Text Size

১৯৮২১০১৩ শ্রীমদ্ভাগবতম ৫.৫.১৯

13 Oct 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|New Talavan, USA

নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ১৩ অক্টোবর ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ নিউ তালবান ফার্ম, ক্যারিয়ার, মিসিসিপিতে দিয়েছেন। এই প্রবচনটি শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৫ম স্কন্ধ, ৫ম অধ্যায়, ১৯ শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

শ্লোক ৫.৫.১৯ 
ইদং শরীরং মম দুর্বিভাব্যং
সত্ত্বং হি মে হৃদয়ং যত্র ধর্মঃ। 
পৃষ্ঠে কৃতো মে যদধর্ম আরাদ্
অতো হি মামৃষভং প্রাহুরার্যাঃ॥

অনুবাদ: আমার চিন্ময় দেহ (সচ্চিদানন্দময় বিগ্রহ) ঠিক একটি মানুষের মতো, কিন্তু তা মনুষ্য-শরীর নয়। এই তত্ত্ব অচিন্তনীয়। আমি জড়া প্রকৃতির দ্বারা বাধ্য হয়ে কোন বিশেষ প্রকার শরীর ধারণ করি না; আমি স্বেচ্ছায় এই শরীর গ্রহণ করি। আমার হৃদয় শুদ্ধ সত্ত্বময়, এবং আমি সর্বদা আমার ভক্তদের কল্যাণের কথা চিন্তা করি। তাই প্রকৃত ধর্ম যে ভক্তির পন্থা তা আমার হৃদয়ে রয়েছে, এবং তা আমার ভক্তদের জন্য। অধর্মকে আমি আমার হৃদয় থেকে বহু দূরে পরিত্যাগ করেছি। যারা অধার্মিক বা অভক্ত, তাদের প্রতি আমার কোন অনুরাগ নেই। আমার এই সমস্ত দিব্য গুণাবলীর জন্য আর্যগণ আমাকে ঋষভদেব, অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ বা ভগবান বলে সম্বোধন করেন।

তাৎপর্য: এই শ্লোকে ইদম্ শরীরং মম দুর্বিভাব্যম্ পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সাধারণত দুই প্রকার শক্তি অনুভব করি—জড়া শক্তি এবং চিৎশক্তি। জড়া শক্তি (মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার) সম্বন্ধে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা রয়েছে, কারণ এই জড় জগতে সকলেরই শরীর এই উপাদানগুলি দিয়ে গঠিত। এই জড় শরীরে আত্মা রয়েছে, কিন্তু আমাদের জড় চক্ষুর দ্বারা তা আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু যখন আমরা চিৎশক্তিতে পূর্ণ একটি শরীর দর্শন করি, তখন আমরা বুঝে উঠতে পারি না কি করে চিৎশক্তির একটি শরীর থাকতে পারে। এখানে বলা হয়েছে যে, ভগবান ঋষভদেবের শরীর সম্পূর্ণরূপে চিন্ময়; তাই তা জড় বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন। জড় বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণরূপে চিন্ময় শরীরের ধারণা অচিন্তনীয়। আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতার দ্বারা যখন আমরা কোন বিষয় বুঝতে পারি না, তখন সেই সম্বন্ধে বেদের বাণী আমাদের অবশ্যই মেনে নিতে হবে। ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে — ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ। ভগবানেরও রূপসমন্বিত শরীর রয়েছে, কিন্তু সেই শরীর জড় উপাদানের দ্বারা গঠিত নয়। তা সৎ, চিৎ এবং আনন্দময়। ভগবান তাঁর অচিন্ত্য শক্তির দ্বারা তাঁর চিন্ময় স্বরূপে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হতে পারেন, কিন্তু যেহেতু চিন্ময় শরীর সম্বন্ধে আমাদের কোন অভিজ্ঞতা নেই, তাই আমরা মোহাচ্ছন্ন হয়ে ভগবানের রূপকে জড় বলে দর্শন করি। মায়াবাদীরা চিন্ময় শরীরের কোন ধারণাই করতে পারে না। তারা বলে যে চিৎবস্তু নিরাকার, এবং যখন তারা কোন আকার দর্শন করে, তখন তারা মনে করে যে তা জড়।

ভগবদ্গীতায় (৯/১১) বলা হয়েছে —

অবজানন্তি মাং মুঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্। 
পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্ ॥

“আমি যখন নররূপ নিয়ে অবতরণ করি, তখন মূর্খেরা আমাকে অবজ্ঞা করে। তারা আমার পরম ভাব এবং পরম ঈশ্বরত্ব সম্বন্ধে জানে না।”

নির্বোধ মানুষেরা মনে করে যে, ভগবান জড়া শক্তির দ্বারা গঠিত দেহ ধারণ করেন। জড় শরীর যে কি বস্তু তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি, কিন্তু চিন্ময় শরীর সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারণাই নেই। তাই ঋষভদেব বলেছেন—ইদং শরীরং মম দুর্বিভাব্যম্। চিৎ-জগতে সকলেরই চিন্ময় শরীর রয়েছে। সেখানে জড় অস্তিত্বের কোন ধারণা নেই। চিৎ-জগতে কেবল সেবা সম্পাদন এবং সেবা গ্রহণ হয়। সেখানে কেবল সেব্য, সেবা এবং সেবক রয়েছেন। এই তিনটি সম্পূর্ণরূপে চিন্ময়, এবং তাই চিৎ-জগৎকে বলা হয় পরম। সেখানে জড় কলুষের লেশমাত্রও নেই। সম্পূর্ণরূপে জড়াতীত হওয়ার ফলে, ভগবান ঋষভদেব বলেছেন যে, তাঁর হৃদয় ধর্মের দ্বারা বিরচিত। ধর্মের বিশ্লেষণ করে ভগবদ্গীতায় (১৮/৬৬) বলা হয়েছে—সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ। চিৎ-জগতে প্রতিটি জীবই ভগবানের শরণাগত এবং সম্পূর্ণরূপে চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত। যদিও সেখানে সেবক, সেব্য এবং সেবা রয়েছে, তা সবই চিন্ময় এবং বৈচিত্র্যময়। আমাদের জড় ধারণার ফলে, আমাদের পক্ষে এখন সবকিছুই দুর্বিভাব্য অর্থাৎ অচিন্ত্য। ভগবান সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার ফলে, তাঁকে বলা হয় ঋষভ। বেদের ভাষায়, নিত্যো নিত্যানাম্। আমরাও চিন্ময়, কিন্তু আমরা অধীন তত্ত্ব। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পুরুষোত্তম। ঋষভ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘প্রমুখ’ অথবা ‘পরম’ এবং তা পরমেশ্বর ভগবানকেই বোঝায়।

ইতি শ্রীমদ্ভাগবতের ৫ম স্কন্ধ ৫ম অধ্যায় ১৯ শ্লোকের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত। 

জয়পতাকা স্বামী: এখানে ঋষভ দেব তার পুত্রদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যদিও তাঁর দিব্য শরীর মনুষ্য স্বরূপের মত দেখতে, কিন্তু তা জড় মনুষ্য দেহ নয়। এটি অচিন্তনীয়। তা আসলেই আধ্যাত্মিক সচ্চিদানন্দ সত্য। এটাই নির্বিশেষ তত্ত্ববাদী ও জড়বাদীরা বুঝতে পারে না যে কিভাবে ভগবান পৃথিবীতে আগমন করেন এবং মনুষ্য রূপে আবির্ভূত হন। এখানে তিনি তাঁর ভক্তদেরকে সেই রহস্য বর্ণনা করছেন যে, তিনি মনুষ্য স্বরূপে আবির্ভূত হতে পারেন, কিন্তু আসলে তা মনুষ্য স্বরূপ নয়। তাঁর জড়জাগতিক দেহ নেই, তাঁর আধ্যাত্মিক দেহ আছে যা বহুমুখী শক্তি সমন্বিত, যা এত অসাধারণ যে, তা দেখে মনে হয় যেন মনুষ্য দেহ, কিন্তু এটিকেবল  মনুষ্য দেহের মতো দেখতে মনে হয়, তবে আসলে তা শুদ্ধ আধ্যাত্মিক শক্তি দ্বারা গঠিত। 

আসলে, এটি অনুধাবন করা তত কঠিন হওয়া উচিত নয় কারণ জড়বাদীরা মনুষ্য দেহের মতো দেহ সৃষ্টিতে সক্ষম, যদিও তা ঠিক সেইরকম নয়। এমনকি ওয়াল্ট ডিসনে তার প্রদর্শনীতে রোবট দেখিয়েছিল, যা হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে এবং কথোপকথন করতে পারে। তাদের মার্ক তাইন এবং বেন ফ্রাঙ্কলিন রোবট ছিল তাদের সর্বশেষ প্রদর্শনী, যা এই জন্য বিখ্যাত যে সেগুলি দেখতে একেবারে বাস্তবিক ও কদাচিৎ কেউ বলতে পারবে যে এগুলি হচ্ছে রোবট। সেগুলি মঞ্চে হাঁটছে, সবকিছু বলতে পারছে, তাদের মূল্য হচ্ছে লক্ষ্যাধিক ডলার। যদি একজন জড়জাগতিক ব্যক্তি এমন একটি যন্ত্র তৈরি করতে পারে যা ঠিক মনুষ্য স্বরূপের মত এবং যা কথা বলতে পারে, তাহলে আপনি ভাবতে পারেন যে ভগবানের কেন এমন এক আধ্যাত্মিক স্বরূপ থাকতে পারে না যা ঠিক মনুষ্য স্বরূপের মত? যদি জড়জাগতিক ব্যক্তি জড় উপাদান দিয়ে তা তৈরি করতে পারে, তাহলে ভগবান কেন তাঁর উৎকৃষ্ট শক্তি, পরমশক্তি, যা হচ্ছে আধ্যাত্মিক শক্তি তা দিয়ে করতে পারবেন না? তাদের ভগবানকে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয় যে — তিনি নিন্মে অবতীর্ণ হতে পারেন না অথবা যদি তিনি নিন্মে অবতীর্ণ হন, তাহলে তিনি হচ্ছেন আমাদেরই মতো একজন, তিনি হচ্ছেন আমাদেরই মতো এই কারাগারে থাকা এক কয়েদি। আমরা এই জড়জগতে থাকা কয়েদি, কিন্তু তিনি সর্বদা দিব্য স্তরে অবস্থান করেন। 

এছাড়াও, কখনও কখনও মানুষ ভগবানকে দোষারোপ করে যে তাঁর মানুষের কষ্টের কারণ হওয়ার এই অবগুণ আছে, এই বলে তারা অনুমানমূলক সিদ্ধান্তে আসার প্রয়াস করে যে তাঁর একপ্রকার ত্রুটি আছে। কিন্তু এখানে খুবই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আসলে ভগবানের হৃদয়ে কোন অধর্ম নেই, কোন অপধর্ম নেই, সেখানে কোন ভক্তিহীন অবগুণ নেই। আসলে জীব এই জড় জগতের স্বপ্নের মধ্যে যা কিছু কষ্ট ভোগ করে বা আনন্দ উপভোগ করে, সেটি কেবল তাদের নিজেদের কার্যকলাপের জন্য হয়। একজন অন্যজনকে কষ্ট দিতে চায়, সেটি হচ্ছে তাদের বাসনা। এরপর অন্য ব্যক্তি যে কষ্ট পাওয়ার যোগ্য, তাকে সেই পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হয় যাতে প্রত্যেকে তুষ্ট হয়। এখানে এমন ব্যক্তিরা আছে যাদের এই ধরনের শুদ্ধ হৃদয় নেই, এর পরিবর্তে তারা মানুষদের কষ্ট পেতে দেখতে চায়। তারা আসলে এটা পছন্দ করে যে মানুষেরা যাতে কষ্ট ভোগ করে। তাদের নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গের প্রতি দ্বেষ আছে। এমনকি যদি তারা ভগবানকে পাশবদ্ধ করতে পারে, তাহলে তারা এমনকি তাঁকেও কষ্ট দেওয়ার প্রয়াস করবে। যেটি অসুরেরা প্রদর্শন করেছে, তারা ভগবানকে পাশবদ্ধ করার প্রয়াস করেছে, তাঁর অবতারের ক্ষেত্রে এমন প্রয়াস হয়েছে, কিন্তু এর পরিবর্তে ভগবান তাদেরকে হত্যা করেছেন। তারা জানে না যে তারা কার বিপক্ষে। তাই, এই সমস্ত বিষয় সবসময় হতে থাকে। বিষয়ী ব্যক্তিরা একে অপরের প্রতি খুবই ঈর্ষাপরায়ন এবং বড় বড় বিষয়ী ব্যক্তিরা তারা এমনকি ভগবানের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ। সেই জন্য, এই ভক্তিমূলক সেবার এই পন্থা এত অসাধারণ যে তা হৃদয় থেকে সমস্ত ঈর্ষা দূরীভূত করে। কোনো ব্যক্তির এই  বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত যে সেই ঈর্ষা যাতে পুনরায় হৃদয় প্রবেশ না করে বা এখনও যেন তা হৃদয়ে না থাকে। 

শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, আমরা প্রত্যেক রিপুকে ভক্তিমূলক সেবায় পরিবর্তিত করতে পারব, যেমন —কাম, লোভ, ক্রোধ, মোহ, মদ, কিন্তু আমরা মাত্সর্যকে পরিবর্তিত করতে পারব না। আমরা কামকে পরিবর্তিত করতে পারি, ঠিক যেমন কেউ কোন কিছু লাভের আশায় কৃষ্ণের সেবা করার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হতে পারে, ঠিক যেমন শ্রীকৃষ্ণের কিছু ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার প্রতি অত্যন্ত আকাঙিক্ষ। সেই ধরনের কামনা আসলে পরিশুদ্ধকারী। এরপর হচ্ছে লোভ, আমরা কৃষ্ণের জন্য কোন ভালো বস্তু পাওয়ার প্রতি অত্যন্ত লোভী হতে পারি। সেটি পাওয়ার প্রতি লালায়িত হতে পারি, “ওহ এই একজন ভালো ব্যক্তি, যদি আমি এই জীবকে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় দিতে পারতাম!” ক্রোধ — কেউ একজন আসছে ও শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের বা শ্রীবিগ্রহের ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা করছে বা কোন প্রকার উৎপাত সৃষ্টি করছে, তখন ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের প্রতিরক্ষার্থে ক্রোধ করতে পারেন। ঠিক যেমন অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণের মন-বাসনা পূর্ণ করার জন্য ক্রোধ প্রকাশ করেছিলেন। মোহ—একজন ভক্ত ভগবানের প্রতি অনুরাগবশত মোহগ্রস্ত হতে পারেন। একটি খবর আছে যে, কৃত্রিম পন্থা যেরকম ড্রাগ, নারকোটিক্স বা অ্যালকোহল নেশাদ্রব্য কিন্তু কেবল হরেকৃষ্ণ নাম উচ্চারণের মাধ্যমে এবং প্রসাদ ভোজনের মাধ্যমে কেউ যথেষ্ট দিব্য উন্মত্ততায় মোহিত হতে পারেন, অন্য কোন কৃত্রিম প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই। আপনারা ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’ নামক গ্রন্থ থেকে জানতে পারেন যে, কখনও কখনও ভক্তরা তারা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমপূর্ণ ভাবের দ্বারা এত উন্মত্ত হয়ে পড়তেন যে আসলে তারা ভ্রমিত হয়ে পড়তেন, তারা ভ্রমবশত মনে করতেন যে শ্রীকৃষ্ণ এই বৃক্ষে আছেন এবং তারা সেই বৃক্ষকে আলিঙ্গন করতেন বা এমন কিছু করতেন। এইভাবে কত কিছু বিষয় আছে, কিন্তু এই যে ঈর্ষাপরায়ণতা হচ্ছে, “ওহ কেন এই ভক্ত এত উন্নত? কেন এই ভক্তের এটি আছে বা কেন…” নিছক ঈর্ষার কারণে তার অন্য কোন ব্যক্তির কাছে এমনকিছু আছে যা তার কাছে নেই বলে মনে হচ্ছে এবং সেই ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে নিচে নামাতে চায়। এক্ষেত্রে বিষয়টি হচ্ছে, কোন একজনের অন্য ব্যক্তির থেকে বেশি কিছু আছে,  কিন্তু তবুও সেই ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে নিচে নামাতে চায়।

তুমি হয়ত নিজেকে উপরে ওঠাতে চাও, সেটা আরেকটি বিষয়। এটি অনুমোদিত যে তুমি সবসময় নিজেকে উন্নত করার বাসনা রাখতে পারো, কিন্তু জড় জগতে এই ধারণাটি হচ্ছে যে, অন্য একজন ব্যক্তিকে উন্নতি করা থেকে টেনে নামিয়ে নিজেকে উন্নত করা। এটিকে পরিবর্তিত করা যাবে না এমন নয় …  কাউকে আঘাত করা যাবে না, অবশ্য শ্রীকৃষ্ণ তা পরিবর্তিত করতে পারেন। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এটা পরিবর্তিত করা খুবই মুশকিল, তবে শ্রীকৃষ্ণ এটি পরিবর্তিত করতে পারেন, যেমন হিরণ্যকশিপু তার পুত্রের ভক্ত হওয়ার কারণে তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিল এবং কখনও কখনও তুমি বলতে পারো যে, নরসিংহদেবও তার প্রতি হিংসাপরায়ণ ছিলেন। তুমি সেটিকে ক্রোধ বা  হিংসা বা যাই বলুন না কেন। শ্রীকৃষ্ণের ক্ষেত্রে এটি যথার্থ, কারণ তাঁর ভক্তের সুরক্ষার জন্য তাঁর এইরূপ মনোভাব ছিল।  যদি বিষয়টি প্রহ্লাদের সঙ্গে সংযুক্ত না হত, তাহলে তিনি অন্য কোন জনকে হিরণ্যকোশিপুর দায়িত্ব প্রদান করতেন। তাকে যে ব্যক্তিগতভাবে তা করতে হবে, এর প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কিন্তু তিনি তাঁর ভক্তের প্রতি বিশেষ কৃপা প্রদর্শন এর জন্য তা করেছিলেন, এটাই হচ্ছে ভগবানের গুণ। তিনি তাঁর ভক্তের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। তাই তোমরা দেখতে পারছ যে, কেন ভক্তিমূলক সেবা তাঁর হৃদয়ে আছে। সেই জন্য ভক্তিমূলক সেবা ভগবানের এত প্রিয়, তা এত অন্তরঙ্গ যে তা ভগবানের হৃদয়ে বিরাজ করে।

যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর মহাপ্রকাশ লীলা করছিলেন, আপনারা মহাপ্রকাশ জানেন? মহাপ্রকাশ মানে হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সর্বদা একজন ভক্ত মনোভাবে ছিলেন, ঠিক তো? তিনি একজন ভক্তভাবে ছিলেন, আমরা সাধারণত তেমনভাবে তাঁর সেই মনোভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে শান্তিভঙ্গ করি না। আমরা এমনভাবে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সমীপবর্তী হই না যে, “এখন আপনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান!” তখন তিনি বলতেন, “ও বিষ্ণু! বিষ্ণু! বিষ্ণু! আমি হচ্ছি কৃষ্ণের দাস। আমি দাসানুদাস।” এইভাবে এটি ছিল তাঁর মনোভাব, কিন্তু একসময় তিনি শ্রীবাসের গৃহে শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তার ভাব গ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁর প্রকৃত মনোভাব প্রকাশ হয়েছিল এবং তা হয়েছিল অদ্বৈত আচার্যের তাঁর শ্রীপাদপদ্মদ্বয়ে তুলসী নিবেদন করে অর্চন করার জন্য, যা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কখনওই করতে অনুমোদন দিতেন না, কারণ তিনি সবসময় ভক্তের ভূমিকা গ্রহণ করতেন, তিনি কেবল তাঁর মস্তকে তুলসী দিতে অনুমতি দিতেন, কিন্তু সেই সময় অদ্বৈত অন্তত প্রত্যেককে বলার প্রয়াস করছিলেন যে আসলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই হচ্ছেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মে তুলসী নিবেদন করেছিলেন এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি প্রকৃতপক্ষেই তাঁর বাস্তবিক পরমেশ্বর ভগবান-এর মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন এবং তখন লোকেরা দেখতে পেয়েছিলেন যে তিনিই হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ, তিনি হচ্ছেন শ্রীরাম, তিনি হচ্ছেন বরাহ। তখন তাঁদের এই বিষয়ে সমস্ত সংশয় দূরীভূত হয়েছিল এবং সেখানে ২১ ঘণ্টা ধরে অবিরত আরতি হয়েছিল। বিশাল কীর্তন হয়েছিল এবং সেই আরতি ও কীর্তনের সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিরন্তর পরম পুরুষোত্তম ভগবানের মনোভাবে ছিলেন, তিনি সেবকের মনোভাবে ছিলেন না, বরং তিনি স্বয়ং ভগবানের মনোভাবে ছিলেন। সেই সময় তিনি কোলাবেচা শ্রীধরকে,.. আমার মনে হয় আমি যখন এখানে আগে এসেছিলাম, তখন আমি এটি বলেছিলাম যে তিনি তাঁকে এক বিশেষ আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। যখন তাঁকে তাঁর কাছে আনয়ন করা হয়েছিল, তখন তিনি তাঁকে বলেছিলেন যে — “তুমি আমার এত সুন্দরভাবে সেবা করেছ যে আমি তোমাকে যৌগিক শক্তি প্রদান করতে চাই। তুমি যৌগিক শক্তি গ্রহণ করো।”

তখন কলাবেচা বললেন, “আমার কোন যৌগিক শক্তি চাই না, আমি এইসব যৌগিক শক্তি দিয়ে কি করব? আমি কোন যৌগিক শক্তি চাই না।”

তিনি বললেন, “ঠিক আছে! আমি তোমাকে বিরাট রাজত্ব দেব। তুমি শতাধিক সেবক এবং বিরাট ভূমি সহ এক রাজা হবে এবং রক্ষকবাহিনী ও সবাই থাকবে, ভবন থাকবে, তুমি এক বিরাট রাজা হবে। তুমি আমার থেকে এই আশীর্বাদ গ্রহণ করো এবং এক রাজা হও।”

কলাবেচা এটি প্রত্যাখ্যান করলেন যে, “না! না! আমি রাজা হতে চাই না, আমি যা চাই এটি সেটা নয়। আমি রাজা হতে চাই না, এটা কিছুই নয়।”

“তুমি জন্ম-মৃত্যু-ব্যাধি ও জরা থেকে মুক্তি গ্রহণ করো। তুমি আধ্যাত্মিক জগতের মুক্তি গ্রহণ করো।”

তিনি বললেন, “না! না! আমি মুক্তি চাই না।”

“তুমি মুক্তি গ্রহণ করো।”

“না! না! আমি চাই না।”

“তাহলে তুমি কি চাও?”

“শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমি যা চাই তা হচ্ছে, আমি তোমার সেই হাস্যজ্জল শ্রীমুখ দর্শন করতে চাই যে যখন তুমি আমার কাছে আসতে এবং এক তরুণ ব্রাহ্মণরূপে আমার সাথে ঠাট্টা করতে ও আমার থেকে বিভিন্ন সবজি চুরি করতে বা টেনে নিয়ে যেতে। আমি অবিরত সেই অপরূপ শ্রীমুখ দর্শন করতে চাই, আমি সেই তরুণ দুষ্টুমিপূর্ন ব্রাহ্মণকে দেখতে চাই। আমি জন্ম জন্মান্তর ধরে কেবল তোমার সেবা করতে চাই। তুমি যেখানেই থাকবে, আমি কেবল সেবা করতে চাই। যেখানেই তুমি অবতরণ করবে, আমি সেখানে তোমাকে তোমার সবজি, কলা, শাক ইত্যাদি দিতে চাই। আমি মুক্তি চাই না, আমি বিরাট রাজা হতে চাই না, আমাকে কেবল তোমাকে সবজি এবং কলা সরবরাহ করতে দাও। আমাকে তোমার সেবা করতে দাও, এটাই যা আমি চাই। আমি কেবল সেবা করতে চাই, আমি অন্য আর কোন কিছু চাই না।”

তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এর দ্বারা খুবই প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তিনি বললেন যে, “এখন আমি তোমাকে এমন একটি জিনিস প্রদান করব, যা এমনকি ব্রহ্মা শিব তারাও সাধারণত খুব সহজে প্রাপ্ত হন না। আমি তোমাকে শুদ্ধ প্রেম, শুদ্ধ ভগবত প্রেম প্রদান করব। তোমার ইচ্ছার কারণে এখন আমি তোমাকে শুদ্ধ ভগবত প্রেম, কৃষ্ণ প্রেম প্রদান করব।” এবং যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তা বললেন এবং তিনি শ্রীধরকে শুদ্ধ ভগবত প্রেমের আশীর্বাদ প্রদান করলেন, যা হচ্ছে অবিনশ্বর এবং সম্পূর্ণ শুদ্ধ, তখন সমস্ত ভক্তরা সেখানে হুংকার করে উঠলেন, “হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল!” সেই কলা বেচা এমন কিছু প্রাপ্ত হয়েছিলেন, যা এমনকি ব্রহ্মা শিবও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় প্রাপ্ত হতে পারেন নি এবং সমগ্র স্থান উচ্চরবে বিদীর্ণ হতে লাগল। তাঁরা সকলেই উচ্চ নিচ উল্লম্ফন করছিলেন, “হরিবোল! জয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য! জয় গৌরাঙ্গ! জয় গৌরাঙ্গ! হরিবোল! হরিবোল!” তারা উল্লম্ফন করছিলেন এবং হুংকার করছিলেন। কেউ কেউ মূর্ছিত হয়ে পড়েছিলেন, তারা এটি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যেভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই আশীর্বাদ প্রদান করেছিলেন। এইভাবে সেই কীর্তন এবং আরতি ২১ ঘণ্টা ধরে চলেছিল ও একের পর এক শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তদেরকে আনয়ন করছিলেন ও তাঁদের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করছিলেন এবং এইরকম আশীর্বাদ প্রদান করছিলেন। 

মুরারি গুপ্তকে আনা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল, “মুরারি গুপ্ত তুমি আমার নিত্য পার্ষদ। আমি তোমাকে কি দিতে পারি? তুমি কি জানো তুমি কে?”

তিনি মুরারি গুপ্তকে বললেন, “তুমি কি জানো আমি কে?”
তারপর তিনি প্রথমে হঠাৎ করে রামচন্দ্রের স্বরূপ গ্রহণ করেছিলেন এবং নিত্যানন্দ লক্ষণ রূপে ছিলেন, সেখানে সীতা দেবী ছিলেন। সীতা দেবী তাঁকে বাতাস করছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রাম হয়েছিলেন, আর লক্ষণ এবং সীতা প্রত্যেকেই সেখানে ছিলেন। হঠাৎ করে মুরারি গুপ্ত নিজেকে দেখলেন এবং তিনি দেখলেন যে তিনি হচ্ছেন হনুমান। যখন তিনি দেখলেন যে তিনি হচ্ছেন হনুমান এবং সেখানে তার নিত্য প্রভু ভগবান রামচন্দ্র আছেন, সেটি দর্শন করে তিনি এত অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি তৎক্ষণাৎ মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। সেই উপলব্ধি প্রাপ্ত হয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন যে আসলেই তাঁর নিত্য স্বরূপে তিনি হচ্ছেন হনুমান এবং তিনি মহাপ্রভুর লীলায় জন্মগ্রহণ করেছেন কেবল তাঁর নৃত্য প্রভু শ্রীরামচন্দ্রকে তাঁর এই শ্রীচৈতন্য স্বরূপে সেবা করার জন্য। 

আপনারা জানেন যে চৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরাম সকলেই একজন। তাঁরা সবাই সেখানে ছিলেন, সব অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মধ্যে ছিলেন, তিনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত স্বরূপে তাঁর ভক্তিমূলক মনোভাবে ছিলেন। সবকিছু, সব অবতারেরা সেখানে ছিলেন, বিশেষত শ্রীরামচন্দ্র। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর ষড়ভূজ প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তাঁর দুটি ভূজ শ্রীরামচন্দ্রের, দুটি ভূজ শ্রীকৃষ্ণের ও অন্য দুটি ভূজ হচ্ছে শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর। এইভাবে একের পর এক বিভিন্ন ভক্তের কাছে ভগবান তাঁদের নিত্য স্বরূপ প্রকাশ করেছিলেন এবং তাদের সকল রহস্য প্রকাশিত হচ্ছিল। এটি হচ্ছে মহৎ কৃপা যে শ্রীল প্রভুপাদের কৃপার কারণে আমরা কিছু ভক্তিমূলক সেবা নিবেদন করতে পারছি, এমনকি যদিও আমরা সংশয় ও অপরাধে পরিপূর্ণ। (একজন ভক্ত শিশু বললেন হরিবোল!) 

আমরা দেখতে পারছি যে ভক্তিমূলক সেবা কোন ক্ষুদ্র বিষয় নয়, ভক্তিমূলক সেবা এত বিরল, এত অসাধারণ যে আসলে ভক্তিমূলক সেবা অর্জন করা হচ্ছে সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা। কোনো না কোনোভাবে আমাদের অপরাধ সত্ত্বেও আমাদের সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও ভগবান নিতাই গৌর তবুও আমাদেরকে সেবা করতে অনুমতি প্রদান করছেন। তাহলে কেন আমাদের অহংকারী হওয়া উচিত? আমাদের কেন নিজেদেরকে জড়জাগতিক বাসনার প্রতি নীত হতে দেওয়া উচিত? আমাদেরকে খুব খুব সতর্ক হতে হবে। এটা হচ্ছে যেন রত্ন পাওয়ার মত। একবার তুমি রত্ন পেলে, তা যাতে চুরি না হয় সেটির প্রতি অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। একজন ভক্ত ছিলেন, যার ১৫০০ ডলারের আংটি ছিল, তিনি ছিলেন কলম্বিয়া, অস্ট্রেলিয়ার ভক্ত। এখন কলম্বিয়াতে সকলেই জানেন যে সেখানে অনেক চোর আছে। যদি তুমি তা না জান, তাহলে এখন তুমি জানছো। সেই ব্যক্তি কেবল হাটতেই বের হননি, তিনি এক সব থেকে খারাপ স্থানে গিয়েছিলেন। তিনি একটি পাহাড়ের পার্শ্ববর্তী দরিদ্র বস্তি এলাকায় প্রকাশ্যে সেই ১৫০০ ডলারের সোনার আংটি পড়ে গিয়েছিলেন, তাই স্বাভাবিকভাবে তা চুরি হয়। এমনকি কখনও কখনও এমন কিছু ঘটনা শোনা যায় যে, লোকদের সেইকো ঘড়ি বা এমন কিছু নেওয়ার জন্য তাদের হাত কেটে ফেলে দেওয়া হয়। সৌভাগ্যবশত তার কোন কিছু কাটা যায়নি। তার কাছে একজন মানুষ আসে, তার মাথায় বন্দুক ধরে এবং বলে, “আমাকে তোমার আংটি দাও।” এমনকি তখনও তিনি ইতস্তত করছিলেন, তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। তিনি সেই আংটির প্রতি খুবই আসক্ত ছিলেন, তবে অবশেষে তিনি বেঁচে থাকার প্রতি অধিক আসক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তার আংটিটি তাকে দিয়ে দেন। এইভাবে আমাদেরও একটি আংটি আছে, আমাদের একটি রত্ন আছে, স্বাভাবিকভাবেই আমরা এর প্রতি খুবই আসক্ত। যখন তিনি তার স্ত্রীকে ফিরে পান, তখনও তিনি ক্রোধ প্রকাশ করছিলেন যে, “তুমি কিভাবে এত মূল্যবান একটি আংটি দিয়ে দিতে পারলে?”

“আমার কাছে আর কি পথ ছিল?” (হাসি)
“যদি আমি আমার আংটি রেখে দিতাম, তাহলে আমি আমার জীবন হারাতাম।”
যাইহোক, এই হচ্ছে পরিস্থিতি যে যদি তোমার কাছে কোন মূল্যবান কিছু থাকে, তাহলে তোমাকে এটি রক্ষা করতে হবে। আপনি কেবল যে কোনো জায়গায়, যে কোনো স্থানে চলে যেতে পারবেন না বা যে কারোর সাথে কোন কিছু করতে পারবেন না এবং এই আশা করতে পারবেন না যে আপনি এর থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে পারবেন। তাই তো? এমন কিছু নির্দিষ্ট স্থান আছে যেক্ষেত্রে আমাদেরকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। এই জড়জগতে সত্ত্ব, রজ এবং তমগুণের স্থান আছে। একজন ভক্ত কখনও কখনও তারা সত্ত্ব গুণের সং করে এবং সবসময় রজ ও তমগুণকে সংক্রামক মহামারীর মত এড়িয়ে চলে, কারণ তিনি জানেন যে সেখানে গেলে আমি ভক্তি রত্ন হারিয়ে ফেলব। ভক্ত সংক্রামক ব্যাধির মতো ভক্তিমূলক সেবায় সমস্ত ধরনের অপরাধ এড়িয়ে চলে, কারণ তিনি জানেন যে তাহলে আমার ভক্তি চুরি হয়ে যাবে বা কোনো না কোনোভাবে তা কলুষিত হয়ে পড়বে বা আমি বিভ্রান্ত হব বা এমন কিছু হবে, আমি প্রতারিত হব এবং আমার ভক্তিমূলক সেবা হারিয়ে যাবে। 

আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন, যদি আপনি কোন স্থান দেখেন, কোন এক স্থান যেখানে এটি উল্লেখ করা হয়েছে—“আমাকে বঞ্চিত করিবে না।” আপনারা কি বঞ্চিত এর অর্থ জানেন? আসলে এমনকি আমি বাংলা জানি। কিন্তু দীর্ঘদিন হল আমি এই শব্দের অর্থ খুঁজে পাইনি। আমি শুধু..  এটি মানে হচ্ছে আমাকে দূরে ঠেলে দিও না অথবা এইরকম কিছু। কিছু বছর হল আমি এটি খোঁজার চেষ্টা করিনি যে বঞ্চিত এর সঠিক অর্থ কি, এরপর যখন আমি এই ভাষা আরো শিখলাম, তখন বুঝলাম যে বঞ্চিত মানে হচ্ছে ঠকানো। আমরা কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করি যে, “দয়া করে আমাকে ঠকাবেন না। দয়া করে মায়া দ্বারা আমাকে প্রবঞ্চিত হতে দেবেন না। যখন মায়া আমাকে কিছু কৃত্তিম সুখ, কৃত্তিম সত্য, কিছু মায়ার মধ্যে ফেলার চেষ্টা করেন, তখন তা হচ্ছে এক ভ্রম এবং আমি প্রতারিত হচ্ছি। আপনাকে গ্রহন করার পরিবর্তে আমি এই সমস্ত নকল আনন্দ, নকল বাস্তবতা গ্রহণ করে প্রতারিত হয়ে চলেছি। পরবর্তীতে এত প্রয়াস, এত চেষ্টার পর আমি দেখি যে আমি মায়ার দ্বারা প্রতারিত হয়েছি, যেখানে তিনি কোনো না কোনোভাবে আমাকে আপনার শ্রীপাদপদ্ম ত্যাগ করার প্রতি প্রতারিত করেছে এবং এরপর কে জানে যে কত জন্ম, কত সহস্র বছর পর আবার আমি নিজেকে দেখব যে আমি এমনভাবে আপনার প্রতি পুনরায় প্রার্থনা করছি। আমি এটা চাই না.. আমি ফিরে গিয়ে ভ্রমিত হতে চাই না। আমি আপনার ভক্তিমূলক সেবায় থাকতে চাই। আমাকে বঞ্চিত করিবে না। আমাকে বঞ্চিত হতে দেবেন না। সর্বোপরি সবকিছুই আপনার শক্তি, আপনি যেমন চান তাই করতে পারেন। তাই দয়া করে আমাকে আপনার শক্তির দ্বারা প্রতারিত হতে দেবেন না। আমি এটি স্বীকার করছি যে আমি কত অপরাধ করেছি এবং ভুল করেছি ও পাপকর্ম করেছি কিন্তু এখন আমি কেবল আপনার সেবা করতে চাই। সেই জন্য আবার আমাকে প্রতারিত হতে দিলে এতে কোন লাভ নেই! আমি স্বীকার করছি যে আমি সম্পূর্ণ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, অণুমাত্র। আমি বিভ্রান্ত হতে পারি, যদি তা আপনার ইচ্ছা হয়। কে আপনার শক্তিকে অতিক্রম করতে পারবে? কিন্তু এখন আমি সমস্ত বাসনা ত্যাগ করেছি, আমি কেবল আপনার সেবা করতে চাই। তাই দয়া করে আমাকে আবার প্রতারিত হতে দেবেন না, আমি প্রতারিত হওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত ভীত।” 

এমনকি প্রহ্লাদ মহারাজও কিছুটা বলেছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনার আশ্রয়ে আছি, আমি ভীত নই, কিন্তু নয়ত আমি ভীত। আমি আপনার আশ্রয় হারানোর প্রতি ভীত, কারণ তাহলে আমি প্রতারিত হব। কৃষ্ণের আশ্রয় হারালে, তখন মায়া আমাদের প্রতারিত করবেন। তিনি এতই নিপুণ।  মায়া—যা নয়। তিনি জানেন কোন বিষয়কে কেমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যা বাস্তবিক নয়। 

এখানে ঋষভদেব বলছেন যে, ভক্তিমূলক সেবা তাঁর হৃদয়ে আছে। যদি আমরা ভক্তিমূলক সেবা করি, তাহলে দেখুন এর অর্থ হচ্ছে আমরা তাঁর হৃদয়ে স্থান পাব। আপনারা অনুধাবন করতে পারছেন যে ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের কাছে কত প্রিয় যে তিনি তাঁদেরকে তাঁর হৃদয়ে স্থান দেন। ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের সেবা করেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এত করুণাময় যে তিনি তাঁদেরকে তাঁর হৃদয়ে আনায়ন করেন। ভক্তকেও ভক্তিমূলক সেবা নিবেদনের পর সতর্ক হতে হবে, শ্রীকৃষ্ণের হৃদয়ে আসার পর আমরা পিছনে ফিরতে পারিনা এবং সেই সম্বন্ধ পরিত্যাগ করতে পারি না। অবশ্য, তিনি হচ্ছেন অতীব দিব্য, তাই তিনি ততক্ষণ কাউকে তাঁর হৃদয়ে আনয়ন করেন না, যতক্ষণ না তিনি নিশ্চিত যে এই ব্যক্তি নিত্য তাঁর সেবা করতে চান। একবার তোমাকে সেখানে স্থান দেওয়া হলে, তাহলে অবশ্যই এর থেকে কোন উচ্চ পরিপূর্ণতা নেই, যেখানে কেউ ভগবানের অন্তরঙ্গ সেবায় নিযুক্ত থাকেন।

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ।।  

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে 
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে 

কোন প্রশ্ন আছে?

হ্যাঁ!

ভক্ত: শ্রীল আচার্যপাদ যেহেতু আমরা হচ্ছি ভক্ত এবং আমাদের আধ্যাত্মিক জীবন পালন করার কথা, তাই প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কিভাবে আসলে শাস্ত্রের মাধ্যমে কৃষ্ণকে অনুধাবন করতে পারব? এবং একদিকে মনে হয় যে আমরা উন্নতি করছি, আবার অন্যদিকে আমরা তাঁর সেবা, ভক্তিমূলক সেবা করছি, তাই হয়ত সেই কারণে ধর্মগ্রন্থ পড়া ও শাস্ত্র অধ্যায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় পাচ্ছি না। তাই আমরা কিভাবে সুনিশ্চিত হতে পারি যে নিশ্চিতরূপে ভক্তিমূলক সেবার দ্বারা এই জীবনের শেষে আমাদেরকে কৃষ্ণের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, এমনকি যদিও আমাদের হয়ত তাঁর লীলা এবং দিব্য কার্যকলাপ বিষয়ক যথাযথ ধারণা নেই?

জয়পতাকা স্বামী: শ্রীল প্রভুপাদ আমাকে মায়াপুরের ভবন নির্মাণের সেবা দিয়েছিলেন এবং সেই সময় দিন ও রাতে আমাদের নির্মাণ কার্যের জন্য আমরা যারা কাজ করছিলাম, তাদের দুটি সময় অনুসারে বদলি ছিল। ৬০০ মানুষ আমাদের অধীনে কাজ করছিল ও আমরা তিনজন ভক্ত ছিলাম। তখন আমি শ্রীল প্রভুপাদের কাছে যাই এবং বলি যে, আমি দিনে দু’ঘণ্টা চাই আপনার গ্রন্থ অধ্যয়নের জন্য কারণ আমি গ্রন্থ পড়ার কোন সুযোগ পাচ্ছিনা। তাই আমি সময় বের করতে চাই। শ্রীল প্রভুপাদ আমার প্রতি ক্রোধান্বিত হলেন এবং বললেন, “তুমি কি মনে করো সেবা করা এবং আমার এই প্রকল্প নির্মাণ করা ও আমার গ্রন্থ পড়ার মধ্যে কোন পার্থক্য আছে? তুমি কি এগুলির মধ্যে কোন পার্থক্য দেখো?” ( হাসি।)

“না!”

“তাহলে? তাহলে?”
হরে কৃষ্ণ! এটাই হচ্ছে বিষয়। অবশ্য কোনো না কোনোভাবে আমি তবুও আধ ঘন্টা সময় বের করতে পারতাম। এর জন্য ইচ্ছা লাগে! মূল ধারণাটি হচ্ছে যে পড়ার জন্য আমাদেরকে আমাদের সেবা বন্ধ করতে হবে না… আসলে যদি আমরা আমাদের সময়মতো কার্য সম্পন্ন করি, তাহলে সময় বের করতে পারব বা এমনকি সব ছোট ছোট সময় থেকে তা বের করতে পারব, যা আমরা বৃথা নষ্ট করি বা যাই হোক না কেন। যদি আমরা সত্যিই সঠিক সময়ে ধরে চলি, তাহলে আমরা প্রত্যেকদিন কিছু সময় বের করতে পারব এবং যদি সত্যি অনেক বেশি সেবা থাকে যা সম্পন্ন হওয়ার দরকার আছে, তাহলে সেটিও হচ্ছে এক ধরনের আশ্রয়, সেটি আমাদেরকে রক্ষা করছে।  আমাদেরকে দেখতে হবে, যদি তা ততটা জরুরি সেবা হয়, তাহলে তা আমাদেরকে করতে হবে। 

মায়াপুরে এক বড় জরুরি পরিস্থিতি ছিল, অবশ্য শ্রীল প্রভুপাদ সাধারণত আমাদেরকে বলতেন যে আমাদের দিনে এক ঘন্টা পড়া উচিত, কিন্তু যদি আমরা দুটো প্রবচন শুনি, তাহলে সেটাও হচ্ছে অধ্যয়ন। যদি আমরা কোন একটি প্রবচন শুনি, সেটিও হচ্ছে অধ্যয়ন। এর মানে এই নয় যে তিনি অধ্যয়ন করছেন না। আমরা প্রত্যেকদিন ভাগবত প্রবচন শুনি, এছাড়াও আমরা অধ্যয়নের জন্য সময় পাই। আমাদেরকে কেবল প্রকৃতই অন্যান্যভাবে সময় অতিবাহিত করা কম করতে হবে, তাহলে এইভাবে যদি আমাদের এই বাসনা থাকে যে আমরা আমাদের সেবা এত তাড়াতাড়ি ও এত নিখুঁতভাবে করতে চাই যে আমরা আরো গ্রন্থ অধ্যয়নের জন্য একটু অধিক সময় পাবো, ঘুমানোর জন্য বা পরচর্চা করার জন্য অধিক সময় নয়। আমরা যখনই একটু বেশি সময় পাই, আমরা সবাই পরচর্চা করি বা অন্য কোন কিছু করি। কখনও কখনও আমাদের প্রজল্পের প্রতি ও অন্যান্য বিষয়ের প্রতি অধিক রুচি থাকে, কিন্তু যদি আমরা আসলেই সময় বের করার চেষ্টা করি, তাহলে যখনই আমাদের হাতে সামান্য সময় থাকবে, তখন তৎক্ষণাৎ আমরা বসে অধ্যয়ন করতে পারি। এটা খুবই ভালো! আমাদের অতিরিক্ত সময় থাকা উচিত নয়, আমরা কতই বা পড়তে পারব? আমরা কেবল যত সেবা করি, তত পড়তে পারি। সেবা অধ্যয়নের প্রতি এক রুচি উৎপাদন করে, ও  এইভাবে যদি তুমি তোমার সময় অত্যাধিক সেবা করার প্রতি লাগাও, তাহলে এমনকি অত্যাধিক দক্ষতার সাথে তুমি অধিক সময়কে অধ্যয়নের প্রতি কাজে লাগাতে পারবে। তখন মায়ার পক্ষে আমাদেরকে পাশবদ্ধ করা কঠিন হবে। 

আধ্যাত্মিক জগতে আছে সেব্য, সেবা এবং সেবক। সেই ব্যক্তি, যাকে সেবা করা হচ্ছে এবং সেবার পন্থা ও সেবক এই তিনটি সম্পূর্ণরূপে আধ্যাত্মিক। সেই জন্য আধ্যাত্মিক জগতকে বলা হয় পরম সত্য। সেখানে জাগতিক কলুষতার লেশমাত্র নেই। আমাদেরকে কেবল দেখতে হবে যে যদি আমরা নিজেদের চেতনাকে সেবায় রাখতে পারি, তাহলে কোন সমস্যা নেই। যদি আমাদের চেতনা বিক্ষুব্ধ হচ্ছে, তার মানে আমাদের কিছু বিশেষ নির্দেশনার প্রয়োজন আছে। তখন আমাদেরকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের চেতনা ভালো আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে চিন্তা করতে হবে না যে কেবল সেবা করার মাধ্যমে আপনি যেখানে যেতে চান সেখানে যেতে পারছেন না, কারণ আসলে সেবা হচ্ছে সম্পূর্ণ শুদ্ধ। বরঞ্চ আমি ১৬ মালার বেশি জপ করি না। প্রথমে আমি ১৬ মালা করি, তারপর অধ্যয়ন করি। এরপর যখন আমার মনে হয় যে আমি যথেষ্ট অধ্যয়ন সম্পন্ন করেছি, তখন আমি ১৬ মালার অধিক জপ করি। আমার অগ্রাধিকার হচ্ছে প্রথমে নিজের সংখ্যামালা জপ করা ও তারপর অধ্যয়ন করা। কখনও কখনও ভক্তরা ২০ মালা, ৩০ মালা জপ করেন, সব সময় নয়, কিন্তু কখনও কখনও তারা অধিক মালা জপ করেন। আমার মালা হওয়ার পর প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে অধ্যয়ন করা ও এরপর কখনও কখনও যদি আমার কাছে বেশি সময় থাকে তাহলে আমি অধিক মালা করি। 

এইভাবে আসলে কোন না কোনভাবে আমাদেরকে কম করার পরিবর্তে, সবকিছুর মধ্যে সমন্বয়বিধান করতে হবে। যদি অনেক বেশি সেবা থাকে এবং পড়ার জন্য কোন সময় না থাকে, তাহলে তোমাকে এত নিপুণ হতে হবে যে দিনের মধ্যে তুমি যাতে মায়াকে কোন সময় না দাও, তাহলে তুমি তখনও সুরক্ষিত এবং অবশ্য তুমি প্রবচন শুনছ, তাই সেটা হচ্ছে একপ্রকার অধ্যয়ন, সেটাও হচ্ছে গ্রন্থ অধ্যয়ন। এমন নয় যে শ্রীল প্রভুপাদ এটিকে অধ্যয়নের মধ্যে ধরবেন না। পরবর্তীতে তুমি আরো নিপুণ হতে পার এবং অন্যান্য ভক্তদেরকে নিযুক্ত করতে পার, যারা হয়ত ততটা পুরোপুরি সেবায় নিযুক্ত নন এবং এইভাবে একটু অধিক সময় বের করতে পার অধ্যয়নের জন্য। তাই আমাদের লক্ষ্য সেবা কমানো নয়, তবে কোনো না কোনোভাবে সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় বিধান করা ও যতটা সম্ভব তা বৃদ্ধি করা এবং যদি কারো নিজের সেবার জন্য তা সম্পন্ন হতে না পারে, তাহলে তোমাকে অন্যান্য ব্যক্তিদেরকে আরো অধিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে প্রশিক্ষিত করতে হবে। আরো ভক্ত বানাও এবং তাদেরকে প্রশিক্ষিত কর, ঠিক আছে?

ভক্ত: হ্যাঁ!

জয়পতাকা স্বামী: হরে কৃষ্ণ!

ভক্ত: হরিবোল!

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 11/6/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions