Text Size

১৯৮০০৬০৬ শ্রীমদ্ভাগবত ৭.২.৩৯

6 Jun 1980|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

এই প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ৬ জুন, ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রদান করেছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৭ম স্কন্ধ ২য় অধ্যায় ৩৯তম শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

div class="wavesurfer-transcript" data-transcr-lng="bn">

শ্লোক ৭.২.৩৯

য ইচ্ছয়েশঃ সৃজতীদমব্যয়ো
য এব রক্ষত্যবলুম্পতে চ যঃ।
তস্যাবলাঃ ক্রীড়নমাহুরীশিতু-
শ্চরাচরং নিগ্রহসঙগ্রহে প্রভুঃ॥

অনুবাদ: বালকটি সেই রমণীদের সম্বোধন করে বললেন—হে অবলাগণ! অব্যয় পরমেশ্বরের ইচ্ছার দ্বারাই এই বিশ্ব সংসারের সৃষ্টি, পালন এবং সংহার হয়। এটিই বেদের বাণী। চরাচরাত্মক এই বিশ্ব ঠিক তাঁর খেলনার মতো। তিনি পরমেশ্বর, তাই সৃষ্টি ও সংহার উভয় কার্যেই তিনি পূর্ণরূপে সমর্থ।

তাৎপর্য: এই প্রসঙ্গে মহিষীরা যুক্তি উত্থাপন করতে পারতেন, “ভগবান যদি আমাদের পতিকে গর্তে রক্ষা করে থাকেন, তা হলে তিনি কেন তাকে এখন রক্ষা করেননি?” এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, য ইচ্ছয়েশঃ সৃজতীদমব্যয়ো য এব রক্ষত্যবলুম্পতে চ যঃ। ভগবানের কার্যকলাপ সম্বন্ধে কেউ কোন তর্ক করতে পারে না। ভগবান সর্বদাই ইচ্ছাময়, এবং তাই তিনি রক্ষা করতে পারেন এবং সংহারও করতে পারেন। তিনি আমাদের আজ্ঞাকারী দাস নন; তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। তাই তিনি হচ্ছেন পরম ঈশ্বর। কারও অনুরোধে ভগবান এই জড় জগৎ সৃষ্টি করেন না, এবং তাই তাঁর ইচ্ছার ফলেই তিনি সব কিছু ধ্বংস করতে পারেন। সেটিই হচ্ছে তাঁর পরম ঈশ্বরত্ব। কেউ যদি তর্ক উত্থাপন করে, “কেন তিনি এইভাবে আচরণ করেন?” তার উত্তর হচ্ছে তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, কারণ তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষ। কেউই তাঁর কার্যকলাপ সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করতে পারে না। কেউ যদি তর্ক উত্থাপন করে, "এই পাপময় সৃষ্টি এবং ধ্বংসের কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে?" তার উত্তর হচ্ছে যে, ভগবান তাঁর সর্বশক্তিমত্তা প্রমাণ করার জন্য যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, এবং সেই সম্বন্ধে কেউ কোন প্রশ্ন করতে পারে না। যদি তাঁকে আমাদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় কেন তিনি এভাবে এটা করেন এবং ওভাবে ওটা করেন না, তা হলে তাঁর পরমেশ্বরত্ব খর্ব হত।

***

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: কেন শ্রীকৃষ্ণ কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়? এখানে কে এই কথাগুলি বলছেন? কেউ জানেন?

ভক্ত: যমরাজ।

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: যমরাজ, হ্যাঁ! বাংলায় একটি প্রবাদ আছে যে—যদি পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ কাউকে রক্ষা করেন, তাহলে কার সাধ্য আছে তার ক্ষতি করার? এবং যদি কৃষ্ণ কাউকে মারতে চান, তাহলে কার সাধ্য আছে তাকে রক্ষা করার? ‘রাখে কৃষ্ণ মারে কে? মারে কৃষ্ণ রাখে কে?’ উদাহরণস্বরূপ, কোনো কোনো ব্যক্তি তার গৃহে থাকে, এবং সেখানে বড়ো বড়ো দরজা, বড়ো বড়ো পাহারাদার সহ কত সুরক্ষা থাকে, কিন্তু তবুও তাদের মৃত্যু হয় বা তারা ডাকাতের দ্বারা আক্রান্ত হয় ও সবকিছু চুরি হয়ে যায়। আবার, অন্য কোন ব্যক্তি হয়ত তার দফতরী ব্যাগের মধ্যে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তাকে বিরক্ত করল না। এর কারণ হচ্ছে অবশেষে সবকিছুই কৃষ্ণের হাতে। 

ইচ্ছানুরূপ—এই জড়া প্রকৃতি কেবল কৃষ্ণের ইচ্ছা অনুসারে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় কার্যসম্পাদন করেন। ঠিক যেমন আমাদের শরীরের ক্ষেত্রে আমরা যদি ইচ্ছা করি—“আমার হাতটা নাড়াই” তখন আমার হাত নড়বে। যদি আমরা বালির দুর্গ নির্মাণ করি, তাহলে আমরা তা ভেঙ্গেও ফেলতে পারি। এটি আমাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। সকল জীব হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অংশ: “মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতন ” (গীতা ১৫.৭) তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ সহযোগী এবং কেউ কেউ অসহযোগী। আর শ্রীকৃষ্ণ স্বেচ্ছায় নির্ধারণ করেছেন যে, “অসহযোগী জীবাত্মা যাদের আমি স্বতন্ত্রতা প্রদান করেছি, তাদের জন্য আমি এই জড়জগৎ সৃষ্টি করব, যাতে তারা তাদের স্বতন্ত্র ইচ্ছাপূরণের সুযোগ পায় এবং অবশেষে আমার কাছে ফিরে আসে।”  কিন্তু তিনি তাঁর ভগবত্তার সাথে কোন আপস করেন না। এটাই হচ্ছে পার্থক্য! কৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, এবং তাই তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। এবং তা পরম মঙ্গলময় বলে গণ্য করা হয়। তাঁর কর্মই হচ্ছে আদর্শ। অন্যদিকে, নির্বিশেষবাদীরা মনে করে—“আমি হচ্ছি ভগবান!” কিন্তু তবুও তারা প্রতিমুহূর্তে এই জড়জগতের বিভিন্ন দুঃখময় পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে বাধ্য হয়। তাহলে তারা কি ধরনের ভগবান?  এখানে আমরা লক্ষ করতে পারছি যে কৃষ্ণকে কোনোভাবেই আপস করানো যাবে না। 

ভগবান বলরাম এক সম্মিলনে উপস্থিত হয়েছিলেন, যেখানে রোমহর্ষণ তার বড়ো ব্যাস আসনে উপবিষ্ট ছিল। এবং সেখানে রোমহর্ষণের থেকে ভাগবতের বাণী শ্রবণ করার জন্য অনেক সহস্রাধিক শ্রোতা ও মহান ঋষিরা প্রস্তুত ছিলেন। ভগবান বলরামের অভ্যর্থনার জন্য তারা প্রত্যেকেই উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু রোমহর্ষণ সম্ভবত চিন্তা করছিল—“আমি ব্যাস আসনে উপবিষ্ট আছি!” বলরাম স্বয়ং সেখানে এসেছিলেন, আর অবশ্য গুরু ভগবানের থেকে অভিন্ন।...  কিন্তু কে জানে যে সে সেইসময় ঠিক কি চিন্তা করছিল? সে ভাবছিল, “আমি ব্যাস আসনে বসে আছি, তাই আমাকে দাঁড়াতে হবে না।” যেমন, কোন জায়গায় হয়ত রাজার প্রতিনিধিত্ব করতে রাজার দূত এসেছে এবং সেখানে সকলেই হয়ত তাকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করছে, কিন্তু রাজা যদি স্বয়ং সেই স্থানে আসেন, তাহলে কি  দূত উঠে দাঁড়াবে না? রাজার দূত অবশ্যই উঠে দাঁড়াবে। তিনি তো কেবল রাজার সেবক মাত্র। দূত যখন অন্য দেশে যায়, তখন তাকে হয়ত অনেক অভ্যর্থনা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু যাইহোক না কেন, তিনি রাজার দূত ছাড়া আর কিছুই নয়, তিনি শুধু রাজার বার্তা বহন করে নিয়ে এসেছে। তিনি হচ্ছে বার্তাবাহক।  তাই যদি রাজা আসেন ও দূত মনে করে, “এটা আমার বাড়ি!” তাহলে অবশ্যই সেটা তার ভ্রান্তি। আমরা এই উদাহরণটি দিচ্ছি যে—রোমহর্ষণ তার ব্যাস আসনে উপবিষ্ট ছিল, আর তখন বলরাম আসলেন ও তাকে একটি ঘাস দিয়ে স্পর্শ করলেন। তিনি শুধু একটি ঘাস দ্বারা স্পর্শ করে তার প্রাণহরণ করেছিলেন। তখন প্রত্যেকেই আর্তনাদ করতে শুরু করলেন, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারলেন না কারণ বলরাম হচ্ছেন স্বতন্ত্র ঈশ্বর। তিনি হচ্ছেন স্বরাট পরম ঈশ্বর। তিনি তাঁর যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, কিন্তু তারা দুঃখ প্রকাশ করছিলেন যে,“এখন কে আমাদের কাছে ভাগবত পাঠ করবেন? তিনি আমাদের শিক্ষাগুরু ছিলেন।” তাঁরা কেবল তাঁর কাছে এই সমস্যা সমাধানের প্রশ্ন করতে গিয়েছিলেন। তাঁরা কোনো প্রতিবাদ করেননি যে—“তার প্রাণ হরণ করার আপনার কোন অধিকার নেই!” ভগবানের সবকিছু করার অধিকার আছে। তবে তারা তখন এক দুর্ভাগ্যপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন। সেই জন্য, বলরাম সূত গোস্বামী (রোমহর্ষণের পুত্র)-কে তাদের কাছে ভাগবত পাঠ করার কথা বলেছিলেন। এই হচ্ছে পরিস্থিতি। 

শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বতন্ত্র ভগবান। কেউই তাঁকে আদেশ দিতে পারে না। অবশ্য, প্রেমবশত হয়ত তিনি কোন কার্য করতে সম্মত হতে পারেন, তবে সেটিও তাঁর স্বরাট স্বভাব। তিনি হচ্ছেন সকল শ্রেষ্ঠ গুনাবলীর উৎস। এমনকি যেই সমস্ত গুণগুলি এই জড়জগতে নিকৃষ্ট বলে প্রতিভাত হয়, তাঁর ক্ষেত্রে সেগুলিও সৎ গুণ। তাই স্বভাবতই তাঁর মধ্যে করুণা, স্নেহশীলতা, কৃপা, বন্ধুত্বপূর্ণভাব, ক্ষমাশীলতা, অনুগ্রহ আদি অনেক গুণ আছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই, যদি কেউ তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেন ও তাঁকে নিজের নিত্য প্রভু বা সুহৃদ ভেবে তাঁর সাথে আচরণ করেন, তাহলে কৃষ্ণ এমন নন যিনি ভাব-বিনিময় করবেন না। ভাব আদান-প্রদানে তিনি অন্যদের তুলনায় অধিক সক্ষম। কিন্তু কেউই কৃষ্ণের উপর কোন দাবি করতে পারে না। প্রেম ব্যতীত আর কোন মাধ্যম নেই যার দ্বারা কৃষ্ণ… এমনকি তবুও কৃষ্ণ হচ্ছেন স্বরাট।  তিনি কারও কথা শুনতে বাধ্য নয়, তবে তিনি হয়ত তাঁর প্রিয় ভক্তদের কথা শুনতে ইচ্ছা করতে পারেন। তিনি হয়ত তাঁর অহৈতুকি কৃপা, অচিন্তনীয় করুনাবশত ও দিব্য গুণাবলীর কারণে সেই পদগ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু তিনি হচ্ছেন স্বরাট। তাঁর যা ইচ্ছা তিনি তাই করতে পারেন। 

যদি কোন ভক্ত কৃষ্ণকে বা গুরুদেবকে সস্তাভাবে গ্রহণ করে, তাহলে তৎক্ষণাৎ তার ভগবদ্ভক্তি ব্যাহত হবে। সে যদি চিন্তা করে, “আমি আমার গুরুদেবের জন্য কতকিছু করেছি।” বা শ্রীকৃষ্ণের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। আমরা আধ্যাত্মিক গুরুদেবের মাধ্যম ব্যতীত শ্রীকৃষ্ণের সেবা করি না। তাই কেউ যদি চিন্তা করে, “এখন গুরুদেব আমার জন্য কি করবেন? তিনি আমাকে যথেষ্ট কৃপা করছেন না, কিন্তু কেন তিনি এই গুরুভ্রাতাকে এত কৃপা করছেন? আমি তো তার থেকেও ভালো। আমি কত সেবা করেছি। আমি সবদিক থেকেই বেশি আন্তরিক ও অনেক বুদ্ধিমান।” তাহলে সেই ব্যক্তি এক হতচ্ছাড়া! শিষ্যের সাথে সম্বন্ধের ক্ষেত্রে, গুরুদেবও পরম পুরুষোত্তম ভগবানের মতোই সম গুণযুক্ত। তিনিও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি যেমনভাবে ইচ্ছা তেমনভাবেই তাঁর কৃপা প্রদান করতে পারেন। এক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যদি শিষ্য অনুসরণ না করে, তাহলে গুরুদেব কৃপা করতে বাধ্য নয়। তিনি বিষয়টিকে যেভাবে দেখবেন, সেইভাবে তাঁর কৃপা প্রদান করতে পারেন। তিনি তাকে হয় অবজ্ঞা করার মাধ্যমে অথবা সান্নিধ্যে রাখার মাধ্যমে কৃপা করতে পারেন। কেউ সামান্য মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ক্রন্দন বা প্রার্থনা করতে পারে। সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু আমরা দাবি করতে পারি না। 

কৃষ্ণের উপর কোন দাবি করা যাবে না। এমনকি কিছু ভক্তরা—যেমন নারদ মুনি শ্রীকৃষ্ণের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তাঁর পবিত্র নাম জপে মগ্ন ছিলেন। এবং হঠাৎ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সম্মুখে প্রকট হয়েছিলেন ও তারপর অন্তর্হিত হয়েছিলেন। যখন কৃষ্ণ প্রকট হয়েছিলেন, তখন নারদ মুনি দীর্ঘ বিচ্ছিন্ন ভগবানের দর্শন পেয়ে পরমানন্দের শিখরে উন্নীত হয়েছিলেন, এবং এরপর কৃষ্ণ অপ্রকট হলে তিনি হতাশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, “কৃষ্ণ কোথায়?”  তখন তিনি পুনরায় আসনে বসার ভঙ্গি সঠিক করার প্রয়াস করেছিলেন, প্রাণায়াম, মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন, ও এইভাবে ঠিক আগের মতো সবকিছু করার চেষ্টা করেছিলেন যে কীভাবে কৃষ্ণকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা যাবে? কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ আমাদের যন্ত্রবৎ আচরণ অনুশীলনের দ্বারা প্রকট হতে বাধ্য নন। কোনরূপ যন্ত্রবৎ আচরণ অর্থাৎ ব্যায়াম বা এমনকি সাধনা ভক্তির দ্বারাও কৃষ্ণ প্রকট হতে বাধ্য নন। আপনি এটি বলতে পারবেন না যে, “যদি আমি ৩০০,০০০ নাম জপ করি, তাহলে কৃষ্ণকে আমার সামনে প্রকট হতেই হবে।” এমন কোন যান্ত্রিক পদ্ধতি নেই। এমনকি আপনি যদি ১ কোটি জীবন ধরে হরেকৃষ্ণ মন্ত্র জপ করেন, তাহলেও কৃষ্ণ আপনার সামনে আসতে বাধ্য নন। এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই! কেউ ভগবান কৃষ্ণকে দর্শন না করে ১ কোটি জীবন ধরে ভক্তি অনুশীলন করতে পারেন, হরে কৃষ্ণ নাম জপ করতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি ভগবদ্ভক্তিতে অপরাধ এড়িয়ে না চলেন, তাহলে তিনি অগ্রসর হতে পারবেন না।  ভগবান কৃষ্ণ নিজ ইচ্ছায় আসেন। 

যতক্ষণ আমরা এই অহংকার বজায় রাখি, ততক্ষণ আমরা কোনো না কোনোভাবে গুরু-কষ্ণের সঙ্গে বা অন্যদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেদের গুরুত্বের মিথ্যা ধারণায় আবদ্ধ থাকি, এবং উপলব্ধি করতে পারি না যে আমরা কত ক্ষুদ্র, কত তুচ্ছ তাই কৃষ্ণ আসতে বাধ্য নন। আর সেই অহংকারী মনোভাবের বশবর্তী হয়ে আমরা অপরাধ করি। আমরা মূল্যায়ন করা শুরু করি—আমরা কতটা ভক্তিমূলক সেবা করেছি, এবং কতটা সেবা বা সমর্পণ এড়িয়ে যেতে পারব। আর এটাই হচ্ছে আমাদের জন্য ফাঁদ বা অধঃপতনের পথ। তাই, আমাদের কখনই এটা চিন্তা করা উচিত নয়—কৃষ্ণের সেবায় আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

এমনকি এটা উল্লেখ করা হয়েছে যে, কখনো কখনো ভক্তগণ ভাব স্তরে উন্নীত হন। ভাব স্তর হচ্ছে সেই স্তর, যখন ভক্ত ক্রন্দন করেন, চোখ থেকে জল পড়ে, রোমাঞ্চ হয় ও তাঁর মধ্যে অষ্টসাত্ত্বিক-ভাব প্রকাশিত হয়। তিনি পূর্ণরূপে, অবিরত ভগবদ্ভক্তিতে নিযুক্ত থাকেন। এমনকি সেই স্তরেও কৃষ্ণ হয়ত তাকে সহস্র জন্ম ধরে অপেক্ষমাণ রাখতে পারেন। তিনি সেই ভক্তের সামনে প্রকট না হয়ে অথবা তাকে নিজের কাছে আনয়ন না করে, তাঁর কৃষ্ণের সমীপে আসার যে বাসনা সেটির রসাস্বাদন করতে পারেন। এমনকি তিনি হয়ত কখনো কখনো ভক্তের কাছে আসতে পারেন ও তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন এবং ভক্ত হয়ত তাঁর দেহের সুঘ্রাণ পেয়ে উন্মত্তের মত তাঁর অনুসন্ধান করতে পারেন যে, “কোথায় কৃষ্ণ? এটা কি?” কখনো কখনো এমনকি শ্রীকৃষ্ণ হয়ত ভক্তের সম্মুখে প্রকট না হয়েও তাঁকে স্পর্শ করতে পারেন। অবশ্য, তা অতি উচ্চ স্তরের। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে যে ভক্তের কেমন আচরণ হওয়া উচিত? এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের অপরাধ এড়িয়ে চলতে হবে। 

কখনো কখনো ভক্তরা জিজ্ঞাসা করেন, “আমি তিন বছর ধরে নাম জপ করছি, কত কঠোর চেষ্টা করছি, কিন্তু কেন আমার নাম জপে রুচি আসছে না? আমি উপলব্ধি করতে পারছি না যে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে কী এমন আছে।” কিন্তু অপর ব্যক্তি একদিন নাম জপ করেই তৎক্ষণাৎ স্বাদ আস্বাদন করতে পারছেন। এখানে বিষয়টি এটা নয় যে কেউ তিন বছর ধরে নাম জপ করছে, কিন্তু কোন স্বাদ পায়নি। এর কারণ হচ্ছে সেই মুহূর্তে ঐ ব্যক্তি মায়ার মধ্যে আবদ্ধ আছে। কোনো ব্যক্তির রুচি না হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা অপরাধ করে। যেহেতু তারা বুঝতে পারছে না যে কীভাবে অপরাধ এড়িয়ে চলতে হয়, যেহেতু তারা গুরুদেবের নির্দেশ অমান্য করছে, বা বৈষ্ণবদের বা শাস্ত্রের নিন্দা করছে, অথবা নাম বলে পাপাচরণ করছে, বা এটা মনে করছে যে শ্রীকৃষ্ণ ও দেবতারা সমপর্যায়ভুক্ত বা শ্রীকৃষ্ণ ও পবিত্র নাম যে অভিন্ন তা না জেনে নামে অর্থবাদ আরোপ করছে, অথবা অবিশ্বাসীদের অন্ধভাবে প্রচার করছে এটি না বুঝে যে কীভাবে তারা কৃষ্ণ থেকে আরও দূরে চলে যাচ্ছে। অথবা যেহেতু হরিনাম স্বর্গলোকে যাওয়ার কোন এক পুণ্য কর্মের মত মনে করছে বা ইত্যাদি ইত্যাদি অপরাধ করছে, তাই এর ফলস্বরূপ তারা হরিনামে রুচি লাভ করতে পারছে না। তাই এটি অন্য কারও ভুল নয়, তাদের নিজেদের ভুল। এটি তাদের নিজেদের গাফিলতি। 

একজন ভক্ত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তদের প্রতি অপরাধ করেছিলেন এবং যখন তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান, তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন, “আমি আর তার সাথে দেখা করব না। তোমরা তাকে আমার সামনে আনবে না। যে এমন অপরাধ করেছে, আমি তার মুখদর্শন করতে চাই না।” তখন তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারবেন না ভেবে অত্যন্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি খুবই দুঃখ পাচ্ছিলেন যে আমি চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারছি না। এরপর সেই ভক্ত প্রার্থনা করলেন, “আমি আবার কবে চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারব?” মহাপ্রভু বলে পাঠালেন, “১ কোটি জন্ম পর তুমি আমার দর্শন পাবে।” এবং যখন তিনি তা শুনলেন, “তুমি এক কোটি জন্ম পর চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারবে।” তখন তিনি আনন্দে উল্লম্ফন করতে লাগলেন ও হুংকার দিতে থাকলেন—“হরিবোল! হরিবোল! গৌর হরিবোল! আমি ভেবেছিলাম আমি আর কখনই চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারব না।”  এইভাবে তিনি খুবই আশাবাদী হয়েছিলেন। কারণ তিনি ভেবেছিলেন যে, “আমি আর কখনোই চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারব না।” কিন্তু যখন তিনি শুনলেন যে কেবল ১ কোটি জন্ম পর, অর্থাৎ “আমি আবার কোন এক সময় চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারব!” তখন তিনি আনন্দে অভিভূত হয়েছিলেন। 

এমনকি এই জড় জগতে, “ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান জীব। গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা-বীজ॥” (চৈ চ মধ্য ১৯.১৫১) আপনারা কি জানেন যে আমরা কত জন্ম ধরে এই জড় জগতে আছি? এমন কোনো কম্পিউটার নেই যা একাধিক সাহায্য ছাড়া সেই সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে। “ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে”। এক এক ব্রহ্মাণ্ড হচ্ছে এক একটি বন্ধ কারাগারের মতো, যা সৃষ্টি হয়েছে ব্রহ্মার জন্মের সময় ও ধ্বংস হবে তার অন্তিম সময়ে। তাই এটিকে বলা হয় ব্রহ্মাণ্ড। ব্রহ্মার জীবনকাল পর্যন্ত এর অস্তিত্ব থাকে। ব্রহ্মার ১ দিন হচ্ছে ৪৩ লক্ষ বছর x ১০০০, সুতরাং ৪৩০ কোটি বছর। এটি হচ্ছে তার এক দিন এবং এইভাবে তিনি দিন-রাত্রি যাপন করেন। এবং ৩০ দিনে ১ মাস এবং ১২ মাসে ১ বছর হিসাবে তিনি ১০০ বছর জীবিত থাকেন। আর আমরা ভ্রমণ করছি—“ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে”—আমরা এক ব্রহ্মাণ্ড থেকে আরেক ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করছি। যেহেতু ব্রহ্মার জীবনের অন্তিমে এই সমগ্র জড়জগৎ বিলীন হয়ে যায়, তাই এরপর যখন কৃষ্ণের ইচ্ছা হয়, তখন তিনি সৃজন করেন ও পুনরায় আমরা নতুন ব্রহ্মাণ্ডে যাই ও সেখানে ব্রহ্মার এক জীবৎকাল ব্যাপী পোকা, কিট-পতঙ্গ, মনুষ্য রূপে পুনরায় নিম্নে ফিরে আসি। “ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে”—আমরা এইভাবে এক ব্রহ্মাণ্ড থেকে অন্য ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রমণ করে চলেছি। এবং এমন নয় যে, এক ব্রহ্মাণ্ড থেকে অন্য ব্রহ্মাণ্ডে যেতে ১ দিন সময় লাগে। তাহলে ১০ লক্ষ জন্মের হিসাব কী হবে? 

যতক্ষণ পর্যন্ত ভক্ত এমন চিন্তা করবে যে, “আমি এত দিন অবধি সেবা করব এবং এর মধ্যে যদি কৃষ্ণকে না পাই, তাহলে অন্যকিছু চেষ্টা করব।” তাহলে এর মানে তার কোন আস্থা নেই। ভক্তের এইরকম দৃঢ় সংকল্প থাকতেই হবে যে—“এই জড়জগতে লাভ করার মত অন্য কোনো মূল্যবান কিছু নেই। আমি কৃষ্ণ ব্যতীত আর কোন কিছুই চাই না এবং আমার কোন শর্ত নেই। আমার একমাত্র শর্ত হচ্ছে যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি কেবল কৃষ্ণ সেবা করে যেতে চাই।” শ্রীকৃষ্ণ এত নিষ্ঠুর নন যে তিনি আমাদেরকে তাঁর সেবার জন্য আবশ্যক পরিস্থিতি প্রদান করবেন না। আর যিনি আসলে শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করবেন, তিনি হচ্ছেন এমন এক ভক্ত যিনি প্ররোপুরি প্রস্তুত, সংকল্পবদ্ধ বা এই ইচ্ছায় পূর্ণরূপে স্থির যে, “শ্রীকৃষ্ণের কাছে পৌঁছানো ছাড়া আমার আর কোন লক্ষ্য নেই!”  এটিই হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তি।

অন্যাভিলাষিতাশূন্যং জ্ঞানকর্মাদ্যনাবৃতম্।
আনুকূল্যেন কৃষ্ণানুশীলনং ভক্তিরুত্তমা॥
(চৈ. চ. মধ্য ১৯.১৬৭)

যেমন অর্জুনকে বলা হয়েছিল, “তুমি কেবল আমার কথা চিন্তা করো।” তখন তিনি বলেছিলেন, “আমি তা করতে পারছি না। হে কৃষ্ণ, কেবল তোমার কথা চিন্তা করা খুবই কঠিন কারণ মনকে নিয়ন্ত্রণ করা উত্তাল বাতাস নিয়ন্ত্রণের থেকেও বেশি কঠিন।” অবশ্য, অর্জুন সবসময় কৃষ্ণের কথা চিন্তা করতেন, কিন্তু তবুও তিনি উপলব্ধি করলেন—“এটি হয়ত করা কঠিন, তাই তুমি আমাকে অন্য উপায় বলো।” আসলে অর্জুন সবসময়ই কৃষ্ণের কথা চিন্তা করতেন, কিন্তু তবুও তিনি আমাদের উপকারার্থে এটি জিজ্ঞাসা করেছেন যে—“আচ্ছা আমি যদি সব সময় তোমার কথা চিন্তা করতে না পারি, তাহলে এর পরিবর্তে আমি কি করব?” তখন ভগবান বললেন, “ঠিক আছে তাহলে তুমি আমাকে চিন্তা করার অভ্যাস করো।” তাই ভক্ত যদি সবসময় কৃষ্ণকথা স্মরণ করতে না পারেন, তবুও তার এটি বোঝা উচিত যে— “আমার জীবনের লক্ষ্য কি?” যদি আমরা কৃষ্ণকথা চিন্তা করতে পারছি না বলে এটা ভাবি যে, “ওহ ঠিক আছে। আমার স্তর যথেষ্ট ভালো।” আর সবাইকে নিজের মত ভেবে সন্তুষ্ট থাকি যে, “অন্যরা তত উন্নত নয়, আর আমিও তত উন্নত নই, তাই আমার অবস্থা যথেষ্ট ভালো।” তাহলে তা ঠিক নয়। আমাদের গুরু-শাস্ত্র-সাধুকে নিজেদের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যদি প্রত্যেক ভক্ত সর্বোচ্চ মানদণ্ডে স্থির থাকেন, তাহলে তিনি চরম উন্নতি করতে পারবেন। 

সমসাময়িক ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়? সেখানে প্রত্যেকেই তাদের মানদণ্ড স্থির করে পারিপার্শ্বিক মানুষের আপেক্ষিক ত্রুটির ওপর ভিত্তি করে, এবং তাই ক্রমশ ধাপে ধাপে এর পতন হয়। যেমন—“আমার ঠাকুমা, তিনি একাদশী পালন করতেন, পূর্ণিমায় উপবাস করতেন, কষ্ণ-পূজা করতেন, আর সবসময় কাউকে দেখলেই ‘জয় শ্রী কষ্ণ!’ বলতেন, তিনি সবসময় তিলক সেবাও করতেন। এরপর আমার বাবা তিলক সেবা ও একাদশী পালন বন্ধ করলেন, কিন্তু তিনি শ্রীবিগ্রহের সামনে প্রণাম করতেন। তিনি ধূমপান ও চা পান করতেন, তবে ‘জয় শ্রী কষ্ণ!’ বলতেন।” এইভাবে ব্যক্তি যখন এইরকম মানুষদের দেখে, তখন এরপর আমি কি করছি? “আমি মদ পান করছি, কিন্তু মুরগি মাংসের উপর তুলসী পাতা রেখেছি।” (হাসি) এবং এর পর অধঃপতন আরো বাড়তে থাকে। তাই এর ফলে কি হচ্ছে? সংস্কৃতি যখন নিম্নগামী হয়, তখন পরিবার ভেঙে যায়, প্রথা বিলুপ্ত হয় ও এইভাবে ধাপে ধাপে মানুষ আরও অজ্ঞতার অন্ধকারে এগিয়ে যায়। 

যেকোন আধ্যাত্মিক সংস্থার ক্ষেত্রেও এই একই ঘটনা ঘটতে পারে। এই গুরু-পরম্পরার পন্থাটি কি? তারা হচ্ছেন কেবল পথ পরিষ্কারক। গুরু মানে, তিনি হচ্ছেন পথ পরিষ্কারক, যিনি সকল কল্মষ পরিষ্কার করে শুদ্ধ ধারা বজায় রাখেন। তাই আমাদের এই বিষয়ে সুদৃঢ় থাকতে হবে যে আমাদের লক্ষ্য কি? এবং মায়ার ছলনা হচ্ছে—প্রথমে কৃষ্ণকে ভুলিয়ে দেওয়া ও তারপর আমাদের অধঃপতিত করা। প্রথম বিস্মৃতি হচ্ছে এটি ভুলে যাওয়া যে—“শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তি কি? আমার জীবনের লক্ষ্য কি?” এবং তখন জীব ভাবতে শুরু করে, “ভক্তিতে আমার অবস্থা যথেষ্ট ভালো!” যখন আমরা অমনোযোগী বা অলস হয়ে পরিপূর্ণতা লাভের চেষ্টা থামিয়ে দেই, তখনই আমাদের অধঃপতন হয়। এটাই হচ্ছে পরবর্তী পদক্ষেপ ও এরপর ধীরে ধীরে আমরা অধঃপতিত হই। কেন রুচি আসেনি? যেহেতু আমরা শুদ্ধ ভক্ত হওয়ার চেষ্টা করিনি তাই। এই কারণে ভক্ত রুচি লাভ করতে পারছে না, যেহেতু তিনি সর্বোচ্চ লক্ষ্য সম্বন্ধে বিস্মৃত হয়ে নিজেকে মধ্যবর্তী অবস্থায় রাখার চেষ্টা করছে।  তত্ত্বগতভাবে তিনি জানে যে এই জড় জগৎ দুঃখময়, কিন্তু তিনি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ নয় যে—“আমি কৃষ্ণের কাছে পৌঁছাতে চাই।” যখন ভক্ত কৃষ্ণের আশ্রয় নেওয়ার সময় জাগতিক দুঃখ থেকে সামান্য রক্ষা পায়, তখন তিনি যদিও কৃষ্ণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, কিন্তু এই চিন্তা করে যে, “এই পরিস্থিতিই বেশ ভালো—এক পা মায়ার দিকে, আরেক পা কৃষ্ণের দিকে।” তখন তার অবস্থা শেষ। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর আশ্রয় সরিয়ে নেন, যেহেতু ভক্ত কৃষ্ণের দিকে অগ্রসর না হয়ে, মায়ার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। 

আর (এই উদাহরণটি ঋষিগণ দিয়েছেন) যদি আপনি মাঝ নদীতে থাকেন এবং একইসময় এক নৌকায় একটি পা এবং অন্য নৌকায় আরেকটি পা রাখেন, তাহলে কি হবে? হয় আপনি আপনার পায়ের সন্ধি ছিঁড়ে জলে পড়ে যাবেন, অথবা আপনাকে কোন একটি নৌকায় লাফ দিতে হবে।  আমরা জড়জগৎ থেকে আধ্যাত্মিক জগতের দিকে পদক্ষেপ ফেলছি। সেই পদক্ষেপ নিতে এমনকি এক জীবন বা পাঁচ জীবনও লাগতে পারে, আবার তা এক মিনিটেও হতে পারে! তবে ঠান্ডা লড়াই হোক বা উষ্ণ লড়াই, আমরা এই পদক্ষেপ ফেলি। এটি হচ্ছে মায়ার সঙ্গে এক যুদ্ধ। এবং যদি কেউ মায়াকে নিজের বন্ধু ভাবতে শুরু করে, তাহলে তিনি যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন। এর অর্থ মায়া এই সংঘর্ষে বিজয়ী হয়েছেন। 

তাই, শাস্ত্র কেন এত বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে কি করা উচিত? কি করা উচিত নয়? কার্য ও অকার্য। যিনি কি করা উচিত বা উচিত নয় সেই বিষয়ে অজ্ঞাত, তার জন্য বলা হয়েছে—“কার্য অকার্য অজ্ঞানতঃ, গুরু ত্যাগম্ বিধিয়তে”—তিনি গুরু হলেও, তাকে পরিত্যাগ করা উচিত। এটাই ভগবান কৃষ্ণচৈতন্য বলছেন। আমাদের সাহায্য করার আর কে আছে? আমরা নিজেদেরকে সমাজ, বন্ধুত্ব ও দেশের প্রতি সমর্পণ করি, কিন্তু মৃত্যুর সময় আমাদের কে রক্ষা করতে পারবে? প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণ কখনও জীবকে অধঃপতিত হতে দেন না। কিন্তু জীব যদি মনে করে, “কৃষ্ণ আমার কিছু দাবি আছে যা তোমাকে করতেই হবে।” না, কৃষ্ণ তাঁর ভক্তকে অধঃপতিত হতে দেবেন না। কিন্তু তিনি কীভাবে তাঁর ভক্তকে রক্ষা করবেন সেটা তাঁর নিজস্ব ব্যাপার। ভক্তদের আগ্রহ এটা নয় যে, “কীভাবে কৃষ্ণ আমাকে রক্ষা করবেন?” বা “কীভাবে তিনি আমার আবশ্যকতা পূরণ করবেন?” ভক্তদের আগ্রহ হচ্ছে কেবল, “আমি কীভাবে গুরুদেবের মাধ্যমে কৃষ্ণের সেবা করব?” এবং কৃষ্ণের আগ্রহ হচ্ছে, “আমি কীভাবে আমার ভক্তকে রক্ষা করব?” তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “আমার ভক্ত কখনও বিনষ্ট হন না।” ভক্ত চিন্তা করেন—“কীভাবে আমি গ্রন্থ প্রচার করব? কীভাবে ব্যক্তিদের সদস্য করব? কীভাবে এই সেবা করতে পারব? কীভাবে সমাধি মন্দির নির্মাণ করতে পারব? কীভাবে এই সমস্ত ব্যক্তিদেরকে উদ্ধার করতে পারব?”এইভাবে তিনি চিন্তা করতে থাকেন। এবং কৃষ্ণ পরিকল্পনা করেন যে, “এখন আমি কীভাবে আমার ভক্তকে রক্ষা করব?” দেখুন, কি অসাধারণ!

আমি সেই মন্দিরে গিয়েছিলাম, যেখানে চৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। আমি শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর আবির্ভাব স্থান দর্শনে যাচ্ছিলাম। আর আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম যে দুপুরের মধ্যে সেখানে পৌঁছে ফিরে আসব, কিন্তু আমাদের একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। যা অস্বাভাবিক নয়! চৈতন্য মহাপ্রভুর সন্ন্যাস মন্দির যা গদাধর দাস ও নরহরি ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই কেশব ভারতী আশ্রমে আমরা দুপুর ১২ টার সময় পৌঁছাই। তখন আমি সেখানকার এক শিষ্য, গোস্বামীকে বলেছিলাম আমাকে আরও এক ঘণ্টা দূরে অবস্থিত কৃষ্ণদাস কবিরাজের আবির্ভাব স্থানে নিয়ে যেতে। কিন্তু তিনি জোর করলেন যে—“আপনাকে প্রসাদ গ্রহণ করতেই হবে!” আমি বললাম, “না আমাকে সেই স্থানে গিয়ে কৃষ্ণদাস কবিরাজের আবির্ভাব স্থানটি দর্শন করতে হবে। আমরা সেখানে কিছু উন্নয়ন করতে চাই।” তখন তিনি বললেন, “আপনি কৃষ্ণের সেবার কথা ভাবছেন, সেটা আপনার দায়িত্ব। কিন্তু কৃষ্ণের দায়িত্ব হচ্ছে আপনাকে ভোজন করানো। অতএব, কৃষ্ণের আদেশ হিসেবে আপনাকে অবশ্যই তাঁর প্রসাদ গ্রহণ করতে হবে।” তাই আমি আর কি করতে পারতাম? (হাসি) তারা আমাদের খুব ভালো প্রসাদও দিয়েছিলেন! 

আসলে, এটাই ধ্রুব সত্য। তিনি যা বলেছিলেন, তা একেবারেই সঠিক—এটা কৃষ্ণের দায়িত্ব। অবশ্য, আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করি যে—“এটা আমার শরীর, তাই কৃষ্ণের জন্য আমাকে নিজের শরীরের খেয়াল রাখতে হবে।” এই বিষয়টি আছে। আমাদের তা অবহেলা করা উচিত নয়। কিন্তু আমরা নিজের দেহকে কৃষ্ণের সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ করি। আর ভক্তরা যেমন সরলভাবে জীবনযাপন করেন, কোন বিষয়ী ব্যক্তি তা করার সাহস দেখাবে না। তারা নিজেদের জন্য অনেক কিছু আয়োজন করতে চায়, কিন্তু কৃষ্ণের কৃপায় একজন ভক্ত এমনভাবে জীবনযাপন করতে পারেন যে তিনি আসলেই নিজেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অনুভব করেন। এমনকি তার কার্যকলাপের ক্ষেত্রেও তাই হয়। যেমন গৃহস্থরাও তাদের কর্ম করছে, কিন্তু যেহেতু তারা কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল, তাই কৃষ্ণ যা কিছু প্রেরণ করেন, তাই তারা গ্রহণ করেন। আর যদি কেউ প্রকৃতই ভক্ত হন, তাহলে কৃষ্ণও তাঁকে সবক্ষেত্রে সাহায্য করেন। সমাধান সূত্র হচ্ছে—আমাদের ভক্ত হতে হবে। আর ভক্ত মানে আমরা নিজেদের সেবার মাধ্যমে কৃষ্ণকে প্রসন্ন করতে চাই। এবং আমরা কতটা শুদ্ধ ভক্ত, তা নির্ভর করে আমরা কতটা অপরাধমুক্ত থাকতে পারছি। মূল বিষয় হলো—গুরুদেবকে সন্তুষ্ট করার ইচ্ছায় আমরা কতটা স্থির আছি ও কতটা আন্তরিকভাবে তা করার চেষ্টা করছি। তাই যদিও কৃষ্ণের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তিনি আমাদেরকে অপেক্ষায় রাখতে পারেন, কিন্তু তবুও তিনি আমাদেরকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের থেকেও বেশি আকুল। তিনি আমাদেরকে তাঁর কাছে আনার জন্য আমাদের থেকেও বেশি আগ্রহী। আমরা কৃষ্ণের দিকে এক পা অগ্রসর হলে, তিনি আমাদের দিকে দশ পা এগিয়ে আসেন। তিনি এতই অধীর। 

শ্রীল সনাতন গোস্বামী বর্ণনা করেছেন, কখনও কখনও বদ্ধ জীব যখন অবশেষে কৃষ্ণের কাছে পৌঁছান, তখন কৃষ্ণ তাঁকে আলিঙ্গন করে ক্রন্দন করেন যে—“আমি বহু কাল ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম! তোমার আমার কাছে ফিরে আসতে কেন এত সময় লাগল?” এমনকি কখনো কখনো কৃষ্ণ তাঁর ভক্তের সঙ্গে সাক্ষাতের আনন্দে অচেতন হয়ে পড়েন। তাহলে ভক্তের কথা আর কি বলার আছে? তিনিও অচেতন হয়ে পড়েন।  কৃষ্ণ আমাদেরকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য এত অধীর, কিন্তু আমরাই বিভিন্ন জড়জাগতিক বিবেচনার দ্বারা নিজেদের পা আটকে রাখছি। যদি আমরা কৃষ্ণের ইচ্ছাপূরণের চেষ্টায় সামান্য আগ্রহী হই, ও বদ্ধ জীবদের উদ্ধারের ক্ষেত্রে গুরুদেবের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে কৃষ্ণকে লাভ করা খুব সহজ, কারণ তিনি আমাদেরকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য এতই আগ্রহী, যা আমাদের কল্পনার বাইরে। কিন্তু আমরা বলছি—“আমি এখন আসতে চাই না! কৃষ্ণ, তুমি আরেকটু অপেক্ষা করো, আমাকে আগে এই একটা কাজ শেষ করতে দাও। তুমি আমার কাছে এসেছ, কিন্তু আমি তোমাকে সময় দেওয়ার আগে এটা উপভোগ করতে চাই।” তখন কৃষ্ণ বলেন, “তুমি প্রথমে ভোগ করো ও তারপর ফিরে এসো।” আমরা বিষয় ভোগ করে চলেছি, কিন্তু কৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়ার সময় আর আসে না। তবে কেউ যদি সত্যি একনিষ্ঠ থাকেন যে—“আমি কৃষ্ণের কাছে পৌঁছাতে চাই!” তাহলে কৃষ্ণ তাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রাখেন না। এমনকি ভক্তিরসামৃতসিন্ধু গ্রন্থে এটি বর্ণিত আছে যে—এমন উন্নত ভক্তদের জন্য কৃষ্ণ স্বয়ং অপেক্ষা করতে পারেন না। তিনি খুব অধৈর্য হয়ে পড়েন। তিনি সেই ভক্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। এটি ভগবান কৃষ্ণের নিজেকে প্রকাশ করার প্রশ্ন নয়, যদি ভক্ত কৃষ্ণ সেবা করার প্রতি আগ্রহী হন, তাহলে ভগবান স্বয়ং তাঁর ভক্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন, তিনি তাঁর ভক্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অধীর আগ্রহী! 

এখানে আমরা দেখতে পারছি যে, যমরাজ প্রকৃত পরিস্থিতি সম্বন্ধে উপদেশ দিচ্ছেন যে, “তোমরা বারংবার প্রয়াস করতে পারো কিন্তু সুখী হতে পারবে না।” কেবল কৃষ্ণ কৃপাই হচ্ছে আনন্দ লাভের রহস্য। এমন কি আপনি যদি জাগতিকভাবেও সুখী হতে চান, সেটিও ভগবানের মধুর ইচ্ছায় রচিত বা ব্যর্থ হয়। আপনি সুখী হওয়ার সব বন্দোবস্ত করতে পারেন, কিন্তু যদি কৃষ্ণের এইরূপ পরিকল্পনা না থাকে যে আপনার এই ভাবে সুখী হওয়া উচিত, তাহলে আপনি যতই ব্যবস্থা করুন না কেন বা যেখানেই যান না কেন, ভগবান সেই সব ব্যর্থ করে দেবেন। যদি কৃষ্ণ কাউকে দরিদ্র রাখতে চান, তাহলে তিনি ধনী হওয়ার সব ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও ধনী হতে পারবে না এবং যদি কৃষ্ণ কাউকে ধনী করতে চান, তাহলে তিনিই সব ব্যবস্থা করে দেবেন ও অর্থ এমনিই আসবে। এই জন্যই কৃষ্ণ বলেছেন যে—আমাদের তাঁর উপর নির্ভর করে ভগবদ্ভক্তির কর্তব্য পালন করে চলা উচিত। এবং আমাদেরকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব হচ্ছে কৃষ্ণের। এই দায়িত্ব তাঁর। আমরা যতটা কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল হই, তিনি ততটা আমাদের জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

আমার মনে পড়ে, একবার এক ভক্ত শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন ও তিনি এই বলে কাঁদতে শুরু করেছিলেন যে—“কৃষ্ণ, কৃষ্ণ, তুমি আমার সাথে কেন এরকম করছ?” কারো মুখ থেকে এমন বাক্য শোনা সবথেকে ভয়ংকর ও অপরাধজনক। আমি তাকে থামালাম, “তুমি কীভাবে এটা বলছ? আমরা এই জন্ম ও পূর্ববর্তী অগণিত জন্ম ধরে কত পাপ করেছি, তাই আমরা যদি কষ্ট ভোগ করি, তাহলে তা কেবল আমাদের এই জন্ম ও পূর্ব জন্মের কুকর্মের ফল। তুমি কৃষ্ণকে কীভাবে দোষারোপ করতে পারো?” এটাই হচ্ছে জড়জাগতিক জীবন। জড় বিষয়াসক্ত মানুষেরা কত বিভিন্ন জঘন্য কর্ম করে, কত বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে আর তারা সামান্য সাফল্য পেলে মনে করে, “আমি কত চতুর! আমি কত দক্ষ! আমি নিজের সাফল্য নিজেই তৈরি করেছি। আমি জীবনে ভীষণ সুখী। আমি খুব শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত।” আর দুঃখ পেলে মনে করে—“কৃষ্ণ আমার সাথে কেন এমন করছেন?” কিন্তু একজন ভক্ত যখন কোন দুঃখ পান, তিনি মনে করেন, “আমি যে সবসময় জীবনে এত পাপ করি এটা তার ফল, এবং কৃষ্ণ এতই দয়াময় যে তিনি কেবল আমাকে আমার প্রাপ্যের অতি সামান্য দুর্ভোগ প্রদান করছেন।” আর ভক্ত কোন সফলতা পেলে মনে করেন, “ওঃ! দেখো, কৃষ্ণ কী অসাধারণ ব্যবস্থা করেছেন!” দেখুন, আত্মতত্ত্বজ্ঞ জীবের জন্য যা নিদ্রার সময়, তা জড় অজ্ঞান-অন্ধকারে আবদ্ধ ব্যক্তিদের জাগরণের সময় এবং আত্মতত্ত্বজ্ঞ জীবদের যা জাগরণের সময়, তা জড় বিষয়াসক্ত ব্যক্তিদের নিদ্রার সময়। তারা হচ্ছে ঠিক বিপরীত—পয়সার ২ পিঠ বা দিন-রাত্রির মতো। 

জড়বাদীদের কোন আশ্রয় নেই। তাই, তারা সবসময় দুর্দশাগ্রস্থ থাকে এবং ভক্তদের কোন সমস্যা নেই যেহেতু তাঁরা সবসময় কৃষ্ণের আশ্রয়ে আছেন। সেই জন্য বলা হয়েছে—যিনি শুদ্ধ ভক্ত, তিনি হচ্ছেন দেবতাদের সকল সদ্গুণাবলীর ভাণ্ডার। তাই, শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, “এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্রাহ্মণ তৈরি করা, যেহেতু এই সমাজে কোনো যথার্থ ব্রাহ্মণের অস্তিত্ব নেই।” এমনকি, শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন—যখন আমরা নতুন সদস্যদের আমাদের সঙ্ঘে নিয়ে আসি, তখন তারা হয়ত তৎক্ষণাৎ সব বিধি পালনে সক্ষম নয়। তাই, ভালো হবে যদি তারা বাইরে বসবাস করে আর মন্দিরে এসে ভক্তসঙ্গ করে, বৈরাগ্য শিক্ষা নেয়, আমাদের তত্ত্ব কি সেই সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে। এবং যখন তারা কৃষ্ণভাবনামৃতের সব নিয়ম পালনে প্রস্তুত হবে, তখন তাদের মন্দিরে এসে থাকার অনুমতি পাবে। কারণ আমরা জড় বিষয়াসক্ত মানুষদের আমাদের সংস্থার ভিতর আনতে চাই না, কেননা তারা পুরো পরিবেশ কলুষিত করে দেবে। যদি সমগ্র বিশ্ব আমাদের সংস্থার মতো না হয় তাহলে কোনো ব্যাপার নয়। আমরা আশা করি না যে প্রত্যেকেই এমন ভক্ত হবে। কিন্তু কাউকে এটা দেখতেই হবে যে—প্রকৃত মানদণ্ড কি? পরিপূর্ণতার মান কি? এটাই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এবং যদি কেউ সেই মানদণ্ড বজায় রাখতে অক্ষম হয়, তাহলে তাকে ততক্ষণ সংস্থার ভিতর প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত নয়, যতক্ষণ না তিনি ভক্ত সঙ্গ করার মাধ্যমে সেই মানদণ্ড বজায় রাখার মত যথেষ্ট একনিষ্ঠ হচ্ছেন। এটা তার নিজের ভালোর জন্য। তাই যারা এই সম্প্রদায়ে শিষ্যত্ব বরণ করেছে, তাদের নিজ নিজ গুরুদেবের প্রতি সেই স্তরের পূর্ণ সমর্পণ থাকা উচিত। এবং ভক্তের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুসারে গুরুদেব যা সেবা দিয়েছেন, তাকে সেই সব নির্দেশ পালন করতে হবে। এই জন্য আমরা নিম্নমানের শিষ্য গ্রহণ করি না। আমরা লক্ষ লক্ষ শিষ্য চাই না। 

বাংলায় কিছু গুরু আছে, যারা এক বড়ো প্যান্ডেলে ১০০০, ৫০০০, ১০০০০ মানুষদের একসাথে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। তারা বলে, “যারা যারা দীক্ষা গ্রহণ করতে চান প্রত্যেকে উঠে দাঁড়ান।” তখন প্রত্যেকে উঠে দাঁড়ায়। “এখন হাত তুলুন!” তারা “ওঁ তৎ সৎ” বা এরকম কিছু বলে। এরপর তারা বলে— “তোমরা সবাই আমার শিষ্য।” একবারে ১০,০০০! “এখন তোমরা এসে প্যান্ডেলের পাশে গুরুদক্ষিণা দিতে পারো।” (হাসি) এই অর্থ করমুক্ত নয়, কিন্তু আপনি ২ নম্বরে (এক ধরনের আয়কর দেওয়ার ফর্ম) দিতে পারেন। সেখানে নীতি হচ্ছে শুধু গুরুকে দান করো, আর কোন নিয়ম নেই। “আমাকে আরো শিষ্য করতে দাও!” এটা ধর্মীয় বলে মনে হয়, কিন্তু সেখানে কোন বিধি-নিষেধ নেই। আপনি মাংসাহার করতে পারেন, সব কুকর্ম করতে পারেন। এইভাবে খুব শীঘ্রই আপনি ভগবান হয়ে যাবেন! এটাই তারা প্রতিশ্রুতি দেয় যে—“যেহেতু আমি হচ্ছি ভগবান, তাই তুমি আমার পূজা করো এবং এর ফল কি হবে? তুমিও ভগবান হয়ে যাবে।” এইভাবে তারা প্রতারণা করে। তাই শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, “কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ এইসব বিষয়ে প্রতি আগ্রহী নয়। আমরা পরম সত্যের আন্তরিক অনুসন্ধানকারীদের খুঁজতে চাই এবং তাদেরকে সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ প্রদান করতে চাই।” নয়তো, আমরা যদি আমাদের মান কমিয়ে দেই, তাহলে আমাদের কাছে অনেক মানুষ আসবে। কিন্তু আমাদের মান কমিয়ে দেওয়ার কারণে তারা যদি কৃষ্ণের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে কৃত্রিম কিছু অনুসারী ধরে রেখে কি লাভ আছে? যদি আপনি শিষ্যদের অর্থ দেন, তাহলে অনেক শিষ্য পাবেন। কিন্তু এর কী লাভ আছে? শিষ্য মানে, তিনি গুরুকে দান দেবে। 

আমি কখনো কখনো চিন্তা করি, মায়াপুরে তাদেরকে আমাদের কিছু সামান্য অর্থ দেওয়া উচিত এবং তাহলে আমাদের কাছে কত মানুষ আসবে, কারণ তারা বাড়িতে মায়ের কাছে ৫০ টাকা পাঠাতে চায়। কিন্তু অবশ্য প্রশ্ন হচ্ছে—যদি তারা কোন সেবা না করে, শুধু মন্দিরে আসে ও সব নিয়ম পালন করে এবং সামান্য অর্থ পায়, তাহলে হয়ত এক ধাপ অগ্রগতি হবে। তাদের কিছুটা উন্নতি হবে এবং এটাও উন্নত মানদণ্ড। কিন্তু এটা প্রকৃত মানদণ্ড নয়।প্রকৃত মানদণ্ড কীভাবে বজায় রাখা যাবে? প্রকৃত মানদণ্ড হচ্ছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। আর এটা বেশ কঠিন। এখানে দুটি বিষয় আছে: একটি হচ্ছে কাউকে উন্নতির দিকে নিয়ে আসা। যেমন আপনারা বলতেই পারেন যে—কোন ব্যক্তিকে অনুদান দিতে অনুপ্রাণিত করা হলে, সেটাও তাকে উন্নতির দিকে নিয়ে আসা। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে আমরা চাই সেই ব্যক্তি ভগবদ্ধামে ফিরে যান। তাই ব্যক্তিকে উন্নতির প্রথম পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পূর্ণ কার্যক্রম থাকতে হবে, নয়তো আমরা প্রতারণা করছি। আমরা মানুষদের ভুল পথে চালিত করছি। আমরা যদি কাউকে সর্বোচ্চ লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারি, তাহলেই একমাত্র আমাদের এই বড়ো বড়ো আসনে বসা উচিত, নয়তো আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করা উচিত নয়, কারণ সেটা প্রতারণা। আমাদের কোন ব্যক্তিকে প্রারম্ভিক স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত নিয়ে যেতে সক্ষম হতে হবে। 

শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের এই পন্থাই প্রদান করেছেন যে কীভাবে আমরা ভগবদ্ভক্তির সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হতে পারব। এবং একবার কেউ কিছুটা অগ্রগতি করলে, তার আর পিছিয়ে আসা উচিত নয়। যদি কোন ব্যক্তি এক নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত উন্নতি করে ও তারপর আবার কিছুটা পিছিয়ে আসে, তাহলে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা ঠিক রাখতে হবে। দ্রুত এগিয়ে গেলে চলবে না। আমরা যেটুকু উন্নতি করেছি, প্রথমে তা রক্ষা করতে হবে এবং এইভাবে ধীরে ধীরে ও নিশ্চিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা অবিলম্বে উন্নতিতে আগ্রহী নই। আমরা নিশ্চিত উন্নতিতে আগ্রহী। এমনকি যদি তা ধীর ধীরে হয়, তবুও তা অবধারিত। আমরা নিশ্চিত উন্নতি চাই। ভগবান চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায়, এমনকি আমাদের ধীর নিশ্চিত অগ্রগতি মানেও অতি দ্রুত উন্নতিসাধন। তাঁর কৃপায় আমরা কৃষ্ণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু কৃষ্ণ আমাদের দিকে আরও দ্রুত এগিয়ে আসছেন। অতএব, আমাদের কৃষ্ণের দিকে ধীর অগ্রগতি কৃষ্ণের আমাদের দিকে দীর্ঘ মাইল এগিয়ে আসার মত। তাই, আমরা যখন হেঁটে এগিয়ে আসছি, তিনি তখন দৌড়ে এগিয়ে আসছেন। তবে আমাদেরকে  নিজেদের অগ্রগতির পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। যদি আমরা কৃষ্ণের দিকে অগ্রসর হওয়া থামিয়ে দিই, বা যদি আমরা পরম লক্ষ্যের সাথে সংযোগচ্যুত হয়ে পুনরায় জড়জাগতিক কায়-মন ও ধারণার দ্বারা বিষয় ভোগকেই সব কিছু বলে মনে করি, তাহলে আমরা শেষ! কারণ তাহলে তখন কৃষ্ণ অপেক্ষা করবেন, “ঠিক আছে, সে আগে সেই কাজ সম্পন্ন করুক, তারপর আমি আসব।” এইজন্য ভক্ত হচ্ছেন অধিক কৃপালু। কারণ গুরুদেব শিষ্যকে কান ধরে টেনে নিয়ে আসেন যে— “তুমি এখানে কীজন্য অপেক্ষা করছো? তুমি কৃষ্ণের কাছে ফিরে যাও!” ভক্ত কৃষ্ণের কাছে না গেলে তিনি আসেন না। কিন্তু গুরুদেব এতই কৃপালু যে ভক্ত দিশেহারা হয়ে, মায়ার দ্বারা ভ্রমিত অবস্থায় থাকলে, গুরুদেব ভক্তকে সামনের দিকে ঠেলে দেন—“তুমি কৃষ্ণের কাছে ফিরে যাও, এখানে সময় নষ্ট করো না!” এই জন্যই ভক্তকে কৃষ্ণের চেয়েও অধিক কৃপালু বলে গণ্য করা হয়।

জয়!

(অস্পষ্ট প্রশ্ন)

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ...অর্জুন কৃষ্ণকে এই একই প্রশ্ন করেছিলেন যে, “আমি যদি প্রতিমুহূর্তে তোমার কথা স্মরণ করতে না পারি, তাহলে কি করব?” তিনি বলেছিলেন, “অভ্যাস—তাহলে তোমাকে স্মরণের অভ্যাস করতে হবে।” একটা কুকুর কীভাবে শেখে? যখন কুকুর বাড়ির ভিতর বিষ্ঠা ত্যাগ করে, তখন আপনি তাকে সেটার গন্ধ শোঁকান ও বলুন, “তুই এটা কি করেছিস?” এইভাবে বকা খাওয়ার পর, সে সেটার গন্ধ শোঁকে, বার বার শোঁকে; ও অবশেষে সে বোঝে—এটা আমার বিষ্ঠা ত্যাগের সময়, তাই আমি বাইরে যাই নয়ত মার খাব। তাই, আপনি কেন এটা ভাবছেন না যে আমরাও এমন কিছু করছি যার জন্য আমরা আঘাত পাচ্ছি? “আমি আঘাত পাচ্ছি কারণ আমি মায়ায় আছি। এর কারণ হচ্ছে আমার জড় কামনা-বাসনা।” তাই ভক্ত আঘাতকে কৃষ্ণের কৃপা হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি হচ্ছে আমাদের বিরক্তিভাব উদয়ের ও জড় জগতের প্রতি বিতৃষ্ণ হওয়ার অনুপ্রেরণা। এবং এরপর আমরা অভ্যাস করি। আমরা নিজের মনকে প্রশিক্ষিত করার চেষ্টা করি। মন হচ্ছে ঠিক একটি কুকুর বা একটি জঙ্গলী প্রাণীর মতো। সে এখানে ওখানে দৌড়ে বেড়ায়, কিন্তু বুদ্ধি এটি লক্ষ্য রাখে যে—“আমার মন কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে?” সে তাকে ধরে নিয়ে এসে আবার কৃষ্ণের দিকে ফিরিয়ে আনে।

ঠিক যেমন মা শিশুর যত্ন গ্রহণ করেন, তেমনই আমাদের বুদ্ধি মনের খেয়াল রাখে যে তা কোথায় যাচ্ছে। মা যখন দেখে যে, খেলতে খেলতে শিশু একটি ছুরি নিয়ে তার মুখের মধ্যে ঢোকাতে যাচ্ছে, (তখন তিনি তার থেকে ছুরি সরিয়ে নেন) তেমনই আমাদের মন হচ্ছে শিশুর মত, সে অনিয়ন্ত্রিতভাবে এদিকে-ওদিকে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। তাই মনকে নিজেদের বুদ্ধি দ্বারা প্রশিক্ষিত করতে হবে। আর সেই বুদ্ধি গুরু-কৃষ্ণের কৃপায় প্রাপ্ত হওয়া যায়। সেই বুদ্ধি আমাদেরকে প্রদান করা হয়। এই কারণে আমরা প্রতিদিন ১৬ মালা জপ করি, ৪ নিয়ম পালন করি, যাতে আমরা আধ্যাত্মিক বুদ্ধি লাভ করতে পারি। আর এর ফলে, আমরা যখন দেখব যে আমাদের মন অন্য কোন দিকে যাচ্ছে বা ইন্দ্রিয়গুলি অনিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তখন আমরা বুদ্ধি দ্বারা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব।

যদি আমরা নাম জপ, হরি কথা শ্রবণ ও ভক্তসঙ্গ গ্রহণের এই সাধনা সুদৃঢ়ভাবে অনুশীলন না করি, তাহলে আমরা সেই বুদ্ধি লাভ করতে পারব না যে, কি করে  মনকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? এবং তখনই আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি ও মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। এই জন্যই এটি হচ্ছে এক পূর্ণ প্রক্রিয়া। আমাদের অভ্যাস করতে হবে। আমাদের নাম জপ ও এই সবকিছু অনুশীলন করতে হবে। তারপর যখন আমরা লক্ষ্য করব যে আমাদের মন ধাবিত হচ্ছে; তখনই আমাদের প্রকৃত তপস্যার দ্বারা মনকে পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। 

দেখুন, মা যদি নিজেই মদ্যপ অবস্থায় থাকে, তাহলে তার তার কিছু যায় আসে না। সন্তান মরতেও পারে বা বাঁচতেও পারে। তেমনই আমাদের বুদ্ধি যদি জাগতিক চাকচিক্যের দ্বারা মোহগ্রস্ত হয় ও প্রকৃত দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে যে আমাদের জীবনের লক্ষ্য শুদ্ধ ভক্ত হওয়া, তাহলে মন অন্য কোনোদিকে ধাবিত হলে বুদ্ধির এটি বোঝার শক্তি থাকে না যে মন বিচলিত হওয়া কত বড়ো ব্যাপার, সে ভাবে—“আহ, মন নিজের খেয়াল খুশি মতো চলুক, তাতে ক্ষতি কি?” তখন আমরা মায়ার চাকচিক্যে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। ও সেইসময় কৃষ্ণ আমাদের কাছে অনেক প্রতিনিধি, অনেক নির্দেশ প্রেরণ করেন। তিনি বিভিন্নভাবে আমাদের চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন, তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে প্রকৃত চেতনায় আনার চেষ্টা করেন। 

তাই আমাদের তরফ থেকে আমরা কি করতে পারি? আমাদের ভগবদ্ভক্তি অনুশীলন করতে হবে।  গুরুদেবের নির্দেশ পালন করতে হবে। একদিকে লতায় জল দিতে হবে এবং অন্যদিকে আগাছা নির্মূল করতে হবে। আগাছা উপরে ফেলতে হবে! আমাদের ৫০% সময় জল দিতে হবে এবং বাকি ৫০% সময় আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। এটাই হচ্ছে শ্রীল প্রভুপাদ প্রদত্ত বিধি। অতএব, এটা মনে হয় যে শিশুর বড়ো হতে অনেক দিন সময় লাগবে, কিন্তু কিছুদিন পর অজান্তেই সে বড়ো হয়ে যায়, তেমনই মনে হতে পারে যে মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে, কিন্তু আমরা এই কাজে সুদৃঢ় থাকি। মা কখনও এমন বলে না যে, “এই কাজ খুবই কষ্টকর। থাক ভুলে যাই, ওকে মেরে ফেলি!” তাহলে সে মা নয়। সে এক রাক্ষস! আমরা স্নানের জলের সাথে বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে দেই না। তেমনই, আমরা এই দায়িত্বও পরিত্যাগ করতে পারি না যে— “ওহ! মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো খুবই কঠিন।” এর মানে আমরা জপ করছি না, নিয়ম পালন করছি না। আর তাই কোন না কোনোভাবে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছি, নিরাশ হয়ে পড়ছি।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 4/10/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions