নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ১২ অক্টোবর, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, হনুলুলু হাওয়াইতে দিয়েছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ২য় স্কন্ধ, ১০ম অধ্যায়, শ্লোক ৪৩ পাঠের মাধ্যমে।
অনুবাদ: তারপর কল্পান্তে ভগবান রুদ্ররূপে সমগ্র সৃষ্টিকে সংহার করবেন, ঠিক যেমন বায়ু মেঘরাশিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
তাত্পর্য: মেঘের সঙ্গে সৃষ্টির এই তুলনা খুবই উপযুক্ত। মেঘের সৃষ্টি হয় আকাশে অথবা আকাশেই তাদের স্থিতি, এবং যখন তারা স্থানান্তরিত হয় তখন তারা আকাশেই অব্যক্ত রূপে থাকে। তেমনই, ব্রহ্মারূপে পরমেশ্বর ভগবান এই জগৎ সৃষ্টি করেন, বিষ্ণুরূপে তিনি তা পালন করেন এবং রুদ্র বা শিব রূপে তার সংহার করেন। এ সবই সংঘটিত হয় যথাসময়ে। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় (৮/১৯-২০) এই সৃজন, পালন এবং সংহার সম্বন্ধে সুন্দরভাবে বর্ণনা করে বলা হয়েছে —
ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে।
রাত্র্যগমেহবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে।।
পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎসনাতনঃ।
যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি।।
এই জড় জগতের স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে প্রথমে তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে সৃষ্টি হয়, তারপর খুব সুন্দরভাবে তার বৃদ্ধি হয় এবং দীর্ঘকাল ধরে তার অস্তিত্ব থাকে (কখনো কখনো তা সর্বশ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞেরও গণনার অতীত), কিন্তু তারপর আবার ব্রহ্মার রাত্রির আগমনে তার বিনাশ হয়। কারোরই তাতে বাধা দেবার ক্ষমতা থাকে না, এবং ব্রহ্মার রাত্রি শেষ হলে পুনরায় তার সৃষ্টি হয় পালন এবং ধ্বংসের চক্র অনুসরণ করার জন্য। যে মূর্খ বদ্ধ জীব এই অনিত্য জগতকে তার নিত্য অবস্থানের স্থান বলে গ্রহণ করেছে, তাকে বুদ্ধিমত্তা সহকারে জানতে হবে যে, এই প্রকার সৃষ্টি এবং ধ্বংস হয় কেন। জড় জগতের সকাম কর্মীরা পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক প্রদত্ত জড় পদার্থের দ্বারা বিশাল উদ্যোগ, বড় বড় বাড়ি, বড় বড় সাম্রাজ্য, বড় বড় কলকারখানা এবং বড় বড় কত কিছু করতে উৎসাহী। এই সমস্ত সম্ভাবনা এবং তার মূল্যবান শক্তির দ্বারা বদ্ধ জীবেরা কত কিছু তৈরি করে তাদের বাসনা চরিতার্থ করে, কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের সমস্ত সৃষ্টি থেকে বিদায় নিয়ে পুনরায় আরেকটি জীবনে বার বার সৃষ্টি করার জন্য প্রবেশ করতে হয়। যে সমস্ত মূর্খ বদ্ধ জীব এই জড় জগতে তাদের শক্তির অপচয় করে, তাদের আশা দান করার জন্য ভগবান তাদের জানান যে, আরেকটি প্রকৃতি রয়েছে যা সৃষ্টি এবং ধ্বংসের ঊর্ধ্বে নিত্য বিরাজমান, এবং বদ্ধ জীবাত্মা তখন হৃদয়ঙ্গম করতে পারে যে, তার মূল্যবান শক্তির যথার্থ সদ্ব্যবহার করে তার কি করা উচিত। পরমেশ্বর ভগবানের ইচ্ছার প্রভাবে যথাসময়ে ধ্বংস হতে বাধ্য এই জড় জগতে জড় বিষয়ে লিপ্ত হয়ে তার সময়ের অপচয় করার পরিবর্তে পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় তার শক্তির সদ্ব্যবহার করা উচিত, যাতে সে সনাতন ধামে স্থানান্তরিত হতে পারে, যেখানে জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, সৃষ্টি নেই, ধ্বংস নেই, পক্ষান্তরে রয়েছে কেবল নিত্য জীবন। সেই জগৎ পূর্ণ জ্ঞানময় এবং আনন্দময়। এই অনিত্য সৃষ্টি এইভাবে প্রকাশ হয় এবং ধ্বংস হয় কেবল সেই সমস্ত বদ্ধ জীবদের শিক্ষাপ্রদান করার জন্য, যারা অস্থায়ী বিষয়ের প্রতি আসক্ত। তাদের আত্ম-উপলব্ধির একটি সুযোগ দান করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য, সকাম কর্মীদের পরম লক্ষ্য ইন্দ্রিয়-সুখ প্রদান করা নয়।
ইতি ‘শ্রীমদ্ভাগবত সমস্ত প্রশ্নের উত্তর’ নামক শ্রীমদ্ভাগবতের ২য় স্কন্ধ, ১০ম অধ্যায়, ৪৩ শ্লোকের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত।
জয়পতাকা স্বামী: এই জড়জগতে প্রত্যেকেই স্বকাম কর্মের পিছনে ধাবিত হচ্ছে। তারা সকাম কর্মফল চায়, কিসের জন্য? ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য। তারা ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করতে চায়। সেই ইন্দ্রিয়তৃপ্তি বিভিন্ন ভাগের আছে, বিভিন্ন ধরনের আছে। এই জড়জগতে সবধরনের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি আছে, কিন্তু সেটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতের এক অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব। দেখুন এখানে একজন তমো গুণে থাকা ব্যক্তি, একজন শূদ্র একধরনের আনন্দ পেতে আগ্রহী, বৈশ্য আরেক ধরনের, ক্ষত্রিয় আরেক ধরনের, ব্রাহ্মণ আবার আরেক ধরনের আনন্দ লাভ করতে আগ্রহী। শূদ্র, অবশ্য যদি তাদের সেই সুযোগ থাকে, তাহলে তারা মদ পান করতে পছন্দ করবে এবং নেশাগ্রস্ত হবে ও দূতক্রীড়া করবে, অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিত যৌন জীবনে লিপ্ত হবে এবং এইরকম অন্যান্য ধরনের অশ্লীল কার্যকলাপে নিযুক্ত হবে। যদি শূদ্রের কাছে সেই সুযোগ থাকে, তাহলে সে এই সমস্ত কার্যকলাপে যুক্ত হতে চাইবে, কিন্তু সেই জন্যই এটি নির্দেশিত হয়েছে যে, শূদ্রদের সবসময় ভগবানের নাম কীর্তনে নিযুক্ত থাকা উচিত এবং তা তাদের হৃদয়ে জ্বলমান জাগতিক অগ্নি নির্বাপনে সাহায্য করবে।
একজন বৈশ্য, তাদেরও যতটা সম্ভব ভগবানের প্রতি কোন সেবা সম্পাদন করা উচিত। বৈশ্যরা, অবশ্য শ্রীকৃষ্ণ দেখিয়েছেন যে কিভাবে একজন বৈশ্য গাভীদের সাথে ক্রীড়া করে, মাখনের জন্য লড়াই করে ও অন্যান্য অসাধারণ লীলার মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করতে পারে। যারা বৈশ্য, যারা গ্রামীণ পরিবেশে আছেন, নয়ত বৈশ্যরা বর্তমান আধুনিক জগতে তারা অর্থ লাভের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী। হয়ত শূদ্ররাও অর্থ লাভের প্রতি আগ্রহী, কিন্তু তারা জানে না তা কিভাবে হবে। তাই অবশেষে তারা চাকরি করে বা এমন কিছুতে যুক্ত হয়, কিন্তু বৈশ্যরা আসলে জানে যে কিভাবে অর্থ লাভ করতে হয় এবং এটা বাস্তবে তাদের জন্য এক ধর্মের মত হয়ে ওঠে। তারা কেবল অধিক থেকে অধিকতর অর্থ সঞ্চয়ের প্রচেষ্টা করে। সেই জন্য এটি নির্দেশিত হয়েছে যে, বৈশ্যদের কৃষ্ণভাবনামৃতের জন্য অর্থ ব্যয় করা উচিত এবং এইভাবে তারা শুদ্ধ হতে পারবে। যদি তারা তাদের অর্থ কেবলমাত্র নিজেদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য ব্যবহার করে, যা এই শরীরের সাথে সাথেই শেষ হয়ে যাবে, তাহলে সবকিছুই শেষ।
ক্ষত্রিয়, আমরা শ্রীরামচন্দ্রের লীলায় দেখি, কিভাবে একজন ক্ষত্রিয়, অন্যান্য অবতারদের ক্ষেত্রে পরবর্তী জীবনে, তবে বিশেষত শ্রীরামচন্দ্র দেখিয়েছেন কিভাবে একজন রাজা বা ক্ষত্রিয় জীবনযাপন করেন। তারা সামরিক বিদ্যা, বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা, দান এবং সংস্কৃতির দ্বারা আনন্দ লাভ করেন। তারা বিশেষত আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির প্রচার করেন, কিন্তু এর মাধ্যমে অন্যান্য সকল ধরনের সংস্কৃতিও প্রচারিত হয় এবং সমাজকে সুসংগঠিতভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা জনসাধারণকে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার দিকে নেতৃত্ব দেন, যাতে প্রচারকেরা সুরক্ষিত থাকেন, আর ধর্ম, ধর্মীয় রীতিনীতিও সুরক্ষিত থাকে ও প্রচারিত হয়।
এরপর ব্রাহ্মণেরা, ব্রাহ্মণেরা অবশ্য পণ্ডিত। তারা পাণ্ডিত্যপূর্ণ কার্যকলাপে অধিক আগ্রহী। এটি আমরা খুঁজে পাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলায় যে কিভাবে একজন ব্রাহ্মণ আনন্দ লাভ করেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পূর্ববর্তী জীবনে ব্রাহ্মণ পরিবারে আবির্ভূত হয়ে তা প্রদর্শন করেছেন, তিনি এই সমস্ত ব্রাহ্মণীয় কার্যকলাপের আনন্দবিলাস করেছিলেন। অবশ্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ক্ষেত্রে, তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো বেদ স্মরণ করেছিলেন। কার্যতঃ ১১ বা ১২ বছর বয়সেই তিনি পুরো বেদ জানতেন, যা একজন সাধারন মানুষের পক্ষে অসম্ভবকার্য। তিনি অন্যদের আহ্বান জানাতেন… এই বলতেন যে… আমার মনে হয়… আমি জানিনা আমি এটা আগে বলেছি কিনা, কিন্তু কখনো কখনো তিনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন, তিনি দেখতেন আহ… বলা যাক মুকুন্দ। সেই সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ইতোমধ্যেই তাঁর নিজের ছাত্র গ্রহণ করা শুরু করে দিয়েছিলেন। তিনি মুকুন্দকে দেখতেন ও তিনি বলতেন, “এই মুকুন্দ! তুমি কোথায় যাচ্ছ?” তিনি একটু দূর থেকে ডাকতেন, তিনি ডাকতেন, মুকুন্দ আসতেন। আমি বলতে চাইছি, মুকুন্দ তাঁকে দেখতেন ও দৌড়ে পালিয়ে যেতেন, “না! এই নিমাই পণ্ডিত, কেন তিনি আমাকে ডাকছে? তিনি এত দাম্ভিক। আজকে আমি তাঁর অহংকার চূর্ণ করব।”
তাই, যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাকে ডাকতেন ও বলতেন, “কেন তুমি আসছো না…” খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ, “কেন তুমি আমাদের সাথে থাকছ না? কেন না? কেন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছ?”
“তুমি কি আর সংস্কৃত অধ্যায়ন করতে চাও না?”
কারণ একবার তিনি অল্প কিছু সময়ের জন্য তার ছাত্র ছিলেন এবং তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে গিয়েছিলেন। এটি হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর তাঁর ভক্তিমূলক ভাব প্রকাশের পূর্বের কথা। ঠিক যেমন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর গোপ সখাদের সঙ্গে ক্রীড়া করতেন, তেমনই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর বাল্য কালে ব্রাহ্মণদের সাথে ক্রীড়া করতেন। ব্রাহ্মণদের, তাদের মূল বিষয় হচ্ছে জ্ঞান। জ্ঞান তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এইরকম পাণ্ডিত্যপূর্ণ কার্যকলাপ যা আমরা আজকালকার দিনে শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠানে দেখি, তা বিশেষত ব্রাহ্মণদের দ্বারা আস্বাদিত হয়। অবশ্য, কিছু ব্যক্তিরা তারা বুঝতে পারেন না, কেন? কারা পাঠশালার আনন্দ উপভোগ করতে পারে? কিন্তু এমন কেউ কেউ আছেন যারা আসলে জ্ঞান সংগ্রহ করতে পছন্দ করেন। হয়ত তারা বইয়ের পোকা বা অন্য এমন মর্যাদাহানিকর কিছু হিসেবে পরিচিত। আমি এই বিভিন্ন ধরনের বিষয় জানিনা, কিন্তু এমন কিছু নির্দিষ্ট ধরনের মানুষেরা আছেন, যারা পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা পছন্দ করেন এবং তত্ত্বগতদিক বুঝতে পছন্দ করেন ও বিভিন্ন ধরনের যুক্তি ও শিক্ষাগত কার্যকলাপ পছন্দ করেন। বিশেষত এটি হচ্ছে, কার্যকলাপের দিক থেকে, তাদের গুণাবলীর মধ্যে নয়, অপরিহার্য এটি ব্রাহ্মণদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ধরনের মধ্যে একটি।
তখন তিনি বললেন, “মুকুন্দ কেন তুমি পালিয়ে যাচ্ছ? কেন তুমি আমাদের সাথে থাকছ না?”
মুকুন্দ বললেন, “এখন আমি তোমায় বলছি… আমি তোমাকে দেখাতে যাচ্ছি…” তিনি বললেন যে, “এখন আমি আর তোমার ব্যাকরণ অধ্যয়নের প্রতি আগ্রহী নই নিমাই পণ্ডিত! এখন আমি কাব্য পড়ি, এখন আমি সংস্কৃত কাব্য পড়ি। এখন আমার আর তোমার সংস্কৃত পাঠের প্রয়োজন নেই।”
তখন নিমাই বললেন, “দেখো, অবশ্য আমরাও কাব্যের বিষয়ে কিছু জানি।” (হাসি)
“তুমি কি নিশ্চিত যে তুমি কাব্যের উপর কিছু শিক্ষা দিতে চাও?”
“তুমি এমন কোন ধরনের কাব্য শিখছ যা আমরা যা শেখাতে পারব তার থেকে অধিক মহত্বপূর্ণ?”
এরপর মুকুন্দ কিছু কাব্য পাঠ করতে শুরু করেছিলেন, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাকে তৎক্ষণাৎ বাক্য দ্বারা পরাস্ত করেছিলেন এবং পুরো নিষ্পিষ্ট করেছিলেন, তবে তিনি এই সবকিছুই অত্যন্ত কোমলভাবে হাসিমুখে করেছিলেন।
তখন মুকুন্দ, তিনি বললেন, “তিনি কি করে সব শাস্ত্র জানেন? কি করে সব ব্যাকরণ জানেন? তিনি কি করে সব কাব্য জানেন? এই নিমাই পণ্ডিত কি? কিন্তু তিনি এত দাম্ভিক। আমি এমন কারও সাথে থাকতে চাই না যিনি এত দাম্ভিক। যদি তিনি অধিক মাত্রায় একজন ভক্তের মতো হতেন, তাহলে আমি তাঁর সাথে থাকতাম।” তারপর তিনি চলে গেলেন।
এবং নিমাই পণ্ডিত বললেন, “তোমার সাথে কাল দেখা হবে। এসো, কিছু কাব্য শিখে যাও।” (হাসি)
এইভাবে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি শহরের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন এবং প্রত্যেকেই তাঁকে ভালবাসতেন। এমনকি তিনি যখন ১৬ বা ১২ বছর বয়সী, তখন তিনি কেশব কাশ্মীরি, ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, দ্বিগবিজয়, যিনি গ্রামে গ্রামে শহরে শহরে যেতেন সব রাজার গুরুদের পরাস্ত করার জন্য, তাকে পরাস্ত করেছিলেন। তিনি শহরের মধ্যে দিয়ে যেতেন, সেই পুরো শহরে প্রত্যেকেই এই ব্রাহ্মণীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে ছিলেন, সমগ্র ভারত থেকে মানুষেরা আসতেন সংস্কৃত শিখতে, বেদ শিখতে, কাব্য শিখতে, এই বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির শিক্ষা গ্রহণ করতে। নবদ্বীপ ছিল সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল।
[পাশে: আসলে এখন ভবানন্দ গোস্বামী এবং আহ.. মায়াপুর চন্দ্রদ্বয় মন্দির এবং আমি বিনয়ীভাবে নিজে, আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত মায়াপুর চন্দ্রদ্বয় মন্দিরকে আবার সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু বানানোর চেষ্টা করছি নবদ্বীপ ধামের প্রকৃত ভাব পুনঃসৃষ্টি করার জন্য, অন্তত সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আরো আধ্যাত্মিক ব্যবহারিক দিকগুলি তুলে ধরার জন্য।]
চৈতন্য মহাপ্রভু যখন শহরে যেতেন, তখন প্রত্যেকেই তাঁকে দর্শন করতে আসতেন। ঠিক যেমন বৃন্দাবনে তারা শ্রীকৃষ্ণকে গাভীদের সাথে যেতে দেখতে আসতেন, তেমনই নবদ্বীপের সকল বাসিন্দারা নিমাই পণ্ডিতের সাথে তাঁর ছাত্রদের যেতে দেখতেন। তাঁর পদ্মলোচন ও অপরূপ রূপ সহ তিনি এত অপূর্ব সুন্দর ছিলেন। তখন তিনি যেতেন এবং তাঁতি বলতেন, “নিমাই পণ্ডিত! নিমাই পণ্ডিত! আপনি আসছিলেন না।” তিনি আসতেন এবং তিনি ওঁণাকে একটি বসার স্থান দিতেন, ওঁণাকে শ্রদ্ধা জানাতেন, তিনি ওঁণাকে ধুপ নিবেদন করতেন ও বিভিন্ন ঠান্ডা পানীয় দিতেন। অবশ্য, সাধারনত চৈতন্য মহাপ্রভু বাইরে থেকে কিছু গ্রহণ করতেন না, কিন্তু তিনি তাঁকে কোন না কোনভাবে তা নিবেদন করতেন, সব ধরনের আতিথ্য করতেন। তখন নিমাই পণ্ডিত বলতেন, “এই বস্ত্রটি পুরনো হয়ে গেছে। আমার নতুন বস্ত্র কোথায়? নতুন বস্ত্র কোথায়? আজকে আপনার কাছে কি আছে?” শ্রীল প্রভুপাদ বলতেন যে তিনি খুবই চটকদার পোশাক পরিধান করতেন। তিনি নতুন রং-এর বিভিন্ন ধরনের বস্ত্র এনে দিতেন, তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বলতেন, “ওহ এটা খুব ভালো! ওইটা খুব ভালো! কিন্তু আমি অবশ্য গরিব, আমি আর এইসব কিছুর অর্থ কোথায় পাবো?” এবং এই বলে তিনি সবার হৃদয় কেড়ে নিতেন। তারা বলতেন, “আপনার জন্য দামের কোন প্রশ্নই ওঠে না! (হাসি) যদি আপনি কিছু দিতে চান তাহলে দিতে পারেন, না হলে ঠিক আছে।” তখন চৈতন্য মহাপ্রভু আবার রাস্তা দিয়ে চলে যেতেন এবং তখন তিনি ঘোষদের কাছে যেতেন, যেখানে তারা সবাই হচ্ছে দুধওয়ালা। তারা ওঁণাকে বসার স্থান দিতেন, “দয়া করে বসুন! বসুন!” তিনি বলতেন, “রসগোল্লা কোথায়? দই কোথায়? দুধ কোথায়? ঘোল কোথায়? ঘি কোথায়? তোমরা আমাকে এখানে খালিহাতে বসতে বাধ্য করছো কেন?” (হাসি) তারপর তারা বেরিয়ে আসতেন এবং ঘি ঘোল নিবেদন সহ আসতেন। তিনি বলতেন, “অবশ্য আমি তো গরিব ব্রাহ্মণ। আমার আর এইসবের সামর্থ্য কোথায়? আমার কাছে টাকা কোথায়?” (হাসি) “কোন অর্থ লাগবেনা।” কিন্তু প্রত্যেকেই পূর্ণ তৃপ্ত ছিলেন, তিনি ছিলেন সমগ্র নগরির ভগবান, যেখানে তিনি যেতেন, মানুষেরা স্ব-ইচ্ছায় তাঁকে দিতেন যে, “আপনার শ্রীবিগ্রহের জন্য ঘি নিয়ে যান, আপনি অভিষেক করাতে পারেন এবং অভিষেকের জন্য দুধ নিয়ে যান।” এরপর তারা ওঁণাকে স্বইচ্ছায় সমস্ত দুগ্ধজাত দ্রব্য দিয়ে দিতেন। তিনি তা কোন এক ছাত্রকে দিতেন ও চলে যেতেন। এটা ছিল যেন তাঁর নিজের দিগ্বিজয়। এরপর তিনি যেতেন, তিনি একজন জ্যোতিষীর কাছে গিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন দিন বিভিন্ন স্থানে যেতেন, এমন নয় যে প্রত্যেকদিন একই জায়গায় যেতেন। তবে তিনি দিনে এক নির্দিষ্ট সময়ে শহরের চারিদিকে যেতেন এবং যদি তিনি কোন পণ্ডিতকে দেখতেন, তিনি বলতেন, “ওহ! হে ভট্টাচার্য! ভট্টাচার্য! দয়া করে এক মিনিট দাঁড়ান। মহাশয়! মহাশয়!” তারপর তারা তাকে দেখে দৌড়ে পালাতেন, ওহ না যদি চৈতন্য মহাপ্রভু তাদেরকে দেখে ফেলতেন, তাহলে তারা জানতেন যে তারা শেষ। (হাসি) তিনি তাদেরকে ডাকতেন এবং খুব বিনম্রভাবে প্রশ্ন করতেন ও তারপর সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজেদের শিক্ষা বিষয়ে যে আত্মসম্মান ছিল তা বিনষ্ট করতে এগিয়ে যেতেন আর নিজের জ্ঞান তাদের উপর প্রতিষ্ঠা করতেন। সেই জন্য তারা সেই অপমান ভোগ করতে চাইতেন না বলে তারা নিজেরাই দৌড়ে পালাতেন। ঠিক যেমন, জঙ্গলে সিংহ দেখলে ছোট প্রাণীরা দৌড়ে পালায়। তারা আর সেই পথে আসতেন না এবং যদি কোন পণ্ডিত তাঁর সামনে হেঁটে আসার সাহস দেখাতেন, তাহলে নিমাই তৎক্ষণাৎ তাদেরকে তর্ক আলোচনায় যুক্ত করতেন ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতেন এবং এরকম কিছু হতো। এইভাবে তখন বৈষ্ণবরা চিন্তা করতেন, “এই নিমাই পণ্ডিতের কি হয়েছে? তিনি তাঁর জীবন ব্যর্থ নষ্ট করছেন। তিনি কেন শুদ্ধ ভক্তি, ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হন না? তিনি কেবল তর্ক করেন। তার মধ্যে কিছু তও আছে, যার জন্য সব ভক্তরা তাঁর প্রতি পূর্ণরূপে আকৃষ্ট হন। তার কিছু আছে, আমরা তাঁর সম্বন্ধে চিন্তা করা বন্ধ করতে পারি না।” যখন আপনি দেখবেন যে, এত, এত আকর্ষণীয় একজন! “কিন্তু কেন তিনি সবসময় তর্ক করেন এবং এই বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপে যুক্ত থাকেন? আমরা সাধারণত এইসব বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হই না, তবে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হই। তাঁর মধ্যে কিছু তো আছে, যা খুবই আকর্ষণীয়।” তাদের সাধারণ মানসিকতা অবশ্য এটা ছিল, শুদ্ধভক্তরা সব সময় এমনই ভাবতেন যে, “তাঁর শুদ্ধ ভগবত সেবায় নিযুক্ত হওয়া উচিত।”
একসময়, তিনি শ্রীবাসের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, যিনি অনেক বয়ঃজ্যেষ্ঠ ছিলেন। শ্রীবাস বললেন, “কেন তুমি এমনভাবে তোমার জীবন নষ্ট করছ? কেন তুমি শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হচ্ছ না? কেন তুমি কেবল ভক্তি সহ কৃষ্ণের পূজা করছ না? কেন এসব তর্ক-বিতর্কের মধ্যে জড়াচ্ছো? কেন এইসব পাণ্ডিত্যপূর্ণ কার্যকলাপ নিয়ে আছ?” তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু উত্তর দিয়েছিলেন, “আমার, আমার অতি প্রিয় বৈষ্ণব ঠাকুর! আমি তোমাকে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করি। নিশ্চিতরূপে আমি শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হতে চাই, এটাই আমার জীবনের লক্ষ্য কিন্তু এখন আমার যৌবনে আমি শিক্ষা, পাণ্ডিত্য, জ্ঞানের আনন্দ নিতে চাই, তবে আমি গুরুর খোঁজ করছি। যখন আমি আমার গুরুর সাথে সাক্ষাৎ করব, তখন আমি নিশ্চিতরূপে শুদ্ধ ভক্তি সেবা করব। তুমি আমাকে আশীর্বাদ করো যাতে আমি একজন শুদ্ধ বৈষ্ণবকে গুরু রুপে লাভ করতে পারি। একজন শুদ্ধ ভক্তকে গুরু রূপে লাভ করা ছাড়া কিভাবে আমার বাসনা পূর্ণ হবে?” সেই জন্য তোমাকে আমায় আশীর্বাদ করতেই হবে। তুমি তোমার হাত আমার মাথার উপর রাখো যাতে আমি ভবিষ্যতে একজন শুদ্ধ বৈষ্ণবের আশ্রয় লাভ করতে পারি”। এইভাবে, তিনি তাদের উৎসাহ দিতেন এবং তাদের থেকে আশীর্বাদ লাভ করতেন ও তারপর চলে যেতেন ও তার নিজের কার্য চালিয়ে যেতেন।
এরপর কিছু সময় পর তিনি সব ছাত্রদের নিয়ে যান, “ঠিক আছে, চলো যাওয়া যাক!” রাস্তায় অবশ্য তিনি স্থির করেছিলেন, “আজকে এখানেই থামা যাক, এখানে একজন জ্যোতিষী আছেন।” তিনি এসেছিলেন ও সেই জ্যোতিষীকে বলেছিলেন, “তুমি হচ্ছো সর্বজ্ঞ। তুমি সবকিছু জানো, তুমি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ তোমার জ্যোতিষ গণনা ও জ্ঞানের দ্বারা দেখতে পাও। হে সর্বজ্ঞ আমাকে বলো, আমরা শুনেছি যে তুমি খুবই বিখ্যাত যে, তোমার আসলে এই জ্ঞান আছে, [পাশে: অবশ্য ইংরেজিতে আমার মনে হয় তারা এটিকে বলে ক্ল্যারভয়েন্ট ভিশন (জ্যোতিষ দৃষ্টি) কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাক্তির এক বিশেষ দূরদৃষ্টি থাকে, যার ফলে তিনি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পারেন।] তাই, “আমাকে বলো, আমি অতীতে কী ছিলাম? আমার পূর্বজন্মে আমি কি ছিলাম?” তখন তিনি তার জ্যোতিষ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার জন্য তার গোপাল মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন। যখন তিনি তার দিকে তাকিয়ে এই মন্ত্র উচ্চারণ করছিলেন, হঠাৎ তিনি দেখলেন — এই হচ্ছেন রামচন্দ্র, রঘুপতি রাম রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, তিনি পুরো লীলা তার চোখের সামনে দেখলেন। “এটা কি হচ্ছে? এই ব্রাহ্মণ আমার ওপর কোন জাদু করেছে।” তারপর তিনি আবার দেখলেন, “বরাহ, বামন, তারপর নৃসিংহ।” এরপর তিনি দেখলেন যে, শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর বংশী বাজাচ্ছেন, মুরলীবদন। তারপর আবার তিনি দেখলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, “কি হচ্ছে এটা হ্যাঁ?” (হাসি) “আমি তোমাকে কিছুই বলতে পারব না। আমি জানি না তুমি কে। এইসব আমাকে খুবই বিভ্রান্ত করছে।” (হাসি) এবং তারপর তিনি বললেন, “তুমি আমার উপর কোন জাদু বা এমন কিছু করেছো।” যোগ মায়ার কারণে তিনি জানতে পারলেন না, এমনকি তিনি দেখলেন কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি যে এটা কিভাবে হচ্ছে। এমনকি এই হচ্ছেন শ্রীরাম, এই হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ, নৃসিংহ, শ্রীবিষ্ণু এসেছেন, তখন চৈতন্য মহাপ্রভু চলে গেলেন এবং সেই ব্যক্তি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে আমি কিভাবে এইসব কিছু দেখলাম? এবং তারপর তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুকে তার শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন, কিন্তু তিনি পুরোপুরি বিভ্রান্তিতে ছিলেন। তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তার ছাত্রদের নিয়ে চলে গেলেন এবং তারা গঙ্গায় গেলেন, সেখানে তারা জলের মধ্যে খেলা করতে শুরু করেছিলেন, একে অপরকে জল চিটাচ্ছিলেন এবং এইভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু গঙ্গায় স্নান করার পর গৃহে ফিরে ছিলেন ও তাঁর শালিগ্রাম শিলা পূজা করেছিলেন। শালিগ্রাম শিলার অভিষেক করেছিলেন ও অর্চন করেছিলেন। তারপর তাঁর মা শচীমাতা ও তাঁর স্ত্রী, তারা প্রসাদ রন্ধন করেছিলেন, তিনি তা শ্রীবিগ্রহকে নিবেদন করেছিলেন। এরপর তিনি বসেছিলেন ও তার স্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে প্রসাদ সেবা করিয়েছিলেন। তাঁর প্রসাদ সেবা শেষ করার পর তিনি তাঁর উচ্ছিষ্টপ্রসাদ গ্রহণ করেছিলেন এবং শচীমাতা এই দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন যে কিভাবে স্ত্রী স্বামীর সেবা করছেন, কিভাবে তার পুত্র খুবই ভালো অবস্থায় আছেন। তারপর তিনি কিছু বিশ্রাম গ্রহণ করতেন, বিশ্রাম গ্রহণের পর আবার সন্ধ্যায় তিনি বের হতেন ও তাঁর সঙ্গীগনের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। এইভাবে তিনি তাঁর দৈনন্দিন কার্যকলাপ করতেন, এইভাবে প্রথমদিকে তিনি এক ব্রাহ্মণের মত জীবন-যাপন করেছিলেন।
বৈশ্য, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, শূদ্র ইত্যাদি বিভিন্ন বিভাগের প্রত্যেকের তাদের বিশেষ বিশেষ আকর্ষণ আছে এবং ঠিক যেমন বিভিন্ন অবতার, তারাও বিভিন্ন শ্রেণীতে আবির্ভূত হন, বিভিন্ন বর্ণ ও আশ্রমেও আসেন মানুষদেরকে এটি দেখানোর জন্য, আসলে বিভিন্ন ব্যক্তিদের কৃপা করার জন্য। এমনকি তাঁর দিব্য লীলা উপভোগের জন্যও। অবশ্য জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষ্ণভাবনাময় হওয়া, কিন্তু যখন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আবির্ভূত হন, তখন তাঁর অভ্যন্তরীণ কিছু লীলা থাকে। যখন তাঁর ছাত্ররা তাঁকে এইভাবে ঘিরে থাকতেন, তখন সেটি বর্ণনা করা হয়েছে যে এটি কত অপ্রাকৃত দৃশ্য ছিল। আসলে সেইসব ছাত্ররা অত্যন্ত মহান মহাত্মা ছিলেন, যারা এই লীলায় কেবল পরিশীলনের জন্য এসেছিলেন। হয়তো আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তী জীবনে নবদ্বীপে যাবেন… অন্য কোন ব্রহ্মাণ্ডে এবং আপনারাও চৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে এইসব লীলায় অংশগ্রহণ করবেন, হয় তাঁর পূর্ব জীবনে, অথবা পরবর্তী জীবনে তাঁর সংকীর্তন আন্দোলনে যুক্ত হবেন। বেশিরভাগ ছাত্ররাই, তারা সবাই পরবর্তীতে তাঁর সংকীর্তন লীলায় যুক্ত হয়েছিলেন। আসলে এটি হচ্ছে জীবনের লক্ষ্য যে গৃহে ফিরে যাওয়া, ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া ও ভগবানের সাথে থেকে তাঁকে তাঁর লীলায় সহায়তা করা।
এই ব্রহ্মাণ্ডে আনন্দ এবং সম্পর্ক, এই জড়জগতে এই সবকিছুই অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং গতকাল আমরা পড়েছি কিভাবে কুয়োর মধ্যে থাকা ব্যাঙ, কুয়োতে থাকা ব্যাঙ সে তা তার নিজের ধারণার মাধ্যমে চিন্তা করছে যে সমুদ্র কত বড় হবে, এইভাবেই মানুষেরাও ভগবানকে বোঝার চেষ্টা করে, এবং তারা মনে করে, ভগবান হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা, তিনি হচ্ছেন সংহারকর্তা। বর্তমানে এটি খুবই বিশালভাবে প্রচারিত যা সাম্প্রতিক ‘ব্যাক টু গডহেড’-এ এসেছে। আমি দেখেছি যেদিন আমি এখানে এসেছিলাম নিউইয়র্কে, না আমাকে ক্ষমা করুন ‘লস এঞ্জেলেস টাইমস’-এ বলা হয়েছিল যে কিভাবে অনেক মানুষেরা এখন ভগবানের ব্যাপারে চিন্তা করছে যে ভগবান জীবিত আছেন, তিনি আছেন কিন্তু তিনি কেবল সৃষ্টি করেন ও ধ্বংস করেন এবং তিনি চান যাতে আমরা ভালো কিছু করি কিন্তু তিনি তত শক্তিশালী নন। তিনি আসলে নিষ্কর্মা। তিনি যেটা করতে পারেন তা হচ্ছে কেবল ভালো আশা করা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এমন কিছুই নেই যা তিনি করতে পারেন। এটা সত্যিই তাঁর নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে। সব থেকে শ্রেষ্ঠ যা তিনি করতে পারেন, তা হচ্ছে এক পর্যায়ে সবকিছু শেষ করে দেওয়া এবং তিনি আবার তা সৃষ্টি করতে পারেন। তবে এর মাঝে তার আর কিছু করার নেই। সেই জন্য ভগবান, যেহেতু তিনি হচ্ছেন নিষ্কর্মা ব্যক্তি, তাই মানুষেরা জন্মগতভাবে অন্ধ, মানুষেরা কষ্ট ভোগ করছে, এমনকি যদিও তারা প্রকৃতপক্ষে এর যোগ্য নয়, কিন্তু যাইহোক না কেন এই সবকিছু তাঁর নিয়ন্ত্রণের অতীত, এসব ঘটনাক্রমে ঘটে বা এমন কিছু। এইরকম নিষ্কর্মা ভগবানের ধারণা নিয়ে, তারা বলে, “সর্বশক্তিমান ভগবান যিনি আমাদের উপর খুবই কঠোর, তার থেকে একজন নিষ্কর্মা ভগবান থাকা ভালো, যিনি খুবই দয়ালু। আমি তার সাথে সম্বন্ধ অনুভব করতে পারব।” এই হচ্ছে তাদের ধারণা এবং তাদের জল্পনা কল্পনা। তাই মানুষেরা, তারা ভগবানকে সীমিত করতে চায়। তারা তাদের নিজেদের সীমিত উপলব্ধির দ্বারা ভগবানকে বুঝতে চায়। খুব সীমিত ধরনের উপলব্ধির দ্বারা তারা কৃষ্ণকে, পরমেশ্বর ভগবানকে জানতে চায়। এটা খুবই অপরাধজনক। এটি হচ্ছে কর্ম, পুনর্জন্ম যে আছে এই সবকিছু অবশ্য যেহেতু তারা জানে না, তাই তারা বুঝতে পারে না কেন শিশু জন্মান্ধ হয়। কেন একজন ব্যক্তি, কেবল পাঁচ বছর বয়সে যখন সে রাস্তার উপর খেলছে, তার উপর দিয়ে গাড়ি চলে গেল বা এইরকম কিছু হল। তারা এগুলো বুঝতে পারে না যে কিভাবে এই সবকিছু হতে পারে? কারণ তারা মনে করে যে এই জীবনই হচ্ছে একটি জীবন এবং অনেকগুলি জীবনের একটি ক্রম। তারা এটাও বোঝে না, ভগবানের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে কোন কিছুই বোঝে না। আসলে কৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বশক্তিমান, কিন্তু এমনকি মহান ব্যক্তিরা বলে, গোঁরা ধর্মজ্ঞরা বিশ্বাস করে যে, “ভগবান হচ্ছেন একজন সৃষ্টিকর্তা, তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি ধ্বংস করেন, তিনি হচ্ছেন পালক।” কিন্তু আসলে কৃষ্ণ হচ্ছেন এই সবের থেকে অনেক বেশি কিছু। আজকাল, আমরা আসলে… কালকে যে শ্লোক আছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে কিভাবে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন আসলে, তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আনন্দ। প্রকৃত গুণ যা শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে আছে, তা একপ্রকার এইসবকিছুর থেকে অধিক, আপনি বলতে পারেন, সৃষ্টি এবং ধ্বংসকারী হলেও আসলে তিনি হচ্ছেন আনন্দ। তিনি হচ্ছেন সকল আধ্যাত্মিক আনন্দের ভান্ডার। আমরা কিভাবে সেই সব আধ্যাত্মিক আনন্দগুলি ব্যাপারে জানতে পারি, তা হচ্ছে যখন তিনি এখানে অবতীর্ণ হন ও তার লীলাবিলাস করেন। আপনি সেইসব আনন্দের কিছুটা সেই লীলাসমূহের মাধ্যমে উপলব্ধি করা শুরু করতে পারেন।
যখন শ্রীকৃষ্ণ অবতরণ করেছিলেন, তিনি বৃন্দাবনবাসীদের আশীর্বাদ দিয়েছিলেন, তাদের সাথে সাধারণ গোপবালকের মত ক্রীড়া করেছিলেন বা চৈতন্য মহাপ্রভু এক ব্রাহ্মণরূপে সেইসব ব্রাহ্মণদের সাথে ক্রীড়া করেছিলেন, কিভাবে তারা অবতীর্ণ হয়েছিলেন ও অবশ্য তারা তাদের শৈশবের শিশুকালীন লীলা প্রকাশ করেছিলেন এবং তাঁরা আসলে বিভিন্ন দিক দিয়ে তাদের স্বরূপ প্রদর্শন করিয়েছিলেন যাতে মানুষেরা বুঝতে তাঁদের অতুলনীয় শক্তি সম্বন্ধে পারে। এর মানে এই নয় যে তাদের শৈশবকালীন কার্যকলাপ কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমনকি যদিও তা দেখে জড়জাগতিক মনে হতে পারে, কিন্তু তা জড়জাগতিক নয়, বরং এটি অনেক ভক্তদের প্রতি একপ্রকার আশীর্বাদ, যারা সেইরকমভাবে ভগবানের সেবা করার জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। যখন এই লীলা সংগঠিত হয়েছিল, তখন তারা এর মাধ্যমে কোনো জাগতিক আনন্দ অনুভব করেননি, এর দ্বারা ভক্তরা আধ্যাত্মিক আনন্দ উপলব্ধি করেছিলেন। অবশ্য, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভাব লগ্ন থেকেই নিজেকে পরম পুরুষোত্তম ভগবান রূপে প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রচ্ছন্নভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই জন্য অনেক মানুষেরা বুঝতে পারত না যে তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। এটা অবশ্য তাদের উপর তাঁর যোগমায়া এবং তাঁর মহামায়া উভয় শক্তির প্রভাব। এক্ষেত্রে, মহাত্মারা তৎক্ষণাৎ শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবানরূপে বুঝতে পেরেছিলেন, তবে নির্দিষ্ট কিছু জন কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুকে বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু সকলে নয়। যখন তিনি তাঁর সংকীর্তন লীলা প্রকাশ করেছিলেন, তখন ভক্তরা যথাসময়ে এটি উপলব্ধি করেছিলেন যে তিনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। সেটা একটি ভিন্ন বিষয়।
আজকে এই শ্লোকে আমরা দেখতে পারছি কিভাবে মূর্খ বদ্ধ জীবেরা এই জড় জগতকে চিরস্থায়ী অবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে এবং পরে দুর্ভাগ্যবশত সেই ব্যক্তিরা বড় কর্ম উদ্যোগ, বড় প্রতিষ্ঠান, বড় ভবন এবং কত কি সৃষ্টি করতে অত্যন্ত উৎসাহিত হয়। তারা এটা উপলব্ধি করতে পারে না যে কিভাবে এইসব বড় বড় রাজত্ব এবং বড় আধিপত্য, কর্ম প্রতিষ্ঠান, ইত্যাদি সবকিছুই বিনষ্ট হয়ে যাবে। একজন ব্যক্তির জীবন খুব শীঘ্রই শেষ হয়ে যায়। এইসব বড় বড় রাজবংশ, বড় বড় সৃষ্টি এই সবকিছু বেশি দিনের জন্য থাকে না। তাই মূল বিষয় হচ্ছে যে আমরা যা করি তা যদি কেবল জাগতিক কিছু সৃষ্টির জন্য করি, তাহলে সেটা হচ্ছে ঠিক সমুদ্রের ধারে বালির প্রাসাদ নির্মাণের মতো। এটা হয়ত দেখতে খুব সুন্দর লাগতে পারে, কিন্তু তা… একবার ঢেউ এলেই, এই সব কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সময়ের স্রোত হচ্ছে নিষ্ঠুর, বিস্ময়করভাবে কিভাবে সময় ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। যেমন আমেরিকার সরকারের দ্বারা করা বড় বড় কোম্পানিগুলির প্রদর্শনীতে দেখা যায়, তারা বিশ্বের ইতিহাস দেখে এবং তারা দেখায় যে, “মিশর সভ্যতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল যা ধ্বংস হয়েছে, রোমান সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে। এরপর সেখানে কিছু নেপোলিয়ান ছিল, তারাও ধ্বংস হয়ে গেছে, এইভাবে কত সভ্যতা ছিল।” কিন্তু তারা এমন বলে যে, “এখন সময় হচ্ছে আমাদের গড়ে তোলার।” তবে দেখুন ইতিহাস পুনরাবর্তিত হয়, তাই আমেরিকাও বর্তমানে এই একই ধ্বংসের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।
আমরা আসলে, এই বৈদিক সভ্যতা এখনো বর্তমান আছে, এখন হয়ত তা অপরিবর্ধিত অবস্থায় আছে, কিন্তু আসলে এটিই হচ্ছে সর্বপুরাতন সভ্যতা। সেই জন্য আমাদের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বছরের পুরনো ইতিহাস আছে, কিন্তু একটি সভ্যতাই শেষ হয়ে যায়নি, তবে অনেক অনেক আসুরিক সভ্যতা যা বিভিন্ন ব্যক্তিদের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, তারা চেষ্টা করেছিল… সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই সব বিনষ্ট হয়ে গেছে। এই হচ্ছে প্রকৃত সমাধান যে এই ছোট জীবনকালে এবং বিশেষত এই কলিযুগে আপনি হাজার হাজার দিন দেখতে পাবেন না, আপনি পুরো সরকার সহ সবকিছু কেবল কিছু দশক বা এমনকি ১০-১৫ বছর বা কিছু মাসের মধ্যে দেখতে পাবে। বলিভিয়াতে তাদের এক বছরে গড়ে দুই সরকার ছিল, এইভাবে আপনি ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতিকে দেখতে পারবেন, কিন্তু প্রত্যেক সরকার যখন তারা ক্ষমতায় আসে, তারা মনে করে “আমিই শেষ সরকার হতে চলেছি! আমি পরবর্তী ১০ বছরের জন্য এই কার্যালয় থাকতে চলেছি।” কিন্তু এটাই কখনো শেষ হয় না। যাইহোক বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কর্ম আছে, কিন্তু ১০ বছর হোক বা ১০০ বছর ,আমরা এই শরীরে ১০০ বছরের বেশি থাকব না। এই সমগ্র বিশ্বে কেবল মুষ্টিমেয় ব্যক্তি আছে যারা ১০০ বছরের অধিক বেঁচেছে যাদের কথা মানুষেরা জানে। কিন্তু এই বেঁচে থাকার কি লাভ... ? প্রকৃত বিষয় হচ্ছে এই জীবনকাল থাকাকালীন আমাদের কৃষ্ণের প্রতি ভক্তিমূলক সেবা করা উচিত। এটি অবশ্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর পরবর্তী জীবনকালে প্রকাশ করেছিলেন। আমরা ভগবানের জন্য যা কিছু করি যার দ্বারা আমরা ভগবত চেতনাময় হই, তা কখনো বিনষ্ট হয় না, কিন্তু জড়জাগতিকভাবে আমরা যা কিছু করি, তা চিরদিন থাকবে না। অবশ্য আমরা এই আবর্ত এর মধ্যে বাহিত হই এবং পুরো বিষয়টি হয়ে ওঠে যে প্রসিদ্ধি, ক্ষমতা, মান-মর্যাদা, অর্থ এবং ইন্দ্রিয়তৃপ্তির দ্বারা জড়জাগতিক জীবনে সাফল্য অর্জন ও এরপর আমাদের বোঝার আগেই জীবন শেষ হয়ে যায়, আবার আমরা আরেকটি জন্মগ্রহণ করি ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে এসে পড়ি এবং আমরা যা কিছু করেছিলাম তা শেষ হয়ে যায়। তাই প্রকৃত বস্তু হচ্ছে আমরা কৃষ্ণের জন্য যা করি, একজন ব্যক্তি প্রতিবার যে হরে কৃষ্ণ নাম করেন, ব্যক্তি যা সেবা করেন, তা নষ্ট হয় না, সেটা তাদের সাথে থাকে, আর এটিই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ লাভ।
যদি আপনি কাউকে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বা প্রভুপাদের গ্রন্থ পড়াতে পারেন, তাহলে কেবল এই সমস্ত গ্রন্থ পড়ার মাধ্যমে তারা এত লাভবান হতে পারেন, যা আপনি কল্পনা করতে পারবেন না। এটা হচ্ছে চিরন্তন লাভ। এইভাবে শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন আমরা যাতে তাঁর কৃপা বিতরণ করি, তাই চলুন মানুষদের নিত্যভাবে লাভবান হতে দেওয়া যাক। অবশ্য মানুষেরা সাময়িক ইন্দ্রিয় তৃপ্তির প্রতি এবং এই সম্বন্ধীয় কার্যকলাপের প্রতি এতই মনোযোগী যে তারা হয়ত সবসময় এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারবে না যে এইসব আধ্যাত্মিক কার্যকলাপের মূল্য কি? তারা এটি উপলব্ধি করতে পারবে না যে নাগড়দোলায় ওঠার মতো সাময়িক ইন্দ্রিয় তৃপ্তির মূল্য কি, যে ১০ মিনিটের জন্য এক ডলার খরচ করে নেমে আসতে হয়। আপনি সেখানে দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারবেন না। এটাই হচ্ছে প্রকৃত বস্তু। এইটি আপনি কখনও হারাবেন না। তারা হচ্ছে ঠিক শিশুর মত, তাদের পূর্ণ ধারাবাহিক জীবনের কোন দৃষ্টিভঙ্গি নেই, সেই জন্য তারা কেবল শিশুদের মতো অতি সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। তারা যে খুবই অত্যাধুনিক এতে কোন সন্দেহ নেই, তাদের নিজেদের চলার পথে তারা খুবই নিপুণ। কিন্তু এই সব কিসের জন্য? অবশ্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যখন তার পিতা এই জগত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তখন তিনি ফিরে এসে দেখেছিলেন যে তার পিতা চলে গেছেন, তিনি এটিকে একটি তার শৈশবকালীন লীলা সমাপ্তির শুভারম্ভের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তখন তিনি কেবল ১৪ বছর বয়সী ছিলেন। তখন আর তিনি সেইরকম ছিলেন না, তিনি দীর্ঘক্ষণ বাইরে খেলতেন না। সেই বয়সের আগে কেউ কিভাবে ভগবত চেতনার প্রচারের বিষয়ে তাঁর কথা শুনত? ততদিন পর্যন্ত তিনি কিছু পান্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞানচর্চা নিয়ে থাকতেন, কিন্তু যাইহোক না কেন সেটি ছিল তাঁর ইচ্ছা এবং লীলা। ১৪ বছর বয়সে তিনি গয়াতে গিয়েছিলেন, যেখানে খুব বড় এক শ্রীবিষ্ণুর মন্দির রয়েছে। ভারতের প্রত্যেকেই কম বেশি গয়াতে যান সকলের জন্য পিণ্ডদান করতে বা জগত ছেড়ে চলে যাওয়া আত্মার জন্য, মৃত পিতা বা কোন আত্মীয়দের জন্য পবিত্র পূজা করতে। তারা সেই ব্যক্তির নামে শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্মে পূজা করেন যাতে তারা উদ্ধার লাভ করতে পারে। সেই সময় যখন চৈতন্য মহাপ্রভু সেখানে গিয়েছিলেন, তখন ঈশ্বরপুরীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল, যাঁর সঙ্গ তিনি পূর্বেও পেয়েছিলেন। কিন্তু এই সময় তিনি তাঁকে দীক্ষা লাভের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। যখন তিনি কৃষ্ণ নামে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নামে দীক্ষিত হন, তখন তিনি গিয়েছিলেন এবং গয়াতে বিষ্ণুপাদ মন্দিরে শ্রীবিষ্ণুর শ্রীপাদপ্রদ্ম পূজা করেছিলেন এবং সেই স্থানে প্রথম তিনি তাঁর মহাভাব প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর চক্ষু থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। সেই সময় তিনি দীক্ষা লাভ করেছিলেন এবং তিনি কেবল ‘কৃষ্ণ’ ‘কৃষ্ণ’ ‘কৃষ্ণ’ নাম উচ্চারণ করছিলেন। যখন তিনি নবদ্বীপে ফিরে এসেছিলেন, তখন পুরো যাত্রাপথে তিনি ‘কৃষ্ণ’ নাম কীর্তন করছিলেন। যখন তিনি ফিরে আসলেন, তখন তার সকল ছাত্রদের সাথে তিনি কেবল কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় কথা বলতেন। সবকিছু, তখন সবকিছুতেই তিনি কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় বিষয় টেনে আনতেন। প্রত্যেক বৈদিক শ্লোক, প্রত্যেক আলোচনা, প্রত্যেক ব্যাকরণ, প্রতি শব্দ, প্রতি বর্ণ, সবকিছুকেই তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত করতেন। তার ছাত্ররা পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন, “নিমাই পণ্ডিতের কি হয়েছে? তিনি যাই বলেন, তাতে তিনি কৃষ্ণকে নিয়ে আসেন।” তারা তার শিক্ষকের কাছে গিয়েছিলেন যিনি তাকে বহু বছর পূর্বে ব্যাকরণ বিদ্যা শিখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “আপনার ছাত্র নিমাই পণ্ডিত আমার মনে হয় তিনি উন্মাদ হয়ে গেছেন। তাঁর কিছু একটা হয়েছে। তিনি কেবল ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ জপ করছেন এবং যা কিছু তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন তাও কৃষ্ণ সম্বন্ধীয়, তিনি আমাদেরকে বলছেন আমাদের কেবল শুদ্ধ ভক্তি সেবা করা উচিত। হয়ত তার কিছু একটা হয়েছে। আপনি তাঁকে সম্ভবত নির্দেশ দিতে পারবেন।” তখন গঙ্গা দাস পণ্ডিত, তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর পুরাতন শিক্ষককে দেখে তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। তিনি তাঁকে প্রণাম করেছিলেন এবং তাঁকে বসার স্থান দিয়েছিলেন ও বলেছিলেন, “আমি কিভাবে আপনার সেবা করতে পারি? তিনি গঙ্গা দাস পণ্ডিতকে শ্রদ্ধা করতেন, তবুও তিনি সকলকেই পরাস্ত করেছিলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন আসলে সান্দীপনী মুনির অবতার, তাই যাইহোক তিনি তাকে তাঁর শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন এবং যদিও তিনি তার গুরু ছিলেন না, তার গুরু ছিলেন ঈশ্বরপুরী, তবুও শিক্ষক হিসেবে তিনি তাকে শ্রদ্ধা করতেন। যদি কেউ আপনাকে কোন কিছু শিক্ষা দেন, তাহলে তাকে আপনার শ্রদ্ধা করা উচিত। তখন তিনি বলেছিলেন, “তুমি হচ্ছ এক ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব। তোমার কর্তব্য হচ্ছে শ্রীবিগ্রহ অর্চন করা এবং তোমার শাস্ত্র জানা উচিত। এখন তোমার ছাত্ররা বলছে যে তুমি যুক্তি তর্ক করা ছেড়ে দিয়েছ, তুমি সব কিছুই ছেড়ে দিয়েছ, তুমি কেবল ভক্তিতে যুক্ত আছো।”
“কে বলেছে? আমি নিমাই পণ্ডিত। আমি সর্বশাস্ত্র জানি, আমি সমস্ত যুক্তিবিদ্যা জানি, আমি তর্কবিদ্যা জানি, আমি সবকিছুই জানি — ব্যাকরণ, কাব্য, আমি সব জানি। এমন কে আছে যে আমাকে বাকযুদ্ধে আহ্বান জানাতে পারবে?”
তার ছাত্ররা তখন বলছে, “আহ! এই হচ্ছে পুরনো নিমাই পণ্ডিত যাকে আমরা চিনি।” (হাসি)
তারা ছিলেন পাক্কা বুদ্ধিজীবী তারা এটা চাইতেন না, তারা বিক্ষিপ্তচিত্ত হতে চাইতেন না। কখনও কখনও আপনি এই ধরনের পেশাদার বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে পাবেন, তারা এইসব চায়না, তারা বুঝতে চায় না। খুব বেশি আধ্যাত্মিক ব্যাপার হলে, তারা কোন না কোনভাবে মনে করে যে এটি তারা যে পরিস্থিতিতে আছে সেটায় তাদের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা হবে। মানে অল্প কিছু ঠিক আছে, কিন্তু বেশি নয়। যদি একটু বেশি হয়, তাহলে তারা তা পছন্দ করে না। তখন তারা বলছে, “শুনুন, এটা এখন অতিরিক্ত হচ্ছে, সব সময় নাম জপ করা এবং কৃষ্ণের জন্য ক্রন্দন করা, এটা এবার অতিরিক্ত হয়ে পড়ছে।” তখন তারা তার পিছনে গেলেন এবং আপনারা এটাকে কি বলেন, ফিনক করা (তার সম্বন্ধে বলল) তারা তার শিক্ষককে বললেন। (হাসি) তখন, এইভাবে গঙ্গা দাস পণ্ডিত বললেন, “ওহ! কিন্তু তিনি তো ঠিক আছেন। একজন ব্রাহ্মণ হিসেবে আপনার জানা উচিত, অবশ্য আপনার বৈষ্ণবীয় বিষয় সম্বন্ধেও জানা উচিত, কিন্তু আমাদের খুব শক্তিধর দার্শনিক ব্যক্তিও দরকার যিনি অন্যান্যদের বিরুদ্ধে বৈদিক সংস্কৃতি রক্ষা করতে সক্ষম এবং যিনি ভরণ পোষণের জন্য অর্থ আয় করবেন ইত্যাদি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “না! না! এমন কে আছে যিনি বাকযুদ্ধে আমায় আহবান করতে পারবে? আসুন।” তিনি রাস্তায় হেঁটে গিয়েছিলেন, তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন, “এমন কে আছে যিনি আমাকে আহ্বান করতে পারবে? আমি নিমাই পণ্ডিত। কেউ একজন শ্লোক বলুন, শ্লোক বলুন, কোন তর্ক উত্থাপন করুন। দেখি কে ভালো ব্যাখ্যা করতে পারে। এমন কে আছে যে…” এইভাবে তিনি সকলকে আহ্বান করছিলেন, তার ছাত্ররা আনন্দে ছিলেন, এই হচ্ছে আগের একই নিমাই পণ্ডিত। আমরা তাঁকে যেরকম দেখেছিলাম সেখানে ফিরে এসেছি। এইতো আমরা ভালো এগোচ্ছি। তখন গঙ্গা দাস পণ্ডিত চলে গেলেন।
এরইমধ্যে চৈতন্য মহাপ্রভুর ঠাকুরদা নীলাম্বর চক্রবর্তী ঠাকুরের এক পুরাতন বন্ধু, তিনি হেঁটে এসেছিলেন এবং তখন তিনি দেখলেন যে নিমাই পণ্ডিত এইরকম বলছেন। তিনি তাঁর কাছে এসেছিলেন এবং তাঁর কাছে শ্রীমদ্ভাগবতের একটি শ্লোক উচ্চারণ করতে শুরু করেছিলেন, কয়েকটি শ্লোক বলেছিলেন, যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ লীলার মহিমা বর্ণিত হয়েছে যে কিভাবে তিনি সকল অসুরদের উদ্ধার করেছিলেন, তাদেরকে বিশেষ মুক্তি প্রদান করেছিলেন, এমনকি যদিও তারা তাঁকে হত্যা করার জন্য এসেছিল এবং যখন তিনি এইভাবে কৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করা শুরু করেছিলেন, যখনই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কর্ণে সেই সব শ্লোকের ধ্বনী পৌঁছালো, তখন ছাত্ররা তাঁর দিকে তাকালেন যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কি হচ্ছে? তিনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন, হঠাৎ করে চৈতন্য মহাপ্রভু, “ওহ কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! আমি কত পতিত। কৃষ্ণ আমি কত বছর ধরে তোমাকে অবহেলা করে এসেছি।” তারপর তিনি ভাবেবিভোর হয়ে গিয়েছিলেন, “কৃষ্ণ!” তিনি মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন, “আহ কৃষ্ণ!” তাঁর দেহ কম্পিত হচ্ছিল, তারা তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন, “কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! আমি কবে তোমার আশ্রয় লাভ করব? কবে?...” তিনি বিরহ বেদনায় নিমগ্ন ছিলেন, ক্রন্দন করছিলেন, “কৃষ্ণ! কৃষ্ণ!” বলে এবং তারা তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তাঁর দেহ কম্পিত হচ্ছিল। এমনকি ১০ জন ছাত্ররা তাঁকে এদিক দিয়ে, ওদিক দিয়ে ধরার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তারা পারছিলেন। চৈতন্য মহাপ্রভু মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন এবং এমনভাবে তাঁর দেহকম্পিত হচ্ছিল যে তারা তাঁকে ধরে রাখতে পারছিলেন না। তারা বললেন, “ওহ না! চৈতন্য মহাপ্রভু আর একই রকম নেই। নিমাই পণ্ডিত একই রকম নেই। কি করা যায়? কি করা যায়?” তারা তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন এবং অবশেষে কিছু সময় পর চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর মহাভাব থেকে বের হয়ে বাহ্যিক চেতনায় ফিরে এসেছিলেন। তারপর তিনি সেই বালকদের বলেছিলেন, “ঠিক আছে, আজকে তোমাদের বই নিয়ে যাও এবং এখানেই সমাপ্ত করছি।” (হাসি)
পরের দিন সব ছাত্ররা এসেছিলেন, পরের দিন চৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীমান দাসকে বলেছিলেন… যাইহোক এইসব লীলা বলার জন্য আর সময় নেই, আমার মনে হয়। কিভাবে তিনি প্রথম ভক্তদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাদেরকে তাঁর হৃদয়ের পরিবর্তন সম্বন্ধে বলেছিলেন, সেটা হচ্ছে তাদের সাথে তাঁর সম্পূর্ণ অন্তরঙ্গ লীলা। তিনি আসলে তাদের সাথে তাঁর সম্বন্ধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমি সেটা কোন একসময় বলতে পারি, যখন আরেকটু সময় থাকবে। এরপর ভক্তদের সাথে সাক্ষাতের পর, প্রথমবার এইসব অন্তরঙ্গ লীলা হওয়ার পর, তিনি আবার তাঁর ছাত্রদের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন… পরের দিন দুপুরে। তখন তারা তাদের গ্রন্থ ও সবকিছু এনেছিলেন। তিনি বললেন তোমরা কি বুঝলে যা আমি তোমাদেরকে শিখিয়েছি?” তারা বললেন, “মহাশয়” একজন বালক উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “আপনি যা কিছু বলেছেন… তাতে আমরা একটা ব্যাপারই বুঝেছি যে কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! আপনি যা কিছু বলেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই কৃষ্ণতে চলে আসে। তাই অকপটে আমরা সবাই… আমরা এটাই অনুসরণ করতে পারি যে আপনি আমাদেরকে কৃষ্ণ সম্বন্ধে যা বলছেন, কিন্তু আপনি এর আগে আমাদেরকে কখনো এরকম শিক্ষা দেননি, সেইজন্য আমরা একটু বিভ্রান্ত। আমরা সত্যি বুঝতে পারছি না কিভাবে কৃষ্ণের বিষয়ে হঠাৎ এইসব ব্যাখ্যা, হঠাৎ এই পরিবর্তন বুঝবো?” তখন চৈতন্য মহাপ্রভু তাদেরকে বললেন, “দেখো আমি তোমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমি তোমাদের সংস্কৃত শিখিয়েছি। আমি পুরো বেদ পড়েছি, আমি তোমাদের যা কিছু শিক্ষা দিতে পারতাম তা সব দিয়েছি। এখন বিষয় হচ্ছে এই সব কিছু অধ্যয়নের পর, এই সব কিছু জানার পর, আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে কৃষ্ণের বাইরে আর কিছু নেই। সবকিছুর মধ্যে, সবকিছুর বাইরে কৃষ্ণ আছেন, তিনি হচ্ছেন সবকিছু, তবুও তিনি হচ্ছেন সবকিছুর উর্ধ্বে। কেবল কৃষ্ণই আছেন। এখন আমি আর সাধারণভাবে চলতে পারবো না। আমাকে মানুষদের কৃষ্ণ সম্বন্ধে বলতে হবে এবং এইভাবেই আমি এখন থেকে চলব। আমি সকলকে কৃষ্ণের সম্বন্ধে বলব, কৃষ্ণের পূজা করতে বলব এবং কৃষ্ণের পবিত্র নাম জপ করতে বলব। আমি দুঃখিত নই। আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে যদি তোমরা কারণ জানতে চাও, তাহলে আমি তোমাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারি। আমি সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। এটা কোন অন্ধভাবে নয়। কোন ভ্রমবশত নয়। এটাই হচ্ছে সত্য। কৃষ্ণ হচ্ছেন সবকিছু এবং তাঁকে সেবা করাই হচ্ছে জীবনের একমাত্র চরম লক্ষ্য, কিন্তু আমি জানি যে তোমরা আমার কাছে ব্যাকরণ শিখতে এসছ এবং অন্যান্য অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে এসেছ, তাই তোমরা তোমাদের বই গুছিয়ে নিতে পারো এবং তোমরা অন্য কোন শিক্ষকের কাছে যেতে পারো যিনি তোমাদেরকে এই সবকিছু শিক্ষা দেবেন, কিন্তু এখন আমার পক্ষে এই সবকিছুতে ফিরে যাওয়া, এসব নিছক কেতাবি শিক্ষায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে কোন খারাপ অনুভূতি নেই। যদি কেউ চলে যায় তাতে আমি রুষ্ট হব না। তোমরা যেতে পারো, কারণ অবশ্য তোমাদের ক্ষেত্রে এটা এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি।” তখন একজন ছাত্র উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “প্রভু আপনি আমাদেরকে ক-খ-গ সকল ব্যাকরণের শিক্ষা দিয়েছেন, সকল বেদ শিখিয়েছেন, সংস্কৃতের সূক্ষ্ম জ্ঞান দিয়েছেন, কিভাবে বেদের ব্যাখ্যা করতে হয় তা শিখিয়েছেন। অবশ্য আপনি আমাদেরকে ভক্তি সম্বন্ধে শিখিয়েছেন, আপনি আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয় শিখিয়েছেন। এখন আপনি এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, কেবল কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবাই হচ্ছে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আমরা ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছি যে আপনি হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত, এমনকি সত্যিই আপনি সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। আপনি হচ্ছেন সবথেকে বুদ্ধিমান ব্যক্তি, আপনি সবথেকে পণ্ডিত্যপূর্ণ ব্যক্তি। আমরা অন্য কোথাও যেতে চাই না। যদি এটাই আপনার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে এটা নিশ্চিত রূপে সত্য। আমরা আপনাকে অনুসরণ করতে চাই। অন্তত আমি নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি এবং অন্যান্যদের অনেকের হয়েই বলছি।” তখন প্রত্যেকে বলে উঠলেন, “না! না! আমরা আপনাকে অনুসরণ করতে চাই।” প্রত্যেকে… সব ছাত্ররা… সব ছাত্ররা তারা বললেন, “না! না! আমরা চাই… আমরা করব না… আমরা আপনাকে ছেড়ে যাবো না। আপনি যা বলছেন তাই ঠিক আছে।” তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “তোমরা কেবল হরি কীর্তন কর।” একজন ছাত্র জিজ্ঞেস করলেন, “হরি কীর্তন কি? আপনি এর আগে কখনও আমাদেরকে হরি কীর্তন শেখাননি। (হাসি) মনে হচ্ছে এইটাই একমাত্র বিষয় যা আপনি আমাদেরকে শেখাননি। আমরা জানি না আপনি কোথা থেকে শিখেছেন, কিন্তু আপনি আমাদেরকে কখনও শেখাননি। সংকীর্তন কি? আপনাকে শিখাতে হবে… আমরা তা শিখব। আপনি যা বলবেন আমরা তাই করব। আমরা আপনার পথ নির্দেশনা গ্রহণ করছি, কিন্তু তা কিভাবে করতে হবে? আমরা আগে কখনো তা করিনি।” তখন চৈতন্য মহাপ্রভু কিছু ভক্তদের ডাকলেন… সবসময় ভক্তি অনুশীলনকারী ভক্তদের আসতে বললেন এবং সব ছাত্রদের নাম কীর্তন শেখাতে বললেন। তাদেরকে নাম কীর্তন শেখানোর মাধ্যমে তিনি সব ছাত্রদের দিয়ে নাম কীর্তন করিয়েছিলেন এবং তারপর সেই দল… তিনি তার ছাত্রদেরকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তারা শহরের মধ্যে কীর্তন করেছিলেন। মানুষেরা বলছিলেন, “হে ভগবান! এইরকম একজন ব্যক্তি নিমাই পণ্ডিত, তিনি কত গর্বিত ছিলেন। তিনি ছিলেন… কিভাবে বলা যাবে? দুষ্টুর থেকেও অধিক কিছু। আমি বলতে চাইছি ঠিক দুষ্টু নয় … দুষ্টুর মত, অন্যান্যদের উত্ত্যক্তকারী… যখন এক যুবক অন্যদের কাছে আতঙ্কের মত হয়, সেটার এক নির্দিষ্ট শব্দ আছে। আপনারা বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাইছে? সঠিক শব্দটি কি তা আমি বুঝতে পারছি না।
ভক্ত: (শ্রুতিহীন)
জয়পতাকা স্বামী: না… সেটা নয়। এটা হচ্ছে এই সবকিছুর সংমিশ্রণ।
জয়পতাকা স্বামী: যেমন ফুর্তিবাজ শব্দটি এর কাছাকাছি কিন্তু এমন শিশুর জন্য এক বিশেষ শব্দ আছে যারা পুরো শহরকে একপ্রকার নাজেহাল করে রাখে।
ভক্ত: অদম্য উচ্ছাসময়।
জয়পতাকা স্বামী: অত্যন্ত অদম্য উচ্ছাসময়, তবে অধিক বাস্তব বুদ্ধিযুক্ত।
জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ। ঠিক উত্ত্যক্তকারীর মত কিন্তু একই সাথে তিনি অত্যন্ত সংস্কৃতি পরায়ণ ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত… আমার মনে হয় এটি বলার কোন শব্দ নেই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। আরেকটি শব্দ আছে… যাইহোক এমন একজন যিনি অত্যন্ত, অত্যন্ত দারুন, তিনি হচ্ছেন এইসব শব্দের সংমিশ্রণ। তিনি কিভাবে এমন হয়েছিলেন… তখন তিনি কেবল কৃষ্ণ নাম জপ করছিলেন এবং সংকীর্তন করছিলেন। এর মানে কি? তিনি বশীভূত হয়ে পড়েছিলেন। বাস্তবে তিনি অনিয়ন্ত্রিত কিন্তু একই সাথে তিনি হচ্ছেন খুবই… তাঁর নিজের মত, তিনি এতই উত্তেজনাপূর্ণ যে… বর্ণনার অধিক। যেমন তোমাদের যদি কোন খেলোয়াড় বা কোন মহান রাজনীতিবিদ বা এমন কেউ জানা থাকে যিনি খুব খুব....
ভক্ত: অনন্য প্রতিভা সম্পন্ন।
জয়পতাকা স্বামী: প্রতিভাবান ব্যক্তি, যিনি পুরোপুরি জড়জাগতিক কার্যকলাপে লিপ্ত, হঠাৎ তারা যদি আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে ফিরে, তাহলে তা সাধারণ মানুষের কাছে এক অত্যন্ত আশ্চর্যকর বিষয়। তখন সেখানে তারা দেখেছিলেন যে চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর সকল ছাত্রদের নিয়ে কীর্তন করছেন, তাই দেখে তারা পুরোপুরি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এইভাবে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তার প্রকৃত স্বরূপ প্রদর্শন করা শুরু করেছিলেন। তাঁর আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি ছিল? তা ছিল আসলে এই হরিনাম সংকীর্তন-এর প্রচার করা। তাই, ১৪ বছর বয়সে, ইতিমধ্যেই তখন তিনি প্রধান পণ্ডিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত,... ইতোমধ্যেই তিনি সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, পুরোপুরিভাবে, তিনি ছিলেন জাগতিক সমাজে সবথেকে বিখ্যাত পণ্ডিত। তার জায়গায় তিনি হচ্ছেন সারিতে সর্বোপরি। তিনি হচ্ছেন এক নম্বর ব্যক্তি এবং তিনি যা কিছু জরজাগতিকভাবে অর্জন করতে পারতেন তা অর্জন করার পরই সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি তাঁর আধ্যাত্মিক কার্যকলাপ প্রকাশ করেছিলেন এবং তাঁর সকল অনুসারীরা তাঁর দিকে এসেছিলেন কারণ তিনি ইতিমধ্যেই তাঁর কার্যকলাপের দ্বারা তাদের মন জয় করেছিলেন। ইতিমধ্যেই তিনি তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। অবশ্য তারা, তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তাঁর নিত্য পার্ষদ এবং তারা সবাই তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন, যা ছাত্রদের ক্ষেত্রে খুবই কঠিন ছিল। ছাত্ররা অনুসরণ করতে চাননি, তারা তাদের শিক্ষা ছাড়তে চাননি। একবার… তারা তাদের এই ধরনের পেশা বজায় রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কারণে, তাদের উপর তার কৃপার কারণে তা হয়নি এবং তিনি আসলে তাদেরকে তাঁর সাথে নিয়ে এসেছিলেন, আর তিনি আসলে সমাজে গভীরভাবে কৃষ্ণভাবনামৃতকে স্থাপন করার জন্য তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ বৃত্তি, তাঁর সকল সক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন। যেহেতু তিনি ইতিমধ্যেই পণ্ডিত্যে সর্বোত্তম স্থানে ছিলেন, পুরো সামাজিক উন্নতির মার্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিলেন, তাই এমনকি খুব কিশোর বয়সী হওয়ায়, তা প্রত্যেককে গভীরভাবে প্রভাবিত করা ছাড়া আর কিছুই করেনি এবং সেটাই তাদের হরে কৃষ্ণ নাম জপের প্রতি এক গভীর বিশ্বাস গড়ে তুলেছিল, যেই স্তরের বিশ্বাস অর্জন করা তাদের পক্ষে কঠিন হত। চৈতন্য মহাপ্রভু প্রথমত নিজেকে সমগ্র ভারতে সর্ব প্রধান পণ্ডিত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এইভাবে তারপর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর আগমনের প্রকৃত উদ্দেশ্য—হরে কৃষ্ণ নাম ও সকলকে সংকীর্তন আন্দোলনে যুক্ত করার বিষয়টি প্রকাশ করেছিলেন।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
আমরা এই জড় জগতে যা কিছু সৃষ্টি করি, তা ধ্বংস হয়ে যাবে কিন্তু আমরা যতটা কৃষ্ণভাবনামৃত গড়ে তুলতে পারব, আমরা যতটা উদঘাটিত করতে পারব, আমরা পুনর্জীবিত করতে পারব, সেটা হচ্ছে নিত্য, তা কখনো বিনষ্ট হবে না। এই হচ্ছে প্রকৃত সম্পদ যা আমরা লাভ করতে পারি। এই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন, যা শ্রীল প্রভুপাদ নিয়ে এসে আমাদের সকলকে দিয়েছেন। জাগতিক মানুষেরা যারা তাদের নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে, সেটা বালির প্রাসাদের মতো ধুয়ে যাবে। সেইজন্য তিনি তাদেরকে প্রকৃতপক্ষে স্থায়ী লাভ প্রাপ্তির সুযোগ প্রদান করছেন, আর এই সবই হয়েছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপার মাধ্যমে।
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ
হরে কৃষ্ণ!
ভক্ত: হরে কৃষ্ণ!
জয়পতাকা স্বামী: আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।
ভক্ত: শ্রীল আচার্যপাদ কি জয়!
Lecture Suggetions
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২