Text Size

ভাদ্রপূর্ণিমায় প্রদত্ত প্রবচন

10 Sep 2022|Duration: 00:39:02|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

প্রদত্ত ভাগবত প্রবচনটি শ্রী শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ দিয়েছেন ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারত।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

 

শ্রীমদ্ভাগবত ১.৩.৪০

ইদং ভাগবত নাম পুরাণং ব্রহ্মসম্মিতম্‌।

উত্তমশ্লোকচরিতং চকার ভগবানৃষিঃ।

নিঃশ্রেয়সায় লোকস্য ধন্য স্বস্ত্যয়নং মহৎ ॥

 

অনুবাদ : এই শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের বাঙ্ময় বিগ্রহ এবং তা সংকলন করেছেন

ভগবানের অবতার শীল ব্যাসদেব। তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্ত মানুষের পরম মঙ্গল সাধন করা, এবং এটি সর্বতোভাবে সার্থক, পূর্ণ আনন্দময় এবং সর্বতোভাবে পরিপূর্ণ।

 

তাৎপর্য : শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ঘোষণা করেছেন যে, শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের এবং

ইতিহাসের নির্মল এবং পূর্ণ বর্ণনা। তাতে পরমেশ্বর ভগবানের কয়েকজন অন্তরঙ্গ ভক্তের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের বাঙ্ময় বিগ্রহ এবং তাই তা শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিন্ন আমরা যেভাবে পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনা করি, ঠিক সেইভাবে আমাদের শ্রীমদ্ভাগবতের পূজা করা উচিত। তা যত্ন সহকারে এবং ধৈর্য সহকারে পাঠ করার ফলে আমরা পরমেশ্বর ভগবানের পরম আশীর্বাদ লাভ করতে পারি, যদি তা গুরু-পরম্পরার ধারায় অধিষ্ঠিত সদ্‌গুরুর কাছ থেকে লাভ করা যায়। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ সচিব শ্রীল স্বরূপ দামোদর গোস্বামী উপদেশ দিয়ে গেছেন, যাঁরা জগন্নাথপুরীতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শনাভিলাষী, তারা যেন অবশ্যই ব্যাক্তি-ভাগবতের কাছে গ্রন্থ ভাগবত পাঠ করেন। ব্যক্তি-ভাগবত হচ্ছেন কৃষ্ণতত্ববেত্তা সদ্‌গুরু এবং শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করে উপযুক্ত ফল লাভের জন্য তাঁর কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবতের তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে হয় পরমেশ্বর ভগবানের উপস্থিতিতে যে পারমার্থিক লাভ হয়, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করেও সেই একই ফল লাভ করা যায় তাই শ্রীমদ্ভাগবত সর্বদাই পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত আশীর্বাদ বহন

করে, যা তাঁর সান্নিধ্যে এলেই কেবল লাভ করা যায়।

***

জয়পতাকা স্বামী: আজ ভাদ্র পূর্ণিমা, শ্রীমদ্ভাগবত দান করার এক বিশেষ দিন। বিভিন্ন পুরানে এটি উল্লেখ করা আছে যে, আজ হল শ্রীমদ্ভাগবত দান করার বিশেষ দিন। আজকে আমরা এই শ্লোকটিতে শুনলাম যে কিভাবে শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন করার মাধ্যমে জ্ঞান-বৈরাগ্য-ভক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কন্ধপুরাণে পুরো একটি অংশ রয়েছে যেখানে শ্রীমদ্ভাগবতমের মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়নের মাধ্যমে আপনি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের প্রীতিবিধান করতে পারবেন। পদ্ম পুরাণেও ছটি অধ্যায়ে শ্রীমদ্ভাগতের মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, যদি আপনি হাজারটি অশ্বমেধ যজ্ঞ এবং বিভিন্ন ধরনের যজ্ঞানুষ্ঠান করেন, তাহলে তার যে ফল হয় তা শ্রীমদ্ভাগবত পড়ার যে ফল তার এমনকি একের ষোল অংশের সমান নয়। এবং যদি কেউ এক সপ্তাহ ব্যাপী শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন, তাহলে তিনি বৈকুন্ঠ লোক প্রাপ্ত হওয়ার বিশেষ কৃপা পান। তবে, দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের ভক্তরা সবসময় শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন করে না।

পদ্মপুরাণে ভক্তি দেবী সম্পর্কে একটি ইতিহাস আছে। তিনি বৃন্দাবনে ছিলেন, তরুণী এবং নৃত্যরত আর তার দুই পুত্র ছিল জ্ঞান এবং বৈরাগ্য, যারা বয়স্ক এবং প্রায় মৃত্যুর মুখে। কিন্তু ভক্তি দেবী ছিলেন তরুণী এবং তিনি বৃন্দাবনে নৃত্য করছিলেন। নারদ মুনি তাকে দেখেছিলেন, তখন তিনি ওনাকে বললেন, তাঁর কাছে বললেন যে, “আমার দুই পুত্র জ্ঞান এবং বৈরাগ্য অনেক বয়স্ক হয়ে গেছে এবং আমি তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারছি না।” তিনি তাঁর ইতিহাস বলেন। তিনি দ্রাবিড়দের দেশ, দক্ষিণ ভারতে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তারপর তিনি কর্নাটকে যান। তিনি মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটে যান। তবে তখন তিনি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তারপর যখন তিনি বৃন্দাবনে যান, তখন আবার তিনি তাঁর তরুণ অবস্থা লাভ করেন কিন্তু তাঁর পুত্ররা তখনও বৃদ্ধ। কিছু মন্তব্যে এটি বলা হয়েছে যে, এর অর্থ কি? তারা মনে করেন যে, দ্রাবিড়দের দেশ হলো সেই স্থান যেখানে রামানুজাচার্য আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সমগ্র আলওয়াররা সেখানে ছিলেন। কর্ণাটক মানে মাধ্বাচার্য, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটে অনেক সাধুরা রয়েছেন কিন্তু ধীরে ধীরে সেখানে কিছু নির্বিশেষ বাদী ধারণা প্রবেশ করেছিল যা ভক্তিকে ধ্বংস করেছিল। ভক্তি বৃন্দাবনে যান এবং সেখানে তিনি আবার তাঁর তরুণ অবস্থা ফিরে পান। কিন্তু তাঁর পুত্ররা জ্ঞান এবং বৈরাগ্য তখনও বয়স্ক ছিল। তাই মন্তব্যকারীরা মনে করেন যে, বৃন্দাবনে চৈতন্য মহাপ্রভু এবং ষড় গোস্বামীর কারণে ভক্তি আবার পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। নারদ মুনি বললেন যে, “আমি এই দুই জনকে ভিন্ন বৈদিক মন্ত্র দ্বারা পুনরায় জীবিত করার চেষ্টা করব।” তিনি ভগবদ্‌গীতা এবং বিভিন্ন বৈদিক শ্লোক পাঠ করেন তারা দুজন তাদের চক্ষু উন্মীলন করে এবং নারদ মুনির দিকে তাকায় ও আবার নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তাই তারপর তিনি বললেন, “আমার কি করা উচিত? আমি কি করতে পারি?” তখন আকাশ থেকে একটি শব্দ নেমে আসে, তাতে বলা হয়, “চিন্তা করো না একটি সমাধান রয়েছে, আপনার পারমার্থিক শ্লোক উচ্চারণ করা উচিত।”  তিনি বিভিন্ন ঋষিদের জিজ্ঞেস করলেন যে, “আমার কোন শাস্ত্রটি পাঠ করা উচিত?” কিন্তু তারা কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। তারপর তিনি বৃন্দাবনের ভিন্ন ভিন্ন বনে যান। আমার মনে হয় এটা ছিল কাম্য বন, যেখানে তিনি চতষ্কুমারদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি বর্ণনা করেছিলেন যে আকাশ থেকে নেমে আসা শব্দে কি বলা হয়েছিল এবং তাই তাঁদের নির্দেশ ও উপদেশ জিজ্ঞেস করছিলেন। সনৎকুমার তাঁদের চারজনের পক্ষ থেকে বললেন,  “যদি আপনি শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করেন, তাহলে তা তাঁদের দুজনকে পুনরুজ্জীবিত করবে। আপনি ব্যাস দেব, যিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার তাঁকে শ্রীমদ্ভাগবত লিখতে বলেছিলেন ও তা তৎক্ষণাৎ তাকে সুখী করেছিল।” যাই হোক, এত বড় কাহিনীটি সংক্ষেপে বলার জন্য বলছি, নারদ মুনি তখন শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করতে করেন এবং তারা দুজন তাঁদের জীবন ফিরে পায়। হরিবোল! এই কাহিনী থেকে আমরা শ্রীমদ্ভাগবতের মহিমা অনুধাবন করতে পারি।

এছাড়াও, পদ্মপুরাণে ভক্তি দেবী বলছেন, বৃন্দাবন থেকে আমি সমুদ্র পাড়ি দেবো এবং শ্রীল প্রভুপাদ তিনি বৃন্দাবন থেকে গিয়েছিলেন, তিনি শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধ সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। অতএব, কিছু কিছু ব্যক্তিরা তর্ক করছিলেন যে এই ‘বিদেশ’-এর অর্থ কি। হয়তো এর অর্থ ভারতের থেকে কিছুটা দূরবর্তী স্থান। ভারতের আরেকজন পণ্ডিত তিনি বলেছিলেন, এটিতে দ্রাবিড়, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, গুজরাটের কথা উল্লেখ নেই এতে বিদেশের কথা বলা হয়েছে, যার মনে হল ভারতের বাহিরে। তাই, আমাদের ভক্তরা এবং কয়েকজন পণ্ডিতরা মনে করেন যে এটা অবশ্যই শ্রীল প্রভুপাদের শ্রীমদ্ভাগবতকে সমগ্র বিশ্বের কাছে নিয়ে যাওয়ার ভবিষৎবাণী। এবং ভক্তিযোগও পশ্চিমে আনা হয়েছিল। অতএব এই সমস্ত বিষয়গুলি পদ্মপুরাণে উল্লেখ করা রয়েছে। এখন আমরা দেখতে পাই যে কিভাবে এমনকি শ্রীমদ্ভাগবতমের একটি শ্লোক, অর্ধেক শ্লোক, এমনকি, এক চতুর্থাংশ শ্লোক পড়ার মাধ্যমে আমরা বিশেষ কৃপা প্রাপ্ত হই। এবং যে গৃহেতে শ্রীমদ্ভাগবত রয়েছে এবং যেখানে নিয়মিত প্রতিদিন তা পড়া হয়, সেই গৃহ গুলি কোন তীর্থস্থানের থেকে ভিন্ন নয়। হরিবোল!

আমি জানিনা আপনাদের কতজনের গৃহে শ্রীমদ্ভাগবত রয়েছে? আপনি কি তা নিয়মিত পড়েন? আমাদের কত পবিত্র স্থান রয়েছে!! শ্রীল প্রভুপাদ যখন শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম তিন স্কন্ধ লেখা সমাপ্ত করেছিলেন, তখন তিনি পাশ্চাত্যে গিয়েছিলেন। আমি সেই তিনটি স্কন্ধ কিনেছিলাম, সেই সময় কেবল সেই গ্রন্থ গুলিই ছিল। আমি আগে ‘অন্য লোকের সুগম যাত্রা’ বইটি পড়েছিলাম। তাই এমন কি যদিও প্রথম স্কন্ধটি নিখুঁত ইংরেজিতে ছিল না, তবুও তা গভীর জ্ঞানের আলো প্রদান করেছিল। এবং আমি জানিনা আমরা এই বছর কতদূর পৌঁছাতে পেরেছি — আমাদের ৪৩০০০টি শ্রীমদ্ভাগবত সেট বিতরণ করার লক্ষ্য ছিল। অতএব পরিকল্পনাটি হল যে, ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা ১ লক্ষ সেট বিতরণ করব। এর মানে প্রত্যেক বছর আমাদের ২১% বৃদ্ধি করতে হবে। আসলে, যদি প্রত্যেকে শ্রীমদ্ভাগবত পড়ে এবং শ্রীমদ্ভাগবত রাখে তাহলে এটি হল গ্রন্থ রূপে শ্রীকৃষ্ণ অবতার। আমাদের শ্রীমদ্ভাগবতের জন্য একটি স্বর্ণ আসন, সিংহাসন রয়েছে। হরিবোল!

শ্রীমদ্ভাগবতকে পূজা করা যেতে পারে, ঠিক যেমন আমরা শ্রী-বিগ্রহের পূজা করি। সেই ভাবে আমরা শ্রীমদ্ভাগবতেরও পূজা করতে পারি। আসামে তাদের একটি পিতলের সিংহাসন রয়েছে এবং তারা তাতে শ্রীমদ্ভাগবত রেখেছে ও পূজা করে। শ্রীমদ্ভাগবত হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গ্রন্থ অবতার। এবং শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবানের এবং তাঁর প্রকাশ ও শুদ্ধ ভক্তগণ যারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্পর্কিত তাদের বিভিন্ন লীলা বর্ণিত আছে। হরে কৃষ্ণ! কোন প্রশ্ন আছে কি?

প্রশ্ন: আপনি বললেন যে, শ্রীমদ্ভাগবত আমরা শ্রী-বিগ্রহের মত পূজা করতে পারি। আমাদের গৌরনিতাই এবং রাধামাধব আছে, আমরা কি সিংহাসনে শ্রীমদ্ভাগবতকে আমাদের মুখ্য শ্রী বিগ্রহ হিসেবে গুরু পরম্পরার সাথে রাখতে পারি এবং পূজা করতে পারি?

জয়পতাকা স্বামী: কেন নয়?

প্রশ্ন: আমি শ্রীমদ্ভাগবত, ভগবদ্‌গীতা বিতরণ করি এবং তাদের পূজা করি কিন্তু এখন আমি প্রতিবন্ধী এবং অক্ষম। এর কারণ কি হতে পারে?

জয়পতাকা স্বামী: এটা সময়ের কারণে। এবং ভক্তি, বৈরাগ্য, জ্ঞান এগুলি নিত্য তত্ত্ব। কিন্তু জ্ঞান বৈরাগ্য তারা কলি যুগে বৃদ্ধ হয়ে গেছিল। তবে শ্রীমদ্ভগবতমের তারা পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। আপনি কি মনে করেন যে গ্রন্থ বিতরণের কারণে আপনি এই জড় জগতে থেকে যাবেন, সবসময়ের জন্য? যাইহোক, আমাদের বেঁচে থাকার সীমিত সময় রয়েছে। আপনার গ্রন্থ বিতরণের কারণে, আমরা আশা করি যে এই জীবনের শেষে আপনাকে আর জন্ম নিতে হবে না! আমাদের অপরাধ এড়িয়ে চলা উচিত।

হরে কৃষ্ণ!

ঠিক আছে, আমি শ্রী শ্রীমৎ ভক্তি বিজয় ভাগবত স্বামীকে এবং সেই সকল ভক্ত যারা শ্রীমদ্ভাগবত বিতরণে সাহায্য করছে তাদের ধন্যবাদ জানতে চাই।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions