Text Size

১৯৭৯০৯১৯ শ্রীমদ্ভাগবতম ৪.৯.৬

19 Sep 1979|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|Los Angeles, USA

ধ্রুব মহারাজের প্রার্থনা

নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ, লস এঞ্জেলস, ক্যালিফোর্নিয়ায় দিয়েছেন। প্রবচনটি শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৪র্থ স্কন্ধ, ৯ম অধ্যায়, ৬ষ্ঠ শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

শ্লোক ৬

ধ্রুব উবাচ
যোহন্তঃ প্রবিশ্য মম বাচমিমাং প্রসুপ্তাং
সঞ্জীবয়ত্যখিলশক্তিধরঃ স্বধাম্না।
অন্যাংশ্চ হস্তচরণশ্রবণত্বগাদীন্
প্রাণান্নমো ভগবতে পুরুষায় তুভ্যম্॥

অনুবাদ: ধ্রুব মহারাজ বললেন—হে ভগবান! আপনি সর্বশক্তিমান। আমার অন্তরে প্রবেশ করে আপনি আমার হস্ত, পদ, কর্ণ, ত্বক, আদি সুপ্ত ইন্দ্রিয়গুলিকে জাগরিত করেছেন, বিশেষ করে আমার বাক্ শক্তিকে। আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।

তাৎপর্য: ধ্রুব মহারাজ প্রত্যক্ষভাবে পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করে, দিব্য জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পূর্বের এবং পরের অবস্থাটির পার্থক্য অতি সহজে নিরূপণ করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর জীবনীশক্তি এবং কার্যকলাপ সুপ্ত অবস্থায় ছিল। চিন্ময় স্তরে না আসা পর্যন্ত, দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মন এবং দেহের অন্যান্য ক্রিয়া সুপ্ত অবস্থায় থাকে। চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত, সমস্ত কার্যকলাপ মৃত ব্যক্তির কার্যকলাপ অথবা প্রেতাত্মার কার্যকলাপের মতো। এই সম্পর্কে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর নিজেকে সম্বোধন করে গেয়েছেন—“জীব জাগ! জীব জাগ! কত নিদ্রা যাও মায়া-পিশাচীর কোলে? ভজিব বলিয়া এসে সংসার-ভিতরে, ভুলিয়া রহিলে তুমি অবিদ্যার ভরে।” বেদেও ঘোষিত হয়েছে উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত—“ওঠ! জাগ। এখন তুমি মনুষ্য জীবন লাভের এক অপূর্ব সুযোগ প্রাপ্ত হয়েছ—এখন তুমি নিজেকে জান।” এইগুলি হচ্ছে বেদের নির্দেশ।

ধ্রুব মহারাজ বাস্তবিকভাবে অনুভব করেছিলেন যে, তাঁর ইন্দ্রিয়গুলি চিন্ময় স্তরে জাগরিত হওয়ার ফলে, তিনি বৈদিক নির্দেশের সারমর্ম হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে, পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন পরম পুরুষ; তিনি নির্বিশেষ বা নিরাকার নন। সেই সত্য ধ্রুব মহারাজ তৎক্ষণাৎ হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, দীর্ঘকাল ধরে তিনি প্রায় নিদ্রিত ছিলেন, এবং বৈদিক সিদ্ধান্ত অনুসারে, ভগবানের মহিমা কীর্তন করার প্রবণতা তখন তিনি অনুভব করেছিলেন। বিষয়াসক্ত ব্যক্তিরা কখনও ভগবানের প্রতি প্রার্থনা নিবেদন করতে পারে না অথবা ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে পারে না। কেননা তারা বৈদিক সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করতে পারেনি। 

তাই ধ্রুব মহারাজ যখন তাঁর নিজের মধ্যে এই পার্থক্য দেখতে পেয়েছিলেন, তৎক্ষণাৎ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, পরমেশ্বর ভগবানের অহৈতুকী কৃপার প্রভাবেই কেবল তা সম্ভব হয়েছে। পূর্ণরূপে তাঁর প্রতি ভগবানের কৃপা হৃদয়ঙ্গম করে, গভীর শ্রদ্ধা সহকারে তিনি ভগবানের প্রতি প্রণতি নিবেদন করেছিলেন। ধ্রুব মহারাজের মন এবং ইন্দ্রিয়ের এই চিন্ময় জাগরণ ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তির প্রভাবে সাধিত হয়েছিল। তাই এই শ্লোকে স্ব-ধাম্না শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘চিন্ময় শক্তির দ্বারা’। পরমেশ্বর ভগবানের চিন্ময় শক্তির প্রভাবেই কেবল দিব্য জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। হরেকৃষ্ণ মন্ত্রে সর্ব প্রথমে ভগবানের পরা শক্তি হরাকে সম্বোধন করা হয়েছে। জীব যখন ভগবানের নিত্য দাসরূপে নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করে পূর্ণরূপে ভগবানের শরণাগত হয়, তখন এই চিন্ময় শক্তি সক্রিয় হয়। কেউ যখন পরমেশ্বর ভগবানের নির্দেশ পালন করেন অথবা ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, তাঁকে বলা হয় সেবোন্মুখ; সেই সময় চিন্ময় শক্তি ধীরে ধীরে তাঁর কাছে ভগবানকে প্রকাশ করে। 

চিন্ময় শক্তির প্রকাশ ব্যতীত, ভগবানের মহিমা কীর্তন করে প্রার্থনা করা যায় না। বিষয়াসক্ত ব্যক্তিদের সমস্ত দার্শনিক জল্পনা-কল্পনা অথবা কাব্য রচনা জড়া শক্তিরই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। কেউ যখন বাস্তবিকরূপে চিন্ময় শক্তির দ্বারা অনুপ্রাণিত হন, তখন তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলি পবিত্র হয়, এবং তিনি কেবল ভগবানের সেবায় যুক্ত হন। তখন তাঁর হাত, পা, কর্ণ, জিহ্বা, মন, উপস্থ—সব কিছুই-ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়। এই প্রকার দিব্য চেতনা-সমন্বিত ভক্ত আর জড় কার্যকলাপে লিপ্ত হন না অথবা জড় বিষয়ে লিপ্ত হওয়ার কোন আকাঙ্ক্ষাও তাঁর থাকে না। ইন্দ্রিয়সমূহ পবিত্র করার এবং ভগবানের সেবায় তাদের যুক্ত করার এই পন্থাকে বলা হয় ভক্তি। প্রাথমিক স্তরে গুরুদেব এবং শাস্ত্রের নির্দেশে ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবানের সেবায় যুক্ত করা হয়, এবং তারপর আত্ম-উপলব্ধির পর, ইন্দ্রিয়গুলি যখন পবিত্র হয়, তখনও সেই সেবা চলতে থাকে। পার্থক্য হচ্ছে এই যে, প্রথমে যান্ত্রিকভাবে ইন্দ্রিয়গুলিকে যুক্ত করা হয়, কিন্তু আত্ম-উপলব্ধির পর, দিব্য জ্ঞানের প্রভাবে তা স্বতস্ফূর্তভাবে ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়। 

ইতি শ্রীমদ্ভাগবতের ৪র্থ স্কন্ধ ৯ম অধ্যায় ৬ষ্ঠ শ্লোকের ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য। 

 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: আসলে আমি যখন এখানে ধ্রুব মহারাজের শক্ত্যাবিষ্ট হওয়ার ব্যাপারে পড়ছিলাম, তখন আমার আমাদের মধ্যেকার মহান ভক্তদের কথা মনে পড়ছিল। ধ্রুব মহরাজ কৃষ্ণের দ্বারা শক্ত্যাবিষ্ট ছিলেন এবং তার বুদ্ধি, তার সক্ষমতা সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়েছিল। অতএব, ভগবানের দ্বারা শক্ত্যাবিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কেউই কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করতে পারবে না, কেউই আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আলোকিত হতে পারবেনা। 

কলিকালের ধর্ম—কৃষ্ণ নাম সংকীর্তন।
কৃষ্ণ-শক্তি বিনা নহে তার প্রবর্তন ।।
 

এই কলি যুগে একমাত্র ধর্ম, আধ্যাত্মিক জীবনের একমাত্র পথ হচ্ছে নাম সংকীর্তন, কৃষ্ণ সংকীর্তন, কৃষ্ণের পবিত্র নাম ও মহিমা বর্ণনা করা। যতক্ষণ না কেউ কৃষ্ণের কৃপা প্রাপ্ত হচ্ছেন, ততক্ষণ তিনি প্রচারের জন্য, সংকীর্তন আন্দোলনের জন্য শক্ত্যাবিষ্ট নন।

আমি মনে করছিলাম কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ, তার অন্তিমের কিছু দিন ও মাসে, একদিন আমাদেরকে ডেকেছিলেন। তিনি আমাদেরকে বলেছিলেন যে কিভাবে তিনি যে কার্য শুরু করেছেন তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে প্রস্তুত হতে হবে। তিনি বলেছিলেন, “আমার কেবল অর্ধেক কার্য সম্পন্ন হয়েছে, অন্য অর্ধেকাংশ এখনও বাকি আছে যা তোমাদেরকে অবশ্যই সমাপ্ত করতে হবে।” তিনি বলেছিলেন, “তোমরা আসলে সবাই সরল, তোমরা সবাই সরল, সরল ভক্ত, তোমাদের একসাথে সম্মিলিতভাবে এই কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলন প্রসারের কার্য সম্পন্ন করা উচিত।” তিনি আরো বলেছিলেন, “তোমাদের মধ্যে কেবল একজন ব্যক্তির একটু বুদ্ধি আছে, তিনি হচ্ছে রামেশ্বর স্বামী।”

ভক্তবৃন্দ: জয়!

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীল রামেশ্বর স্বামীর প্রতি অত্যন্ত প্রেমময় ছিলেন তার কার্যকলাপ, তার বুদ্ধিমত্তা এবং সংকীর্তন আন্দোলনের প্রসারের ক্ষেত্রে তার বুদ্ধির ব্যবহারের জন্য। আমরা এখানে ধ্রুব মহারাজ সম্বন্ধে পড়ছি, তখন আমার নিজের পূজনীয় গুরুভ্রাতা শ্রীল রামেশ্বর স্বামীর কথা মনে পড়ল, যিনি সবসময় কাল ও স্থান অনুসারে তার বুদ্ধিকে ভগবানের মহিমা কীর্তনে ব্যবহার করেছেন। 

আসলে এখানে আমরা এই শব্দটি দেখি —‘স্বধাম্না’— তা হচ্ছে ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি। আসলে ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি নিজেকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেন এবং ভগবানের এই শক্তি ভগবানের সাথে দিব্যভাবে সম্পর্কিত। যারা শুদ্ধ ভক্ত, তারা এই দিব্যশক্তির অধীনে থাকেন। আসলে কেউ যদি শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করতে চান, তাহলে তাকে সর্বপ্রথম আধ্যাত্মিক গুরু বা শ্রীকৃষ্ণের পার্ষদ-এর মাধ্যমে ভগবানের শক্তির কৃপা লাভ করতে হবে, অবশ্য আধ্যাত্মিক গুরুও হচ্ছেন এমনই একজন। আধ্যাত্মিক গুরুর পরে হয়ত অন্যান্য পার্ষদবর্গও কৃপা প্রদান করতে আসতে পারেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, জগন্নাথকে দর্শন করার পূর্বে প্রথমে তুমি সুভদ্রাকে দর্শন কর, সুভদ্রা হচ্ছেন ভগবানের শক্তি, তিনি হচ্ছেন সর্ব করুণাময়ী। তারপর সুভদ্রার পর বলরাম ও এরপর অবশেষে তুমি জগন্নাথকে দর্শন করতে পার। ভগবানের কৃপা—অত্যন্ত করুণাময়। ধ্রুব মহারাজ নারায়নকে দর্শন করার পূর্বে প্রথমে নারদ মুনিকে দর্শন করেছিলেন এবং তার কৃপায় অবশেষে তিনি নারায়ণকে দর্শন করতে পেরেছিলেন। নারায়ণের কৃপায় তিনি নারায়ণের মহিমা বর্ণনার জন্য শক্ত্যাবিষ্ট হয়েছিলেন। নারায়ণের মহিমা কীর্তন করা কোন জাগতিক ক্ষমতার দ্বারা সম্ভব নয়, কোন জড়জাগতিক ব্যক্তির পক্ষে যথার্থভাবে ভগবানের মহিমা গান করা সম্ভব নয়, তা কেবল নারায়ণের কৃপার দ্বারা, শ্রীকৃষ্ণের কৃপার দ্বারায় এবং তার শুদ্ধ ভক্তের কৃপার দ্বারাই সম্ভব। একটি বিষয় হচ্ছে, আমরা দেখছি কিভাবে ‘ধাম্না’ মানে আধ্যাত্মিক শক্তি, ‘ধাম’ এর অর্থও আধ্যাত্মিক, পারমার্থিক শক্তি। 

আমার মনে পড়ে যে কত সুন্দরভাবে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন যে, “যদি তুমি কৃষ্ণকে জানতে চাও, যদি তুমি কৃষ্ণকে ভালবাসতে চাও, তাহলে তোমাকে অবশ্যই সেই সকল  জনকে জানতে ও ভালোবাসতে হবে যাঁদেরকে কৃষ্ণ ভালোবাসেন, নয়ত তা সম্ভব নয়।”

“আমার প্রিয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু তুমি যদি কেবল এইসব গাভী থেকে দূরে থাক, তাহলে আমি তোমাকে ফিফথ এভিনিউতে নিয়ে আসতে পারি।” দেখুন এইসব হচ্ছে জল্পনা। যদি আপনি কৃষ্ণকে চান, তাহলে আপনাকে তাঁর গাভী, তাঁর গোপবালক, তাঁর গোপীগণ, তাঁর মাতা, তাঁর পিতা, তাঁর গোপকাকা, তাঁর অন্যান্য গোপি মাতা, তাঁর পিতামহি পূর্ণমাসি প্রত্যেককেই গ্রহণ করতে হবে। কৃষ্ণ হচ্ছেন একজন ব্যাক্তি এবং তাঁর নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ আছে, তিনি কাউকে কষ্টে দেখতে পছন্দ করেন না, বিশেষত তিনি তাঁর ভক্তদের কঠিনতায় দেখতে পছন্দ করেন না। এটা তাঁর অপছন্দ, তিনি এটা পছন্দ করেন না। সেই জন্য তিনি নিন্মে অবতরণ করেণ সেইসব ভক্তদেরকে কৃপা করার জন্য, যারা তাঁর শ্রীপাদপদ্মের বিরহ অনুভব করেন। এবং তিনি আসুরিক প্রভাব বিনষ্ট করার ব্যবস্থাপনা করে পূণ্যবান ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ ভক্তদের উদ্বেগ প্রশমিত করেন। ভগবানের তাঁর নিজের পছন্দের বিষয় আছে, তিনি তাঁর নির্দিষ্ট বস্ত্র পছন্দ করেন, তাঁর বাঁশি পছন্দ করেন। তিনি তাঁর বাঁশি ভালোবাসেন, যেটি হচ্ছে তাঁর থেকে অভিন্ন। আধ্যাত্মিক জগতে এই সবকিছুই হচ্ছে অভিন্ন, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস তাঁর ব্যবহৃত বস্তু, তাঁর পার্ষদবর্গ, তাঁর নিত্য দাস-দাসী-এর পদ গ্রহণ করে। তাঁর পবিত্র নাম আছে, তাঁর পবিত্র স্বরূপ আছে আর এছাড়াও সেই স্থান তিনি পছন্দ করেন, সেই নির্দিষ্ট স্থানটি তিনি পছন্দ করেন। আমি এখনো বুঝতে পারি না, যদিও প্রত্যেকেই এটা বলতে পছন্দ করেন যে জয়পতাকা স্বামী পবিত্র ধামে বসবাস করেন, তবে সেটা কেবল আমার দেহ। পবিত্র ধামের মহিমা এমন কিছু নয় যে কেবল সেখানে বাস করার মাধ্যমেই  কেউ এমনকি খুব সহজে তা অনুধাবন করতে পারবে। ভগবানের পবিত্র নাম, বৈশিষ্ট্য, ধাম, লীলা ও রূপের যে কি মহিমা তা কেবল শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর শুদ্ধ ভক্তবৃন্দের বিশেষ কৃপার দ্বারাই বোঝা যেতে পারে যে কিভাবে ভগবানের সেই নির্দিষ্ট স্থানের প্রতি কত গভীর প্রেম আছে ও কিভাবে সেই স্থান জড়জগতের কোন অংশ নয়, সেটা হচ্ছে তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির প্রকাশ। এটা বোঝা খুবই কঠিন, আসলে যে স্থানেই ভক্তরা যান, সেই স্থানেই তিনি ধামকে পুনঃপ্রকট করেন। ধাম সীমিত নয়, যদিও এটি জগতের এক নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করছেন, স্থির আছেন, তবুও একই সময় তা শ্রীকৃষ্ণের মতোই সর্বব্যাপ্তিশীল কারণ যেখানে কৃষ্ণ আছেন, সেখানেই তাঁর ধাম আছেন, সেখানে তাঁর নাম, তাঁর স্বরূপ, তাঁর লীলা, তাঁর ভক্তগণ আছেন। যখন কেউ শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ে আনয়ন করেন, তখন সেটিও এক পবিত্র স্থান। যখন কেউ শ্রীকৃষ্ণকে তাদের গৃহে নিয়ে আসেন, তখন সেটিও ধামের প্রকাশ। কোন ব্যক্তির যত ভক্তি আছে, সেই অনুসারে কৃষ্ণ এবং তাঁর ব্যবহৃত পবিত্র বস্তুসমূহ-রূপ-নাম-ধাম প্রকাশিত হয়, তাই প্রত্যেক বস্তুরই তাঁর সাথে এক দিব্য সম্বন্ধ আছে। 

শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে, “ইসকন হচ্ছে আমার দেহ।” আমি শ্রীল প্রভুপাদের একজন ভক্ত, কিন্তু আমি ইসকনকে পছন্দ করি না, সেটা কি রকম? এটা কিভাবে সম্ভব? শ্রীল রামেশ্বর স্বামী আমি আপনাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি আপনার দেহকে ভালোবাসি না, এটা কিভাবে সম্ভব?  আমি তাঁর দিব্য সুন্দর বপু, পদ্মের মতো তাঁর সুমিষ্ট শব্দসমূহ এবং (যদি আমি তাকে পছন্দ করি) তার সাথে সম্বন্ধীয় তাঁর সহকারি ও সবকিছুই পছন্দ করি। কৃষ্ণ আমি তোমাকে পছন্দ করি, কিন্তু আমি তোমার দেহ পছন্দ করি না। আধ্যাত্মিক জগতে এসবের মধ্যে কোন ভিন্নতা নেই, অবশ্য জড়জাগতিক দেহ আধ্যাত্মিক দেহের থেকে ভিন্ন, কিন্তু একজন শুদ্ধ ভক্তের শরীর আধ্যাত্মিকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়, তা পবিত্র হয়, কারণ তা কৃষ্ণের প্রতি সম্পূর্ণ উৎসর্গিত। এমনকি একজন বলেছিল যে এটি হচ্ছে জড়জাগতিক দেহ, নাহ্! এটা হয়ত তোমার চোখে জড়জাগতিক কিন্তু যেহেতু তা কৃষ্ণের সেবায় সম্পূর্ণরূপে নিযুক্ত, তাই সেটাও পবিত্র হয়ে গেছে। তবে বিশেষত যখন শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, “আমার দেহ হচ্ছে ইসকন।” তাহলে আমরা কিভাবে ইসকন কে ভিন্নভাবে দেখতে পারি? কৃষ্ণ আমি তোমাকে ভালোবাসি কিন্তু আমি তোমার দেহকে পছন্দ করি না, এটা কি সম্ভব? কৃষ্ণের সাথে এর কি কোন পার্থক্য আছে? তাঁর শরীরের? শ্রীল প্রভুপাদ এবং তাঁর শরীরের মধ্যে কি কোন পার্থক্য আছে? যখন তিনি বলেছেন যে ইসকন হচ্ছে আমার শরীর, তখন তিনি এটা এই অর্থে বলেছেন যে—যদি তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাহলে তুমি চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে ভক্তদের সম্মিলিত সঙ্গকেও ভালোবাসো। আমি জানি একজন ভক্ত বলেছিলেন, “শ্রীল প্রভুপাদ এটা সত্য যে কেবল সেইসব ভক্তরা যারা সংকীর্তন করছেন, তারা কৃষ্ণের শুদ্ধ ভক্ত।” তখন প্রভুপাদ বললেন, “কে সংকীর্তন করছে না? পুরো আন্দোলন সংকীর্তনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তাই কে এখানে সংকীর্তন করছে না?” প্রত্যেকেই কেবল সংকীর্তন প্রসারের উদ্দেশ্যেই একে অপরের সাথে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করছেন। যদি কোন ব্যক্তি প্রসাদ রন্ধন না করেন, তাহলে ভক্তরা কিভাবে প্রসাদ পেয়ে বাইরে বের হবেন এবং প্রচার করবেন? প্রত্যেক ব্যক্তি একে অপরের সাথে সম্মিলিতভাবে সেবা করছেন। কোন একজন ব্যক্তি হয়ত অন্যজনের থেকে অধিক ঝুঁকি গ্রহণ করছেন, ও যারাই  গুরু এবং কৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ করে নিজেদেরকে সব থেকে বেশি ভক্তিমূলক সেবায় ঠেলে দিচ্ছেন, তারা শ্রেষ্ঠ কৃপা লাভ করছেন, তারা অধিক কৃপা লাভ করতে পারছেন, কিন্তু কে এই আন্দোলনের সংকীর্তন করছে না? কে সম্পূর্ণরূপে শরণাগত হচ্ছে না? এই পুরো আন্দোলন প্রচার-এর উপর ভিত্তি করে চলছে এবং প্রত্যেকেরই সেই প্রচারের মনোভাব থাকা উচিত যে কিভাবে আমি প্রভুপাদের ইচ্ছার সাথে সম্মিলিতভাবে চলতে পারব, কিভাবে ইসকনের সংকীর্তন আন্দোলন প্রচারের বৃহৎ যন্ত্রপাতির বর্ম, নাট, বল্টু, চাকা হয়ে কার্য করতে পারব। এই পুরো যন্ত্রটি সর্বত্র শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করার দিকেই কেবল যাচ্ছে। 

ধ্রুব মহারাজ, তিনি ভগবানের মহিমা গান করছিলেন যে—আপনার কৃপায় আমার ইন্দ্রিয় উদ্বুদ্ধ হয়েছে, আমি কেবল নিদ্রিত ছিলাম। সেটা কি আমাদেরও স্থিতি নয়? আমরা গুরুদেবের কৃপা লাভ করার পূর্বে কেবল মৃত ব্যক্তি ছিলাম, চলমান মৃতদেহ। তাঁর কৃপায় আমরা জেগে উঠেছি, তাঁর কৃপায় আমাদের দর্শনের চক্ষু হয়েছে যে আমরা কে, আমাদের উদ্দেশ্য কি, আমরা কোথায় যাচ্ছি, কৃষ্ণ কে, তাঁর সাথে আমাদের সম্বন্ধ কি, আমরা কিভাবে সেই সম্বন্ধে অনুসারে কার্য করতে পারব এবং পরম পরিপূর্ণতা কি। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীল রূপ গোস্বামীর নিয়মনীতি পালনের অতি কঠোর নিয়মানুবর্তিতা বা সাধনভক্তি বজায় রাখার মাধ্যমে কৃষ্ণভাবনামৃতকে এক অনন্য, প্রগতিশীলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি সেটার মধ্যে রাগানুগা ভক্তি বা স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তিমূলক সেবা প্রকাশের সর্বব্যপ্তিশীল সুযোগ নিবদ্ধ করেছেন। এটা অত্যন্ত বিরল। অমনি ভারতে এই প্রবণতা আছে যে কনিষ্ঠ অধিকারী হলে তৎক্ষণাৎ তারা বলে আমি হিন্দু, আমি এই, আমি ওই। আর কেবল আরতির সময় ঘন্টা বাজায়—ডিং ডং ডিং ডং ডিং ডং এবং তারা আরতির পর ফিরে যায় ও বসে অন্ন প্রসাদ পাওয়ার অপেক্ষা করে, আর অনেক অন্ন প্রসাদ গ্রহণ করে ও অনেক বিশ্রাম করে। অন্য অর্থে বলতে গেলে, তা কেবল পরের আরতির সময় সেই ঘন্টা তুলতে সক্ষম হওয়ার জন্য, যা খুবই ভারী প্রায় দু কিলো, পাঁচ পাউন্ডের ঘন্টা। শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের কাছে একবার বলেছিলেন যে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর বলেছেন, “যদি আমার কেবল একজন মধ্যম অধিকারী শিষ্য থাকে, উত্তম অধিকারী না হোক, প্রথম শ্রেণীর না হোক, যদি আমার একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর ভক্ত থাকত, তাহলে আমি বলতে পারি যে আমার এই পুরো আন্দোলন সফল হয়েছে।” (বিরতি) একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর ভক্ত। তৃতীয় শ্রেণীর ভক্ত কেবল বাহ্যিক রকম, কেবল বাহ্যিক স্বরূপ দেখে যে, যদি কেউ মাথা নত করে তাহলেই তিনি কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত। যদি মন্দিরে যায়, তাহলে তিনি শরণাগত। এর থেকে আরও বেশি কিছু আছে, কিন্তু এরপর তারা সহজেই আরো একধাপ এগিয়ে বলে, “আমরা পুরোপুরি দ্বিতীয় শ্রেণীর ভক্ত, আমরা বুঝি যে কেবল মাথা নত করলে মন্দিরে গেলে সেটাই শুদ্ধ ভক্তি নয় এর উর্ধ্বে আরো কিছু আছে। সেই জন্য আমরা নিজেদেরকে এসবের ঊর্ধ্বে দেখানোর জন্য মন্দিরে গিয়ে ভক্তির প্রদর্শন করি না। আমাদের সেটার প্রয়োজন নেই।” এরপর তারা আরো গভীর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। 

শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে আধ্যাত্মিক জীবন হচ্ছে ক্ষুরের মতো ধারালো। এর অর্থ কি? কেউ যদি শ্রীল প্রভুপাদ প্রদত্ত কৃষ্ণভাবনামৃতের সোজা পথ অনুসরণ করে, যা সম্পূর্ণরূপে শ্রীল রূপ গোস্বামী শিক্ষার সাথে মিল যুক্ত, তাহলে তিনি সোজা পথে এগিয়ে যাবেন। যদি কেউ একটু ডানদিকে যায় তাহলে মায়াবাদের গর্তে পতিত হবে—আমি হচ্ছি ভগবান, আমি একই গুরু, আমি সেই একই কৃষ্ণ, সবাই এক এবং সে যদি অন্য কোন দিকে একটু যায়, একটু বাঁদিকে যায়, তাহলে সহজিয়া হয়ে পড়বে—আমি ইতিমধ্যেই কৃষ্ণের নিত্য পার্ষদ হয়ে গিয়েছি, আমি ইতিমধ্যেই একজন শুদ্ধ ভক্ত, আমার এইসব নিয়ম-নীতির কোন দরকার নেই। আমি যেরকম চাইব সেই রকম যেকোনভাবেই কাজ করতে পারি, আমি আমার হৃদয় ও মনে কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত। কিন্তু শ্রীল রূপ গোস্বামী তিনি যা বলেছেন, প্রভুপাদ যথার্থভাবে আমাদেরকে সেটির বাস্তবিক প্রয়োগ দিয়ে গেছেন যা শ্রীল রূপ গোস্বামীর তথাকথিত অনুসারীরা অবশ্যই গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। 

সাধারণ সাধনা অনুসরণ করার সময়—নাম জপ করা, মন্দিরের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, আধ্যাত্মিক গুরুদেবের নির্দেশে উত্সাহের সাথে ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত থাকা, তা ভক্তিমূলক সেবার প্রতি কোন ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ বিকশিত করে। কারণ ইন্দ্রিয়সমূহ যত শুদ্ধ হবে, সে তার সেবায় তত নিপুণ হতে পারে কারণ ইন্দ্রিয়সমূহ যত শুদ্ধ হবে, তত স্পষ্টভাবে তিনি দেখতে পারবেন যে তাঁর আধ্যাত্মিক গুরুদেব এবং কৃষ্ণের প্রতি কি দায়িত্ব আছে। এমনকি যদি কেউ জাগ্রত জীব হয়, তিনি ভালো দৃষ্টান্ত হওয়ার চেষ্টা করবেন কারণ কনিষ্ঠ অধিকারী, অনুন্নত ভক্তরা তাদের প্রগতি ব্যাপারে বুঝতে পারেনা, কিন্তু শুদ্ধ ভক্তরা কখনো কখনো আধ্যাত্মিক গুরুদেবের নির্দেশ তুষ্ট করার প্রয়াসের মনোভাবে অত্যন্ত নিমগ্ন থাকেন, যা হচ্ছে অধিকতর উন্নত তত্ত্ব। 

আমাদের শ্রীল প্রভুপাদ কলকাতায় একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। তিনি তার গৃহে গিয়েছিলেন, যখন তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, সেই ব্যক্তি বলল, যেটা আমি বলছি, “শ্রীল প্রভুপাদ এসেছেন, আপনি কি তার সাথে দেখা করতে চান? অনেক অনেক বছর আগে আপনি তাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।” সেই ব্যক্তি বলে পাঠাল যে, “আমি এখন পূজা করছি, দয়া করে এক ঘন্টা বা এমন কিছু সময় পর আসুন।” প্রভুপাদ বললেন, “তিনি জানে না যে কিভাবে সন্তুষ্ট করতে হয়, শুদ্ধ ভক্তের স্থিতি কি, তাই তিনি কনিষ্ঠ অধিকারী। তিনি তার পূজো করছে, কিন্তু কৃষ্ণ তার কাছে তাঁর ভক্তকে পাঠিয়েছেন, এইসময় ভক্তের অভ্যর্থনা করা যান্ত্রিকভাবে শ্রীবিগ্রহ অর্চনের থেকে আরও অধিক উত্কৃষ্ট বিষয়। শ্রীচৈতন্য লীলায় এইরকম কত উদাহরণ আছে যে সার্বভৌম ভট্টাচার্য, তিনি যা করছিলেন তা ছেড়ে দিয়ে ভক্তদের অভ্যর্থনা করতে তৎক্ষণাৎ এসেছিলেন। ভগবানের ভক্তদের প্রীতিবিধান করার মাধ্যমে কৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ প্রীত হন, তাই তা সীমাহীন সময় ধরে সরাসরি ভগবানের সেবা করার থেকেও অধিক গুরুত্বযুক্ত। 

শ্রীল প্রভুপাদ ব্যক্তিগতভাবে ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের সমাধি মন্দির পছন্দ করেননি, কারণ তিনি অনুভব করেছিলেন যে তারা ভক্তিসিদ্ধান্তের মূর্তি এমনভাবে দেখতে তৈরি করেছিলেন… আমি ভুলে গেছি তিনি কাকে বলেছিলেন… হয়ত রূপানুগা বা ভবানন্দকে, আমি ভুলে গেছি কিন্তু তিনি বলেছিলেন, এটি তাকে ভক্তিসিদ্ধান্তকে স্মরণ করায় না। যখন তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, তারা তাকে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধাজনক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছিলেন। যখন তিনি সেটার সামনে দিয়ে যেতেন, তখন তিনি তার হাত দিয়ে দণ্ডবৎ জানাতেন ও চলে যেতেন। একদিন তিনি এই সমালোচনা শুনতে পান যে তার একজন গুরুভ্রাতা সমালোচনা করেছিলেন, “কেন ভক্তিবেদান্ত স্বামী  এসে মাথা নত করে না ভক্তিসিদ্ধান্তের সমাধি মন্দিরে? তার গুরুর মন্দিরে? এটা হচ্ছে একটা ত্রুটি।” তারা সমালোচনা করেছিলেন এবং তিনি যখন তার শুনলেন, তখন আমি সেই ঘরে উপস্থিত ছিলাম। তিনি তাতে এত প্রভাবিত হয়েছিলেন—“তারা বুঝতে পারে না, তারা বুঝতে পারে না। তারা মনে করে ভক্তিসিদ্ধান্ত সেই স্থানে বসে আছেন, তারা এটা উপলব্ধি করতে পারেনা যে তিনি আমার পাশে বসে আছেন এবং প্রতিমুহূর্তে আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন, আমাকে সাহায্য করছেন।  কনিষ্ঠ অধিকারীরা মনে করে যে একজন শিষ্য আধ্যাত্মিক গুরুদেবের পূজা কেবল তখন করে যখন সে আরতির সময় ঘন্টা বাজায়। তারা এটা দেখতে পারেনা যে অন্য যেকোন সময়ের থেকেও অধিক একজন শুদ্ধ শিষ্য তার নির্দেশ পালনের মাধ্যমে অন্তরঙ্গভাবে তার আধ্যাত্মিক গুরুদেবের সঙ্গে সংযুক্ত। সেই সম্পর্ক এত দৃঢ় এবং সুমিষ্ট যে এমনকি তিনি কোন আচার অনুষ্ঠানেরও উর্ধ্বে কেবল তার একান্ত ইচ্ছা পূরণ করার ভাবে নিমগ্ন থাকেন। যেটা তিনি পালন করেন এবং তার ইচ্ছা তুষ্ট করেন, এটাই হচ্ছে তত্ত্ব। কিন্তু বিদ্বেষে, অজ্ঞানতায়, জড় জাগতিক কলুষতায় ও অপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা অন্ধ কোন ব্যক্তি যেখানে কোন খুঁত নেই, এমন একজন ব্যক্তির মধ্যেও খুঁত দর্শন করে। ঠিক যেমন, সে কে ছিল? রামানন্দপুরী? কি ছিল? পরমানন্দ? না রামচন্দ্র। রামচন্দ্রপুরী যিনি দেখতেন, যিনি আসতেন ও ভক্তদের ভোজন করাতেন, প্রসাদ পাওয়াতেন।

তারা বলতেন, “আমাদের পেট ভরে গেছে, আমাদের পেট ভরে গেছে।”

“না! না! আপনাকে আরো গ্রহণ করতে হবে। আপনাকে অবশ্যই আরো গ্রহণ করতে হবে।”

তিনি তাদের পাত ভর্তি করে দিতেন ও তারপর অবশেষে তারা তা গ্রহণ করতেন। তিনি তাদেরকে এত জোর করতেন যে তারা বলতেন, “ঠিক আছে আমি ইতিমধ্যেই গ্রহণ করেছি কিন্তু আপনি বলছেন বলে আমি আরও একটু গ্রহণ করছি।”

“ওহ আপনি অধিক আহার করেন, মূর্খ ব্যক্তি!  আপনি অবৈষ্ণব! বদমাশ! আপনি অধিক আহার করেন, আপনি প্রকৃত ভক্ত নন।”

“আমি কেবল গ্রহণ করছি কারণ আপনি জোর করছিলেন, আমি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আহার করেছিলাম।”

“আহ বদমাশ!”

এই হচ্ছে রামচন্দ্রপুরীর মনোভাব যে কাউকে উপরে তোলা ও তারপর তার মস্তক ছিন্ন করা, সেখানে কোন ইতিবাচক নির্দেশ নেই। আমার মনে হয় যে কেন এই সব লীলাগুলি চৈতন্যচরিতামৃতে দেওয়া হয়েছে? এর কী উপকারিতা আছে? উপকারিতা হচ্ছে যে কারণ এইরকম উদাহরণ হতে চলেছে যেখানে বিদেশী জীবেরা... আমরা… তাদের এই ধরনের আচরণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকবে। সেই জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়ার জন্য এটা আছে যে, এটা কত মূর্খতা পূর্ণ। শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়ার জন্য এটিকে রেখেছেন, পাছে আমরা যদি রামচন্দ্রপুরী হয়ে যাই। তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর কক্ষে গিয়েছিলেন এবং দেখলেন যে মাটিতে কিছু পিঁপড়ে আছে, “ওহ আপনি এত মিষ্টি খান যে পিঁপড়েরা আসছে, আপনি প্রকৃত সন্ন্যাসী নন।” তিনি স্বয়ং কৃষ্ণের সমালোচনা করছেন.. কত .. কত দাম্ভিক? এই মতামতের দ্বারা বাধ্য হয়ে, ভক্ত এত বিনয়ী হন ও চৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তের মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন, এত বিনয়ী যে তিনি বলেছিলেন, “ঠিক আছে আমি আর আহার করব না।” তিনি সামান্য কিছু গ্রহণের মত তার আহার কমিয়ে ফেলেছিলেন। ভক্তরা এতই নমনীয় হৃদয়ের যে যদি কেউ সমালোচনা করে, এমনকি যদিও তা জড়জাগতিক দিক থেকে, এমনকি যদিও তা সঠিক দিক দিয়ে নয়, তবুও তিনি এত বিনয়ী যে—ঠিক আছে আপনি যেমন পছন্দ করেন… আমি আহার করা বন্ধ করে দেব। তাই প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোন ভুল না থাকলেও, কেউ ভুল খুঁজে বের করবে গুরু এবং কৃষ্ণের অন্তরের ইচ্ছা কি সেই বিষয়ে গভীর অনুভব না থাকায়। কী মূল্যে এই কলিযুগে বদ্ধ জীবদের মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করানো যাবে? কিভাবে তাদের মৃত পাথরের মতো হৃদয়ে কৃষ্ণভাবনামৃতের সুমিষ্ট অমৃত প্রবেশ করানো যাবে, যা হচ্ছে চৈতন্য মহাপ্রভুর সর্বপ্রধান বাসনা? 

আমরা প্রত্যেকদিন প্রার্থনা করি, “শ্রী-চৈতন্য-মনো-’ভিষ্টম স্থাপিতম’ যেনা ভূ-তলে স্বয়ং রূপঃ কদা মহ্যং দদাতি স্ব-পদান্তিকম”—হে শ্রীল রূপ গোস্বামী, আমি আপনার শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করি, কারণ আপনি এই জগতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মনোভিষ্ট স্থাপন করেছেন। এটাই হচ্ছে সর্বোচ্চ নীতি। শ্রীল রূপ গোস্বামীকে রূপমঞ্জরী ডাকা হয়, তিনি শ্রীমতী রাধারানীর সব থেকে অন্তরঙ্গ মঞ্জরী, ১০৮ জন গোপীর ৯ম গোপি। তিনি এটা মনে করেন না যে তিনি রাধা এবং কৃষ্ণ। তিনি পরম অন্তরঙ্গভাবে নিত্য সেবিকা। তিনি কি করেছেন? তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর সন্তুষ্টিবিধানার্থে শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তনের স্থাপন করেছিলেন। এবং তার নীতি অনুসরণ করে ভক্তিসিদ্ধান্ত বলেছিলেন, “আমি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছি শুধু এটা দেখানোর জন্য যে আমি কৃষ্ণের সেবকের সেবক। আমি চৈতন্য মহাপ্রভুর মতো নই, যিনি পুরীতে গৌড় গম্ভীরাতে বসে রাধা কৃষ্ণের লীলা রস আস্বাদনের আনন্দ উপভোগ করতেন। তুমি কি চৈতন্য মহাপ্রভু? আমার কি সেই রকম আনন্দ উপভোগ করা উচিত? আমি তাঁর সেবক, তাই তিনি যা চান সেইভাবে আমরা তার সেবা করব। তাঁর এইসব অন্তরঙ্গ লীলা উপভোগ করা উচিত, আমি কেবল তাঁর শ্রীপাদপদ্মের সেবা করব এবং তিনি আমাকে যে কৃপা করতে চান, সেটার জন্যই আমি সর্বদা আগ্রহী ও অধীর, আমি আর কিছুই চাই না। আমি তাকে নকল করে রাধা কৃষ্ণের অমৃত রস আস্বাদানের চেষ্টা করব না, মিথ্যাভাবে নিজেকে তার স্থিতিতে রাখার চেষ্টা করব না। আমি কেবল তাঁর কৃপায় যেকোন রস আস্বাদন করব, তাঁর মনভাব অনুযায়ী সেবায় মগ্ন থাকব।তিনি এটা দেখেছিলেন যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু চাইতেন তাঁর সংকীর্তন সর্বত্র প্রচারিত হোক, তাঁর শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা সর্বত্র প্রচারিত হোক এবং পুরো গুরু-পরম্পরার মাধ্যমেও আমরা দেখি যে তারা কেবল তাঁর এই ইচ্ছাই প্রকাশিত করেছেন। শ্রীল প্রভুপাদ সেই আদেশকে হৃদয়ে অপরিমেয়ভাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং সমগ্র বিশ্বে তা প্রচার করেছিলেন। এটা খুবই অসাধারণ এক বিষয়, অত্যন্ত অসাধারণ বিষয়। 

আমি হয়ত মায়াপুরে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম (অবশ্য সেখানে একটাই রাস্তা আছে) কিন্তু রাস্তায় আমাকে বলতে হবে, আসলে আমাকে কিছু স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেছিলেন যে, সেতুর পাশে এক বড় বটবৃক্ষ আছে, যা আমাদের জমি থেকে আধা মাইল দূরে ভক্তিসিদ্ধান্ত রোড-এর কাছে এবং কেউ একজন বলেছিলেন, এটা হচ্ছে যোগ মায়া, তা প্রায় ৭-৮ বছর আগের কথা। আমি প্রভুপাদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “প্রভুপাদ মানুষেরা বলেন যে যোগমায়া এখানে এই গাছ রূপে এসেছেন, আপনি কি এটি একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন? এটা কি সত্যি?” শ্রীল প্রভুপাদ তাকালেন, “কেন নয়?” প্রশ্নের উত্তর পেলাম কিন্তু একই সময় আমরা সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। নিশ্চয়ই সেই গাছটি হচ্ছেন যোগমায়া কিন্তু তিনি আবার আমাদেরকে এটাও বলছিলেন যে, “এর মানে এই নয় যে পবিত্র ধামে অন্যান্য গাছ যোগমায়া নয়।” পুরো ধামই হচ্ছে যোগমায়া, তাই এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে কেবল সেই গাছটি যোগমায়া। অবশ্য সেখানে সবকিছুই যোগমায়া, বিশেষত যদি অধিক যোগমায়া থাকে, তাহলে তা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করার, গভীর উপলব্ধি করার প্রয়োজন আছে। শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত নিগূঢ়, সমুদ্রের মতো গভীর এক উত্তর দিয়েছিলেন যা কেবল পবিত্র ধামের প্রতি আমাদের প্রশংসাভাব বৃদ্ধি করেছিল। আসলে শ্রীধাম মায়াপুরে আমরা অনুভব করি যে আমরা কেবল স্থানীয় জিবিসি বা মন্দির অধ্যক্ষ নই, আমাদের দর্শন করার চক্ষু আছে, আমরা এটা অত্যন্ত অনুভব করি যে আমরা সমগ্র ইসকন সংস্থার কেবল রক্ষক।

আমার মনে পড়ে ১৯৭০ সালে যখন শ্রীল প্রভুপাদ সেখানে গিয়েছিলেন, তিনি আসলে আমাকে ভারতে আসতে বলেছিলেন এবং তারপর তিনি কিছু সময় পর সেখানে এসেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, “আমার গুরু দত্ত দেশ, কৃষ্ণ কর্তৃক আমাকে প্রচার করার জন্য যে ভূমি দেওয়া হয়েছে তা হচ্ছে পাশ্চাত্য জগত। এখন আমাদের এখানে পাশ্চাত্যে অনেক ভক্ত আছে যারা প্রচার করছে, তাই এটির প্রয়োজন আছে যে তারা যাতে যায় ও আমাদের পবিত্র স্থানগুলি দর্শন করে। মায়াপুর, বৃন্দাবন দর্শন করে এবং কিছু সময়ের জন্য যাতে চৈতন্য মহাপ্রভুর পবিত্র আবির্ভাব স্থানের অনুষ্ঠানগুলি দর্শন করে।” তারপর তিনি আমাকে খুঁজে বের করার প্রয়াস করতে বলেন, তিনি প্রথমে অচ্যুতানন্দকে বলেছিলেন এবং তারপর তিনি আমাকে অচ্যুতানন্দকে সাহায্য করতে বলেছিলেন ও এরপর আমাকে সেখানে কিছু জমি খোঁজার, মায়াপুরে কিছু জমি খোঁজার প্রয়াস করতে বলেছিলেন এবং অচ্যুতানন্দ স্বামীকেও সেই উদ্দেশ্যের কথা বলেছিলেন। এটা এক দীর্ঘ পদ্ধতি ছিল কারণ ভারতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেবল পোস্ট অফিসে একটা চিঠি মেইল করতে তিন ঘন্টা লাগে, তাহলে জমি কেনার বিষয়টা কেমন তা আপনার চিন্তা করতে পারছেন। এবং সব সময় শ্রীল প্রভুপাদের মনোভাব ছিল আমাদের যাতে খুব ভালো ব্যবস্থাপনা থাকে যাতে ভক্তরা আসতে পারেন এবং দর্শন করতে পারেন এবং কিছু সময়ের জন্য সেখানে থাকতে পারেন। তিনি আমাদেরকে বলেছিলেন যে অসুরদের প্রচার  করতে থাকার ফলে ধীরে ধীরে কোন একজনের মন তার দ্বারা প্রভাবিত হয়, এই রকমই হচ্ছে স্টেথোস্কপ, এটা ১০০%... ০% …১০০% কৃষ্ণভাবনা এবং ০% মায়াভাবনা, কিন্তু কেউ যখন অবিরতভাবে সেইসব মানুষদের প্রচার করে চলেছে যারা ১০০% মায়াচেতনাময় এবং ০% কৃষ্ণচেতনাময়, তখন ধীরে ধীরে কেউ একজন হয়ত একটু রুচিহীন হতে শুরু করে, তখন কোনটা জীবনধারণের প্রকৃত মান সেই ধারণা তার কাছে একটু অবহেলিত হতে পারে, ঠিক যেমন এইসব বছরের মধ্যে দিয়ে আমরা দেখছি কিভাবে এমনকি আমেরিকাতে ৩০ বছর আগে যদি কেউ বলত যে—“এই ব্যক্তি সমকামী।” তাহলে মানুষেরা তৎক্ষণাৎ বলত, “আমি সেই ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাই।” এবং এখন ক্রমাগত অনুচিত সঙ্গ প্রভাবে খুব শীঘ্রই ৩০ বছর পর আমেরিকার ব্যক্তিরা সেইভাবেই আচরণ করছে ও অনেকেই এই ব্যাপারে ভাবতেও শুরু করছে, “ওহ! হ্যাঁ! এটা তো সাধারণ ব্যাপার। এটি একটি স্বাভাবিক ধরন।” সঙ্গ কত গুরুত্বপূর্ণ, তাই অবশ্যই ভক্তরা ক্রমাগত অশ্লীল কর্মীদের সঙ্গ করার ফলে তারাও হয়ত অবশেষে ভাবতে শুরু করতে পারেন যে আমাদের যথার্থ কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার থেকেও আরেকটু ভালো কিছু আছে। তাই, শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই মনোভাবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে যে, মানুষেরা এই ধরনের অশ্লীল ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে মগ্ন মানুষদের থেকে বের হয়ে কিছু সময়ের জন্য যাতে শুদ্ধ আধ্যাত্মিক স্তরে একে অপরের সাথে, কেবল ভক্তদের সাথে সঙ্গ করে। এটাই হচ্ছে আশ্রয় স্থল, যা হচ্ছে পূর্ববর্তী আচার্যগণের আশা এবং ইচ্ছাকে সন্তুষ্ট করা, চৈতন্য মহাপ্রভুকে সমগ্র বিশ্বের কাছে সর্বোচ্চ সম্মানীয় এবং বিশিষ্ট স্থানে সংস্থাপিত করা ও আরো অন্যান্য বিষয়সমূহের সংমিশ্রণ। এইসব কার্যক্রম শ্রীল প্রভুপাদ শুরু করেছিলেন। এবং যখন আমরা দেখি যে এই সব কিছু কিভাবে হচ্ছে যে যখন কেউ ধামে সেবা করছেন, তখন তিনি নাম-রূপ-লীলা এবং ভক্তদের প্রশংসা করতে শুরু করেন, তখন কোন ব্যাক্তি বুঝতে পারেন যে আধ্যাত্মিক জগতে সব কিছুর সাথেই সবকিছু আছে। এবং এই সম্বন্ধের বিভিন্ন ভাব, মধুরতা এবং রস আছে আর সেই একই সাথে সবকিছুর কৃষ্ণের সাথে গভীর আসক্তি আছে। সেই জন্য কাউকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে যে আধ্যাত্মিক জগতে তিনি কিভাবে আচরণ করছেন। এই আধ্যাত্মিক জগত অবশ্য সমগ্র কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলনে বিরাজ করছে এবং তাই আমাদেরকে খুবই নিপুণ হতে হবে—কৃষ্ণ এবং তাঁর ভক্তদের মধ্যেকার, কৃষ্ণ এবং তাঁর পবিত্র নামের, কৃষ্ণ এবং তাঁর পবিত্র ধামের, কৃষ্ণ এবং তাঁর স্বরূপের, কৃষ্ণ এবং তাঁর ব্যবহৃত বস্তুসমূহের মধ্যেকার সম্বন্ধ উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে। আমরা আমাদের পা দিয়ে শ্রীখোল বা মৃদঙ্গকে স্পর্শ করতে পারি না। আমরা আরতির বস্তুসমূহ আমাদের পা দিয়ে স্পর্শ করতে পারিনা। কেন? এইগুলি তো কেবল তামার অংশ মাত্র! আমরা কেন তা আমাদের পা দিয়ে স্পর্শ করতে পারব না? কারণ তাদেরকে কৃষ্ণের সেবায় ব্যবহার করা হয়েছে, ও আধ্যাত্মিক জগতে আরতির জিনিসসমূহও আড়তি করার সময় কৃষ্ণকীর্তন করেন। অবশ্যই আমরা এটা বলতে পারি না যে আমাদের আরতির জিনিসসমূহ তা করেনা। আমরা হয়ত এতটাই অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ও জড় বস্তুর মত যে আমরা আরতির করার সময় গোপবালিকারা যে কীর্তন করছেন তা আমরা শ্রবণ করতে পারছি না। কৃষ্ণের বাঁশি কথা বলেন, গোপীরা তাঁকে বলেন, “ওহ তুমি কত সৌভাগ্যবান! কিভাবে তুমি সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের অধরের দ্বারা চুম্বিত হও?” তখন বাঁশি তাঁদেরকে ভর্ৎসনা করেন। আধ্যাত্মিক জগতে সবকিছুই প্রাণময়, তা এক জীবিত আধ্যাত্মিক শক্তি, তাই আমরা কিভাবে কোন কিছুকে আলাদা করতে পারি? সবকিছুই হচ্ছে প্রশান্ত ব্যক্তিবিশেষ, প্রয়োজনীয়, গতিশীল, জীবন্ত আধ্যাত্মিক শক্তি। তা সবই বিভিন্ন স্বরুপে কৃষ্ণের সাথে বিভিন্ন সম্বন্ধের কারণে তাঁর নিজের বিস্তার। যদিও সবকিছুই হচ্ছে কৃষ্ণ কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তিনি নিজের সেবা করছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে তিনি সেবা গ্রহণ করছেন। কিছু ক্ষেত্রে তিনি সেই সেবা করার অমৃত রস আস্বাদন করছেন ও কিছু ক্ষেত্রে তিনি সেবিত হওয়ার অমৃত রস আস্বাদন করছে ও ভক্তদের সাথে ভাববিনিময় করছেন। আমাদের বোঝার জন্য সবথেকে জটিল বিষয় হচ্ছে সমগ্র অস্তিত্বের সার বস্তু এবং যার উপর ভিত্তি করে সবকিছু আছে, তা হচ্ছে সবকিছু কেবল গভীর আধ্যাত্মিক সম্বন্ধের প্রতিবিম্ব, যা কৃষ্ণের তাঁর নিত্যধামে বিরাজ করছে এবং অসাধারণ বিষয়টি হচ্ছে যে তা উপলব্ধি করার জন্য আমাদেরকে কৃত্রিমভাবে কোন কিছু পরিগ্রহ করতে হবে না, কেবল নিজেদেরকে শুদ্ধ আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে উৎসর্গিত করলে, শ্রীকৃষ্ণই সবকিছু প্রকাশ করবেন। 

বাসুদেবে ভগবতি ভক্তিযোগঃ প্রয়োজিতঃ।
জনয়ত্যাশু বৈরাগ্যং জ্ঞানং চ যদহৈতুকম্ ॥
[শ্রী. ভা. ১.২.৭]

শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবার দ্বারা আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে দিব্য জ্ঞান এবং বৈরাগ্য প্রকাশিত হয়। 

আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম ও এই শুনে আশ্চর্যিত হয়েছিলাম যে যখন আমি তমাল কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে গিয়েছিলাম, আমি জানিনা এটা তিনি বলেছিলেন এখানে নাকি। আমি একটু ভয়ে আছি কারণ আমি হয়ত উদৃতিটি ভুল বলতে পারি, কারণ আমি শুরুর দিকে অতটা মনোযোগ দিচ্ছিলাম না, যদিও শেষের দিকে আমার মন সম্পূর্ণরূপে আকৃষ্ট হয়েছিল। সম্ভবত তিনি(শ্রীল তমাল কৃষ্ণ গোস্বামী) শ্রীল রামেশ্বর স্বামীর ব্যাস পূজায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, “তিনি এখানে এসেছিলেন আপনার ব্যাস পুজার জন্য।” তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, হয়ত সেই রাতে বা তার আগের দিন রাতে বা তার পরের দিন রাতে বা কিছুদিন পরে কোন এক রাতে, আমি সঠিক কালানুক্রম জানিনা। তিনি একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন যে কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ তিনি নিচে যাচ্ছিলেন ও মন্দিরে এসেছিলেন। সেখানে রামেশ্বর স্বামী ছিলেন, তখন শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ব্যাস আসনে বসেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ স্বয়ং তার ব্যাস আসনে বসেছিলেন এবং সকালে মন্দিরের কার্যক্রম চলছিল। এরপর শ্রীল প্রভুপাদ উপরে তাঁর কক্ষে সকাল সাড়ে দশটার সময় এসেছিলেন একটু কিছু প্রাতঃপ্রসাদ গ্রহণ করতে। তিনি বললেন, “এখন আমি মন্দিরে ফিরে যেতে চাই।” উনি জিজ্ঞেস করলেন, “ওহ আমাদের কি আয়োজন করা উচিত শ্রীল প্রভুপাদ?” তিনি বললেন, “ শ্রীল রামেশ্বর স্বামীর শিষ্যরা তাঁকে তাঁর ব্যাস পূজায় যে শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখেছে আমি তা শুনতে চাই।” শ্রীল প্রভুপাদ সিঁড়ি দিয়ে নিচে গিয়েছিলেন এবং খুব মনোযোগ দিয়ে প্রত্যেক ভক্তের শ্রদ্ধাঞ্জলি শুনছিলেন ও এত কৃষ্ণভাবনাময় শ্রদ্ধাঞ্জলির কারণে তিনি এক দিব্য আনন্দ অনুভব করছিলেন। প্রভুপাদ, আমি জানিনা তিনি এটা কারো কাছে উল্লেখ করেছেন নাকি, কিন্তু অবশ্যই প্রভুপাদ সেখানে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কতটা খুশি হন যখন একজন ভক্ত এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে আত্মসমর্পণ করেন এবং গুরুপরম্পরার প্রতি গভীর বিশ্বাস অনুভব করেন। তিনি কতই না তাতে সন্তুষ্ট হন! অবশ্য স্বপ্ন যে ব্যক্তি দেখে, তা সরাসরি নির্ভর করে সেই ব্যক্তি কত শুদ্ধ তার উপর। স্বাভাবিকভাবেই একজন শুদ্ধ ভক্তের স্বপ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ কৃষ্ণ এবং আধ্যাত্মিক গুরু তার কাছে কিছু প্রকাশ করেন এবং যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু। কিন্তু যদি কোন উন্মাদ, পাগল, মানসিক রোগগ্রস্থ নির্বোধ লোক স্বপ্ন দেখে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে খুব একটা কোন প্রামানিকতা নেই। কেউ সেটার উপর নির্ভর করতে পারে না। একজন মায়াপুর মন্দিরে এসেছিল এবং আমাকে বলল, “আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি যে আপনি আসানসোলে আসতে চলেছেন এবং সেটা হচ্ছে ২০০ মাইল দূরে একটু শহরের এলাকা ও আপনি এখানে আমার বাড়ির পিছনে এক বড় মন্দির নির্মাণের জন্য আসতে চলেছেন।” আমি বললাম — “স্বপ্ন দেখতে থাকুন, হয়তো তা হতে পারে।” 

দেখুন, আসলে তমাল কৃষ্ণ গোস্বামী, তিনি আমাকে বলেছিলেন যে সাম্প্রতিক যা কিছু ঘটেছে, তার দ্বারা তিনি খুবই বিরক্ত। দুই মাস আগে তাঁর ব্যাসপূজাকালীন সময়ে, তিনি অমোঘ লীলা নামে বোম্বের এক ভক্তের থেকে চিঠি পেয়েছিলেন যে, “আমি উপলব্ধি করেছি যে আপনি হচ্ছেন কৃষ্ণের অবতার। আপনি হচ্ছেন কৃষ্ণ। আপনি অবতরিত হয়েছেন, আপনি অবতার। আপনি স্বয়ং কৃষ্ণ। আমি এটা উপলব্ধি করেছি।”  সে এটি লিখেছিল ব্যাস পূজায়, যা তারা প্রকাশ করেনি। সে বলছিল যে, তমাল কৃষ্ণ হচ্ছেন আসলে কলিযুগ অবতার কৃষ্ণ এবং তমাল কৃষ্ণ আমাদেরকে বলেছিলেন যে এই ব্যক্তি আসলে নিশ্চিতরূপে এক মায়াবাদী এবং কিভাবে প্রভুপাদ এই সমস্ত ব্যাপারে আমাদেরকে সাবধান করে দিয়ে গেছেন, কিন্তু তিনি কেবল তাকে লিখেছিলেন যে, “তোমার এইসব বলা উচিত না।” ও তা থামিয়ে ছিলেন, কিন্তু তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সাম্প্রতিক এই একই ব্যক্তির আরো কিছু তথাকথিত স্বপ্নের ব্যাপারে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, যাতে তমাল কৃষ্ণকে বলা হচ্ছিল যে, “এই পুরো জিবিসির কোন বৈধতা নেই। এখন আপনি এবং গিরিরাজ হচ্ছেন হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের একত্রিত আচার্য।” তিনি এত কুপিত হয়েছিলেন যে, “২ মাস আগে আমি কৃষ্ণ ছিলাম, আর এখন আমি হচ্ছি একমাত্র আচার্য? কেন আমাকে এরকম অবনমিত করা হচ্ছে?” দেখুন অবশ্য সাম্প্রতিক আমি আরেকটা চিঠির কথা শুনলাম যা তিনি বলছিলেন। সবকিছু ঠিক আছে, কৃষ্ণ... প্রভুপাদ তার স্বপ্নে এসেছিলেন এবং তাকে বলেছিলেন যে তিনি অমোঘ লীলাকে পরীক্ষা করছিলেন, আসলে প্রত্যেকে এবং সবকিছুই সেই ভাবে থাকা উচিত সেটা যেরকম ছিল আর তখনই সবকিছু ঠিক হবে। তার স্বপ্নের ভিত্তিতে নাকি জিবিসি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। 

কিছু ব্যক্তিরা যারা কনিষ্ঠ অধিকারী, যারা আধ্যাত্মিক গুরুদেবকে সন্তুষ্ট করার মনোভাব উপলব্ধি করে না, তারা হয়তো এর দ্বারা প্রভাবিত হবে। অবশ্য কৃষ্ণ কিছু বিষয় ঘটতে দেন কেবল এটা প্রকাশ করার জন্য, যে কে কনিষ্ঠ অধিকারী, কে মধ্যম অধিকারী, আর কে শ্রীল প্রভুপাদের অন্তরঙ্গ মনোভাব সন্তুষ্টির ইচ্ছায় মগ্ন ও কে তাঁর প্রকৃত ইচ্ছার কথা না ভেবেই বাহ্যিক বিষয়ে মগ্ন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, “কখনো কখনো মাটি মন্থন হওয়া দরকার এটা দেখার জন্য যে ব্যক্তি কোন পর্যায়ে আছে। কার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট, কার দৃষ্টিভঙ্গি ঘোলাটে এবং কার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি ঝাপসা।  কৃষ্ণ তার ভক্তদেরকে পরীক্ষা করেন।” প্রত্যেক ভক্তের এক ভিন্ন মনোভাব আছে যে কিভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করা যাবে, কিভাবে তার আধ্যাত্মিক গুরুকে সন্তুষ্ট করা যাবে, কিন্তু যারা ১০০% শুদ্ধ তাদেরকে দেখা যাবে যে তারা প্রতি মুহূর্তে তার প্রতি তার আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশাবলী পালনে সম্পূর্ণ মগ্ন। সেগুলিই হচ্ছে শাস্ত্রে নির্দেশিত পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সাধারণ নির্দেশ। শাস্ত্রে সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে কোন ব্যক্তিকে মন্দিরে যেতেই হবে। ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে বিভিন্ন নির্দিষ্ট বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে যে যখন কেউ মন্দিরে যায়, তখন তার কি করা উচিত। রূপ গোস্বামী ভক্তিরসামৃতসিন্ধু দিয়ে গেছেন। সাধারণ নির্দেশ হচ্ছে কোন ব্যক্তির আধ্যাত্মিক গুরুর থেকে দীক্ষা গ্রহণ করতেই হবে এবং তার আদেশ পালন করতে হবে। তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা আধ্যাত্মিক গুরুর দ্বারা সময় ও পরিস্থিতি অনুসারে শিষ্য অনুযায়ী প্রদান করা হয়। এটি সাধারণ নির্দেশ আছে যে কোন ব্যক্তিকে তার গুরুদেবকে, আধ্যাত্মিক গুরুকে পূজা করতে হবে কৃষ্ণের শুদ্ধ প্রতিনিধি রূপে গ্রহণ করে, যে কৃষ্ণ ওঁনার মাধ্যমে তাকে বলছেন, ওঁনার মাধ্যমে নির্দেশ দিচ্ছেন এবং ওঁনাকে সেবা করার মাধ্যমে কৃষ্ণ গুরুদেবের মাধ্যমে তার সেবা গ্রহণ করছেন, ওঁনাকে ভোজন করানোর মাধ্যমে কৃষ্ণ তাঁর মাধ্যমে ভোজন করছেন। এখন গুরুদেব তাদের নির্দিষ্ট মানসিকতার উপর নির্ভর করে কিভাবে শিষ্যদেরকে দিয়ে এই পূজা করাতে চান, সেটার উপর ভিত্তি করে তারা কিভাবে ভক্তিমূলক সেবায় স্থির হবে, কারণ তা সময় ও স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।

আমার মনে পড়ে যখন আমি মায়াপুরে এসেছিলাম, প্রথমদিকে মানুষেরা, যখন আমি বলছি মানুষের, তারা হচ্ছে শ্রীল প্রভুপাদের কিছু গুরুভ্রাতা। তারা শ্রীল প্রভুপাদের নিন্দা করছিলেন, কেন তুমি ভক্তিসিদ্ধান্তের মতো এত বড় এক আসনে বসে আছ? কেন তুমি এত এক বড় আসনে বসে আছ? তারা এখন আর বলে না। এখন তারা বলেন, “তিনিই হচ্ছেন একজন যিনি সমগ্র বিশ্বের কাছে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করতে পেরেছেন। তিনি ছিলেন এক শক্ত্যাবিষ্ট জীব। এখন আমরা ইসকনে যা কিছু করছি, সেখানে কোন কিছুতেই তাদের ভুল বলার কিছু নেই। সব বরিষ্ঠ সম্মানিত সদস্যগণ, তাদের খারাপ কিছু বলার নেই। এখন তারা এগিয়ে আসছেন এবং বলছেন, “আমরা সেই দিনের অপেক্ষা করছি, যেদিন আসলে ইসকন সব মন্দির পরিচালনা করবে, কারণ আমরা পরিচালনা করতে পারছি না।” অনেক ব্রহ্মচারীরা আসেন এবং বলেন, “আমরা পারছি না!” 

মায়াপুর অনুষ্ঠানে শ্রীল রামেশ্বর স্বামী প্রকাশ করেছিলেন, কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ ব্যক্তিগতভাবে তাকে এটি বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে—“একদিন এইসব মন্দিরগুলি তারা আমাদের কাছে আসবে এবং প্রার্থনা করবে যে দয়া করে এর দায়িত্ব গ্রহণ করুন। দয়া করে আমাদের পরিচালনা করুন। আর কেউ নেই যারা এটা পরিচালনা করতে পারে।” এবং এই বছর যেমন আমরা পরিক্রমায় যাচ্ছি,  মায়াপুরের এক অতি পুরাতন মন্দির, লক্ষ লক্ষ বছর আগের এক পবিত্র স্থান কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনকে দেওয়া হয়েছে যে, দয়া করে এটির দায়িত্ব গ্রহণ করুন ও পরিচালনা করুন। সেটি হচ্ছে সীমন্ত দ্বীপে আমাদের জগন্নাথ সুভদ্রা বলরামের পবিত্র মন্দির। এর সাথে অনেক লীলা আছে, যা এখন আমার বলার মত সময় নেই, তবে তা খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু আমি কেবল ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই শ্রীল প্রভুপাদের আশীর্বাদের প্রতি এবং রামেশ্বর স্বামীর অনুপ্রেরণার প্রতি, যিনি আমাদেরকে অনুপ্রেরিত করেছেন। যখনই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, “আমাদের কি এই বোঝা গ্রহণ করা উচিত? আমাদের কি তা গ্রহণ করা উচিত?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ! শ্রীল প্রভুপাদ আমাকে বলেছিলেন যে এইসব মন্দির অবশেষে পরিচালিত হওয়া উচিত এবং তিনি সকল জিবিসিকে বলেছিলেন যে এটা আমাদের দায়িত্ব।” এখন সেই মন্দির পুরোপুরি সই সহ কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনকে দেওয়া হয়েছে এবং স্নানযাত্রার সময় ৫০০০ স্থানীয় গ্রামবাসীরা এসেছিলেন এবং তারা এই গুণগান করছিলেন যে জগন্নাথদেবের পূজা হতে দেখা কত অসাধারণ। আসলে এখানে কিছু কিছু অত্যন্ত দিব্য এবং সুন্দর লীলা আছে, যা আমার সাথে জগন্নাথদেবের হয়েছিল, যেগুলি আমি পরে বলব যদি আপনাদের শুনতে আগ্রহ থাকে তাহলে।

ভক্তবৃন্দ: জয়!

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন মধ্যম অধিকারী ভক্তদের দ্বারা প্রসারিত হবে। সেই সমস্ত ভক্তদের দ্বারা, যারা তাদের আধ্যাত্মিক গুরুদেবের নির্দেশকে তাদের নিজের জীবন, প্রাণ ও আত্মার থেকেও অধিক প্রিয় বলে গ্রহণ করেছেন, যারা সব ধরনের সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে দেখেন যে সাধারণ এবং ব্যক্তিবিশিষ্ট নির্দেশের মধ্যে কি সম্পর্ক আছে আর নিয়মনীতির ও এই জগতে আধ্যাত্মিক গুরুর আদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যে কি সম্বন্ধ আছে।

ধ্রুব মহারাজ আমাদেরকে দয়া করে আশীর্বাদ করুন যাতে আমরা কৃষ্ণের কৃপা লাভ করতে পারি। এছাড়া আশা করার মত আর অন্য কোন মহান বস্তু আছে?

আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ! 

ভক্তবৃন্দ: জয়!

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 15/4/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions