Text Size

১৯৮০০৩১৬ মায়াপুরে শ্রীল প্রভুপাদের ভগিনী—পিসিমাকে অনুস্মরণ

16 Mar 1980|Bengali|Homages to Vaiṣṇavas|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

এটি হচ্ছে জয়যুক্ত মুহূর্ত, কিন্তু তবুও একইসময় এটি হচ্ছে এক বৈষ্ণব বিরহের সময়। অবশ্য, আমাদের আরো কিছু বলার আছে। আপনারা আরো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়গুলি লক্ষ্য করতে পারেন যে, কিভাবে পিসিমা তার বাল্যাবস্থায় সর্বদা শ্রীল প্রভুপাদকে সাহায্য করতেন। এটি সৎস্বরূপ দাস গোস্বামীর সংকলিত জীবনচরিত থেকে গৃহীত। আমার মনে পড়ে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, যখন তারা ছোট ছিলেন, তখন তিনি(পিসিমা) তার পিছন পিছন চলতেন। 

যখন শ্রীল প্রভুপাদ আমাকে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে কানাডার টরন্টো থেকে ভারতে পাঠিয়েছিলেন, তখন পথে শ্রীল ভগবান গোস্বামীর সাথে শিকাগো, লস এঞ্জলস ও লন্ডনে সংক্ষিপ্ত বিরতি হয়েছিল, এবং এরপর যখন আমি কলকাতায় পৌঁছাই, তখন আমার সঙ্গ করার মতো কেবল অচ্যুতানন্দ স্বামী ছিলেন। যদিও আরো অনেক ব্যক্তিবর্গ ছিলেন, কিন্তু তাদের সঙ্গ প্রকৃত সঙ্গ ছিল না। আমার মনে পড়ে প্রথম তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি আমাকে বলেছিলেন যে—“তোমার শ্রীল প্রভুপাদের বোনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা উচিত। তিনি আমাদেরকে প্রসাদের জন্য নিমন্ত্রণ করেছেন।” এবং আমরা তার গৃহে গিয়েছিলাম, সেখানে তিনি আমাদেরকে শ্রীল প্রভুপাদের ছোট শ্রীবিগ্রহ, যা প্রভুপাদ পূজা করতেন, তা দর্শন করিয়েছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ছোটবেলার সেবীত শ্রীবিগ্রহ তাঁর ছোট বোনকে অর্চন করতে দিয়েছিলেন, এখন আমরা তাঁর পূজা করি না।… 

আমরা পিসিমা সম্পর্কে এইজন্য বলছি না যে মুখ্যত তিনি জাগতিক সম্পর্কে শ্রীল প্রভুপাদের বোন, পিসিমা, তবে আসলে তিনি হচ্ছেন তাঁর গুরুভগিনী, তিনিও শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের থেকেই হরিনাম দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন, আমি সেই প্রসঙ্গে পরে বলব। আসলে প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন গুরুভগিনী। আমরা তার গৃহে গিয়েছিলাম এবং শ্রীবিগ্রহ দর্শন করেছিলাম। তিনি পুষ্প দ্বারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে সুসজ্জিত করে অর্চন-সেবা করেছিলেন, তিনি শ্রীবিগ্রহকে প্রসাদ নিবেদন করেছিলেন এবং এরপর তিনি আমাদেরকে প্রসাদ গ্রহণের জন্য বসিয়েছিলেন। তিনি আমাদের অনেককিছু সুক্ত, শাক, সবজি সহ বহু পদ গ্রহণ করানোর ক্ষেত্রে তার সর্বোচ্চ প্রয়াস করেছিলেন, যা ছিল আমাদের ধারণ ক্ষমতার উর্ধ্বে। তিনি জানতেন যে কিভাবে সর্ষের তেলে সিদ্ধ আলুর ভর্তা করতে হয়, শুদ্ধ ঘিতে ভাজি করতে হয়। কারো ক্ষেত্রে এমনকি নিজের মায়ের থেকেও এমন যত্ন পাওয়া কঠিন, কিন্তু তিনি শ্রীশ্রী রাধা-গোবিন্দের প্রসাদ সহ অত্যন্ত সুন্দরভাবে আমাদের সেবা-যত্ন করেছিলেন। পরে আমরা এটি লক্ষ্য করলাম যে তিনি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত সন্ন্যাসীদের প্রসাদ ভোজন করানোর বিষয়ে সুপ্রসিদ্ধা ছিলেন। এমনকি শ্রীধর স্বামী ও অন্যান্য শ্রীল প্রভুপাদের গুরুভ্রাতাবর্গও বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে এটি বলেছিলেন যে তারা পিসিমার রন্ধিত প্রসাদ গ্রহণ করেছেন। 

তিনি ‘মদনের মা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কারণ তার ছোট ছেলে মদন মৃত্যুপ্রায় অবস্থায় ছিলেন এবং সেইসময় তিনি অবিরতভাবে নাম জপ করছিলেন ও কেবল ভগবানের উপর নির্ভরশীল ছিলেন, এইভাবে তার পুত্র বেঁচে যান। তিনি ‘মদনের মা’ হিসেবে সুবিখ্যাত ছিলেন। আমি সেই কাহিনী পূর্ণ বিস্তারিতভাবে জানিনা, তবে তিনি মায়াপুরে গৌড়ীয় সম্প্রদায়ে সুপরিচিত ছিলেন। যদিও তার জীবনে একটি দুঃখ ছিল যে বিবাহিত হলেও, তিনি তার কোন সন্তানকে পূর্ণরূপে শুদ্ধভক্ত, নিবেদিত-প্রাণ ভক্ত করতে পারেননি। যদিও তার বেশ কয়েকজন পুত্র আজীবন সদস্য হয়েছিলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই পূর্ণরূপে বৈষ্ণব তত্ত্ব গ্রহণ করেননি, এটি ছিল তার দুশ্চিন্তার উৎস। 

তিনি সবসময় পবিত্র ধামে বাস করতে চাইতেন, যেখানে শ্রীল প্রভুপাদ প্রাথমিক অবস্থায় তা চাইতেন না,… তিনি তাকে সেবা করতে চান বলে এত জোর করেছিলেন যে শ্রীল প্রভুপাদ তাকে সবসময় বলতেন, “না তুমি তোমার ছেলেদের সাথে থাকতে পারো।” তবে অবশেষে তার জোরাজুরির কারণে তিনি সহমত হন এবং মায়াপুরে থাকার জন্য তাকে অনুমতি দেওয়া হয়, এখানে তিনি সবসময় হরিনাম করতেন। তিনি সবসময় বারান্দায় বসতে ও মন্দিরের কীর্তন শুনতে পছন্দ করতেন। আমার মনে পড়ে যে আগেই তিনি ভক্তি সারঙ্গ গোস্বামীর থেকে তার দ্বিতীয় দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং যখন তিনি কলকাতায় ছিলেন, তখন তিনি ভক্তিসারঙ্গ গোস্বামী, যিনি হচ্ছেন প্রভুপাদের একজন গুরুভ্রাতা, তার অনুষ্ঠানাদি পালন করতে আসতেন। তিনি ভক্তিসিদ্ধান্তের থেকে কেবল প্রথম দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। এই বিষয়টি আমাকে এক ভালো অন্তর্দৃষ্টিমূলক উপলব্ধি প্রদান করে যে কিভাবে তার শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের প্রতি গভীর বিশ্বাস ছিল ও একই সাথে তার মন্ত্র গুরুর প্রতিও গভীর বিশ্বাস ছিল, যাকে তিনি ভক্তিসিদ্ধান্তের প্রতিনিধি রূপে দেখতেন। তিনি সবসময় এই সমস্ত অনুষ্ঠানাদিতে অতি বিশ্বাস ও ভক্তিসহ অংশগ্রহণ করতেন। এটা এক খুবই ভালো লক্ষণ। যদিও এতে কোন সংশয় নেই যে, কেউ যখন পুরোপুরি সংকীর্তন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন, তিনিই সর্বাপেক্ষা মহিমান্বিত। যদিও তার ভাবধারা অত্যন্ত সরল ছিল যে—কেবল বৈষ্ণবগণের সেবা করা এবং বৈষ্ণবগণের সঙ্গ করা, কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে তার বৈষ্ণবদের প্রতি এই বিশেষ আস্থা এবং বৈষ্ণব পরিবারে জন্মগ্রহণ করে শ্রীল প্রভুপাদের সঙ্গ গ্রহণ করার কারণে তিনি সবসময় এই সঙ্গ লাভের প্রতি খুবই আসক্ত ছিলেন এবং এটি তাকে ভক্ত সঙ্গে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র নাম কীর্তন করে জীবনের শেষ বছরগুলি এবং শেষ মুহূর্তটি এই পবিত্র ধামে অতিবাহিত করার মতো সর্বমহান সুযোগ প্রদান করেছিল। কোন ব্যক্তি এই শরীর ত্যাগ করার ক্ষেত্রে আর কি বা কামনা করতে পারে? আসলে শেষ দুটি বছর অবশ্য শ্রীল বিষ্ণুপাদ অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তার যত্ন গ্রহণ করেছিলেন। 

আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে প্রত্যেক সময় যখন প্রভুপাদ ঘরের ভিতরে যেতেন, পিসিমা তাকে সবসময় অনুরোধ করতেন—“তুমি আমাকে আশীর্বাদ করো যাতে আমি শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হতে পারি।” তিনি শ্রীল ভবানন্দ গোস্বামীর কৃপাও লাভ করার প্রতি সবসময় উদগ্রীব থাকতেন, যাতে তিনি হরেকৃষ্ণ নাম জপের প্রতি আরো অধিক রুচি লাভ করতে পারেন। তিনি অত্যন্ত সরল হওয়ায় তিনি তাদের থেকেও আশীর্বাদ গ্রহণ করতেন, যারা গভীর শ্রদ্ধাসহ শ্রীল প্রভুপাদের কৃপাগ্রাহক ছিলেন এবং তিনি সবসময় বিষ্ণুপাদের কৃপা লাভ করতে চাইতেন, যা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী! বিশেষত তিনি সকল ভক্তদের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আগত দেখতে চাইতেন এবং মনে হত সেটাই ছিল তার এক সর্বোচ্চ ইচ্ছা। 

যদিও যখন তার জীবন থেকে শ্রীল প্রভুপাদের সঙ্গ লাভের সুযোগ চলে গেল, তখন থেকেই আমরা তার এই জগতে থাকার ইচ্ছার প্রতি বিরূপভাব দেখেছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন তার জীবন সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গেছে এবং অনেকভাবেই তিনি এই ভাবটি প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি সেই আধ্যাত্মিক সঙ্গ বিনা অত্যন্ত নি:সঙ্গ অনুভব করছেন। অবশ্য তার ক্ষেত্রে সঙ্গ লাভ ছিল মূলত শ্রবণ, এবং এমনকি যখন তিনি টেপ রেকর্ডার শুনতেন, তখন অবশেষে তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত হয়ে  উঠতেন।

আমরা দেখি যে এই বৈষ্ণব তত্ত্বদর্শন অত্যন্ত মহৎ এবং এই সংস্কৃতি অত্যন্ত গভীর যে—প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এটা লক্ষণীয় বিষয় নয় যে ব্যক্তি মহান পণ্ডিত নাকি নয়, পুরুষ নাকি স্ত্রীয়ের শরীরে আছে, বা তিনি নির্দিষ্ট কোন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে কিনা, যাই হোক না কেন, কেউ যদি কোন না কোনভাবে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের প্রতি আসক্ত হন, তাহলে বৈষ্ণবগণের সেবা করার মাধ্যমে, সেই সঙ্গ প্রাপ্তির মাধ্যমে তিনি সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারবে। তাহলে কেউ যদি মহৎ সঙ্গ সহ মহিমান্বিত কোন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, তাহলে তার ক্ষেত্রে আর কি বলার আছে? আমরা দেখি যে যদিও তিনি এক সরল জীবনযাপন করছিলেন, সরলভাবে তিনি কেবল সবসময় বৈষ্ণব সঙ্গে ছিলেন, কিন্তু তবুও এর দ্বারাই কেউ সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত থাকেন। এর ফলে ব্যক্তি পুরোপুরি সুরক্ষিত অবস্থায় থাকেন। তাই, কোন না কোনভাবে আমাদেরকে এই বৈষ্ণব সঙ্গের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হতে হবে। আমাদেরকে বৈষ্ণব সেবার প্রতি অত্যন্ত সুস্থির হতে হবে, পবিত্র নাম জপের প্রতি রুচি লাভ করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে খুবই আগ্রহী হতে হবে। তাহলে তখনই আসলে আমরা প্রতিমুহূর্তে সুরক্ষিত থাকবো এবং তখন চরমে আমাদের মনকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি স্থির করা খুবই সহজ হবে। 

এইভাবে আমরা দেখি যে শ্রীল প্রভুপাদের গুরুভগিনী, আমাদের পিসিমা, পিসিমা মানে পিসি, তিনি আমাদেরকে এই ধরনের আধ্যাত্মিক ইচ্ছার বিষয়ে সম্যগদর্শন প্রদান করেছেন এবং সেইজন্য তার দিব্য গুণাবলী সম্বন্ধে কিছুমুহূর্ত বলতে পেরে আমরা খুবই ধন্য হয়েছি এবং এই মহিমান্বিত মুহূর্তে তিনি যে এখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পবিত্র ধাম থেকে গোলক বৃন্দাবনে ফিরে যাচ্ছেন, এই জেনে আমরা তার আধ্যাত্মিক সঙ্গ না পাওয়ার বিরহ অনুভব করছি।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 25/08/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions