নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রী শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ, লন্ডন, ইংল্যান্ডে দিয়েছেন। প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতম ১ম্ স্কন্ধ, ১১ অধ্যায়, ১০ম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে। প্রবচন দেওয়া হয়েছে শ্রীমতি রাধারানীর শুভ আবির্ভাব দিবসে।
“জপের মাধ্যমে আমরা কৃষ্ণকে দর্শন করতে পারব”
মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
শ্রীমদ্ভাগবতম ১.১১.১০
কথং বয়ং নাথ চিরোষিতে ত্বয়ি প্রসন্নদৃষ্ট্যাখিলতাপশোষণম্ ।
জীবেম তে সুন্দরহাসশোভিতমপশ্যমানা বদনং মনোহরম্ ॥
ইতি চোদীরিতা বাচঃ প্রজানাং ভক্তবৎসলঃ।
শৃ্ান্বানোঽনুগ্রহং দৃষ্ট্যা বিতন্বন্ প্রাবিশৎ পুরম্ ॥
অনুবাদ:- হে প্রভু, আপনি ঘদি এইভাবে সব সময় প্রবাসে থাকেন, তা হলে সমস্ত তাপ মোচনকারী সুন্দর হাস্য শোভিত আপনার মুখমণ্ডল দর্শন না করতে পেরে কিভাবে আমরা জীবন ধারণ করতে পারি?
তখন ভক্তবৎসল ভগবান প্রজাদের এই প্রকার অভিনন্দনবাক্যসমূহ শ্রবণ করে সহর্ষে তার চিন্ময় দৃষ্টিপাতের দ্বারা কৃপা বিস্তার করতে করতে দ্বারকা নগরীতে প্রবেশ করলেন।
তাৎপর্য:- শ্রীকৃষ্ণের আকর্ষণ এতই প্রবল যে তাঁর প্রতি একবার আকৃষ্ট হলেতাঁর বিরহ আর সহ্য করা যায় না। কেন এমন হয়? কারণ আমরা সকলে তাঁর সঙ্গে শাশ্বত সম্পর্কে সম্পর্কিত, ঠিক যেমন সুর্যকিরণ সুর্যমণ্ডলের সঙ্গে নিত্য সম্পর্কযুক্ত। সূর্যকিরণ সুর্যের বিকিরণের অণুসদৃশ অংশ। তাই, সূর্যকিরণকে সুর্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। মেঘের দ্বারা তার বিচ্ছেদ সাময়িক ও কৃত্রিম, এবং মেঘ সরে গেলে সূর্যের উপস্থিতিতে সূর্যকিরণ পুনরায় তার স্বাভাবিক জ্যোতি প্রকাশ করে। তেমনই পূর্ণ পরম আত্মার অনুসদৃশ অংশ জীবেরা মায়ার কৃত্তিম আবরণের দ্বারা ভগবান থেকে বিচ্ছিন হয়ে পড়ে। এই মোহময়ী শক্তি বা মায়ার যবনিকা যখন উত্তোলন করা হয় তখন জীব ভগবানকে সাক্ষাৎভাবে দর্শন করতে পারে, এবং তখন তার সমস্ত দুঃখ দুর্দশা দূর হয়ে যায়। আমরা সকলেই আমাদের জীবনের দুঃখ দুর্দশা দূর করতে চাই, কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব তা আমরা জানি না। এখানে সেই সমস্যার সমাধান দেওয়া হয়েছে, এবং তা নির্ভর করছে আমরা তা গ্রহণ করব কিনা তার উপর।
***
জয়পতাকা স্বামী:- আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে যে আমাদের সমস্যার সমাধান কি এবং আমরা যদি এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তাহলে তৎক্ষণাৎ আমাদের সকল সমস্যার সমাধান হবে। আসলে এই সকল ভক্তরা কৃষ্ণের উপস্থিতিতে বা কৃষ্ণের বিরহে মগ্ন থাকেন, তারা জড় জগতে তাদের সকল প্রকার দুঃখ-কষ্টে নিজেদের চেতনা সম্পর্কে সচেতন থাকে। এটিই কৃষ্ণের গুণ যে কেউ যদি কৃষ্ণের প্রতি একটু আসক্তি বিকশিত করেন বা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন, তাহলে তিনি কৃষ্ণকে ভুলে থাকতে পারেন না। এবং সেই ব্যক্তির কাছে এই জড়জগতের তথাকথিত আনন্দ ও দুঃখ খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, এই হচ্ছে কৃষ্ণের প্রতি আসক্তির শক্তি, কারণ প্রকৃতপক্ষে এই জড়জগত প্রতিবিম্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। সূর্যের আলো অতি উজ্জ্বলভাবে দীপ্তিমান, কিন্তু কোন রঙ্গিন, অসমতল, অপূর্ণ প্রতিবিম্বতলের মধ্যে থেকে যে প্রতিবিম্ব আসে, তা সূর্যের প্রকৃত দীপ্তির সাথে তুলনীয় নয়।
ঠিক যেমন ইংল্যান্ডে প্রত্যেকদিন সূর্য ওঠে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা মেঘলা আকাশের কারণে দৃশ্যমান নয়। সূর্যের আলো কোন না কোনভাবে মেঘের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়, কিন্তু কেউই সেটিকে সরাসরি আশা সূর্যালোকের সমান রূপে গ্রহণ করে না, তারা বলে না যে তা সূর্যের আলোময় রোদ ঝলমলে দিনের মতো একই। ঠিক যেমন আজকে বাজে দিন। সূর্য নেই, মেঘলা, অন্ধকারময়। এবং যখন উজ্জ্বল সূর্যালোক প্রবেশ করে, তখন তারা বলে, “আজকে খুব ভালো দিন!” এবং প্রত্যেকেই অত্যন্ত উদ্দীপ্ত অনুভব করে।
তাই যদি আপনি কখনও সূর্য না দেখেন, তাহলে অবশ্য আপনি হয়ত ভাবতে পারেন যে, “আহ! ঠিক আছে।” কিন্তু একবার যখন আপনি সূর্যকে দেখবেন, তাহলে যতবারই আপনি এইরকম মেঘাচ্ছন্নতা, স্বল্প মেঘাচ্ছন্নতা, বা সম্পূর্ণ মেঘলা দিন দেখবেন, আপনি কিছু ফারাক খুঁজে পাবেন। তবে তা সেই স্থানপূর্ণ করে না, তাই জন্য আপনি সবসময় ভাববেন যে কখন আমরা আবার রোদ ঝলমলে দিন পাব! ঠিক একইভাবে এই জড়জগত মায়ার দ্বারা আচ্ছাদিত। এই জগতে আমরা যা কিছু ভালো দেখি তা শ্রীকৃষ্ণের স্বল্প গুণ মাত্র, যা প্রকাশিত হচ্ছে তবে কেবল এক ভগ্নাংশ মাত্র। যখন মায়া সরে যাবে, মেঘ সরে যাবে, তখন আমরা সম্পূর্ণ সৌন্দর্য দর্শন করতে পারব, তখন আমরা পূর্ণ পরিপূর্ণতা দেখতে পাব, যা আমরা খোঁজ করছিলাম।
কেউ হয়ত আমাদেরকে বিশ্বাস করাতে চাইবে যে রোদ ঝলমলে দিন বলে কিছুই হয় না, মেঘাচ্ছন্নতাই নিত্য গুণ। পরম সত্য বলে কিছুই নেই, পরম পুরুষ, পরম সৌন্দর্য, পরম পরিপূর্ণতা বলে কিছুই নেই। আমরা যা কিছু দেখি, সেটাই আছে। এটা তাদের জন্য ঠিক আছে যারা চোখ খুলে এর থেকে বেশি কিছু দেখেনা, কিন্তু একবার যদি কেউ তার চোখ এমনকি একটুও খোলে, তাহলে সে এক ঝলক বুঝতে পারবে, হয়ত শুদ্ধ দীপ্তির এক রশ্মি মাত্র পাবে। এরপর সে কিভাবে সন্তুষ্ট থাকতে পারে? সেই ব্যক্তি এই জড়, পরিবর্তনশীল বিশ্বকে সবকিছু ভেবে কিভাবে সন্তুষ্ট থাকতে পারে? তাই দ্বারকাবাসীদের মত আমরাও এই খারাপ পরিস্থিতির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারি। তারা কত ভাগ্যবান?! কৃষ্ণ নিন্মে এসেছেন এটি প্রদর্শন করার জন্য যে ভক্তরাও তাঁর সাথে থাকতে পারেন। তারাও তাঁর সঙ্গ লাভের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন ধরনের লীলায় অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন সম্পর্কের মাধ্যমে ভিন্ন রস, মিষ্টতা আস্বাদন করার দ্বারা পরিপূর্ণতা পেতে পারে। ঠিক দ্বারকাবাসীদের মত, তারা কৃষ্ণভাবনাময় হতে সক্ষম ছিলেন। তারা দ্বারকায় কত লীলা করেছিলেন, যার অর্থ হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত কারো মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বর্ণিত আছে যে কালিন্দী... কুলীন গ্রাম, সেখানে রামচন্দ্র খান... অন্য রামচন্দ্র খান। হরিদাস ঠাকুর সর্বদা পুলিনবাসীদের অনুকূলে ছিলেন, সেখানে এমনকি যে সমস্ত ব্যক্তিরা শুকরদের এইদিক ঐদিক নিয়ে যাচ্ছিল, তারাও হরেকৃষ্ণ বলছিল, এমনকি তারা কৃষ্ণের গুণের প্রশংসা করছিল। অর্থাৎ, এক অর্থে বলতে গেলে যে কেউ কৃষ্ণভাবনাময় হতে পারে। এটি কৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা — স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রা (গীতা ৯.৩২) যারা সাধারণত দুর্ভাগ্যবান, খুব বেশি উচ্চ তত্ত্ব বোঝে না, ব্যবসায়ী, শূদ্র, সাধারণ নারী – যারা মহান দার্শনিক তত্ত্বগত বিষয়ের মধ্যে থাকে না, তারাও বিশেষ কৃপা পাবে, প্রত্যেকে পাবে! তাহলে যারা অধিক বুদ্ধিমান তাদের সম্পর্কে আর কি বলার আছে? যদি তারাও কৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করে, তাহলে তারা খুব সহজেই তা অর্জন করতে সক্ষম হবে। তা মায়ার এই আচ্ছাদন বিচ্ছেদ করে।
মায়ার অর্থ যা নেই, যেটা নেই। এই মায়া হচ্ছে মা – না, য়া – কৃষ্ণের কাছে যাওয়া। এটি আমাদেরকে কৃষ্ণের কাছে যাওয়া থেকে আটকায়, আমাদেরকে কৃষ্ণকে দর্শন করা থেকে এবং কৃষ্ণকে বুঝতে পারা থেকে আটকায়। মায়া – তুমি যেতে পারবে না। ঠিক যেমন আমি উল্লেখ করছিলাম যে ভারতীয় এক পরিবার তাদের পুত্রকে আমাদের মন্দিরে এসে জপ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে তার জড়জাগতিক উন্নতি লাভের জন্য প্রার্থনা করতে উৎসাহিত করছিলেন, যাতে সে কলেজে ভালো পরীক্ষা দিতে পারে ও আর অন্যান্য কিছু। তারা যেহেতু ভারতের, তাই সেখানকার মানুষেরা ধর্মে বিশ্বাস করে, কিন্তু সাধারণত তা অর্থ লাভের জন্য এবং কাম অর্থাৎ ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের জন্য। কিন্তু সেই ছেলেটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিল, তাই কিছু সময় পরে, মন্দিরে আসার কিছু মাস পরে সে ১৬মালা জপ করতে শুরু করে এবং অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয় যে, সেখানে যাওয়ার অর্থ কি? সে ছিল এক নব শিক্ষার্থী তাই এই পর্যায়ে সে ভাবছিল যে সেখানে সম্পূর্ণ জাগতিক শিক্ষায় প্রবেশ করার কি মানে আছে? তাই তার এই ধারণা হয়েছিল যে, “আমি বর্ণাশ্রম কলেজে ঢুকব এবং সেখানে কৃষ্ণভাবনামৃত শিক্ষা পেয়ে প্রচারক হব।” তার পিতা অনুভব করেছিলেন যে সে হচ্ছে পরিবারের কুলাঙ্গার। তার সব ভাইবোনেরা উচ্চপদস্থ কর্মচারী, কার্যকর্তা, সামরিক ব্যক্তি। তিনি এক পেশাদারি ব্যক্তি ছিলেন, তাই চেয়েছিলেন যে তার ছেলে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সম্পন্ন করে আমেরিকায় যায় ও সেখানে একটি কাজ করে, তাহলে তিনি আমেরিকা থেকে তার ছেলের সাথে ফিরে এসে সকলকে দেখাতে পারবেন যে আমি করে দেখিয়েছি। এইভাবে তার বাবা নিজের মুখ বাঁচাতে পারবে। তবে হঠাৎ তার ছেলে বলছে, “আমি পাশ্চাত্যে যেতে চাই না, আমি ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে চাই।” তার বাবা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন, তিনি এসে ভক্তদের উপর চিৎকার করেন। আগে তিনি সবসময় প্রশংসা করতেন, “আপনারা চমৎকার কার্য করছেন, আপনারা বৈদিক সংস্কৃতির আসল কার্য সম্পাদন করছেন।” তবে এখন তিনি এসে চিৎকার করছেন এবং আর্তনাদ করছেন যে, “আপনারা আমার ছেলেকে নষ্ট করে দিয়েছেন, আপনারা তার মাথা নষ্ট করে দিয়েছেন, আপনারা গুপ্তচর!!”এই, ওই এত কিছু। কেন? কারণ এটিই হচ্ছে মায়া। আপনি হয়ত একটুখানি ধার্মিক হতে পারেন, কিন্তু কেবল সেই ভগবানই আপনার খাবার জোটাচ্ছেন, তারা বলে, “হে ভগবান আজকে আমাদের খাওয়ার রুটি দিন!” সেটাও ঠিক আছে, এটাও বলা যেতে পারে কারণ এটা মায়ার অধীনের মধ্যে। ঠিক যেমন আমরা ফোন করি, ঠিক তো? আপনারা বলেন, “আমার পিজা চাই। প্লেইন।” “হে ভগবান! আমাদের পিজা, রুটি দিন প্রত্যেকদিন।” ঠিক? বলুন এর মধ্যে তফাৎ কি? ভগবানকে আমরা কিছুই দিচ্ছি না, তবে যিনি দিতে আসেন, তাকেও আমাদেরকে টাকা দিতে হয়। এমনকি এটাও খারাপ নয়, অন্ততপক্ষে ভগবানের সাথে কোন সম্পর্ক আছে। যেমন একেবারে না থাকার থেকে কিছু থাকা ভালো। আমরা তাদের নিন্দা করছি না, তবে একেবারে কোন সম্পর্ক না থাকার থেকে, কিছু সম্পর্ক থাকা ভালো। যারা রজ এবং তম গুণের, যারা রজ এবং তমগুণে আছে, তাদের দু ধরনের সম্পর্ক আছে — হয় ভগবানের সাথে কোন সম্পর্ক নেই বা ভগবান মৃত অথবা তিনি আমাদের চাহিদা সরবরাহকারী, তিনি আমাদেরকে সবকিছু প্রদান করবেন। ঠিক যেমন রাশিয়াতে বিপ্লবের পর সেখানকার মানুষদের অবস্থা ... সেখানে সরকার খাবার সরবরাহ করা বন্ধ করে দেয়। মানুষেরা অনাহারে থাকছিল, তখন কিছু লোকেরা তাদের কাছে গিয়ে বলত,
“তুমি কি ক্ষুধার্ত?”
“হ্যাঁ!”
“তোমাদের কাছে কি রুটি আছে?”
“না!”
“তোমরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করো না? কেন চার্চে যাও, প্রার্থনা করো! চার্চে গিয়ে প্রার্থনা করো।”
এরপর তারা সেখানে গিয়ে প্রার্থনা করে, “ভগবান, আমাদের কিছু রুটি দিন।” তারপর তারা বেরিয়ে আসত। তারা বলত, “ভগবান তোমাদের কোন রুটি দিয়েছেন?” তারা বলত, “না! এখনো দেননি।” তুমি আমাদের কাছে রুটি চাও। “আমাদেরকে কিছু রুটি দিন।” “ট্রাক নিয়ে এসো, ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে এসো, তাদেরকে রুটি দাও! তোমাদের ভগবানের কি মানে আছে? তিনি তোমাদেরকে রুটি দেন না, আমরা তোমাদের রুটি দেই। আমরা ভগবান।” সেই লোকেরা এইভাবে বলত, এই ছিল তাদের পন্থা। অবশ্য কৃষ্ণের দেওয়া বৃষ্টি, সূর্যের আলো ছাড়া তারা রুটি তৈরি করতে পারবেনা। ঠিক যেমন আজকে অপর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে, তাই আমেরিকা থেকে তাদেরকে আটা কিনতে হয়েছে, তারা এটি তৈরি করতে পারেনি কারণ কৃষ্ণ তাদেরকে বৃষ্টি দেন নি, সেই জন্য তারা এক কঠিন পরিস্থিতিতে আছে। এই হচ্ছে জড়জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষেরা হয় তারা ভগবানে বিশ্বাস করে না, অথবা যদি তারা ভগবানে বিশ্বাস করে, তাহলে তারা মনে করে যে তিনি কেবল সরবরাহকারী। যদি তিনি পর্যাপ্ত সরবরাহ না করেন, ঠিক সরকারের মত, প্রত্যেককে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, মুরগি মাংস না দিলে, ঠিক আছে একে দূর করো। ঐ পরিস্থিতিও এইরকম। “ওহ! ভগবান আমাদেরকে দিচ্ছেন না, তাকে ছেড়ে দাও।”... “ভগবান মৃত।”
এমনকি ভগবান শব্দটিও চারিদিকে এক গোঁড়ামী প্রসঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। এইজন্য, আমরা বলি, “পরম পুরুষোত্তম ভগবান।” এটি এক উত্তম ধারণা। প্রকৃতপক্ষে, সূর্য যেমন এই সমগ্র মহাবিশ্বকে সহায়তা করছে এবং তা এই মহাবিশ্বের থেকে কোটি কোটি গুন বৃহত্তর, ও কোটি কোটি গুন বড় সেই সব গ্রহকেও হয়ত করা হচ্ছে। “একো বহুনাম যো বিদধাতি কামান” — একটি মূল উৎস দ্বারা হচ্ছে, যিনি পরম, বুদ্ধিমান এবং অবিনশ্বর গুণাবলী দ্বারা পরিপূর্ণ। আমরা অনতিবিলম্বে খুব সহজেই তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে পারি কিন্তু জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য রুটি পাওয়ার জন্য ওঁনার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা নয়, তা তিনি ইতিমধ্যেই প্রদান করছেন, তিনি রুটি সরবরাহ করছেন। অবশ্যই আমরা এমনভাবে প্রার্থনা করতে পারি। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি চান যে আমরা যাতে নিজেদের কার্যাবলীর উপর নির্ভর করে এগিয়ে যাই, আমরা যাতে ওঁনার প্রকৃত গুণ উপলব্ধি করার জন্য নিজেদের চেতনা জাগ্রত করি। আকর্ষিত কঠিন নয়, তা স্বাভাবিকভাবেই হয়। আমরা যখন কৃষ্ণের সম্পর্কে শ্রবণ করি, আমরা যখন কৃষ্ণকে দর্শন করি, তখন কেউ যদি অপরাধজনক(যিনি ভক্তদের প্রতি হিংসাত্মক বা এমন কিছু কার্য করেছেন) না হন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। সাধারণভাবে বলতে গেলে, কৃষ্ণের সাথে কেবল একটু সম্পর্ক থাকলেই তা হয়। কেবল একটু কৃষ্ণপ্রসাদ আস্বাদন করা বা শ্রীবিগ্রহ দর্শন করা অথবা কীর্তন শ্রবণ করার মাধ্যমে কেউ কৃষ্ণের প্রতি আকর্ষিত হয়। এবং একজন যত বেশি নিজের মনকে কৃষ্ণের প্রতি আকর্ষিত হতে দেয়, এটিকে রোধ করতে না চায়, যেমন আমাদের আসলে জোর করে আকর্ষণ করাতে হবে। আমি যখন প্রথম ভক্ত হয়েছিলাম, তখন মন্ট্রিলে ছিলাম, সেই সময় আমার ভাই এসেছিল। সে আমার থেকে পাঁচ বছরের ছোট। সে মন্দিরে থাকছিল, প্রসাদ পাচ্ছিল।
একদিন সে এসে বলল, “এখন আমাকে যেতে হবে।”
আমি বললাম, “কেন?”
সে বলল, “কারণ আমি এটির প্রতি খুব আসক্ত হয়ে যাচ্ছি। আমি প্রসাদ ভালোবাসছি, জপ করতে ভালোবাসছি, আমি যদি এখানে আরেকটু থাকি, তাহলে আমি যখন ঘরে ফিরে যাব, তখন কি খাব? সেখানে কেউই নিরামিষ খাবার রান্না করতে পারবে না। খুব বেশি দেরি হওয়ার আগে ভালো হবে আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাই!”
এটাই হচ্ছে জড়জাগতিক ভাব। আসলে মানুষেরা প্রশ্ন এড়িয়ে চলে, তারা এটিকে এড়িয়ে চলে। তারা পরম পুরুষের সাথে সম্পর্কিত সবকিছু এড়িয়ে চলার প্রয়াসের দ্বারা নিজেদেরকে বিশাল কিছু দেখানোর চেষ্টা করে। অনেক ব্যক্তিরাই এইরকম করে। এমন অনেক নিরীহ মানুষ আছে, তারা বিশেষত এসব এড়িয়ে যায়, বিশেষত এসবের সঙ্গ করে না। তারা নিরুৎসাহিতও, কারণ এমন অনেকেই আছে যারা নিজেদের ভগবত চেতনাময় দেখাতে ভালোবাসে, কিন্তু তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে এর মাধ্যমে জড়জাগতিক কিছু সুবিধা লাভ করা। তাদের কৃষ্ণের গুণাবলীর প্রতি আদপে কোন আকর্ষণ নেই। ভাগবতমে কৃষ্ণভাবণামৃত আন্দোলনের কথা বর্ণিত আছে, শুদ্ধ অকপট প্রতারণা মুক্ত রূপে। এতে সব ধরনের প্রতারণামূলক ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বর্ণিত আছে যে প্রতারণামূলক ধর্ম হচ্ছে এমন কিছু যা নিত্য পরম সত্য বিহীন অন্য ফল প্রদান করে। যদি অন্য কিছু পাওয়ার জন্য ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা শুদ্ধ নয়। যদি আমাদের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য এক হয়, তবে এটি যথাযথ কারণ তা নিত্য। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য যদি এই প্রক্রিয়ার চেয়ে ভিন্ন হয়, তাহলে তা যথাযথ নয়। তাতে সর্বদা ভন্ডামি আছে। অতএব, এই কৃষ্ণভাবণামৃত আন্দোলন সেই বৈচিত্র্যের ঐক্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য একই, যেটি অদ্বিতীয়।
এখানে ভক্তরা প্রার্থনা করছেন যে তারা কেবল কৃষ্ণকে ভালোবাসেন কৃষ্ণের কে সেই জন্য। তারা এমন বলছেন না যে, “কৃষ্ণ, আমরা আপনার হাসি দেখতে চাই, কারণ আপনার হাসির দ্বারা বাঙ্কে অর্থ বাড়াবে বা অন্য কিছু।” যদিও এর কোনো সন্দেহ নেই যে কৃষ্ণের উপস্থিতিতে তারা পূর্ণ সৌভাগ্য লাভ করছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তারা কেবল কৃষ্ণকে তিনি যে কৃষ্ণ সেই জন্যই ভালবাসেন। তারা ওঁনার হাসিমুখ দেখতে ভালোবাসেন। এটি তাদের কাছে সর্ব বৃহৎ উৎসব। বৃন্দাবনে কৃষ্ণ সন্ধ্যা বেলায় গাভী নিয়ে ফিরে আসতেন। আসলে কৃষ্ণের সেই সময়ে মাঠ থেকে গাভী নিয়ে ফিরে আসার ফলে মাটিতে গাভীর পায়ের ছাপ পড়ত, আর সেই এলাকা পুরো খুঁড়ের ধূলিতে ভরে যেত, আকাশ এমন হত যেন ঠিক ছোট ধুলির মেঘ। সূর্যাস্তের আগে সূর্যের আলো যখন কমতে শুরু করে, কিন্তু সূর্যাস্ত হয়নি, বিকেল হয়নি, তাকে বলে গো-ধুলি। গো মানে গাভী, ধুলি মানে আকাশে গাভীদের ধূলির মেঘ। তাই এটিকে একপ্রকার স্নান করার মত বিবেচনা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি শুদ্ধ করে। এমনকি কেউ যদি সেই ধূলিকণার মধ্যে যায়, তাহলে সে দূষিত হয় না, বরং পরিশুদ্ধ হয়। কিন্তু বৃন্দাবনের ভক্তগণ সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করতেন, এই কারণে নয় যে তারা গো-ধূলি দ্বারা শুদ্ধ হতে চাইতেন, বিশেষত এই কারণ যে তারা কৃষ্ণের শ্রীমুখপদ্ম দর্শন করতে চাইতেন। এটি ছিল তাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উত্সব: কৃষ্ণকে তাঁর সখাদের সাথে দর্শন করা, গাভীদের সঙ্গে আসতে দেখা। এটি এক নিত্য-মহোৎসব। পার্বণকে বলা হয় উৎসব। উৎ এর অর্থ হচ্ছে উন্নতি, সব এর অর্থ সকলের, প্রত্যেক জীবের। উত্সাহ - উদ্যম ইচ্ছা। উত্সব - এটি আমাদের উত্সাহ, জ্ঞান, আনন্দ, খুশিকে বৃদ্ধি করে। এই হচ্ছে উত্সবের মানে। আর মহ মানে মহান। মহোৎসব - একটি মহান উৎসব।
ভাগবতমে বর্ণিত আছে যে কৃষ্ণ যখন গাভী নিয়ে ফিরে আসতেন, তখন সকল বৃন্দাবনবাসী ভক্তরা কৃষ্ণকে দেখার জন্য তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেন। তা ছিল এক মহোৎসব, সকল বৃন্দাবনবাসীদের জন্য এক আনন্দ, অনুপ্রেরণা ও উত্সাহের মহান উৎস। এটি ছিল একটি উৎসব। একইভাবে, দ্বারকাবাসীদের জন্যও কৃষ্ণকে দর্শন করা ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব। তাই, কেউ যদি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এই শুদ্ধ আকর্ষণ এবং স্নেহ গড়ে তোলে, যা এমন ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত নয় যে, “কৃষ্ণ আমার সাথে কি করবেন? এসবের মধ্যে আমার জন্য কি আছে?” তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেই স্থিতি আসবে। এখন অবশ্য আমরা মনে করি যে, “আমার কৃষ্ণের পূজা করা উচিত কারণ আমি জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই। আমি আমার নিত্য আধ্যাত্মিক আত্মাকে উপলব্ধি করতে চাই।” অথবা “আমি এই দুঃখজনক অবস্থা থেকে বের হতে চাই।” নয়ত “আমি বুঝতে চাই চরম বাস্তব কি?” প্রাথমিকভাবে আমাদের হয়ত অনেকগুলি উদ্দেশ্য থাকবে, কিন্তু দ্বারকাবাসীদের এই স্তরটি হচ্ছে পরিপূর্ণ পর্যায়। তারা তাদের অন্যান্য সকল প্রকার ভাবনা অতিক্রম করেছিল। তারা কেবল শুদ্ধভাবে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং কৃষ্ণকে দর্শন করতে আগ্রহী ছিলেন। তাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না। আর এখানে কি বলা হয়েছে? “যাঁর হাসি সকল বাঁধাকে পরাভূত করে।” এর মানে হচ্ছে যখন তারা কৃষ্ণকে দেখেন, তখন আর কোন কষ্ট থাকেনা। যখন তারা কৃষ্ণকে দর্শন করতে পারেন না, তখন সেটাই তাদের কষ্ট। অন্যভাবে বলতে গেলে, যদি আমরা সর্বদা কৃষ্ণকে দর্শন করতে পারি, তাহলে কষ্টের প্রশ্ন আসে কোত্থেকে?
কেউ হয়ত… যেমন বিমানবন্দরে আমরা অনেক লোক দেখি। অবশ্য, এখন আমরা আমেরিকাতে তা ততটা দেখি না, কারণ সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলি অন্যান্য স্থানের মতো অত গাঢ় নয়, যদিও আমরা মাঝে মাঝে তা দেখতে পাই। তবে বিশেষ করে প্রাচ্য, ভারত ও বাংলাদেশে, কখনও কখনও আমরা দেখি যে পঞ্চাশ জন লোক বিমানবন্দরে কাউকে বিদায় জানাতে আসে। এবং তারা যখন চলে যাচ্ছে, তখন তারা কাঁদছে, দুই সপ্তাহের সফর বা এমনকিছুর জন্য যাচ্ছে, কিন্তু তারা তার জন্য কান্নাকাটি করছে এবং একে অপরকে আলিঙ্গন করছে, বাচ্চারা টাটা করছে, এবং এইভাবে আরো কত কিছু চলছে। আর যখন তারা ফিরে আসে, তখন এক বড় মিলনৎসব। যেমন উড়িষ্যায় আমি এক শিষ্যের বিয়েতে গিয়েছিলাম। তাদের এক গ্রামে বিয়ে হয়। সেখানে প্রথা হচ্ছে মেয়ের পরিবার বিবাহের অনুষ্ঠান করবে। তাই তারাই সমস্ত খরচ এবং সমস্ত কিছুর দায়িত্ব নিয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের খুশি করার জন্য তারা ওখানে অনুষ্ঠান করেছিল। সেখানকার রীতি হচ্ছে যেহেতু মেয়ে স্বামীর সাথে চলে যাবে, তাই শাশুড়ি অর্থাৎ মেয়ের মা, মেয়েকে হারাচ্ছেন বলে কাঁদে। আর এই মা, তিনি যেভাবে কেঁদেছেন, তাতে যে কেউ মনে করবে যে মেয়েটি চলে যাচ্ছে নাকি সে মারা গেছে! তিনি এত প্রচন্ড কাঁদছিল যে এক সময় তিনি মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে থাকেন। সবাই শুধু একে অপরের দিকে তাকাল, “কি করব?” (হাসি) তারপর তা এত চরম পর্যায়ে গেল যে সেই মেয়েটাও কাঁদতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অর্ধেক মহিলারা সবাই চিত্কার করে কাঁদতে লাগল, এবং কয়েকজন পুরুষও কাঁদতে লাগল। এটি তাদের অনুভূতি… হতে পারে খুব গভীর অনুভূতি, কিন্তু আসলে এক মাস পর পুত্রবধূ ফিরে আসবে, বা কন্যা ফিরে আসবে, আর তখন এক বড় আয়োজন হবে, তারা বিমান থেকে নামবে, সবাই খুব খুশি হবে। তারপর প্রায় ২ ঘন্টা পরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখানে আমরা দেখতে পাই যে এটা আসলে তাদের (দ্বারকাবাসী) জন্য প্রত্যেকদিনের উৎসব। কৃষ্ণের সাথে থাকার বাসনায় তৃপ্তি আসে না। এই পৃথিবীতে আমরা যে আসক্তি বা অনুভূতি দেখি, তা কেবল এক অতীব ম্লান প্রতিফলন। এবং এখানে কেউই এমন বলতে পারবে না যে, “ওহ, তোমাকে দেখার কারণে আমার সকল দুঃখ, সকল সমস্যা পরাভূত হয়েছে। সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে।” সেই ব্যক্তি ফিরে এসেছে তাই হয়ত অনেক কষ্ট মুছে গেছে। কিন্তু আধঘণ্টা পরে, আবার সব কষ্ট আসবে। তবে তারা যারা কৃষ্ণকে দেখছেন, তাদের সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে। অর্থাৎ, যিনি কৃষ্ণকে দেখতে পান, অবশ্যই তার ওঁনার প্রতি অটুট বিশ্বাস আছে। আমরা জপ করার মাধ্যমে কৃষ্ণকে দর্শন করতে শুরু করতে পারি। কৃষ্ণ তাঁর নামের থেকে আলাদা নয়, তাই আমরা যদি জপ করি —
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
তাহলে আমরা যদি সেই স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বাস বিকশিত করতে পারি, তাহলে কৃষ্ণকে নিজেদের কর্ণ দ্বারা দর্শন করতে পারব। স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বাস এক প্রকার বুদ্ধিযুক্ত বিশ্বাস, যা জ্ঞান এবং উপলব্ধির দ্বারা বিকশিত। অন্ধ বিশ্বাসও আছে, কিন্তু আমরা অন্ধবিশ্বাসের সমর্থক নই।
প্রথমত, কাউকে নিজের বুদ্ধি দ্বারা তত্ত্ব বুঝতে হবে, অধ্যয়ন করতে হবে ও তাতে সন্তুষ্ট হতে হবে। আর তারপর কাউকে সেটি প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগ করার মাধ্যমে কেউ উপলব্ধ বিশ্বাস লাভ করবে। ঠিক যেমন আমরা পড়ি অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন, যখন আপনি তাদের একত্রিত করবেন, তখন আপনি H2O পাবেন, জল পাবেন। “এটা ভালো শোনাচ্ছে।” কিন্তু তারপরে যখন আপনি কিছু অক্সিজেন নিয়ে হাইড্রোজেন জ্বালাবেন, তখন জলীয় বাষ্প পাবেন, এটি খুব সাধারণ এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, যা প্রত্যেক বিদ্যালয়ের রসায়ন ক্লাসে করানো হয়। আপনি জলীয় বাষ্প পেলে বুঝবেন, “ওহ, হ্যাঁ। এই যে প্রমাণ।” সমগ্র আধুনিক যুগের অভিজ্ঞতামূলক বিজ্ঞান এই বিষয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে প্রথমে একটি তত্ত্ব বুঝুন, তারপর তা পরীক্ষা করে দেখুন যে এটি কাজ করে কিনা। অবশ্য, এখানে পার্থক্য হচ্ছে আমি হাইড্রোজেন জ্বালাতে পারি এবং আপনি জল দেখতে পারেন। কিন্তু হরে কৃষ্ণ জপের ক্ষেত্রে আমি হরে কৃষ্ণ জপ করতে পারি, তবে আপনি হয়ত বুঝতে পারবেন না যে হরে কৃষ্ণ জপ করে কি হচ্ছে, কিন্তু সেটা আমি অনুভব করতে পারব। যেহেতু দর্শন করা ভৌতিক, তাই তা ভিন্ন। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা আধ্যাত্মিক স্তরের। সুতরাং, আধ্যাত্মিকভাবে জাগ্রত ইন্দ্রিয় সহ আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আমরা তা অনুভব করতে পারি। একটি পরীক্ষা আছে যে আপনি কাউকে নিয়ে যান… আপনি এসে বলবেন, “আচ্ছা এর কোনো মানে হয় না। এটা খুব একটা বৈজ্ঞানিক নয়।” কিন্তু ঠিক যেমন কেউ বলে, “এটা খুব ভালো রেস্তোরাঁ। ওখানে এসে খাবার খাওয়া যেতে পারে।” যে ব্যক্তি খাবার খাচ্ছেন, তিনি বলবে, “দারুণ।” কয়েকবার হাসবেন। তবে আপনি তাতে সত্যিই স্বাদ বুঝবেন না, আপনি হয়ত ভাববেন, “আচ্ছা এর স্বাদ বেশ ভাল হবে।” কিন্তু আসলে আপনি যখন সেই খাবারের স্বাদ নেবেন, তখনই আপনি তা বলতে পারবেন। কেবল অন্যদের উপর নির্ভর করা খুব একটা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কাউকে নিজেকে খেতে হবে, তাই এর ব্যবস্থাটি আছে।
আধ্যাত্মিক জীবনে আমাদের তা অনুশীলন করা উচিত। তারপর হবে বুদ্ধিযুক্ত বিশ্বাস, উপলব্ধ বিশ্বাস, আর তারপর আসবে স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বাস। এরপর আমরা আরও অধিক থেকে অধিকতর অগ্রসর হতে থাকব। তখন আমাদের নিঃশর্তভাবে, পরিবর্তনহীনভাবে আধ্যাত্মিক গুরুদেব গ্রহণ করার প্রতি বিশ্বাস থাকবে, কৃষ্ণের ভক্তিমূলক সেবা করার প্রতি বিশ্বাস থাকবে। ভাগবত উপদেশ দিচ্ছে যে আমাদের ভক্তিমূলক সেবা করা উচিত:—
বাসুদেবে ভগবতি ভক্তিযোগঃ প্রয়োজিতঃ।
জনয়ত্যাশু বৈরাগ্যং জ্ঞানং চ যদহৈতুকম্ ॥
[ভাগবত ১.২.৭]
স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে।
অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি ॥
[ভাগবত ১.২.৬]
সুপ্রসিদতি - সম্পূর্ণ সন্তুষ্টির জন্য, সম্পূর্ণ প্রসন্নতার জন্য। অহৈতুক্যপ্রতিহত। অহৈতুকি মানে কারণহীন; অপ্রতিহত মানে অটল। “আজকে, আমি কৃষ্ণকে বিশ্বাস করি, কালকে আমি কৃষ্ণকে বিশ্বাস করি না। পরের দিন আমি আর তাঁকে বিশ্বাস করি না।” বিশ্বাস, সম্বন্ধ এবং অনুশীলনকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তা অটুট থাকবে। অপ্রতিহত মানে যেমন আমরা প্রতিদিন জপ করি। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা হয়ত প্রতি মুহুর্তে কৃষ্ণের ধ্যান করতে সক্ষম নাও হতে পারি। আমাদের কত কাজ আছে, আমাদের কত কিছু করার আছে। কিন্তু প্রতিদিন, আমরা কৃষ্ণের কথা চিন্তা করছি, কার্যত অতি স্বল্প মুহূর্ত আমরা কৃষ্ণের কথা ভাবছি, এবং অবশিষ্ট সময়ে আমরা কৃষ্ণের জন্য বিভিন্ন সেবা করছি, অথবা আমরা নিজেদের কৃষ্ণ চেতনা বিকাশিত করার জন্য বা আমাদের দেহ এবং আত্মাকে একত্রে রাখতে প্রয়াস করছি। এটাই হচ্ছে চূড়ান্ত লক্ষ্য। এটি অসম্বন্ধীয় নয়, তা অপ্রতিহত। যদি আমরা অন্য লক্ষ্যের দিকে মনোযোগ দেই, অথবা যদি কৃষ্ণের সেবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য রেখে করি, যা অস্থায়ী, সীমিত, অপূর্ণ, তাহলে আমাদের এই অনুশীলন সুপ্রসিদতি অর্থাৎ সম্পূর্ণ প্রসন্নতা প্রদানে সক্ষম হয় না। যযাত্মা, আত্মার অর্থ আত্মা, জীবনীশক্তি, যা সক্রিয় ও শরীরের অত্যাবশ্যক বিষয়। এছাড়াও আত্মা মানে মন, বুদ্ধি। আত্মার অর্থ দেহও হয়। অর্থাৎ যযাত্মা সুপ্রসিদতি মানে যখন আমরা কৃষ্ণভাবনামৃত হই, যা হচ্ছে “স বৈ পুষাম পরো ধর্ম” যা হচ্ছে সমস্ত পেশাগত কর্তব্য, ধর্মীয় অনুশীলন, সকল যোগের পরিপূর্ণতা। তখন কেউ হয়ত ভাবতে পারে যে এটি ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তি; কিন্তু তা আধ্যাত্মিক, যা সর্বাধিক অপরিহার্য তৃপ্তি, এতে স্বাভাবিকভাবে আমাদের মন এবং শরীর তৃপ্ত হয়, সুখী হয়। অন্যথায়, ভক্তরা কীভাবে নিয়মনীতিগুলি পালন করতে পারে? কখনও কখনও এমনকি তারা যদি তুষ্ট না হয়, তাহলে কঠোরতা গ্রহণ করে। কেবল আধ্যাত্মিকভাবেই নয়, আধ্যাত্মিকভাবে, মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে – আর এতে সব ক্ষেত্রেই কেউ সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়। কৃষ্ণচেতনা বিকাশের সাথে সাথে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি উত্তেজিত হওয়া বন্ধ হয়, মন চাঞ্চল্য বন্ধ করে। প্রভুর প্রতি এমন বিশ্বাস গড়ে ওঠে যে অন্য আর কোন ভাবনাই বেশি সুস্পষ্ট নয়। যেমন উদাহরণ স্বরূপ, আমাদের পঞ্চতত্ত্বের মধ্যে মহান ভক্ত হচ্ছেন শ্রীবাস। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী মালিনী ছিলেন ভক্তদের মধ্যে শুদ্ধতম। কার্যত নবদ্বীপে থাকাকালীন ভগবান নিত্যানন্দ প্রতিদিন তাদের বাড়িতে যেতেন। এবং নিত্যানন্দ প্রভু, তিনি অবধূত নামে পরিচিত কারণ তিনি বর্ণাশ্রমের উর্দ্ধে, তিনি বিভিন্ন রীতির বাইরে। প্রকৃতপক্ষে তিনি হচ্ছেন পরম ভগবান এবং তিনি কোন প্রকার জড়জাগতিক নিয়ম-নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। মালিনীর প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ ছিল, যে তিনি যেন তাঁর মা। এবং তাই, তিনি যখন শ্রীবাসের বাড়িতে যেতেন, তখন তিনি এক ছোট পাঁচ বছরের ছেলের মত ভাবে থাকতেন, যদিও তিনি পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন, তবে তিনি নিজের হাতে খেতেন না, তিনি সেখানে ছোট্ট শিশুর মত বসে থাকতেন। ২,৩ বছর বয়সী শিশু যেমন খায় না, তার মাকে খাওয়াতে হয় তেমনই মালিনী খাবার নিয়ে তাকে খাওয়াতেন। এটি ছিল তাদের এক অনন্য সম্পর্ক। এইভাবে, নিত্যানন্দ প্রভু কখনও কখনও এতে অতি মগ্ন হয়ে পড়তেন, এবং মালিনীও বাৎসল্যভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়তেন। তিনি ভাবছিলেন, “নিত্যানন্দ ঠিক আমার ছেলের মত,” তিনি তাকে পুত্রের মতো দেখতেন, এবং সেই বাতসল্য রসে, তার স্নেহময় মাতৃ সম্পর্ক পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছিল, যেমনটি নিত্যানন্দের প্রতি শ্রীবাসেরও ছিল, বিশেষত এই ঘটনা ঘটার সময়।
একদিন চৈতন্য মহাপ্রভু শ্রীবাসকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার বিশ্বাসের পরীক্ষা। তিনি শ্রীবাসকে বললেন, “শ্রীবাস, কেন তুমি নিত্যানন্দকে তোমার ঘরে রাখছ? সে অবধূত; সে বৈদিক নিয়মনীতির কোন বিবেচনা ছাড়াই কার্য করে। তুমি জানো না তাঁর জাত কী, তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য কী? অবর্ণনীয়ভাবে সে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। তাই কেন তুমি তাকে ঘরে রাখছ? এইভাবে সে হয়ত তোমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তোমার তৎক্ষণাৎ তাঁকে বের করে দেওয়া উচিত; তাঁকে তোমার বাড়িতে রেখো না। কেন তুমি তাকে তোমার বাড়িতে রাখতে চাও? এক্ষুনি তাকে বের করে দাও এবং নিজের পরিবারকে রক্ষা কর।” বিশ্বম্ভর, চৈতন্য মহাপ্রভু অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এই কথাগুলি শ্রীবাসকে বললেন। শ্রীবাস প্রণাম করে বললেন, “প্রভু, আমি আপনার নিত্য ভক্ত। কেন আপনি আমাকে এভাবে পরীক্ষা করার চেষ্টা করছেন? এটি ঠিক নয়। আমি জানি নিত্যানন্দ আর আপনার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নিত্যানন্দ প্রভুর দেহ এবং আপনার দেহের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই – আপনারা দিব্য। এমনকি যদি নিত্যানন্দ আজ কিছু মাতাল যৌবনীর সাথেও যান, (একপাশে: তার মানে মাতাল বা নিচু জাতের মেয়ে। মধ্যস্থতার মতো, আদিবাসীদের মতো) [ভক্তরা হাসছে] এমনকি যদি তিনি কোন মাতাল পতিতার সাথে যেতে চান, তবুও আমি কোনোভাবেই তাঁকে ত্যাগ করব না। এমনকি আমার গৃহে তাঁর উপস্থিতির কারণে যদি আমার পুরো বংশ, পুরো পরিবার, সম্পদ, খ্যাতি, সমস্ত কিছু নষ্ট হয়ে যায়, তবুও আমার কিছু যায় আসে না। আমি কখনও নিত্যানন্দ প্রভুর শ্রীপাদপদ্ম ত্যাগ করব না। তিনি যা কিছু করুন বা না করুন, আমি তা দেখতে যাচ্ছি না, কারণ আমি জানি যে তিনি আসলে দিব্য স্তরে আছেন। অতএব, আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি যা খুশি করতে পারেন, তা আমার বিশ্বাসকে প্রভাবিত করবে না।” চৈতন্য মহাপ্রভু এই কথা শুনে উল্লম্ফন দিতে লাগলেন, “হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল!” তিনি উর্দ্ধ-নিন্মে লাফ দিয়ে নাচতে লাগলেন। “তোমার বিশ্বাস কত শক্তিশালী! এটি আমার কাছে আনন্দের বিষয়।” কারণ প্রকৃতপক্ষে শ্রীবাস, তিনি অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছিলেন, এমনকি যখন এই পরীক্ষা নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইছিল। তিনি অত্যন্ত ঐকান্তিকভাবে এইসব কথাগুলি বলছিলেন। এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে তিনি এগুলি তার হৃদয়ের গভীর থেকে বলেছিলেন।
তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “তোমার এই বিশ্বাসের জন্য, আজ আমি তোমাকে একটি বিশেষ বর, আশীর্বাদ দেব। এমনকি তোমার গৃহে থাকা বিড়াল, কুকুর অথবা কোনো না কোনোভাবে যে সব প্রাণীরাই তোমার বাড়িতে বাস করে, কেবলমাত্র তোমার গৃহে বসবাস করার জন্য এমনকি তারাও অবিনশ্বর, স্থায়ী শুদ্ধ ভক্তি সেবা ও প্রেম-ভক্তি প্রাপ্ত হবে! তোমার এই বিশ্বাসের কারণে এমনকি তুমি যদি গৃহস্ত জীবন সবকিছু বিসর্জন ও দাও, এমনকি যদি সর্বদা নারায়ণের বক্ষে থাকা লক্ষ্মী দেবীও (সৌভাগ্যের দেবী – সমস্ত সম্পদ, সবকিছু যাঁর কাছ থেকে আসছে) তাঁর ভাগ্য হারিয়ে ভিখারি হয়ে যান, ঘরে ঘরে গিয়ে ভিক্ষা করেন; তবুও কোনোদিন তোমার কোনো অভাব হবে না, কোনোদিন তোমার গৃহে অভাব থাকবে না, কোন অপূর্ণ চাহিদা থাকবে না, কোন ঘাটতি বা কমতি থাকবে না; সর্বদা ভক্তিমূলক সেবা করার জন্য এবং প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ করার জন্য তোমার যথেষ্ট ধন থাকবে। তোমার কোন অভাব হবে না। এ আমার আশীর্বাদ।”
এমনকি কখনও কখনও কৃষ্ণ নিজেও ভক্তকে পরীক্ষা করেন। ঠিক যেমন নারদ মুনি ধ্রুব মহারাজকে বলেছিলেন, “তুমি ফিরে যাও। তোমার রাজ্যে ফিরে যাও। এখানে এসে ভগবানের খোঁজ করে কি লাভ? তুমি ফিরে যাও এবং এখানে জঙ্গলের পশু বাঘ, সিংহ এবং সাপ নিয়ে থাকার মতো ঝুঁকি নিও না, এরা তোমাকে গ্রাস করতে পারে।” ধ্রুব মহারাজ বললেন, “নারদ মুনি আপনার সদয় নির্দেশের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, কিন্তু আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, কারণ আমি আপনার কথা মেনে নিতে পারছি না। আমি এখানে ভগবানকে সন্ধান করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এসেছি; আপনি যদি আমাকে ভগবানকে খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারেন, তাহলে আমি সেই নির্দেশ পেয়ে আনন্দিত হব...” [বিরতি] আমাদের এই জড় জগতের সাথে কিছুই করার নেই। অতএব, আমাদের ভৌতিক নিয়মনিষ্ঠ, জাগতিক তপস্যা, জাগতিক ধার্মিক ক্রিয়াকলাপ গ্রহণ না করার প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সাধারনত, এই বিষয়গুলিকে খুব বড় ধর্মনীতি বলে মনে করা হয়। আমরা এমনকি অন্যদের ভিতরে প্রবেশ করতেও দেই না। পাপময় কার্যকলাপের কথা আর কি বলার আছে? সে দূরের কথা! তাই, একনিষ্ঠ মন দিয়ে রাধাকৃষ্ণের সেবা করার মাধ্যমে নিতাই-গৌরের কৃপায় স্বাভাবিকভাবে মনকে ফিরিয়ে আনুন, আর তখন আমরা শুদ্ধ হব এবং জীবনে সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা লাভ করব।
শ্রীকৃষ্ণের অনেক শক্তি আছে, কিন্তু বর্ণিত আছে যে তাঁর অনেক আনন্দদায়িনী শক্তি আছে। তাঁর আনন্দদায়িনী শক্তি অতীব বিশাল কিন্তু প্রেম হচ্ছে এর চুরা-মণি। তাই প্রেমের সেই রূপ বা বিশুদ্ধ প্রেম হচ্ছে শ্রীমতি রাধারাণী। কেবল তাঁরই আছে পূর্ণ প্রকাশিত সর্বোচ্চ শুদ্ধ প্রেম। তিনি হচ্ছেন সেই শুদ্ধ প্রেমের মূর্ত প্রতীক। সুতরাং, সিদ্ধ দেহ না পাওয়া পর্যন্ত কেউই এটি আলোচনা করতে বা বুঝতে পারবে না; তারপর তিনি রাধা কৃষ্ণের প্রশংসা করতে শুরু করতে পারবেন। এর আগে পর্যন্ত আমরা কেবল সমুদ্র থেকে তার এক বিন্দু পেতে পারি; এমনকি তাও অটল। কিন্তু এটা বুঝতে পারা খুব কঠিন, তাই আমাদেরকে প্রথমে এই জড় জগতে আমাদের স্থিতি কি তা বোঝা উচিত, যেমন খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা আছে যে কীভাবে আমরা এক দেহ থেকে আরেক দেহে বিচরণ করছি, কিভাবে আমাদের বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষা আছে। এখন, আমরা যদি আমাদের বাসনা পরিশুদ্ধ করতে পারি, বৃন্দাবনের শুদ্ধ ভক্তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারি, তাহলে আমরা জীবনের সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারব। রাধা কৃষ্ণ পূজার প্রকৃত অর্থ কী তা বুঝতে পারাই হচ্ছে একটি লক্ষ্য। চৈতন্য মহাপ্রভুর লীলার প্রকৃত অর্থ কী? এটি এমন কিছু নয় যা অবিলম্বে শিক্ষাগতভাবে বোঝা যাবে। এমনকি এর বর্ণনা সম্পূর্ণ তত্ত্বের সমতুল্য নয়। সেগুলি কেবল বোঝার ইঙ্গিত মাত্র যে এর উদ্দেশ্য কি, অর্থ কি! তবে সত্যিকারে বুঝতে পারা হচ্ছে কেবল উপলব্ধি করা। এটি এমন কিছু নয়, যা আমরা শব্দের মধ্যে পাই বা নিজেদের মনে বুঝতে পারি, এটি এমন কিছু যা পূর্ণ বিকশিত শুদ্ধ আত্মার দ্বারা উপলব্ধ হয়। ঠিক যেমন রামানন্দ রায় এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর আলোচনা... আরো কত পণ্ডিতগণ আছেন!
ভারতে একজন খ্রিস্টান যাজক ছিলেন, যিনি চৈতন্য-চরিতামৃতের উপর একটি পর্যালোচনা লিখতে চেয়েছিলেন। আসলে আমরা চৈতন্য-চরিতামৃতের পুনঃসমীক্ষা করাতে চেয়েছিলাম। আমরা সেখানকার সবচেয়ে বড় সংবাদপত্রকে তা দিয়েছিলাম। তারা মনে করেছিল যে তারা একটি মজার ব্যবসা পেয়েছে। তাই, তারা যা করেছিল তা হল তারা বলেছিল, “ঠিক আছে।” তারপর তারা সবচেয়ে বড় খ্রিস্টান পণ্ডিতকে ডেকে বলল, “আমরা এই বইটি পুনঃমূল্যায়ন করতে চাই।” তাই তিনি তাকে আদি-লীলা এবং অন্ত্য-লীলা পুনঃসমীক্ষার জন্য দিয়েছিলেন। তিনি তিন মাসে পাঁচবার গ্রন্থটি পড়েছিলেন, তারপর তিনি বলেছিলেন যে, “আমি এর পুনঃমূল্যায়ন করতে পারব না। এটি পড়তে গিয়ে এমন পর্যায় আসে, যা আমার বোঝার বাইরে।” এবং তিনি আরও অনেক কিছু বলেছিলেন। তবে কার্যত তিনি কিছুটা ভক্তে রুপান্তরিত হয়েছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এগুলি ছিল তার বোঝার বাইরে। যদি তিনি ব্যাখ্যা করেন, পুনঃমূল্যায়ন করেন, তাহলে তা হবে অন্য ধর্মের প্রকাশ, এটিই ছিল তার বক্তব্য। এটি খুবই বিরক্তিকর যে একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক হিসাবে তিনি যদি যথাযথ পুনঃবিবেচনা প্রদান করতেন, তবে তাকে বহিষ্কার করা হত। [হাসি] এটাই ছিল প্রাথমিক বিষয় যে তিনি... সুতরাং, মূল বিষয়টি হচ্ছে আমাদেরকে নিজেদের অবস্থান বুঝতে হবে, খুব সাবধানে সেবা করতে হবে এবং এক নিঃস্বার্থ মনোভাব বিকাশিত করতে হবে।
আসলে, আমি গতকাল এক বড় ধাক্কা খেয়েছি, তা থেকে এখন পুনরায় ভাল হচ্ছি। এক অত্যন্ত শুদ্ধ ভাবনা যে আজ রাধারাণীর আবির্ভাব দিন। আগের দিন প্রথাগতভাবে আমাদের কিছু কাজ করার অনুষ্ঠান হয়। চৈতন্যলীলায় শ্রীরাধা এসেছেন গদাধর রূপে, আর বৃষভানু এসেছিলেন পুণ্ডারিক বিদ্যানিধি রূপে। আমি বর্ণনা করেছি কিভাবে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, কিভাবে এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে পুণ্ডরিক, যিনি বৃষভানু, তিনি চৈতন্যলীলায় গদাধরের, রাধারাণীর গুরু হয়েছিলেন।
আমি কেবল ব্যাখ্যা করেছিলাম যে চৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন রাধা কৃষ্ণের মিলিত তনু, চৈতন্য মহাপ্রভু রূপে প্রকাশ ও তাঁর অবির্ভাবের রহস্যময় উদ্দেশ্য আছে। এবং দ্বিতীয় দীক্ষিত, ব্রাহ্মণ পৈতে পড়া এক ভক্ত, প্রবচনের শেষে এসে বলল যে, “যদি কৃষ্ণ পরমাত্মা হন, তাহলে একজন ভক্ত কি ভাবছেন তা বোঝার জন্য কেন তাঁকে ভক্তের মনোভাব নিতে হবে যে? কেন বুঝতে হবে যে রাধারাণী কী ভাবছেন? এবং সেই প্রশ্নটি এত দূরের বিষয়, সেই প্রশ্নের মধ্যে এত অপরাধ এবং রসভাষ আছে, তাই আমি এখনও ঠিক হইনি। কিভাবে একজন ভক্ত... যদিও এটা একটা এমনি প্রশ্ন ছিল, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ অপরাধমূলক। কারণ প্রথমত, প্রশ্ন হচ্ছে “যদি কৃষ্ণ পরমাত্মা হন...” যদি কেন? তুমি সন্দেহ করছ যে কৃষ্ণ কি পরমাত্মা নাকি?! যদি এটি অন্য কোনো ব্যক্তি হত, তাহলে অন্য বেপার ছিল। প্রথমত উল্লেখ করা হল যে, “যদি কৃষ্ণ পরমাত্মা হন” — কৃষ্ণ-অপরাধ। তারপর দ্বিতীয় কথা হল, তাহলে, “তাঁকে রাধারাণীর মনোভাব কি তা বুঝতে তাঁর ভাব গ্রহণ করতে হবে কেন?” পরমাত্মা বদ্ধ জীবাত্মার হৃদয়ে আছেন। এটি রাধারাণীকে বদ্ধ জীবাত্মার সাথে এক মনে করেছে, যাঁর একটি জড় দেহ আছে এবং কৃষ্ণ হচ্ছেন তাঁর পরমাত্মা, তাহলে কেন কৃষ্ণ তাঁর মন বুঝতে পারলেন না? — ওটা ছিল রাধা-অপরাধ। এবং পুরো ব্যাপারটাই ছিল রসভাস। তারপর আমি ভাবলাম, “আমি পারব না...” এটি আমাকে শিক্ষা দিয়েছে যে আর আমার কখনও এমন কিছু ব্যাখ্যা করা উচিত নয়, যা কিছুটা গুহ্য, কারণ তখন কিছু ভক্তরা খুব নিরীহভাবে এক সন্দেহের মধ্যে জড়িয়ে পড়বে এবং অপরাধ করবে।
বৈকুণ্ঠে কৃষ্ণ হচ্ছেন পরম নারায়ণ। সেখানে তিনি যা ঘটছে সবই জানেন, কিন্তু গোলকে তিনি ভিন্ন মনোভাব গ্রহণ করে আছেন। এই হচ্ছে তাঁর ঐশ্বর্য। ঠিক যেমন আদালত কক্ষে হাইকোর্টের বিচারক সম্পূর্ণরূপে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন; কিন্তু যখন তিনি বাড়িতে যায়, তখন তিনি তার স্ত্রীকে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়। এর মানে এই নয় যে তিনি কিছু হীন। তেমনি রাধারাণী হচ্ছেন কৃষ্ণের আনন্দদায়িনী শক্তির প্রসার। তাঁর সকল দিব্য গুণ রয়েছে, কিন্তু তিনি কৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হন। অতএব, তিনি কৃষ্ণের কাছে পরাভূত হয়েছেন এবং কৃষ্ণও নিজেকে তাঁর কাছে পরাভূত হতে দেন। এ এক নিত্য লীলা চলে, যা আমাদের বোধগম্যতার বাইরে। তাই চৈতন্য মহাপ্রভু এক বিস্তার হিসেবে নিন্মে এসেছেন। আমাদের পক্ষে এটি বোঝা সত্যিই অসম্ভব। এখনও যেমন কৃষ্ণদাস কবিরাজ, রূপ এবং সনাতনের মতো মহান ভক্তগণ, তারা কিছু ব্যাখ্যা করার প্রতি কত বিনীত, এতে আমরা সেগুলি জানতে পারি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে এই পরমাত্মাকে কৃষ্ণের সাথে কতটা দূর থেকে বোঝা উচিত এবং রাধারাণীর অবস্থিতি কী? কোন ভক্তের অত্যন্ত সাবধান হওয়া উচিত। রাধা কৃষ্ণের উপাসনা করা, এমনকি রাধা কৃষ্ণকে নিয়ে আলোচনা করা, এসব খুব গভীর জল। আপনাকে খুব সতর্ক হতে হবে! এরপর আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলাম আর আমি ভেবেছিলাম যে এখনও যুক্তিতর্কের মনোভাব রয়েছে। তাই, আমি আর বেশি ঘন জলের ভিতর যেতে চাইনা।
আমাদের বুঝতে হবে যে রাধারাণীর অবস্থান কী? তিনি কোন বদ্ধ জীবাত্মা নন; তাঁর হৃদয়ে কোনো পরমাত্মা বিষ্ণুর অবস্থান নেই। তিনি কৃষ্ণের অ-ভিন্ন শক্তি — আপনি কি কৃষ্ণের সেই ছবি দেখেছেন যে তাঁরা সম্পূর্ণ একত্রে আছেন, কিন্তু কোনোভাবে তাঁরা আবার দুজন হয়ে যান। যতক্ষণ না আমরা একজন শুদ্ধ ভক্তের পদাঙ্ক অনুসরণ করি, ততক্ষণ আমরা এগুলি কখনই বুঝতে পারব না। এই বিষয়ে আমরা যা কিছু বুঝতে পারি বা যেটুকু ব্যাখ্যা করতে পারি তা হল এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়। এটি জীবনের চরম সারবস্তু। এমন নয় যে আমরা আলোচনা করে, যৌথ সাক্ষাতকার করে, একান্তভাবে আলোচনা করে তা বুঝতে পারব। এটি সম্ভব নয়। তবে প্রথমে আমাদের সীমিত বুদ্ধিমত্তার দ্বারা আপেক্ষিকভাবে বুঝতে হবে যে প্রকৃতপক্ষে এর চেয়ে উচ্চতর কোন ধারণা নেই, এটি সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে। এখন তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করুন, শুদ্ধ ভক্ত হন। নিজেকে সমর্পণ করুন ও নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করুন। কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর ইচ্ছা অনুসারে সেবা করুন। ক্রমাগতভাবে হরে কৃষ্ণ জপ করুন এবং সর্বদা তাঁকে স্মরণ করুন। এখানে যে নিশ্চয়তা আছে তা হচ্ছে যদি কেউ সর্বদা ভগবানকে স্মরণ করে, জপ করে ও রাধাকৃষ্ণের সেবা করে, ভগবানের সেবা করে, তাহলে ভবিষ্যতে তিনি প্রত্যক্ষভাবে ভগবানের সেবা করতে পারবেন। কারো এর থেকে বেশি আর কি চাই? প্রকৃতপক্ষে তখন আমরা এই সকল বিবরণ বুঝতে পারব, এমনকি সেই পর্যায়ে আসার আগে থেকেই আমাদের কাছে তা ধীরে ধীরে অধিক থেকে অধিকতর প্রকাশ পেতে থাকবে।
অতএব এখন কেবল আলোচনা হল যে কেউ এতে নিশ্চিত হতে পারে যে, “হ্যাঁ, পরম সত্যের পূর্ণ উপলব্ধির ক্ষেত্রে এর উপর আর কিছু নেই। এটি সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে। এখন আমাদেরকে তা উপলব্ধির মাধ্যমে প্রকৃত অর্থ বুঝতে হবে। আমরা উপলব্ধির বিষয়টি বিশ্বাস করি। আমরা পুঁথিবিদ্যা ভিত্তিক নই। আমরা উপলব্ধির দ্বারা তা উপলব্ধি করি। জ্ঞান প্রদান করা আছে এবং সেই উপলব্ধি আসে তা অনুশীলনের মাধ্যমে। এমনকি কোন সাধনা-সিদ্ধি, যিনি সাধনা অনুশীলন করছেন, সবসময় নিয়মনীতি পালন করছেন, যদি তিনি তাতে দৃঢ় থাকেন, এই মনোভাব গড়ে তোলেন, শুদ্ধ ভক্তবৃন্দের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তাহলে তিনিও নিত্যমুক্ত জীবদের মত সেই একই সাফল্য অর্জন করেন। তাই, কলিযুগে অনেক ত্রুটি, অনেক বাঁধাসমূহ থাকা সত্ত্বেও, আমাদেরকে উর্দ্ধে নিয়ে যাওয়ার করুণা প্রদান করতে রাধা কৃষ্ণ কৃপা করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে নিন্মে নেমে এসেছেন। কোন না কোনভাবে আজ যারা এখানে উপস্থিত আছেন, তারা সবচেয়ে সৌভাগ্যবান – তারা শ্রীমতি রাধারাণী, শ্রীকৃষ্ণ, গোকুলানন্দ এবং তাঁদের ভক্তদের প্রিয়, কারণ কোনো না কোনোভাবে আপনাদেরকে এই ভক্ত সংঘে আনা হয়েছে, কেবল ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনা থেকে কৃষ্ণভাবনামৃতে নিজের মানসিক ভাব পরিবর্তন করার প্রয়াসের মাধ্যমেই তা হয়েছে। কারণ কৃষ্ণ হলেন প্রকৃত তত্ত্ব, তিনি সবকিছুর মূল, যখন আমরা তাঁকে সন্তুষ্ট করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমরাও সন্তুষ্ট হই। কেউ যদি তার মানসিকতা পরিবর্তন করে, সবকিছু অনুসরণ করে, সেই মনোভাব বিকাশিত করে এবং সেই নতুন মানসিকতার সাথে সেবা করে, তাহলে অবিলম্বে সে দিব্য আনন্দ অনুভব করতে পারে। একবার সেই দিব্য আনন্দ লাভ করলে, তারপর ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ভুলে যাওয়া খুব সহজ। তবে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন না করেই আমরা যদি মনে করি যে আমরা দিব্য সুখ পেতে চলেছি, তাহলে তা খুবই কঠিন। আমরা সেই আনন্দ এক মুহূর্তের জন্য পেতে পারি, কিন্তু তারপর তা আবার চলে যাবে। এখন এটি এক অপরিহার্য বিষয় — একজন উপভোগকারী বা নিয়ন্ত্রক হওয়ার মানসিকতা পরিবর্তন করে ভগবানের দ্বারা উপভোগ্য একজন সেবক হন। এই কারণে নরোত্তম দাস ঠাকুর গেয়েছেন, “বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন? – কখন আমি নিয়ন্ত্রক হওয়ার ও ভোগ করার বাসনা ত্যাগ করব? কখন আমার কেবল ভোগ্য হওয়ার, সেবক হওয়ার বাসনা থাকবে ও এই মিথ্যা স্থিতি পরিত্যাগ করার ইচ্ছা হবে? শ্রীমতী রাধারাণীর কৃপায় তা অতি সহজেই হতে পারে। তিনি শীর্ষ অবস্থানে স্থিত। লক্ষ্মী, মহালক্ষ্মীগণ শ্রীমতি রাধারাণীর মতো পবিত্রতা ও সতীত্ব অর্জন করার জন্য তপস্যা করছেন। কিন্তু তাঁকে এমনকি রাসনৃত্যে প্রবেশ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। গৌরী, তিনিও সতীত্বের সেই সর্বোচ্চ স্তর অর্জন করতে চান। ইন্দ্র, বশিষ্ঠ এবং অন্যান্য মহাত্মাদের সহধর্মিণীদের বিষয়ে আর কী বলার আছে? তারা সর্বদা এটি লাভ করার প্রতি অভিলাষী, তবে রাধারাণী হচ্ছেন শিরমণি। এটি বুঝুন যে চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর কৃপার মূর্ত প্রকাশ। আমি শুনেছি তা সরাসরি নিতাই-গৌর, ষড় গোস্বামীগণ, আধ্যাত্মিক গুরুদেব এবং বৈষ্ণবদের মাধ্যমে নিন্মে প্রদান করা হয়েছে। যেভাবেই হোক আমাদের সেই কৃপা লাভ করা উচিত এবং শ্রীমতী রাধারাণীর বিশেষ কৃপা লাভ করে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া উচিত। ওঁনারা যেখানে চাইবেন, আমরা সেখানেই তাঁদের দিব্য সেবায় যেতে পারি।
জয় শ্রী-কৃষ্ণ-চৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ
শ্রী-অদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি-গৌর-ভক্ত-বৃন্দ
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
শ্রীমতি রাধারাণী কি!
ভক্ত : জয়!
জয়পতাকা স্বামী: শ্রী শ্রী রাধাষ্টমী-মহোৎসব কি!
ভক্ত: জয়!
জয়পতাকা স্বামী: জয় শ্রীল প্রভুপাদ কি!
ভক্ত: জয়!
জয়পতাকা স্বামী: জয় শ্রী তীর্থপদ কি!
ভক্ত: জয়!
জয়পতাকা স্বামী: জয়!
[বিরতি]
জয়পতাকা স্বামী: সোনালি রঙ, গলিত সোনার মতো। কিভাবে সম্ভব? একদম একরকম। তাঁর কোনো জাগতিক রূপ নেই। এটি চৈতন্য-চরিতামৃতের বর্ণিত আছে কিন্তু আমরা তা ঠিক বুঝতে পারি না। কৃষ্ণ এতই আকর্ষণীয় যে তিনি এমনকি কমদেবদেরও আকর্ষণ করেন। কিন্তু রাধারাণী এতই আকর্ষণীয় যে তিনি এমনকি কৃষ্ণকেও আকৃষ্ট করেন, কিন্তু তিনি অন্য কাউকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন না বা অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হন; তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষ্ণের দ্বারা আকৃষ্ট হওয়া। অন্য কারোর কোন ভাবনা নেই।
প্রশ্ন: (শ্রবণাতীত)
জয়পতাকা স্বামী: যখন কেউ এগুলি শ্রবণ করেন কিন্তু যৌন বাসনা দ্বারা উত্তেজিত হন না, জাগতিক যৌন ক্রিয়াকলাপের কথা স্মরণ করেন না, তখন সেটি শাস্ত্রোল্লেখিত যোগ্যতাগুলির মধ্যে একটি। যদি কেউ কৃষ্ণ এবং গোপীদের লীলাবিলসের কথা শুনে জাগতিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ে, তাহলে অবশ্যই তার এগুলি শোনা উচিত নয়। অন্য যোগ্যতাটি হল, যেমন প্রভুপাদ বলেছেন, “ভাগবতমের প্রথম নয়টি স্কন্ধ বুঝতে হবে এবং তারপর দশম স্কন্ধতে যেতে হবে, যা সবচেয়ে গুহ্য বিষয়: রাধা কৃষ্ণ ও গোপী এবং কৃষ্ণের লীলা।”
প্রশ্ন: (শ্রবণাতীত)
জয়পতাকা স্বামী: ক্ষমা? কেন নয়, যখন সব শক্তিই আছে, তাহলে এটি কেন নয়? তুলসী, তিনিও একজন মুখ্য মঞ্জরি। বৃন্দা-দেবী। তুলসী হচ্ছেন বৃন্দা-দেবী।
প্রশ্ন: (শ্রবণাতীত)
জয়পতাকা স্বামী: যদি আমরা জপ করি এবং আমাদের হৃদয় না গলে, এর মানে হচ্ছে তা আমাদের পাপ কর্ম এবং অপরাধের প্রভাব। কিন্তু আমরা যেহেতু জপ করছি, তাই আমরা হয়ত কিছুটা আশ্রয় পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের জপ যদি সম্পূর্ণ অপরাধমুক্ত হয়, তাহলে আমরা প্রত্যক্ষভাবে বুঝতে পারব যে কৃষ্ণ তাঁর নামের থেকে ভিন্ন নন। আমরা জপের মাধ্যমে কৃষ্ণকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারব। ঠিক যেমন হরিদাস ঠাকুর এবং অন্য ভক্তরা সেই স্তর অর্জন করেছিলেন। আমরা এটি বুঝতে পারি যে আমাদের অপরাধ আছে, তাই আমরা এখন যা করতে পারি তা হল, আর কোন অপরাধ এড়ানোর প্রচেষ্টা এবং আমাদের যা অপরাধ রয়েছে, তা নির্মূল করার জন্য খুব সাবধানতা সহ সেবা করা। এমন হতে পারে যে এখন আমরা এখন তা পরিষ্কার করছি; আমাদের কোন বড়, বিশাল অপরাধ নেই। কিন্তু আমরা যদি অসাবধান হই, তাহলে তা আরও প্রভাব ফেলবে। কখনও কখনও ভক্তরা দ্রুত অগ্রগতি করছে বলে মনে হয়, তারপর তারা আটকে পরে। কারণ অন্য ভক্তদেরকে জাগতিক দৃষ্টিতে দেখার অপরাধের কারণে তা হয়। প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, “আমাদের চিন্তা না করার প্রতি সতর্ক থাকতে হবে...” আমরা ভাবতে পারি যে, ওহ, প্রভুপাদ একজন শুদ্ধ ভক্ত ছিলেন এবং যখন তার গুরুভ্রাতারাও প্রকট ছিলেন, তখন হয়ত একে অপরকে অন্য কোন দৃষ্টিতে ভাবতে পারে। কিন্তু তিনি বলছিলেন যে, “তোমাদের একে অপরকে বৈষ্ণব রূপে দেখতে হবে। আমার সকল অনুসারীগণ শুদ্ধ ভক্ত। কারো প্রতি অপরাধ কর না, এতে কৃষ্ণ অসন্তুষ্ট হবেন।” প্রচারের ক্ষেত্রে কাউকে রক্ষা করতে হয়। যেমন কখনও কখনও প্রভুপাদ আমাদেরকে অন্যান্য ক্রিয়াকলাপ থেকে রক্ষা করতেন যা ইসকনের পক্ষে খুব একটা অনুকূল নয়, তবে অন্যান্য বৈষ্ণবরা যা করেছেন, তাতে আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য ওঁনাকে আমাদের সমালোচনা করতে হত। তারপর তিনি ক্ষমা চাইতেন এবং ব্যাখ্যা করতেন যে প্রচারের জন্য কখনও কখনও এটি প্রয়োজনীয়, তবে আমাদের কোন ভক্ত বা পবিত্র নাম বা দেবতাদের প্রতি অপরাধ করার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। স্পষ্টতই, আমরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ভুগছি; অন্যথায় আমরা কিছু সময় জপ করার পরও সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তিমূলক সেবায় যে নেই তার এটাই কারন।
Lecture Suggetions
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন