শ্রী নবদ্বীপ ধামের মাহাত্ম্য
বিদুরোহপ্যুদ্ধবাচ্ছ্রত্বা কৃষ্ণস্য পরমাত্মনঃ।
ক্রীড়য়োপাত্তদেহস্য কর্মাণি শ্লাঘিতানি চ ॥ ৩৩ ॥
অনুবাদ: পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের এই জড় জগতে আবির্ভাব এবং তিরোভাব সম্বন্ধে বিদুরও উদ্ধবের কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন, যে বিষয়ের অনুসন্ধান মহর্ষিরা অত্যন্ত অধ্যবসায় সহকারে করে থাকেন।
তাৎপর্য: পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব এবং তিরোধানের বিষয় মহর্ষিদের কাছেও রহস্যজনক। এই শ্লোকে পরমাত্মনঃ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ জীবকে বলা হয় আত্মা, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সাধারণ জীব নন কেননা তিনি হচ্ছেন পরমাত্মা। তবুও একজন মানুষের মতো তাঁর আবির্ভাব এবং এই নশ্বর জগৎ থেকে তাঁর অন্তর্ধান সেই গবেষকদের গবেষণার বিষয়, যাঁরা অত্যন্ত অধ্যবসায় সহকারে এই সমস্ত বিষয়ের গবেষণা করেন। এই প্রকার বিষয়ের গবেষণা অবশ্যই ক্রমবর্ধমান উৎসাহের বিষয়, কেননা সেই বিষয়ে গবেষণা করতে হলে, গবেষকদের ভগবানের অপ্রাকৃত ধামের অনুসন্ধান করতে হয়, যেখানে ভগবান এই জড় জগৎ থেকে তাঁর লীলা সংবরণ করার পর প্রবেশ করেন। কিন্তু মহান ঋষিদেরও জানা নেই যে, এই জড় আকাশের অতীত চিদাকাশ রয়েছে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পার্ষদ পরিবৃত হয়ে নিত্য বিরাজ করেন, আবার একই সময়ে তিনি এই জড় জগতে এক ব্রহ্মাণ্ড থেকে আর এক ব্রহ্মাণ্ডে তাঁর লীলা প্রদর্শন করেন। এই সত্য ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৩৭) প্রতিপন্ন হয়েছে, গোলোক এব নিবসত্যখিলাত্মভূতঃ — “ভগবান তাঁর অচিন্ত্য শক্তির প্রভাবে তাঁর নিত্য ধাম গোলোকে বাস করেন, আবার একই সময়ে তিনি পরমাত্মারূপে সর্বত্র বিরাজ করেন। তিনি তাঁর বিভিন্ন প্রকাশের দ্বারা জড় জগৎ এবং চিৎ জগৎ উভয় স্থানেই বিরাজ করেন।” তাই তাঁর আবির্ভাব ও তিরোভাব একসাথে চলছে, এবং কেউই নিশ্চিতরূপে বলতে পারে না, তাঁর কোনটি আরম্ভ এবং কোনটি শেষ। তাঁর নিত্যলীলার আদি নেই অথবা অন্ত নেই, এবং তথাকথিত গবেষণার কার্যে মূল্যবান সময় নষ্ট না করে, শুদ্ধ ভক্তের কাছ থেকেই কেবল সেই সম্বন্ধে জানতে হয়।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এটা বেশ আকর্ষণীয় যে কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ এই বলে তাৎপর্যটি শুরু করেছেন যে ভগবানের প্রকট এবং অপ্রকটের বিষয়বস্তু হচ্ছে গবেষকদের জন্য, যারা অত্যন্ত ঐকান্তিকতার সাথে গবেষণা কার্য করেন। তিনি এটিও বলেছেন যে, এইসব বিষয়সমূহ হচ্ছে গবেষকদের আগ্রহ বৃদ্ধির জন্য, কারণ গবেষকদের দিব্য ধাম খুঁজে বার করতে হবে যে ভগবান তাঁর লীলা সম্পাদন করার পর কোথায় যান, কিন্তু এই তাৎপর্যের শেষে প্রভুপাদ বলেছেন যে, ভগবানের দিব্য লীলার কোন প্রারম্ভ বা সমাপ্তি নেই। কোন ব্যক্তির তথাকথিত গবেষণা করে মূল্যবান সময় নষ্ট না করে, তা কেবল শুদ্ধ ভক্তদের থেকে জানতে হবে। যে, অন্য কথায় বলতে গেলে, যিনি ভগবান সম্বন্ধে গবেষণা করতে চান, সেই ঐকান্তিক গবেষণার ফল এই হবে যে এই বিষয়বস্তু গবেষণার ঊর্ধ্বে। তাই এই সিদ্ধান্তে আসার জন্য সময় নষ্ট না করে, ভালো হবে শুদ্ধ ভক্তদের থেকে সরাসরি জানা, যাদের কাছে স্বয়ং কৃষ্ণের থেকে এই সম্বন্ধীয় জ্ঞান আছে। তাই সেইসব শুদ্ধ ভক্তদের থেকে জ্ঞান নিতে হবে যাতে কোন সময় নষ্ট ছাড়াই তারা তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে পারে। এটাই হচ্ছে প্রকৃত পদ্ধতি।
অন্য আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে কিভাবে তাঁর লীলা সমূহের কোন প্রারম্ভ বা সমাপ্তি নেই। যখন আমি বললাম যে কেউই প্রকৃতপক্ষে বলতে পারবেন না যে কোন ব্রহ্মাণ্ডে শ্রীকৃষ্ণ প্রথম আসেন বা কোথায় এর শেষ, তখন আমার মনে পড়ছিল, কলকাতার হাওড়াতে একটি বট বৃক্ষ আছে, ঠিক নদীর ধারে, যেখানে তারা দাবি করে যে এটি হচ্ছে সমগ্র বিশ্বের সবথেকে বড় বট বৃক্ষ। এটার ১০,০০০ বা, এমন কিছু অবিশ্বাস্য সংখ্যায় বৃক্ষগুড়ি আছে। আপনারা জানেন যে কিভাবে বটগাছ থেকে অধিশাখা নিচে নামে, আর সেইসব মূল একবার যখন ভূমি স্পর্শ করে, তারাও গুড়ির মত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এইভাবে, এটা এখন এত বিস্তারিত হয়ে গেছে, আমার মনে হয় তা প্রায় আড়াই হেক্টর, যা হচ্ছে বলা যেতে পারে ৬-১০ একর জমি ও এটা পুরো একটাই গাছ। তাই তারা এই অফার দিয়েছিলেন যে, যে ব্যাক্তি এর আদি মূল খুঁজে বার করতে পারবে, তারা তাকে ১০,০০০ টাকা উপহার দেবে। সেখানে হাজার হাজার বৃক্ষগুড়ি আছে, যা হচ্ছে আদি এবং যা… আর অন্যান্যগুলি হচ্ছে মূল, কেবল একটাই মূল হতে পারে, তাই যদি আপনি মূল অংশটা খুঁজে বার করতে পারেন, তাহলে তারা আপনাকে ১০,০০০ বা ২০,০০০, এইরকম কিছু অর্থ দেবে। এমনকি তারা হয়ত সম্প্রতি এটা উত্থাপন করেছিলেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কেউই এটা খুঁজে বার করতে পারেনি যে কোনটি প্রকৃত মূল, অবশ্য যদি আসলটি এখনো সেখানে থেকে থাকে।
একইভাবে এটা আমাকে মনে করিয়েছে যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাসমূহ যেহেতু তা ঘটেই চলেছে, যেহেতু তা নিত্য, নিত্যভাবে সম্পাদিত হচ্ছে, তাই কেউ কিভাবে বলতে পারেন যে প্রকৃত ব্রহ্মাণ্ড কোথায়? কোথায় তার লীলা সমূহের সমাপ্তি হচ্ছে? যেহেতু এগুলি ঘটেই চলেছে। তারা এমনকি বটবৃক্ষের আদি মূল খুঁজে বার করতে পারছে না, আর তারা নাকি খুঁজে বার করবে কৃষ্ণের প্রকৃত লীলা? সেইজন্য, এগুলিকে বলা হয় নিত্য লীলা এবং সেগুলি ক্রমান্বয়ে ঘটে চলেছে। এই মুহূর্তে কৃষ্ণ পুতনাকে হত্যা করছেন, কৃষ্ণ অঘাসুরকে হত্যা করছেন, অঘাসুরকে মুক্তি প্রদান করলেন, এইভাবে সবকিছু, এইসব বিভিন্ন লীলাসমূহ, এক স্থান থেকে আরেক স্থানে এগুলি ঘটে চলেছে। যেমন এক ব্রহ্মাণ্ডে এই লীলাসমূহের প্রারম্ভ হচ্ছে, পরবর্তী ব্রহ্মাণ্ড, আরেকটি ব্রহ্মাণ্ড, সেই ব্রহ্মাণ্ডতে হচ্ছে, এইভাবে আরেকটিতে, সেখানে একটি লীলা সমাপ্ত হচ্ছে। যেমন, এখন এখানে ফিলাডালফিয়াতে হচ্ছে রাত্রি ৮টা বাজে, এরপর আপনি পরবর্তী সময়-অঞ্চলে যান, সেখানে রাত্রি ৭টা বাজে। ধীরে ধীরে এখানে ৯টা বাজবে আর সেখানে ৮টা বাজবে। একইভাবে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাসমূহ ব্রহ্মাণ্ডে ব্রহ্মাণ্ডে হয়েই চলেছে, যেমন কোনটিতে তাঁর বাল্যলীলা সম্পূর্ণ হচ্ছে এবং পৌগণ্ড লীলা শুরু হচ্ছে; আবার পরবর্তী ব্রহ্মাণ্ডে তাঁর জন্ম লীলা থেকে বাল্য লীলার প্রারম্ভ হচ্ছে, এইভাবে এইসব লীলাসমূহ অবিরতভাবে হতেই থাকছে, এক স্থান থেকে অন্যত্র হয়েই চলেছে। আপনি সবসময় তা খুঁজে পাবেন, কিন্তু এমন নয় যে তা পরবর্তী ব্রহ্মাণ্ডেই হতে হবে, সেখানে হয়ত জড় আকাশে অনন্ত সহস্র কোটি, শত কোটি ব্রহ্মাণ্ড আছে, আর সেখানে একস্থান থেকে অন্য স্থানে তাঁর লীলাসমূহ হয়ে চলেছে।
এমন অনেক ব্রহ্মাণ্ড আছে, যেখানে তিনি ওঁনার লীলাসমূহ এমনকি এই জড়জগতে সবসময় প্রকাশিত রাখতে পারেন, যার অর্থ তা ঠিক এই মুহূর্তেও হচ্ছে। এমনকি যদিও কৃষ্ণের লীলাসমূহ এই ব্রহ্মাণ্ডে প্রকাশিত অবস্থায় নেই, কিন্তু আপনি যদি কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন, তাহলে আপনি সেই ব্রহ্মাণ্ডে যাবেন যেখানে এই মুহূর্তে কৃষ্ণের লীলা সম্পাদিত হচ্ছে এবং সেখানে আপনি জন্মগ্রহণ করবেন ও এই জড়জগতে কৃষ্ণের লীলায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, সাধারণত কেউ কিভাবে আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করে, প্রথমে ব্যাক্তি ভগবানের সেই লীলায় অংশগ্রহণ করে, যা এই জড়জগতের কোন এক ব্রহ্মাণ্ডে সম্পাদিত হচ্ছে এবং সেখান থেকে, সেখানে ভগবানের লীলা, যা ভগবান এই জড় জগতে প্রকাশ করছেন তাতে সংযুক্ত হয়ে, তারপর কেউ আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে যান। অবশ্য, ভগবানের লীলা যাই হোক না কেন, সেই মুহূর্তে সেই পরিবেশ পুরোপুরি আধ্যাত্মিক থাকে। সেইসময়, ভক্তের বাস্তবিক অনুভূতিতে আধ্যাত্মিক বা জড়জগতে থাকার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। একইভাবে, আমরা পবিত্র ধামকে মনে করি যে ভগবানের পবিত্র ধামও হচ্ছে দিব্য ভূমি, তা হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগতের বিস্তৃত অংশ বা প্রতিরূপ যা এই জড় জগতে প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত তা এখানে আছে, কিন্তু তা আসলে আধ্যাত্মিক জগতের নিয়ন্ত্রণাধীন, যোগমায়ার নিয়ন্ত্রণাধীন।
ঠিক যেমন শাস্ত্রে এটি বর্ণিত আছে যে, বৃন্দাবন এবং মায়াপুর — এই দুটি হচ্ছে অভিন্ন পবিত্র ধাম। বৃন্দাবন হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ও লীলাস্থলী এবং নবদ্বীপ হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব ও লীলাস্থলী। তাই যা কিছু বৃন্দাবনে আছে, তা আপনি নবদ্বীপে খুঁজে পাবেন। এছাড়াও সকল পবিত্র ধামও এই দুই পবিত্র ধামে প্রকট হয়েছেন।
নবদ্বীপকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই ধামের আয়তন ১৬ ক্রোশ এবং এটির চারিপাশকে কমলের মতো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যদি আপনার কাছে পদ্মের কুঁড়ি থাকে, যখন সেই পদ্মের কুঁড়ি প্রকাশিত হয়, তখন তা পূর্ণ প্রস্ফুটিত কমলের মত প্রকাশিত হয়। এবং খেয়াল করবেন যে, পদ্ম ফুলের মধ্যস্থানে সেখানে পাপড়ি আছে এবং এর অভ্যন্তরে একটি হলুদ অংশ আছে, সাধারণত পুষ্পের সেই আভ্যন্তরীণ অংশকে করোনা বলা হয় এবং বহিঃস্থ অংশকে করল্লা বলা হয়। যতদূর আমি জানি ইংরেজিতে, তারা ইংরেজিতে এটিকে তাই বলে। সংস্কৃততে ভিন্ন নাম আছে পাপড়ি এবং অন্যান্য কিছু। অভ্যন্তরীণ পাপড়ি বিশিষ্ট মধ্যবর্তী স্থান, এটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে নবদ্বীপ ধাম রূপে। এর মধ্যবর্তী অংশ, নবদ্বীপ ধামের মধ্যবর্তী বিস্তৃত অংশ অন্তর্দ্বীপ নামে পরিচিত, অন্তর্দ্বীপ থেকে আট দিকে আটটি পুষ্প পাপড়ি বেরিয়ে আসছে এবং সেগুলি হচ্ছে অন্যান্য নয়টি দ্বীপ। সেই ৯টি দ্বীপ নবদ্বীপ ধামের মধ্যে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী এসেছেন এবং সেই সব নদী ১৬টি ভিন্ন নদীতে উপবিভক্ত হয়েছে, যা বিভিন্ন স্বরূপ যেমন — কাবেরী, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, ইত্যাদি রূপে প্রকাশিত হয়েছে। তাম্রপর্ণী, গোমতী। এইভাবে এই ৯টি দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে। ৯টি দ্বীপ, প্রত্যেকটি একটি ভক্তিমূলক সেবার অঙ্গকে সূচিত করে: শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, প্রণতি জ্ঞাপন এবং প্রার্থনা। বিভিন্ন লীলা… মধ্যবর্তী দ্বীপটি হচ্ছে আত্মনিবেদন বা সম্পূর্ণ শরণাগতির দ্বীপ। নবদ্বীপ ধামের সেই মধ্যবর্তী স্থানের চারিপাশে, সেখানে বৃহৎ আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র আছে যা বৈকুন্ঠ লোকের থেকে অভিন্ন। মধ্যবর্তী অংশটি হচ্ছে ঠিক গোলক বৃন্দাবনের মত এবং এর বহিঃস্থ অংশটি গৌর মন্ডল ভূমি নামে পরিচিত।
“শ্রী গৌর-মণ্ডল-ভূমি, যেবা জানে চিন্তামনি, তার হয় ব্রজ-ভূমে বাস”
শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর বলছেন যে — “যিনি জানেন যে গৌর মণ্ডল ভূমি হচ্ছে চিন্তামণি ধাম, তিনি সর্বদা বৃন্দাবনে বাস করছেন।” তাই গৌর-মন্ডল-ভূমি ও হচ্ছে দিব্য ধামের অংশ এবং এটির আয়তন হচ্ছে ২১ যোজন, আয়তন নয় তবে পরিধি ২১ যোজন বা প্রায় ১৫৮ মাইল, প্রতিযোজন ৮ মাইল। তাই, এইভাবে পবিত্র ধাম বিস্তৃত হয়। সেই স্থান, যা বিভিন্ন শাস্ত্রে বলা আছে যে মায়াপুর এবং বৃন্দাবন হচ্ছে যোগমায়া শক্তির অন্তর্গত, এটা মহামায়া শক্তির অন্তর্গত নয়। যদিও দৃশ্যত, তা মহামায়ার আধিপত্যে অবস্থান করছে, কিন্তু তা বাহ্যিক। প্রকৃতপক্ষে সেইসব স্থানসমূহ আধ্যাত্মিক শক্তির অন্তর্ভুক্ত এবং যিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অথবা ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে তাঁর সম্বন্ধ একজন নিত্য দাস রূপে জানেন, যিনি সেখানে থাকেন, তারা প্রকৃতপক্ষে সেই পবিত্র ধামে বাস করে অসীম দিব্য আনন্দ ও উপলব্ধি প্রাপ্ত হন।
আমরা দুটো উদাহরণ দেই, কখনও একসময়… সম্প্রতি ২ বছর আগে সেখানে এক বড় সংকট হয়েছিল যে, ইরানে পারসীকরা আমেরিকান দূতাবাস জয় করেছিল বা দখল করে নিয়েছিল। সেই সময় আমেরিকা এটি দাবি করছিল যে, এটা হচ্ছে তাদের দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ, কারণ আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুসারে সেই দূতাবাস ইরান দেশের অংশ নয়। রাষ্ট্রপ্রতিনিধির অফিস বা দূতাবাস, সেটা হচ্ছে আমেরিকার অধিরাজ্য। একইভাবে, এখন বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে দূতাবাসকে সরাসরি সেই দেশের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ও সমুদ্রের জাহাজও। তাই, একইভাবে পবিত্র ধাম হচ্ছে এইরকমই সরাসরি আধ্যাত্মিক শক্তির অন্তর্ভুক্ত। এমনকি যদিও এটি জড়জগতে আছে, তবুও এর পরিচালনা এবং দিব্য অস্তিত্ব সবকিছু আধ্যাত্মিক শক্তির অন্তর্গত।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা সমূহও এই পবিত্র ধামে নিত্য হয়ে চলেছে —
“অদ্যাপিহ সেই লীলা করে গোরা রায়,
কোনো কোনো ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।”
(চৈ. ভা. মধ্য ১০.২৮৩)
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা সমূহ অবিরতভাবে হয়েছে চলেছে এবং যারা অত্যন্ত ভাগ্যবান, ভক্তিমূলক সেবার মাধ্যমে, তারা সেইসব লীলাসমূহ এমনকি আজও দর্শন করতে পারেন। এইভাবে, অবশ্য শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, তিনি সেখানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা দর্শন করতে পেরেছিলেন। শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু যখন শ্রীল জীব গোস্বামীকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন তাঁরা সেইসব লীলা দর্শন করেছিলেন। এই লীলা আজও হয়ে চলেছে। আপনি সেই সব লীলা বৃন্দাবন এবং নবদ্বীপে দর্শন করতে পারবেন, যদি আপনি ওঁনাদের অহৈতুকী কৃপা লাভ করতে পারেন তাহলে। কখনও কখনও ভক্তরা তাদের স্বপ্নে তা দর্শন করেন, কখনও কখনও ভক্তরা সমাধিস্থ হয়ে পড়লে, তখন তারা সেই সব লীলা দর্শন করতে পারেন, আবার কখনও কখনও ভক্তরা কেবল তাদের নিজেদের চোখের দ্বারাই পবিত্র ধানের সেই সব দিব্য লীলা দর্শন করতে পারেন। আমরা ভগবানের পবিত্র নাম, ভগবানের পবিত্র ধাম, ভগবানের দিব্য লীলা—নাম-ধাম-লীলা শক্তির অবমূল্যায়ন করতে পারিনা। কেবল সেই সম্বন্ধে সমাধি মগ্ন হলে, সেই সম্বন্ধে চিন্তা করলে, শ্রবণ করলে এবং মহিমা বর্ণনা করলে তাতে এত অসীম শক্তি আছে যে তা বদ্ধ জীবদের পরিশুদ্ধ করতে পারে, কারণ এটা শুরু হয়, যা কেবল আমাদের শ্রীকৃষ্ণের সাথে নিত্য সঙ্গন্ধে আবদ্ধ করে।
এক সময়, শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত সহানুভূতিশীল হয়ে বলেছিলেন যে, “যদি তুমি কৃষ্ণকে ভালবাসতে চাও, তাহলে তাঁর প্রিয়জনদের ভালোবাস।” এই সরল উদাহরণ দিয়েছিলেন যে, তারা বলে পাশ্চাত্যে যে, “যদি তুমি আমাকে ভালবাসতে চাও, তাহলে আমার কুকুরকে ভালোবাসো।” তেমনই, যদি তুমি কৃষ্ণকে ভালবাসতে চাও, তাহলে তোমাকে তাদেরকে ভালোবাসতে হবে যাঁদেরকে কৃষ্ণ ভালোবাসেন। তাঁর নিজের গাভী আছে, তাঁর নিজের সখাগণ আছেন, তাঁর নিজের অভিভাবক আছেন। কখনও কখনও ভারতে আপনারা এই মায়াবাদীদের দেখবেন, তারা বলে, “না! না! আমরা কেবল অবাস্তবিকভাবে কৃষ্ণকে চাই। আমরা এটা গ্রহণ করি না, কৃষ্ণ তাঁর সকল পারিষদগণ সহ—আমরা এটা চাই না।” আমরা কখনই কৃষ্ণকে একা লাভ করতে পারি না, সেটা হচ্ছে মায়াবাদী ধারণা, কৃষ্ণ কখনই একা নন। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর গ্রন্থ লিখনের সময়, যখন তিনি তাঁর চিত্রশিল্পীদের দিয়ে চিত্রাংকন করাতেন, তিনি কখনই শ্রীকৃষ্ণের কোন একা ছবি গ্রহণ করতেন না, সেখানে কোন একজন ভক্ত বা গাভী বা ময়ূর বা হরিণ বা কেউ না কেউ থাকতে হবে। তিনি কখনই একা থাকেন না, তিনি সবসময় অনেক ভক্তদের দ্বারা সংসর্গিত থাকেন। কত পারিষদবৃন্দ — সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্ — ভগবান একা আবির্ভূত হন না, তাই আপনি যদি কৃষ্ণকে ভালবাসতে চান, আপনি ভাবতে পারেন এটা কিভাবে সম্ভব যে, “কৃষ্ণ আমি তোমাকে পছন্দ করি কিন্তু আমি এইসব গাভী ও অন্যান্য এইসব কিছু পছন্দ করি না? আমি এইসব গাভী এবং গোপবালক ও সব গ্রামবাসীদের ছাড়া কেবল তোমাকে চাই। এই সব কিছুই চাই না” অপ্রকৃত দ্বারকাবাসীদের মত। “আমি কেবল তোমাকে চাই।” কেন কৃষ্ণ সেই ব্যক্তির কাছে যাবেন? যদি আপনি কৃষ্ণকে চান, তাহলে আপনাকে হয় তাঁকে বৃন্দাবনবাসীদের সাথে গ্রহণ করতে হবে, অথবা মথুরাবাসীদের সাথে বা দ্বারকাবাসীদের সঙ্গে পেতে হবে। আপনি কোথাও কৃষ্ণকে একা পেতে পারবেন না। এমনকি এটা বেশ অপরাধজনক! কৃষ্ণ মানে লীলা, গুণ, ভক্ত, বাসস্থান সহ কৃষ্ণ — আকাশে কৃষ্ণ নয়।
কোন একটা গান ছিল না, যা এক বিখ্যাত গান ছিল, আকাশে কিছু একটা?
“আই জাস্ট সি দি স্কাই ইন ডার্কনেস”…
হ্যাঁ, সম্ভবত…
(জবাব শ্রুতিহীন)
দলের মধ্যে আছে… (হাসি) এর সম্ভবত অবাস্তবভাবে আধ্যাত্মিকতার কোন কিছুর সাথে এক ধরনের সম্পর্ক আছে। যাইহোক…
শ্রীকৃষ্ণের সকল দিব্য গুণ আছে, কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতে তিনি একা নন। এটা গবেষকেরা কখনই বুঝতে পারবে না। গবেষকেরা তারা কিভাবে এই জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হবে? তারা এমনকি এই ব্যাপারে কল্পনা করতেও পারবে না, সামান্যতম এই ধারণা সমীপবর্তী হতে পারে যে আধ্যাত্মিক জগতে কি বৈচিত্র আছে। যে কেউ অবৈচিত্র কল্পনা করতে পারে, নির্গুণ, নির্বিশেষতত্ত্ব কল্পনা করতে পারে। সেটা হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত – আলোক থেকে অন্ধকারের দিকে, বিশেষ থেকে নির্বিশেষের দিকে। তবে, প্রকৃতপক্ষে, আধ্যাত্মিক জগতের বৈচিত্র্য কি তা বোঝা কোন গবেষক-এর পক্ষে পুরোপুরি অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন। সেই জন্য, কাউকে জ্ঞান প্রাপ্তির অবরোহী পন্থার মাধ্যমে, ঊর্ধ্বতন সূত্র থেকে শ্রবণের মাধ্যমে ও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁদের ব্যাখ্যা যথার্থরূপে গ্রহণের মাধ্যমে তা বুঝতে হবে। অবশ্য, গতকাল আমি কিছু বৈজ্ঞানিক এবং ডাক্তার ও সবার সাথে এটি আলোচনা করছিলাম যে, মানুষেরা প্রতিরোধমূলক ভাব নিয়ে বলে যে, “এটা অবৈজ্ঞানিক।” অবশ্য, তারা বিরুদ্ধে বাক্য বলে যে, “এটা হচ্ছে অযৌক্তিক বা এটা যুক্তির ঊর্ধ্বে; অযৌক্তিক না, তবে যুক্তি এবং অযুক্তি — এইসব সত্য অনুধাবন করা যুক্তির ঊর্ধ্বে।” আপনাকে এটি ব্যাখার দ্বারা গ্রহণ করতে হবে, এটি যুক্তির ঊর্ধ্বে, যেহেতু এটা যুক্তির ঊর্ধ্বে, এর মানে এই নয় যে তা অযৌক্তিক। এর অর্থ এই যে এটা হচ্ছে দিব্য সত্য এবং এর উচ্চতর যুক্তি আছে, যা জড়জগতের কোন দক্ষতার পরিবর্তে বিভিন্ন পদ্ধতির দ্বারা বুঝতে হবে। তাই, প্রকৃতপক্ষে আধ্যাত্মিক জগত কি তা জানতে হলে, এর প্রকৃত উৎস হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ। এবং তিনি এটি এখানে ভাগবতে বর্ণনা করেছেন, তিনি ভাগবতে ব্যাখ্যা করেছেন, অবশ্য বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর প্রকাশ ব্যাসদেবের দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি নিজে ভগবদগীতায় সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করেছেন, ব্রহ্মা ব্রহ্মসংহিতায় তা ব্যাখ্যা করেছেন। এই বিভিন্ন শাস্ত্র গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে শুরু করি, আমরা এটা বুঝতে পারি যে আধ্যাত্মিক জগতের প্রকৃতি কি, তা হচ্ছে চিন্তামণি ধাম! এটি কোন জড় জাগতিক স্থান নয়। তবে, এটি ভগবানের শাশ্বত-জ্ঞান শক্তি দ্বারা নিত্যভাবে প্রকাশিত এবং সেই স্থানে ভগবান তাঁর নিত্য আনন্দপূর্ণ লীলা উপভোগ করেন, যা পূর্ণ জ্ঞানময়। এটি হচ্ছে আমাদের প্রকৃত স্থান, এই হচ্ছে সেই স্থান যেখানে আমরা যেতে চাই। আসলে সব মানুষেরা এই জগতে আনন্দিত হতে চায়, যে স্থানের তারা সন্ধান করছে, সেই প্রকৃত স্থান যা তারা তাদের পরিকল্পনা নিয়োগের মাধ্যমে সৃষ্টি করতে চাইছে, সেটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগত। কিন্তু এই জড় জগতে তারা কৃষ্ণবিহীন আধ্যাত্মিক জগৎ সৃষ্টি করতে যায়। তারা নিত্য জীবন চায়, নিত্য আনন্দ চায়, অসীম আনন্দপুর্ণ কার্যকলাপ চায়, তারা সবকিছু সমন্বিত করতে চায়। তারা আধ্যাত্মিক জগত যেরকম, সেইরকম সবকিছু চায় কেবল কৃষ্ণকে চায় না। তারা চায় না যে সেখানে তাদের উপর পরমেশ্বর ভগবানের থাকা উচিত, যিনি হচ্ছেন চরমে সকল কার্যের উপভোক্তা। সেই জন্য, তারা আধ্যাত্মিক জগত সৃষ্টি করতে পারছে না, কারণ আধ্যাত্মিক জগত শ্রীকৃষ্ণের দিব্য উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল, কিন্তু যদি তারা কেবল শ্রীকৃষ্ণকে গ্রহণ করেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ সেই ব্যক্তি যেখানেই থাকুন, তা আধ্যাত্মিক জগত হয়ে যাবে। তাদের সৃষ্টির সর্ব প্রচেষ্টা, [একটি আধ্যাত্মিক…] কৃষ্ণবিহীন সর্বনিখুঁত জগত সৃষ্টির প্রচেষ্টা কোন সাহায্য করতে পারবে না তবে তা ব্যর্থ হবে এবং সমন্বয়, শান্তি ও আনন্দ এবং তারা যেরকম জগত চায়, তা সৃষ্টির সবথেকে সহজ পথ হচ্ছে কেবল কৃষ্ণকে আনায়ন করা, কারণ তিনি কেবল তাঁর আধ্যাত্মিক জগতেই আসেন। এই কলিযুগে কৃষ্ণকে কিভাবে নিয়ে আসা যাবে? শ্রীকৃষ্ণ কলিযুগে প্রকট হন না। তিনি ত্রিযুগ নামে পরিচিত, তিনি তিনটি যুগে: সত্য, ত্রেতা এবং দ্বাপর যুগে আসেন। তাঁকে কলিযুগে কিভাবে আনা যাবে? সেটা সম্ভব কারণ তিনি নাম-অবতার রূপে আসেন।
নাম চিন্তামণিঃ কৃষ্ণশ্চৈতন্যরসবিগ্রহঃ।
পূর্ণঃ শুদ্ধো নিত্যমুক্তোহভিন্নত্বান্নামনামিনোঃ।।
(চৈ. চ. মধ্য ১৭.১৩৩)
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নামকে নিয়ে আসুন। সেই পবিত্র নাম হচ্ছে নিত্য জ্ঞানময়, পূর্ণ আনন্দময় এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিনয়।
কেবল নাম উচ্চারণের মাধ্যমে:
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
এরপর শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, কলি একবার সেই নাম শোনে এবং এরপরে ভয়ে দৌড়ে পালায়, তৎক্ষণাৎ পবিত্র নামের উপস্থিতির দ্বারা পরাস্ত হয়েকেবল দৌড়ে পালিয়ে যায়।
তাই আমরা এই হরে কৃষ্ণ নাম জপ গ্রহণ করতে পারি। সর্বত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম প্রচারিত হলে কলির পতন হতে বাধ্য হবে এবং আধ্যাত্মিক জগতের আধিপত্য বৃদ্ধি হবে, যা এমনকি এই জড় জগতেও ভক্তদের প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার জন্য যথার্থ পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং তারপর তাদেরকে নিত্য আধ্যাত্মিক জগতে স্থানান্তরিত করবে যেখান থেকে কেউ কখনও ফিরে আসে না — “নাপ্নুবন্তি মহাত্মানঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ” (গীতা ৮.১৫) — একবার সেখানে গেলে কাউকে আর এই জন্ম-মৃত্যু চক্রের জড়জগৎ, জড় অস্তিত্বে ফিরে আসতে হয় না।
কোন প্রশ্ন আছে?
ভক্ত: মহারাজ, ব্রহ্ম সংহিতায় এটি বলা হয়েছে যে শুদ্ধ ভক্তরা সবসময় তাদের হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেন, কিন্তু ষড় গোস্বামীর প্রার্থনায় এটি উল্লেখ করা হয়েছে যে তারা সবসময় ছুটতেন, কৃষ্ণের খোঁজ করতেন যেন তাঁরা তাঁর দর্শন পাননি। তাই, আপাতদৃষ্টিতে আমরা তাদের চেতনার এই দুই পরস্পরবিরোধীভাব কিভাবে বুঝতে পারব?
জয়পতাকা স্বামী: ১১ স্কন্ধে তারা তাৎপর্যের মধ্যে লিখেছেন, তারা পূর্ববর্তী আচার্যগনের মন্তব্য দিয়ে বলেছেন যে, শুদ্ধ ভক্তরা তাদের হৃদয় সর্বদা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করেন, যার মানে হচ্ছে তারা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করার যোগ্য। কিন্তু যেমন ষড় গোস্বামীগণ, তারা সবসময় কৃষ্ণকে দর্শন করার মনোভাবে থাকতেন, তাই সেই বিরহ মনভাবে আসলে তারা কৃষ্ণকে তাঁর ভাবস্বরূপে দর্শন করছিলেন, কিন্তু দিব্য লীলা বর্ধনের জন্য কখনও কখনও শ্রীকৃষ্ণ উপস্থিত থাকেন আর কখনও কখনও তিনি উপস্থিত থাকেন না, তবে শুদ্ধ ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় সম্পূর্ণ নিমগ্ন হওয়ায়, তারা সবসময় শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করার যোগ্য হন, কিন্তু এটা কেবল ওঁনার লীলার বৈচিত্র। এর মানে এই নয় যে … সেই তাৎপর্যে যা বলা হচ্ছে যে যেমন প্রহ্লাদ বা এমন কেউ, তারা সবসময় দর্শনের যোগ্য, কিন্তু লীলার রস বৃদ্ধির জন্য কখনো কখনো তাঁরা দর্শন করতে পারেন, কখনো কখনো আবার তাঁরা দর্শন করতে পারেন না, তবে আসলে তারা সবসময় নাম জপ, সেবা ও অন্যান্যভাবে কৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন। এর মানে এই না… হয়ত এমন কোন কোন ভক্ত আছেন যারা কোন বিরহ ছাড়া সবসময় কৃষ্ণকে দর্শন করেন। এটি এর বিরোধ করেনা যে এমন কোন ভক্ত নেই, যারা কৃষ্ণকে সবসময় দর্শন করতে পারেন বা কৃষ্ণের থেকে সবসময় নির্দেশনা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন আমরা জানি যে, ভক্তরা যারা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শনের যোগ্য, তারা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করতে পারেনা। তাই, এইভাবে তারা এটি ব্যাখ্যা করেছেন।
ভক্ত: শ্রীল আচার্যপাদ, আপনি কি কৃপা করে একটু ব্যাখ্যা করবেন বা অন্তত বলবেন আমাদেরকে নবদ্বীপ ধামের মহিমা সম্বন্ধে?
জয়পতাকা স্বামী: এটি পুনর্উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবদ্দীপ ধাম আধ্যাত্মিক জগত থেকে অভিন্ন। বিষয় হচ্ছে নবদ্বীপ ধামের এক বিশেষ উদ্দেশ্য আছে যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেবল তিন যুগে— সত্য, ত্রেতা এবং দ্বাপর যুগে আবির্ভূত হন তাঁর প্রকৃত বা আধ্যাত্মিক স্বরূপে, পরম পুরুষোত্তম ভগবান রূপে তাঁর প্রকৃত স্বরূপে। কিন্তু কলিযুগে তিনি প্রচ্ছন্ন রূপে, ছন্ন অবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে আসেন, তিনি ভক্তের ভাব গ্রহণ করে অবতীর্ণ হন। তাই বেদে অগণিত স্থানে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু কোন না কোনভাবে, এমনকি যদিও তা বেদের মধ্যে স্পষ্টভাবে আছে, কিন্তু পণ্ডিতেরা আসলে তা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের পূর্বে তুলে ধরেননি। ঠিক যেমন আমরা যখন ভগবদগীতা পড়ি, অন্তত আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং তখন যখন… এমনকি যদিও আমি এটি অনেকবার পড়েছি, তবুও আমি যখন আবার তা পড়ি, আমি তুলে নিয়ে তা পড়ি, তখন সবসময় আমি এমন কোন একটি অনুচ্ছেদ খুঁজে পাই যা মনে হয় যে আমি এইভাবে কখনও বুঝিনি বা এমনকি আমি এর আগে কখনও দেখিনি বা এমন কিছু। বারংবার পড়ার মাধ্যমে আপনার এক নতুন ধরনের সম্যগদর্শন লাভ হয়।
কোন না কোনভাবে অধ্যয়নের মাধ্যমে অনেক কম পণ্ডিতেরা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন, কলিযুগে ভগবানের এক অবতার আবির্ভূত হবেন। যখন তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন, এটি উল্লেখ করা হয়েছে যে তখন মানুষেরা সেই চিন্তা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন না। এর ফলস্বরূপ, যখন চৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তিনি আসলে তাঁর যোগমায়া শক্তির দ্বারা পণ্ডিতদের দৃষ্টিভঙ্গি আচ্ছাদিত রেখেছিলেন, যাতে উনি ভক্তরূপে আবির্ভূত হতে পারেন এবং সেইসব মানুষদের দ্বারা বিরক্ত না হন, তিনি এক অবতার রূপে অধিক প্রচারিত হলে, তাহলে সেটা তাঁর ভক্ত মনোভাব নাশ করত। কিন্তু ভগবান কৃষ্ণ [চৈতন্য], তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে বলেছিলেন, যারা জানতেন যে তিনি কে। তিনি তাঁর অনুসারীদের কাছে প্রকাশ করেছিলেন, যাঁরা তাঁর একজন ভক্তরূপে সেবা করার মনোভাব ভঙ্গ না করার প্রতি যথেষ্ট বিচক্ষণ ছিলেন, এমনকি যদিও তিনি ছিলেন ভগবান। কিন্তু ভগবান তাদেরকে বলেছিলেন যে তাঁর অপ্রকটের পর এই পবিত্র ধামের মহিমা, তাঁর লীলার মহিমা প্রকাশিত হবে, কিন্তু তাঁর লীলা চলাকালীন প্রত্যেকের কাছে তাঁদের তা প্রকাশ করা উচিত নয়। তাহলে এক উৎপাত সৃষ্টি হবে। তিনি রাধারানীর মনোভাবে, একজন ভক্ত মনভাবে ছিলেন, এবং তখন যদি মানুষেরা এসে বলতেন, “আপনি ভগবান।” তাহলে তাঁর লীলায় এক চিত্ত বিক্ষেপ হত। তাই, ভগবান কৃষ্ণ [চৈতন্যের] অপ্রকটের পর এবং নিত্যানন্দ প্রভু… শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর তিরোধানের পর শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু, ষড় গোস্বামীগণ এবং অন্যান্য মহান ভক্তরা তা দেখেছিলেন যে চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাস্থলি এবং তাঁর পবিত্র ধাম মহিমান্বিত হবে।
ভক্তি রত্নাকর এবং অন্যান্য শাস্ত্র গ্রন্থে তারা পবিত্র ধামের কিছু উপলব্ধি প্রদান করেছেন এবং এটি উল্লেখ করা হয়েছে মায়াপুর, নবদ্বীপ হচ্ছে আধ্যাত্মিক জগত এবং ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আসলে সেই সময় তিনি সর্বোচ্চ অবদান রেখেছিলেন, না কেবল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সরাসরি পারিসদদের দ্বারা লিখিত গ্রন্থ থেকে প্রমাণ নিয়ে, [পাশে: প্রবোদানন্দ সরস্বতী, ভক্তি রত্নাকরের লেখক যিনি কিচক্রবর্তী, তারা নবদ্বীপের মহিমা বলেছেন] এর সাথে অবশ্য নরোত্তম দাস ও অন্যান্য পার্ষদবৃন্দ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিষ্যের শীষ্যগণ আছেন, কিন্তু ভক্তিবিনোদ ঠাকুর কেবল তাদের কার্য গ্রহণ করেননি, তবে তিনি নবদ্বীপ মায়াপুর ধাম ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব সম্পর্কে বেদ, উপনিষদ, পুরান, মহাভারত গবেষণা করে অনেক প্রমাণ এবং তথ্যউত্স প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এগুলি বিভিন্ন গ্রন্থে সংকলন করেছিলেন, এদের মধ্যে কিছু কিছু নবদ্বীপ মাহাত্ম্য— নবদ্বীপ ধামের মহিমা নামে পরিচিত এবং তার কিছু ব্যক্তিগত উপলব্ধি সম্বন্ধীয় — নবদ্বীপ ভাব তরঙ্গ, এরপর সংস্কৃত বৈদিক তথ্যসূত্রের সংকলন, যা খুঁজে পাওয়া যায়, সেটিকেও বলা হয় নবদ্বীপ ধামের মহিমা — প্রমাণ বিভাগ। এবং অন্যান্য বিভিন্ন গ্রন্থ, এছাড়া তার পত্রিকা, সংবাদপত্রিকা যেমন তার ছিল সজ্জন-তোষনী, বিভিন্ন কিছু, তার চার-পাঁচটি পত্রিকা ছিল এবং বিষ্ণুপ্রিয়া পত্রিকা ও অন্যান্য পত্রিকার মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক প্রকাশ করেছিলেন, সেখানে তিনি পবিত্র ধামের বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ উল্লেখ করেছিলেন, যেমনটি তিনি গবেষণা করে খুঁজে পাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি নবদ্বীপ ধামের মহিমা বর্ণনা করেছেন, যা বর্তমানে অনুদিত হয়েছে, নবদ্বীপ হচ্ছে এই কলিযুগে এক অনন্য ক্ষেত্র, কারণ কলিযুগে অন্যান্য ধাম তাদের শক্তি হ্রাস করে। মানুষেরা সেখানে যায় এবং সেই সব পবিত্র ধামে তাদের পাপকর্ম ফল স্তুপীকৃত করে। অন্যান্য পবিত্র তীর্থ স্থানসমূহ, ধীরে ধীরে ধামে আগত পতিত জীবদের পরিশুদ্ধ করার প্রভাব হ্রাস করে, যদি না সেখানে কোন মহাত্মা আসেন বা কোন যোগ্য অনুষ্ঠান করা হয়। সেইসব পবিত্র স্থান সেই সব পাপ ফলের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যায়, কিন্তু এর তুলনায় দেখা যায়, কলিযুগের সময়কাল বাড়তে থাকলে নবদ্বীপ ধামের শক্তিও বৃদ্ধি পায় এবং এই কলিযুগে বদ্ধ জীবদের শুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এর শক্তি অপরিমেয়, যা কেবল ক্রমবর্ধনশীল।
ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এই উদাহরণ দিয়েছেন যে, এমনকি যদি আপনি কেবল কৃষ্ণ লীলা অধ্যয়ন করেন, আপনি খুঁজে পাবেন যে অসুরেরা বৃন্দাবনের পবিত্র ধামে কৃষ্ণের কাছে আসে এবং তারা নিহত হয়। কিন্তু যখন নবদ্বীপে অসুরেরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে আসেন, তিনি তাদেরকে শুদ্ধ ভক্তের রূপান্তরিত করেন, তাদেরকে শুদ্ধ ভগবত প্রেম প্রদান করেন। জগাই-মাধাই এসেছিল ও তারা নিত্যানন্দকে আঘাত করেছিল, কিন্তু সবশেষে তারা উদ্ধার হয়েছিল ও হরিনাম করেছিল:
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
চাঁদ কাজী কীর্তন দলের মৃদঙ্গ ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু সবশেষে তাকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্পর্শ করেছিলেন এবং তার হৃদয়ে ভগবত প্রেম প্রবেশ করেছিল। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভাব হচ্ছে সর্ব-করুণাময়। এমনকি অসুরেরাও এসে পবিত্র ধামের প্রতি অপরাধ করেছিল, কিন্তু সবশেষে তারা কৃষ্ণপ্রেম প্রাপ্ত হয়েছিল। তাই সেই সব ভক্তদের আর কি কথা যারা সেখানে যান? ভক্তরা অবশ্যই সর্বোচ্চ আশীর্বাদ প্রাপ্ত হন।
এইভাবে এটি বলা হয়েছে যে, যদি একজন ব্যক্তি বৃন্দাবনে যান এবং অপরাধ করেন, শ্রীশ্রী রাধা-কৃষ্ণ এত সহজে ক্ষমা করেন না। সেইজন্য এটা একটু বিপদজনক যে, পবিত্র ধামে যাওয়া এবং যখন কেউ পবিত্র ধামের প্রতি অপরাধ করে বা পবিত্র গ্রামবাসীদের প্রতি অপরাধ করে, পবিত্র ধামের প্রচারকারীদের প্রতি অপরাধ করে, তাহলে সেই ধাম অপরাধ কারও প্রগতি পথে বাধা হয়। অন্যদিকে, নবদ্বীপে যদি কেউ সেখানে যায় এবং এমনকি কেউ যদি অপরাধ করে, তবুও কোন না কোনভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় কেউ কৃপাপ্রাপ্ত হতে পারে এবং প্রকৃতই অপরাধ থেকে শুদ্ধ হতে পারে। সেই জন্য এটি নির্দেশিত হয়েছে যে, কেউ বৃন্দাবনে যাওয়ার আগে তার প্রথম মায়াপুর নবদ্বীপ ধামে যাওয়া উচিত, যারা পবিত্র তীর্থস্থানে যায় এবং প্রথমে বৃন্দাবন যায়, তারা পিছিয়ে পড়বে। প্রথমে নবদ্দীপ ধামে এলে, পবিত্র নাম জপ এবং কীর্তনের মাধ্যমে কেউ সকল অপরাধ থেকে শুদ্ধ হয় এবং তারপর বৃন্দাবনে যেতে হয়, তখন কেউ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় কৃষ্ণের আরাধনা করতে সক্ষম হবে। আসলে শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করা হচ্ছে শুদ্ধ প্রেমের স্তরে, তা অপরাধহীন হওয়ার কথা। এর পরিবর্তে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি মানুষদের অপরাধ সহ্য করেন এবং তিনি ব্যক্তিদের তাদের অপরাধ থেকে শুদ্ধ করেন। তাই, চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় আমরা কৃষ্ণ, রাধা কৃষ্ণের পূজা করতে পারি। তাঁর কৃপা ব্যতীত, নিতাই গৌরের কৃপা ব্যতীত, রাধাকৃষ্ণের পূজা করা সম্ভব নয়।
সেই জন্য, এমনকি নাম-জপের থেকে, আমরা প্রথমে বলি:
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ
এটি বলার পর, আমরা জপ করি:
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
অবশ্য, এমনকি হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের কৃপা, বিষ্ণু মন্ত্র বা শুদ্ধ রাম মন্ত্রের থেকে অধিক। হরে কৃষ্ণ...
এটি বলা হয়েছে যে —
শ্রী রাম রাম রামেতি রামে রামে মনোরমে
সহস্রনাম তত তুল্যম রাম নাম বর্ণনে
(বিষ্ণু সহস্রনাম)
ভগবান শিব পার্বতী দেবীকে সম্বোধন করছেন, পরম সুন্দরী দেবী, সুন্দর, সুন্দর মুখমণ্ডলের দেবী, যে তিনি রাম রাম রামেতি নাম করেন, তিনি সেই দিব্য শব্দ তরঙ্গের আনন্দ অনুভব করেন এবং তিনবার এই রাম রাম করেন, এক রাম নাম করা হচ্ছে এক সহস্র বিষ্ণু নাম করার সমান।
ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, আপনি যদি তিন সহস্র বার, এক সহস্র বার বিষ্ণু নাম করেন, তাহলে তা কৃষ্ণের এক নামের সমান। প্রভুপাদ বলেছেন, চৈতন্য মহাপ্রভুর নাম করতে, তা কৃষ্ণ নামের থেকে এক সহশ্র গুন শক্তিশালী। তারপর একজন ভক্ত জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তাহলে কেন আমরা কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর নাম করি না?” প্রভুপাদ বলেছিলেন, “কারণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদেরকে হরে কৃষ্ণ নাম করার আদেশ দিয়েছেন।” সেই জন্য আমরা হরে কৃষ্ণ নাম করি। কিন্তু প্রথমে আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর নাম করি। যখন আপনি হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র বলেন, তখন চৈতন্য মহাপ্রভুর নাম করলে তার ফল পান। এটাই হচ্ছে তাঁর নির্দেশ — বদ্ধ জীবদের ভগবান-এর প্রকৃত স্বরূপ কৃষ্ণের আরাধনার দিকে অভিমুখী করা। একইভাবে পবিত্র ধামেরও পরিশুদ্ধিকারী প্রভাব আছে। এমনকি কেবল বাতাসের প্রশ্বাস গ্রহণ করলে, তা অনেক যজ্ঞ করার মতো ফলপ্রদায়ক। সেই ভূমিতে হাঁটলে, প্রত্যেক পদক্ষেপে অশ্বমেধ যজ্ঞ করার থেকে অধিক ফলপ্রদায়ক। মায়াপুরে, ৩দিন সেই পবিত্র ধামে বাস করলে, তা ভারতের অন্যান্য পবিত্র তীর্থস্থানে ১ মাস থাকার সমান এবং আসলে আপনি নবদ্বীপ ধামের শক্তির উপর কোন সীমাবদ্ধতা রাখতে পারবেন না, কারণ সেখানে কেউ শুদ্ধ কৃষ্ণ প্রেম লাভ করতে পারে, যেখানে অন্যান্য স্থানে গেলে সাধারণত আপনি কেবল মুক্তি লাভ করতে পারবেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এমনকি সর্বশ্রেষ্ঠ সপ্ত তীর্থ, ভারতের সপ্ততীর্থ — প্রয়াগ, বদ্রিনাথ, বদ্রি নারায়ণ হচ্ছে বদ্রিনাথ এবং অন্যান্য কিছু স্থান, কেউ যদি সেখানে পূজার্চনা করে, তাহলে তিনি আসলে মুক্তিলাভ করতে পারেন। কাশিতে কেউ নির্বিশেষ মুক্তি লাভ করতে পারে এবং অন্যান্য স্থানে কোন ব্যক্তি আসলে কৃষ্ণকে প্রাপ্ত হতে পারেন, কিন্তু মুক্তি বা বৈকুন্ঠ প্রাপ্তি নির্ভর করে সেইসব স্থানের উপর। তবে, একমাত্র স্থান যেখানে কেউ খুব সহজেই শুদ্ধ কৃষ্ণ প্রেম লাভ করতে পারেন, তা হচ্ছে নবদ্বীপ।
সেইজন্য, নবদ্বীপ ধাম-এর সাথে আমাদের নিত্য সম্বন্ধ উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের পবিত্র ধামের প্রতি সবসময় বিরহ অনুভব করা উচিত। যদি আমরা শারীরিকভাবে সেখানে বাস করতে না পারি, তাহলে সেবার মাধ্যমে, বিরহের মাধ্যমে, আমাদের মনের দ্বারা সেখানে বাস করা উচিত। সেইভাবে যখন কেউ চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্য সংকীর্তন করেন এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে তার নিত্য সম্বন্ধ অনুভব করেন, তখন সেটাও হচ্ছে পবিত্র ধামে বাস করার মত এবং সেইজন্য ভক্তরা ধামের সাথে সেই আধ্যাত্মিক সম্বন্ধ বজায় রাখেন যে — সেটা হচ্ছে আমার প্রকৃত বাসস্থান, সেটা আমার প্রকৃত আবাসস্থলী। যেই স্থানই হোক না কেন, আমি কেবল সেখানে আসা একজন ব্যক্তি, আসলে আমি নবদ্বীপ-বৃন্দাবনধামের বসবাসী, তবে আমি কেবল এখানে প্রচারের প্রতিনিধিত্বের জন্য আছি। এইভাবে কেউ সেই সম্বন্ধ বজায় রাখতে পারেন এবং তখন সেই ব্যক্তি আসলে জড় জগতে বাস করেন না, সবসময় আধ্যাত্মিক জগতে থাকেন। হরে কৃষ্ণ! জয়!
হ্যাঁ?
ভক্ত: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কী জড়জগতে কৃষ্ণলীলার ঠিক পরেই সবসময় অবতীর্ণ হন?
জয়পতাকা স্বামী: তিনি অন্যকোন সময় অবতীর্ণ হন না।
ভক্ত: প্রত্যেক সময় কৃষ্ণ অবতীর্ণ হলে তারপরে চৈতন্য মহাপ্রভুও অবতীর্ণ হন?
জয়পতাকা স্বামী: হম। আমি জানি যে চৈতন্য মহাপ্রভু কেবল শ্রীকৃষ্ণের পরবর্তীতে আবির্ভূত হন কিন্তু আমি নিশ্চিতরূপে জানিনা যে তিনি প্রত্যেকবার শ্রীকৃষ্ণের আসার পরে অবতীর্ণ হন নাকি। এই ব্যাপারে নিশ্চিত নই। আমি শুনেছি যে, বিপ্রতীপ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আগমন শ্রীকৃষ্ণের আগমনের থেকেও অধিক বিরল, কিন্তু আমি আসলে এটা কোথাও দেখিনি বা সরাসরি শ্রীল প্রভুপাদের থেকে শুনিনি। ব্যতিক্রম, আমি শুনেছি সরাসরি তিনি কেবল শ্রীকৃষ্ণের পরবর্তীতে আসেন, কিন্তু আপনারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখতে পারবেন এখন যদি তিনি কোন ভক্তের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন, কিন্তু প্রকাশিতভাবে, প্রত্যেকেই তাঁকে দেখতে পান, কেবল যখন তিনি শ্রীকৃষ্ণের পরবর্তীতে আসেন।
ভক্ত: যেহেতু আমরা ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুসারী ও একইসাথে আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরও পূজা করি, তাই যখন আমরা আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে যাব, তখন আমরা কোথায় যাব? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর তাঁর নিজস্ব ধাম আছে এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরও তাঁর নিজের ধাম আছে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তগণ কোথায় যান বা যারা শ্রীকৃষ্ণেরও পূজা করেন, তারা যখন ফিরে যান, তখন ভগবদ্ধামে কোথায় যান?
জয়পতাকা স্বামী: আমি এটিকে অন্যভাবে বলব, কারণ সেই ভাবে উত্তর দেওয়া খুব সহজ। দেখুন, আধ্যাত্মিক জগত গোলক বৃন্দাবনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বৃন্দাবনের মধ্যে তাঁর নিজস্ব বিভাগ আছে, যেখানে তিনি তাঁর পারিষদবর্গ সহ থাকেন। এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পারিষদবৃন্দ, অবশ্য মাতা বা অন্যান্যদের বাদ দিলে সাধারণত তাদের পুরুষ স্বরূপ আছে। সেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পার্ষদবৃন্দ, অবশ্য তাঁর গোপসখাদের বাদে, আমি বলতে চাইছি সাধারণত তাঁরা স্ত্রী স্বরূপে আছেন, যেমন গোপিগন ও অন্যান্যরা, সেখানে অনেক গোপীগণ আছেন। তাই, আধ্যাত্মিক জগতে যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্ত, তারা যুগপৎভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে লীলায় তাদের নিজস্ব স্বরূপ লাভ করেন এবং যারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত, তারাও কৃষ্ণের সাথে লীলায় তাদের নিজস্ব স্বরূপ লাভ করেন। তাঁদের উভয় ক্ষেত্রেই সম্বন্ধ আছে, যেমন হয়ত সেখানে এমন কেউ আছে যার কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে সম্বন্ধ আছে, যদিও তা অত্যন্ত বিরল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের উভয়ের সাথেই সম্বন্ধ আছে কারণ এটাই হচ্ছে চৈতন্য মহাপ্রভুর মনোভাব। সেই জন্য তারা যুগপৎভাবে শ্রীকৃষ্ণের সাথে এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাথে তাদের নিজ নিজ স্বরূপ লাভ করবে।
কিন্তু আমি একজন পণ্ডিতের সঙ্গে কথা বলছিলাম এবং আমরা হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিলাম ও আমরা জিজ্ঞেস করছিলাম যে — কেন তারা, এটা ছিল গৌর গম্ভীরা মঠ, হিমাঙ্গ শাস্ত্রী, তিনি গৌর-গোপাল সম্প্রদায়ভুক্ত প্রধান পূজারী। তিনি বলছিলেন যে, তারা “শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রী রাধে গোবিন্দ” নাম করে। আমরা আলোচনা করছিলাম, “কেন তারা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কে কেটে দিয়ে খণ্ডনাম সৃষ্টি করেছে এবং তাদের নিজেদের মন্ত্র জপ করে, যার কথা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রকৃত শাস্ত্রগ্রন্থ বা অন্য কোন শাস্ত্রে প্রমাণ নেই?” এটা ছিল দীর্ঘ ৪ ঘন্টা ধরে আলোচনা। এক প্রবল যুদ্ধ, কিন্তু যদিও আমি তেমন কোন মহান পণ্ডিত নই, তবুও শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন, আর আমরা কোন না কোনভাবে তার যুক্তি প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এছাড়া, তার কৌশল ছিল যে, আমার মনে হয় এটা পণ্ডিতদের সাধারণ কৌশল, কোন ঠাসা হয়ে পড়লেই তিনি কথার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে দিতেন। (হাসি)
ঠিক যেমন, তিনি এই দিয়ে বলা শুরু করলেন যে, “দেখুন আপনি বলছেন হরে কৃষ্ণ হচ্ছে সর্বোচ্চ কিন্তু হরিদাস হরে কৃষ্ণ জপ করতেন, তবে হরিদাস ঠাকুর তিনি পুরো জীবন ‘হরে কৃষ্ণ’ নাম জপ করেছেন, কিন্তু তিনি যখন শরীর ত্যাগ করলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে, আমি শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য বলে আমার শরীর ত্যাগ করতে চাই। এইজন্য তিনি এটি প্রমাণ করেছেন যে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ট নাম।” এটা ছিল তার প্রথম কথা।
তারপর আমরা বললাম, “হ্যাঁ! ঠিক আছে, তাহলে আপনি কেন কেবল শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য নাম করছেন না?” কেন আপনি হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রী রাধে গোবিন্দ যুক্ত করেছেন?”
তখন তিনি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করেন এবং বলেন, (হাসি) তিনি বললেন, “যেহেতু আধ্যাত্মিক জগতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তরা বৃন্দাবনবাসীরূপে তাদের আধ্যাত্মিক স্বরূপ লাভ করে থাকেন এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুসারীরা তারা তাদের আধ্যাত্মিক স্বরূপ লাভ করে থাকেন, তবে এই জড় জগতে সিংহাসনে একই সাথে আমাদের রাধা গোবিন্দ আছে এবং কখনো কখনো আমাদের চৈতন্য মহাপ্রভু আছেন, তাই যখন আপনি ধান মগ্ন হন ও শ্রীবিগ্রহের অর্চন করেন, অবশ্য এই মুহূর্তে আপনি কেবল এটুকুই করতে পারেন, আমরা হচ্ছি সীমিত, আমরা আমাদের প্রকৃত সিদ্ধ দেহ লাভ করিনি যে আমাদের বিভিন্ন স্বরূপ থাকবে, তাই এক জড়জাগতিক চেতনায় থেকে এবং পূজা-অর্চনা করার ক্ষেত্রে আপনি কি করে করবেন? আপনি কি করে যুগপৎভাবে কৃষ্ণের সাথে আপনার প্রকৃত স্বরূপে থাকবেন, স্ত্রী স্বরূপে বলা যাক মাধুর্য রূপে থাকবেন? আবার চৈতন্য মহাপ্রভুর সাথেও লীলায় থাকবেন? তাহলে আপনি কিভাবে সেবা পূজা করবেন? কিভাবে করবেন? কার করবেন? এইভাবে তিনি ঝাঁপ দিয়ে বিষয় পরিবর্তন করে এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন আপনি কিভাবে উত্তর দেবেন? (ভক্তরা বলছেন, “ফাঁদে আটকে গেছি” মহারাজ হাসছেন)
যখন আপনি ভারতে প্রচার করেন, তখন এই সমস্ত বিষয় উঠে আসে। আপনাকে…
প্রথমে আমাদেরকে জপ করতে হবে —
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
না, কিন্তু আপনি যখন পূজা করবেন, তখন আপনার ধ্যানস্ত হওয়ার কথা, যেমন যদি আপনি অর্চন করেন তাহলে আপনার আধ্যাত্মিক স্বরূপের ধ্যান করা উচিত এবং সেইভাবে পূজা সম্পাদন করা উচিত, তখন আপনি তা কিভাবে করবেন? আপনি প্রথমে কার পূজা করবেন? আপনি তা কিভাবে করবেন?
ভক্ত: প্রথমে আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর পূজা করি।
জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ! এই হচ্ছে বিষয়, কিন্তু তিনি বলেননি যে আপনি প্রথমে কার পূজা করবেন? আমি শুধু আপনাদের একটি ইঙ্গিত দিলাম। বিষয় হচ্ছে, প্রথমে আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর পূজা করি এবং সেটাই আমাদের করতে হবে। আপনারা জানেন, অবশ্যই আমরা যুগপৎভাবে উভয় করতে পারব না, কারণ আমরা এই চেতনায় সীমিত এবং তাই আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পূজা প্রথমে করি তারপর আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা করি, তারপর সেইভাবে আমরা ধ্যানমগ্ন হই।
যাই হোক এই সমস্ত ব্যক্তিরা সত্যিই কুশল। এইসব বিষয়ে উঠে আসে, কিন্তু আপনারা দেখবেন যে কিভাবে তারা এইসব কিছুর হেরফের করে তবে তারাই আসলে কোনো না কোনোভাবে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের সেবা মনোভাব গড়ে তোলা সত্যিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সবকিছু প্রকাশিত হয়, অবশ্য আমরা তাদের জানি এবং আমাদের তাদের সম্বন্ধে জানা উচিত, আর আপনার প্রচার ক্ষেত্রের উপর নির্ভর করে আপনাকে কম বেশি তাদের সম্বন্ধে জানতে হবে। আপনার কিছু না কিছু তাদের সম্পর্কে জানা উচিত এবং তা আমাদের জানার জন্য আছে। বিষয় হচ্ছে যেমন কিছু নির্দিষ্ট… এই তত্ত্ব… তারা কেবল সব সময় এইসব বিষয়ে জল্পনা কল্পনা করে, কিন্তু চরম ব্যাপারটি হচ্ছে তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যেমন তারা মন্ত্র গ্রহণ করে ও তা ভেঙে ফেলে এবং এরপর আমরা তিন ঘন্টা ধরে এইসব উচ্চ তত্ত্বের উপর আলোচনা করার পর তিনি বলছেন, “এটা স্বপ্রচারের জন্য বেশ ভালো।” আমি বলতে চাইছি, এমন কিছু ব্যক্তিরা আছেন যারা চৈতন্য মহাপ্রভুকে জানেন না, তারা রাধাগোবিন্দকে জানেন, যেমন— রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি। সেইজন্য আমরা রাধা-গোবিন্দকে শেষে রেখেছি, কিন্তু যেহেতু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যে ‘হরে কৃষ্ণ’, আবার অনেক রাম ভক্ত আছে অযোধ্যা এবং উত্তর প্রদেশ ও দক্ষিণে, তাই ‘হরে রাম’ (ভক্তরা হাসছেন) এইভাবে, সবার জন্য একটু একটু কিছু গ্রহণ করা হয়েছে (ভক্তরা আবার হাসছেন) সেই সময় আমরা জানতাম যে, পুসসসস… (সম্পূর্ণ চূর্ণ করে দেওয়ার মতো আওয়াজ করলেন) তাকে পুরোপুরি পরাস্ত করা হল, তিনি স্বপ্রচারের জন্য কিভাবে পবিত্র নামকে বিভক্ত করতে পারেন? এটা সম্পূর্ণ অননুমোদিত। যাইহোক, অবশেষে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, “হ্যাঁ! আপনারা হরে কৃষ্ণ নাম করছেন, আমরা বছরে একবার করি — এটা প্রামানিক। আমরা সমগ্র বিশ্বে শ্রীল প্রভুপাদের প্রচারের প্রশংসা করি। আসলে কোন না কোনভাবে আমাদের সম্প্রদায়ের কোন একজন গরু এই নাম জপ করা শুরু করেছিলেন এবং এখন আমরা এর মত এক প্রকার আটকে পড়েছি কিন্তু আমরাও হরে কৃষ্ণ নাম করি। দেখুন অন্যান্য দল হচ্ছে মেকি, তারা হরে কৃষ্ণদের সাথে সহমত প্রকাশ করে না। কিন্তু আমরা এই সহমত জানাই যে হরে কৃষ্ণই হচ্ছে প্রকৃত নাম। এটাই হচ্ছে ঠিক।” তাই সবশেষে, তিনি একপ্রকার এই দাবি পরিত্যাগ করেছিলেন, সেই সময় আমরা উপলব্ধি করলাম যে যাই হোক না কেন আমাদের আর তার সাথে এই ব্যাপারের মধ্যে বেশি প্রবেশ করা ঠিক নয়।
তাই ভারতে আমাদেরকে অনেক কঠিনতার এবং বিভিন্ন ব্যক্তিদের সম্মুখীন হতে হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ, হয়ত কেউ কেউ আন্তরিক, তারা নিয়ম পালন করে। তারা আসলে প্রভুপাদের প্রশংসা করে, তারা আমাদেরকে পুরীতে কিছু মন্দির দিয়েছেন যদি আমরা সেগুলির দায়িত্বভার গ্রহণ করতে চাই। তাই তারা হচ্ছে, সেই সব দল হচ্ছে আসলে আমাদের অনুকূল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারাও এই ব্যাপারে আপোষ করেছেন যে — স্বপ্রচার করে মানুষদের কাছে যাওয়ার জন্য পবিত্র নামের পরিবর্তন করেছে। কিন্তু, আপনি যদি এইসব পণ্ডিতদের দেখতে পান, দেখবেন তারা এইসব বিষয়ে এত গভীরে চলে যায় কিন্তু সর্বোচ্চ বিষয় যে কেবল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নিয়ম অনুসরণ করার প্রতি বাস্তবিকভাবে দৃঢ় থাকা, সেই ব্যাপারটি যেমন তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। কোন না কোনভাবে পুরো পরম্পরায় তারা কেবল প্রচারের কারণে বা কোন উদ্দেশ্যবশত এটির সাথে আপোষ করে আসছে।
শ্রীল প্রভুপাদ তিনি ভগবদগীতা যথাযথ দিয়েছেন, তিনি প্রকৃত পন্থা যথার্থ রূপে দিয়েছেন, তিনি সময়ের পরিবর্তনের সাথে মানানসই হওয়ার জন্য এটির পরিবর্তন করেননি। সেই জন্য এখানে প্রকৃত শক্তি আছে। তাই এটা পাশ্চাত্যে, পূর্বভাগে, সুদূর পূর্বে, দক্ষিণ পূর্বে বা আফ্রিকার জঙ্গলে — যেখানেই অনুশীলন করা হোক না কেন, তার তৎক্ষণাৎ প্রভাব লক্ষণীয়। কেউ যখন এই মন্ত্র জপ করেন:
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
তারা কোনো অপরাধ ছাড়াই তৎক্ষণাৎ দিব্য ফল লাভ করছেন।
তাই, শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত দয়ালু যে তিনি আমাদেরকে এইসব জ্ঞান দিয়েছেন, সবকিছুই সেখানে আছে, এই সব কিছু আসলে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থে আছে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা ও এছাড়াও চৈতন্য চরিতামৃত আছে এবং বিশেষত ভারতে তিনি এইসব বিষয়গুলি তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন প্রদানের সময়ও আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু তিনি যেই মূল বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন, তা হচ্ছে আসলে নিজেদেরকে সংকীর্তনের মনোভাবে নিমগ্ন করা, সেবা মনোভাব গড়ে তোলা যা আসলে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার জন্য তত্ত্বগতভাবে এইসব বিষয় অনুধাবনের থেকেও অধিক প্রয়োজনীয়। কারণ আমরা যখন আমাদের সেবা মনোবৃত্তি গড়ে তুলি এবং পূর্ববর্তী আচার্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করার মনোভাব রাখি ও সেবা করি, তখন এগুলি হচ্ছে উপলব্ধি এবং এই উপলব্ধ জ্ঞান হচ্ছে তত্ত্বগত জ্ঞানের থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তত্ত্বগত জ্ঞান থাকলেও কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু উপলব্ধ জ্ঞান হচ্ছে এক চিরন্তন সম্পদ।
আপনি কি আরও বলতে চান? আপনি কি একটু বিশ্রাম নিতে চান?
আর একটা প্রশ্ন?
ভক্ত: নির্বিশেষ বাদ… এটা কি এক ধরনের কৃষ্ণের সেবা থেকে বিচ্যুত হওয়া? আপনি প্রবচনের প্রথমে বলছিলেন যে তারা ভগবানের রাজ্য চায় কিন্তু ভগবান বা কৃষ্ণ কে চায় না।
জয়পতাকা স্বামী: যারা ভগবান ছাড়া ভগবানের রাজ্য চায়, তারা নির্বিশেষবাদীদের থেকে ভালো, কারণ দেখুন নির্বিশেষবাদীরা তারা এমনকি ভগবান ছাড়া ভগবানের রাজ্যও চায় না। যে সমস্ত মানুষেরা ভগবান ছাড়া ভগবানের রাজ্য চায়, তারা হচ্ছে জড়জাগতিক ব্যক্তি, তারা জড়জগৎ চায়, তারা এটি উপভোগ করতে চায়, কিন্তু তারা ভগবানকে চায় না। এমনকি দেবতারা, আমি বলতে চাইছি, তারা কৃষ্ণকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু যেমন মুদ্রার দুটি দিক আছে — একদিকে এই জরজাগতিক ব্যক্তিরা আছে, যারা জড়জগৎ চায় এবং ভগবান ছাড়াই তা উপভোগ করতে চায়, তারা একভাবে তা দখল করতে চায়, নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপভোগ করতে চায়। তাই, তারা এইভাবে আসে যে কেউ কেউ দেবতা হয় যারা হচ্ছে ভগবানের প্রতি অনুকূল ভাবাপণ্য এবং কেউ কেউ অসুর হয় যারা ভগবানের প্রতি সম্পূর্ণ অপরাধমূলক। এবং একভাবে, তারা চায় নিজেরা… তারা ভাবে যে তারা হচ্ছে ভগবান। এমনকি ভগবান ছাড়া কথাটি বলতে গেলে, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেবতাদেরকেই ইঙ্গিত করে কারণ ভগবান ছাড়া কথাটি বলার মাধ্যমে আমরা ইঙ্গিত করছি যে ভগবান আছেন, কিন্তু নির্বিশেষবাদীরা তারা এমনকি প্রকৃতপক্ষে এটিও গ্রহণ করে না যে কোন পরমেশ্বর ভগবান আছেন। তারা বলে যে সবকিছুই নির্বিশেষ। নির্বিশেষবাদী হওয়ায়, পরমেশ্বর ভগবানের ধারণাই আসে না। তারাভাবে যে প্রত্যেক জীবাত্মাই হচ্ছে অন্য জীবাত্মার মতো পরমেশ্বর এবং ভগবানের স্বরূপ সহ, সেই রকম যে কোন স্বরূপই হচ্ছে ভ্রম। সেই জন্য তারা হচ্ছে চরম অপরাধী, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, “মায়াবাদী কৃষ্ণে অপরাধী” (চৈ. চ. মধ্য ১৭.১২৯) তারা কৃষ্ণের প্রতি অপরাধী।
নিশ্চিতভাবে, মায়াবাদীরা কৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত অপরাধমূলক, যারা শুদ্ধ অদ্বৈত তারা, না কেবল শুদ্ধ অদ্বৈত … শুদ্ধ অদ্বৈত… আমরা শুদ্ধ অদ্বৈতকে অদ্বৈত বলি না, কেবল অদ্বৈত — যারা এটা বিশ্বাস করে যে কেবল এককত্ব আছে, আর কিছু নেই। কোন বিভিন্নতা নেই, বিভিন্নতা হচ্ছে ভ্রম। বিভিন্নতা কিভাবে এসেছে, তারা এই উত্তর কখনও দেয় না। কিন্তু যাইহোক, যে সমস্ত ব্যক্তিরা কেবল মায়াবাদী, কেবল নির্বিশেষবাদী, তারা কৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত অপরাধী এবং তারা এই বাসনা না করেই ব্রহ্মজ্যোতিতে এক হয়ে যায়। অসুরেরা যাদেরকে কৃষ্ণ হত্যা করেন, তারা সেটি লাভ করে। কেউ কেউ এমনকি এর থেকেও অধিক কিছু লাভ করে, কিন্তু তারা অন্তত ব্রহ্মজ্যোতিতে মিলিয়ে যায়। কৃষ্ণের দ্বারা নিহত হওয়ার জন্য যদি আপনি ব্রহ্মজ্যোতিতে মিলিয়ে যান এবং নির্বিশেষ উপলব্ধি প্রাপ্ত হন, তাহলে তাতে এত মহৎ কি আছে? এমনকি অসুরেরাও এই গতি প্রাপ্ত হয়, এর মানে এইসব নির্বিশেষবাদীরা অসুরদের মত একই স্তরের।
সেইজন্য, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তিনি আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন, “তাদের কথা শুনবে না” কারণ আপনি যদি তাদের দর্শন বোঝেন, তাহলে আপনি কৃষ্ণের প্রতি আপনার প্রকৃত উপলব্ধি বিনষ্ট করে ফেলবেন, কারণ তারা হচ্ছে অপরাধী এবং যদি আমরা কৃষ্ণের বিরুদ্ধে অপরাধ শ্রবণ করি, তাহলে তা আমাদের ভক্তিমূলক সম্পদ দূরে সরিয়ে দেবে। এইজন্য, আমাদের সবসময় কৃষ্ণের প্রতি অপরাধ শ্রবণ করা এড়িয়ে চলা উচিত, আর তাদের প্রচার হচ্ছে অপরাধমূলক। তাদের প্রচারের পদ্ধতি হচ্ছে কৃষ্ণের প্রতি অপরাধ করা। রামানুজাচার্য, তিনি এত দুঃখিত হয়েছিলেন যখন তিনি শুনলেন এইসব শিক্ষা যে, তারা কৃষ্ণের সাথে তুলনা করছে… কৃষ্ণ হচ্ছেন এক বানর বা এইরকম কিছু… তারা বলেছিল বানরের পশ্চাদদেশ এবং তারা কিছু উদাহরণ দিয়েছিল। এবং রামানুজাচার্য… [পাশে: তিনি কি রামানুজাচার্য নাকি মাধ্বা? তাঁদের মধ্যে কেউ একজন] তিনি সেই উদাহরণ শ্রবন করা মাত্র ক্রন্দন করছিলেন এবং তারা পরবর্তীতে, তারা সেই ব্যক্তিকে পরাস্ত করেছিলেন যে, “আপনি কিভাবে এসব কিছু বলতে পারেন?” তারা সংস্কৃত শব্দ নিয়ে তা বিকটভাবে ভাগ করত, যাতে তারা অপরাধজনক মানে বের করে বিষ্ণু অবতারের ব্যাখ্যা করতে পারে। তারা নিন্দা করার চেষ্টা করত যে তাঁদের অস্তিত্ব নেই বা এগুলি হচ্ছে কল্পনা মাত্র বা এইরকম কোন কিছু। এটা এত অপরাধমূলক। যখন মহান আচার্যরা এই সবকিছু শ্রবণ করতেন, তারা এত দুঃখিত হয়ে যেতেন যে তারা ভগবানের বিরহে ক্রন্দন করতে শুরু করতেন এবং এই সবকিছু অপরাধমূলক বিষয়ে শ্রবণ করে ক্রোধান্বিত হতেন। এইভাবে, আমাদের কখনো এই নির্বিশেষবাদীদের থেকে শ্রবণ করা উচিত নয় এবং তারা মানুষদেরকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করতে নিপুণ।
একজন ছিল চিনময়ানন্দ। সে বলছিল, “হ্যাঁ! হরে কৃষ্ণ খুবই শক্তিশালী জপ।” সে বলছিল, “কিন্তু কেউই জানে না এর শক্তির রহস্য। এটা নাম নয় — কৃষ্ণ রাম হরে — এটাই হচ্ছে শক্তি, নাম গুলোর মধ্যে কিছুটা শূন্যস্থান আছে, শক্তি হচ্ছে সেই শূন্যের মধ্যে আছে।” (হাসি) আপনি কৃষ্ণের প্রতি অপরাধ ছাড়া তাদের কোন প্রবচন শুনতে পারবেন না এবং বিভিন্নভাবে তাঁকে পাদপ্রহার করে। তাদের পুরো বিষয়… তারা হচ্ছে সম্পূর্ণ কৃষ্ণ বিরুদ্ধ, পরমেশ্বর ভগবান বিরুদ্ধ। সেইজন্য, কোন ব্যক্তির তাদের পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত, পূর্ণস্বতন্ত্রতা সহ পরিহার করা উচিত। যতক্ষণ না কেউ তাদেরকে পরাস্ত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, ততক্ষণ তাদের এড়িয়ে চলা উচিত। কখনো কখনো, ভারতীয়রা, “যাই আমি শ্রবন করি, আমি কেবল সাধুর থেকে শ্রবণ করতে চাই, তাই আমি যাব ও শ্রবণ করবো।” এবং তারা যায় ও এতই বিভ্রান্ত হয়ে যায় যে তারা আর কৃষ্ণের প্রতি তাদের মনস্থির করতে পারে না।
রাজনিশের তার নিজের মায়াবাদী তত্ত্ব আছে, তাও একই। একজন আজীবন সদস্য আমাকে বিমানবন্দর থেকে মনিপুর বা এরকম কোন এক জায়গায় গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তখন তাদের সেখানে রাজনীশের এক টেপ রেকর্ডার ছিল এবং তারা তা চালিয়েছিল। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, সে ব্যাখ্যা করছিল, কিভাবে আপনি আধ্যাত্মিক প্রগতি করার চেষ্টা করছেন, তাতে আপনি উপরে এগিয়ে যাচ্ছেন, আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন এবং আপনি জড়জগৎ থেকে আধ্যাত্মিক জগতের দিকে যাচ্ছেন, কিন্তু যখন আপনি অর্ধেক পথ অতিক্রম করেন, তখন কিছু আসক্তি আপনাকে সেখানে আটকে দেয় এবং তখন আর আপনার যথেষ্ট ক্ষমতা থাকে না সেখানে যাওয়ার এবং তখন আপনি আবদ্ধ অবস্থায় ভাসতে থাকেন এবং আপনি তখন জড়জগতে নেই, আপনি আধ্যাত্মিক জগতেও নেই, আপনি হারিয়ে গেছেন, আপনি হারিয়ে গেছেন... হারিয়ে গেছেন... হারিয়ে গেছেন… তখন কি করা যাবে? তখন আমি আসি। (ভক্তগণ এবং মহারাজ হাসছেন) আমি ডুবি, আমি দৃঢ়ভাবে আপনাকে জড়জগতে ফিরিয়ে আনি (হাসি) সে সেটা উপস্থাপন করছিল, তার বিভিন্ন ধরনের গলার স্বর বা এইরকম কিছু আছে, পটভূমির শব্দ আছে এবং সেখানে আপনি বুঝবেন যে ব্যক্তিরা সেই আবদ্ধ অবস্থায় হারিয়ে যেতে চায় না, তারপর সে তাদেরকে দৃঢ়ভাবে এই জগতে নিয়ে আসে। তারা এইসব মায়াবাদীদের শোনে ও তারা পুরোপুরি ভয়ভীত হয়ে যায়। তারা আসলে আধ্যাত্মিক জীবনে কোন প্রগতি করার প্রতি তাদের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। তাই আপনাকে খুবই সতর্ক হতে হবে। এই সমস্ত মায়াবাদীরা তারা নিশ্চিতরুপে কৃষ্ণের প্রতি অপরাধী। তাদের হয়ত নিজেদের অপ্রাকৃত অনুভব থাকতে পারে এবং আমরা হয়ত তাদেরকে মনুষ্যজ্ঞানের অতীত জেনে শ্রদ্ধা করতে পারি। তাদের মধ্যে কিছু জন আছে আন্তরিক, কিন্তু সেইসব আন্তরিক মায়াবাদীরা সাধারণত কোন সাহায্য করতে পারে না, তবে তারা বিভিন্নভাবে কৃষ্ণের প্রতি অপরাধ করে। এমনকি যদিও এটা জড়জাগতিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হয়ত স্থূল জড়জাগতিক আসক্তি থেকে বের হওয়ার জন্য সামান্য সাহায্যকারী হতে পারে, তবে এটি ভক্তদের জন্য ক্ষতিকর এবং সেই সমস্ত ব্যক্তিরা তারা আসলে আধ্যাত্মিক জগতে ফিরে যেতে সক্ষম হয় না। সেইজন্য এমনকি যদি একজন জড়বাদী মায়াবাদীদের থেকে কিছু সাহায্য লাভ করতে পারে, ও সেইসব শুনে জড়জাগতিক আসক্তি থেকে বের হতে পারে, তবুও যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের মায়াবাদীদের দৃঢ় মুষ্টির থেকে বেরিয়ে আসা উচিত এবং ভক্তিযোগের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত যেখানে তারা আসলে পূর্ণ পরম সত্য সম্বন্ধে বুঝতে পারবে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় এক পক্ষ ভিত্তিক, যা পূর্ণ দর্শন প্রদান করে না।
ভক্ত: এটাই কি মায়ার সর্বশেষ ফাঁদ?
জয়পতাকা স্বামী: না। এটা সর্বশেষ ফাঁদগুলির মধ্যে একটি। সহজিয়াভাব হচ্ছে আসলে আরও শেষ ফাঁদ। ভক্তদের জন্য সহজিয়াভাব নির্বিশেষবাদের থেকেও অধিক ভয়ংকর। সহজিয়াভাব এবং প্রকৃত ভক্তির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা বেশ কঠিন। নির্বিশেষ বাদ হচ্ছে বেশ সহজ বিষয়। আমি বলতে চাইছি, তারা কেবল, তারা এগুলি বিশ্বাস করে না। সব গুনাবলী এবং ব্যক্তিত্ব বোঝা খুবই সহজ। এই পথ খুবই অসৎ। সহজিয়াদের ক্ষেত্রে, তাদের দেখে মনে হয় ভক্তের মত গুণযুক্ত কিন্তু আসলে সেখানে প্রকৃত ভক্তদের প্রতি সুক্ষ অপরাধ আছে। তারা মনে করে যে তারা ইতিমধ্যেই ভগবানের একজন পার্ষদ, এমনকি যদিও তারা সেই স্তর লাভ করেনি। সেইজন্য, তারা একজন পার্ষদ হিসেবে বা একজন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বক্তব্য রাখে, যেখানে আসলে তারা হচ্ছে প্রকৃত ভক্তদের প্রতি অপরাধী এবং তারা বিষয়বস্তু যথার্থ রূপে উপস্থাপন করেনা। সেই জন্য তারা সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়, তারা আসলে সেই স্তর থেকে ভগবদ্ধামের ফিরে যেতে সক্ষম হয় না। তারা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের অপরাধে অপরাধী, তারা রসভাস ও বৈষ্ণব অপরাধ করে। তারা চিন্তা করে সরাসরি তারা হচ্ছে রাধা, তারা চিন্তা করে যে তারা হচ্ছে নন্দ মহারাজ, তারা চিন্তা করে যে তারা কোন একজন নিত্য পার্ষদ, এমনকি যদিও তারা সেই পদ অর্জন করেনি। আমি বলতে চাইছি, তারা রাধা হওয়ার বা কোন নিত্য পার্ষদ হওয়ার, প্রকৃত পারিষদ হওয়ার পদ লাভ করতে পারে না। তারা দাসদাসানুদাস-এর পদ লাভ করতে পারত, কিন্তু তারা সরাসরি ইতিমধ্যেই এই চিন্তা করে যে তারা সেই স্তরের এবং তা দেখতে খুবই আকর্ষণীয় লাগে এটি দেখে মনে হয় তারা খুবই উন্নত ভক্ত। কিন্তু, এই সবকিছুই হচ্ছে জড়জাগতিক স্তরে এবং সেই কারণে যেহেতু এটি তাদের মন এবং বুদ্ধির দ্বারা আরোপিত, তাই এটা এইসব মিথ্যে ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। সেইজন্য তা অধিক বিপদজনক কারণ একজন ভক্তের ক্ষেত্রে বোঝা কঠিন — “তাদের দেখে ভক্ত মনে হয়। তারা কৃষ্ণের পূজা করে। তারা কোন না কোন ভাবে…” আসলে এটা হচ্ছে এই রকম। সহজিয়া ভাব মানে হচ্ছে আপনি কৃষ্ণকে উপভোগ করার চেষ্টা করেন। ভক্তি মানে আপনি কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হন এবং তিনি আপনার সাথে আনন্দ উপভোগ করেন, তিনি আপনার সেবা আনন্দ উপভোগ করেন, আপনি সেবা করেন এবং সেই সেবা কৃষ্ণের দ্বারা উপভোগ্য এবং আপনি অন্তর থেকে দিব্য আনন্দ অনুভব করেন, কিন্তু সহজিয়া মানে হচ্ছে সেই ব্যক্তি কৃষ্ণের ভোগ করার চেষ্টা করে, সে কৃষ্ণের সাথে আনন্দ উপভোগ করতে চায়, সে চায়… সেই কারণে এটা সেবা মনোবৃত্তি নয়, এটা হচ্ছে ভোগের মনোভাব।
কেউ ভক্তিমূলক সেবা ছেড়ে দেয় এবং সরাসরি কৃষ্ণের লীলায় প্রবেশের প্রয়াস করে এবং তাদের উপভোগের জন্য তারা রাধা-কৃষ্ণের সম্বন্ধে চিন্তা করে, বিভিন্ন লীরা সম্বন্ধে চিন্তা করে। তারা কৃষ্ণের সেবা করা এবং কৃষ্ণের দ্বারা উপভোগ্য হওয়ার পরিবর্তে, ব্যাক্তি সেই একই উপভোগের মনোবৃত্তি গ্রহণ করে, ঠিক যেমন এই জড়জগতে একজন ব্যক্তি যৌন জীবন, নেশা আমিষ আহার বা দূতক্রিড়ার দ্বারা উপভোগ করতে চায়, তেমনই তারা কৃষ্ণের লীলা উপভোগ করতে চায়, কৃষ্ণের লীলায় গৃহীত হওয়ার পরিবর্তে — একজন বিনয়ী ভক্ত গৃহীত হয়ে, তারা আসলে আধ্যাত্মিক জীবনের প্রকৃতভাব আস্বাদন করে যা হচ্ছে কৃষ্ণের দ্বারা উপভোগ্য হওয়ার স্বাদ। আর তারা তাদের জড় জাগতিক মনের দ্বারা সেই পথ চূর্ণ করে তারপর এইসব লীলা উপভোগ করার চেষ্টা করে, তারা এই সবকিছুর হেরফের করে কারণ সেখানে কিছু আনন্দ আছে। কখনো কখনো তারা আসলে তাদের মানসিক এবং আবেগের অনুভব সংমিশ্রিত এক প্রকার আধ্যাত্মিক অনুভূতি লাভ করে, এটি এক খুবই বিভ্রান্তির স্থিতি তৈরি করে, যা আসলে নবাগতদের কাছে পার্থক্য নিরূপণ করাকে খুবই কঠিন করে দেয়। কনিষ্ঠ অধিকারীরা সাধারণত সহজিয়াদের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে অভিভূত হয়ে পড়ে এবং একদিক থেকে, সেটা আসলে নির্বিশেষবাদের থেকেও অধিক বিপদজনক কারণ উভয়ই হচ্ছে প্রকৃত ভক্তিমূলক সেবার বিরুদ্ধে এক মারাত্মক ধরনের অপরাধ। তাই কখনো কখনো নবাগত ভক্তদেরকে বলা হয়, “ওহ তুমি খুবই উপভোগের মনভাবে আছো।” যদি সেটা দেখা না হয়, তাহলে তার মানে কী তাদের মধ্যে সহজিয়া প্রবণতা গড়ে ওঠে না? পারত… তাদের হতে পারতো। তারা হয়ত উপভোগের মনোবৃত্তি বিকশিত করতে পারে, ও তারা আবার জড় জগতের দিকে ফিরতে পারে (হাসি) এবং সরাসরি তাদের ইন্দ্রিয় উপভোগের চেষ্টা করতে পারে। বা অন্যভাবে, যেটা হয় তা হচ্ছে, সেই উপভোগের মনোভাব থেকে তারা কৃষ্ণকে উপভোগ করার চেষ্টায় ঝাপ দেয়।
বলা যাক এমন একজন ভক্ত আছেন, যার ভোগের মনোভাব আছে এবং ভারতে যা হয় যে, এইসব সহজিয়ারা বলে, “প্রকৃত বিষয় হচ্ছে যে প্রকৃত ভক্তরা সবসময় শরণাগত হতে চায় এবং দাসানুদাস হতে চায়। আপনার মিথ্যা অহংকারকে ত্যাগ করুন, এইভাবে আপনার সেবা করুন। শরণাগতির মনোভাব নিয়ে এবং তাহলে স্বাভাবিকভাবে ভক্তিমূলক সেবায় স্বতঃস্ফূর্ত উন্নতির মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের দিব্য গুণসমূহের প্রকৃত উপলব্ধি, প্রকৃত আনন্দ এবং প্রকৃত স্বতঃস্ফূর্ত অনুরাগ ভক্তি হৃদয়ে আসবে। কিন্তু কেউই না… আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে না। এতে আসলে তেমন একটা বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু এর অর্থ হচ্ছে তাকে উপভোগের মনোভাব থেকে সেবা মনোভাবে – সেবা ভাবের দিকে নিজের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। কেউ তখন মনে করে, “হ্যাঁ! আমি এক মহান ভক্ত, আমি ইতিমধ্যেই উন্নত ভক্ত বা আমি…” কিন্তু তারা কেবল তাদের আধ্যাত্মিক জীবনে সেই একই মিথ্যা অহংকার বহন করে চলে।
সেই সমস্ত ব্যক্তিরা, তারা আপনাকে ডাকবে ও বলবে, “আমার আপনাকে এমন কিছু বলার আছে যা আপনার গুরু ও জানেন না।” তারা এটা বলেনি, তারা বলেছিল, “আমার আপনাকে এমন কিছু বলার আছে যা আপনার গুরুও আপনাকে বলেনি।” এইভাবে তারা মনকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করত। এই সমস্ত কয়েকজন গুরু, তারা চুরি করার চেষ্টা করেছিল, তারা এইভাবে শ্রীল প্রভুপাদের কিছু শিষ্যদেরকে চুরি করে নিয়েছিল যে: “আমার আপনাকে এমন কিছু বলার আছে যা আপনার গুরুও আপনাকে বলেনি।” এইভাবে, এটি হচ্ছে এক ধরনের পতিতাবৃত্তি, তারা একটি দ্বিধা মধ্যে ফেলে, আর তখন তারা চেষ্টা করে, আপনারা এটাকে কি বলেন… আপনার উপর চাপিয়ে দেওয়া বা এমন কিছু। এরপর যদি আপনি সহমত প্রকাশ করেন যে, “সত্যিই! তা কি?” তাহলে তৎক্ষণাৎ আপনি গুরু অপরাধে জড়িয়ে পড়লেন এবং আপনার গুরুর সাথে আপনার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল, তখন তারা আপনাকে যা বলে তা আসলে প্রভাব ফেলে। এটা হচ্ছে যেমন এক প্রযুক্তিক আধ্যাত্মিক পন্থা, প্রথমে আপনাকে আপনার প্রকৃত মূল থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং তারপর তারা আরেকটি ভিত্তি রোপন করবে। প্রথম হচ্ছে তারা আপনার জন্য স্থান তৈরি করবে এবং যদি আপনি তাদের থেকে শ্রবণ করতে সহমত হন, তাহলে সেই দ্বিধার সাথে সাথেই আপনি তৎক্ষণাৎ গরু অপরাধে অপরাধী হয়ে পড়েন। কারণ আপনি শ্রবণ করতে সহমত হয়েছেন মানে আপনি সূক্ষ্মভাবে বা স্থূলভাবে সন্দেহ করছেন যে আসলেই আপনার গুরু হয়ত আপনাকে কোন কিছু বলেনি, যেখানে সাধারণ ভিত্তি হচ্ছে যে গুরু আপনার যা কিছু জানা প্রয়োজন, তা সবকিছুই আপনাকে বলে দিয়েছেন।
তারা আমার সাথে একই ধরনের কিছু করতে চেষ্টা করেছিল এবং আমি কেবল প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, “না! আমার যা কিছু জানা প্রয়োজন প্রভুপাদ সেই সবকিছু আমাকে বলে দিয়েছেন।”
“না! না! এমন কিছু আছে যা তিনি আপনাকে বলেননি।”
“না! না! তিনি আমাদেরকে সবকিছু বলেছেন — গোপী ভাব, রাধা কৃষ্ণ, চৈতন্যচরিতামৃত, সবকিছু যা কিছু আমাদের জানার দরকার, তিনি তা বলে দিয়েছেন।”
“না! না! অন্য আরো কিছু আছে আপনি জানেন …”
“হরে কৃষ্ণ! আমাকে ক্ষমা করবেন, আমাকে যেতে হবে।”
কিন্তু সেখানে অন্যান্য ব্যক্তিরা ছিল, তারা যাননি, তারা শ্রবণ করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন এবং তারপর তারা চলে গিয়েছিলেন। আর সেই সমস্ত ব্যক্তিদের বলা হয়েছিল যে, “আপনি কত উন্নত। আমি এখন আপনার রস দেখতে পাচ্ছি, আপনি হচ্ছেন বৃন্দাবনে একজন ময়ূর।” (ভক্তরা হাসছেন) এবং সেই সমস্ত ভক্তরা আমি তাদের নাম বলব না, কারণ যদি তারা ভবিষ্যতে ফিরে আসে… অবশ্য এখন ১০ বছর হল তারা এই আন্দোলনের বাইরে আছে, কিন্তু চাটুকতা বা অন্যান্য এরকম কিছু করে, কিন্তু যদি তারা ফিরে আসতে চায়, সেই জন্য আমি তাদের নাম উল্লেখ করে তাদেরকে বিব্রত করতে চাই না। কিছু ভক্তরা তাদের ঘরের ভেতর গিয়েছিলেন এবং দেখলেন যে এইসব ভক্তরা, সেইসময় তারা মূলত ইসকনে ছিলেন, (মহারাজ ময়ূরের পাখা ঝাপটানোর নকল করলেন) … (ভক্তরা হাসছেন) এবং সেই ভক্ত: “কি হচ্ছে? মহারাজ কি করছেন?” তার টেপ অন ছিল, তিনি ঝাপটাচ্ছিলেন, এবং তখন তিনি তাকিয়ে দেখলেন যে ব্যক্তি ভিতরে এসেছেন,
“তুমি যা দেখেছ তা কখনো কাউকে বলো না।”
“ঠিক আছে মহারাজ।”
প্রায় ১০ বছর আগে এটা ঘটেছিল। এবং তিনি হচ্ছেন এক ধরনের মহারাজ কিন্তু “আপনি কি করছেন?” তখন অবশেষে তিনি বললেন, “আমি তোমাকে বলব যদি তুমি কাউকে না বল। আমি ভারতে এক গুরুর সাথে সাক্ষাৎ করেছি এবং তিনি আমাকে বলেছেন যে আমি হচ্ছি, তিনি আমাকে আমার রস বলেছেন — আমি হচ্ছি বৃন্দাবনের এক ময়ূর — তাই আমি অভ্যাস করছিলাম। (ভক্তরা হাসছেন) এটা এক সত্য ঘটনা। সেই ব্যক্তি অবশ্যই পরে তিনি বৃন্দাবনের ময়ূর হওয়ার পরিবর্তে, এইসব মেকি সহজিয়াদের থেকে দূষিত বার্তা শ্রবণ করেছে বা বিভিন্ন ধরনের সহজিয়া নির্দেশ শ্রবণ করেছে, তাতে তাদের আসলে প্রকৃত রসে থাকার কথা কিন্তু এর পরিবর্তে কিভাবে তারা পতিত হয়েছে এবং তোষামোদ করতে শুরু করেছে। এটি দেখায় যে তারা এই বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কার্যকলাপের মধ্যে ঢুকে পড়েছে এবং এই সবকিছুই হচ্ছে মানসিক জড়জাগতিক স্তরের জল্পনা। আসলে যখন একজন ভক্ত সেই স্তরে উন্নীত হন, এই সবকিছু গরুর মাধ্যমে প্রকাশিত হবে, হয় তার স্বপ্নে অথবা ধ্যানে অথবা তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু কাউকে সেই স্তরে উন্নীত হতে হবে। এটা এমন নয় যে, ওহ মানসিকভাবে কেউ ভাবতে পারবে, “এখন আমি এটা বা ওটা”। এমনকি, শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে অনেক বার সাবধান করে দিয়েছেন যে কামুক ভক্তরা তৎক্ষণাৎ চিন্তা করতে শুরু করে, “আমি একজন গোপি বা এমন একজন। আমি হচ্ছি রানী এবং আমি বৃন্দাবনে আছি।” এবং তারা … এটা এমন নয় যে সেটা তাদের প্রকৃত রস, তবে তারা কেবল একটু কামুক হয়ে পড়ে। তাই তারা সেটাকে এই ভাবে রূপান্তরিত করে, তৎক্ষণাৎ তারা মনে করে, “ওহ এটা হচ্ছে আমার রস। আমি কৃষ্ণের প্রতি এইভাবে আকৃষ্ট হই।” কিন্তু কোন ভক্তকে তার সকল জরজাগতিক বাসনা এবং কামুকতা শান্ত করতে হবে সেগুলিকে সম্পূর্ণরূপে সেবা মনবৃত্তিতে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে। এবং তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কেউ কৃষ্ণের সাথে তার আধ্যাত্মিক সম্বন্ধ বিকশিত করতে পারবেন। তখন তা প্রকাশিত হবে ও আধ্যাত্মিক গুরুদেবের দ্বারা তার নিশ্চিতকরণ হয়। এটা এমন কিছু নয় যা কেউ কেবল ধরে নিতে পারে। তাই এই সব কিছুতে, তারা তৎক্ষণাৎ চেষ্টা করে… এগুলি হয়… মায়াপুরে একজন নতুন ভক্ত ছিল এবং সে পেরে উঠছিল না। সে এটা বজায় রাখতে পারছিল না। মন্দিরে তা ছিল খুবই তপস্যার ব্যাপার বা এমন কিছু। সে চেয়েছিল … মূল বিষয় হচ্ছে তারা আসে, তারা মনে করে… ভারতে অনেক সময় তারা মনে করে… “ আমি এখন আশ্রমে যুক্ত হচ্ছি এবং সেখানে কেউ এমন নেই বা এমন কেউ হবে না যে আমার মত উন্নত। আমি সত্যিই… আশ্রমের নিজের দরজা খোলা উচিত, এই যে আমি এখানে আছি।” এবং এই সেই ভক্ত, ভক্ত শ্যাম, শ্যাম রূপা যাই হোক বা আপনারা জানেন ভক্ত প্রদীপ… সে করতে চায় না… “এখন আপনাকে ১৬ মালা জপ করতে হবে, আপনাকে করতে হবে।” এবং তারা মনে করে, “হে ভগবান! তারা আমাকে এক মহাপুরুষ রুপে চিনতে পারছে না। আমি পোস্ট অফিসের আমার চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসেছি এবং আমি এখন এখানে এসেছি, আর এখন তারা আমাকে মহাপুরুষ রূপে বুঝছে না! আমি কৃষ্ণকে স্বপ্নে দেখেছি। তারা কি বুঝতে পারছে না যে আমি ইতিমধ্যেই মুক্ত জীব বা এমন কিছু? (হাসি) এবং এরপর তারা, কখনো কখনো তারা তা পারে না, আমরা এই রকম নির্দিষ্টভাবে তাদের দেখার পূর্বেই… আমরা জানি যে কিভাবে এর সাথে মোকাবিলা করতে হবে, আমরা জানি যে তারা সেই একই গন্তব্যের। এরপর তারা বৃন্দাবনে বা এমন কোন জায়গায় যায় ও কোন বাবাজিরা, “ওহ হ্যাঁ, তুমি হচ্ছ এক ময়ূর বা তুমি হচ্ছ রাধা কুন্ডের এক কচ্ছপ।” এবং তখন তারা হয় সাঁতার কাটে, ভাসতে চায়। তারা পরবর্তী তিন বছরের জন্য পুরোপুরি এই বিষয়ে মধ্যে ঢুকে পড়ে, যতক্ষণ না তারা এটা বুঝতে পারছে যে তারা আসলে কোন আধ্যাত্মিক আনন্দ পাচ্ছে না এবং এই সবকিছুই তাদের মনের মধ্যে আছে যে বাহ্যিকভাবে পাখা ঝাপটানো এবং তখন সাধারণত সেই সময়ের মধ্যে তারা অনেক অপরাধ করে ফেলে এবং তারা পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে এক বাবাজির মত বৃন্দাবনে বিধবাদের সাথে অবৈধ সম্বন্ধের মধ্যে পতিত হতে শুরু করে বা তারা অন্য কোথাও চলে যায় এবং আবার জড়জাগতিক জগতে যোগ দেয় বা তারা অন্য কোন ধরনের অদ্ভুতপথে অগ্রসর হয়।
এই ধরনের অপসম্প্রদায়ের কথা ভক্তিবিনোদ ঠাকুর অবিরতভাবে, ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর অবিরতভাবে এবং প্রভুপাদও বলেছেন। অবশ্য পাশ্চাত্যে সেখানে কোন মায়াবাদী ছিল না মোকাবিলা করার মত, কিন্তু তবুও তিনি সবসময় এর বিরুদ্ধে লড়াই করতেন কারণ সেটাই ছিল তার প্রধান বিপত্তি যে তিনি সবসময়য় ভীত ছিলেন যে এই ধরনের সহজিয়াবাদ বা মায়াবাদ কোন না কোনভাবে আমাদের আন্দোলনের মধ্যেও প্রবেশ করতে পারে। নিউইয়র্কে সেখানে একজন মায়াবাদের সন্ন্যাসী মন্দিরে এসেছিল, তিনি খুবই বিপর্যস্ত ছিল। সেই ছিল সময় যখন মায়াবাদীদের দ্বারা আক্রমণ হয়েছিল, তখন সংগঠনকে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। সেই ছিল সময়, যখন এমনকি সহজিয়ারা আমাদের সংগঠনে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিল। এই হচ্ছে মূল বিষয় যে আচার্যদের এবং সন্ন্যাসীদের সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, তারা দুই দিক থেকে প্রবেশের চেষ্টা করে এবং প্রকৃত ভক্তিকে লুণ্ঠন করার চেষ্টা করে। কিন্তু তা খুবই জটিল। সাধারণত নতুন ভক্তরা এবং নবাগতরা তারা সেটি বুঝতে পারেনা, তখন তা এক খুবই জটিল ব্যাপার হয়ে ওঠে। এটা খুবই সূক্ষ্ম বিষয় এবং আমি এটা ব্যাখ্যা করছি কারণ আপনি যেহেতু তা জিজ্ঞেস করেছেন, কিন্তু আমি আশা করি এটি কাউকে বিভ্রান্ত করবে না কারণ এটা সরল কোন ব্যাপার নয়। সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি খুবই সরল: কেউ উপভোগের মনোভাবে…উভয়ে উপভোগের মনোভাবে আছে। কেউ ব্রহ্মাজ্যোতিতে এক হতে চায় এবং কেউ সরাসরি লীলায় প্রবেশ করতে চায়। প্রকৃত ভক্তি হচ্ছে হৃদয়ের পরিবর্তন, যেখানে কেউ সেবা মনবৃত্তি নিয়ে আসে, আর এই সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে খুবই সহজ, কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন ধরনের বিষয়ের বহুমুখী প্রয়োগ আছে তবে কেবল এক ধরনের শুদ্ধ ভক্তি আছে। দেখুন রামানুজ সম্প্রদায়, মাধ্বা, নিম্বার্ক, বিষ্ণু স্বামী, চৈতন্য মহাপ্রভু—এক্ষেত্রে মূল মনোভাবে কেবল একটু ভিন্নতা আছে। একটি হচ্ছে দাস্য রসে সেবা মনবৃত্তি, আরেকটি হয়ত মাধুর্যরসে সেবা মন বৃত্তি, অন্য আরেকটি হয়ত বাৎসল্য রসে সেবা, কিন্তু সবক্ষেত্রেই সেবা মনভাব স্থির আছে। যখন আপনি অপসম্প্রদায়ের মধ্যে যাবেন: আউল, বাউল, কর্তাভাজ, ন্যাড়া, গৌরাঙ্গ-নগরি এবং কোট্টা নিশি, এইসব ধরনের মধ্যে এখন আবার আমাদের এক নতুন ধরনের এসেছে — নেশা করা সহজিয়ারা। সেখানে আরো ১৪ টা আছে যা তালিকায় করে রাখা যেতে পারে, আমি জানিনা সংস্কৃতে কি নাম দেওয়া যেতে পারে, আউল, বাউল… তাদেরকে ডাকা যাবে নেশা করা বাউল বা কী? কিন্তু…
এহ?
এইরকম কিছু।
বিষয় হচ্ছে, এই রকম সহজিয়ারা তাদের বিভিন্ন প্রকার আছে। যখন আমরা বিভিন্ন ধরণ দেখি, সেক্ষেত্রেও সাধারণত এই একই ধরনের উপভোগের মনোভাব আছে— আধ্যাত্মিক জগতে ঝাপ মারার প্রয়াস আছে, যেমন পোলভল্ট হয়, এইরকম এক ধরনের জড়জাগতিক মানসিকতা ব্যবহার করা।
যখন কেউ আসলে শরণাগতি এবং সেবার মনোভাব গ্রহণ করে, তখন কৃষ্ণ আপনাকে তুলে নেবেন। আর কোন পথ নেই। আপনাকে উত্থিত হতে হবে। আপনি দ্বার ভাঙতে পারেন না, আপনি তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারবেন না, আপনি পারবেন না… অন্য কোন পথ নেই। কিন্তু কৃষ্ণ আপনাকে দীর্ঘক্ষন প্রতীক্ষা করাবেন না। এমনকি দরজা খুলবে আর শরণাগত হয়ে যান, এইভাবে ইতিমধ্যেই সেখানে ইতিমধ্যেই সম্বন্ধ আছে এবং কৃষ্ণ এত কৃতজ্ঞ হন যে তখন কেউ আসলে তখন ভক্তিমূলক সেবা লাভ করে এবং এটা আসতে এমনকি তত দীর্ঘ সময় লাগে না। এই সমস্ত ব্যক্তিরা তারা অনুমোদিত পন্থা ছাড়া যেতে চায়, তারা প্রকৃত গুরুকে অবহেলা করার মাধ্যমে, প্রকৃত আচার্যকে অবহেলা করার মাধ্যমে তাদের নিজেদের মিথ্যে পথ উদ্ভাবনের চেষ্টা করে। এইভাবে তারা সহজিয়াবাদ বা মায়াবাদের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। সেইজন্য আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। এইভাবে, যদি তাদের কোন সংশয় হয়, সেটা অনুমোদিত ভক্তদের সাথে আলোচনা করা উচিত যারা শ্রীল প্রভুপাদের মাধ্যমে, পরম্পরা মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়েছে, যারা এইসব ব্যাপার জানে। যদি এমন কোন সন্দেহ হয় যে কেউ কোন ধরনের সহজিয়া ভাবনার দ্বারা বা কোন ধরনের মায়াবাদী ভাবনার দ্বারা কলুষিত হয়ে পড়ছে এবং আপনি তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না, আপনার সন্দেহ আছে, তাহলে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সাহায্য করা উচিত। কারণ কেউ এসব ধারণার মধ্যে আরও বেশি পড়লে, এমনকি তত বেশি কেউ ভক্তিমূলক সেবা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলবে। এর ফলে হয়তো অ্যামিবা জন্মে ফিরে যেতে হবে বা আসলে সেইসব ধারণা থেকে মুক্ত হতে এগিয়ে যেতে হবে। চৈতন্যচরিতামৃতকে বলা হয়েছে যে, যদি কেউ সদ্ গুরুর প্রতি অপরাধ করে, তাহলে তার হয়ত কোটি ব্রহ্মা জন্ম বা এক কল্প বা ব্রহ্মার এক কোটি দিনের মত দীর্ঘ সময় লাগবে আবার একজন সদ্ গুরু গ্রহণের যোগ্য হওয়ার জন্য। তা কোন ব্যাক্তিকে এতই দূষিত করে। একবার কেউ এই ধরনের বিকৃত ধারণার মধ্যে পড়লে, আবার ভক্তিমূলক সেবার প্রতি যথার্থ ধারণা লাভ করা খুবই কঠিন হয়। তাই, কোন ব্যক্তির এই সবকিছুর মধ্যে জড়িয়ে পড়ার পূর্বেই, তাদেরকে রক্ষা করা উচিত। হরে কৃষ্ণ!
শ্রীল আচার্যপাদ কী জয়!
Lecture Suggetions
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ