক যেমন যখন গোপীরা ধাবিত হচ্ছিলেন, খোঁজ করছিলেন যে, “কোথায় কৃষ্ণ? কোথায় কৃষ্ণ?” তারা ধাবিত হচ্ছিলেন ও তখন শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে চতুর্ভুজ শ্রীবিষ্ণু রূপে অবগুণ্ঠিত করেছিলেন। তখন তারা তাঁর কাছে গেলেন, তাঁকে বললেন, “ওহ বিষ্ণু!” এই বলে তারা তাদের প্রণাম নিবেদন করে বললেন, “আপনি কি কৃষ্ণকে দেখেছেন? কৃষ্ণ কোথায়?” এমনকি তারা ভগবানকে দর্শন করেছিলেন, সেখানেই তাঁকে অচল অবস্থায় দেখেছিলেন, কিন্তু তারা তাঁর প্রতি আগ্রহী ছিলেন না, তারা খুঁজছিলেন, “কোথায় কৃষ্ণ?” এটাই হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তের বৈশিষ্ট্য যে এমনকি তাদের সামনে শ্রীবিষ্ণু প্রকট হলেও তারা এই মার্গের কথাই জিজ্ঞেস করবেন যে, “কৃষ্ণ কোথায়?” এরপর, কৃষ্ণ তিনি অবশ্য বিষ্ণু রূপ ধারণ করেছিলেন, তিনি বললেন, “তিনি ওই দিকে।” (ভক্তরা হাসছেন) তখন তারা সেই দিকে ধাবিত হয়েছিলেন, তবে যখন শ্রীমতি রাধারানী এসেছিলেন ও বলেছিলেন, “কৃষ্ণ কোথায়?” তাঁর প্রেম এত প্রগাঢ় যে কৃষ্ণ তাঁর চতুর্ভুজ ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর দুই ভূজ বের হয়ে এসেছিল এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই হচ্ছেন কৃষ্ণ এবং তিনি তাকে ধরে ফেলেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ভগবানের আনন্দদায়িনী শক্তিই কেবল ভগবানকে সম্পূর্ণ মোহিত করতে পারেন। অন্যান্য সকলের ক্ষেত্রে তিনি বৈরাগ্য অনুশীলন করতে পারেন, এটাই হচ্ছে তাঁর প্রকৃতি, তাঁর ঐশ্বর্য, কিন্তু যেহেতু তিনি (রাধারানী) ভগবানের অন্তরঙ্গা আধ্যাত্মিক শক্তি হওয়ায় তাঁর(কৃষ্ণের) থেকে প্রত্যক্ষভাবে অভিন্ন, সেই জন্য তাঁর এক বিশেষ, অনন্য পদ আছে। 

এই শ্রীমতি রাধারানী এবং কৃষ্ণ পরস্পর মিলিত হয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্বরূপ হয়েছেন। রাধা এবং কৃষ্ণ —  “শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য, রাধা কৃষ্ণ নহে অন্য।” রাধা ও কৃষ্ণ একত্রে এসেছেন চৈতন্য মহাপ্রভুর রূপে কিন্তু কেন তাঁরা অবতীর্ণ হয়েছেন? দুইজন ভক্ত ছিলেন যারা ক্রন্দন করেছিলেন, হরিদাস ঠাকুর ফুলিয়ার গুহার ভিতর ক্রন্দন করেছিলেন। যখন ভগবান অবতরণ করেছিলেন, তখন মানুষেরা অত্যন্ত জড়জাগতিক ছিলেন। অবশ্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর, শ্রীকৃষ্ণের আগমনের ক্ষেত্রে সর্ব বিখ্যাত এবং লক্ষণীয় আহ্বায়ক ছিলেন, স্বয়ং মহাবিষ্ণুর অবতার শ্রীঅদ্বৈত গোঁসাই। আসলে, এটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কোন এক পার্ষদ দ্বারা লিখিত হয়েছে, একটি প্রার্থনা আছে যার নাম গৌর চন্দ্রিকা। গৌর চন্দ্রিকা, আমি ভবিষ্যতে কোন একসময় তা অনুবাদ করতে চাই। এটা এত অসাধারণ এক মহিমাকীর্তন, যেখানে প্রথমত চৈতন্য মহাপ্রভুর সকল ভক্তদের বিষয়ে বলা আছে, এরপর এতে বর্ণিত আছে শ্রীঅদ্বৈত গোঁসাইয়ের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আহবান করার কথা যে কিভাবে তিনি ক্রন্দন করেছিলেন, তিনি ক্রন্দন করেছিলেন ও শালগ্রাম শিলায় তুলসী মঞ্জরী অর্পণ করেছিলেন। আসলে, তিনি ক্রন্দন করছিলেন, কেন? কারণ তিনি দেখেছিলেন যে, “আমি মানুষদের উদ্ধার করতে পারি, তাদেরকে মুক্তি প্রদান করতে পারি। আমি অনেক কিছুই করতে পারি কিন্তু আমি কিভাবে তাদেরকে কৃষ্ণ প্রেম দিতে পারব? কেবল কৃষ্ণই তা করতে পারবেন।  কৃষ্ণ এতই আকর্ষণীয় যে তিনি সম্পূর্ণরূপে সকলের মন অপহরণ করতে পারবেন। তিনিই হচ্ছেন আদি স্বরূপ।” দেখুন, মহাবিষ্ণু হচ্ছেন আংশিক প্রকাশ। তাই তিনি প্রার্থনা করছিলেন যে, “তোমাকে, স্বয়ং তোমাকে অবশ্যই অবতীর্ণ হতেই হবে। তোমাকে নিজেকে অবতীর্ণ হতে হবে ও বদ্ধ জীবদের তোমার প্রেম বিতরণ করতে হবে, নয়ত আর কোন আশা নেই।” তিনি এইভাবে ক্রন্দন করছিলেন, উপবাস করেছিলেন, প্রার্থনা করছিলেন, পূজা করছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে তিনি অপেক্ষা করেছিলেন — “ভগবান, তিনি কি সত্যিই আমার প্রার্থনা শুনেছেন? তিনি বলেছিলেন যে তিনি আসছেন। তিনি কি সত্যিই এটা শুনেছেন? তিনি কি সত্যিই আসছেন?” তার সেই সন্দেহ ছিল… সেই সময় পর্যন্ত তখনও এর কোন ইঙ্গিত ছিল না। 

যখন চৈতন্য মহাপ্রভু… যেমন আমরা গতকাল আলোচনা করছিলাম, কিভাবে নিমাই পণ্ডিত রূপে তিনি নবদ্বীপে বাস করতেন, আর গয়া থেকে ফেরার আগে পর্যন্ত তিনি শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবার কোন লক্ষণ প্রকাশ করেননি। এটি উল্লেখিত আছে যে যখন তিনি গয়া থেকে ফিরে এসেছিলেন, তিনি শ্রীবাস পণ্ডিতকে ডেকেছিলেন এবং বলেছিলেন, “তুমি সকল ভক্তদেরকে বল যে আমি  তাদের সাথে দেখা করতে চাই। আমি গৃহে তাদের সাথে দেখা করব।…” আমার মনে হয়, “...বক্রেশ্বর পন্ডিতের গৃহে” যখন চৈতন্য মহাপ্রভু তার ভক্তিভাব সহ ফিরে এসেছিলেন, সবসময় কৃষ্ণ নাম করছিলেন, সেখানে শ্রীবাস-এর গৃহে এক গাছ ছিল। আপনারা কি সেই গাছ সম্বন্ধে জানেন? তিনি কি জানেন এই সম্পর্কে? এখানে কি এমন কেউ আছে যিনি শ্রীবাসের গাছের সম্বন্ধে জানেন? তাঁর কাছে এক কল্প বৃক্ষ ছিল। [পাশে: প্রভুপাদ বলেছেন যে মন্দিরের দেওয়াল গুলি হচ্ছে আসলে অনন্ত শেষ। কারো অনন্ত শেষের উপর বিশ্রাম করা উচিত নয়।] শ্রীবাসের গৃহে ওঁনার কাছে এক বিশেষ কল্প বৃক্ষ ছিল। সেখান থেকে আপনি যত ফুল তুলবেন, তাতে আরো ফুল হয়ে যেত। ভক্তরা হয়ত পুরো শহরে ফুলের খোঁজ করছেন, আপনার কাছে যদি এমন একটি গাছ থাকে যে আপনি যত ইচ্ছা ফুল তুলবেন, আর তাতে আরো ফুল হয়ে যাবে! সেই জন্য তারা সবাই তার কাছে কাছে যেতেন ফুল তুলতে এবং প্রত্যেকদিন সকালে ঠিক মঙ্গল আরতির পর তারা ফুল তুলতেন ও সেখানে সেটি ছিল এক যোগাযোগের কেন্দ্রস্থল। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বাধুনিক। স্বাভাবিকভাবেই তারা নাম করতেন এবং ফুল তুলতেন… আপনারা জানেন যে কিভাবে বৈষ্ণব সমাজে খবর ছড়ায়? কেউ একজন বললেন যে, “আপনি কি জানেন নিমাই পণ্ডিত গয়া থেকে ফিরে এসেছেন, পুরোপুরি ভক্তিভাব নিয়ে। তিনি সব সময় নাম করেন — হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে এবং তিনি কেবল কৃষ্ণকে ভালবাসতে বলছেন, তিনি ভক্তদের সাথে দেখা করতে চান।” “কি? হরিবোল! হরিবোল! নিমাই পণ্ডিত তিনি শুদ্ধ বৈষ্ণব হয়ে গেছেন!” তারা সবাই চিৎকার করলেন ও হুংকার করে আনন্দে লাফাচ্ছিলেন। এমনকি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন (আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর পরিষেবা প্রদায়ক) এই ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সমগ্র নবদ্বীপে এই খবর ছড়িয়ে গিয়েছিল। প্রত্যেক বৈষ্ণব জেনে গিয়েছিলেন। (একে অপরে কানে কানে বলছেন) “তুমি শুনেছো?” এইরকম। মুখের কথার থেকে অধিক দ্রুত, এই হচ্ছে দিব্য শব্দ তরঙ্গ। এরপর প্রত্যেকে বক্রেশ্বর পণ্ডিতের গৃহে এসেছিলেন — মুকুন্দ, মাধব, গোবিন্দ ঘোষ এবং অন্যান্য বিভিন্ন ভক্তরা এসেছিলেন। তখন এমনকি গদাধর সেই গৃহে লুকিয়ে ছিলেন, তিনি তখনও কিছুটা… তিনি ঘরের ভিতরে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি নিজেকে আসলে প্রকাশ করতে চাননি কারণ আগে তার নিমাই পণ্ডিতের সাথে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। নিমাই যখন এসেছিলেন, তিনি সেই স্থানে এসেছিলেন, ভক্তরা জপ করছিলেন, পড়ছিলেন, তখন চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি এলেন, তিনি ভক্তদের দেখলেন এবং তিনি খুঁটি দেখেছিলেন। আসলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মনোভাব সেই সময় এমন ছিল, যা আপনি আসলে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন না। তাঁর ভাব এত তীব্র ছিল যে তিনি কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধ প্রেম প্রকাশ করেছিলেন, যাতে এমনকি পাথরও গলে গিয়েছিল। কেউ এর আগে কৃষ্ণের প্রতি এমন তীব্র প্রেমের অভিজ্ঞতা লাভ করেননি। তা এত তীব্র ছিল। 

একটি উদাহরণ হচ্ছে বাস্তবিক… বাস্তবে জীবনে, বিভিন্ন ঘটনায় তিনি আসলে কৃষ্ণের প্রতি তাঁর প্রেমের কারণে পাথর গলিয়ে ফেলেছিলেন। কোন ভক্তেরই অবশ্য এর আগে এই অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা জানতেন যে নিমাই পণ্ডিত হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত বা শহরে তিনি হচ্ছেন বিশেষ বিখ্যাত ব্যাক্তি এবং তাদের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন এমন একজন ভক্ত, যিনি একটু জড়জাগতিক, আগে এর অধিক আর ওঁনার সাথে তাদের কোন সঙ্গ হয়নি। তিনি ছিলেন একজন কর্মীর মত, খুবই পাণ্ডিত্যপূর্ণ কিন্তু সেই স্তরের। প্রথমবারের মতো তারা তাঁকে দেখছিলেন, তিনি তাদের কাছে এসেছিলেন এক নতুন ভাব নিয়ে। তারা এর আগে কখনও এরকম দেখেননি। যেমন, যখন জগন্নাথ দর্শন বন্ধ থাকত, তখন চৈতন্য মহাপ্রভু পুরীতে থাকাকালীন ভগবানকে দর্শন করার জন্য এত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন যে তিনি তাঁকে দর্শন করতে পারছেন না, তাই তখন তিনি ১১ মাইল ধাবিত হতেন, আলালনাথ দর্শনের জন্য, যা বেশ দূরে, আমি বলতে চাইছি ১১ মাইল দূরে। তিনি সেই শ্রীবিষ্ণু বিগ্রহের সামনে পর্যন্ত পুরো পথ দৌড়ে যেতেন। খুব সুন্দর শ্রীবিগ্রহ — তন্বী কটিদেশ, বিস্তৃত বক্ষদেশ, সুন্দর, অপরূপ শ্রীবগ্রহ। সেই শ্রীবিগ্রহের এক বিশেষ লীলা আছে যে কিভাবে এক ছোট শিশু স্বয়ং বিগ্রহকে প্রসাদ সেবা করিয়েছিলেন। এটা সম্পূর্ণ অন্য একটি কাহিনী। এরপর, যখন চৈতন্য মহাপ্রভু ধাবিত হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই বিগ্রহের সামনে প্রণাম নিবেদন করেছিলেন, তখন কৃষ্ণের প্রতি বিরহের কারণে তাঁর বপু এত উত্তপ্ত হয়েছিল যে তিনি তাঁর স্বরূপ বিগলিত করে ফেলেছিলেন সেই পাথরের মধ্যে এবং আলালনাথ মন্দিরে সেই পাথর এখনও সেখানে আছে। এমনকি গৌরগম্ভীরা মন্দিরে প্রত্যেকদিন সেই পাথরের পূজা করা হয়। তারা সেই পূজা নিবেদন করেন, যদি আপনি সেই পাথরের পূজা করতে চান, তাহলে তারা তা আমাদের করতে দেন। এটা পুরীতে আছে। এটা পুরীর কাছের শহর ১১ মাইল দূরে আলালনাথে আছে, আলালনাথ। ৭ ফিট: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্ণ অবয়ব, তাঁর হস্ত এবং বক্ষ, সব সহ বপু পাথরে বিগলিত হয়ে গিয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে বিরহ অনুভব করেন তা ভাষাতীত…  সবকিছুর অতীত…  এই হচ্ছে সেই বিরহ যা শ্রীমতি রাধারানী অনুভব করেন, যা এমনকি কৃষ্ণকেও স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। 

এই হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মনির বিরহের স্তর, কারণ তিনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধরাণীর মিলিত তনু। আমরা তা বুঝতে পারবো না। এটা জড়জাগতিক যে কোন কিছুর ঊর্ধ্বে। এটি খুবই…  কেউ হয়ত তা বর্ণনা করার চেষ্টা করতে পারে, কেউ হয়ত মনে করতে পারে, “কি হচ্ছে? এটা কি?” আমরা শব্দের মাধ্যমে কেবল কিছু ইঙ্গিত দেই, বাহ্যিক লক্ষণসমূহের একপ্রকার ধারণা দেই, কিন্তু অবশ্যই আমরা যদি এমনকি কৃষ্ণচেতনার এক বিন্দু মাত্র ভাব অনুভব করতে পারি, তাহলে আমরা বুঝতে পারব বা তা লক্ষ্য কোটি গুন অধিক করলে সেটা কৃষ্ণের প্রতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমের প্রকৃত তীব্রতার যে প্রতিচ্ছায়া তার কাছাকাছি হতে পারে। ঠিক যেমন, নাম জপ করা এবং কৃষ্ণের প্রতি কিছু অনুভবের নামমাত্র অনুভূতি হওয়া। নাম জপের সময় কিছু অনুভূতি হলে, তা কেবল আলোচনার মাধ্যমে যে অনুভূতি হয়, তার থেকে অনেক অধিক। এই জন্য এটি নির্দেশিত হয়েছে যে প্রত্যেকের জপ করা উচিত :

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

নয়ত, তারা প্রকৃতপক্ষে বুঝতে পারবে না কৃষ্ণভাবনামৃত বিষয়টি আসলে কি। এটি খুবই ব্যক্তিগত এক গভীর অনুভূতি, যা তখনই অনুভূত হয় যখন কেউ কৃষ্ণের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত উপলব্ধি বিকশিত করা শুরু করে। কেবল মানসিক স্তরে তা সম্ভব নয়। যদিও আমরাও উপস্থাপন করি … আসলে ভক্ত হওয়ায় বা ভক্তের ভক্ত হওয়ার প্রচেষ্টায় পূর্ববর্তী আচার্যদের কৃপায় আমরা কিছুটা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিন্দুমাত্র উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছি এবং সেই আনন্দ অনুভূতিতে এই সমস্ত শব্দ, আসলে এগুলি শব্দের অতীত, কিন্তু এমন কেউ যার কোন আধ্যাত্মিক কার্য নেই এবং যে আনন্দানুভূতি ব্যতীত কেবল শব্দ শ্রবন করে, তারা আসলে গভীরভাবে অনুসন্ধান  করতে পারে না যে চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা কি — যতক্ষণ না তারা আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে, হরে কৃষ্ণ জপের মাধ্যমে শুদ্ধ হতে শুরু করে, আধ্যাত্মিক গুরু লাভ করে, আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি শরণাগত হয়। এইভাবে আরো নির্দেশিত হওয়ার মাধ্যমে, শুদ্ধ হওয়ার পর, কেউ ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ পরিষদ মণ্ডলীতে স্বীকৃত হয়। এটা কোন উপরিগত বিষয় নয়, আপনাকে শারীরিকভাবে এই স্থান বা ওই স্থানে যেতে হবে না, এটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক স্তরের, তাই সেখানকার প্রবেশাধিকার হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তদের প্রতি শরণাগত হওয়া। এবং শুদ্ধ ভক্তদের কৃপা লাভ করা, সংকীর্তন অনুষ্ঠান, নামকীর্তন করা, ব্যাক্তির আধ্যাত্মিক বাসনা, এই সবকিছুই হচ্ছে প্রবেশ-অধিকার। 

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তিনি অঙ্গনে এসেছিলেন, তিনি ভক্তদের দেখেছিলেন, একজন ভক্ত বাইরে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং তিনি সেই ভক্তের হাত ধরে বললেন, “ওহ কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! আমি আমার জীবনের দীর্ঘ সময় নষ্ট করে ফেলেছি, কেন আমি কৃষ্ণের পূজা করিনি? আমার ভগবান কৃষ্ণ কোথায়? আমি তোমাদের সকলকে বলতে চাই যে আমি কেবল তর্ক করার মাধ্যমে, পাণ্ডিত্য ও শিক্ষাগত কার্যকলাপের মাধ্যমে আমার জীবন বৃথা নষ্ট করে ফেলেছি। এইসবের কি মূল্য আছে?  এখন আমি কেবল প্রচার করতে চাই। কৃষ্ণ! আমি কৃষ্ণের সেবা করতে চাই। আমি কেবল কৃষ্ণকে চাই আর অন্য কোন কিছু নয়। ওহ কৃষ্ণ!” তারপর তিনি চলে গেলেন এবং সেখানে গৃহের ভিতর বড় বড় খুঁটি ছিল, যা খুবই গাঢ় রংয়ের ছিল, তিনি গিয়ে তা আলিঙ্গন করে বললেন, “কৃষ্ণ! কৃষ্ণ!” যখন তিনি তা আলিঙ্গন করেছিলেন, তিনি এত বিরহ অনুভব করেছিলেন যে তিনি সেখানে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, মূর্ছিত হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। যখন তিনি চেতনা হারিয়েছিলেন, তা এত চরম ছিল যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সকল সঙ্গীগণ, সকল ভক্তগণ তারা বিরহে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের চোখ থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছিল এবং তারা সকলে একে একে ভূপতিত হয়েছিলেন, প্লপ! প্লপ! প্লপ! সবাই কেবল ভূমিতে পড়ে গিয়েছিলেন। এমনকি গদাধর সেই গৃহে ছিলেন, তার হৃদয় সম্পূর্ণ… চৈতন্য কৃষ্ণ এবং তিনিও মূর্ছিত হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। গৃহের মধ্যে তখন একজন ভক্ত দেরিতে এসেছিলেন। তিনি এসে তাদের দেখেলেন, দেখছেন প্রত্যেকেই সেখানে মূর্ছিত পড়ে আছেন… “এসব কি হচ্ছে?” (ভক্তরা হাসছেন) এই ছিল…  সব কিছুর শুরু। তারপর সেখান থেকে ভগবান… তারা সকলে…  যখন তাদের জ্ঞান ফিরল, তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “চলো আমরা সবাই কৃষ্ণ নাম কীর্তন করি” এবং তারা সকলে কীর্তন করা শুরু করেছিলেন। তাই এই ছিল প্রারম্ভ, এরপর চৈতন্য মহাপ্রভু প্রাত্যহিক এইসব ভক্তদের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন এবং তারা একত্রে হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করতেন। আমি আপনাদের বলেছি যে কিভাবে তিনি তাঁর ছাত্রদেরকেও এর মধ্যে যুক্ত করেছিলেন, তবে ছাত্ররা অবশ্য অধিক বাহ্যিক স্থিতির ছিলেন। তিনি জানতেন যে, এইসব ভক্তরা তারা জানেন কৃষ্ণ কে, তারা ইতিমধ্যেই কৃষ্ণভক্তিতে অধিক অন্তরঙ্গ, সেই জন্য শ্রীবাসের গৃহে তিনি অপ্রকাশ্য কীর্তন করতেন। তিনি তাঁর সকল ছাত্রদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দিতেন না বা অন্যান্যদেরকে বা বাইরের কাউকে সেখানে প্রবেশ করতে দিতেন না, কারণ তারা এইসব অশ্রু বর্ষণ ও ক্রন্দন করা, কখনো কখনো মূর্ছিত হয়ে পড়া — মহাভাবের এই বিভিন্ন লক্ষণগুলি তারা বুঝতে পারবে না। তাই, তারা পুরো ব্যাপারটির মধ্যে বিষন্নতার কারণ হবে। (ভক্তরা হাসছেন) সেই জন্য, তিনি এটিকে খুবই অন্তরঙ্গ বিষয় হিসেবে গুহ্য রেখেছিলেন।

ভারতে কখনো কখনো ভক্তরা অত্যন্ত ভাবাবিষ্টকর কীর্তন করেন, আমি জানিনা আপনাদের এখানেও সেই রকম হয় নাকি। আমি জানি যে আপনাদের এখানেও অত্যন্ত আনন্দপূর্ন কীর্তন হয়। কিন্তু এই বিশেষ বিষয়টি যেমন ভারতে উদ্দন্ড কীর্তন হয়, তাতে ভক্তরা লাফান, হঠাৎ করে কিছু…  সহজিয়ারা সেখানে থাকে। কোন সহজিয়া ব্যক্তি সেখানে আসবে ও উপর-নিচে ঝাপ দিতে শুরু করবে, তারা এমনকি ঠোঁট হেলায় না, নাম করে না, কিন্তু লোক দেখানোর জন্য এক প্রকার এমন কাজ করে থাকে এবং এটাই কীর্তনে এক পুরো আকম্পন সৃষ্টি করে। (ভক্তরা হাসছেন) “কী…” “এই ব্যক্তি কোত্থেকে এসেছে?” তাই, বিনয়-নম্রভাবে বলা যাক যে আমাদের ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলনের এই স্তরে এমনকি আমরা এইরকম কিছু অনুভব করতে পারলে, চৈতন্য মহাপ্রভুর ব্যাপারে আর কি বলার আছে? তিনি কৃষ্ণ প্রেমে সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন। কেউ সেখানে এসে কোন প্রকার নিজের বৈশিষ্ট্যে আলোকপাত করতে চাইলে, তাতে পুরো ব্যাপারটি নষ্ট হয়ে যাবে। এমনকি যদি কেউ কেবল সেখানে উঁকি মারে এবং কোন যোগ্যতা ছাড়াই সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলেও এমনই হবে। আপনাকে সেখানে শ্রীগুরুদেবের কৃপায়, চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় প্রবেশ করতে হবে। এমন নয় যে প্রত্যেকেই সেখানে যেতে পারেন। তিনি প্রত্যেককেই অনুমতি প্রদান করবেন, তবে এর জন্য আপনাকে সামান্য আধ্যাত্মিক বাসনা রাখতে হবে। বাসনা রাখতে হবে, তাহলে তিনি তাদের প্রবেশের অনুমতি প্রদান করবেন। মানুষেরা কখনো কখনো দরজা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত, চৈতন্য মহাপ্রভুর কীর্তন শুনত, বলত, “এই সেখানে কি হচ্ছে?” এরা ছিল ঈর্ষাপরায়ণ জাত ব্রাহ্মণরা, তারা আলোচনা করত, “ওহ আমার মনে হয় তাদের এক প্রকার ভোজ অনুষ্ঠান হচ্ছে, দেখো তারা চিৎকার করছে ও হাসছে। এসব কি হচ্ছে?” তখন তারা হাসত এবং তাদের মধ্যে কেউ বলত, “তারা হয়তো কোন কালো জাদু, তন্ত্র করছে।” অন্য কেউ বলত, “না! না! তারা তন্ত্র করে না, তারা তো বৈষ্ণব।” “আপনারা কখনোই বলতে পারবেন না সেখানে কি হচ্ছে।”  এইভাবে তারা কল্পনা করত এবং নিন্দা করত। এরপর সেখানে এক ভক্ত আসলেন এবং তিনি বললেন, “আপনারা কি মনে করেন যে কেন তারা আমাদেরকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয় না? আপনারা কি মনে করেন যে সেখানে কি হয়? আমার মনে হয়, আমরা সেখানে যেতে পারি না কারণ আমরা হচ্ছি সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এতটাই দুর্ভাগ্যজনক যে আমাদের শুদ্ধভক্তির কোন গুণ নেই, আর তাই আমরা সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাই না। যারা সেখানে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে, তারা খুবই সৌভাগ্যবান।” “নাহ! তারা নিশ্চয়ই কোন কিছু একটা করছে।” “আহ, তারা হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন ছাড়া আর কিছুই করছে না। তারা সব থেকে শুদ্ধ কাজ করছে।” “তুমি হচ্ছো তাদের একজন, তাই তো?” তারপর তারা কোন এক প্রকার নিন্দা করত, “আহ তুমি হচ্ছ তাদের মধ্যে একজন।” 

অবশ্য বৃন্দাবন দাস ঠাকুর, তিনি বর্ণনা করেছেন যে, এমনকি সেই সমস্ত মানুষেরা কিছুটা ঈর্ষাপরায়ণ হওয়ার কারণে সেখানে প্রবেশের অযোগ্য, কিন্তু তবুও আমরা তাদের প্রশংসা করতে পারি যে তারা খুবই মহিমান্বিত, কারণ তারা অন্তত দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সেই কীর্তন শ্রবণ করেছে যা জীবের পক্ষে কোনকিছু বলার থেকেও অনেক অনেক অধিক কিছু। আমাদের এমনকি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সৌভাগ্য হয়নি, তাহলে সেখানে প্রবেশের আর কি কথা? তবে তারা অন্তত সেখানে হেঁটে যেতে এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর কিছু কীর্তন শ্রবণ করতে সক্ষম হয়েছে। মায়াপুরে আমি নিশ্চিত যে যখন সব ভক্তরা শ্রীবাস-এর গৃহে যান, তারা সকলে শ্রবন করেন, এই আভাস লাভের আশা করেন যে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন কীর্তন এখনও চলছে, কখনও কখনও সৌভাগ্যবান ভক্তরা তারা সেই কীর্তন শ্রবণ করতে সক্ষম হন।

“অদ্যাপিহ সেই লীলা করে গৌর রায়,
কোনো কোনো ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।”
 

সেই সমস্ত লীলাসমূহ এখনও চলছে, এমনকি আজও চলছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা এমনকি জগতের বিভিন্ন স্থানে হচ্ছে। তিনি কখনো কখনো আবির্ভূত হন, কখনো কখনো প্রকাশ্যে এবং কখনো কখনো অপ্রকাশ্যে লীলা করেন। ভক্তরা তাঁর উপস্থিতির দ্বারা আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা অনুভব করেন, তবে চৈতন্য মহাপ্রভু … ভক্তরা কিভাবে ওঁনাকে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ রূপে প্রকাশ করেছিলেন? তারা এসে কীর্তন করার পর তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি হচ্ছেন এক মহান ভক্ত, তিনি ছিলেন সকলের অনুপ্রেরণা এবং তারা এটি দেখতে পারতেন যে তাঁর প্রেম এবং ভক্তি এত তীব্র যে তা কারও উপর বিশাল প্রভাব ফেলত। তখন তৎক্ষণাৎ… অত্যন্ত বিনয়বশত, তারা তার চারিপাশে আসতেন এবং এমনকি তারা বয়ঃজ্যেষ্ঠ ছিলেন, এবং তিনি তাদের সাথে খুবই শ্রদ্ধাপূর্ণভাবে ব্যবহার করতেন, তারা জানতেন যে তিনি হচ্ছেন এমন একজন যিনি আসলে এমনকি পুরো সংকীর্তন আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করতে পারেন। কিন্তু তারা আসলে এটা বুঝতে পারতেন না যে তিনি হচ্ছেন কৃষ্ণ। এই ধারনা কিছুজনের ছিল যে তিনি নিশ্চয়ই… তিনি কোন সাধারণ মানুষ হতে পারেন না, কোন সাধারণ ব্যক্তির এত তীব্র প্রেম ও এইসব গুনাবলী থাকতে পারেনা, তাই তিনি একজন সাধারণ মানুষ হতে পারেন না, কিন্তু আসলে তিনি কি কোন দেবতা যিনি নিন্মে অবতরণ করেছেন অথবা তিনি কি কোন অবতার নাকি তিনি ভগবানের কোন নিত্য পার্ষদ সেটা অবশ্য সবসময় রহস্যের মধ্যে ছিল এবং তারা জানতেন যে তিনি একজন বিশেষ ব্যক্তি, কিন্তু কেউই অবশ্য সনাক্ত করতে পারেননি। 

একদিন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি যখন শ্রীবাসের গৃহে এসেছিলেন, তিনি ভিন্ন মনভাবে ছিলেন। চৈতন্য মহাপ্রভু সবসময় ভক্তি ভাব নিয়ে থাকতেন। এমনকি কেউ যদি এটা উপলব্ধি করতেন যে তিনি হচ্ছেন কৃষ্ণ এবং বলতেন, “আপনি হচ্ছেন বিষ্ণু।” বলতেন, “আপনি হচ্ছেন কৃষ্ণ।” তখন তিনি তাঁর কর্ণ আবৃত করে বলতেন, “বিষ্ণু! বিষ্ণু! বিষ্ণু! না, কখনও একজন ভক্তকে ভগবান বলবে না। এটা মহা অপরাধ।” যদি কেউ ভক্ত রূপে তার সেই মনোভাব ভঙ্গ করত, তাহলে তা ছিল এক মহা অপরাধ। তিনি তা কখনোই সহ্য করতেন না। এরপর একসময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এসেছিলেন এবং এমন কিছু সময় ছিল, যখন চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি ভূপতিত হতেন, তিনি ভক্তের আচরণ করতেন। তবে আসলে তাঁর প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে কৃষ্ণ এবং তিনি ভক্তের ভূমিকা পরিগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু বিশেষ ঘটনা হত যা ওঁনাকে বিশেষভাবে ভাবাবিষ্ট করত, তখন তিনি নিজে ভগবানের মনভাবে নিবিষ্ট হতেন। ঠিক যেমন, যখন তিনি নরসিংহ নাম শ্রবণ করেছিলেন, তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি নরসিংহদেবের রূপ গ্রহণ করেছিলেন। এমনও একটি লীলা আছে, যেখানে তিনি বরাহ রূপ ধারণ করেছিলেন এবং মুরারি গুপ্তের গৃহে কিছু একটা তুলে ধরেছিলেন। এইরকমই এমন কিছু বিরল ঘটনা ছিল যেখানে তিনি বিষ্ণুরূপ ধারণ করেছিলেন বা যেমন যখন তিনি সেই ব্রাহ্মণ-এর কাছে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেছিলেন, যিনি অনেকবার প্রসাদ নিবেদনের চেষ্টা করেছিলেন। তবে, এইবার চৈতন্য মহাপ্রভু এসেছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনোভাবে ছিলেন। তিনি শ্রীগ্রহের বেদীতে বসে পড়েছিলেন। কেউই শ্রীবিগ্রহের বেদীতে বসে না। আপনি শ্রীবিগ্রহের বেদীতে বসতে যাবেন না, কোন ভক্তই কখনও শ্রীবিগ্রহের বেদীতে বসেন না। একমাত্র যিনি শ্রীবিগ্রহের বেদীতে বসেন, তিনি হচ্ছেন স্বয়ং সেই শ্রীবিগ্রহ। 

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, এই সময় সম্পূর্ণরূপে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের ভাবে ছিলেন এবং প্রত্যেকেই বুঝতে পারছিলেন যে তা খুবই বিশেষ এবং ভিন্ন কিছু। তৎক্ষণাৎ তিনি শ্রীবাসের কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে ডেকেছিলেন এবং বলেছিলেন, “তুমি যাও এখনই এবং তুমি অদ্বৈতকে গিয়ে বলো যে যেই ভগবানের জন্য তিনি তপস্যা করেছিল, যেই ভগবানকে আনার জন্য তিনি উপবাস করেছিল, যেই ভগবানকে আনার জন্য তিনি পূজা করেছিল, যেই ভগবানকে এই জড় জগতে অবতরণের জন্য তিনি উচ্চস্বরে হুংকার করেছিল, তিনি এখন নদীয়ায় আছেন। তুমি এক্ষুনি তাকে নিয়ে এসো। তুমি তার স্ত্রীকেও পূজার সমস্ত সামগ্রী সহ তাঁর সাথে আসতে বল।” তার নাম ছিল রামাই পণ্ডিত। তিনি দৌড়ে গিয়েছিলেন, গৃহের বাহির পর্যন্ত পুরো পথ তিনি দৌড়ে গিয়েছিলেন, তিনি অদ্বৈত-এর গৃহের দিকে ধাবিত হয়েছিলেন কিন্তু যখন তিনি যাচ্ছিলেন, তখন তার স্মরণ হলো যে তিনি জানেন না অদ্বৈত কোথায় থাকেন। তিনি এটা জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গিয়েছিলেন এবং এর আগে কখনও তিনি সেখানে যাননি। (ভক্তরা হাসছেন) কিন্তু তিনি দৌড়াচ্ছিলেন… তিনি… যখন তিনি এই আদেশ পেয়েছিলেন, তিনি এত উৎসাহিত হয়েছিলেন যে তিনি ‘হরে কৃষ্ণ’ নাম করতে করতে ছুটেছিলেন এবং তারপর হঠাৎ তার এই কথা মনে পড়েছিল যে তিনি কাউকে জিজ্ঞেস করেননি যে উনি কোথায় থাকেন। তারপর, তিনি একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “অদ্বৈতের গৃহ কোথায়?” “ওহ! তিনি তো এইখানেই থাকেন।” সেই গৃহ ছিল একদম তার সামনেই। (হাসি) তারপর তিনি অদ্বৈত-এর গৃহে আসেন এবং যখনই তিনি সেখানে আসলেন,  এমনকি তার প্রণাম নিবেদন করতে পারার পূর্বেই, কোনকিছু বলার পূর্বেই, অদ্বৈত সেখানে বসেছিলেন, তিনি লাফ দিয়ে উঠলেন, তিনি তার দিকে তাকালেন ও তার দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলতে শুরু করলেন, এই সব কিছু স্বতঃস্ফূর্তভাবেই হচ্ছিল —- “এটা কিভাবে সম্ভব যে ভগবান এই কলিযুগে আসবেন? ভগবান কখনও কলিযুগে আসেন না। তিনি ত্রিযুগ নামে পরিচিত এবং কেন তিনি এই নদীয়াকে তাঁর অবতরণের স্থান হিসেবে বেছে নেবেন?” তখন রামাই পণ্ডিত ভাবলেন, আমি তো কিছুই বললাম না! তিনি জানতেন অদ্বৈত গোঁসাই হচ্ছেন খুবই অদ্ভুত স্বভাবের এবং ওঁনার মধ্যে এমন কিছু আছে যা প্রকৃতপক্ষে কেউই কখনো বুঝতে সক্ষম নয়। তাই তখন তিনি কেবল তার প্রণাম নিবেদন করলেন এবং সেখানেই বসে পড়লেন, কোনকিছুই বললেন না। এরই মাঝে অদ্বৈত এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছিলেন, আর কিছু বলছিলেন না, তিনি বিভিন্ন কিছু করছিলেন ও তার পূজা, বিভিন্ন কিছু প্রস্তুত করছিলেন। তারপর তিনি শান্ত হয়ে গেলেন এবং বললেন, “তুমি কি চাও? তুমি এখানে কেন এসেছ?” তখন রামাই বললেন, “এখন আমি সুযোগ পেয়েছি!” তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন ও বললেন, “যেই ভগবানের জন্য আপনি উচ্চ রব করে প্রার্থনা করেছিলেন, তিনি এসেছেন। আপনি যেই ভগবানের পূজা করেছিলেন, তিনি এসেছেন। যাঁর অবতরণের জন্য আপনি উপবাস করেছিলেন, তিনি আধ্যাত্মিক জগত থেকে এসেছেন। সেই ভগবান যাঁর জন্য আপনি ক্রন্দন করেছিলেন, তিনি এসেছেন। তিনি এখানে নদীয়ায় আছেন। তিনি আপনার অপেক্ষায় আছেন। আপনি আপনার পূজার সামগ্রী ও স্ত্রী সহ চলুন।” যখন অদ্বৈত তা শুনলেন, তিনি লাফ দিয়ে উঠলেন, “হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল! ভগবান এসেছেন! তিনি এসেছেন! তিনি এসেছেন! হরিবোল! হরিবোল! তিনি এসেছেন! তিনি এসেছেন!” তিনি উল্লম্ফন করছিলেন, তিনি এত আনন্দিত ছিলেন, “তিনি এসেছেন! তিনি এসেছেন! তিনি আমার ডাক শুনেছেন।” তারপর কয়েক মিনিট উল্লম্ফন করা, উচ্চরব করা এবং সম্পূর্ণ ভাবাবিষ্ট হয়ে আনন্দ প্রকাশের পর, তিনি খুব শান্ত হয়ে গেলেন, “আমি কি করে জানব যে তিনি হচ্ছেন সেই ভগবান? আমি কি করে জানব যে তিনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তিনি কোন প্রতারক নয়? প্রমাণ কোথায়? আমি যাব না। তুমি তাঁকে বল যে আমি আসব না।” “আপনি আসবেন না.. আমি কিভাবে এইসবের মধ্যে পড়লাম? এখন আমার কি করণীয়?” তিনি শুধু সেখানে বসেছিলেন, এটি উপলব্ধ করছিলেন যে সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তারপর অদ্বৈত গোঁসাই তিনি খুবই নিরব ছিলেন এবং তিনি বললেন, “ঠিক আছে, তুমি তাঁকে গিয়ে বল আমি আসব না। তুমি যাও তাঁকে বল আমি আসছি না, কিন্তু আমি যাব এবং নিকটবর্তী স্থানে লুকিয়ে থাকব। আমি দেখব যে তিনি কি করেন। যদি তিনি জানেন যে আমি লুকিয়ে আছি, তাহলে আমি বুঝব যে তিনি হচ্ছেন পরমাত্মা। যদি তিনি আমাকে ডাকেন এবং যদি তিনি জানেন যে আমি লুকিয়ে আছি, তাহলে তিনি আমাকে ডাকবেন এবং আমার বলার পূর্বেই তিনি আমার কাছে তাঁর সচ্চিদানন্দ আধ্যাত্মিক স্বরূপ প্রকাশ করবেন এবং এরপর যদি তিনি তাঁর শ্রীপাদপদ্ম আমার মস্তকে স্পর্শ করান, তাহলে আমি বুঝব যে তিনি হচ্ছেন আমার হৃদয়ে থাকা ভগবান, তিনি সব জানেন। নয়ত আমি নিশ্চিত হব না। আমি কিভাবে বিশ্বাস করব? তুমি তাঁকে গিয়ে বল আমি আসব না।” এর মাঝে, সীতা দেবী ইতোমধ্যেই আরতির থালা প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন। তিনি কোন সময় নষ্ট করছিলেন না, যদি উনিই ভগবান হন তাই। তিনি ছিলেন এক কুশলী স্ত্রী। স্ত্রী মানে হচ্ছে তিনি এই জ্ঞানে অত্যন্ত দক্ষ যে কিভাবে কৃষ্ণের সেবা করতে হয়। তাই তিনি তার স্বামীকে সহায়তা করতে তত্ক্ষণাত কৃষ্ণ পূজার সমস্ত কিছু প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন।  তিনি তাকে বলতে যাচ্ছিলেন, “ঠিক আছে আরতির থালা নাও… ঠিক আছে। চলো যাওয়া যাক।” (দ্রুত চলার আওয়াজ করলেন) তারা দৌড়ে গেলেন এবং শ্রীবাসের গৃহের কাছে একটি গৃহে লুকিয়ে পড়লেন, কাউকে কোন কিছু না বলেই। তখন রামাই পণ্ডিত ফিরে এলেন, তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে তাঁর প্রণাম নিবেদন করলেন, তার কোন কিছু বলার আগেই চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর প্রতি  উচ্চ স্বরে বলতে লাগলেন, “অদ্বৈত এইসব কি চালাকি করছে? তিনি আমার থেকে লুকানোর চেষ্টা করছে? তিনি আমার থেকে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করছে? নারা! নারা!” তিনি এই ডাক নামে ডাকতেন, ‘নারা’ —মানে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন বৈষ্ণব। তিনি ডাকলেন, “হে অদ্বৈত! অদ্বৈত! বেরিয়ে এসো! বেরিয়ে এসো! আমি জানি তুমি লুকিয়ে আছো, তুমি কি করার চেষ্টা করছ? এখানে এসো, এক্ষুনি!” তখন অদ্বৈত, স্ফিউ! ধরা পরে গেছেন, তাই তিনি এগিয়ে এলেন ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর থেকে কিছুটা দূর থেকে তাঁকে তাঁর প্রণাম নিবেদন করলেন এবং যখন তিনি উপরে তাকালেন,  তখন আর নিমাই পণ্ডিতের স্বরূপ ছিল না, সেখানে পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু লক্ষ লক্ষ সূর্যের থেকেও অধিক দীপ্তিমানভাবে প্রকাশমান ছিলেন এবং তাঁর চারপাশের সমগ্র জড়জগৎ সেই দীপ্তির কারণে অন্ধকারময় হয়ে গিয়েছিল। তখন নিত্যানন্দ প্রভু এলেন এবং ঠিক অনন্ত শেষের মতো তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উপর ছত্র ধরলেন ও অন্যান্য ভক্তরাও সেখানে ছিলেন, মহাপ্রভুকে চামর ব্যজন করছিলেন। চারিদিক থেকে সেই যে দীপ্তি প্রকাশ হচ্ছিল তার মধ্যে কেবল এই সমস্ত ভক্তদেরই কেবল দেখা যাচ্ছিল, বাকি সমগ্র জড়জগত ব্রহ্ম জ্যোতির কারণে অন্ধকারময় হয়ে গিয়েছিল। সেখানে অদ্বৈত গোঁসাই দেখছিলেন বিভিন্ন দেবতাদের, তারা এসেছিলেন, শিব, ব্রহ্মা, নারদ এসে তাদের প্রার্থনা নিবেদন করছিলেন। তারা সকলে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের প্রতি তাদের প্রার্থনা নিবেদন করছিলেন। এমনকি মা গঙ্গা এবং অন্যান্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করছিলেন। 

তারপর চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি তাকে ডাকলেন, “তুমি আমাকে ডেকেছিলে, তাই আমি এসেছি। তুমি এখানে এসো।” এবং  যখন তিনি এমন বললেন, তখন অদ্বৈত ঠাকুর ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মে পতিত হয়েছিলেন। চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর শ্রীচরণপদ্ম অদ্বৈত-এর মস্তকের উপর রেখেছিলেন, তিনি বললেন, “তুমি আমাকে ডেকেছ, তাই আমি এসেছি। তোমার হুংকার আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে” এবং তিনি যখন তা বললেন, তখন অদ্বৈত উল্লম্ফন করলেন ও আনন্দে ভাববিষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন — “আমি পরমেশ্বর ভগবানকে এখানে এনেছি! আমার হুংকার, আমার ক্রন্দন তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছে! তিনি এসেছেন এবং আমি তাঁকে এনেছি! হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল!” তিনি উল্লম্ফন করছিলেন, “আমি তাঁকে এখানে এনেছি! আমি তাঁকে এখানে এনেছি!” এইভাবে তিনি এক দিব্য অহংকার অনুভব করছিলেন যে কোন না কোনভাবে ভগবান তাঁর ডাক শুনে আবির্ভূত হয়েছেন এবং তাই তিনি উচ্চ-নিচ উল্লম্ফন করছিলেন। কখনও স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন, ভাববিষ্ট হয়ে পরছিলেন এবং তখন সব ভক্তরা, তারা কীর্তন করতে শুরু করেছিলেন —  

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে 

তারপর অদ্বৈত গোঁসাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পূজা করেছিলেন, তাঁর স্ত্রী আরতির সামগ্রী এনেছিলেন এবং তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর পূজা করা শুরু করেছিলেন। তিনি সেই পূজা করেছিলেন তাঁর শ্রীপাদপদ্মে তুলসী অর্পণ করে। দেখুন, তুলসী কেবল ভগবানের শ্রীচরণেই অর্পণ করা যায়, অন্য কোন ভক্তের চরণে নয়। ভক্ত… হাতে দেন এবং নাম করেন অথবা মাথায় দেন, কিন্তু কেবল পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীচরণপদ্মেই তুলসী নিবেদন করা যায়। এটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দিক যে অদ্বৈত গোঁসাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে পরম পুরুষোত্তম ভগবানরূপে গ্রহণ করেছিলেন। তারপর অন্যান্য ভক্তরা যারা সেখানে ছিলেন, তবুও তাদের কিছু সন্দেহ ছিল কারণ তারা সেই দিব্য দর্শন লাভে সক্ষম ছিলেন না। তারা দেখছিলেন যে অদ্বৈত আচার্য দেখছেন, তবে প্রত্যেকেই যে তা দর্শন করতে পারতেন, সেটা নয়। তারপর তারা চৈতন্য মহাপ্রভুর স্বরূপ এবং সকল দেবতার যারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন ও সবকিছু দর্শন করতে পেরেছিলেন, তাদেরকে সেই দৃষ্টি শক্তি প্রদান করা হয়েছিল। এই হচ্ছে অন্তরঙ্গ পার্ষদ মন্ডলী। অদ্বৈত ঠাকুর পুরো পূজা করেছিলেন, তাঁর প্রণাম নিবেদন করেছিলেন, তারপর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু… অবশ্য এই হচ্ছে মুখ্য বিষয়, সেখানে চৈতন্য মহাপ্রভু অদ্বৈত গোঁসাইকে বিশেষ কৃপা প্রদান করেছিলেন। কিন্তু হয়তো…  সেটা অন্য কোন সময় বলা যাবে, কারণ তা বলার এখন আর কোন সময় নেই।

ভক্ত: শেষ! (হাসি)

জয়পতাকা স্বামী: হুহ?

ভক্ত: আরো কিছুটা সময় আছে। (ভক্তরা হাসছেন)

জয়পতাকা স্বামী: এরপর, চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি অদ্বৈতকে বললেন, “তোমাকে আমার থেকে কোন বর নিতেই হবে।” “তোমাকে একটা বর নিতেই হবে। একটা আশীর্বাদ তোমাকে আমার থেকে গ্রহণ করতেই হবে।”

তারপর অদ্বৈত বললেন, “না! না! আমার কোন কিছু চাই না। আপনি এখানে এসেছেন, আপনি আপনার কৃপা প্রদান করতে এখানে অবতরণ করেছেন, আপনি আমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন, আমার আর কোন ইচ্ছা নেই। আমি সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত। আমার অন্য কোন বাসনা নেই। আমি আর কিছু চাই না।”

“না! তোমাকে গ্রহণ করতেই হবে। একটা বর তোমাকে নিতেই হবে।”

“কোন কিছুই না, আমার কোন কিছুই চাই না।”

“তোমাকে একটি বর নিতেই হবে!”

“আমার কোন কিছুই দরকার নেই। আপনি আমাকে সব কিছুই দিয়েছেন। আমার আর কোন কিছুর দরকার নেই।”

“না!... না! একটা কিছু তোমাকে নিতেই হবে। তুমি কি চাও? তুমি মুক্তি চাও? তুমি এইটা চাও? তুমি চাও…”

“কোন কিছুই নয়। আমার কোন কিছু দরকার নেই। আপনি এসেছেন সেটাই যথেষ্ট।”

“একটা কিছু। তোমাকে কিছু গ্রহণ করতেই হবে।”

তাই অদ্বৈত, তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়েছিলেন, তাই তাকে একটা কিছু নিতেই হত। তিনি বলছিলেন, “না! না! আমি কিছু চাই না। আমি কোন ব্যবসার চুক্তি করছি না। আপনি এখানে এসেছেন সেটাই যথেষ্ট। আমি এর বদলে আর কিছু চাই না। আমি আপনাকে এই জন্য ডাকিনি যে আমার কোন কিছু চাই।”

“না তোমাকে নিতেই হবে, তুমি আমাকে ডেকেছ, আমি এসেছি। এখন তোমাকে একটা বর নিতেই হবে। একটা বর।”

তাই, অবশেষে অনেক বলার পর অদ্বৈত গোঁসাই সহমত হলেন— “ঠিক আছে যদি আমাকে গ্রহণ করতেই হয়, তাহলে এটাই হচ্ছে আমার একমাত্র ইচ্ছা, আপনার প্রতি আমার একমাত্র আবেদন, এই অবতারে আপনি এখানে এসেছেন, আমার বিনীত অনুরোধ হচ্ছে যে, আপনার অন্যান্য অবতারে আপনি কেবল অত্যন্ত উচ্চ গুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণদেরকে, অতি উচ্চ গুনসম্পন্ন ক্ষত্রিয়দেরকে, অতি গুণী ব্যক্তি যারা খুবই উচ্চ স্থিতিতে অবস্থান করছেন, তাদেরকে সবসময় আপনার কৃপা প্রদান করেন কিন্তু এই অবতারে আমার বিশেষ অনুরোধ যে আপনি সবথেকে পতিত জীবদের আপনার কৃপা প্রদান করুন। আপনি সরল ব্যক্তিদেরকে আপনার কৃপা প্রদান করুন, এমনকি যে ব্যক্তিরা অন্যথায় আর কোন সুযোগ পাবে না, এই অবতারে আপনার কৃপা যাতে সেই সব ব্যক্তিদের কাছে উপলব্ধ হয়, যাদের আর কোন আশা নেই। এটাই আমার বিশেষ অনুরোধ। কেবল অত্যন্ত যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নয়, এমনকি যাদের কোন যোগ্যতা নেই, তাদেরকেও আপনি সুযোগ প্রদান করুন, তাদেরকেও আপনি উদ্ধার করুন, তাদেরকে এই সুযোগ পেতে দিন।”

তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “তথাস্ত! তাই হোক!”

“নাহ এটাই সব নয়। আপনি আমাকে শেষ করতে দিলেন না। এর আরেকটি অংশ আছে।”

“সেটা কী?”

তারপর তিনি বললেন, “আরেকটি বিষয় হচ্ছে যে যেই সমস্ত মানুষেরা উদ্ধত, যারা অহংকারী, যারা তাদের যা কিছু গুণ আছে সেই জন্য অহংকারী এবং যারা মনে করে যে তাদের যোগ্যতার কারণে তারা আপনার কৃপা লাভ করতে পারবে, সেইসব মিথ্যা অহংকারী ব্যক্তিবর্গ, যারা আপনার ভক্তদের সম্মান করে না, যাদের নিজেদের মধ্যে কোন বিনম্রতা নেই, যারা নিজেদের মিথ্যা অহংকারের কারণে বিভ্রান্ত, তাদেরকে আপনার কৃপা প্রদান করবেন না, এমনকি যদি তারা উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন হয় তবুও।”

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি সম্মত হলেন, “ঠিক আছে! এটা তোমার ইচ্ছা, তথাস্তু! তাই হোক! এটাই হবে আমার মনের ভাব।” 

যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা চেয়েছিলেন, চৈতন্য মহাপ্রভু তাদের সকলকে সবসময় অবাধে তাঁর কৃপা প্রদান করেছিলেন। সব ভক্তরা তখন নাম কীর্তন করতে শুরু করেছিলেন :

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে 
 

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই সময় তাঁর প্রকৃত আধ্যাত্মিক স্বরূপ, পরম পুরুষোত্তম ভগবানের ভাব প্রকাশ করছিলেন। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি আবার তাঁর ভক্ত মনভাবে ফিরে গিয়েছিলেন। তখন সবকিছুই অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল, তখন অদ্বৈত তাঁর সামনে মাথা নত করতে পারতেন না, তিনি তাঁকে একজন অগ্রজের মতো সম্মান করতেন। এটি ছিল এক বিরল মুহূর্ত যখন চৈতন্য মহাপ্রভু সেই ভাবে আসতে চাইতেন, ও তারপর তিনি সেই ভাবে আসতেন। নয়ত তাঁর পুরো লীলায় কেবল কিছু সময়ই তিনি সেইরকম ভাব পরিগ্রহ করেছিলেন। এই বিশেষ ঘটনার পর এক বিখ্যাত ঘটনা হয়েছিল, সেই ঘটনার খুব একটা পড়ে নয়, তাঁকে ২১ ঘন্টা আরতি নিবেদন করা হয়েছিল এবং কীর্তন হয়েছিল। কত ভক্তরা সেখানে এসেছিলেন এবং চৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেক ভক্তের কাছে এটা প্রকাশ করেছিলেন যে পূর্ববর্তী অবতারী, কৃষ্ণ লীলায় কৃষ্ণের সাথে তাদের এক একজনের প্রকৃত আধ্যাত্মিক সম্বন্ধ কি ছিল। সেটাও এক অসাধারণ লীলা। 

অদ্বৈত গোঁসাইয়ের এই ইচ্ছা ছিল যে প্রত্যেকে যাতে সুযোগ পায়। তবে একই সময় যারা অত্যন্ত মিথ্যা অহংকারী, যারা অন্যান্য ভক্তদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ন, যারা অহংকারী, তারা মনে করে যে, “এখন আমি এতকিছু করেছি, তাই আমি চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা লাভ করব।” এর ফলে তারা সরে যায়। এটা হচ্ছে এমন কিছু যা ভক্তরা সাধারণত উপলব্ধি করে না। ঠিক যেমন মহান মহাত্মাগন, যেমন রূপ ও সনাতন, তারা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তারা সরকারের শক্তিশালী মন্ত্রী ছিলেন। তারা শাস্ত্রে পূর্ণ জ্ঞানবান ছিলেন, তারা প্রাত্যহিক ভাগবত শ্রবণ করতেন। তারা এত পাণ্ডিত্যপূর্ণ ছিলেন, কিন্তু তারা চৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে মুখে তৃণ নিয়ে গিয়েছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তা দেখে ক্রন্দন করছিলেন যে তারা এত বিনম্র, তারা পুরো সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ পদে আছেন। কেউ তাদের থেকে বেশি বৈষ্ণবগুণ সম্পন্ন বা উচ্চ জাগতিক পদে আসীন নেই, কিন্তু তারা কুকুরের মত মুখে তৃণ নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেছিলেন, “তাদের এই বিনম্রতা কারণে আমি ক্রন্দন করছি। তা আমাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে।” এই হচ্ছে পন্থা…  যদি আপনি শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা লাভ করতে চান,  আপনি যদি এই কেলেঙ্কারি করেন যে, “আমি চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা লাভের যোগ্য কারণ আমি এত বছর ধরে সংকীর্তন করেছি, আমি এত বাসন ধুয়েছি বা এই করেছি ওই করেছি।” তাহলে এর মানে এই নয় যে আমরা কৃপা লাভের যোগ্য। আমরা তা ক্রয় করতে পারি না। এমন কিছুই নেই যার ফলে আমরা তা লাভের করতে পারি। তা এতই মূল্যবান! আমরা যেটা করতে পারি তা হচ্ছে, “আমরা সেবা করছি আপনার প্রসন্নতার জন্য। এর সমকক্ষ কিছু নেই… আমরা কৃপা লাভের যোগ্য নই।” কিন্তু একমাত্র যেইভাবে আমরা বলতে পারি যে আমরা এটি লাভের যোগ্য তা হচ্ছে, “না আমরা পতিত… পতিতের থেকেও অধিক পতিত।” এটাই একমাত্র উপায় যে একজন ব্যক্তি বিনম্রতাবশত বলবেন, “আমার আপনার কৃপা দরকার, কারণ আপনি অন্য আর কারও থেকে অধিক কৃপাময় এবং আমার থেকে অধিক আর কোন ব্যক্তির তা দরকার নেই।” যদি আমরা সব সময় সেই বিনয়নম্র ভাব গ্রহণ করি, তাহলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিঃসন্দেহে তাঁর কৃপা প্রদান করবেন, কিন্তু যদি আমরা আমাদের মনের মধ্যে চিন্তা করি যে, আসলে আমরা এটির যোগ্য এবং আমরা যদি আত্ম-অহংকারী হয়ে পড়ি, উপেক্ষাপূর্ণ হয়ে পড়ি, উদাসীনচিত্ত হই, আমরা যদি সবথেকে পতিত হওয়ার বদলে অন্য কোন কারণ দেখাই, তাহলে সেটাই হচ্ছে বিপদ, তিনি হয়ত আমাদেরকে কৃপা করবেন না, কারণ তিনি এটা চান না যে… আপনি উর্ধ্বগতিতে এগিয়ে যান, অনেক দূর এগিয়ে যান এবং অহংকারী হয়ে পড়ুন। একজন ব্যক্তিকে বিনীত মনোভাব গ্রহণ করতেই হবে, তারপরে তিনি কাউকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করবেন। এটাই বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, তুমি এই শ্লোকটি তোমার গলার মধ্যে বন্ধন করে রাখো — 

তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা। 
অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ॥ 

রাস্তায় থাকা তৃণের থেকেও অধিক বিনম্র হওয়া, বৃক্ষের থেকেও অধিক সহনশীল হওয়া, সর্বদা অন্যান্যদের সম্মান করতে প্রস্তুত থাকা ও নিজের জন্য কোন সম্মান আশা না করা, এইভাবে কেউ সর্বদা পবিত্র নাম জপ করতে সক্ষম হয় —

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
 

দেখুন আমাদের প্রশংসা করা উচিত যে চৈতন্য মহাপ্রভু যে কৃপা প্রদান করছেন তা কত মহান এবং এই জড় জগতের কোন ব্যক্তি কতটা অযোগ্য বিশেষত আধুনিক জগতে জন্মগ্রহণ করা কোন ব্যক্তি যাদের বাস্তবিক ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক কোন জীবন নেই। বিশেষত তাঁর এই বিতরণ এবং যদি আপনি এই নম্রভাব গ্রহণ করেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ শুদ্ধ আনন্দপূর্নভাবের এক বিন্দু উপলব্ধি করতে পারবেন যা কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধপ্রেমে বা কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধভক্তিতে আপনার অস্তিত্বকে প্লাবিত করবে। এই সবকিছু সম্ভব হচ্ছে কারণ একজন শুদ্ধ ভক্ত শ্রীল প্রভুপাদ এই বাণী পাশ্চাত্যে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি আমাদেরকে এবং অন্যান্য অনেক ভক্তদেরকে এই কৃপা প্রদানে সক্ষম ছিলেন, আর এখন সেই সব ভক্তরাও প্রচারে যাচ্ছেন। এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন প্রসারিত হচ্ছে। এটি কেবল প্রসারিত হচ্ছে ভক্ত থেকে ভক্তের মধ্যে কৃপা স্থানান্তরের মাধ্যমে। এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তিনি বলেছেন যে, “আমি হচ্ছি মালিক, আমি হচ্ছি গাছ, আমি হচ্ছি ফল। সবকিছুর মালি হিসেবে আমি ফল আস্বাদন করতে চাই। কিন্তু আমি কত ফল আস্বাদন করতে পারব? আমি পূর্ণরূপে তা আস্বাদন করছি, কিন্তু আমি সব শেষ করতে পারছি না। আমি কতই বা বিতরণ করতে পারব?” তাই তিনি প্রত্যেককে ডেকেছেন, “তোমরা সকলে এসো এবং তা আস্বাদন কর। ভগবত প্রেমের ফল আস্বাদন করো, তোমরা তা প্রত্যেককে প্রদান কর। তোমরা সম্পুর্ণ হৃদয় পরিতৃপ্ত করে তা আস্বাদন কর এবং অন্যান্যদের মধ্যে বিতরণ কর।” এই হচ্ছে আমাদের সংকীর্তন আন্দোলন। আপনি কৃষ্ণ প্রেম ও আনন্দময় ভক্তি সেবায় সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত হন ও এরপর এটা কেবল আপনার মধ্যেই রাখবেন না, তা অন্যদেরকেও প্রদান করুন, সকলকে সুখী করুন।

হরি বোল! হরি বোল!

নিতাই গৌর প্রেমানন্দে হরি হরি বোল!

শ্রীল প্রভুপাদ কি জয়!

ভক্তগণ: জয়!

জয়পতাকা স্বামী: প্রভুপাদের অনুসারিবৃন্দের জয়!

ভক্তগণ: জয়!

ভক্ত: শ্রীল জয়পতাকা মহারাজ কী…

ভক্তগণ: জয়!

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 9/5/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions