শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরম ভগবান
নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ৫ নভেম্বর, ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রদান করেছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে ১ম স্কন্ধ ১৩ অধ্যায় ২১নং শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।
নমো ওঁ বিষ্ণুপাদায় কৃষ্ণপ্রেষ্ঠায় ভূতলে।
শ্রীমতে ভক্তিবেদান্ত স্বামীনিতি নামিনে॥
নমস্তে সারস্বতে দেবে গৌরবাণী প্রচারিনে।
নির্বিশেষ-শুন্যবাদী পাশ্চাত্যদেশ তারিণে॥
নমো মহাবদান্যায় কৃষ্ণপ্রেম প্রদায়তে।
কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনাম্নে গৌরত্বিষে নমঃ॥
হে কৃষ্ণ করুনাসিন্ধো দীনবন্ধু জগৎপতে।
গোপেশ গোপীকাকান্ত রাধাকান্ত নমোহস্তুতে॥
তপ্ত কাঞ্চন গৌরাঙ্গি রাধে বৃন্দাবনেশ্বরি।
বৃষভানুসুতে দেবী প্রণামামি হরিপ্রিয়ে॥
বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপা সিন্ধুভ্য এব চ।
পতিতানাং পাবনেভ্যে বৈষ্ণবেভ্যে নমো নমঃ॥
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ।
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ॥
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
নারায়ণং নমস্কৃত্য নরং চৈব নরোত্তমম্।
দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জয়মুদীরয়েৎ॥
মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ
শ্লোক ২১ অনুবাদ: আপনার পিতা, ভ্রাতা, বন্ধু, পুত্রবর্গ সকলেই মৃত এবং প্রয়াত। আপনি নিজেও আপনার জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন, আপনার দেহ এখন জরাগ্রস্ত, এবং আপনি অন্যের গৃহে বাস করছেন।
তাৎপর্য: রাজাকে নিষ্ঠুর কালের প্রভাবে তাঁর শোচনীয় অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে আরও বুদ্ধিমানের মতো তাঁর বিবেচনা করে দেখা উচিত যে, তাঁর নিজের জীবনে কি ঘটতে চলেছে। তাঁর পিতা বিচিত্রবীর্য বহুকাল পূর্বে প্রয়াত হন, তখন তিনি এবং তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতারা সকলেই ছিলেন ছোট্ট শিশু, এবং ভীষ্মদেবেরই স্নেহ এবং করুণার ফলে তাঁরা যথাযথভাবে বড় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তারপর তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা পাণ্ডুরও মৃত্যু হয়। তারপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর শতপুত্র এবং তাঁর সমস্ত পৌত্র, ভীষ্মদেব, দ্রোণাচার্য, কর্ণ এবং অন্যান্য অনেক রাজা ও বন্ধু সহ তাঁর সমস্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদেরও মৃত্যু হয়। সুতরাং তাঁর সমস্ত লোকবল আর ধনবল বিনষ্ট হয়ে গেছে, এবং তিনি তাঁর যে সমস্ত ভ্রাতুষ্পুত্রদের নানাভাবে দুঃখ-কষ্ট দিয়েছিলেন, এখন তাঁদেরই কৃপায় জীবন ধারণ করে আছেন। আর এই সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, তিনি ভেবেছিলেন যে, তিনি আরও অনেক দিন বেঁচে থাকবেন। বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, প্রত্যেককেই তার ব্যক্তিগত কার্যকলাপ এবং পরমেশ্বরের কৃপার সাহায্যে আত্মরক্ষা করতে হয়। ফলাফলের জন্য পরম নিয়ন্তার ওপর ভরসা রেখে, বিশ্বস্তভাবে নিষ্ঠা সহকারে কর্তব্যকর্ম করে যেতে হয়। পরমেশ্বর ভগবান রক্ষা না করলে কোনও বন্ধু, কোনও সন্তান-সন্ততি, কোনও পিতা, কোনও ভাই, কোনও রাষ্ট্র এবং অন্য কেউই মানুষকে রক্ষা করতে পারে না। তাই পরমেশ্বর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে হয় তিনি যেন আমাদের রক্ষা করেন, কারণ সেই আত্মরক্ষার অনুসন্ধানই হচ্ছে মানব জীবনের উদ্দেশ্য। ধৃতরাষ্ট্রের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে পরবর্তী কথাগুলির মাধ্যমে তাঁকে আরও ব্যাপকভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
শ্রীল প্রভুপাদ কৃত তাৎপর্য সমাপ্ত।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: ধৃতরাষ্ট্রের সৎ-ভ্রাতা বিদুর কোনোরূপ আপোষ না করে, সত্য গোপন না করেই ধৃতরাষ্ট্রের সাথে কথা বলছেন। তাই এমনকি যদি শ্রোতা যা শুনছে তা তার শোনার ইচ্ছা না থাকে, তবুও প্রচারকের প্রচার করা আবশ্যক। প্রচারককে সেই কথাই বলতে হবে যা প্রকৃত অর্থেই তার জন্য কল্যাণকর, নচেৎ প্রচার করার কি মানে আছে? বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে অগণিত তথাকথিত প্রচারক আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই এমন কোনো কথা বলছে না যার দ্বারা কারও চেতনার উন্নতি হতে পারে। সেই কারণে, শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র বিশ্বের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী আনয়ন করেছেন, যাতে সেই প্রকৃত প্রচার মানুষের হৃদয় স্পর্শ করার মাধ্যমে তাদের চেতনার পরিবর্তন করতে পারে।
এখানে আমরা লক্ষ করছি যে, ধৃতরাষ্ট্র ষড়যন্ত্র করেছিলেন, কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রের ফলে তিনি কেবল তার নিজ আত্মীয়দের হত্যা করেছিলেন। তাঁর সৎ গুণসম্পন্ন ভ্রাতুষ্পুত্র, যাঁরা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত, তিনি যদিও ষড়যন্ত্র করে তাঁদের হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তবুও তাঁরা নির্দোষ হওয়ায় সেই কর্মফল তাঁর নিজের কাছেই ফিরে এসেছিল। তিনি এতই নির্দয়, এতই নিষ্ঠুর প্রকৃতির যে, তিনি তাঁদেরই ভরণপোষণে জীবন ধারণ করছিলেন, তাঁদেরই গৃহে বাস করছিলেন, আর তাঁরাই তাঁকে রক্ষাও করছিলেন, আর সেই তাঁদেরকেই তিনি হত্যা করার প্রয়াস করেছিলেন।
বিদুর কেবল সমালোচনা করার জন্য এই কথাগুলি বলছিলেন না। তিনি তাঁকে এ কথা বলছিলেন তাঁর আসন ত্যাগ করানোর জন্য, তাঁকে গৃহ ত্যাগ করে বনে গমন করানোর জন্য, সন্ন্যাস ধর্ম অবলম্বন করানোর জন্য এবং আধ্যাত্মিক মার্গে উন্নতির জন্য।
গতকাল আমরা বৈজ্ঞানিক জাদুঘরে গিয়েছিলাম এবং গাড়িতে করে জাদুঘর থেকে ফিরে আসার সময় আমরা লক্ষ্য করি যে জাদুঘরের ভিতর কত উগ্র কর্ম হচ্ছে। তারা অনেক ভার উত্তোলন যন্ত্র, বৈদ্যুতিক শক্তি ও যন্ত্রপাতির মত তথাকথিত আশ্চর্যকর বস্তু লাভ করছে, কিন্তু আমরা যখন গাড়ি চালিয়ে আসছিলাম, আমরা দেখলাম যে পথে আলোক সিগন্যালের ওখানে আমাদেরকে থামতে হল। যদিও আলো পরিবর্তন হয়েছিল, এবং আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু এক বৃদ্ধ ব্যক্তির পিঠে কুঁজ ছিল ও তিনি খুব ধীরে ধীরে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, তাই আমাদেরকে তার পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তাই তাদের কাছে জরাবস্থার জন্য কোনো বৈজ্ঞানভিত্তিক নিরাময় ব্যবস্থা নেই। তাই এটাই প্রকৃত প্রদর্শনী হতে পারত যে—“কীভাবে বার্ধক্য নিরাময় করা যাবে?” শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, “যে সকল বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদের পিঠ বেঁকে গেছে, তা হচ্ছে অতিরিক্ত যৌনাচারণের ফল।” বৃদ্ধ অবস্থায় কেউ যদি অতিরিক্ত অশ্লীলকার্যে লিপ্ত হয়, তাহলে তার পিঠ বেঁকে যায় এবং সে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কখনও কখনও আপনারা দেখবেন তারা পুরোপুরি ৯০ ডিগ্রি বেঁকে গেছে। পুরোপুরি অসন্তোষজনক অবস্থা।
ধৃতরাষ্ট্র তাঁর জরাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন এবং প্রত্যেকেই বৃদ্ধাবস্থা প্রাপ্ত হয়, কিন্তু তারা আসলে ততটা সেই বিষয়ে চিন্তাশীল নয়, যতটা তাদের প্রকৃতই এই চিন্তা করা উচিত যে—“এখন হচ্ছে শেষ মুহূর্ত, এটাই হচ্ছে শেষ সুযোগ, কখন আমি নিজেকে আধ্যাত্মিক জীবনে স্থির করতে পারব?” কিন্তু এর পরিবর্তে তারা কি চিন্তা করে? “আমার ছেলে কেমন আছে? আমার নাতনি কেমন আছে? আমার নাতনির মেয়ে কেমন আছে? কীভাবে নাতির বিয়ে হবে? কীভাবে নাতনির বিয়ে হবে? এবং ছেলে…” ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন কি শেষ মুহূর্তেও তারা কী চিন্তা করছে? তারা কেবল চিন্তা করছে কীভাবে বিভিন্ন পারিবারিক বিষয়াদির সুব্যবস্থা, পারিবারিক যৌন সম্ভোগাদির ব্যবস্থাপনা করা যাবে। এটিই হচ্ছে গৃহমেধী জীবন।
বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে এই অবস্থা থেকে বের করার চেষ্টা করছিলেন। এর পরিবর্তে তিনি বলছিলেন, “কেন আপনি এখানে পড়ে আছেন?” ওঁনাকে তাঁকে ক্রোধিত করতে হয়েছিল, যাতে তিনি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। “যদি আপনার ভ্রাতুষ্পুত্ররা আপনার শত্রু হয়, যাদেরকে আপনি হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, যারা আপনার সন্তানদেরকেও হত্যা করেছেন, তাহলে কেন আপনি এখানে তাদের আশ্রয়ে বাস করছেন?” এরপর, তিনি তাঁকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান দিয়েছিলেন। “এখন আপনি বৃদ্ধ। আপনি এখান থেকে বের হন, আপনার মন ধ্যানে আত্মনিষ্ঠ করুন। আপনি সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করুন, শত্রুদের আশ্রয়ে বেঁচে থাকা বৃদ্ধ কুকুরের মতো নয়।”
এই ঘটনা আমাদের কাছে এটিও প্রমাণ করছে যে, সময় ও কালানুসারে আপনি হয়ত বলতে পারেন, “এই যুক্তি পুরোপুরি আধ্যাত্মিক নয়।” হ্যাঁ, কিন্তু এর দ্বারা তাঁর সেইরূপ অনুভূতি উদ্দীপ্ত হচ্ছে। কারণ আধ্যাত্মিক স্তরে কে শত্রু? আর কে বন্ধু? আমাদের কোনও শত্রু নেই। আমরা যদি এটি অনুধাবন করতে পারি যে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন আমাদের প্রকৃত নিত্য সুহৃদ এবং প্রত্যেক জীবই হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের অংশ, তাহলে কোথায় শত্রু? কে আমাদের দুঃখ দিতে সক্ষম? কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র এখনও সেই বোধগম্যতার স্তরে অধিষ্ঠিত নয়। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তবুও বিদুর তাঁকে কৃপা করার প্রচেষ্টা করছেন। এটিই হচ্ছে একজন শুদ্ধ ভক্তের মহানুভবতা যে এমনকি কেউ সম্পূর্ণ শত্রুভাবাপন্ন হলেও, যদি ভক্ত কোন সুযোগ, কোন অবকাশ পান, তাহলে তিনি এমনকি তাকেও উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। তাই প্রচার হচ্ছে সময়, স্থান এবং পরিস্থিতি:কাল-দেশ-পাত্র অনুসারে প্রয়োগ। যেহেতু ধৃতরাষ্ট্র জাগতিকভাবে আসক্ত, তাই তিনি তাঁর আসক্তি, তাঁর অনুভূতি উদ্দীপ্ত করছেন—“কেন আপনি এখানে আপনার সময় নষ্ট করছেন? আপনি অসম্মানিত হচ্ছেন।” অন্ততপক্ষে তিনি তাঁকে তাঁর আসক্তাবদ্ধ অবস্থা থেকে বের করতে পারেন। মানুষেরা এমন চিন্তা করতে পছন্দ করে যে তারা খুবই সুরক্ষিত, কিন্তু বর্তমান সময়টি তাদের এই উপলব্ধির জন্য ভালো যে আমাদের কোন সুরক্ষা নেই। কোন বন্ধু, পিতা, বোন, ভাই, মা, দেশ, কেউই কাউকে জরাবস্থা এবং মৃত্যুর নিষ্ঠুর হাতছানি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়। তা রাশিয়ান মিসাইল হোক বা রাজপথে দুর্ঘটনা হোক: “পদম পদম যদ্ বিপদাং ন তেষাম”—আমাদের প্রতি পদে পদে বিপদ আছে।
সমাশ্রিতা যে পদপল্লবপ্লবং
মহৎপদং পুণ্যযশো মুরারেঃ।
ভবাম্বুধির্বৎসপদং পরং পদং
পদং পদং যদ্ বিপদাং ন তেষাম্॥
(শ্রী. ভা. ১০/১৪/৫৮)
যদি কোনো ব্যক্তি প্রকৃতই আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত হন, তাহলে তিনি এই জড়জগতের আশ্রয় গ্রহণ করেন না। তিনি ভৌতিক ব্যবস্থাদির আশ্রয় গ্রহণ করেন না। ধৃতরাষ্ট্র এই জাগতিক সুব্যবস্থার দ্বারা নিজেকে খুবই সুরক্ষিত অনুভব করছিলেন, তাঁর কাছে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রেরা ছিলেন, তাঁর কাছে থাকার মত উত্তম কক্ষ ছিল, তাই তিনি উদ্বেগগ্রস্ত ছিলেন না। কিন্তু বিদুর এই একই কথা বলছেন যে, “জেগে উঠুন! আপনি কি মনে করছেন আপনি সুরক্ষিত? যেকোনো মুহূর্তে আপনার মৃত্যু হবে।”
প্রত্যেকেই হচ্ছে এইরূপ, তারা নিজেদেরকে এগুলির দ্বারা পরিবেষ্টন করে রাখার চেষ্টা করে যে, “আমার বাসস্থান আছে। আমার বাড়ি আছে। আমার কাছে ব্যাংকে অর্থ আছে। আমার দেশ আছে। আমার এটা আছে। আমার ওটা আছে।” কিন্তু তারা কি সুরক্ষিত? না!
তাই শ্রীল প্রভুপাদ যখন এসেছিলেন, তিনি সকলকে এই সারতত্ত্ব প্রদান করতে চেয়েছিলেন এবং তিনি লোকেদের অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতেন। যখন তিনি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন, তারা বলেছিল, “শ্রীল প্রভুপাদ আপনি পাশ্চাত্যদেশীয় সভ্যতা সম্পর্কে কি মনে করেন?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি মনে করি তোমরা কুকুরের ন্যায়ে জীবন যাপন করছ, তোমরা কুকুরের মত জীবন যাপন করছ এবং তোমাদের যুক্তরাষ্ট্র মানে হচ্ছে তোমরা কেবল চিৎকার করছ।” শ্রীল প্রভুপাদ ছিলেন অকপটবক্তা, যদি তারা তা গ্রহণ করার মত হত। কারণ মানুষদের ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলিকে উপলব্ধি করতে হবে।
মানুষেরা গাড়ি চালিয়ে পাশ দিয়ে যায় এবং তারা মস্তক মুণ্ডিত ধুতি পরা ভক্তদের দেখে ও চিন্তা করে, “এটা কি?” তারা রাস্তার অন্য প্রান্তে হেঁটে যায়, তখন তাদেরকে আশ্চর্য দেখায় যে তাদের জীবন যাপনের মানদণ্ড কি? তারা মনে করে যে, যদি আপনি স্যুট ও টাই পরিধান করেন, তাহলে সেটাই সভ্যতা এবং বর্তমানে আপনার যদি একটি স্পোর্টস শার্ট থাকে, তাহলে সেটা সভ্যতা। গত বছর ছিল ছোট স্কার্ট পড়ার প্রচলন, তাই এখন আরেক ধরনের স্কার্ট পড়ার প্রচলন হয়েছে। তাই প্রচলন যাই হোক না কেন, সেটাই হচ্ছে সভ্যতা।
এখানে শ্রীমদ্ভাগবতমে আমরা লক্ষ্য করতে পারছি যে অমৃত কোথায় আছে। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য—চৈতন্য মানে চেতনা। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য চরিতামৃত মানে হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলামৃত এবং এর অর্থ চেতনার অমৃত অধ্যয়ন করা। চেতনার ধর্ম কি? তা হচ্ছে সেবা করা। জীবের ‘স্বরূপ’ হয়—কৃষ্ণের ‘নিত্যদাস’ —আমাদের নিত্য ধর্ম হচ্ছে সেবা করা। কাকে সেবা করা? শ্রীকৃষ্ণকে সেবা করা। এটিই হচ্ছে ভক্তিমূলক সেবা অথবা কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন মানে হচ্ছে প্রকৃতসেবার বিকাশ সাধন করা।
জড়জাগতিক জীবনে প্রত্যেকেই সেবা করছে, তারা তাদের পরিবার, তাদের দেশ, এই সমস্ত বিষয়াদির সেবা করছে। তারা যাদেরকে রক্ষা করছে, তাদের থেকে সুরক্ষা প্রত্যাশা করছে, কিন্তু সর্বাপেক্ষা কঠিন মুহূর্তে তারা সেই সুরক্ষা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত থাকে। আমরা শুনি যে কীভাবে কর্ণ ছিলেন এক মহান যোদ্ধা, তিনি ছিলেন মহারথী, কর্ণ একাই সহস্রাধিক সৈন্যের সাথে লড়াই করতে পারতেন, কিন্তু তিনি অভিশাপ পেয়েছিলেন যে—“তুমি যুদ্ধ করতে পারো এবং তোমার সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু যে মুহূর্তে তোমার নিজ শক্তির সবথেকে প্রয়োজন হবে, সেই মুহূর্তেই তুমি তাতে ব্যর্থ হবে। তখন তুমি পরাজিত হবে।” এই হচ্ছে জড়বাদী। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে কতই মহান যোদ্ধা, কিন্তু যখন প্রকৃতই তাঁর নিজের সকল অর্থ, সকল শক্তি, সকল সঞ্চিত বল প্রয়োজন ছিল, তিনি ব্যর্থ হলেন এবং আবার জন্ম-মৃত্যু চক্রে তাঁকে বলপূর্বক ফিরিয়ে আনা হল।
অতএব, কে ভালো শক্তি প্রদর্শন করছে সেটি বিষয় নয়, কে চরমে যুদ্ধে বিজয় লাভ করছে সেটাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। বাংলায় সেখানে এক দল ব্যক্তি আছে, যারা তর্ক করে যে আসলে রাবণ হচ্ছে রামায়ণের বিজেতা, কারণ রাবণ এমন এক বীর যোদ্ধা ছিল, সে শ্রীরামের অর্ধাঙ্গিনীকে অপহরণ করেছিল, তার কাছে কত সৈন্য ছিল, এবং শ্রীলঙ্কায় তার বড় প্রাসাদ সহ সবকিছু ছিল, তাই সর্বদৃষ্টিকোণ থেকেই তার সমগ্র জীবন রামকে পরাস্ত করার মত, কিন্তু অন্তিমে কেবল একবার সে শ্রীরামের দ্বারা পরাজিত হয়। এইভাবে তারা গুণ সাফল্য নির্ধারণ করার চেষ্টা করে এবং প্রযুক্তিগতভাবে রাবণকে জয়যুক্ত করে। কিন্তু এটি কেবল অন্তিমের একটি মুহূর্ত ছিল না, যখন তীর তার হৃদয় বিদীর্ণ করেছিল, তা ছিল চূড়ান্ত পরিণতি, নয়ত এর পূর্বে শ্রীরাম কেবল তার প্রতি সহনশীল ছিলেন।
এইভাবে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অসুরদের সহন করেন, কিন্তু পরিশেষে চূড়ান্ত প্রহারই হচ্ছে জয়ের নির্ধারক। ভক্ত, তিনি প্রকট থাকাকালীন জীবদের কাছে পবিত্র নাম প্রচার করেন এবং অপ্রকটের পরও তিনি বাণীরূপে প্রকট থাকেন। এটিই হচ্ছে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের প্রার্থনা। তাই কেউ কত মহানভাবে জীবনযাপন করছে সেটি বিষয় নয়, কেউ কত মহানভাবে শরীর ত্যাগ করছেন সেটিই মুখ্য বিষয়। যদি কেউ ক্রন্দন করতে করতে, বিষ্ঠা ত্যাগ করতে করতে দেহত্যাগ করে তাহলে তা মহিমান্বিত নয়। এবং দেখুন, যদি কেউ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে, পূর্ণভক্তিভাব সহ, শান্তিময়ভাবে তার বপু ত্যাগ করেন, তাহলে তা গৌরবজনক। এটিই হচ্ছে মনুষ্য জীবন।
মানুষেরা তা বোঝে না, তারা মনে করে একজন ব্যক্তি কি ভাবে জীবনধারণ করছে সেটিই তার গৌরব। না, আমরা বলি যে ব্যক্তির গৌরব কেবল তিনি কীভাবে জীবিত আছেন তা নয়, তিনি কীভাবে মৃত্যুবরণ করছেন সেটাই হচ্ছে চূড়ান্ত পরীক্ষা, এর দ্বারাই প্রমাণিত হবে যে প্রকৃতপক্ষে তিনি কীভাবে জীবনযাপন করেছেন। যে কেউ এই ছলনা করতে পারে যে তারা কত মহান, কিন্তু চরমে শ্রীকৃষ্ণ তা বিচার করবেন। এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন মানুষদের যথার্থ জীবন সৃজন করে ও যথার্থ মৃত্যু প্রদান করে, যার অর্থ হল নিত্য জীবন লাভ করা। জড়জাগতিক জীবনে মানুষেরা মৃত্যু সম্বন্ধে কথা বলতে পছন্দ করে না, এই প্রসঙ্গ অত্যন্ত অরুচিকর, কারণ তারা জানে না মৃত্যু কি—তা হচ্ছে কেবল ক্ষয়িষ্ণু দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ গ্রহণ করা। এমন কি যদি আপনি পুনর্জন্ম গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি একটি নতুন দেহ লাভ করবেন, তাই এতে বিলাপ করার কি আছে? এবং যদি কেউ প্রকৃতই কৃষ্ণভাবনাময় হন, তাহলে তাদের আর কোন জড়জাগতিক দেহ গ্রহণ করতে হয় না, তারা আধ্যাত্মিক দেহ লাভ করেন।
শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাঁর লীলা প্রকাশ করার জন্য যাতে মানুষেরা এটি অনুধাবন করতে পারেন যে আধ্যাত্মিক দেহ থাকার অর্থ কি, কীভাবে আমরা নিত্য কৃষ্ণ সেবায় নিযুক্ত হতে পারব। কিন্তু মানুষেরা এটি বিস্মৃত হয়েছে। তারা এর অপব্যাখ্যা প্রদান করে এবং সেইজন্য শ্রীকৃষ্ণ পুনরায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন কেবল আমাদেরকে এটি প্রদর্শন করানোর জন্য যে কীভাবে শ্রীকৃষ্ণ সেবা করতে হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতাতে তাঁর প্রতি শরণাগত হওয়ার চূড়ান্ত উপদেশ প্রদান করেছেন। এবং এর অর্থ তাঁর আধ্যাত্মিক স্বরূপের প্রতি আত্মসমর্পণ করা। তাঁর একটি আধ্যাত্মিক স্বরূপ আছে এবং এই শরণাগতি হচ্ছে নিত্যস্থিতি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তিনি এটি প্রদর্শন করেছেন যে কীভাবে কেউ শরণাগত হতে পারেন।
তিনি কীভাবে তা প্রদর্শন করেছেন? তিনি তাঁর সকল অনুসারীবৃন্দকে প্রেরণ করেছিলেন। প্রথমত তিনি বিশাল কীর্তন, সংকীর্তন করেছিলেন এবং তিনি তাঁর অনুসারীগণকে বাইরে প্রচার করতে, মানুষদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন গ্রহণে উৎসাহিত করতে প্রেরণ করেছিলেন। শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু এবং শ্রীল হরিদাস ঠাকুর দ্বারে দ্বারে গিয়ে মানুষদের কাছে এই ভিক্ষা করেছিলেন যে, “দয়া করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই আদেশ গ্রহণ করুন। আপনাদের প্রতি তাঁর নির্দেশ হচ্ছে—হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম জপ করুন, শ্রীকৃষ্ণসেবা করুন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা গ্রহণ করুন।” পরম পুরুষোত্তম ভগবান এমনকি দ্বারে দ্বারে গিয়ে মানুষদের কাছে এই বাণী গ্রহণের ভিক্ষা চেয়েছিলেন, এমনকি তাঁর অবমাননা করা হয়েছিল, এমনকি জগাই মাধাই আঘাত হেনেছিল, কিন্তু পরিস্থিতি যাইহোক না কেন, তিনি অবিরত প্রচার করেছিলেন। কখনও কখনও তিনি প্রশংসিত হতেন, কখনও কখনও তাঁর মহিমা কীর্তিত হত, আবার কখনও কখনও তাঁকে অবজ্ঞা করা হত, কিন্তু তাঁর প্রতি এই নির্দেশ ছিল। বর্ণিত আছে যে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু আদি গুরু এবং যেহেতু তিনি আধ্যাত্মিক গুরুর কর্তব্য গ্রহণ করে ভ্রমণ করেছেন ও কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করেছেন, তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রত্যেককে প্রচারক হতে অনুরোধ করেছেন। তিনি প্রত্যেককে সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন প্রচারে সহযোগিতা করতে অনুরোধ করেছেন।
যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি ভক্তভাবসহ বিরাজ করছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রকট-লীলাবিলাসকালীন সময়ে, তিনি তাঁর কোন শ্রীমূর্তি নির্মাণের বিষয়ে অনুমতি প্রদান করেননি। অবশ্য, নবদ্বীপে তাঁর লীলা সমাপ্তির নিকটস্থ সময়কালীন তাঁর প্রিয় সখা গৌরী দাস পণ্ডিত, যিনি কৃষ্ণলীলায় সুবল, তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি তাঁর বিরহভাব সহ্য করতে পারছিলেন না, তাই তিনি তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন যে, “তুমি একটি ব্যতিক্রম কার্য করো এবং আমাকে তোমার এক শ্রীবিগ্রহ রাখার অনুমতি প্রদান করো যাতে আমি তাঁর সেবা-পূজা করতে পারি এবং যাতে আমার কাছেও এমন কেউ থাকে যাঁর সাথে আমি কৃষ্ণকথা আলোচনা করতে পারব। আমি এখানে একা থাকব এবং তুমি চলে যাবে, তা হতে পারে না, কারণ তাহলে আমার সাথে থাকার মত আর কোন সখা নেই।”
তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “আমি কীভাবে আমার নিজের শ্রীবিগ্রহ দিতে পারি? মানুষেরা এটির অপব্যাখ্যা করবে।”
এরপর তিনি বলপ্রয়োগপূর্বক বললেন, “তাহলে আমি তোমাকে যেতে দেব না, তোমাকে যেকোনো একটি শর্ত মানতেই হবে।”
তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সহমত প্রকাশ করলেন। এরপর তারা আবার নবদ্বীপে ফিরে এসেছিলেন। আগে তারা অম্বিকা কালনায় ছিলেন, যা নবদ্বীপ থেকে ৩০ মাইল দূরে অবস্থিত। সেখানে তাদের এক বিশাল নিম বৃক্ষ আছে এবং তা তারা অম্বিকা কালনায় নিয়ে এসেছিলেন, এবং তা থেকে তারা অপ্রাকৃত সুন্দর দুই শ্রীবিগ্রহ নির্মাণ করেন। একটি শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভুর এবং আরেকটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর, যাঁ পূর্ণ সুদীর্ঘ, ৭ ফুট ঊর্ধ্বকায়। যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তখন সেই নির্মাণকারী ঠিক যতদূর সম্ভব তাঁর মতো অনুরূপ শ্রীমূর্তি নির্মাণ করছিলেন এবং যখন নির্মাণকার্য সুসম্পন্ন হয়েছিল, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু বললেন, “ঠিক আছে এখন আমরা যাই!”
গৌরী দাস পণ্ডিত বললেন, “না, তোমরা থাকো। তাঁদেরকে যেতে দাও।” (হাসি) এবং এখানে তিনি শ্রীবিগ্রহগণকে ইঙ্গিত করেছিলেন। “তোমরা থাকো। তোমাদের মধ্যে কোনো ভিন্নতা নেই, তাই তোমরা থাকো।”
তিনি ভেবেছিলেন যে এইবার তিনি তাঁর কুশলী বুদ্ধিমত্তার দ্বারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে পরাস্ত করেছেন কিন্তু তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “ঠিক আছে, আমি রাজি আছি।” ও এই বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন ও ঠিক সেই শ্রীবিগ্রহের মত স্বরূপ ধারণ করলেন এবং শ্রীবিগ্রহ চলমান হয়ে হাঁটতে লাগলেন।
গৌরী দাস পণ্ডিত বললেন, “না! না! না! না! তোমরা থাকো।” (হাসি) “তাঁদেরকে যেতে দাও।”
পুনরায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “ঠিক আছে!” তিনি আবার শ্রীবিগ্রহের স্বরূপ ধারণ করলেন এবং শ্রীবিগ্রহগণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর স্বরূপে সচল হলেন এবং হাঁটতে শুরু করলেন।
“না! না! না! তোমরা থাকো! শ্রীবিগ্রহগণকে যেতে দাও।”
পুনরায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই একই কার্য করলেন।
এরপর গৌরী দাস পণ্ডিত বললেন, “ঠিক আছে, তোমাদের মধ্যে কোন ভিন্নতা নেই।” (হাসি) তিনি তা মান্য করলেন, যেহেতু তিনি জানতেন যে আরো অন্যান্য অনেক ভক্তবৃন্দ আছেন, যাঁরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শন করতে চান।
এইভাবে আমি যতদূর জানি, সমগ্র বিশ্বে এটিই ছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রথম প্রতিষ্ঠিত শ্রীবিগ্রহ। এবং আমি এটি গবেষণা করছিলাম যে কোথায় শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু বিবাহিত হয়েছিলেন এবং আমি গবেষণা করে শাস্ত্রে সেই শ্রীমন্দির সম্পর্কে পড়েছি।
তারা দাবি করছিলেন যে শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু সেখানে বিবাহিত হয়েছিলেন, এ কথা আমি মান্য করিনি, কারণ শাস্ত্রে এটি বলা হয়নি যে তিনি সেখানে বিবাহিত হয়েছিলেন, আসলে তিনি অন্যত্র বিবাহিত হয়েছিলেন, যে স্থানটি হচ্ছে শালগ্রাম। যখন আমি সেখানে গিয়েছিলাম, তখন আমি তাদেরকে বাকবিতর্কে পরাস্ত করেছিলাম এবং তারা এটি গ্রহণ করেছিলেন যে শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু সেখানে বিবাহিত হননি। এটি ছিল এমন এক বিষয় যা তারা পূর্বপুরুষ পরম্পরাক্রমে শুনে আসছেন, কিন্তু এর কোন শাস্ত্রীয় প্রমাণ তাদের ছিল না। যখন আমি সেই শ্রীমন্দিরে গিয়েছিলাম, আমি শ্রীবিগ্রহগণের দর্শন করছিলাম, তাঁরা অপরূপ সুন্দর, তবে প্রায় দু-মিনিট পর তারা দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি বললাম, “এটা কি?” তখন তারা বললেন, “আমরা ভীত যে আমরা যদি দীর্ঘক্ষণ দরজা উন্মুক্ত রাখি, তাহলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু চলে যেতে পারেন। তাই আমরা এক সেকেন্ড অপেক্ষা করি ও আবার দ্বার উন্মুক্ত করি। আমরা প্রতিবার দুই-তিন মিনিটের বেশি তা উন্মুক্ত রাখি না।” এরপর আমি জানতে চাইলাম সেখানে কেন এমন রীতি আছে?
শাস্ত্রে এটি উল্লেখ করা আছে যে এই শ্রীবিগ্রহগণ অত্যন্ত সক্রিয় এবং কেন তারা দ্বার উন্মুক্ত করেন ও বন্ধ করেন, এর যথার্থ কারণ আছে—
একবার যখন গৌরী দাস পণ্ডিতের শিষ্য হৃদয়ানন্দ তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুদেবের ব্যাস পূজা উদ্যাপনের জন্য এক বৃহৎ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, তখন তাঁর গুরুদেব বাইরে ছিলেন এবং যখন গৌরী দাস পণ্ডিত ফিরে এসে তা দেখেন, তিনি বললেন, “এটা কি হচ্ছে?” বাহ্যিকভাবে তিনি অত্যন্ত ক্রোধ প্রকাশ করছিলেন, কারণ তিনি তাঁর থেকে অনুমতি প্রার্থনা করেননি, তিনি একটু অধিক ক্রোধ প্রকাশ করছিলেন, কিন্তু অন্তরে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে আসলেই তাঁর যথার্থ ভক্তিমূলক সেবা মনোভাব আছে। কিন্তু বাহ্যিকভাবে তিনি হৃদয়য়ানন্দকে তিরস্কার করছিলেন, “তুমি কি করেছ? তুমি কোন অনুমতি গ্রহণ করনি? কোন অনুষ্ঠান হওয়া উচিত নয়। তুমি সব অনুষ্ঠান বাতিল করে দাও।” হৃদয়ানন্দের কাছে কোন বিকল্প ছিল না, তাই তিনি সব বাতিল করে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসেছিলেন, জপ করছিলেন ও চিন্তা করছিলেন যে, “কীভাবে আমি আমার আধ্যাত্মিক গুরুদেবের সেবা করতে পারব?” কিন্তু সেইসময় তিনি এত ভক্তদেরকে সেই অনুষ্ঠান কার্যক্রম সম্বন্ধে বলেছিলেন যে সব ভক্তরা অনেক খাদ্যদ্রব্য, শস্য, ফল, দধি, চিড়া সবকিছু বোঝাই শকট সহ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং যখন জিনিসপত্র বোঝাই গাড়ি আসছিল, তখন গৌরী দাস পণ্ডিত এই সব ভক্তদের দেখছিলেন ও তারা শুনছিলেন যে কোন অনুষ্ঠান হবে না। তাই তিনি তা দেখে বললেন, “ঠিক আছে!” এই বলে তিনি হৃদয়য়ানন্দকে ডেকে বললেন, “যেহেতু ইতোমধ্যেই তারা সব দ্রব্যাদি নিয়ে এসেছেন, তাই অনুষ্ঠান হবে।” তখন তিনি এক বৃহৎ কীর্তন শুরু করেন এবং যে সব ভক্তরা আসছিলেন, সেই সহস্র সহস্র ভক্তরা সকলেই গঙ্গার তীরে অত্যন্ত উৎসাহীভাবে কীর্তন করছিলেন। সেসময় গৌরী দাস পণ্ডিত তাঁর আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করেন, তিনি গর্ভগৃহে গিয়ে দেখেন যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু চলে গেছেন, “একি? তাঁরা কোথায় গেছেন?”
তিনি দৌড়ে বাইরে আসেন এবং দেখেন যে হৃদয়নানন্দের কীর্তনের সেই স্থানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং নিত্যানন্দ প্রভু ঊর্ধ্ববাহু করে নৃত্য করছেন, উল্লম্ফন করে হুংকার করছেন, “হরিবোল!” এবং কীর্তন করছেন। আর এই দেখে তিনি আশ্চর্যান্বিত হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি ভীত হলেন যে, যদি তাঁরা এরকম কীর্তনে চলে যান ও পুরোপুরি অন্যত্র চলে যান, তাহলে কি হবে? “আমার কাছে তো আর কেউ থাকবে না!” তখন তিনি তাঁর গাভীচারণের ছড়ি তুলে নেন ও সেখানে যান। মনে রাখুন তিনি হচ্ছেন সুবল সখা, তাই তাঁর এইরূপ সখ্য রস ছিল। তিনি নিত্যানন্দ প্রভু এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পিছনে ধাওয়া করেন, “তোমরা মন্দির ছেড়ে এখানে কি করছ? এরপর তো তোমরা কোথাও পালিয়েই যাবে।” এবং এইভাবে তিনি তাদেরকে মন্দির ফেরা পর্যন্ত ধাওয়া করেন, “মন্দিরে প্রবেশ করো, আর কখনো বের হবে না!” যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দেখলেন যে গৌরী দাস পণ্ডিত এইভাবে ধেয়ে আসছেন, তখন তিনি হৃদয়ানন্দের হৃদয়ে নিজেকে আত্মগোপন করেছিলেন। তাই এই ঘটনার পর থেকে হৃদয়ানন্দ সুপ্রসিদ্ধ হয়েছিলেন, আপনারা চৈতন্যচরিতামৃতে তা লক্ষ্য করবেন, হৃদয়চৈতন্য—যাঁর হৃদয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বিরাজমান।
সেই শ্রীবিগ্রহণ এখনও পূজিত হচ্ছেন, তাই আপনি যদি দর্শন গ্রহণ করেন, তাহলে তারা আপনাকে ফটো তোলার অনুমতি দেবেন না। তাদের কাছে এই পরশপাথর আছে, আর আমারও ছবি তুলতে ইচ্ছা হয়েছিল, কিন্তু হয়ত কোন কৌশল করে তা করতে হবে, সরাসরি তারা এর অনুমতি প্রদান করেন না। এবং তারা কেবল তিন মিনিট দর্শন করতে দেন, এরপরে দ্বার বন্ধ করে দেন, কিছু সেকেন্ড অপেক্ষা করেন ও তারপর আবার তা উন্মুক্ত করেন। তারা বলেছিলেন তারা ভীত যে যদি কোন ভক্ত আসেন ও ভগবান তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন, তাহলে তিনি হয়ত চলে যেতে পারেন, তাই তারা এই বিষয়ে ভীত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সকল শ্রীবিগ্রহগণের সেবা-পূজা, ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সেবার থেকে অভিন্ন এবং প্রকৃতপক্ষে এটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিশেষ কৃপা যে তাঁর সেবা করার মাধ্যমে কেউ তৎক্ষণাৎ সকল অপরাধ থেকে পরিশুদ্ধ হতে পারে।
যদি কেউ পাপপ্রবৃত্তির প্রতি খুবই আসক্ত হয়, তাহলে তার হরে কৃষ্ণ নাম করার পূর্বে অনেকবার এই নাম উচ্চারণ করা উচিত —
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ।
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ॥
যদি কেউ খুবই আসক্ত হয়, তাহলে তার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো লোকেরা শ্রীল প্রভুপাদকে জিজ্ঞেস করতেন, “কেন আমরা কেবল ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নামজপ করি না?” তিনি বলতেন, “কারণ আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুকে অনুসরণ করছি। তিনি যেহেতু হরে কৃষ্ণ নামজপ করেছেন, তাই আমরাও হরে কৃষ্ণ নামজপ করি। আমরা তাঁকে অতিক্রম করে কিছু করি না, আমরা তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করি। যেহেতু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও সকল মহান আচার্যবর্গ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম করেছেন, আমাদের সকল মহান আচার্যগণ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম জপ করেছেন, তাই আমরাও হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করি। কিন্তু হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র উচ্চারণের পূর্বে আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আবাহন করি, তাঁর আগমনের প্রার্থনা করি। আমরা তাঁর পবিত্র নাম উচ্চারণ করি, যার ফলে তাঁর করুনাবশত আমরা হরে কৃষ্ণ নাম নিরাপরাধে করতে সক্ষম হই।
অবশ্য সেই সময় ধৃতরাষ্ট্রের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন না, তাই যদিও তিনি বর্তমান মানুষদের, বিশেষত নেত্রীদের তুলনায় অধিক অপরাধী ছিলেন না, তবুও যেহেতু তার কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ছিলেন না, তাই তিনি ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হতে পারেননি। আমাদের এটি উপলব্ধি করা উচিত যে আমরা কত মহাসৌভাগ্যবান, কারণ যেহেতু শ্রীল প্রভুপাদ ও আচার্যবর্গ আমাদের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আনয়ন করেছেন, সেইজন্য আসলে আমরা এত বৈষ্ণব অপরাধ, এত নাম অপরাধ করা সত্ত্বেও শ্রীকৃষ্ণ সেবার এই দুর্লভ সুযোগ লাভ করছি। এটিই হচ্ছে তাঁর বিশেষ কৃপা যে তিনি ব্যক্তিকে তার অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দেন।
এমন কি এমন ব্যক্তি যারা ব্যক্তিগতভাবে নিত্যানন্দ প্রভুর প্রতি আঘাত হেনেছিল: জগাই মাধাই, তারাও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বারা পূর্ণরূপে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু একবার ক্ষমাপ্রাপ্তির পর তারা আর কোন অপরাধ করেননি। এই বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একবার কেউ যখন আধ্যাত্মিক গুরু গ্রহণ করেন, তখন তার আর কোন অপরাধ করা উচিত নয়। তাহলে তা হবে খুবই অবিবেচনামূলক কাজ, যা আধ্যাত্মিক গুরু এবং শিষ্য উভয়ের জন্যই খুবই ক্ষতিকর।
আধ্যাত্মিক গুরু হচ্ছেন করুণানিধি। তিনি শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধি হয়ে বদ্ধ জীবদের ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর অর্থ, যখন শিষ্য কোনো অপরাধ করে, পাপকার্যে লিপ্ত হয়, তখন আধ্যাত্মিক গুরুকে এর জন্য কষ্ট ভোগ করতে হয়। আধ্যাত্মিক গুরু স্বচ্ছ মাধ্যম স্বরূপ হওয়ায়, এমনকি যদি কোন অপরাধ থাকে যা হচ্ছে পাপময় জীবনের ফলস্বরূপ, তাহলে তা সাধারণত শ্রীকৃষ্ণের কাছেই প্রতিফলিত হয়, কিন্তু যখন কেউ অযোগ্য ব্যক্তিদের দীক্ষা প্রদানের বিষয়ে অসাবধান হন এবং তারা কোন অপরাধমূলক কাজ করে, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে এর সামান্য ফল ভোগ করতে দেন। এমনকি যদিও তিনি হচ্ছেন প্রতিনিধি, তবুও তিনি তাঁকে সামান্য কর্মফল ভোগ করতে দেন, যেমন অসুস্থতা বা অন্য কোন ধরনের যন্ত্রণা। এর দ্বারা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন যে সবকিছু যেমন হওয়া উচিত, তেমন হচ্ছে না। এবং যখন কেউ স্বচ্ছ মাধ্যম না হয়ে, কেবল শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধি হিসেবে আধ্যাত্মিক গুরু না হয়ে, অন্য কোন উদ্দেশ্যবশত আধ্যাত্মিক গুরু হয়, তখন তা ঠিক এক ছাকনীর মত কার্যকর হয় যে যত মাত্রায় তার শ্রীকৃষ্ণের প্রতি স্বচ্ছতার অভাব আছে, তত মাত্রায় কর্মফল শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরত যায় না, বরং তা অবরুদ্ধ হয়ে যায়, জমায়েত হয় ও ফলত তার উপর এক বিশাল বোঝা হয়ে ওঠে।
একইভাবে একজন প্রচারক বাইরে বের হন, আর তার কর্তব্য হচ্ছে—তিনি হয়ত তার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া ব্যক্তিদের দীক্ষা প্রদান করতে না পারেন, কিন্তু যেকোনো প্রচারকের কর্তব্য হচ্ছে তিনি যা শ্রবণ করেছেন ঠিক যথার্থভাবে সেই একই কথা পুনরাবৃত্তি করা। সেজন্য একজন প্রচারকও দায়ী হন। যদি তিনি কাউকে ভুল পথে চালিত করেন, যদি তিনি এমন কোন নির্দেশ প্রদান করেন যা সাধু-শাস্ত্র-গুরু প্রদত্ত যথার্থ সিদ্ধান্ত নয়, তাহলে সেক্ষেত্রে তিনি এর জন্য দায়ী হন। যদি কোন ব্যক্তি সেই নির্দেশ পালন করেন এবং তা পালন করার মাধ্যমে নিজেকে আরো জড় জাগতিক জীবনে বিজড়িত করে ফেলেন, তাহলে সেই কর্মফল সেই প্রচাকের উপর বর্তায়।
শিক্ষাগুরু, তিনি যাদেরকে শিক্ষা প্রদান করেন, তিনি তাদের কোনো স্থায়ী দায়িত্ব গ্রহণ করেন না। তার কর্তব্য হচ্ছে কেবল কৃষ্ণের বাণী প্রদান করা। দীক্ষা গুরু একজন হন এবং শিক্ষা গুরু অনেক হন। যিনি শুদ্ধভাবে কৃষ্ণের বাণী পুনরাবৃত্তি করেন, তিনি শিক্ষা প্রদান করেন, এবং কেউ যখন সর্বদা শুদ্ধভাবে কৃষ্ণের বাণী প্রদান করেন, তাকে শিক্ষা গুরু হিসেবে সম্মান করা উচিত।
তাই প্রত্যেক প্রচারক কৃষ্ণশিক্ষা প্রদান করছেন। সেই অর্থে তিনি যখন প্রচার করছেন, তাকে এই বিষয়ে সতর্ক হতে হবে যে তিনি যাতে কৃষ্ণের বাণী যথার্থভাবে পুনরাবৃত্তি করেন, নয়ত তিনি যদি কোন ভুল বার্তা প্রদান করেন এবং ভুল পথনির্দেশনা প্রদান করেন, তাহলে এর জন্য তিনি দায়ী হন। সেজন্য প্রচারককে খুব সতর্কতা সহ শ্রবণ করতে হবে: শ্রবনং কীর্তনং। প্রচার করতে হলে আপনাকে শ্রবণ করতে হবে। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, “সংকীর্তন করতে হলে প্রচারকদের অধ্যয়ন করা উচিত। তাদের পাঠ শ্রবণ করা উচিত এবং খুব সতর্কভাবে শ্রবণ করা উচিত।”
যেহেতু বিদুর ছিলেন একজন শুদ্ধ প্রতিনিধি, তাই এমনকি ধৃতরাষ্ট্র এক জড়বাদী, পাপকার্যে সমাহিত, নীচ ব্যক্তি ও নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হাওয়া সত্ত্বেও, তিনি তাকে এই কথা বলতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং বিদুরের এই স্বচ্ছতার কারণেই তিনি তাকে এই বাণী প্রচার করতে পেরেছিলেন, যা তাকে এই ভৌতিক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছিল। এইভাবে প্রত্যেক ভক্তকে শুধু শ্রবণ করার মাধ্যমে এবং নাম জপের মাধ্যমে, জাগতিক উদ্দেশ্যশূন্যভাবে সেবা করার মাধ্যমে, ও কোনরূপ চিত্তবিক্ষেপ ব্যতীত, রজ এবং তম গুণের দ্বারা চেতনার কলুষতা ব্যতীত নিজের মধ্যে সেই স্বচ্ছতা, সেই শুদ্ধ ভক্তিমূলক মনোভাব আনয়নের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। এবং কেউ যত স্বচ্ছ হবেন, তিনি ততই বদ্ধ জীবদের উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন।
আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
কোনো প্রশ্ন আছে? হ্যাঁ?
প্রশ্ন: মহারাজ যেমন আপনি উল্লেখ করলেন যে যখন কেউ কৃষ্ণভাবনামৃত উপস্থাপন করছেন, যদি তিনি কাউকে কোন ভুল শিক্ষা প্রদান করেন, তাহলে তার কিছু কর্মফল লাভ হয়। কখনও কখনও গ্রন্থ বিতরণের ক্ষেত্রে আমাদের খ্রিস্টধর্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, যারা দৃঢ়নিষ্ঠ খ্রিষ্টান ধর্মীয় এবং সেক্ষেত্রে কখনো কখনো আমি সেই সব গ্রন্থ নিয়ে যাই এবং তাদেরকে বলি, কেবল অনুদান পাওয়ার জন্য (অস্পষ্ট)
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: আমার মনে পরে যে পাশ্চাত্যে একসময় শ্রীল প্রভুপাদ প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছিলেন এবং একজন বৃদ্ধা মহিলা তার কাছে এসে অনুরোধ করলেন, “পিতা, কৃপা করে আমাকে কিছু নির্দেশ প্রদান করুন।” এবং তিনি বললেন, “ভগবানের প্রতি আস্থা রাখো!” অবশ্যই তার ক্ষেত্রে শ্রীল প্রভুপাদ এটি লক্ষ্য করেছিলেন যে এই শিক্ষাই সর্বাপেক্ষা যথার্থ এবং তার গ্রহণের জন্য উপযুক্ত।
যীশু খ্রিষ্টের শিক্ষায় ত্রুটি নেই। তিনি কেবল জীবকে এক নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত উন্নীত করেছেন এবং এর ঊর্ধ্বে তিনি আর কোন নির্দেশ প্রদান করেননি। তাই ভক্ত একজন ব্যক্তিকে কোনো নির্দেশ প্রদান করতেই পারেন, যা হয়ত মূল উপদেশ নাও হতে পারে, কিন্তু তার এমন কোনো ভুল উপদেশ দেওয়া উচিত নয়, যা ব্যক্তিকে এমন কোনো কার্যে উৎসাহিত করবে যা তার জন্য পুরোপুরি ক্ষতিকর। কোন ব্যক্তি খ্রিস্টধর্মের অন্ধ-অনুগত হলে, সেক্ষেত্রে আপনি তাকে তার ধর্মীয় উদ্দীপনায় উৎসাহিত করছেন। এমন নয় যে আপনি তার উৎসাহ খর্ব করছেন বা তিনি যে স্তরে পৌঁছেছেন তা থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে কেউ যদি কঠোর খ্রিস্টধর্মীয় না হয়, তিনি যদি শ্রীকৃষ্ণকে গ্রহণ করার পর্যায়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনি যদি তাকে উপদেশ প্রদান করা, কৃষ্ণভাবনামৃতে পূর্ণরূপে উৎসাহিত করার পরিবর্তে বামদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যান এবং কর্মকাণ্ডের মতো কোনো ধর্মীয় নিয়মনীতি পালনের দিকে ঠেলে দেন, তাহলে সেটি তার কোন উপকার করা নয়। আমি যতটা বুঝি যে, যদি গ্রন্থ বিতরণের বিষয় হয়, তাহলে মূল লক্ষ্য হচ্ছে অনুদান সংগ্রহ করা। আর প্রচারশক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, আমার মনে হয় আদিকেশব মহারাজের কাছে ভবিষ্যতের জন্য ভিন্ন কার্যপরিকল্পনা আছে। তাই অনুদান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবশ্য কখনো কখনো পরিস্থিতি ভিন্ন থাকে।
প্রশ্ন: (অস্পষ্ট) মানুষ ধার্মিকপথ অবলম্বন করার পরিবর্তে অসৎ পথ সহজে অবলম্বন করে। তাই এই দুই পথের ক্ষেত্রে, (অস্পষ্ট) আপনি কি কৃপা করে আমাদের কাছে এটি স্পষ্ট করে বলবেন যে অসুর এবং আসুরিক আচরণের ক্ষেত্রে কি তত্ত্ব প্রদান করা হয়েছে?
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এই জড় জগতে থাকা জীবেরা হচ্ছে অধঃপতিত জীব, যারা ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম বিস্মৃত হয়েছে। তাই তিনি এই জড়জগতে তাদেরকে এই সুযোগ দিচ্ছেন—প্রথমত, তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার এবং দ্বিতীয়ত, তাদের ভৌতিক বাসনা পূর্ণ করার।
কিছু জীব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে চায় না, শ্রীকৃষ্ণ তাদেরকে সেইমতো কার্য করতে দেন। এমন কি ভগবদগীতায় তিনি বলেছেন যে, “যে আসুরিক ভাবযুক্ত হয়ে কার্য করে,” শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “আমি তার সেই ইচ্ছা পূর্ণ করি এবং সে অগণিত জন্মগ্রহণ করে, পুনরায় বারংবার, অসুর পরিবারে এবং আসুরিক গর্ভে জন্মগ্রহণ করে।”
অতএব, শ্রীকৃষ্ণ প্রত্যেককে উপদেশ দেন যে তাদের তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণ করা উচিত, ঠিক যেমন পিতা তার প্রাপ্তবয়স্ক পুত্রকে বলেন যে, “তোমার এখনও আমাদের সাথেই থাকা উচিত এবং একা কোথাও যেও না।” কিন্তু পুত্র যদি বাইরে যেতে চায়, পতিতালয়ে যেতে চায়, তাহলে পিতা কি করতে পারেন? তিনি তাকে বেঁধে রাখতে পারেন না। তেমনই শ্রীকৃষ্ণও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের মত জীবদের যত্ন গ্রহণ করেন। তিনি তাদেরকে একটি সুযোগ প্রদান করেন যে: তোমার যা ইচ্ছে তুমি তাই করতে পারো, কিন্তু তোমার এটি করা উচিত। কিছু জীব হচ্ছে সুসন্তান এবং কিছু জীব হচ্ছে কুসন্তান। কিছুজন হচ্ছেন ভক্ত এবং কিছুজন হচ্ছে অসুর। তাই স্বাভাবিকভাবেই, যদি কোন কুসন্তান অন্যান্য সুসন্তানদের দুঃখ দিতে উদ্যত হয়, তাহলে তখন ভগবানকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, তখন পিতাকে তাদের রক্ষা করতে হয়। তবে এই ব্যতীত, কুসন্তান যদি কুকার্যে লিপ্ত হয়, সেক্ষেত্রে তিনি কেবল তা নজর রাখেন, “কখন তুমি ফিরে আসবে?” কিন্তু তিনি তার কার্যকলাপে কোন হস্তক্ষেপ করেন না, যতক্ষণ না সে কোন অধিক গোলযোগের পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। তখন তিনি একটি ব্যবস্থাপনা করেন যাতে সবকিছু যথার্থভাবে সাধিত হয়, যাতে মানুষেরা সকলে সুসন্তান হতে পারে এবং সবাই ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হতে পারে।
এইভাবে, এটি এইরূপ বিবেচিত হয় যে, শ্রীকৃষ্ণের উদারতা যা জীবদের, তাঁর অংশোদ্ভূত জীবাত্মাদের বিপথে পরিচালিত হতে দেয়, তা শুদ্ধ ভক্তবৃন্দের কৃপার তুলনায় কম, যারা এমনকি সেই সমস্ত বিপথগামী জীবাত্মাদের কাছে যান এবং তাদেরকে অনুরোধ করেন, “কেন তুমি কৃষ্ণকে ভুলে গেছ? তুমি যে কষ্ট ভোগ করছ তা কি উপলব্ধি করতে পারছ না? তুমি কৃষ্ণের কাছে ফিরে যাও এবং সুখী হও।” শ্রীকৃষ্ণের আসলে অসুরদের বধ করার জন্য এখানে আবির্ভূত হওয়ার দরকার পড়ে না। তিনি যা করেন, তা হচ্ছে তিনি দু’জন অসুরকে অত্যন্ত শক্তিশালী হতে দেন এবং তারপর সেই দুই অসুর তাদের বলপ্রভাবে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করে এবং একে অপরের বিনাশ করে। এবং তখন ভক্তদের আর এই সমস্ত অসুরদের থেকে কোন কষ্ট ভোগ করতে হয় না। সাধারণত বলতে গেলে, অসুরেরা অত্যন্ত ঈর্ষাপরায়ণ, তারা বিশেষত একে অপরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে, তারা ভক্তদের প্রতিও ঈর্ষান্বিত হয়, কিন্তু ভক্তরা এমন দাম্ভিক নয়, তারা নিরহংকারী। তারা লক্ষ্য করেন যে অসুরেরা খুবই উদ্ধত, তারা খুবই প্রসিদ্ধ, তাই অসুরেরা নিজেরাই একে অপরের সাথে লড়াই করে। এটিও অবশ্য শ্রীকৃষ্ণের কৃপা।
পূর্ববর্তী যুগে শ্রীকৃষ্ণ অসুরদের বধ করার জন্য আবির্ভূত হতেন, কিন্তু এই যুগে তিনি অসুরদের আসুরিক মনোবৃত্তি ধ্বংস করার জন্য শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে, হরিনাম রূপে আবির্ভূত হয়েছেন এবং এইভাবে তিনি অসুরদের প্রাণে হত্যা না করে তাদের আসুরিক প্রবৃত্তি নাশ করেন এবং সেই মনোভাব নাশ করে তাদেরকে ভক্তে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে বিনষ্ট করেন। অতএব, শ্রীকৃষ্ণ অসুরদের অত্যন্ত সহজ পন্থা প্রদান করেছেন, কিন্তু তিনি একা কতজনকে উদ্ধার করবেন? তাঁর নিজ ভক্তদের সাহায্য প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে তিনি তাঁর ভক্তদেরকে বাইরে যাওয়ার এবং অন্যদের কাছে কৃষ্ণকে প্রদান করার এই সুযোগ প্রদান করেছেন। এবং এর ফলেই বদ্ধ জীবদের আসুরিক মনোবৃত্তি পরিবর্তিত হবে।
প্রশ্ন: আপনি উল্লেখ করলেন যে যেহেতু ভক্তরা নিরাহংকারী অথবা তারা ততটা দাম্ভিক নয়, তাই অসুরদের কাছে তারা ততটা লক্ষণীয় নয়, কিন্তু কখনো কখনো এমনকি ভক্ত হিসেবেও আমরা কম-বেশি অসুরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। অসুরদের যে দৃষ্টি আকর্ষণ হয় তা কি ভক্তদের এরূপ বিনম্র চেতনার ফল ?
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: ঠিক যেমন প্রহ্লাদ মহারাজ, তিনি কেবল কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করছিলেন, কিন্তু এর দ্বারা তিনি তাঁর নিজের পিতার ঈর্ষা মনোভাব আকৃষ্ট করেছিলেন। যখন একজন ভক্ত প্রকৃতই পূর্ণরূপে বিনয়ী হন, কোন প্রকার মিথ্যা অহংকার ছাড়া কেবল প্রচার করেন, তখনও যেহেতু অসুরেরা উপস্থিত আছে, তাই তারাও তাদের উৎপীড়িত করতে চায়। ইতিহাসেও তা লক্ষ করা যায়। অসুর এবং ভক্তদের মধ্যে সবসময় সংঘর্ষ লেগে থাকে, কিন্তু যখন শ্রীকৃষ্ণ অসুরদের হত্যা করতে চান, তিনি অসুরদের অধিক শক্তিশালী হতে দেন, এবং এর ফলে তারা নিজেরাই একে অপরকে হত্যা করে। মূল বিষয়টি হচ্ছে যে, যখন একজন ভক্ত আসুরিক আচরণের দ্বারা কলুষিত হয়ে পড়ে এবং অযৌক্তিকভাবে আচরণ করে, ব্যক্তি বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে, তিনি চিন্তা করে যে, “আমি একজন ভক্ত”।
আমার মনে পরে মায়াপুরে গুরুদেবের লীলা, শ্রীল তমাল কৃষ্ণ গোস্বামীর এক অসাধারণ লীলা হয়েছিল। সেখানে একদল গুন্ডা ছিল এবং আমরা প্রায় ৪০০০ ভক্তদের প্রসাদ বিতরণ করছিলাম এবং আসলে মহোৎসবের সময় কত ভক্তরা ছিলেন, তাই পুরো স্থান জনাকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। হয়তো পুরো মাঠে ৩০,০০০ মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং প্রায় ৪০০০ জন মাটিতে বসেছিলেন এবং আমরা তাদেরকে প্রসাদ দিচ্ছিলাম। কিছু গুন্ডা রান্নাঘরে আসে এবং প্রসাদ ও বিভিন্ন বস্তু দূষিত করার চেষ্টা করে। একজন রাঁধুনি খুন্তি হাতে তুলে সেই গুন্ডাদেরকে রান্নাঘরের ভিতর আর প্রবেশ করা থেকে বিরত করে এবং তখন তারা চলে যায়, কিন্তু সেখানে একজন ভক্ত ছিলেন যিনি পরে নব বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন, ক্ষত্রিয়দের মুখ্যভূমিকায় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় সেই ব্যক্তিরা সম্ভবত চলে যেতে পারত, কিন্তু তারা বেশ গুন্ডাপ্রকৃতির ছিল, তাই সেই ভক্ত যা করেছিলেন তা আসলে ভুল ছিল না, তিনি যা করেছেন আমি এটি তার সমালোচনা হিসেবে বলছি না, আমি কেবল বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাইছি। তিনি একটি কুড়ি ফুট লম্বা বাঁশ তুলে তার মাথার উপরে ঘোরাতে লাগলেন, সেই সময় অবশ্য সেই স্থানটি প্রসাদবিতরণক্ষেত্র অপেক্ষা কুরুক্ষেত্রের মতই বেশি দেখাচ্ছিল। তখন লোকেরা এদিক-ওদিক সবদিকে ছোটাছুটি করতে লাগল, এটি হয়েছিল ১৯৭২ বা ৭৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি লোকেদের ধাওয়া করে সেই স্থান থেকে বের করেছিলেন। এরপর তারা রাস্তা থেকে গোডাউনের দিকে ইট ভর্তি ব্যাগ ছুঁড়তে লাগল, তখন সেই ভক্ত কোন এক স্থানে লুকিয়ে পড়েছিলেন কারণ বাঁশ তুলে তাদের দিকেই ঘুরিয়ে প্রহারের জন্য তারা তাকে ধরার চেষ্টা করছিল।
যখন শ্রীল প্রভুপাদ এই কঠিন পরিস্থিতির কথা শুনেছিলেন, তিনি তমাল কৃষ্ণ গোস্বামীকে বলেছিলেন যে তাঁর সেখানে যাওয়া উচিত এবং পুরো পরিস্থিতি সামলানো উচিত। শ্রীল তমাল কৃষ্ণ গোস্বামী প্রায় ২০ জন ভক্ত সহ সেখানে কীর্তন করতে শুরু করেন এবং তারা ভবন থেকে বের হয়ে মাঠে যান এবং সেখানে কীর্তন করতে থাকেন। তারা মুখ্য প্রবেশদ্বারের সামনের রাস্তায় বসে পড়েন। সেই সময় অন্য কোন প্রবেশদ্বার ছিল না। এই ঘটনা অন্য কোনো প্রবেশদ্বার নির্মাণের পূর্বে ঘটেছিল। তখন তারা কেবল হরে কৃষ্ণ কীর্তন করছিল, আর কিছু গুণ্ডারা তাদের উপর ইট ছুঁড়তে বা এমন কিছু করতে চাইছিল, কিন্তু জনগণ তাদেরকে বাধা দেয়। তারা বলে, “না ওঁনারা হরিনাম করছেন, আপনারা তাঁদের কোনো আঘাত করতে পারেন না।”
পরিস্থিতি বেশ শান্ত হচ্ছিল, কিন্তু তখন হঠাৎ করে যে ভক্ত বাঁশ তুলেছিলেন, তিনি হেঁটে এসে সেই কীর্তন দলের মধ্যে বসে পড়েন এবং তারা বলে ওঠে, “ওই যে সেই লোকটা!” (হাসি) তারা এটি আশা করেনি যে হঠাৎ করে তিনি সাধু হয়ে যাবে। তারা সেই সবকিছু মনে করছিল যে এই লোকটি বাঁশ দিয়ে তাদের মাথা থেঁতলে দিতে যাচ্ছিল। তখন তারা তাকে সেখান থেকে তোলে এবং আঘাত করতে শুরু করে এবং পরিস্থিতি বেশ গুরুতর হয়ে উঠেছিল। তাই তাকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে অন্যত্র কোথাও লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল। আমি যেই উদাহরণটি দেওয়ার চেষ্টা করছি তা হচ্ছে, আপনি অত্যন্ত কঠোর হতে পারেন, কিন্তু একইসময় একজন ভক্ত হিসেবে আপনার শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয়ও প্রয়োজন।
আসলে তার কঠোরতা ভুল ছিল না, কিন্তু তার সেইসময়ই কীর্তন দলের মধ্যে প্রবেশ করা এবং এটি আশা করা যে তৎক্ষণাৎ তাদেরও অপ্রাকৃত উপলব্ধি হবে সেই ধারণাটি ভুল ছিল। তবে গুরুদেব আসলে অত্যন্ত সাহসী ছিলেন, তিনি সেখানে বসে কীর্তন করছিলেন এবং প্রায় ২০০ জন দাঙ্গাকারী মানুষদের মধ্যে থেকে এমন কার্য করার জন্য যথেষ্ট সাহস লেগেছে। কখনও কখনও ভক্তরা অন্য ব্যক্তির বিষয়ে বিবেচনা না করেই কার্য করে, কিন্তু তবুও মনে করে, “আমি তো একজন ভক্ত।” ব্যক্তি যদি কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় বা বিপরীত কোন কিছু করে, তাহলে তারা রুষ্ট হয়। তাই আমাদের আসলে এটি লক্ষ্য করা উচিত যে আমরা যেন নিজেদের কামনা বা জড়জাগতিক বিষয় অন্য ব্যক্তির উপর চাপিয়ে না দেই এবং যখন সেই ব্যক্তি কোন প্রতিক্রিয়া জানাবে, তখন তারা এইরকম অহংকার পোষণ করে যে, “আমি একজন ভক্ত!” এমনকি তবুও তারা অসুর। এটাই হচ্ছে বাস্তব। যদি কেউ অত্যন্ত বিবেচক হন, কেবল প্রচার করেন, তাহলে এমন ভক্তকে কে পীড়া দেবে? তবে যদি তা করা হয়, তা আলাদা বিষয়। এমন কি এটি প্রহ্লাদ মহারাজের সাথেও হয়েছিল। তা সকল মহান ভক্তদের সাথেই হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণ এমন ভক্তদের রক্ষা করেন এবং যখন কোন ভক্ত রক্ষিত না হন, বা যখন একজন ভক্তের সাথে এমন কোন ঘটনা ঘটে যা তার সুরক্ষার অভাব হিসেবে প্রতিভাত হয়, তাহলে সাধারণত অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে তিনি সেই মুহূর্তে প্রকৃতপক্ষে যা সদাচার ছিল, সেই বিষয়ে উদাসীন ছিলেন।
এটিকে উপলব্ধি করার আরেকটি দিক আছে যে—ভক্ত প্রচার করলে তখন আসুরিক ব্যক্তিরা আসে, তবে তিনি রক্ষিত হন। আমার অনেক সংকীর্তন লীলা মনে পরে যে কীভাবে একজন ভক্ত প্রচার করছিলেন ও তার কাছে কিছু আসুরিক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিরা এসেছিল এবং যেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যে তার মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে, তখনই কিছু একটা হয়েছিল যে তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন। আমার মনে পড়ে যে গত বছর রথযাত্রার সময় আমি এই ঘটনাটি বলেছিলাম যে কীভাবে এক আসুরিক ব্যক্তি এসেছিল এবং পুরো দাঙ্গা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছিল, আর তখন হঠাৎ সেখানে এক বৃষ এসে উপস্থিত হয়, হুস! তাকে মাটি থেকে তুলে ফেলে। বৃষ ধর্মের প্রতিভূ। (হাসি)
আমার মনে পড়ে লস এঞ্জেলসে, পাশ্চাত্যে অনেকবার এমন হয়েছে, অসুরেরা এসেছে এবং তাদের ভক্তদেরকে কোনোভাবে হয়রান করার বা ক্ষতিসাধন করতে পারার পূর্বেই ভক্তরা তাদের সুযত্ন গ্রহণ করতেন। অবশ্য ভক্তরা নিজেদেরও আত্মরক্ষার ব্যবস্থা রাখতেন। তারা শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যা কিছু প্রয়োজন তাই ব্যবহার করতেন। তবে প্রচারক যদি প্রকৃতই শুদ্ধভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করার চেষ্টায় রত থাকেন, তাহলে তিনি রক্ষিত হন। কিন্তু যদি তিনি সামান্য মাত্রায় কোন গুণের দ্বারা প্রভাবিত হন ও অতিরিক্ত কিছু করেন, রেগে যান, বা আপনারা যাই বলেন, তাহলে হয়ত এর প্রতিক্রিয়া অধিক হবে এবং তখন আপনি কৃষ্ণকে দোষারোপ করতে পারবেন না। “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্”—ব্যক্তি যতটা মাত্রায় শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আত্মসমর্পণ করবে, তত মাত্রায় তিনি তাকে আশ্রয় প্রদান করবেন।
Lecture Suggetions
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ