Text Size

১৯৮২০১০৯ শ্রীমদ্ভাগবত ৮.৮.৪১-৪৬ ও বৈশিষ্ট্যষ্টাকম্ অষ্টম শ্লোক

9 Jan 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|Kolkata, India

নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ৯ জানুয়ারি, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, কলকাতা, ভারতে প্রদান করেছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৮.৮.৪১-৪৬তম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে, এবং বৈশিষ্ট্যষ্টকম-এর [সপ্তম] অষ্টম শ্লোক আলোচনা অব্যাহত আছে।

বৈষ্ণব সভ্যতা প্রত্যেকের আনন্দবিধান করে

শ্রীমদ্ভাগবত (৮.৮.৪২-৪৬)

এতস্মিন্নন্তরে বিষ্ণুঃ সর্বোপায়বিদীশ্বরঃ।
যোষিদ্রূপমনির্দেশ্যং দধার পরমাদ্ভুতম্॥ ৪১॥
প্রেক্ষণীয়োৎপলশ্যামং সর্বাবয়বসুন্দরম্।
সমানকর্ণাভরণং সুকপোলোন্নসাননম্॥ ৪২॥ 
নবযৌবননিবৃত্তস্তনভারকৃশোদরম্। 
মুখামোদানুরক্তালিঝঙ্কারোদ্বিগ্নলোচনম্॥ ৪৩॥ 
বিভ্রৎ সুকেশভারেণ মালামুৎফুল্লমল্লিকাম্। 
সুগ্রীবকণ্ঠাভরণং সুভুজাঙ্গদভূষিতম্॥ ৪৪॥ 
বিরজাস্বরসংবীতনিতম্বদ্বীপশোভয়া। 
কাঞ্চ্যা প্রবিলসদ্বল্গুচলচ্চরণনূপুরম্॥ ৪৫॥ 
সব্রীড়স্মিতবিক্ষিপ্তভ্রূবিলাসাবলোকনৈঃ। 
দৈত্যযূথপচেতঃসু কামমুদ্দীপয়ন্ মুহুঃ॥ ৪৬॥ 

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কৃত অনুবাদ: ভগবান শ্রীবিষ্ণু, যিনি যে কোন প্রতিকূল পরিস্থিতির প্রতিকার করতে পারেন, তিনি এক অপূর্ব সুন্দরী স্ত্রীমূর্তি ধারণ করেছিলেন। নারীরূপে ভগবানের এই মোহিনীমূর্তি অবতার পরম মনোরম। তাঁর অঙ্গকান্তি নব-বিকশিত নীল কমলের মতো, এবং তাঁর দেহের প্রতিটি অঙ্গ পরম সৌন্দর্যমণ্ডিত। তাঁর কর্ণযুগল সমান আভরণে বিভূষিত, তাঁর গণ্ডদেশ অত্যন্ত মনোহর, তাঁর সুন্দর মুখমণ্ডল উন্নত নাসিকাযুক্ত, এবং যৌবনের ছটায় পূর্ণ। তাঁর উন্নত স্তনযুগলের প্রভাবে তাঁর কটিদেশ অত্যন্ত ক্ষীণ বলে প্রতীত হচ্ছিল। তাঁর অঙ্গসৌরভে আকৃষ্ট হয়ে ভ্রমরেরা তাঁর চতুর্দিকে গুঞ্জন করছিল, এবং তার ফলে তাঁর নয়নযুগল চঞ্চল হয়েছিল। তাঁর সুন্দর কেশদাম মল্লিকা মালায় ভূষিত। তাঁর কমনীয় গ্রীবা কণ্ঠ আভরণে ভূষিত, তাঁর বাহুযুগল অঙ্গদের দ্বারা বিভূষিত, তাঁর দেহ নির্মল বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত, এবং তাঁর নিতম্ব এক সৌন্দর্যের সমুদ্রে দুটি দ্বীপের মতো প্রতিভাত হচ্ছিল। তাঁর চরণ নূপুরের দ্বারা বিভূষিত। মধুর হাস্য সহকারে ভ্রূযুগল বিচলিত করে তিনি যখন অসুরদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছিলেন, তখন সমস্ত অসুরদের হৃদয় কামবাণে বিদ্ধ হয়েছিল এবং তারা সকলেই তাঁকে কামনা করেছিল।তাৎপর্য: ভগবান যেহেতু অসুরদের কামবাসনা উদ্দীপ্ত করার জন্য এক সুন্দরী স্ত্রী-মূর্তি ধারণ করেছিলেন, তাই এখানে তাঁর সৌন্দর্যের পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

ইতি শ্রীমদ্ভাগবতের অষ্টম স্কন্ধের ‘ক্ষীরসমুদ্র মন্থন’ নামক অষ্টম অধ্যায়ের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য। [হাসি] 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে—ভগবান শ্রীবিষ্ণু মোহিনী-মূর্তি ধারণ করে নারীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যা বিশেষত অসুরদের কামভাব উদ্দীপ্ত করে তুলেছিল। অসুর এবং ভক্তদের মধ্যে একটি পার্থক্য আছে, সেই পার্থক্যটি হচ্ছে—অসুরেরা সর্বদা আত্মকেন্দ্রিক; তারা সবসময় নিজেদের ভৌতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে। অন্যদিকে, ভক্তরা সর্বদা ভগবানের স্বার্থকেই সবকিছুর উর্দ্ধে রাখেন।

অবশ্য, কখনও কখনও এই জড় জগতে এমনকি একজন নবীন পর্যায়ের  ভক্তও  অপরা শক্তির দ্বারা আবৃত হতে পারেন। কিন্তু অসুররা সর্বদাই অপরা শক্তি দ্বারা আবৃত থাকে। তারা সবসময় ভোগ-বাসনার দ্বারা আক্রান্ত হয় ও সেটিকেই তাদের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য বলে মনে করে। তাঁদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে কাম-বাসনা পূর্ণ করা। এটাই হচ্ছে সর্বদা ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে আগ্রহী কোনো অসুরের সঙ্গে ভগবদ্ভক্তের পার্থক্য। কোনো ভক্ত জড় কামনা-বাসনা যুক্ত বা মোক্ষ প্রাপ্তির ইচ্ছা যুক্ত অথবা জড় কামনা-বাসনা শূন্য একজন শুদ্ধভক্ত হতে পারেন, কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই তিনি পরম পুরুষোত্তম ভগবানের প্রতি বিশ্বস্ত ও শরণাগত থাকেন। অতএব, কোনো ব্যক্তির শুদ্ধভক্তির অনুপাত অনুসারে তিনি সমস্ত সৎ গুনাবলীর অধিকারী হন। কিন্তু অসুররা যেহেতু ভগবদ্ভক্ত নয়, তাই তাদের মধ্যে কোনো সৎগুণ আছে বলে মনে হলেও, তা শুধুই বাহ্য প্রকাশ। চরমে তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করা ও বাকি সবকিছুই সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায় মাত্র। 

শ্রীল প্রভুপাদও আমাদেরকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে বলেছিলেন। কারণ আমাদের মধ্যেও কারো কারো হয়ত অনেক আসুরিক গুণাগুণ থাকতে পারে, এবং শীল প্রভুপাদ আমাদেরকে সতর্ক করেছিলেন যে—এই সংস্থায় যে সব ভক্তরা আছেন, তাদের মধ্যেও কিছু কিছু অসুর প্রবেশ করেছে। বৃন্দাবনে শ্রীল প্রভুপাদ এই জগৎ পরিত্যাগ করার সময় আমাদেরকে বলেছিলেন, “আমার শিষ্যদের মাঝেও কিছু কিছু অসুরেরা আছে, তাই তোমাদের নিশ্চয়ই সতর্ক থাকতে হবে।”

চূড়ান্ত আসুরিক প্রভাব হচ্ছে—ভক্ত গুরুদেবের নির্দেশ পালন করা বন্ধ করে নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য কার্য করতে শুরু করে। তাই, আপনাকে সর্বদা অত্যন্ত সতর্কভাবে এই স্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করতে হবে যে কোনটি গুরুদেবকে প্রীত করবে ও কোনটি তাঁকে অপ্রীত করবে, এবং এইসব অপ্রীতিকর দিকগুলি সর্বদা এড়িয়ে চলতে হবেও এমনভাবে আচরণ করতে হবে যা গুরু-কৃষ্ণের প্রীতিবিধানকারী, ভক্তি-অনুকূল ও শুদ্ধ ভক্তিযুক্ত।

আমরা শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত বৈশিষ্ট্যাষ্টকম পড়ছিলাম এবং এখন আমরা কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদের মহিমায় রচিত অষ্টম শ্লোকটি পাঠ করব। একদিকে, এটি আসলে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সম্প্রদায়ের প্রতি আস্থাভাজন বৈষ্ণবগণের প্রতি শ্রীল প্রভুপাদ প্রদত্ত নির্দেশনা যে, “তাদের কীভাবে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের নির্দেশ পূরণ করা উচিত ও কীভাবে তাঁর মহান গুণাবলীর পদাঙ্ক অনুসরণ করা উচিত, যাতে তাঁর মহান গুণসমূহ মহিমান্বিত হয়।”

এটা বাংলায় লেখা, তাই আমরা ব্যাখ্যা করার সময় এর অনুবাদ করব—

কেন লোক কাঁদে সব রাম-রাজ্য তরে।
একমাত্র কারণ সেই বিষ্ণুরাজ্য করে॥ ১॥
কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরে বসায় রাজ-সিংহাসনে।
ধনে-ধান্যে পূর্ণ ধরা বৈষ্ণবের গুণে॥ ২॥
নদ-নদী বৃক্ষ-মাঠ-গিরি ভরপুর।
দুগ্ধবতী গাভী দুগ্ধে ভাসায় প্রচুর॥ ৩॥ 
পশু-পক্ষী জীব-জন্তু হিংসা নাহি করে।
বৈষ্ণবী রাজ্যের বিধি প্রসিদ্ধ সংসারে॥ ৪॥
সকলে আনন্দে মগ্ন হরিগুণ গায়।
দেখিয়া বৈষ্ণব-হৃদয় আনন্দে নাচয়॥ ৫॥
কৃষ্ণভক্তি-গন্ধহীন বিষয় বিভোর। 
ভরিয়া গিয়াছে আজ জগৎ-সংসার॥ ৬॥
অথচ শান্তি তারা করে অন্বেষণ।
প্রচারের দ্বারা তাহা করহ পূরণ॥ ৭॥
আজিকার দিনে ভাই কোটিবদ্ধ হও।
প্রচারের দ্বারা যত জীবেরে বাঁচাও॥ ৮॥
শ্রীল প্রভুপাদ! তুমি আজি কর দয়া।
এবার করুণা কর হইয়া অমায়া॥ ৯॥
স্বতন্ত্রতা যার যত হোক জলাঞ্জলি। 
দীন ‘অভয়’ দেয় আজি সে অঞ্জলি॥ ১০॥
(বৈশিষ্ট্যষ্টাকম্ অষ্টম শ্লোক)

কেন লোক কাঁদে সব রাম-রাজ্য তরে? একমাত্র কারণ সেই বিষ্ণুরাজ্য করে॥—মানুষ তাদের দুঃখ-দুর্দশা থেকে রক্ষা পেতে পারবে একমাত্র এমন একটি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা বিষ্ণু-ভক্তি নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে সমগ্র বিশ্বের শাসকরূপে রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, তখন সকলের কাছেই ধন-সম্পদ ও খাদ্যের প্রচুর জোগান ছিল, যা সবই হচ্ছে বৈষ্ণবের কৃপার ফল। সেসময় নদ-নদী, জলধারা, অরণ্য ও সমতল ভূমি সহ পার্শ্ববর্তী পর্বতসমূহও ঐশ্বর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল, যা ঠিক যেন সমগ্র মানবজাতির উপর প্রাকৃতিক উপঢৌকন বর্ষণের মতো। তখন দুগ্ধবতী গাভীরাও  অপরিমেয় দুগ্ধ দান করত, আর ধর্মের এই তরলরূপ সমগ্র জনসাধারণকে প্লাবিত করত। 

ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শুদ্ধভক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতায় পশু-পাখি ও অন্যান্য জীবজন্তুরাও পরস্পরের প্রতি কোনো হিংসামূলক আচরণে লিপ্ত হত না। তা ছিল সর্বাপেক্ষা নিখুঁত সংগঠন বা পরিবারে সবকিছুই ছিল সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল ও নিয়মানুবর্তি। সেসময় প্রত্যেকেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির মহিমা কীর্তনের দিব্য আনন্দরসে মগ্ন ছিলেন। 

সব ভক্তরা তাদের হৃদয়ে দিব্য আনন্দ অনুভব করে ভাবেবিভোর হয়ে নৃত্য করতেন। পরমেশ্বর ভগবানের শুদ্ধ ভক্তি সমগ্র বিশ্বের প্রত্যেকের হৃদয়কে পরিপূর্ণ করেছিল, যার মধ্যে এমনকি জাগতিক ভোগবাঞ্ছার সামান্যতম লেশমাত্র উপস্থিত ছিল না। সেই জন্য তখন তাঁরা সর্বদা শান্তিতে ছিলেন, এই সবই সম্ভব! এই যে স্বপ্ন—বিশ্বশান্তি, সুখ এবং ধার্মিকতা—এই সবই কেবল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের মাধ্যমে সম্ভব। বর্তমানে শতাধিক লক্ষ্যাধিক পতিতাত্মা রয়েছে। তাই, চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করুন এবং তাহলেই এই সব পতিতাত্মারা উদ্ধারপ্রাপ্ত হবে ও ভববন্ধন মুক্ত হবে। হে শ্রীল প্রভুপাদ (শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর), আজ আমি আপনার শ্রীপাদপদ্মে বিনীতভাবে প্রার্থনা করছি—দয়া করে আমাকে আপনার কৃপা প্রদান করুন। এই সর্বাপেক্ষা তুচ্ছ ব্যক্তিকে আপনার কৃপা প্রদান করুন যে আমি যেন সর্বপ্রকার মায়া থেকে মুক্ত হতে পারি, আমি যেন যেকোনো ধরনের স্বাধীন কার্যকলাপ প্রত্যাখ্যান করতে পারি। [পাশে: বাংলা কথোপকথন] আমাকে কৃপা করুন যাতে আমার হৃদয়ের সমস্ত স্বতন্ত্রভাব শুদ্ধ কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রবাহে নিমজ্জিত হতে পারে। আপনার তুচ্ছ অভয় আজ আপনার ব্যাস পূজার পুণ্যলগ্নে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছে। এটাই হচ্ছে বৈশিষ্ট্যষ্টকমের পরিসমাপ্তি। 

অতএব, আমরা বুঝতে পারছি—এটি স্পষ্ট যে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের মনোভিলাষ ছিল সমগ্র বিশ্ব কৃষ্ণভাবনায় সম্পৃক্ত হোক। এটি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের ৮৬তম আবির্ভাব তিথি মহোৎসব উপলক্ষ্যে তাঁকে লেখা হয়েছিল, যা ছিল সম্ভবত ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে বা ৬০-এর দশকের শুরুর দিকে। আমি যতটা বুঝতে পারছি যে এটা ছিল ১৯৫০-এর দশকে বা ৬০-এর দশকের প্রথম দিকে লেখা। আমি এই শ্রদ্ধাঞ্জলি পড়ছি, তবে আমি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্তের প্রকৃত আবির্ভাব দিবস বা আবির্ভাব সাল মনে করতে পারছি না। শ্রীল প্রভুপাদ সবসময় শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সমগ্র বিশ্বব্যাপী কৃষ্ণভাবনামৃত তথা শুদ্ধভক্তি বা কৃষ্ণভক্তি প্রচারের অভিলাষ পূর্ণ করতে চাইতেন। তাঁর এই অগাধ বিশ্বাস ছিল যে কেবল সক্রিয়ভাবে প্রচার, গ্রন্থ বিতরণ, ভগবদ্ভক্তি প্রতিষ্ঠা ও পবিত্র নাম জপের মাধ্যমে সমস্ত মায়া ও ভ্রম বিদূরিত হবে।

তিনি এই ভাবধারায় পূর্ণরূপে মগ্ন ছিলেন যে—এটাই তাঁর গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরকে সবথেকে আনন্দিত করবে। প্রকৃতপক্ষে, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর হচ্ছেন নিত্যসিদ্ধ ভক্ত, তিনি হচ্ছেন আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে আগত মুক্তাত্মা। কিন্তু তিনি অবিরত চৈতন্য মহাপ্রভুর মহিমা প্রচারে নিযুক্ত ছিলেন। এমনকি তিনি শ্রীল প্রভুপাদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—প্রচারে ব্যবহার হয় না এমন মন্দিরের মার্বেল খুলে নিয়ে, তা বিক্রি করে গ্রন্থ ছাপানো ভালো! তিনি শ্রীল প্রভুপাদকে বিভিন্নভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা সম্বন্ধীয় দিব্যশাস্ত্র গ্রন্থ মুদ্রণ ও প্রচার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং, আমাদের আসলে পূর্বতন আচার্যবর্গের এই ইচ্ছা থেকে স্বতন্ত্র হওয়ার ভয়ে অত্যন্ত ভীত হওয়া উচিত। গুরুদেব ও গুরু-পরম্পরার অন্তর্ভুক্ত আচার্যগণের প্রত্যক্ষ সন্তুষ্টিবিধানের মার্গ থেকে বিচ্যুত যে কোনো স্বতন্ত্র কার্যকলাপই এক মারাত্মক বিপজ্জনক পদক্ষেপ।

শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ভগবদ্ভক্তির মার্গে অগ্রসর হওয়া ঠিক ক্ষুরের ধারের সংস্পর্শে আসার মতো। কেউ যদি ক্ষৌরকর্ম করার সময় সামান্য অন্য মনস্ক বা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সে সঙ্গে সঙ্গে তার দেহ কেটে ফেলবে। ঠিক একইভাবে, আমরা যদি অন্যমনস্ক বা বিক্ষিপ্ত হয়ে ভগবদ্ভক্তির মূল লক্ষ্য সম্বন্ধে বিস্মৃত হই যে আমার প্রকৃত লক্ষ্য কি, তাহলে আমরা বিপথগামী ও অধঃপতিত হয়ে পড়ব। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি লক্ষ লক্ষ মানুষ…, পৃথিবীতে উপস্থিত চার বিলিয়ন মানুষের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন বাদে সবাই অধঃপতিত। তারা সবাই হচ্ছে ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে মগ্ন পতিতাত্মা, যারা কৃষ্ণের সঙ্গে তাদের নিত্যসম্বন্ধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছে। সেইজন্য তাঁরা প্রতি মুহূর্তে কষ্ট ভোগ করছে, জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে ও সমগ্র বিশ্বের সর্বত্র হিংসা, ব্যাঘাত, উচ্ছৃঙ্খলতা, অবক্ষয় ও অবনতি আদি বিভিন্ন অনৈক্য দেখা দিচ্ছে। তাই শুদ্ধ ভক্তের যে দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থাৎ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের যে দৃষ্টিভঙ্গি শ্রীল প্রভুপাদ পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছিলেন ও তাঁর নিজ জীবনে প্রয়োগ করেছিলেন তা হচ্ছে—আমাদের জীবনে কেবল শুদ্ধ বিষ্ণুভক্তির অভাব রয়েছে। 

এই জগৎও ভগবানের রাজ্য, তাহলে কেন লোকেরা ক্রন্দন করছে? কষ্ট ভোগ করছে? লোকেরা বলতে পারে—“সবকিছুই ভগবানের নিয়ন্ত্রণাধীন, তাহলে কেন আমরা কষ্ট ভোগ করছি?” সাধারণ মানুষ কষ্ট ভোগ করছে, কারণ তারা কৃষ্ণকে পরিত্যাগ করেছে। তারা পরম পুরুষোত্তম ভগবান কৃষ্ণকে পরিত্যাগ করে তাঁর থেকে নিজেদের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ও কেবল ইন্দ্রিয়তৃপ্তির কামনা করে আসুরি প্রভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে। সেইজন্য, এমনকি যদিও এটি হচ্ছে ভগবানের ভৌতিক রাজ্য, ভগবানের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষেত্রগুলির মধ্যে একটি, কিন্তু তবুও সবাই দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করছে, কারণ তারা কৃষ্ণভক্তি, কৃষ্ণসেবা ও কৃষ্ণের দিব্য মহিমা-কীর্তনের আনন্দ সম্বন্ধে বিস্মৃত হয়েছে।

অতএব, এই জগতে কৃষ্ণভাবনামৃত পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে সুফল, সে বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে—“ভগবান শ্রীকৃষ্ণের যুধিষ্ঠির মহারাজকে বিশ্বের দায়িত্বভার অর্পণের সময় যেমন পরিস্থিতি ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও সেরকম হয়ে যাবে; ধন-সম্পদ, খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য, জনগণের সম্পত্তি এবং নদ-নদী, বন-জঙ্গল, সমভূমি, পাহাড়-পর্বতের প্রাকৃতিক সম্পদ, সবকিছুই মানবজাতির কল্যাণে উপলব্ধ হবে। গাভীরা যখন কসাইখানা থেকে সুরক্ষিত থাকে, তখন তারা আনন্দে থাকে ও সবার হৃদয় তৃপ্ত করার মতো যথেষ্ট দুগ্ধ দান করে, যার ফলে মানুষেরা অত্যন্ত উৎকৃষ্ট বুদ্ধিমত্তা লাভ করে। দুধ হচ্ছে মানুষের জন্য সবথেকে আবশ্যক একটি পানীয়দ্রব্য, কারণ তা যেকোনো ব্যক্তিকে পারমার্থিক বিষয় অনুধাবনের জন্য উন্নত বুদ্ধিমত্তা প্রদান করে ও কৃষ্ণভাবনাময় হতে সাহায্য করে। এই ধরনের বৈষ্ণব জগতে এমনকি হিংস্র পশুরাও বৈষ্ণবগণের প্রতি তাদের হিংস্রভাব পরিত্যাগ করে।” 

এই ধরনের বৈষ্ণব সভ্যতা প্রত্যেককে সুখী করে। সেখানে সবাই হরে কৃষ্ণ জপ করে, আনন্দে বিভোর হয়ে নৃত্য করে ও তাদের হৃদয়ে কোনো উদ্বেগ থাকে না। কিন্তু এটা কীসের উপর নির্ভরশীল? কলিযুগ মানেই এর প্রভাবে সবকিছু কলুষিত, কলহপূর্ণ ও বিভাজিত হয়, কিন্তু তবুও এমন সুখকর পরিস্থিতি সম্ভব, কারণ এই কলি যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একটি বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছেন যে—যেহেতু তিনি চৈতন্য মহাপ্রভু রূপে আবির্ভূত হয়েছেন, তাই ভক্তবৃন্দ যদি তাদের আলস্য ত্যাগ করে প্রচার করে, তাহলে কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের এই উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমেই শতাধিক, সহস্রাধিক, লক্ষাধিক জীব উদ্ধার হয়ে যাবে। এর প্রভাব এতই বিশাল যে কেউ এর সীমা নির্ধারণ করতে পারবে না, কেউই এর কার্যকারিতার কল্পনাও করতে পারবে না। তবে এটি সম্ভবপর হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দিব্য কৃপা এবং শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ও শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের কৃপায়, যাঁরা সমগ্র বিশ্বের উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করছেন।

আমরা লক্ষ্য করেছি যে শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র বিশ্বকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন, তিনি চাইতেন সবাই সুখী হোক, সবাই শুদ্ধতম দিব্য আনন্দে নিমগ্ন হোক। তার মধ্যে এইরকম ভাব আছে, ছিল ও সর্বদা বিরাজমান। আর সেইজন্যই আজ আমরা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা এখানে একত্রিত হয়ে রাধা-কৃষ্ণ, মহাপ্রভু, জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরামের মহিমা কীর্তন করছি। ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই সমস্ত কাব্য, অন্যান্য লেখনী ও কার্যকলাপের মাধ্যমে তাঁর এক অনন্য ও বিশেষ ভাব প্রকাশ করেছেন। এবং যে ব্যক্তি এই বিষয়ে প্রশংসনীয় নয় যে তিনি (শ্রীল প্রভুপাদ) শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ও চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনের ভাবধারা পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছেন, সেই ব্যক্তি হয় নির্বোধ নয়ত ঈর্ষান্বিত।

এবং যারা শ্রীল প্রভুপাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর নির্দেশাবলি অব্যাহত রাখার জন্য দিব্য গ্রন্থাবলি মুদ্রণ ও তা বিতরণ করছেন, চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন এবং পবিত্র ধামের মহিমা প্রচার করছেন ও সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণপূজার প্রচার-প্রসার করছেন—মানুষেরা যদি তাদের প্রশংসা না করতে পারে, তাহলে সেটা তাদের মহাদুর্ভাগ্য! তাদেরকে অবশ্যই সমগ্র বিশ্বের সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক মানুষদের মধ্যে গণ্য করতে হবে। 

শ্রীল প্রভুপাদ উল্লেখ করেছিলেন যে সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনের প্রতি প্রশংসনীয়। কিন্তু কিছু তথাকথিত বৈষ্ণবগণ তাদের ঈর্ষার কারণে এই প্রচারকার্যের প্রতি প্রশংসনীয় নয়। তাই সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষও এই ধরনের তথাকথিত ভক্তদের তুলনায় অধিক উন্নত। শ্রীল প্রভুপাদের পরিবার হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পরিবার। তা এত বিশাল যে সমগ্র বিশ্বকে পরিবেষ্টন করতে সক্ষম। শ্রীল প্রভুপাদ এর চেয়ে কম কিছুতে সন্তুষ্ট নন। তিনি চান অসীম প্রচার ও চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী যথার্থরূপে বিতরণ করার মাধ্যমে সবাই নিজেদের দুঃখময় অবস্থা থেকে উদ্ধার লাভ করুক।

যেহেতু আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশ পালনে রত, তাই আমরা জানি যে যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর নির্দেশ পালন করা হবে বা এটাই ইসকনের মূল লক্ষ্য বা প্রধান কর্মসূচি থাকবে, ততক্ষণ অবধি তা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পূর্ণ আশ্রয়াধীন থাকবে, এবং এই আন্দোলন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অপেক্ষা অভিন্ন। একবার, একজন গোস্বামী শ্রীল প্রভুপাদকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন এমন এক সন্ন্যাসী, যিনি পূর্বে একজন বড়ো ব্যবসায়ী বা কিছু ছিলেন ও পরে সেইসব ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। তিনি শ্রীল প্রভুপাদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—“যেহেতু আপনি সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য এত বড় একটি সংগঠন তৈরি করছেন, তাই ঠিক যেমন জড় জগতে কোনো ব্যক্তি অনেক বিভিন্ন জড় আসক্তি ও মিথ্যা উপাধির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, তেমনই আপনারও কি এই আন্দোলনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই? এটা আপনার জন্য এক পারিবারিক আসক্তি বা সাংসারিক, ভৌতিক আসক্তির মতো হবে।” তখন শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন—“যে আন্দোলন কেবল গোবিন্দ বাণী বা কৃষ্ণের বাণী প্রচারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সেই আন্দোলন গোবিন্দ থেকে অভিন্ন। তাই কেউ যদি সেই আন্দোলনের প্রতি আসক্ত হয়, তাহলে এর অর্থ তিনি গোবিন্দের প্রতি আসক্ত, সুতরাং এটি একটি মুক্তাবস্থা। ভগবান গোবিন্দের বাণী এবং স্বয়ং গোবিন্দ অভিন্ন। কারণ পরম স্তরে এই সবকিছুই পূর্ণ। সবকিছুই পরমতত্ত্ব।”

ভগবদগীতাতে বলা হয়েছে—হোম বা অগ্নিযজ্ঞ হচ্ছে ব্রহ্ম, তা পরমতত্ত্ব। বিষ্ণু হচ্ছেন যোগ্যপতি বা পরমব্রহ্ম। যে পুরোহিত বা পূজারী ব্রাহ্মণ যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, তিনি হচ্ছেন যাজী, তিনিও ব্রহ্ম।  এবং যজ্ঞে নিবেদিত নৈবেদ্যও ব্রহ্ম ও এই নিবেদনকার্যও ব্রহ্ম, এবং সম্পূর্ণ যজ্ঞানুষ্ঠানটি ব্রহ্মস্তরে অধিষ্ঠিত। অতএব, এই কলিযুগের যুগধর্ম বা যজ্ঞানুষ্ঠান কী? কলি-কালের ধর্ম—কৃষ্ণ-নাম-সংকীর্তন  [অথবা কৃষ্ণ...] কলিযুগের প্রকৃত যজ্ঞানুষ্ঠান হচ্ছে সংকীর্তনযজ্ঞ—“যজ্ঞৈঃ সংকীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ॥” (ভাগবত ১১/৫/৩২) সংকীর্তন মানে অনেক ভক্ত একত্রে কীর্তন করেন ও ভগবানের মহিমা বিতরণ করেন। যে যে মৃদঙ্গ বাজাচ্ছেন, কর্তাল বাজাচ্ছেন, নৃত্য করছেন, কীর্তন করছেন বা তাদের অনুসরণ করছেন বা সেটি শ্রবণ করছেন বা কীর্তনে অংশগ্রহণ করছেন—তারা সবাই সংকীর্তনের অংশ। তারা সবাই ব্রহ্মস্তরে অধিষ্ঠিত। অতএব, যে গ্রন্থ মুদ্রণ করছেন, গ্রন্থ বিতরণ করছেন, গ্রন্থ পড়ছেন, বা ভগবানের ভক্তদের আশ্রয় প্রদানের জন্য ও ভগবানের সেবা-পূজার জন্য মন্দির নির্মাণ করছেন—পরমার্থিক স্তরে সবাই সমান। তবে সবকিছুই কেবল শুদ্ধ কৃষ্ণভাবনামৃতের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হলে চলবে না। 

সেইজন্য শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের সতর্ক করেছিলেন যে— “জাগতিক সমাজ সেবা বা অন্য কোন ভৌতিক কার্যকলাপে যুক্ত হয়ও না, কারণ সেসব কর্মে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে তোমরা যদি বিপথগামী হয়ে পড়, তাহলে আর সেটা বিষ্ণুযজ্ঞ থাকবে না, তা পুণ্য কর্ম বা অন্য কোন প্রকার কর্মে উপনীত হবে; যা অস্থায়ী বৈশিষ্ট্যযুক্ত।” যেহেতু এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সমগ্র বিশ্বে চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনের প্রচার-প্রসার করছে, কৃষ্ণ-কথা ও কৃষ্ণের বাণী প্রচার করছে, তাই এই আন্দোলনের দিব্য কার্যকলাপে নিযুক্ত প্রত্যেক ভক্ত ব্রহ্মস্তরে নিমজ্জিত, তারা সবাই দিব্যস্তরে অধিষ্ঠিত ও তাদের প্রত্যেকটি কার্যকলাপ মুক্ত স্তরের কর্ম

[পাশে: জয় রাধা গোবিন্দ! জয় জগন্নাথ সুভদ্রা বলরাম!] 

শ্রীল প্রভুপাদ খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন যে— যারা দিব্য বিষয়বস্তু সম্বন্ধে ও কৃষ্ণভাবনামৃত সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু অজ্ঞানতায় দুর্ভোগ পীড়িত মানুষদের মধ্যে তা বিতরণ করে না বা প্রচার করে না, তারা কনিষ্ঠ অধিকারী। হতে পারে তারা সবথেকে জ্ঞানী বা তাদের মধ্যে অনেক লক্ষণীয় গুণ আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে যদি এই দিব্য বাণী বা জ্ঞান বিতরণের অনুকম্পা না থাকে, তাহলে তারা হচ্ছে কনিষ্ঠ অধিকারী। তাঁরা জড় আসক্ত ও এই জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের উন্নতিকে সীমিত করছে।” তাই, শ্রীল প্রভুপাদ সেই সমস্ত মানুষদের বেরিয়ে আসতে অনুরোধ করছিলেন, যারা পবিত্র তীর্থে বাস করে, কিন্তু প্রচারকার্যে নিযুক্ত নয়। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন তীর্থস্থানের বিভিন্ন মানুষদের বের করে এনে তাদেরকে প্রচারে নিযুক্ত করার প্রয়াস করেছিলেন। 

এই সবেমাত্র আমার বৃন্দাবনের একজন পণ্ডিতের সাথে দেখা হয়েছিল, যিনি ব্যাংককে প্রবচন দিচ্ছিলেন ও বলছিলেন, “শ্রীল প্রভুপাদও আমাকে পাশ্চাত্যে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু আমি বলেছিলাম—আমি বুঝতে পারছি না যে আমি সেখানে গিয়ে কি করব, ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে আমি সেখানে যেতে একটু ভয় পাচ্ছিলাম তাই যাইনি, কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে যে আমি এক বড় ভুল করেছি। সেই জন্য আমি এখন এখানে এসেছি।” শ্রীল প্রভুপাদ কত বিভিন্ন ব্যক্তি, সাধু, মহাত্মা ও গুরুভ্রাতাদের যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তিনি সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারে সহায়তার জন্য তাদেরকে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি কেবল তাঁর গুরুমহারাজ ও শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত আর কারও কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাননি। অবশ্য এটাই হচ্ছে প্রকৃত নির্ভরশীলতা। আমাদের সর্বপ্রকার স্বতন্ত্রতা পরিত্যাগ করে কেবল গুরুদেবের কৃপার উপর নির্ভরশীল হতে হবে। 

অতএব, এই আন্দোলনের ঐতিহ্য হচ্ছে—শ্রীল প্রভুপাদ এক বিশাল সংগঠন তৈরি করেছেন, যার নাম আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), যার বিভিন্ন শাখা সমগ্র বিশ্বের প্রত্যেক মহাদেশে বৈদেশিক ভাষায় ডজন ডজন গ্রন্থ মুদ্রণ করছেন। এই সংস্থার ঐতিহ্য হচ্ছে—মায়াপুর থেকে উদ্ভূত সংকীর্তন আন্দোলন এখন সমগ্র বিশ্বে এর শিকড় বিস্তার করেছে। আর এই বৃক্ষের শাখা সমগ্র বিশ্বে পরিব্যপ্ত হয়েছে, এটি মূল বৃক্ষ, যা মূল উৎসের সঙ্গে সংযুক্তআমরা আমাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারব না, যদি আমরা মূল উৎসের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলি, তাহলে কোন না কোনভাবে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব, ঠিক যেমন কোনো শাখা বৃক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেটিকে দেখেও বৃক্ষের একটি শাখা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে এর সতেজতা চলে যায় ও তা শুষ্ক হয়ে যায়, এবং মূল বৃক্ষের সঙ্গে আর কোন সংযোগ না থাকায় অসার হয়ে পড়ে। অতএব, আমাদের ঐতিহ্য হচ্ছে—সংকীর্তন আন্দোলনে একত্রে সহযোগিতা করা ও পরম পুরুষোত্তম ভগবানের সেবায়  কায়-মন ও বাক্য উৎসর্গ করে তাঁর বাণী প্রচার অব্যাহত রাখা।

এটি এক প্রকার সাধনা। আমাদের বোঝা উচিত যে এটি হচ্ছে এক অনুশীলন প্রক্রিয়া, একধরনের শুদ্ধিকরণ ও কৃষ্ণের সমীপবর্তী হওয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়, এবং এর মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে পূর্ণরূপে এই চিন্তা, এই পরিকল্পনা ও এই সেবায় নিযুক্ত করতে পারি যে—যারা জরা প্রকৃতির দাসত্ব করে অজ্ঞানতা ও দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বারংবার জন্ম-মৃত্যু চক্রে আবর্তিত হতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের কীভাবে উদ্ধার করা যাবে। অতএব, যিনি এই সংকীর্তন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, তিনি মহিমান্বিত ও তৎক্ষণাৎ সুখী হন। কিন্তু যে কোনো না কোনোভাবে চৈতন্য মহাপ্রভুকে সন্তুষ্ট করার ও সংকীর্তন আন্দোলনকে প্রসারিত করার এই ভাব থেকে নিজের মনোভাবকে বিচ্ছিন্ন রাখে, সে তৎক্ষণাৎ অসন্তুষ্ট ও অস্থির বোধ করে।

এই প্রক্রিয়া খুবই সরল। বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের এই সাধারণ বিষয় সম্বন্ধে বোঝা উচিত ও এটিকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা উচিত। এটি কেবল তাঁদেরই উপকার করবে না, বরং সমগ্র বিশ্বকে ধ্বংসাত্মক দিক থেকে ফিরিয়ে এনে পূর্ণ পুনর্গঠন ও এক স্বাভাবিক এবং আদর্শ অবস্থার দিকে পরিবর্তন করবে।

অতএব, শুদ্ধ কৃষ্ণভাবনামৃত ব্যতীত এমন সৌহার্দ্য আনয়নের আর অন্য কোন উপায় নেই। যেকোনো সংযত মনের ব্যক্তি গভীরভাবে বিচার-বিবেচনা করলে ও নিত্য শাশ্বত আত্মা এবং পরম পুরুষোত্তম ভগবানের অংশ রূপে নিজের সঙ্গে এই জড় জগতের সম্বন্ধ বিষয়ে দিব্য সত্য অনুধাবন করতে পারলে, তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন যে—কৃষ্ণভাবনামৃত ব্যতীত এই জগতের আর অন্য কোন বিকল্প নেই। 

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ 
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ॥  

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 24/12/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions