নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ১৪ই সেপ্টেম্বর, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, নিউ অরল্যান্স, লউসিয়ানাতে প্রদান করেছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৮ম স্কন্ধ ৮ম অধ্যায় ২২ ও ২৩ শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।
শ্লোক ৮.৮.২২
ক্বচিচ্চিরায়ুর্ন হি শীলমঙ্গলং
ক্বচিৎ তদপ্যস্তি ন বেদ্যমায়ুষঃ।
যত্রোভয়ং কুত্র চ সোহপ্যমঙ্গলঃ
সুমঙ্গলঃ কশ্চ ন কাঙ্ক্ষতে হি মাম্॥
অনুবাদ: কারও দীর্ঘ আয়ু থাকতে পারে, কিন্তু মঙ্গল বা সৎ আচরণ নেই। কারও মঙ্গল এবং সৎ আচরণ উভয়ই থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর আয়ু স্থির নয়। যদিও শিব আদি দেবতাদের নিত্য জীবন রয়েছে, কিন্তু শ্মশানে বাস করা আদি অশুভ অভ্যাস রয়েছে। আর কেউ যদি সর্বতোভাবে সদ্গুণ সম্পন্ন হনও, তবুও তাঁরা ভগবানের ভক্ত নন।
পুনরায় অনুবাদ বলা হলো*
শ্লোক ৮.৮.২৩
এবং বিমৃশ্যাব্যভিচারিসদ্গুণৈ-
র্বরং নিজৈকাশ্রয়তয়াহগুণাশ্রয়ম্।
বব্রে বরং সর্বগুণেরপেক্ষিতং
রমা মুকুন্দং নিরপেক্ষমীপ্সিতম্॥
অনুবাদ: শুকদেব গোস্বামী বললেন—এইভাবে পূর্ণরূপে বিবেচনা করার পর, লক্ষ্মীদেবী মুকুন্দকে তাঁর পতিরূপে বরণ করেছিলেন, যদিও তিনি (মুকুন্দ) সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র এবং তাঁকে (লক্ষ্মীদেবীকে) লাভ করার অভিলাষী ছিলেন না। তিনি সমস্ত দিব্য গুণ ও যোগশক্তি সমন্বিত এবং তাই তিনি পরম বাঞ্ছনীয়।
তাৎপর্য: ভগবান মুকুন্দ স্বয়ংসম্পূর্ণ। যেহেতু তিনি সর্বতোভাবে স্বতন্ত্র, তাই তাঁর লক্ষ্মীদেবীর আশ্রয় বা সঙ্গের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু লক্ষ্মীদেবী তাঁকে তাঁর পতিরূপে বরণ করেছিলেন।
ইতি শ্রীমদ্ভাগবতের ‘ক্ষীরসমুদ্র মন্থন’ নামক ৮ম স্কন্ধ ৮ম অধ্যায় ২২ ও ২৩ শ্লোকের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য সমাপ্ত।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: আমাদের গতকালের ক্লাসের ধারাবাহিকতা চলছে, শ্রীমতী লক্ষ্মী দেবী সকল দেবতাদের কাছে, সকল অসুরদের কাছে, সকল মহান ব্যক্তিত্বের কাছে গিয়েছিলেন এবং তারপর তিনি সিদ্ধান্ত করেন যে একমাত্র ব্যক্তি যিনি পূর্ণ স্বরাট, তিনি হচ্ছেন সর্বোচ্চ পদে স্থিত ভগবান শ্রীবিষ্ণু, শ্রী মুকুন্দ।
শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের জার্মানির একজন শিষ্য ছিলেন, যিনি ৪০-৫০ বছর আগে ভারতে এসেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ এই কাহিনীটি বলেছিলেন। তিনি ছিলেন এক বিরল অতি সুদক্ষ জার্মান সংস্কৃত পণ্ডিত। তিনি সমগ্র ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন, এবং সংস্কৃত শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সকল শ্রীবিগ্রহ দর্শন করেছিলেন ও এটি অনুধাবনের চেষ্টা করছিলেন যে কে সর্বোচ্চ অবস্থানে স্থিত। এরপর তিনি যখন শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের কাছে আসেন, এটা হয়ত নিশ্চয়ই তার দীক্ষার পূর্বের ঘটনা, নিশ্চয়ই সেটাই, এবং তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে তার সিদ্ধান্ত কি? তখন তিনি বলেছিলেন যে, তার সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে নিশ্চিতরূপে শ্রীকৃষ্ণ সর্বোচ্চ পদে স্থিত ভগবান। “কেন? কিভাবে তুমি সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছালে?” তখন তিনি অনেক কারণ উল্লেখ করেছিলেন এবং তারপর সরলভাবে তিনি এটি বর্ণনা করেছিলেন যে, “যখন আপনি বিভিন্ন দেবতাদের দেখবেন, ঠিক যেমন দেবী কালীর বড় দা আছে, প্রত্যেক দেবতারই, আর যেমন মহাদেব শিব ধ্যানমগ্ন এবং প্রত্যেক দেবতাই এমন কিছু করছেন ও অন্য কারও ধ্যানে মগ্ন এবং কোন না কোন কর্মে লিপ্ত আছেন, এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করছেন বা যাইহোক না কেন করছেন। যখন তিনি শ্রীশ্রী রাধা-কৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহ দর্শন করেছিলেন, তখন তিনি দেখলেন যে শ্রীকৃষ্ণ কেবল নৃত্য করছেন, তাঁর বংশীবাদন করছেন। তিনি হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আনন্দ উপভোগে লিপ্ত। সেই জন্য সর্বশেষ সিদ্ধান্ত এই যে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বোচ্চ, তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দ উপভোগ করা।”
ভারতে যখন আপনি সরকারী দপ্তরে যাবেন, আপনি দেখবেন কিছু সরকারি কর্মকর্তার কার্যালয়ে ফাইল জমায়েত হয়ে রয়েছে, তিন-চারটি স্তূপ হয়ে রয়েছে, প্রায় ৩-৪ ফুট লম্বা স্তূপ। কিন্তু যখন আপনি কোন মন্ত্রীর কার্যালয় যাবেন, দেখবেন তার কাছে কম স্তূপীকৃত ফাইল আছে। একইভাবে যখন আপনি আরো উচ্চ কার্যালয়ে যাবেন, সেখানে তারা, সেই সব ব্যক্তিরা কেবল আসে এবং একটি ছোট সই করে ও তারপর তারা বেরিয়ে যায়। এটাই যা তাদের করতে হয়। বড় কর্পরেশনে তাই হয়। ভগবান তাঁর প্রকৃত স্থিতিতে কেবল তাঁর ভক্তদের সাথে আনন্দ উপভোগ করেন, দিব্য প্রেমময় সম্পর্কের আনন্দে লিপ্ত থাকেন। এই ব্রহ্মাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে, ব্রহ্মাণ্ড বা মহাজাগতিক পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে বিষ্ণু বা নারায়ণ রূপে বিস্তার করেন। যদিও নারায়ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তিনি হচ্ছেন স্বরাট, কিন্তু তিনি স্ব-ইচ্ছায় সবকিছু পরিচালনা করার বিষয়টি গ্রহণ করেন। সেইজন্য, এমনকি শ্রীবিষ্ণু স্বরূপ-এর মধ্যে যদিও তাঁরা সকলেই একই ব্যক্তিত্ব, যদিও তাঁরা অনন্য, কিন্তু একই ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্বেও প্রত্যেক স্বরূপের এক নির্দিষ্ট ভিন্ন ব্যক্তিত্ব আছে। এটি এক অবিশ্বাসনীয় পরিস্থিতি যে ভগবান এই বিভিন্ন বিষ্ণু স্বরূপে ব্রহ্মাণ্ডের পরিচালনা করছেন।
শ্রীল প্রভুপাদ বর্ণনা করেছিলেন যে, তুমি কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারো— এটা তত কঠিন নয়। এবং আরো সহজ হচ্ছে তা নষ্ট করা। কিন্তু কোন কিছু বজায় রাখতে গেলে, তখন তা বেশ কঠিন। ঠিক যেমন আমেরিকাতে, আপনি দেখবেন যে অনেক মানুষ বিবাহিত হয়, এটা তত কঠিন বলে মনে হয় না এবং অনেক মানুষের বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে, সেটিও তত কঠিন বলে মনে হয় না। কিন্তু একসাথে থাকা এবং কোনকিছু কার্যের ভিত্তিতে সেই সম্পর্ক বজায় রাখা, সেটা বেশ কঠিন! ঠিক তেমনই এই জড় জগতে মানুষ কোনকিছু সৃষ্টি করছে এবং তারা ধ্বংস করছে। কিন্তু বজায় রাখতে পারছে কে? ঠিক যেমন, যুক্তরাষ্ট্র-র সবসময় শান্তি বজায় রাখার কথা, কিন্তু তারা কখনই তা বজায় রাখতে পারছে না। পরিণামে কারও কিছু যায় আসে না তারা কি বলছে, যখন তা সেই পর্যায়ে আসছে। তাই এটি করা খুবই কঠিন। তাই ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষেত্রে, সেইজন্য শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং নিজেকে শ্রীবিষ্ণু রূপে বিস্তারিত করেন এবং শ্রীবিষ্ণু সবকিছু বজায় রাখেন, নয়ত এই সবকিছু কিভাবে বজায় থাকবে? কিন্তু তিনি এটি করেন তাঁর শক্তির মাধ্যমে, এমন নয় যে তাঁকে নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে তা সম্পাদন করতে হবে। ব্যতিক্রম হচ্ছে কখনও কখনও তিনি তাঁর ভক্তদেরকে কৃপা করার জন্য নিন্মে অবতীর্ণ হন। কখনও কখনও তিনি দেবতাদের কৃপা করে অসুরদেরকে তাদের নিজেদের স্থানে রাখেন।
এই ক্ষেত্রে শ্রীমতি লক্ষী দেবী, আমরা দেখি যে তিনি শ্রীমুকুন্দের সাথে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত করেছিলেন। আসলে শ্রীল প্রভুপাদ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সর্বদা নারায়ণের সাথে বা কৃষ্ণের সাথে স্থির থাকেন। কিন্তু অন্য সর্বত্র সৌভাগ্য লক্ষ্মী চঞ্চলা বা চঞ্চল নামে পরিচিত। তিনি অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির, অত্যন্ত অস্থির। মানুষ কেবল এই আশা করে যে সৌভাগ্য লক্ষ্মী যেন সবসময় তাদের সাথে থাকেন, যাতে তারা অনেক অর্থ উপার্জন করতে পারে, সব ধরনের সমৃদ্ধি উপভোগ করতে পারে। কিন্তু কোন ব্যক্তি যখন পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তি যুক্ত না হয়, তখন সেই স্থানে তিনি খুব দীর্ঘ সময় থাকেন না। ভারতে তাদের বিভিন্ন ধরনের তত্ত্ব আছে, আমি জানিনা সেই সব সত্য নাকি। কিছু ব্যক্তি মনে করে যে, “ঠিক আছে! সৌভাগ্য লক্ষ্মী কেবল আপনার পরিবারে তিন প্রজন্ম পর্যন্ত থাকতে পারেন, এরপর এমনকি অতি ধনবান ব্যক্তিও সর্বস্বান্ত হবে।” এইরকম, তাদের সব ধরনের জল্পনা-কল্পনা আছে। এরপর যখন পরবর্তী প্রজন্ম দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তারা জানে যে, “আচ্ছা এখন আমাদের নারায়ণের ভক্ত হওয়ার সময় এসেছে, নয়ত আমরা সব হারাব।” এমনকি মায়াবাদীরা মানুষদের বলে, “হ্যাঁ! যদি আপনি আপনার গৃহে লক্ষ্মী দেবীকে রাখতে চান, তাহলে আপনাদের নারায়ণের পূজা করা উচিত।” যখন রাবণ সীতা দেবীকে হরণ করেছিল, এটাই ছিল অভিযোগ। তার একজন পরিবারিক সদস্য বিভীষণ বা এমন কেউ স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, সীতা দেবীর প্রতি তাঁর (রাবণের) এই অপরাধের কারণে শ্রীমতী লক্ষী দেবী শ্রীলঙ্কা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এবং সেই সময় থেকে সমস্ত অশুভ কিছু ঘটতে শুরু করে। তারপর পরবর্তীতে রাবণ যা কিছু প্রয়াস করেছিল, সব ব্যর্থ হয়েছিল। তাই সৌভাগ্য লক্ষ্মীকে নিজের সাথে রাখতে গেলে, ব্যক্তির কেবল সর্বদা নারায়ন বা কৃষ্ণকে তার সাথে রাখা উচিত এবং এছাড়াও শুদ্ধ ভক্তদের প্রতি কোন অপরাধ না করা উচিত। এটাই হচ্ছে সফলতার মৌলিক রহস্য।
আমেরিকা এক শক্তিশালী দেশ, প্রথমদিকে আমেরিকাকে ভগবত চেতনাময় দেখা গিয়েছিল, অন্ততপক্ষে সেটা ছিল তাদের ভিত্তি। এটাই ছিল তীর্থযাত্রীদের ইংল্যান্ড ছাড়ার এক মুখ্য কারণ। অবশ্য স্বাধীনতা ঘোষণা, অন্যান্য অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কারণও তাদের ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু এমনকি আজও আমরা মুদ্রা ও টাকায় দেখতে পাই, “ইন গড উই ট্রাস্ট” (আমরা ভগবানকে বিশ্বাস করি) যেটা হচ্ছে প্রকৃত মনোভাব—ভগবানের প্রতি নির্ভরশীল থাকার এক প্রতীক। আমেরিকাবাসীরা এখনও তাদের পূর্বপুরুষদের পুণ্য কর্মের ফল ভোগ করছে, কিন্তু সেই সমস্ত পুণ্য কর্ম শেষ হতে বেশিদিন সময় লাগবে না, যদি কেউ অনেক পাপকর্ম, ইন্দ্রিয়তৃপ্তিকর কার্যে লিপ্ত হয়, যা বিপুল মাত্রায় সংঘটিত হচ্ছে। আসলে শ্রীল প্রভুপাদ এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন আমেরিকা, পাশ্চাত্যে নিয়ে এসেছিলেন, আর ভবিষ্যতে মানুষ লক্ষ্য করবে যে এটাই ছিল তাদের অপার সৌভাগ্যের সূত্রপাত। ইতিমধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের কয়েকজন পণ্ডিত বলেছেন যে, আস্তিকতা সম্বন্ধীয় ইতিহাসে এটাই ছিল সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সময় যখন প্রথমবার ভারতীয় সনাতন ধর্ম এবং সেই অনুশীলন পাশ্চাত্যে প্রবেশ করে সেখানে ভিত্তিস্থাপন করেছিল। সৌভাগ্যক্রমে, এখানে একটি সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ আছে। যদিও আমেরিকা অতি শক্তিশালী দেশ, কিন্তু সেখানে মানুষেরা বাকি জগতের থেকে বিচ্ছিন্ন। এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে কিভাবে তারা অন্যান্য সংস্কৃতি সম্বন্ধে খুবই অল্প জানে। তারা আন্তর্জাতিক হোটেল তৈরি করছে, যা ভিতরে ঠিক একই। তারা সমগ্র বিশ্বে যায় এবং হোটেলে থাকে। এটা ঠিক যেন কাচের অন্তঃসাগরীয় যান-এর মাধ্যমে জলের তলায় গিয়ে মাছ দেখার মত, তারা বেরিয়ে এসে চারিদিকে দেখে এবং বাজারে গিয়ে কিছু স্মারক কিনে ফিরে আসে। যখন তারা এমনকিছু দেখে যেই বিষয়ে তারা অভ্যস্ত নয়, সেক্ষেত্রে তারা যা জানে তার ঊর্ধ্বেও কোন কিছু থাকতে পারে এটি মানার পরিবর্তে তাদের সেটা এড়িয়ে চলার বা প্রত্যাখ্যান করার এক প্রবণতা থাকে।
এইভাবে, বেদান্ত সূত্র এই উপদেশ দিয়েছে যে মানুষের আসলে সবকিছুর উৎস ও অন্তর্নিহিত চিরস্থায়ী সত্যতা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা উচিত এবং এই ক্ষণস্থায়ী বিষয়সমূহের ঊর্ধ্বে ওঠা উচিত। অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা — এখন ব্রহ্ম সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার সময়। এখন সময় হচ্ছে এই মনুষ্য জীবনে পরম সত্য সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার। প্রকৃতপক্ষে, সেই অনুসন্ধান আসলে অস্তিত্বহীন ছিল। শ্রীল প্রভুপাদকে ধন্যবাদ যে, এখন অনেক জীব এই অনুসন্ধান করছে এবং তারা উত্তর পেতে সক্ষম হচ্ছে। এইজন্য আমরা প্রার্থনা করি ,
ওঁ অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া।
চক্ষুরুন্মিলিত যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।।
সেই জ্ঞানের আলোক আধ্যাত্মিক গুরু বহন করছেন এবং সেই আলোর দ্বারা অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছাদিত চক্ষু উন্মীলীত হতে বাধ্য হচ্ছে, “ওহ এই হচ্ছে পরিস্থিতি।” এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হচ্ছে আসলে মানুষের চক্ষু উন্মলিত করার জন্য, তাদেরকে কৃষ্ণের নিকটে নিয়ে আসার জন্য।
“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।”
শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে, “কেউ যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি সেভাবে তার সাথে ভাববিনিময় করি।” তাই কোনো না কোনোভাবেই যদি ব্যাক্তিরা অনুসন্ধানী হন বা এমনকি যদি তারা সামান্যতম আগ্রহী হন, তাহলে শ্রীকৃষ্ণ সেই ভাব আদান-প্রদান করেন। কিন্তু যদি তারা সম্পূর্ণ উদাসীন হয়, তাহলে তা কৃপা লাভের ক্ষেত্রে খুব একটা ইতিবাচক দিক নয়। শ্রীকৃষ্ণ যদি উদাসীন হন, তাহলে তখন সেই ব্যক্তির পরিস্থিতি হয় আশাহীন।
এমনকি যীশু খ্রিস্ট বলেছেন যে, বিরোধিতার ক্ষেত্রে, তিনি বলেছেন, আমরা বিরোধীতায় কিছু মনে করিনা। এমনকি, যদি কেউ আমাদের বিরুদ্ধে থাকে, তা আমরা পছন্দ করি। তিনি বলেছেন, “আমি গরম জল বা ঠান্ডা জল পছন্দ করি, কিন্তু যদি তা হালকা গরম থাকে, তাহলে আমি থুতু ফেলি।” দেখুন যদি মানুষেরা এসে বলেন যে আপনারা কেন এসব করছেন, তাহলে তারা এমন কোন ব্যক্তির থেকে ভালো যে কেবল অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে, যেন আপনার কোন অস্তিত্বই নেই— “আমি তো হরে কৃষ্ণদের সেখানে দেখতে পারছি না।” কারণ এই সমস্ত ব্যক্তিরা হচ্ছে যেমন ঘোড়ার দৌড়ে তাদের চোখে ঠুলি পরিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, তেমনই তারা কোনোকিছু দেখতে চায় না, কেবল এগিয়ে যায়। আপনি ঘোড়ার চোখে ঠুলি পড়িয়ে রাখেন যাতে সে তার পাশে কি হচ্ছে তা দেখে ভয়ার্ত না হয়। ঠিক তেমনই, তারা নিজেদের চোখে ঠুলি পড়িয়ে রাখে। তারা বিরক্ত হতে চায় না, তারা কেবল পর পর এক এক পদক্ষেপ ফেলে যেতে চায়। তারা এটি উপলব্ধি করে না যে, পদং পদং যদ্ বিপদাং ন তেষাম্ — প্রত্যেক পদক্ষেপ বিপদসঙ্কুল। প্রতিটি পদক্ষেপ বিপদসঙ্কুল। কেউই তা এড়িয়ে চলতে পারবে না। এমনকি ভক্তদের ক্ষেত্রেও প্রতি পদক্ষেপে বিপদ আছে, কিন্তু যেহেতু তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তাই তিনি সেই বিপদ অতিক্রম করতে পারেন।
সমাশ্রিতা যে পদপল্লবপ্লবং
মহৎপদং পুণ্যযশো মুরারেঃ ।
ভবাম্বুধির্বৎসপদং পরং পদং
পদং পদং যদ্ বিপদাং ন তেষাম্ ।।
[শ্রী. ভা. ১০.১৪.৫৮]
মুরারির, শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম এক নৌকার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা আমাদেরকে জন্ম-মৃত্যুর ভবসাগর পার করাতে পারে। এবং যারা তা গ্রহণ করে না,... জ্ঞানী জীবাত্মারা সবসময় সেই নৌকা গ্রহণ করেন এই জেনে যে, এই আশ্রয়ের বাইরে প্রতি পদক্ষেপ বিপদসঙ্কুল। তাই যখন আমরা প্রথম কৃষ্ণভাবনামৃতে আসি এবং সেবা করা প্রারম্ভ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমরা প্রতিমুহূর্তে সর্বদা শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে পারিনা। কিন্তু তবুও আমরা যা সেবাই করি, তা আমাদেরকে শ্রীকৃষ্ণের অধিক থেকে অধিকতর নিকটস্থ করে। এমনকি যদি আমরা এই জীবনে তা পূর্ণ করতে না পারি, তবুও পরবর্তী জীবনে আবার আমরা যেখানে শেষ করেছিলাম সেখান থেকে তা শুরু করব। একই সাথে, শ্রীল প্রভুপাদ তিনি বারংবার তাঁর ভক্তদেরকে সচেতন করতেন যে তাদেরকে কৃষ্ণচেতনাময় থাকার মাধ্যমে, সেই চেতনাময় থাকার মাধ্যমে, পবিত্র নাম জপের মাধ্যমে, স্মরণের মাধ্যমে, হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশের প্রতি সুগ্রাহী হওয়ার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্পর্কিত থাকতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ এমনকি বিষয়ী ব্যক্তিদেরও সাহায্য করেন। ঠিক যেমন যখন একটি মশা বাড়িতে আসে, প্রথমে মশা কানের সামনে দিয়ে ঘুরে যায়। এই হচ্ছে পরমাত্মা, আপনাকে একটি সুযোগ দিচ্ছেন (হাসি) ঝ.. ঝ..ঝ..ঝ.., “ওহ একটা মশা আছে।” আমার মনে হয় আমি আগে এটা উল্লেখ করেছিলাম যে, বাঘ যেখানে যায় তাদেরকে অনুসরণ করে ছোট ছোট ইঁদুরেরা পিছনে পিছনে যায়। “টি…টি…টি…টি…টি…” এরা হচ্ছে ছোট গিনিপিগ এবং বাঘ যখন হরিণের উপর ঝাঁপ দিতে যাবে, ঠিক তখনই তারা একটু কোলাহল করে। এইভাবে হরিণ পালিয়ে যেতে পারে এবং রক্ষা পেতে পারে, কিন্তু যদি সে সচেতন থাকে তবে। কিন্তু সে যদি পরমাত্মার কথা না শোনে, যেমন যদি আপনি বিমানে থাকেন ও রেডিও অফ করে দেন, তাহলে আপনি যে খবর সম্প্রচারিত হচ্ছে তা শুনতে পারবেন না, আপনি তা শুনতে পারবেন না, আপনি কোনকিছুই শুনতে পারবেন না। তাই ভক্ত আসলে অন্তর থেকে শ্রীকৃষ্ণের সহায়তা গ্রহণ করেন। তিনি বাহ্যিকভাবে গুরুরূপে সহায়তা করেন এবং অভ্যন্তরীণভাবে চৈত্য গুরুরূপে সহায়তা করেন। কিন্তু আমরা যদি তা গ্রাহ্য না করি, যদি আমরা সচেতন না থাকি এবং উদাসীন হয়ে পড়ি, তাহলে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার প্রত্যেক সুযোগ আছে।
কখনও কখনও মানুষেরা কৃষ্ণভাবনাময় হতে চায়, কিন্তু একই সাথে তারা দৃঢ়চরিত্র হতে পারে না। তারা মনে করে যে, এই কৃষ্ণচেতনাময় আন্দোলনে তারা অনেক কিছু করতে পারত, যদি তাদের অর্থ থাকত। সেই জন্য, “চলো আমি কিছু অবৈধ কাজ করি এবং অনেক টাকা উপার্জন করি এবং তা কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলনে দেব ও নিজের জন্য এক ক্ষুদ্র অংশ রেখে দেব। এবং এইভাবে তা খুবই ভালো হবে।” যখন তারা তা করে, শ্রীকৃষ্ণ আমাদেরকে দিয়ে কোন অবৈধ কাজ করাতে চান না, তিনি চান না যে আমরা কোন অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি গ্রহণ করি। এইভাবে বিপদ এড়ানোর কত ভালো সুযোগ রয়েছে, কিন্তু কাম বাসনার কারণে ব্যক্তি তা শোনে না, যখন পরমেশ্বর ভগবান বলেন যে, “এটা করো না! ওটা করো না! এইটা করো না!” তবুও এইভাবে সে এগিয়ে যায় ও সেই কাজ করে বসে। সেই জন্যই গুরুদেবের প্রয়োজন আছে। সেই কথা না শুনলেও, এমনকি আমরা নিজেদের হৃদয়ে জানি যে আমাদের এটা করা উচিত নয় বা আমাদের ওটা করা উচিত নয়। কিন্তু আমাদের মন এত দৃঢ় থাকে, আমাদের ইচ্ছা এত শক্তিশালী থাকে যে কোন না কোনভাবে আমরা এগিয়ে যেতে চাই ও তা করতে চাই। যখন আমরা গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করি, “আমার কি এটা করা উচিত?” তিনি বলেন, “না বা হ্যাঁ” এইভাবে বা যাইহোক না কেন, তখন আমরা সেটা গ্রহণ করি ও আমরা আমাদের হৃদয় জানি যে তিনি যেটা বলছেন সেটা সঠিক। আমাদের একগুঁয়ে হওয়া উচিত নয়। আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুর আদেশ গ্রহণের ক্ষেত্রে, বরিষ্ঠ বৈষ্ণবদের নির্দেশ গ্রহণের ক্ষেত্রে সুগ্রাহী হওয়া উচিত। এইভাবে পাশ্চাত্য জগতের মানুষ অসুরক্ষিত, কারণ তাদের কোন পথনির্দেশক নেই বা তাদেরকে সাহায্য করার কেউ নেই। সরকার সমাজসেবীদের নিযুক্ত করে সেইসব ব্যক্তিদের সাহায্য করার জন্য, যারা সমস্যায় আছে, কঠিন পরিস্থিতিতে আছে।
বৈদিক সংস্কৃতিতে ব্রাহ্মণেরা আধ্যাত্মিক গুরু রূপে থাকেন, যারা আসলে আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত, এবং তারা মানুষদের সাহায্য করেন। তবুও সরকার বা মানুষেরা বলে, “আপনারা হচ্ছেন পরাশ্রয়ী।” কিন্তু সেখানেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানি, ইত্যাদি কত কাউকে নিযুক্ত করা হচ্ছে। এবং সাম্প্রতিক আত্মহত্যা বিষয়ক গবেষণা অনুসারে, সেই সমস্ত ব্যক্তিরই আত্মহত্যার হার সর্বোচ্চ। যাদের হতাশ ব্যক্তিদের সাহায্য করার কথা, তারা নিজেরাই এত হতাশ যে তারা আত্মহত্যা করে, যেই পরিসংখ্যা অন্যান্য ব্যক্তিদের জাতীয় গড় হিসাব-এর তুলনায় অধিক। তাই তাদের কোন অধিকার, কোন গুণ আছে অন্যদেরকে পথনির্দেশনা প্রদান করার? তারা কেবল বর্তমান পরিস্থিতিকে সমর্থনের চেষ্টা করে, সেটিকেই সঠিক বলে গ্রহণ করে এবং মানুষকে অজুহাত দেয় যে তারা নিজেদের সাথে বাঁচতে পারে। যখন তারা নিজেরা এটা আরও কাছ থেকে উপলব্ধি করে যে, এই পুরো বিষয়টি কতটা নিরর্থক, কতটা ব্যর্থ এবং কতটা ফাঁপা, তখন তারা নিজেরাই আসলে হতাশ হয়ে পড়ে এবং যেই ঔষুধ যাদেরকে তাদের সাহায্য করার কথা, তাদের জন্য নির্ধারণ করে, তারা সেই একই ঔষুধ নিজেদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করে। এইভাবে ধীরে ধীরে তারাও প্রস্থান করে এবং এটা চলতেই থাকে।
আসলে বৈদিক সভ্যতা হচ্ছে নির্ভুল। সেখানে যেই সমস্ত ব্যক্তিদের অন্যান্য ব্যক্তিদের সাহায্য করার কথা, তাদের নিজেদেরকে শান্ত হতে হবে। তাদের নিজেদেরকে দিব্য স্তরে স্থিত হতে হবে।
কৃষ্ণভক্ত-নিষ্কাম, অতএব ‘শান্ত’।
ভুক্তি-মুক্তি-সিদ্ধি কামী সকলি ‘অশান্ত’।।
(চৈ. চ. মধ্য ১৯.১৪৯)
মুক্তানামপি সিদ্ধানাং নারায়ণপরায়ণঃ।
সুদুর্লভঃ প্রশান্তাত্মা কোটিপি মহামুনে ।।
(চৈ. চ. মধ্য ১৯.১৫০)
ভক্তরা, এমনকি সিদ্ধ অর্থাৎ সিদ্ধিপ্রাপ্ত জীব ও যেই জীব যৌগিক শক্তিযুক্ত, তাদেরকে সবথেকে বিরল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তারা হচ্ছে সবথেকে শান্ত, আত্মতৃপ্ত। বেদে এটি নিশ্চিতভাবে প্রতিপন্ন হয়েছে। সেই জন্য, তারা হচ্ছে আসলেই সকলকে সাহায্য করার পদে অধিষ্ঠিত।
শ্রীনিবাসের দ্বারা রচিত একটি ভজনে শ্রীল রূপ গোস্বামী এবং সনাতন গোস্বামীর কথা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদেরকে সাধারন মানুষেরা এত ভালবাসতেন, এমনকি দুর্বৃত্তরাও ভালোবাসত। তারা উভয় তাদের কাছে আসতেন উপদেশ লাভের জন্য। এটাই হচ্ছে মহান এবং শুদ্ধভক্তদের প্রকৃতি যে তারা প্রত্যেকের প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন। সেইজন্য, এমনকি আজও ভারতে সাধারণত ডাকাত বা চোরেরা সাধুদেরকে ছেড়ে দেয়।
একসময় শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কোন চোর বা দুর্বৃত্তদের দ্বারা নয়, পরন্তু তিনি কৃষ্ণভাবনামৃতের পুনর্গঠন করছিলেন অথবা কৃষ্ণভাবনামৃতের বৈদিক সাংস্কৃতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছিলেন এবং তথাকথিত আধ্যাত্মিক নেত্রীদের অসদাচরণ ও প্রতারণার প্রকাশ করছিলেন। তাই, সেই সমস্ত তথাকথিত আধ্যাত্মিক নেত্রীরা কাউকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছিল, যে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরকে হত্যা করবে। তখন একদিন পুলিশের এক মুখ্য অধিকর্তা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে এবং বলে যে, আপনার খুব সতর্ক থাকা উচিত। আপনার জীবন নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাকে সেইজন্য ২৫ বা ১০ হাজার - ১০,০০০ বা ২৫,০০০ টাকা দেওয়া হয়েছে।
[পাশে: তা অবশ্য তখনকার হিসেবে ২৫০০০০ টাকা। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে ২ টাকা দিয়ে তাঁর বাবা সারাবছরের খাদ্যসামগ্রী কিনে আনতেন।] (হাসি)
এই পুলিশের মুখ্য অধিকর্তা বলল, “অবশ্য পুলিশ হওয়ায় আমরা এইরকম ভালো পরিমাণ অর্থ এর বিনিময়ে মানুষকে হত্যা করতে অভ্যস্ত, তাতে আমরা এত কিছু ভাবি না। কিন্তু আমি তাদেরকে বলেছি যে, আমি একজন সাধুকে হত্যা করে নিজের হাত নোংরা করব না। আমি তত পাপ গ্রহণ করতে পারব না, এটা কোন টাকার মূল্যের সাথে তুলনীয় নয়। তাই আপনার সতর্ক থাকা উচিত।” আসলে ভারতে তারা বলে যে, যেখানেই পুলিশ আসে, সেখানেই অপরাধ বৃদ্ধি পায়। যদি কোন পুলিশ থানা না থাকত, তাহলে মূলত কম অপরাধ হত। আমি জানিনা পাশ্চাত্যেও এটা একই নাকি। দুর্বৃত্তরা, এমনকি সে ছিল এক দুর্বৃত্ত, সে ছিল এক কুখ্যাত পুলিশ, কিন্তু তবুও সে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে চায়নি। আসলে আপনি ভারতে এমন কাউকে খুঁজে পাবেন না, কারণ তারা সবাই, এমনকি দুর্বৃত্ত হোক বা সজ্জন ব্যক্তি, তাদের ভক্তদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও বিশ্বাস আছে। এটাই শ্রীল প্রভুপাদ চাইতেন যে পাশ্চাত্যেও এমন হওয়া উচিত, যেন লোকেদের হরেকৃষ্ণ ভক্তদের প্রতি সম্মান থাকে যে, তারা খুবই সৎ, খুবই বিশ্বাসী ও আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুবই অকপট। অবশ্য, এখানে নিউ অরলেন্সে গঠিত ভক্ত দলকে দেখে মনে হচ্ছে যে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিদের সাথে তাদের এইরকম সম্বন্ধ গড়ে উঠেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে সাধারণত দেশের বিভিন্ন অংশে প্রত্যেকের সেই একই ধারণা নেই। অবশ্য, অনেক অপব্যাখ্যা আছে, কিন্তু এটা শ্রীল প্রভুপাদের পরিকল্পনা ছিল কারণ আসলে একজন ভক্তের কাউকে প্রতারণা করার কোন কারণ নেই। তার কোন কিছু লাভ করার নেই, তিনি কৃষ্ণের জন্য কার্য করছেন, তাই কৃষ্ণই তাঁকে সবকিছু প্রদান করেন। ভক্ত আন্তরিকভাবে প্রত্যেককে কৃষ্ণের নিকটস্থ হতে, প্রত্যেকের কৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা বিকশিত করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে আগ্রহী। আদৌ শ্রদ্ধা — প্রথম কোন ব্যক্তির শ্রদ্ধা থাকতে হবে, তারপর কেউ ভক্তদের সঙ্গ করার স্তরে উন্নীত হতে পারে, ও এরপর ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলন করতে পারে। তাই, আমাদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে শ্রদ্ধা বিকশিত করা। যদি আমরা শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, বা এর পরিবর্তে যদি ব্যক্তিদের কৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করতে পারি, তাহলে তাদের জন্য অধিক থেকে অধিকতর অগ্রগতি করা খুবই সহজ হয়ে যাবে। আমরা যত কৃষ্ণের সেবা করি, ততই আমরা আনন্দিত ও আরো আনন্দিত হই।
আসলে শ্রীবাসের গৃহে সেখানে এক দাসী ছিলেন, তার নাম ছিল দুঃখী দেবী। দুঃখী মানে দুঃখিত। দুঃখী দাসী। তাকে দুঃখী দাসী বলে ডাকা হত। এটি ছিল এক অস্বাভাবিক নাম, কিন্তু বিভিন্ন কারণবশত তাঁকে সেই নাম দেওয়া হয়েছিল, তবে যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর সংকীর্তন প্রারম্ভ করেছিলেন, তখন তিনি মাটির পাত্র পূর্ণ করে গঙ্গার জল নিয়ে আসতেন এবং তা সারিবদ্ধ করে রাখতেন। তিনি সেইসব তার গৃহে রাখতেন, কারণ তিনি ছিলেন এক দাসী ও তার জল নিয়ে আসার কাজ ছিল। তাই তিনি জল নিয়ে আসতেন। তখনকার দিনে তাদের পৌরশাসিত ব্যবস্থাপনা ছিল না। যদি আপনার জল চাই, তাহলে আপনাকেই নদীতে যেতে হবে, নিজেকে তা নিয়ে আসতে হবে। তাই তিনি জল নিয়ে আসতেন, তবে কেবল জল নিয়েই আসতেন না, তিনি সেইসব একের পর এক সারিবদ্ধভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যেখানে যেতেন, সেখানে রাখতেন। তাকে ১০৮ বা এমন অবিশ্বাসকর পরিসংখ্যায় জলপূর্ণ পাত্র নিয়ে আসতে হত। তিনি আসলে যেকোনো স্থানে অযত্নশীলভাবে সেই সব রাখার পরিবর্তে, তা সারিবদ্ধভাবে এমনভাবে রাখতেন যেন তা ছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কীর্তন দলের জন্য এক প্রীতিসম্ভাষণ। তিনি খুব সুন্দরভাবে সারিবদ্ধভাবে তা রাখতেন এবং জলপূর্ণ পাত্রকে খুবই মঙ্গলজনক মানা হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেকদিন তা লক্ষ্য করতেন যে কিভাবে তিনি সেই জলের পাত্রগুলি নিয়ে আসেন ও সংকীর্তনের সেই স্থানের খুব নিকটে তা সুন্দরভাবে সারিবদ্ধভাবে ও গোল করে রাখেন। তিনি জানতেন যে তিনি সেটি করছিলেন বিশেষত এই চিন্তা করে যে এটি হয়ত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে প্রসন্ন করবে। তিনি এই বিনম্র সেবা নিবেদন করছিলেন ভক্তিমূলকভাবে, সেইজন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তৎক্ষণাৎ তাঁকে স্বীকার করেছিলেন।
তিনি বললেন, “এই দাসীর নাম কি?”
তারা বললেন, “তাঁর নাম দুঃখী দাসী।”
তিনি বললেন, “কি? তিনি কিভাবে শ্রীমতি দুঃখী হতে পারেন? এটা সঠিক নাম নয়। যেহেতু তিনি এই ভক্তিমূলক সেবা করছেন, তার এই সেবামূলক আচরণ কত সুন্দর, তাই এইরকম সেবামূলক ভাবযুক্ত কাউকে দুঃখী বা দুঃখিত বলে ডাকা যেতে পারে না। এখন থেকে আমি চাই প্রত্যেকে তাকে সুখী দাসী বলে ডাকুন।” তাঁদের তাঁকে এই নামে ডাকা উচিত, শ্রীমতি সুখী, শ্রীমতি দুঃখী নয়। এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় দুঃখী দাসী সুখী দাসী হয়েছিলেন — দুঃখী হলেন সুখী। তাই এমনকি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তদের ভৃত্যও স্বল্পমাত্র সেবা নিবেদনের কারণে, সামান্য সঙ্গ লাভের কারণে অসীম কৃপা লাভ করেছিলেন। এটাই হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য— যে কেউ এর সংস্পর্শে এলেই কৃপা প্রাপ্ত হন। এর মানে এই নয় যে এই আন্দোলনে থাকা কেউ, যখন কেউ এগিয়ে আসেন, তখন তার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপাকে প্রত্যাশিত বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। কোন ব্যক্তির “আমি হচ্ছি এক ভক্ত!” এই মনে করে এতটা আত্ম-অহংকারী হওয়া উচিত নয় যে এমনকি তার অন্তরে থাকা পরমাত্মা বলছে, “সতর্ক হও তা করোনা। এটা তোমার গুরু চান না, এটা তোমার করা উচিত নয়, এটা আমি চাইনা।” অন্তর থেকে কৃষ্ণের বানী আমাদেরকে বললেও, আমরা মনে করছি, “না! না! আমি একজন ভক্ত এবং আমি ভাল জানি।” আমরা মনে করছি, এটা আমাদের মন বা এমন কিছু। এইভাবে আমরা তাঁর কথা শুনলাম না, ও আমরা মিথ্যা অহংকারের বশবর্তী হয়ে চিন্তা করলাম যে, আমি একজন ভক্ত! সেইজন্য আমাদের সবসময় চিন্তা করা উচিত যে, আমি একজন ভক্ত হওয়ার চেষ্টা করছি, আমি সেই মানদণ্ডে উন্নীত হওয়ার চেষ্টা করছি এবং এইভাবে আমাদের সর্বদা কৃষ্ণের প্রতি সচেতন থাকা উচিত।
প্রাথমিক পর্যায়ে হয়ত আমাদের সচেতনতা তত ভালো নয়, সেই জন্য নিশ্চিতরূপে আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু থাকতে হবে। কিন্তু এমনকি আমরা নিজেদের প্রাত্যহিক সেবার দ্বারা অধিক থেকে অধিকতর অনুধাবন করতে শিখি যে শ্রীকৃষ্ণ আমাদের থেকে কি চান, কিভাবে কার্য করতে হবে। তবুও ভক্তিমূলক সেবা হচ্ছে অগ্রগতির এক অসীম ক্ষেত্র। সেইজন্য, আধ্যাত্মিক গুরুর অনেক উপদেশাবলী এবং সহায়তা রয়েছে। এমনকি শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর বিরচিত আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি যে প্রার্থনা, তাতে তিনি বর্ণনা করছেন যে যখন কেউ সিদ্ধ হয় এবং আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে যায়, তখনও আধ্যাত্মিক গুরু এক পুরাতন বন্ধু হিসেবে থাকেন এবং এমনকি সিদ্ধ অবস্থা প্রাপ্তির পর তার কৃষ্ণের লীলায় অন্তর্নিবেশ ঘটান। বদ্ধ অবস্থায় থাকাকালীন আমরা শ্রীগুরুদেবকে সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধা নিবেদন করি, আর সিদ্ধ স্তরে তাঁদের মধ্যে এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্বন্ধ থাকে। বদ্ধ জীবনে সম্ভ্রমের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে, তবে কখনই তা অতি অন্তরঙ্গ নয়।
অবশ্য এখন আমরা বেশ একটু উদ্বিগ্ন আছি, কারণ আমাদের একজন ভক্তের দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করছি যাতে এই জীবনে আমাদের অপ্রতিহত সঙ্গ থাকে, আমাদের অনেক প্রচারক দরকার। আমরা তার মাধ্যমে কত কিছু করতে পারব, সেই জন্য অবশ্যই আমরা তার প্রতি আশাবাদী, কিন্তু সর্বশেষে কৃষ্ণ হচ্ছেন পূর্ণ স্বরাট এবং যদি তিনি কাউকে নিয়ে নিতে চান, তাহলে আমাদের কিছুই করার নেই। আগে হোক বা পরে, আমাদেরকেও যেতেই হবে। তখন আমরা কেবল এই প্রার্থনা করতে পারি যে কৃষ্ণের কৃপায় সেই ব্যক্তি হয় ভগবদ্ধামে ফিরে যান অথবা অন্য কোথাও সেবায় নিযুক্ত থাকুন। অবশ্য এমনকি আমাদের মনে চলতে থাকা এইসব উচ্চতত্ত্ব বিষয়ক চিন্তাধারা ব্যতিরেকে আমাদের নিজেদের জীবনের কিছু ব্যবহারিক বিবেচনা আছে যে যখন এমন সময় আসে আমরা একগুঁয়ে হয়ে পড়ি, তখন আমরা কৃষ্ণ কর্তৃক স্মরণ করিয়ে দেওয়া এই সমস্ত ছোট ছোট বিষয়গুলি এড়িয়ে যেতে শুরু করি।
ঠিক যেমন এমনকি আমাদের প্রাত্যহিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে এক কণ্ঠস্বর আমাদেরকে বলেন, “এটা কোরো না!” কিন্তু তবুও আমরা সেটাই করি। আমরা জানি যে, যদি আমরা গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়ি, যদি আমরা গাড়ি রাস্তার ধারে না থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি, তাহলে আমাদের দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে। আমরা কথা শুনিনি। আমরা জানি যে বিভিন্ন সময় কৃষ্ণের থেকে আমরা সতর্কবাণী প্রাপ্ত হই, কিন্তু আমরা সচেতন হই না। অবশ্য এইজন্য ভক্তদের সঙ্গের কথা নির্দেশিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা যদি সচেতন নাও হই, যদি একজন ভক্ত প্রকৃত বন্ধু হন, তাহলে কোনো হিংসা, কোনো ক্রোধ ছাড়াই, অবশ্য ক্রোধ কেবল বিবেচনার ভিত্তিতে থাকতে পারে, কিন্তু কোন শত্রুতা ছাড়াই ভক্ত বলেন, “তুমি কেন সময় নষ্ট করছ?” অথবা “তুমি কেন অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি গ্রহণ করছ?” বা “তুমি কেন এই অনির্দেশিত কাজ করছ?” এইভাবে, তারা আমাদেরকে সাহায্য করেন, তারা আমাদেরকে কৃষ্ণকে মনে করিয়ে দেন। যখন আমরা একা থাকি, তখন আমরা অধিক দুর্বল হয়ে পড়ি। শ্রীল প্রভুপাদ, তিনি পাশ্চাত্যে একা এসেছিলেন কিন্তু তিনি এটি স্বীকার করেছেন, আমি মনে করতাম না যে অন্য কেউ এটি করতে পারতেন। একবার তার সঙ্গে ভক্তরা ছিলেন, তখন একসময় তাকে ব্যাংকে বা এইরকম কোন এক জায়গায় যেতে হত। ব্যাংকে কিছু গোলমাল হয়েছিল, তাই তাকেই ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে সেটির সমাধান করতে হত। তিনি বললেন, “আমি আমার ভক্তদের সাথে যেতে চাই। আমি কোথাও একা যেতে চাই না। আমি কখনও আর ভক্তদের সঙ্গের বাইরে থাকতে চাই না, কখনও আমাকে একা হতে দিও না।” এমনকি যদিও তিনি ছিলেন নিত্যসিদ্ধ জীব, তবুও তিনি ভক্তসঙ্গবিহীন থাকতে চাইতেন না। একইভাবে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হওয়া উচিত।
আমরা গতরাত্রে আলোচনা করছিলাম যে, কখনই আমাদের মনকে এমন কোন বিপরীত পরিকল্পনা করতে অনুমতি দিও না যেখানে আমরা ভক্তসঙ্গের বাইরে হয়ে যাব। এবং যদি আমরা ভক্তসঙ্গের বাইরে থাকি, তাহলে আমাদের এটি দেখা উচিত যে আমাদের পরিস্থিতি সংকটপূর্ণ। তখন কৃষ্ণভাবনামৃতে অগ্রগতি করা বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। তাই, যতটা সম্ভব আমাদের ভক্তগোষ্ঠীর সমীপে থাকা উচিত। এটিকে বলা হয় সৎসঙ্গ — সৎ কথাটি যথেষ্ট ভালো শব্দ নয়। এটি হচ্ছে দিব্য সঙ্গ, ভক্তসঙ্গ। আমাদের সেই সঙ্গের প্রয়োজন আছে। এই জগতে ভক্তরাই হচ্ছেন প্রকৃত বন্ধু, তাই আমাদের ভক্তসঙ্গে থাকার কারণে নিজেদেরকে অত্যন্ত ভাগ্যবান অনুভব করা উচিত এবং এই সঙ্গ হারিয়ে না ফেলার প্রতি আমাদের খুবই সতর্ক থাকা উচিত, কারন পরম পুরুষোত্তম ভগবানের ভক্তের ভক্তদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সমস্ত ভালো গুনাবলী প্রকাশিত হয়। ঠিক যেমন সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ধনলক্ষী দেখেছিলেন, এমন কিছু ব্যক্তিরা আছে, যাদের সম্ভবত সমস্ত ভালো গুণাবলী আছে, কিন্তু যেহেতু তারা ভক্ত নয়, তাই তিনি তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন। ঠিক যেমন কংস, তার সমস্ত ভালো গুণাবলী ছিল, সে ছিল খুবই বুদ্ধিমান, সে ছিল খুবই দানী ব্যক্তি, খুব শক্তিশালী, আর পরিস্থিতি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিপুণ, কিন্তু যখনই আকাশ থেকে সেই শব্দতরঙ্গ ভেসে এল যে, “কংস, তোমার ভগিনী দেবকীর অষ্টম পুত্র তোমার মৃত্যুর কারণ হবে।”
তখন সে বলল, “কি?”
সে শত শত লোক, তার অভিভাবক, তার আত্মীয়দের সম্মুখে তার ভগীনির কেশ আঁকড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, “তোমার পুত্র আমার হত্যার কারণ হবে, তাই এখনই আমি তোমাকে হত্যা করব।” সে তার শিরচ্ছেদ করতে উদ্যত হয়েছিল কারণ সে ভক্ত ছিল না। এটা হচ্ছে আসুরিক ভাবধারা। তৎক্ষণাৎ তার সমস্ত সৎ গুনাবলী জানলা দিয়ে বাইরে পালিয়ে গেল! সব প্রক্ষিপ্ত হল! সে সব ভুলে গিয়েছিল। নিজ ইন্দ্রিয়তৃপ্তি, নিজ স্বার্থের কারণে সবকিছু ভুলে গেল!
পরীক্ষিত মহারাজ, যখন তাকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল যে, “তোমার সাত দিনের মধ্যে মৃত্যু হবে।” তখন তিনি এই প্রয়াস করেননি যে, “ওহ সেই নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণকে আমি ছাড়ব না!” না! তার সেরকম কোন মনোভাব ছিল না। তিনি বললেন, “ওহ এটাই হচ্ছে আমার জন্য শ্রীকৃষ্ণের পরিকল্পনা।” আমি দায়িত্বহীনের মতো আচরণ করেছি, এখন আমি সমস্যায় পড়েছি, তাই এখন আমি কিভাবে কৃষ্ণের কথা চিন্তন করতে পারব? তিনি নিশ্চয়ই চান যে আমার মন যাতে তাঁর প্রতি স্থির হয়। তাঁর নিশ্চিতরূপে কোন উচ্চতর উদ্দেশ্য আছে। তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করার পর, অবশ্য ততক্ষণে তিনি যা চান সেটাই করার ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীন ছিলেন। সময়ের আগমনকে কেউই স্তব্ধ করতে পারে না। আমরা শ্রীকৃষ্ণের উচ্চতর উদ্দেশ্যের নিমিত্তে কার্য করি এবং শ্রীকৃষ্ণের যন্ত্র হয়ে উঠি। এই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলনে আমাদের বিশেষ সুযোগ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে প্রত্যেক নগর ও গ্রাম পবিত্র নাম-কীর্তনে পরিপূর্ণ হবে। এখন যদি আমরা ক্রীড়ানক হয়ে সেবা করতে পারি, আমরা যদি আমাদের মধ্যে দিয়ে এই কৃপা প্রবাহিত হতে দেই, তাহলে আমরা মহিমান্বিত হব, আমরা এত উপকৃত হব যে এই উপকার অসংখ্য জীবের মধ্যে দিয়ে বৃদ্ধি পাবে। ঠিক যেমন সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, তিনি কোন নিকৃষ্ট ব্যক্তির সেবায় নিযুক্ত হতে চাননি, তিনি কেবল এটি নির্বাচন করেছিলেন যে, “আমাকে কেবল শ্রীবিষ্ণুর সেবা করতে দিন।” ঠিক তেমনই, আমাদের উচিত তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করা এবং যখন আমাদের কাছে পরমেশ্বর ভগবান আছেন, তখন আমাদের কেন অন্য কারও সেবা করা উচিত? নিশ্চিতরূপে তাঁকে সেবা করার মাধ্যমে কেবল আমরাই উপকৃত হব না, অন্যান্য অসংখ্য জীবও উপকৃত হবে।
জয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ।।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
কোনো প্রশ্ন আছে কি? হ্যাঁ?
ভক্ত: (শ্রুতিহীন) কি.. এটা এক বাস্তবিক বিষয়। তাই, আপনার অন্তরের শব্দ আপনার মন নাকি শ্রীকৃষ্ণ?
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: প্রথম দিকে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে কেবল আধ্যাত্মিক গুরুকে জিজ্ঞাসা করা। কেউ অন্যান্য ভক্তদের সাথে, বরিষ্ঠ ভক্তদের সাথে, বিশেষত আধ্যাত্মিক গুরুর সাথে আলোচনা করে দেখতে পারে, তখন কেউ পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারবে। ঠিক যেমন, কখনও কখনও আমাদের মনে কোন পরিকল্পনা আসত এবং আমরা তা শ্রীল প্রভুপাতকে জিজ্ঞেস করতাম এবং তিনি বলতেন যে, এই পরিকল্পনা হচ্ছে পরমাত্মার দ্বারা অনুপ্রাণিত। কখনও কখনও কেউ একটি পরিকল্পনা বলত এবং তিনি বলতেন যে এই ধারণা মায়ার দ্বারা অনুপ্রাণিত। (ভক্তরা হাসছেন) অবশ্য শ্রবণ ও অধ্যয়নের মাধ্যমে আমাদেরকে কোন ধারনা পেতে হবে, আমাদেরকে এটি পরীক্ষণ করতে শিখতে হবে। ঠিক যেমন আমরা প্রার্থনা করি, “গুরু মুখ পদ্ম বাক্য, চিত্তেতে করিয়া ঐক্য” — “আমার চিত্ত আপনার উপদেশ, আপনার নির্দেশ-এর প্রতি ঐক্যপূর্ণ থাকুক।” আধ্যাত্মিক গুরু যা কিছু বলেন, আমরা চাই আমাদের চেতনা যেন সেই সমস্ত শব্দাবলী পূর্ণ করে এবং সেই সব শব্দের সাথে ঐক্যপূর্ণ থাকে। তাই, যদি আমরা কোনো কিছু করি, আমাদের কাছে যদি সেই কার্যের কোন পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আমরা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাই। এটাই হচ্ছে পরম্পরার নিয়ম — ব্যক্তি যা কিছু করেন, তা কেবল তখনই করেন যদি তা অনুমোদিত হয়। সরাসরিভাবে আপনি দেখতে পারেন যে গুরু বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণ শাস্ত্রে বলেছেন এবং শাস্ত্র, বেদ এত বিস্তীর্ণ যে এমনকি যদি কেউ তার হৃদয়ে জানেন যে এটি কৃষ্ণভাবনাময়, তবুও মনঃধর্মপ্রসূত ধারণার কোনো স্থান নেই। এছাড়া ততক্ষণাৎ কেউ চেষ্টা করে খুঁজে বার করতে পারেন যে শ্রীকৃষ্ণ এই উদাহরণ দিয়েছেন নাকি, বেদে এই উদাহরণ আছে নাকি, এই পরিস্থিতির কথা আছে নাকি। শ্রীমদ্ভাগবতে এমনকি লক্ষাধিক উদাহরণ দেওয়া আছে এবং যদি কারও তা দেখার চোখ থাকে, তাহলে দেখতে পারবেন যে ভগবদগীতার মধ্যে বেশিরভাগ সব পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই দেওয়া আছে। আধ্যাত্মিক গুরুর তা দেখার চোখ আছে, সেইজন্য আমরা তাঁর নির্দেশ গ্রহণ করি।
এছাড়াও উপসর্গ হচ্ছে যে অতিরিক্ত প্রয়াস মূলত মায়া ধারণার লক্ষণ। ঠিক যেমন, কোন ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণের জন্য কোন কিছু করার একটি ধারণা লাভ করলেন এবং তা খুব সহজেই হয় বা মনে হয় ভালোই এগিয়ে চলছে। কিন্তু যখন আমাদের এই ধারণা থাকে যে আমরা কৃষ্ণের জন্য করছি কিন্তু এর আগে যখন আমাদের অতিমাত্রায় জড়জাগতিক কার্যের দিকে পদক্ষেপ করতে হয়, যাতে অবশেষে সেটি কোনভাবে কৃষ্ণের দিকে পরিচালিত হতে পারে, তখন কত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এটা হচ্ছে অতিরিক্ত প্রয়াস-এর একটি লক্ষণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ফল লাভের জন্য অতিরিক্ত প্রয়াসের লক্ষণ। যদি কাউকে কোন কিছু করতে হয়, অতিরিক্ত প্রয়াস করতে হয়, তাহলে তারা হয়ত কৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে এবং মনে করতে পারে, আমি কৃষ্ণের জন্য এটি করব। আমি কৃষ্ণের জন্য বাড়ি নির্মাণ করতে চাই, যাইহোক না কেন এইরকম কিছু। কোন নির্দিষ্ট কিছু বলা খুবই কঠিন। হয়ত কেউ একটি বিমান বানাতে চান। সেই একই বিষয়ে হয়ত অন্য পরিস্থিতিতে কৃষ্ণভাবনাময়। তাই এটা সেই নির্দিষ্টবস্তু নয়, তবে সেই নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, যেই সময়টিকে আরও সহজভাবে ব্যবহার করা যেতে পারত। শ্রীকৃষ্ণ চান আপনি যাতে ভিন্নভাবে তা করেন, সেইজন্য তিনি মায়াকে রাখেন, যিনি কত কিছু বাধা প্রদান করেন, যাতে ব্যক্তি অন্য পথ গ্রহণ করেন, কিন্তু যদি কেউ প্রত্যেক সমস্যা সত্বেও একপ্রকার পূর্ব পরিকল্পিত ধারণার কারণে সেই নির্দিষ্ট ধারণার প্রতি স্থির থাকে, তাহলে তিনি প্রতি পদক্ষেপে সমস্যার সম্মুখীন হবে। এই বিষয়ে আমি অনেক বাস্তবিক দৃষ্টান্তের কথা চিন্তা করতে পারছি। এই সব কিছু ভক্তদের সাথে জড়িত, আমি তাদেরকে বিব্রত করতে চাই না।
আমাদের আন্দোলনে একজন বরিষ্ঠ ভক্ত ছিল, যে খুব ভালো সেবা করছিল, কিন্তু তারপর তার মাথায় এটি পরিকল্পনা আসে। কেউ একজন তাকে প্রভাবিত করেছিল, তাকে কিছু রুবি দিয়েছিল এবং সেই থেকেই পুরো বিষয়টি হয় যে সে রুবি খনন করা শুরু করল এবং সে একটি রুবির খনি কিনেছিল ও সেখানে যাওয়া শুরু করেছিল। সে এইসব রুবি ও রত্ন দেখে এত অভিভূত হয়ে পড়েছিল, যা ছিল একপ্রকার সোনা লাভের আকাঙ্ক্ষা। তার রুবির প্রতি লোভ এবং রত্নের প্রতি লোভ হয়েছিল। শ্রীল প্রভুপাদ তাকে বলছিলেন যে, “এটা হচ্ছে অতিরিক্ত প্রয়াস! এটা অপ্রয়োজনীয়। কেবল কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করো, কৃষ্ণ সমস্ত কিছু প্রদান করবেন।” “না! না! আমি কৃষ্ণের জন্য অর্থ উপার্জন করতে চাই।” এবং এমনকি তার গুরু তাকে বললেন যে এটা করো না, কিন্তু সে বলল, “না! না!” এবং অবশ্য যা কিছু অর্থ সে পেয়েছিল, তা সে কৃষ্ণকে দেয়নি, সে পুনরায় সেটি আবার বারংবার তার ব্যবসায় পুনঃবিনিয়োগ করেছিল, যা সাধারণত ঘটে থাকে। এবং এরপর অবশেষে সে আরো অধিকভাবে কৃষ্ণবিমুখ হয়ে যায় ও অধিক থেকে অধিকতর মায়ার মধ্যে চলে যায়। এখন গত অনেক বছর হল সে পুরোপুরি সংস্পর্শের বাইরে। আপনারা কখনও কখনও তাকে দেখেন, সে এখনও এগিয়ে চলেছে একদিন সফল হবে এই উদ্দেশ্যে। তাই এটা হচ্ছে অতিরিক্ত প্রয়াস, ভুল পথে চালিত হওয়া। তাই অবশ্যই চরমে শ্রীগুরু হচ্ছে কোন ভক্তের আধ্যাত্মিক অগ্রগতির তত্ত্বাবধায়ক, তাই আপনাকে তার নির্দেশ গ্রহণ করতে হবে এবং কেউ যত উন্নত হবে, তখন কেউ বলতে পারে যে যখন সে ভুল সিদ্ধান্ত করবে, সাধারণত কৃষ্ণ তা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবেন। আপনি ভক্তিমূলক সেবায় যত উন্নত হবেন, ততই সামান্য ভুলের ফল তৎক্ষণাৎ পাবেন। দেখুন কর্ম হয়ত একশত জন্মের ফল নিয়ে আছে, কিন্তু যখন আপনি কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হন, তখন আপনি কোন ভুল করলে আপনি হয়ত সেই প্রতিক্রিয়া লাভ করবেন, “স্ফিউ” (তৎক্ষণাত) ৫ সেকেন্ড বা ৫ মিনিট বা ৫ বছর এর মধ্যে।
একজন ভক্ত ছিল, যে কলকাতায় ট্যাক্সিতে করে যাচ্ছিল, ভগবান জানেন যে কোন কারণবশত সে শ্রীল প্রভুপাদ ও বিভিন্ন ভক্তদের নিন্দা করা শুরু করেছিল! সে নিশ্চয়ই উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল এবং তখন আরেকজন ভক্ত যে তার সাথে ছিল, তৎক্ষণাত সে সেই গাড়ি থামায় এবং বাইরে বেরিয়ে এসে বলে, “আমি শুদ্ধ ভক্তের ব্যাপারে কোন অপরাধ শুনব না।” এইভাবে সেই ব্যক্তি চলে যায় এবং একঘন্টার মধ্যে সে ট্রেন স্টেশনে পৌঁছে যায়, কিন্তু সে ট্রেন ধরতে পারে না, এইভাবে সে সেখানে একটি কুলির সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, একজন সংবাহক, ভারতে তাদেরকে কুলি বলে ডাকা হয়, এটাই হচ্ছে খাতায়-কলমে তাদের নাম, হে কুলি! কুলি ডাকা হলে তারা কিছু মনে করে না। এরপর সেখানে পুরো দাঙ্গা শুরু হয় এবং প্রায় ১৫০ জন কুলি ইট এবং লাঠি সহ বেরিয়ে আসে। তারা সেই তথাকথিত ভক্তের সবকিছু খুলে নিয়ে তাকে পুরোপুরি উলঙ্গ করে দিয়েছিল এবং একমাত্র তার শরীরে যা ছিল, তা হচ্ছে তার ব্রাহ্মণ পৈতে। তারা তাকে প্রহার করে তার মজ্জা বের করে দিয়েছিল এবং সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল এবং অবশেষে সে ঝাঁপ দিয়ে একটি বাসের ভিতর প্রবেশ করে। এবং সেই পুরো বাস খালি হয়ে গিয়েছিল, তারা এটি বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
(শ্রীল জয়পতাকা স্বামী এবং ভক্তরা হাসছেন)
এবং এই সবকিছু হয়েছিল তার ভক্ত নিন্দা করার এক দুই ঘন্টার মধ্যে। সে হাসপাতালে ছিল। সে ছিল এক পুরো ব্যর্থ ভক্ত, সবসময় অন্যদের নিন্দা করত। এরপর সে এসেছিল ও মন্দিরে শতাধিকবার নমস্কার করেছিল এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক ভক্তের কাছে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল। এইভাবে সে শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছিল। কখনও কখনও আমাদেরকে একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বারংবার সতর্ক হতে বলা হয়, বা কোন এক ধরনের কার্যকলাপ এড়িয়ে যেতে বলা হয়, আমরা তা শুনি না, আমরা শুনি না, আমরা শুনি না এবং অবশেষে কৃষ্ণ বলেন, “ঠিক আছে, যা ঘটতে চলেছে তা হতে দেই।” এবং তখন মায়া দায়িত্ব গ্রহণ করেন, কৃষ্ণ দায়িত্ব তুলে নেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে তা করেন না, তিনি কেবল কিছু আশ্রয় সরিয়ে নেন এবং মায়া প্রবেশ করেন। নয়ত ভক্ত সবসময় যোগমায়ার আশ্রয়ে থাকেন, কিন্তু আমরা যদি কৃষ্ণকে অবহেলা করি, যদি আমরা গুরুদেবকে অবহেলা করি বা আমরা যদি নিন্দা করি, তাহলে সেই আশ্রয় সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তখন আমরা মায়ার কৃপা-আশ্রয়ে থাকি এবং যেহেতু আমরা তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হওয়া থেকে বের হতে চেষ্টা করছি, তাই তিনি ইতিমধ্যেই আমাদের প্রতি রুষ্ট থাকেন, এবং তখন তিনি আমাদের উপর তার পূর্ণ চাপ প্রয়োগ করেন।
ভক্ত: যদি কেউ শুদ্ধ ভক্তের বা আধ্যাত্মিক গুরুর নিন্দা করে, তাহলে এমনকি যদিও ভগবদগীতাতে বলা হয়েছে ভক্ত উচ্চলোকে বা জড়জাগতিকভাবে ভালো জন্ম লাভ করে, কিন্তু এটা কি সম্ভব যে সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক গুরুকে নিন্দা করার পরও কোনো ভালো জন্ম লাভ করবে? অথবা সে কি ভগবদগীতায় বলা সেই ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়?
জয়পতাকা স্বামী: না! মূল বিষয় হচ্ছে যে, বলা যাক একজন ভক্ত কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু তা হতে পারেনি, তিনি ইন্দ্রিয়ের বশবর্তী হয়ে আবার জড়জাগতিক জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই ব্যক্তি যতটা সময় কৃষ্ণভাবনাময় কার্যাবলীতে অতিবাহিত করেছেন, সেই জন্য তারা স্বর্গলোকে অথবা ভবিষ্যতে এক খুব ভালো জন্ম লাভ করতে পারে। তাদের হারানোর কিছুই নেই। এই পাপ প্রতিক্রিয়া প্রভাব বিস্তার করে না, পাপময় জীবন আমাদের ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বের সৃষ্টি করে, কিন্তু তা ফিরে যাওয়া রোধ করতে পারে না, কারণ সেই সুকৃতি স্থায়ী আমানতে সঞ্চিত আছে। কিন্তু কি হয়, যখন কেউ অপরাধ করে, তখন সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অপরাধ হচ্ছে সরাসরি… ঠিক যেমন আপনি কারও কাছে কর্মরত, আপনি এক ভালো বিশ্বাসের ইতিহাস গড়ে তুলেছেন এবং তখন যদি আপনি তার থেকে চুরি করেন, তাহলে আপনাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে এবং সেই ব্যক্তি আর কখনই আপনাকে দেখতে চাইবে না, তাই না? কিন্তু বলা যাক যে, আপনি কোন একজন ব্যক্তির কাছে কাজ করছেন, কিন্তু কোন না কোনভাবে আপনি দূরে চলে গেছেন বা কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, আপনি যাই করুন না কেন তবু আপনাদের মধ্যে সেই সম্পর্ক বিদ্যমান আছে, সম্বন্ধ একই আছে। এটা এক প্রকার স্থূল জাগতিক উদাহরণ, এটা পুরোপুরি যথাযথ নয়।
উচ্চতর অর্থে আমাদের সাথে কৃষ্ণের সম্বন্ধ অন্যান্য সর্বপ্রকার কার্যকলাপের থেকে স্বতন্ত্র। কিন্তু তাঁর প্রতি বা তাঁর ভক্তের প্রতি সরাসরি অপরাধ করলে, এমনকি তিনি তাঁর প্রতি অপরাধ করলে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু যিনি মানুষদের তার কাছে নিয়ে আসতে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন, আপনি যদি তাঁর সেইরূপ ভক্তের প্রতি অপরাধ করেন, তখন সেটি তাঁর কাছে অসহনীয়। তাঁর এই নীতি আছে যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সেই কার্যের জন্য কাউকে ক্ষমা করেন না। যদি সেই ভক্তরা নিজেরা ক্ষমা করেন, তাহলে তিনি তা ক্ষমা হিসেবে গ্রহণ করেন। সব অপরাধের মধ্যে আধ্যাত্মিক গুরু, যিনি শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ ভক্ত, তাঁর নিন্দা করাকে সবথেকে জঘন্য অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত বলা হয়েছে যে, কেউ এরপর আবার লক্ষাধিক জন্ম পর গুরু লাভের সুযোগ পায়। কেন কৃষ্ণ আপনাকে গুরুর কাছে আনবেন, যদি আপনি তাঁর নিন্দাই করেন? যদি আপনি এতই হিংসাপরায়ণ হন, তাহলে আপনাকে সেইরকম কোন হিংসুক যোনির জীবন দেওয়া হবে। এইভাবে, শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, কৃষ্ণভাবনামৃত থেকে পাপকর্মে বা জড়জাগতিক কর্মে পতিত হওয়া নিন্দুক হওয়ার থেকে ভালো। আপনার কখনই গুরুকে রুষ্ট করা উচিত নয়। যদি আপনি সেই কার্য করতে না পারেন, তাহলে কেন গুরুকে রুষ্ঠ করছেন? এটি তার ভুল নয়। ভুল হচ্ছে আপনি সেটা করতে পারেননি। আপনি চেষ্টা করেছেন, আপনি যতটা সম্ভব তা করেছেন, কিন্তু আপনার তত দৃঢ়তা ছিল না সেইজন্য আপনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন এবং আপনি পথভ্রষ্ট হয়েছেন। গুরুকে কেন রুষ্ট করা হবে? গুরু আপনার কোন ক্ষতি করেননি, তিনি আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন। যদি আপনি ডাক্তারের কাছে যান এবং আপনার যদি এক দুরারোগ্য ব্যাধি হয় বা আপনি যদি কোন প্রকার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন, এখন ডাক্তার আপনার সেই বদ অভ্যাস ছিন্ন করতে আপনাকে সাহায্য করেন, কিন্তু আপনাকে সেই প্রত্যাহারের ব্যথা সহ্য করতে হবে। যদি আপনি ফিরে গিয়ে আবার হিরোইন বা এমন কোন নেশা দ্রব্য গ্রহণ করতে থাকেন, যতক্ষণ না আপনি অতিরিক্ত সেবন করার ফলে মারা যান, তাহলে সেক্ষেত্রে ডাক্তারের নিন্দা কেন করা হবে? এটি তার ভুল নয়, আপনার সেই স্থিরতা বা বের হয়ে আসার ধৈর্য ছিল না। তিনি আপনাকে পুরো বিষয়ে, আপনার উত্তেজনার সময়, আপনার সমস্যার সময়, সবকিছুতে সাহায্য করেছিলেন কেবল আপনাকে সুস্থ ব্যক্তির পর্যায়ে তুলে আনার জন্য। এটি হচ্ছে এরকমই এক ধরনের বিষয় যে যখন তারা আসে, তারা তাদের মনের বিক্ষুব্ধতা প্রত্যাহারের মধ্যে দিয়ে যেতে চায় না — আমাকে আমার বাইসাইকেল বা যাই হোক না কেন কোন কিছু, বিভিন্ন আসক্তি পরিত্যাগ করতেই হবে। যদি আমি একজন ভক্ত হই, তাহলে আমি আমার হাইফাই স্টেরিয়াতে রক এন্ড রোল গান শুনতে পারব না, যেটা আমি শুনতে চাই। এইভাবে যাইহোক না কেন, কোন না কোন বিভিন্ন ধরনের মায়া হয়ত ব্যক্তিকে আক্রমণ করতে পারে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, তবে তাদের দেখা উচিত যে গুরু তাকে সাহায্য করছেন।
ভক্ত: তাতে কি সে তার অগ্রগতি হারিয়ে ফেলতে পারে? যেহেতু তিনি তা হারাতে পারে না কারণ ....
জয়পতাকা স্বামী: যদি, … আপনি তা হারাতে পারেন।
ভক্ত: যদি নিন্দা করে তাহলে হারাতে পারে?
জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যে,
যদি বৈষ্ণব-অপরাধ উঠে হাতী মাতা।
উপাড়ে বা ছিণ্ডে, তার শুখি’ যায় পাতা॥
একজন ভক্তকে নিন্দা করার অপরাধকে মত্ত হস্তির অপরাধ বলা হয়, কারণ কারও আধ্যাত্মিক প্রগতিকে একটি লতা, একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যখন আপনি শুদ্ধ ভক্তের নিন্দা করেন, সেই মত্ত হস্তি বাগানে প্রবেশ করে সেই পুরো গাছকে উপড়ে ফেলে, ছিঁড়ে ফেলে, বাগান ধ্বংস করে ফেলে। এই তুলনা দেওয়া হয়েছে যে, অন্য সবকিছু হচ্ছে আগাছার মত, তারা প্রকৃত লতাকে মেরে ফেলে না, তারা কেবল এর সাথে বৃদ্ধিতে প্রতিযোগিতা করে। তারা এর শক্তি কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে বৃদ্ধি রোধ করে, ভক্তিলতা যে স্তরে ছিল সেই স্তরেই থাকে। কিন্তু আগাছাগুলির ক্ষেত্রে মূল লতাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেওয়া বেশ কঠিন যতক্ষণ না চূড়ান্তভাবে বিনষ্ট করছে। কিন্তু অপরাধ, সেটি হচ্ছে মত্ত হস্তির মতো, যা প্রবেশ করে এবং ট্রপপপপ (ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার শব্দ) উপড়ে ফেলে এবং তা মাটিতে ফেলে তার উপর পা দিয়ে পিষে দেয়। এমনকি কিছু সময়ের জন্য মনে হতে পারে যে সেই ব্যক্তি আধ্যাত্মিক স্তরে আছেন, তারা লতা উপরে ফেলে তবুও কিছুদিনের জন্য সেই সবুজ পাতা থাকে, তবে ধীরে ধীরে তা শুষ্ক হয়ে পড়ে যায়। যদি আপনি এমনকি অধঃপতিত হন, তবুও গুরুদেবের সাথে যে সম্বন্ধ তা কখনই ছিন্ন করা যায় না, এটি কোন জড়জাগতিক কার্যকলাপের দ্বারা ছেদন করা যায় না, কিন্তু যদি আপনি গুরুদেবের নিন্দা করেন, তাহলে তা সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, এটি হচ্ছে যেন ত্যাগ করে দেওয়ার মত। শিষ্য নিন্দা করার মাধ্যমে গুরুকে ত্যাগ করে দেয়।
ভক্ত: তিনি তাকে ফিরিয়ে নেন?
জয়পতাকা স্বামী: অবশ্যই। ও হ্যাঁ! তাতে কোন সমস্যা নেই। যদি সন্তান মা এবং অন্যান্য ভ্রাতাদের প্রহার করে, তখন বাবা বলেন যে, “এখান থেকে বেরিয়ে যাও, তুমি আর এখানে ফিরে আসবে না।” কিন্তু সে যদি বাবার কাছে ফিরে আসে এবং বাবাকে বলে যে, “আমি এক মূর্খ। আমি অবিবেচক ছিলাম, তাই এখন তুমি যা বলবে আমি তাই করব।” তখন বাবা কখনই, বাবা সবসময় তার পুত্রকে ফিরিয়ে নেবেন। এটা হচ্ছে তেমনই, কিন্তু অন্যান্য সন্তানেরাও তারা বিবেচনা করতে পারে। খবরের কাগজে এসেছিল যে এক পুত্র তার বোন বা এমন কাউকে হত্যা করতে গিয়েছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই বাবা সব সন্তানদের ভালোবাসেন, তাই কেউ একজন বড় সমস্যা সৃষ্টি করলে, “তোমাকে বের হয়ে যেতে হবে। যদি তুমি ফিরে আসতে চাও, তাতে কোন সমস্যা নেই। এটাই হচ্ছে পুরো বিষয় যে, এই জীবনে কেউ হয়ত এইরকম ধরনের অপরাধ করেছে, তাহলে তার ফিরে আসা উচিত এবং তার এই ক্ষতিপূরণ করা উচিত। তার পরিস্থিতি খুবই ভয়ঙ্কর, যদি সে এই জীবনে এই ক্ষতিপূরণ না করে, তাহলে সে শেষ।”
ভক্ত: বেশ প্রয়োগীয়, কিন্তু যদি… তারপর যখন তিনি ফিরে আসে, নিন্দা করার পর, তখন তিনি তার সকল অগ্রগতি হারিয়ে ফেলে। তার পূর্বে করা সমস্ত অগ্রগতি যদি তিনি হারিয়ে ফেলে, তাহলে তখন তিনি কি আবার নতুন করে শুরু করেন? আমি কিছু ভক্তদেরকে জানি… এখানে নিউ অরলেন্সের, যারা খুব নিন্দা করেছিল, তারা আর ফিরে আসতে পারেনি, কিন্তু…
জয়পতাকা স্বামী: কৃষ্ণ হিসাব রাখেন। প্রত্যেক ব্যক্তির তার নিজস্ব হিসাব কিতাব আছে এবং এটা বলা খুবই কঠিন যে তোমার সাফল্যাঙ্ক ঠিক কি। সেইজন্য আমরা দেখেছি যে ভক্তরা যারা নিন্দা করে, তারা ভক্তিমূলক সেবায় নিজেদেরকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে, তবে তারা যেখানে ছেড়েছিলেন, সেখান থেকে শুরু করেন, এটাই হচ্ছে বাস্তব। তাদের কিছুটা ক্ষতি হয়, কিন্তু এরপর তাদের আন্তরিক প্রয়াসের ফলে তারা আবার তাড়াতাড়ি ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমাদের এই আন্দোলনে বড় বড় ভক্তরা, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি তাদের খুব বাজে অপরাধের পরও ফিরে এসেছেন। এবং শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় তাদের কিছু সমস্যা হয়েছিল, তাদেরকে নিশ্চিতরূপে বিনয়ী পদ গ্রহণ করতে হয়েছিল। তবে শ্রীল প্রভুপাদ সাধারণত এই ধরনের ব্যক্তি, যারা অপরাধ করেছে, তাদেরকে খুব প্রচারকারকার্য, প্রায় একপ্রকার ঝুঁকিপূর্ণ প্রচারে নিযুক্ত করতেন, যেমন সীমান্ত অঞ্চলে বা এমন কোন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে, যেখানে তাদের অনেক প্রচার করতে হত এবং এই প্রচারের কারণে কেউ অপরাধ থেকে ক্ষমা পেতে পারেন এবং আপনি আর অন্যদেরকে সাহায্য করছেন, তাই এইভাবে তারা পুনরায় ভক্তিমূলক সেবায় তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। ঠিক যেমন জগাই মাধাই, মাধাইকে বলা হয়েছিল অন্যান্য ব্যক্তিদের আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য কিছু সেবা করতে, এইভাবে তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
হরেকৃষ্ণ!
ভক্ত: হরে কৃষ্ণ!
তোমার কি কোনো প্রশ্ন আছে, ডেভ? তোমার কোনো প্রশ্ন ছিল?
ভক্ত: যখন আমরা সংখ্যামালা জপ করি, তখন যদি আমরা সঠিকভাবে উচ্চারণ না করি, তাহলে কি তবুও একই প্রভাব হবে?
জয়পতাকা স্বামী: আমি কিভাবে সেই একই প্রভাব পেতে পারি? আমরা হয়ত কৃষ্ণের নাম জপ করছি, কিন্তু মহামন্ত্র জপ করছি না। সেক্ষেত্রে আপনি কৃষ্ণের যে কোন নাম জপ করতে পারেন, সেটার প্রভাব আছে, কিন্তু মহামন্ত্র হচ্ছে বিশেষত শক্তিশালী: ১৬টি শব্ধ, ৩২টি অক্ষর। যখন তুমি কিছু অক্ষর বাদ দিয়ে দেবে, তখন তুমি যে নাম জপ করছ তা ভিন্ন মন্ত্র। তুমি জপ করছ ১৪টি শব্দ, ৩০টি অক্ষর বা ২৮টি অক্ষরের মন্ত্র বা এইরকম অন্য কিছু। এটি প্রভাব কিছুটা কমিয়ে দেবে, কিন্তু অবশ্যই যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের নাম স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, তাই এটি সমীকরণে ফেলা খুবই কঠিন যে কত শতাংশ প্রভাব কম হবে এবং আরো অন্যান্য বিষয়গুলি। কিন্তু কোন ব্যক্তির যেই মহামন্ত্র দেওয়া হয়েছে, সেটি যথাযথভাবে বলার প্রয়াস করা উচিত, যদি কেউ জপ করার সময় অমনোযোগী হয়, তাহলে তা সাহায্য করতে পারবে না, কিন্তু এর প্রভাব থাকবে।
ডেভ?
ডেভ: মন্ত্র উচ্চারণ করার যথার্থ পদ্ধতি কি?
জয়পতাকা স্বামী: তুমি আধ্যাত্মিক গুরুর উচ্চারণ শুনতে পারো যে তিনি কিভাবে বলেন, তোমার সেইভাবে বলার চেষ্টা করা উচিত। ঠিক আছে?
ভক্ত: আমি চিন্তা করছিলাম। মনে হচ্ছে এই জড়জগতে কত নিয়ন্ত্রণকারী মাধ্যম আছে, যেমন জড়জাগতিক গুণসমূহ এবং দেবতা ও পরমাত্মা এইসব কিছু। এটা কঠিন যে যখন আপনি ঠিক কলির বিপরীতে আছেন, তখন যে কোনো স্বাধীন ইচ্ছা… খুব আন্তরিকতাপূর্ণভাবে থাকা… বা এটা কি কৃষ্ণের কৃপা যা আপনাকে অনুপ্রাণিত করে, আপনাকে সেবা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে?
জয়পতাকা স্বামী: একজন ভক্ত গতকাল আমার সাথে কথা বলছিলেন। প্রভু না মাতাজি আমি ভুলে গেছি। তিনি একটি খুব ভালো পথ বের করে এনেছেন যে, তারা সবাই একসাথে ভক্ত হওয়ার পরেও কৃষ্ণের কাছে শরণাগত হওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত করছিল, কিন্তু অবশেষে তারা এক মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে, “যদি আমি এখন কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত না হই, তাহলে আমি কখনই বুঝব না যে আমি কি থেকে বঞ্চিত হলাম। তাই, চলো আমরা শরণাগত হই।” তারা কেবল সেই সিদ্ধান্ত করেছিল যে, “আমি শরণাগত হব, আমি কৃষ্ণের ভক্ত হব।” যখনই তারা সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, তখন সবকিছু স্ স্ স্ (মুক্ত হওয়ার শব্দ) এইভাবে সব দরজা খুলে গেল। যদি একজন ভক্ত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, আমি কেবল এই জড়জাগতির জীবন উপভোগ করতে চাই, আমি কোন ভক্তিমূলক সেবা করতে চাই না, তাহলে তখন কৃষ্ণ, তখন মায়া সমস্ত পথ খুলে দেন। হঠাৎ করেই পুরনো বান্ধবী চলে আসে বা এমন কেউ চলে আসে বা এইরকম বিভিন্ন ধরনের আয়োজন হয়, সেগুলি সংঘটিত হয়। এবং যখন কেউ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে তারা ভক্ত হতে চান, এই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হতে হবে, এই হচ্ছে দুটো মুখ্য সিদ্ধান্ত। এরপর তখন দেবতারা এবং জড়জাগতিক ত্রিগুণাত্মিকা শক্তি বিভিন্ন ধরনের বিকল্প দেবেন জড়জাগতিক জীবনে লিপ্ত হওয়ার জন্য, কিন্তু তখন শ্রীকৃষ্ণ ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলনের সুযোগ দেন, তার বিভিন্ন ভক্তদের মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি হচ্ছে প্রকৃত সিদ্ধান্ত যে আমি কি চাই… আমার জীবনের লক্ষ্য কি? সেটা কি জড়া প্রকৃতির আনন্দ উপভোগ করা? নাকি কৃষ্ণের সেবা করা? এবং যখন আমরা এই দুইয়ের মধ্যে থাকি, তখন সেই সময় আমরা পারিপার্শ্বিক ঠেলা-ধাক্কার মধ্যে থাকি, আমরা সেই সময় এক প্রকার নিরীহ প্রকৃতির থাকি, কখনও আমরা উপভোগ করার চেষ্টা করি, কখনও আমরা মনে করি, “আচ্ছা হয়ত আমি…” যখন আমরা সেই ধরনের সিদ্ধান্তহীন পরিস্থিতিতে থাকি, তখন অবশ্যই তা খুবই কষ্টকর পরিস্থিতি। সেই ব্যক্তি সম্পূর্ণ অজ্ঞানতায় ভরে ওঠে। সেই সময় তারা যতক্ষণ না পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ বেশ আনন্দিত থাকে, এরপর আবার সেই সিদ্ধান্তহীন পরিস্থিতিতে থাকা শুরু করে কিন্তু সম্পূর্ণ অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন কোন ব্যক্তি কেবল এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, “আমি ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করতে চাই। আমি অন্য কোন কিছু শুনতে চাই না, আমি অন্য কোন কিছুর কথা ভাবতে চাই না।” কিছু স্বল্প সময়ের জন্য তা হয়, এমনকি কিছু সমস্যা হয়, তবে তারা কিছু সময়ের জন্য সেই অজ্ঞানতাময় পরিস্থিতিতেই থাকতে চায়। তবে ভক্ত প্রথমে সিদ্ধান্ত না গ্রহণ করলেও, পরে তাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হয় যে তিনি কোন পথে যেতে চান। একবার তুমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে, তখন কৃষ্ণ তোমাকে সাহায্য করেন, কৃষ্ণ তোমাকে তাঁকে স্মরণ করতে বা বিস্মিত হতে বুদ্ধি দেন। তাই, এখানে কোন কর্ম নেই যে এই কর্মের দ্বারা আপনার ভক্ত হওয়া উচিত, আপনি সরাসরি এই জলের মধ্যে আসতে পারেন, কিন্তু পান করবেন কিনা তার যে নির্বাচন সেটা করতে হবে। অন্য কথায় বলতে গেলে, এত পুণ্য কর্ম, পূর্ব জীবনের এত ভালো কর্ম ও এই সবকিছু দিয়ে কেউ প্রবেশ পথে আসতে পারে, কিন্তু সেই মুহূর্তে যদি কেউ মনে করে, আচ্ছা ঠিক আছে না এখন নয়, এখন নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি কোন কিছু অজুহাত আশ্রয় করে, তাহলে আবার সেই সুযোগ কত কত পুণ্য কর্ম সম্পাদনের পর তাকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কেউই বলতে পারে না।
এই মনুষ্য জীবনে আমাদেরকে কদাচিৎ এই সুযোগ দেওয়া হয়। মনুষ্য যোনি, মনুষ্য জন্ম স্বয়ং হচ্ছে এক সুযোগ, কিন্তু এমনকি মনুষ্য জীবনে থাকলেও এমন নয় যে প্রত্যেকের প্রকৃতপক্ষে সেই মনোনয়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার সমান সুযোগ রয়েছে। অনেক মানুষ, বেশিরভাগ মানুষই সেই পথটি নির্বাচন করার দিকে কখনওই এগোতে পারে না। কিন্তু যখন কোন ব্যক্তি আসলে এই পর্যায়ে আসে যে যেখানে সেই নির্বাচনের পথটি তার মনের মধ্যে এক বিকল্প হিসেবে প্রবেশ করে, তার মানে ইতিমধ্যেই সেই ব্যক্তি অনেক অনেক বিরল। সহস্রাধিক লোকের মধ্যে সেই পুরুষ বা নারী হচ্ছে এক অতীব অনন্য ব্যক্তি, কিন্তু এরপর যদি তারা সেই ঝুঁকি না গ্রহণ করে, যা হয়ত তেমন একটা ঝুকি নয়, যদি তারা সেই বিশ্বাস বা উৎসাহ গ্রহণ না করে যেখানে আদপে কোন ঝুঁকি নেই, যদি তারা সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে, তাহলে তারা এগোতে পারবে না এবং তারা একপ্রকার আরো এক জন্ম, আরো এক সময়কাল ধরে এখানেই থাকবে। যদি তারা সামান্য ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলন করে, তাহলে হয়ত এমনকি অনেক জীবন ধরে সেই স্তর বজায় রাখার সুযোগ পাবে। যতক্ষণ না তারা অপরাধ করছে, যতক্ষণ তারা সামান্য ভক্তিমূলক সেবা করছে, ততক্ষণ তারা সেই একই স্তরে থাকতে পারবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, “হ্যাঁ! আমি কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হতে চাই।” এবং সেই পর্যায়ে থেকে আরও এক পদক্ষেপ ফেলে প্রবেশ স্থলে পৌঁছায় এবং এরপর প্রকৃতই আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ করে। যতক্ষণ না সে পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে যে, জড়জাগতিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে লিপ্ত হতে চায় অথবা এর থেকেও খারাপ হচ্ছে একজন ভক্তের প্রতি অপরাধ হয়। দেখুন, অন্যান্য ভক্তরা দরজা দিয়ে প্রবেশ করছেন এবং সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে সে এই চেষ্টায় রত যে, আমার কি ভেতরে প্রবেশ করা উচিত কিনা, আমার কি উচিত? আমার কি কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হওয়া উচিত কিনা? এবং এরপর যখন পাশের ব্যক্তিরা চলে যেতে শুরু করে, তখন কখনও কখনও আমরা ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠি। এই ঈর্ষা হচ্ছে এক ভয়ঙ্কর বিষয়, যেমনটা আমরা আলোচনা করছিলাম। ঈর্ষা ছাড়া তুমি সেই দরজায় দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থেকে চিন্তা করতে পারবে, কিন্তু যখনই অপরাধ হয়, তখনই পরাজয় স্বীকার করতে হয়। বিষয়টি হচ্ছে যে, যখন আমরা সেই পর্যায়ে থাকি, তখন আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত, এতে আমাদের কি হারানোর আছে? তুমি অনেক প্রয়াস করেছ। বিষয়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি তেমন ভিন্ন মনে হয় না, মনে হয় না যে, “আচ্ছা আমি কত কিছু করেছি, কিন্তু যদি একজন ভক্তের যা করার কথা তা আমি দু’মাস ধরে আন্তরিকভাবে করি, দেখি কি হয়!” এবং এমনকি যদি কেউ কেবল সেই সিদ্ধান্ত নেয় যে, আমি পুরোপুরি শরণাগত হব এবং দুইমাস ধরে যদি আমি দেখি যে কোন কিছুই হল না, তাহলে আমি অন্য কিছু করব। মানুষ, একবার আপনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে যে, “ঠিক আছে আমি শরণাগত হব, এমনকি স্বল্প সময়ের জন্য করে যদি আমি সেই নির্দিষ্ট সময়ে কোন ফল না পাই, তবে আমার মনোভাব হচ্ছে আমি পূর্ণ সংকল্পের সাথে শরণাগত হব এবং দেখা যাক কি হয়” কেবল সেই সিদ্ধান্ত নিলে আপনি দেখবেন যে কত কিছু ঘটছে। *তুতুচ* কৃষ্ণ ব্যবস্থাপনা করে দেন। তিনি কাউকে ঊর্ধ্বে উন্নীত হতে নেতৃত্ব দেন। তখন কোন ব্যক্তির আধ্যাত্মিক গুরুর সাথে সাক্ষাৎ হয়, ভক্তদের সাথে সাক্ষাৎ হয়, এইভাবে ব্যক্তির উন্নতির জন্য প্রতি পদক্ষেপে আয়োজন হয়।
এটা কি তোমার প্রশ্ন ছিল? আমার মনে হচ্ছে আরেকটি বিষয় ছিল; আমার মনে হচ্ছে একটি অংশ বাদ দিয়েছি।
ভক্ত: হ্যাঁ… আমার মনে হয় হয়ত এটা সম্ভব যে আপনার কর্ম আপনাকে প্রতিরোধ করতে পারে এই থেকে… কেবল সূক্ষ্মভাবে আপনাকে....
জয়পতাকা স্বামী: এটা হচ্ছে বাস্তব। কোন ব্যক্তির কর্ম তার সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে কঠিন করে তুলতে পারে। যদি কেউ অতিরিক্ত মাত্রায় তম গুণ এবং রজ গুণে থাকে, তাহলে তা তার মনকে ভগবানের প্রতি শরণাগতির শুদ্ধসত্ত্ব স্তরে আনা কঠিন হয়। এইভাবে কর্ম কিছু নির্দিষ্ট মাত্রায় আপনার পথে বলবৎ হতে পারে। এটি কিছুটা কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু এই কারণে আধ্যাত্মিক গুরু, যখন কোন ব্যক্তি কোন না কোনভাবে তার ঘনিষ্ঠ হয়, এমনকি যদিও কর্মের কারণে হয়ত অনেক সমস্যা থাকতে পারে, হয়ত সেই ব্যক্তি আসতে পারে এবং কর্মের কারণে এমনকি তারা হয়ত বেশ কিছু বছর আসতে পারে, এমনকি কোনভাবে ভক্তদেরকেও দেখতে পারে, তারা দেখে যে কি হচ্ছে, তারা সেটি পছন্দ করেন, কিন্তু কোন না কোনভাবে তাদের বাসনা এত বলশালী যে তারা সেই গুণের দ্বারা এত প্রভাবিত যে তাদের প্রকৃত ধারণা হচ্ছে, “আমি তাদের সঙ্গ করতে চাই, আমি তাদের সাথে থাকতে চাই, কিন্তু তাদের একজন হতে গেলে আমাকে আসলে শরণাগত হতে হবে।” তাদের সেই অটল স্থির সংকল্প আসে না। সেইসময় শুদ্ধ ভক্ত, আধ্যাত্মিক গুরুবর্গ, যারা শক্ত্যবিষ্ট, যখন তারা কাউকে এই ধরনের কোন পরিস্থিতিতে দেখেন, তারা কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেন যে, “দয়া করে এই ব্যক্তির উপর আপনার কৃপা করুন।” অথবা বিভিন্নভাবে তারা সেই ব্যক্তিকে সেই কর্ম অতিক্রম করতে সাহায্য করার প্রয়াস করেন। সেই কর্ম এক চরম বাধা নয়, এটা ঠিক এক নিপীড়নমূলক বোঝা বা এমন কিছু যা তাদের টানতে হচ্ছে।
সেই জন্য কখনও কখনও কোনো ব্যক্তির সামান্য অধিক কৃপা দরকার আছে। কখনও কখনও ব্যক্তি তা দেখতে পারে যে সেটি হচ্ছে শুদ্ধ বাতাস গ্রহণ করার মত। ঠিক যেমন অযথার্থ ধারণার উর্ধ্বে উঠলে আপনি দেখতে পারবেন যে এই স্পষ্ট বিশালতা যে আমি কত কর্মের দ্বারা, কত কামনা বাসনার দ্বারা বন্ধন গ্রস্ত এবং তখন আপনি এর এক ঝলক উপলব্ধি করবেন। সেইসময় যদি আপনি আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে, নিতাই গৌরের কাছে, ক্রন্দন করে সাহায্যের প্রার্থনা করেন যে, “সাহায্য করুন! দয়া করে সাহায্য করুন! আমার বিশেষ সাহায্য দরকার। আমি এইসবের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি। আমি এখনও শরণাগত হওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী নই, কিন্তু আমার আপনাদের সাহায্য দরকার।” তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তাঁদের এই আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, তাঁরা সেইসব ব্যক্তিদেরকে সাহায্য করেন, যারা এইরকমভাবে কর্মের মধ্যে বিজড়িত অবস্থায় আছে।
যে সমস্ত ব্যক্তিরা খুবই উন্নত, যারা বলতে গেলে কর্ম শীর্ষে আছে, তারা সত্ত্ব স্থিতিতে আছে। কিন্তু যারা তবুও গর্বিত, তার মনে করে যে, “আচ্ছা যেহেতু আমি বর্তমানে সফলতার সুযোগ পাচ্ছি তাই আমার কাউকে প্রয়োজন নেই, আমি… কৃষ্ণের প্রতি আমি কোনভাবে ঋণী।” শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই সমস্ত ব্যক্তিদের বেশি পরোয়া করেন না, তিনি তাদের উপেক্ষা করেন। কিন্তু যারা সেই কৃপা পেতে চান, এমনকি তারা যদিও অনেক কর্মফলে বিজড়িত, তারা হয়ত অনেক ধনী বা তারা হয়ত খুবই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বা তারা হয়ত তত বেশি সৌভাগ্যবান নয়, কিন্তু কোন না কোনভাবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন ভালো বা মন্দ, তারা কোন এক সময় কেবল ক্রন্দন করে, “দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন! দয়া করে আমাকে আপনার প্রতি শরণাগত হতে সাহায্য করুন!” তারপর তিনি তাদেরকে ঊর্ধ্বে উত্থিত করেন, কখন কখনও কারো সেই ক্রন্দন করার সাহস থাকে না যে — দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। কখনও কখনও কোন ভক্ত নিজে থেকেই দেখেন যে, এই ব্যক্তি ভালো ভক্ত হতে পারতেন, “কৃষ্ণ দয়া করে তাকে সাহায্য করুন।” এইভাবে আধ্যাত্মিক গুরুর কৃপায়, কেবল এসে কিছু সামান্য সেবা করার মাধ্যমে কেউ কৃপা লাভ করতে পারে।
হ্যাঁ। ঠিক আছে, কেউ কি আছেন যিনি কোন প্রশ্ন করেননি?
ভক্ত: একবার আপনি বিষয়টি দেখলে,… (শ্রুতিহীন) কি উপদেশ, আধ্যাত্মিক, আপনি আশা করেন?
জয়পতাকা স্বামী: একটি উপদেশ হচ্ছে কিভাবে আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃতে উন্নতি লাভ করা উচিত। আমাদেরকে বলা হয় যে, আমাদের নিয়ম আগ্রহ পরিহার করা উচিত। নিয়ম মানে শাস্ত্রের নির্দেশ। আগ্রহ হচ্ছে সংস্কৃততে অদ্ভুত উপায়। যখন আপনি এই দুই শব্দাবলীকে যুক্ত করবেন, তখন নিয়ম আগ্রহ বা অগ্রহ হবে। এই নিয়ম আগ্রহ মানে নিয়মনীতির প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হওয়া, অত্যাধিক আগ্রহী হওয়া এবং অগ্রহ মানে নিয়ম-নীতি অবহেলা করা। আগ্রহ মানে গ্রহণ করা এবং অগ্রহ মানে অবহেলা করা। যখন নিয়মনীতি অবহেলা করে, এড়িয়ে চলে যে, “আমি এইসব কোন কিছু গ্রাহ্য করি না।” এটা হচ্ছে একটি দিক। আমরা আলোচনা করছিলাম যে যিনি ধর্মান্ধ, এর মানে হচ্ছে, তিনি এর উদ্দেশ্য না দেখেই সেই নিয়মের প্রতি অত্যাধিক আসক্ত। কখনও কখনও বিভিন্ন ধরনের নিয়ম থাকে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রত্যেক নিয়মের এক আপেক্ষিক গুরুত্ব আছে।
কোন ব্যক্তি হয়ত কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম এর প্রতি আবদ্ধ থাকতে পারে এবং খুব নিপুণভাবে সেইসব নিয়ম পালন করতে পারে। একই সময় তারা আসলে ভগবানের নিকটস্থ হচ্ছে না, তারা ধর্মান্ধভাবে নিয়ম পালন করছে। এমনকি কখনও কখনও তা ভগবানের প্রতি অপরাধমূলক, কারণ অন্যান্য বিষয়গুলি যদি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে স্বইচ্ছায় করে, যেমন কৃপা লাভের কিছু উর্ধ্বতর নীতি আছে যেমন অন্যান্য এতসব নিয়মের মধ্যে মহান ভক্তদের সম্মান করা। ঠিক যেমন একসময় শ্রীল প্রভুপাদ এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে গিয়েছিলেন যে তাকে সেখানে আসতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, কিন্তু সেই ব্যক্তি এই বার্তা দিয়ে পাঠান যে, “আমি পুজো করতে ব্যস্ত আছি, আমি এক্ষুনি এসে আপনাকে অভ্যর্থনা করতে পারছি না। আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে।” তিনি তার পুজো শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করিয়েছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, “সে কনিষ্ঠ স্তরের ভক্ত, সে জানেনা যে যখন আধ্যাত্মিক গুরু আসেন, তখন বিশেষত আপনার তাকে অভ্যর্থনা করার কথা।” এরপর আরেকজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তার পূজা করছিলেন। যখনই তিনি দেখলেন যে, শ্রীল প্রভুপাদ এসেছেন, তিনি সবকিছু রেখে বেরিয়ে এসেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “তুমি তোমার পূজার শেষ করনি।” তিনি বললেন, “কৃষ্ণের সেবা পূজা করার থেকে, তাঁর ভক্তের সেবা পূজা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।” এই ছিল এক পার্থক্য। সেই ব্যক্তি জানতেন যে কি হওয়া উচিত, আর অন্য ব্যক্তি কেবল ধর্মান্ধভাবে তা পালন করছিলেন। সে জানে না যে সে এইসবের মাধ্যমে দিনে কত অপরাধ করছে, কারণ একমাত্র যেভাবে সে উন্নত হতে পারবে তা হচ্ছে কয়েক ভক্তদের কৃপা, এত গর্বিত হওয়ার পরিবর্তে যে আমি আমার কাজ করছি, আমি ইতিমধ্যেই… তারপর সে বাইরে বেরিয়ে আসে যে আমি আমার পুজো সম্পন্ন করেছি, “ও হ্যাঁ! হ্যাঁ! আসুন, আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।” এই সমস্ত মানুষেরা আধ্যাত্মিকতা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে।
Lecture Suggetions
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ