কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক প্রদত্ত তাৎপর্য:
জীবনের কতকগুলি প্রয়োজন আছে, যেগুলি ইতর পশুদের সম স্তরের, এবং সেগুলি হল আহার, নিদ্রা, ভয় এবং যৌন সংসর্গ বা মৈথুন। এই দৈহিক চাহিদাগুলি মানুষ আর পশু উভয়েরই আছে। তবে মানুষকে সেই আকাঙক্ষাগুলি পূরণ করতে হয় পশুদের মতো নয়, মানুষের মতো। একটা কুকুর বিনা দ্বিধায় লোকচক্ষুর সামনেই একটা কুকুরীর সাথে মৈথুন করতে পারে, কিন্তু যদি একটা মানুষ তেমনি করে, তবে সেই কাজ একটা সামাজিক নোংরা কাজ বলেই মনে করা হয়, এবং লোকটিকে দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত করাও হবে। তা হলে মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণ চাহিদাগুলি পূরণের জন্যও কিছু বিধিনিয়ম রয়েছে।
মানব সমাজ যখন কলিযুগের প্রভাবে বিভ্রান্ত হয়, তখন এই ধরনের বিধিনিয়মাদি লঙ্ঘন করতে থাকে। এই যুগে, বিধিনিয়মাদি না মেনেই লোকে জীবনের ঐসব প্রয়োজনগুলিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, আর সামাজিক ও নৈতিক নিয়মাদির এই অধঃপতন অবশ্যই দুঃখজনক, কারণ ঐ ধরনের পশুসুলভ আচরণের অহিতকর পরিণাম ঘটে।
এই যুগে, পিতা এবং অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের আচরণে সুখী নন। তাঁদের জানা দরকার যে, কলিযুগের প্রভাব থেকে লব্ধ কুসঙ্গের শিকার হচ্ছে কত নিরীহ শিশু। শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি যে, এক ব্রাহ্মণের নিরীহ এক শিশুপুত্র অজামিল পথ দিয়ে যাচ্ছিল এবং দেখতে পায় এক শূদ্র-যুগল যৌন আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। এই ব্যাপারটি ছেলেটিকে আকৃষ্ট করেছিল, এবং পরে ছেলেটি সকল রকমের ব্যভিচারিতার শিকার হয়ে পড়ে। এক শুদ্ধ ব্রাহ্মণ থেকে সে অধঃপতিত হয় অর্বাচীন চপলমতি এক তরুণের পর্যায়ে, আর এই সবই ঘটেছিল কুসঙ্গের প্রভাবে।
তখনকার দিনে অজামিলের মতো কুসঙ্গের শিকার একজন মাত্রই হয়েছিল, কিন্তু এই কলিযুগে নিরীহ বেচারী ছাত্রছাত্রীদের কতজনেই তো সিনেমার শিকার হচ্ছে প্রতিদিন, যে-সিনেমা মানুষকে আকর্ষণ করে শুধুই যৌনতাকে চরিতার্থ করার জন্য।
তথাকথিত শাসকবর্গ ক্ষত্রিয়েরা সবাই ক্ষত্রিয়ের উপযোগী কার্যকলাপে একেবারেই শিক্ষাদীক্ষাহীন। ক্ষত্রিয়দের কাজ শাসন-প্রশাসন, আর তেমনই ব্রাহ্মণদের কাজ হল জ্ঞানচর্চা আর মানুষকে পথনির্দেশ দান করা। ‘ক্ষত্রবন্ধু’ কথাটি দিয়ে বোঝানো হচ্ছে তথাকথিত শাসকবর্গ বা সেই সব লোকেদের, যারা কোনও সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মাধ্যমে যথার্থ সুশিক্ষা গ্রহণ না করেই শাসকের পদমর্যাদায় উন্নীত হয়ে বসেছে। আজকাল তারা ঐ ধরনের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হচ্ছে জনগণের ভোটের জোরে, আর সেই জনগণ নিজেরাই জীবনের বিধিনিয়ম থেকে অধঃপতিত হয়ে পড়েছে। ঐ জনগণ যখন নিজেরাই জীবনের নির্ধারিত মান থেকে অধঃপতিত হয়ে পড়েছে, তবে তারা কেমন করে যথার্থ লোক নির্বাচন করতে পারে?
অতএব, কলিযুগের প্রভাবে, সর্বত্রই, রাজনৈতিক, সামাজিক, বা ধর্ম সংক্রান্ত প্রতিটি ব্যাপারেই সব বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর তাই সুস্থির প্রকৃতির মানুষের কাছে এই সবই পরম দুঃখজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতি কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ প্রদত্ত শ্রীমদ্ভাগবতের ১ স্কন্ধ, ১৬ অধ্যায়, ২২ শ্লোকের তাৎপর্য।
জয়পতাকা স্বামী: ধর্ম, বলদ রূপী ধর্ম দেব গাভী রূপী ভূমিদেবীকে জিজ্ঞেস করছেন যে কেন তিনি ক্রন্দন করছেন। এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসার মাধ্যমে আমরা কলিযুগ সম্বন্ধে আরো কিছু বিস্তারিত তথ্য বুঝতে পারছি। আমরা বুঝতে পারছি যে এই কলিযুগে কত সমস্যা আছে, মানুষেরা ধর্মের যথাযথ পথ থেকে অধঃপতিত হচ্ছে। বেদে এটি বর্ণনা করা আছে যে যতক্ষণ না কেউ শাস্ত্রের প্রামানিক শিক্ষা পালন করছে, ততক্ষণ তিনি নিশ্চয়ই মনুষ্য সমাজে কেবল উৎপাত সৃষ্টি করছে।
এটি সংস্কৃততে বর্ণিত আছে, শ্রীল রূপ গোস্বামী উদ্ধৃতি —
শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণাদি পাঞ্চরাত্রিকি বিধিং বিনা।
ঐকান্তিকী হরের্ভক্তিরুৎপাতায়ৈব কল্পতে।।
[ভক্তিরসামৃতি সিন্ধু ১/২/১০১]
উৎপাতায়ৈব কল্পতে — মানে কেবল ভিশন উৎপাত। এই জগতে যা কিছুকে ধর্মের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, সেটাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের অপ্রামানিক উৎপাত সৃষ্টিকারী ধর্ম, যে ধর্ম ভগবানকে যথাযথরূপে গ্রহণ করে না। সেই ধর্মের কি মূল্য আছে যা ভগবানকে যথার্থরূপে গ্রহণ করেনা? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ম বলতে বর্তমানে মানুষেরা যা বোঝে, তাতে এমনকি যারা প্রকৃতপক্ষে শুদ্ধ ছিলেন, এত কিছু ভুল ব্যাখ্যার কারণে তারাও এটিকে বিকৃতভাবে অনুধাবন করছেন।
এই প্রসঙ্গে পদ্মপুরাণে বলা হচ্ছে যে, কেউ প্রামানিক সম্প্রদায়ের বাইরে থেকে শ্লোক বা মন্ত্র গ্রহণ করলে, তা নিষ্ফল হয় — মন্ত্র, অসম্প্রদায় মন্ত্র নিষ্ফল। পদ্মপুরাণে এটি বর্ণনা করা আছে যে চারটি সম্প্রদায় আছে — শ্রী, ব্রহ্মা, রুদ্র, কুমার। লক্ষ্মী, ব্রহ্মা, শিব এবং চার কুমার। প্রত্যেকেই সম্প্রদায়ের প্রারম্ভ করেছিলেন। লক্ষ্মী দেবী রামানুজাচার্যের সম্প্রদায়ের কৃপা করেছিলেন, ব্রহ্মা মাধ্বাচার্যকে এই জ্ঞান দিয়েছিলেন এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ব্রহ্মার এই সম্প্রদায়কে ধন্য করেছিলেন, আর মাধ্বাচার্য সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিলেন। রুদ্র সম্প্রদায় হচ্ছে বিষ্ণু স্বামী। বিষ্ণু স্বামীর সমসাময়িক বা তাদের প্রধান আচার্য যিনি ভারতের এই অংশে সুবিখ্যাত ছিলেন, তিনি হচ্ছেন বল্লভাচার্য। আর কুমার সম্প্রদায়ে সুপ্রসিদ্ধ আচার্য হচ্ছেন নিম্বার্ক আচার্য, নিম্বার্ক গোস্বামী।
এছাড়াও পদ্মপুরাণে এই ভবিষ্যৎবাণী আছে যে, কেউ একজন জগন্নাথপুরীতে আবির্ভূত হবেন [এটিকে বলা হয় পুরুষোত্তম] কেউ একজন জগন্নাথপুরীতে জন্মগ্রহণ করবেন এবং তার প্রচারের দ্বারা চার সম্প্রদায়ের বাণী সমগ্র বিশ্বে প্রচারিত হবে ও শুদ্ধ বৈষ্ণব ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হবে। এই চার সম্প্রদায়ের একজন সদস্য জগন্নাথপুরীতে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর মাধ্যমে, তাঁর ক্ষমতা প্রভাবে সমগ্র বিশ্বে বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারিত হবে। ইতিহাস পড়ে আমরা বুঝতে পারি যে, ভক্তিসিদ্ধান্ত স্বরস্বতী ঠাকুর জগন্নাথপুরীতে আবির্ভূত হয়েছেন এবং তিনি সবসময় বিশ্বের কাছে শুদ্ধ বৈষ্ণব ধর্ম, শুদ্ধ কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের প্রচেষ্টা করেছিলেন ও তাঁরই আদেশে আমাদের প্রিয় আধ্যাত্মিক গুরু ও প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ সমগ্র বিশ্বের কাছে গিয়েছিলেন ও তাঁর বাণী প্রচার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, এই সফলতার পেছনে যদি কোন গোপন রহস্য থাকে, তাহলে তা হচ্ছে কেবল এই যে তিনি তার আধ্যাত্মিক গুরুদেবের নির্দেশ পালনে রত ছিলেন। তাই, আসলে এই কলিযুগে অনেক দোষ আছে, কিন্তু তার একমাত্র একটি সমাধান আছে। একমাত্র একটি মহৎ গুণ আছে, কিন্তু সেই মহৎ গুণ এত অসাধারণ যে তা অন্য সব দোষ সমূহকে ছায়াবৃত করে দিয়েছে। এটি শুকদেব গোস্বামী কর্তৃক মহারাজ পরীক্ষিতের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে, (শ্রী ভা. ১২.৩.৫১) —“কলের্দোষনিধে রাজন্নস্তি হোকো মহান্ গুণঃ — “হে মহারাজ পরীক্ষিত, এই কলিযুগ হচ্ছে দোষের সমুদ্র। এই সম্বন্ধে আর ব্যাখ্যা করার কি লাভ আছে? কিন্তু এইসব দোষ সত্ত্বেও সেখানে এক মহৎ গুণ আছে। অস্তি হোকো মহান্ গুণঃ — এক মহান, অসাধারণ গুন আছে এই কলিযুগের, যা আপনি অন্যান্য যুগে খুঁজে পাবেন না। কীর্তনাদেব কৃষ্ণস্য — সংকীর্তনে শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নাম কীর্তন করার মাধ্যমে, মুক্তসঙ্গঃ পরং ব্রজেৎ — কেউ জড়জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্ত, জড়জাগতিক গুণসমূহের কলুষাতা থেকে মুক্ত হয়ে দিব্য স্থিতিতে উন্নত হন ও পরং ব্রজেৎ — তার প্রকৃত স্থিতিতে ফিরে যান, যা হচ্ছে কৃষ্ণের সাথে শুদ্ধ প্রেমের ভক্তিময় নিত্য সম্বন্ধ। সমস্ত আশীর্বাদ এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, সব থেকে বিরল এবং সর্বোচ্চ লক্ষ্য, কদাচিত অর্জনীয় ও জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য শুদ্ধ কৃষ্ণ প্রেম, এই কলিযুগে নাম কীর্তন-এর মাধ্যমে, শ্রীকৃষ্ণের নাম উচ্চারণের মাধ্যমে সহজেই উপলভ্য। মুনি ঋষিদের কত কঠিন প্রয়াস করতে হয়, বিভিন্ন ধরনের তপস্যা করতে হয়, বিভিন্ন ধরনের তপস-চর্যা, ব্রত করতে হয়, এমনকি তা শুধু সিদ্ধি, যৌগিক সিদ্ধি অর্জন করার জন্য, তাহলে মুক্তি লাভ করার ব্যাপারে আর কি বলার আছে? এবং কদাচিৎ কেউ একজন হয়ত বৈকুন্ঠ লোক বা কৃষ্ণ লোক প্রাপ্ত হতে পারেন। তাই, প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণের প্রতি শুদ্ধ প্রেম লাভের ব্যাপারে তাহলে আর কি বলার আছে? কিন্তু এই কলিযুগে তা সহজলভ্য। এটি হচ্ছে এক মহান অবিশ্বাসনীয় আশীর্বাদ।
এই কলি যুগে কেউ হয়তো তার কর্ম, তার জ্ঞান বা তার যোগ যথার্থভাবে অনুশীলন করতে পারবে না, কিন্তু কেউ কৃষ্ণ কীর্তন করতে পারেন এবং তার মাধ্যমে সেই সব লাভ অর্জন করতে পারেন যা অন্যান্য পদ্ধতির দ্বারা অনেক কষ্টের মাধ্যমে প্রাপ্ত হওয়া যায় বা এমনকি প্রাপ্ত হওয়া যায়ও না। এটি এক অত্যন্ত মহৎ সুযোগ, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এই যুগের অধঃপতিত জীবেরা তারা হরে কৃষ্ণ কীর্তন সম্বন্ধে কোন কিছু জানে না, তাদের হরে কৃষ্ণ কীর্তন করার কোন ইচ্ছা নেই, তাদের হরে কৃষ্ণ কীর্তন-এর প্রতি কোনো রুচি নেই। এখন যেহেতু কীর্তন জনপ্রিয় হয়েছে, তাই অনেক দল কীর্তন করছে। কিন্তু যেহেতু প্রভুপাদ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রচার করেছেন, যা হচ্ছে এই যুগের প্রামানিক মহামন্ত্র, তাই অন্যান্য গুরু এবং পণ্ডিতেরা তাদের নিজেদেরকে কিছু বৈশিষ্ট্য লাভের জন্য, যার অর্থ হচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য যার দ্বারা আপনি তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনতে পারবেন। ঠিক যেমন একজন মুনি, প্রত্যেক মুনির নিজস্ব ধারণা আছে, আর তাদের প্রত্যেকেই নিজেদের মতো কীর্তন করে। দেখুন কেউ হয়ত বলবে — “হরি হরে কৃষ্ণ”, “গোপাল কৃষ্ণ” বা আরেকজন কেউ হয়ত বলবে “নারায়ণ” বা এই ওই, তারা বিভিন্ন মন্ত্র বলতে থাকে কেবল তাদের দলকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে যে সেই মন্ত্র উচ্চারণ করতে হবে যা বেদ-এ দেওয়া হয়েছে। ঠিক যেমন কলিসন্তরণ উপনিষদে এটি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের ১৬ টি নাম আছে—
ইতি ষোড়শকং নাম্নাং কলিকল্মষনাশনম্।
নাতঃ পরতরোপায়ঃ সর্ববেদেষু দৃশ্যতে ।।
বলা হয়েছে যে কলিযুগে এই ১৬ নাম কীর্তন করা ছাড়া অন্য আর কোন উপায় নেই। এটি কলিযুগের সমস্ত আসুরিক প্রভাবকে বিনষ্ট করে। তাই, আসলে প্রামাণিক হচ্ছে চার সম্প্রদায়ের যেকোনো একটি এবং তারা এই প্রামাণিক নাম কীর্তন করছে। এই বিষয়ে ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছিল যে প্রচারের মাধ্যমে চার সম্প্রদায় এক হয়ে যাবে। তারা সব ব্রহ্ম সম্প্রদায় হয়ে যাবে।
ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের দ্বারা এই প্রচারের শুভারম্ভ করা হয়েছিল। সেই সময় শ্রীল প্রভুপাদ তিনিও অত্যন্ত গভীরভাবে তা অনুভব করেছিলেন যে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের নির্দেশ পালিত হচ্ছে না এবং সেই জন্য তিনি অনেক নির্দেশ দিয়েছিলেন, অনেক প্রার্থনা করেছিলেন। কয়েকটি ব্যাসপূজার শ্রদ্ধাঞ্জলিতে তাঁর কিছু নির্দেশাবলীর সম্পদ অন্তর্ভুক্ত আছে। আসলে শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে বলেছিলেন যে, আমাদের গৌড়ীয় মঠের এই দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। খারাপ দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন কিছু যা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে। যখন কেউ কোনো ভুল করে, তখন বুদ্ধিমান ব্যক্তি তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। সেই একই, যদি কেউ বৃষ্টির মধ্যে বের হয় এবং ভিজে যায়, তাহলে বুদ্ধিমান ব্যক্তি এটি বুঝবেন যে ভিজে গেছে, বৃষ্টি হচ্ছে, তাই তিনি বাইরে বের হবেন না। বলা হয়েছে, দেওয়ালের রং আর্দ্র আছে এবং কেউ একজন আসে ও বলে, “রং আর্দ্র? তা কী এখনো আর্দ্র আছে?” তিনি তার আঙ্গুল এটার ওপর রাখেন, ও দেখেন যে রং থেকে তার আঙুলে সবুজ লেগে গেছে। “আহ! রঙ আর্দ্র আছে।” তখন অন্য মানুষেরা আর সেখানে এসে রং স্পর্শ করবে না। তেমনই, দেওয়ালের উপর ইতি মধ্যেই লেখা আছে, আমাদের পূর্বতন আচার্য, উন্নত বৈষ্ণবদের দৃষ্টান্ত আছে, তা আমরা সাধনায়, তত্ত্বজ্ঞানে বা বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক কার্য ও আচার অনুষ্ঠানে যত উন্নতই হই না কেন। অথবা এমনকি কেউ কত ভবনই গড়ে তুলুন না কেন, প্রকৃত বিষয় হচ্ছে কোন ব্যক্তিকে এই বাণী গ্রহণ করতে হবে এবং পূর্ববর্তী আধ্যাত্মিক গুরুর শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। যতক্ষণ না আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ পালিত হচ্ছে, সবকিছুই মূল্যহীন। তখন তা এক খালি খোলকের মত হয়ে যায়। অবশ্য, শ্রীল প্রভুপাদ হচ্ছেন আমাদের এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য এবং তিনি পূর্ববর্তী আচার্যদের প্রকৃত সার নির্দেশ যথার্থভাবে গ্রহণ করেছিলেন।
আমাদের আন্দোলনের নিত্য ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে আমাদেরকেও খুব সতর্কভাবে সবসময় শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশ পালন করতে হবে। এবং সেইভাবে এই পরম্পরা চলবে। সরল পুষ্টিকরণ এখানে দেওয়া আছে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবশ্যক ভাবের উর্দ্ধে কোন পরিবর্তন নেই। বিশেষত ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের সময় থেকে চৈতন্য মহাপ্রভুর এই বৈষ্ণব আন্দোলন পুনর্জাগরিত হয়েছে তিনি বিষ্ণুর এক অংশ লাভের প্রার্থনা করেছিলেন। পদ্মপুরাণের ভবিষ্যৎ বাণী পূরণ করা ও ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের প্রার্থনা পূরণ করার উদ্দেশ্যে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত আবির্ভূত হয়েছিলেন। এরপর ভক্তিসিদ্ধান্তের আদেশ হয় ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং সরাসরি শ্রীল প্রভুপাদের মাধ্যমে কার্য করেছেন যে ব্যক্তিগতভাবে সমগ্র বিশ্বের কাছে গেছেন, তা হয়েছে শ্রীল প্রভুপাদের উপস্থিতিতে। এই আন্দোলণ পুনরায় প্রসারিত হয়েছে যেমন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। অতএব, আমাদেরকে খুব সতর্কভাবে তাঁদের নির্দেশ পালন করতে হবে।
এই বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্তের ৮৬তম আবির্ভাব দিনে এক অষ্টকম লিখেছিলেন, যাকে বলা হয় বৈশিষ্ট্যাষ্টক, ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের ৮টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমি ভাবলাম তৃতীয় বৈশিষ্ট্য থেকে পড়ার কথা, যা শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন এবং আমি যথাযথভাবে সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করে এই বিষয়ে আলোচনা করতে পারি।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য —
সবাই মিলিয়া বসি’ যদি চিন্তা করে ।
তবেই সুচারু হয় সে-সব প্রচারে ।। ১ ।।
তাই সে তোমার আজ্ঞা সবাই মিলিয়া।
প্রচারের কার্য করা বাণীতে মজিয়া ।। ২ ।।
নকল করিতে গেলে বিপরীত ফল ।
যত দিন যাবে সব হইবে বিকল ।। ৩ ।।
এখনও ফিরিয়া এসো প্রভুর আজ্ঞায়।
সকলে মিলিয়া মজি তাঁহার পূজায় ।। ৪ ।।
ফুল-ফল মহোৎসবে পূজা নাহি হয়।
বাণীর সেবক যেই সেই ত’ পূজায় ।। ৫ ।।
বাণীর যে পূজা হয় সেই শব্দব্রহ্ম।
ফিরিয়া আইস ভাই না করিও দম্ভ ।। ৬ ।।
‘কালীদাস নাগ’ সেই মাস্টার মশায়।
বলেছিল একদিন প্রকাশ্য সভায়।। ৭ ।।
কলির মিশন হ’ল সারা পৃথ্বী জুড়ে।
মহাপ্রভুর সারকথা খাঁচার ভিতর? ৮ ।।
ছিঃ ছিঃ! লোকলজ্জা নাই আমাদের ভাই।
ব্যবসাদারি চালে করি শিষ্যের বড়াই ।। ৯ ।।
প্রভু তাই বলেছিল প্রচার করিবারে।
কনিষ্ঠ ঢুকুক শুধু ঘন্টা নাড়িবারে ।। ১০ ।।
প্রত্যেকটি অষ্টকে ১০ টি শ্লোক আছে, এই জন্য একটু সময় লাগল। তিনি বলছেন ‘সবাই মিলিয়া’, সময় বাঁচানোর জন্য আমি শুধু ইংরেজি বলব। যদি আমরা সবাই একসাথে বসি ও আমরা চিন্তা করি ও আলোচনা করি যে কিভাবে চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন প্রচার করা যাবে, তাহলে তা অত্যন্ত নিখুত হবে এবং সেই ধরনের প্রচার খুবই ক্রিয়াশীল এবং ফলপ্রসু হবে। ‘তাই সে তোমার আজ্ঞা সবাই মিলিয়া’ — এইভাবে এটা আপনার নির্দেশ যে প্রত্যেকের একসাথে প্রচারকার্য গ্রহণ করা উচিত। এবং আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারে সকল বৈষ্ণবগণের দিব্য সঙ্গে একত্রে দিব্য আনন্দ অনুভব করব। কিন্তু ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের নির্দেশ পালন করার পরিবর্তে যদি আমরা কৃত্রিমভাবে তাঁর নকল করি প্রতিষ্ঠার… [পাশে: তিনি এটা বলেননি। কিন্তু তাৎপর্যে অবশ্য বলা হয়েছে। ভক্তিসিদ্ধান্ত তাদেরকে সমবেতভাবে প্রচার করার জন্য যে গভর্নিং বডি প্রতিষ্ঠা করতে বলেছিলেন, তারা এর বদলে নকল করে একজন আচার্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।] ‘নকল করিতে গেলে বিপরীত ফল। যত দিন যাবে সব হইবে বিকল।।’ — যতক্ষণ তারা কৃত্তিমভাবে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের নকল করার প্রয়াস করবে ও কেবল স্বতন্ত্রভাবে, স্বাধীনভাবে নিজেদের আচার্য রাখার চেষ্টা করবে, তা কেবল এক ঝামেলা হবে এবং আসলে তার ইচ্ছাপূর্তির ক্ষেত্রে কেবল নিষ্ফল প্রয়াস হবে। ‘এখনও ফিরিয়া এসো প্রভুর আজ্ঞায়’ — এখন ফিরে এসো, ফিরে এসো, ভগবানের নির্দেশ গ্রহণ করো। চলো আমরা সকলে একত্রে আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুর পূজা করার আনন্দ উপভোগ করি। ফুল ও ফলের দ্বারা মহোৎসব করা প্রকৃত পূজা নয়, কেবলমাত্র ফুল ও ফলের দ্বারা অনুষ্ঠানই প্রকৃত অর্চন নয়। এর পরিবর্তে তাঁর নির্দেশের সেবক হওয়া, সেটাই হচ্ছে প্রকৃত পূজা। যিনি সেই নির্দেশের সেবক, তিনি হচ্ছেন প্রকৃত পূজারী, যিনি আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশের সেবা করেন। [তিনি হচ্ছেন] সেই নির্দেশ হচ্ছে শব্দব্রহ্ম এবং তিনি আসেন, দিব্য স্তরে অধিষ্ঠিত হন। তাই আমার প্রিয় ভ্রাতাগন ফিরে এসো, গর্বিত হয়ো না, মিথ্যাভাবে অহংকারী হয়ো না, ফিরে এসো।
তারপর তিনি বলেছেন: ‘কালীদাস নাগ’ সেই মাস্টার মশায়। বলেছিল একদিন প্রকাশ্য সভায়।। [পাশে: আমি দুঃখিত, আমি এর তাৎপর্য জানিনা।] তিনি বলছেন যে, “আমাদের মাস্টারমশাই কালিদাস নাগ একবার প্রকাশ্য সভায় একদিন বলেছিলেন।” [পাশে: এটা হচ্ছে এমন কিছু যা তারা জানেন, সেই সমস্ত গুরুভ্রাতাগন, আসলে তারা জানেন। আমি জানিনা এটা সেই সময়ের নাকি যখন আমাদের গুরুভ্রাতারা প্রকাশ্যে অন্যান্য মিশনের নিন্দা করেছিলেন, অন্যান্য যারা এই দাবি করে যে তাদের দলনেতারা হচ্ছে অবতার। আমার মনে হয় নিশ্চয়ই সেটা, কারণ পরবর্তী শ্লোকে শ্রীল প্রভুপাদ বলছেন, ‘কলির মিশন হ’ল সারা পৃথ্বী জুড়ে।’ — এখানে “মিশন” শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে যে এমন কিছু মিশন আছে, যারা বলে তাদের গুরু হচ্ছে ভগবান। এবং ভক্তিসিদ্ধান্তের একজন শিষ্য তা গ্রহণ করেছিলেন না ও অত্যন্ত কঠোরভাবে জনসমক্ষে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এবং তিনি ভক্তিসিদ্ধান্তের বিশেষ কৃপা লাভ করেছিলেন। এখানে প্রভুপাদ বলেছেন যে, কলির মিশন জগতে সর্বত্র আছে। এবং কলির প্রচার সর্বত্র বিভিন্নভাবে হয়ে চলেছে। আর মহাপ্রভুর, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অত্যাবশ্যক শিক্ষা খাঁচার ভিতর রাখা আছে, কারণ প্রচারকেরা বাইরে গিয়ে প্রচার করছে না, তারা একে অপরের সাথে সহযোগিতা করছে না। তারা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সচেষ্ট হচ্ছে, সেই জন্য তা আটক হয়ে আছে।
এরপর প্রভুপাদ বলছেন, ‘ছিঃ ছিঃ!’ — ছিঃ ছিঃ! মানে এই হচ্ছে সেই শব্দ যা আপনি বাংলায় বলেন, যখন আপনি বিরক্ত। ঠিক যেমন লজ্জা লজ্জা! লজ্জা লজ্জা যে, তোমার কি কোন লজ্জা নেই? ‘লোকলজ্জা নাই’ — যা হচ্ছে তার জন্য আমাদের কি কোন লজ্জা নেই ভাইয়েরা? যে ঠিক ব্যবসায়ী-এর মত আমরা চারিপাশে যাচ্ছি শিষ্য গ্রহণ করার জন্য। এই কারণে আমাদের গুরুদেব আমাদেরকে বলেছিলেন যে আমাদের প্রচার করা উচিত। তিনি আমাদেরকে বলেছিলেন যে তারা কেবল নবাগত বা কনিষ্ঠ ভক্ত, যারা মন্দিরে থাকছে ও ঘন্টা বাজিয়ে মন্দিরে পূজা করছে, আর সমগ্র বিশ্বের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচারের কোন ব্যবস্থাপনা করছে না। তাই, বেরিয়ে এসো, তোমাদের খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসো, সেই সব আশ্রম থেকে বেরিয়ে এসো, যা হচ্ছে কারাগারের মতো। বাইরে বেরিয়ে এসো এবং সর্বস্থানের মানুষদের মধ্যে প্রচার কর।
এই ছিল তৃতীয় বৈশিষ্ট্য যা তাঁর আবির্ভাব দিবসে নিবেদন করা হয়েছিল এবং সেই সময়টা ছিল শ্রীল প্রভুপাদের পাশ্চাত্যে যাওয়ার আগে। শ্রীল প্রভুপাদের সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে ভক্তিসিদ্ধান্তের ইচ্ছা সন্তুষ্ট করার জন্য কি প্রয়োজন। এটা হচ্ছে তার বিনম্রতা, তার প্রচেষ্টা, যে তিনি সবসময় তার গুরুভ্রাতাদের সম্মিলিত হয়ে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করছিলেন। যখন তিনি দেখলেন যে আর কোন আশা নেই, তিনি তার পুরোজীবন ধরে চেষ্টা করেছিলেন, তবে এরপর অবশেষে ৭০ বছর বয়সে যখন তিনি দেখলেন যে তিনি যাই করেছেন, এমন কিছু নেই যার দ্বারা তিনি অন্যান্যদের সহযোগিতার দ্বারা কাজ করাতে পারবেন, তখন তিনি একা প্রচার করতে বের হয়েছিলেন। প্রত্যেককে একত্রে পাওয়ার জন্য বাস্তবে তার জীবনের ৫০ বছর ধরে বা ভক্তিসিদ্ধান্তের অপ্রকটের পর ৪০ বছর ধরে সকলকে তিনি একত্রে আনার প্রচেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অবশেষে তিনি বের হয়ে সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করে ফিরে এসেছিলেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, যখন তিনি মায়াপুরে ফিরে আসতেন, তিনি তাঁর সকল গুরুভ্রাতার কাছে আবেদন করতেন … যখন কোন কিছু একত্রিত আছে, তখন কোন না কোনভাবে আপনি সেটাকে একত্রিতই রাখুন। একবার আপনি তা ভেঙে দিলে, তা পুনরায় এক করা মুশকিল। এইরকম স্থূল জরজাগতিক দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই যে, একবার যখন গৌড়ীয় মিশন ভক্তিসিদ্ধান্তের নির্দেশ কঠোরভাবে পালন করা বন্ধ করে দিয়েছে ও ভেঙ্গে গিয়েছে, তখন বাস্তবে বলতে গেলে তাদেরকে কখনই আর পুনরায় একত্রে ফিরিয়ে আনা যাবে না। অন্ততপক্ষে সেই পুরো প্রজন্মে এখনও পর্যন্ত আমরা তাদেরকে তা করতে সক্ষম হতে দেখতে পাইনি, আর না আমি তাদের সেই অভিমুখে কোন আন্তরিক ইচ্ছা দেখতে পাচ্ছি।
ইসকনে এখন আমাদের পালা ও ইতিহাস হচ্ছে আমাদের প্রমাণ হবে যে কিভাবে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের নির্দেশ পালন করতে সক্ষম হচ্ছি ও একসাথে কাজ করছি, আমাদের সাধারন বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সমগ্র বিশ্বে একসাথে প্রচার করছি কারণ আমরা সেই একই ধ্বজার তলায় আছি। মানুষদের এই আন্দোলনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা আছে। এবং যেখানে যাই হচ্ছে না কেন সেটা প্রত্যেকেরই কৃতিত্ব বা অসম্মান। এই ধরনের একত্রিত শক্তি এমনকি জড়জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও অসীম শক্তিযুক্ত।
যদিও অন্যান্য জড়জাগতিকভাবে গণনা করে তোমরা হয়ত বলতে পারো যে আমরা সীমিত, কিন্তু এমনকি জড়জাগতিক ব্যক্তিরা তারা দেখে, তারা খুঁজে পায় না যে এই আন্দোলনে সীমা কোথায় ও আসলে যেখানে কৃষ্ণ আছেন এখানে সীমাবদ্ধতা নেই, তাঁর অসীম শক্তি, সবধরনের অসীম সম্পদ আছে কারণ তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, পরম সত্য। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ পালন করতে পারব, ততক্ষণ আমরা অন্যান্য যা আচার-অনুষ্ঠান করি, তাতে কোন ভুল নেই। কিন্তু আমাদের এটা মনে করা উচিত নয় যে আচার-অনুষ্ঠানই সবকিছু। আচার অনুষ্ঠান হচ্ছে কেবল এক পন্থা, যা আমাদেরকে সবসময় আধ্যাত্মিক গুরুকে অনুসরণ করার প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব তা মনে করানোর জন্য আছে। সেই নির্দেশ—নির্দেশ পালন করা, সেটা হচ্ছে ভাগবত ধর্ম, সেটা হচ্ছে শব্দব্রহ্ম, যা শ্রীকৃষ্ণ গীতায় দিয়েছেন, ভাগবতে আছে। কিভাবে সেটা অনুশীলন করতে হবে তা আমরা বুঝতে পারি সদ্ আচার্যের বাণীর মাধ্যমে। তাই, শ্রীল প্রভুপাদের পূর্বতন আচার্যদের বাণীর মাধ্যমে আমরা জানছি কিভাবে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন অনুশীলন করতে হবে। এবং যদি আমরা তাদের নির্দেশ পালনের নীতিতে কঠোর থাকি, তাহলে কোন সংশয় নেই যে এই আন্দোলন কৃষ্ণের অসীম কৃপা লাভ করতে চলেছে। এই কারণে শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর প্রত্যেক গ্রন্থে লিখেছেন যে, “যদি কেউ মনে করে যে তারা এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন ত্যাগ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী প্রচার করতে পারবে, তাহলে সেই ব্যক্তির দৃষ্টিভ্রম হয়েছে, এটা হচ্ছে তার মতিভ্রম।”
ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধের চতুর্থ অংশে কপিলমুনি দেবহুতির কাছে ব্যাখ্যা করছেন। কপিল ভগবান দেবহুতির কাছে ব্যাখ্যা করছেন যে, চার ধরনের ভক্তি আছে, সাধারণত দুই ধরনের — কলুষিত এবং শুদ্ধ। যারা জাগতিকভাবে কলুষিত, আপনি তা তিন ভাগে ভাগ করতে পারেন — তম, রজ এবং সত্ত্ব। সেটা আবার নববিধা ভক্তিমূলক সেবায় বিভক্ত হয় যা ২৭ প্রকার হয় এবং তারপর আবার প্রত্যেকটির উপবিভাগ আছে। সত্ত্ব, তম ও এই করে ৮১ প্রকার হয়। কিন্তু এর উর্ধ্বে হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা, যা হচ্ছে কেবল গুরুপরম্পরার মাধ্যমে ভগবানের ইচ্ছা পালন করা, যা তিনি কোন জড়জাগতিক বিবেচনা বা জড়জাগতিক নিষ্পত্তি ছাড়া বাসনা করেছেন, যা হচ্ছে কোন জাগতিক আকাঙ্খা ছাড়াই কেবল তাঁদের নির্দেশ পালন করা।
যে ব্যক্তি তম গুণের দ্বারা কলুষিত, এটি বলা হয়েছে যে সে অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত, সে হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী। সে চায়, সে মনে করে যে, সেই হচ্ছে একজন যে যথার্থভাবে কাজ করতে পারে এবং আর অন্যান্যরা যথার্থভাবে করতে সক্ষম নয় এবং সে একটু ক্রোধি ধরনের ও অত্যন্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ। এটি হচ্ছে কোন ব্যক্তির তম গুণের ভক্তির লক্ষণ, কিন্তু যেহেতু তিনি কৃষ্ণকে পরম লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাই তিনি সম্মানীয়, তবে তাকে এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এইরকম ব্যক্তি সঙ্গ করার জন্য ভালো নয়। যে ব্যক্তি ভক্তিমূলক সেবা রজগুণে করেন, এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে সে তার নিজের ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি পেতে চায়, তিনি নিজস্ব নাম ও প্রসিদ্ধি পেতে চায়। তিনি বিভিন্নধরনের জড়জাগতিক সুযোগ-সুবিধা পেতে চায়, ভক্তিমূলক সেবার মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ লাভ করতে চায়। এইভাবে তিনিও হচ্ছে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী, কারণ তার উদ্দেশ্য কৃষ্ণের থেকে একটু আলাদা, তার অন্য কিছু উদ্দেশ্য আছে। সত্ত্ব গুণে ভক্তিমূলক সেবা হচ্ছে, সেই ব্যক্তি আচার অনুষ্ঠান পালন করে, মন্দিরে পূজা করে, বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন করে, এবং এর জন্য একটু সে গর্বিত যে সে এইসব আচার-অনুষ্ঠানে, বর্ণাশ্রম পালনে খুবই পাক্কা। এবং এইভাবে সেও মুক্তি পেতে চায়, কোন না কোনভাবে উন্নত অবস্থানে যেতে চায়। কোন না কোন ভাবে সে নিজেকে খুবই সক্রিয় মনে করে। আসলে তারও এক ভিন্ন মানসিকতা আছে এবং তার মানসিকতা এটা নয় যে শুদ্ধভাবে কৃষ্ণের সন্তুষ্টিবিধান করা। কোন না কোন ভাবে সে তার পদের জন্য একটু গর্বিত।
এই তিনটি বিভাগ উল্লেখ করা হয়েছে এবং চতুর্থ বিভাগ হচ্ছে সেই একই শিক্ষা যা, অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি — সেই অপ্রতিহত এবং অহৈতুকী ভক্তিমূলক সেবা, যা সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সন্তুষ্ট করে। যে ব্যক্তি শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় আছে, তিনি তৎক্ষণাৎ সন্তুষ্ট অনুভব করেন। তিনি তৎক্ষণাৎ আধ্যাত্মিকভাবে আনন্দপূর্ণ হয়ে ওঠেন এবং তার সেই সেবার পরিবর্তে সুবিধা লাভের কোন বাসনা থাকে না, না তার সেই সেবা কোন জড়জাগতিক পরিস্থিতির দ্বারা প্রতিহত হয়, হয়ত পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন তা চলতে থাকে।
তাই আমাদের শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হবে যেমনটি তিনি তার গ্রন্থে দিয়েছেন। এবং যেমন সেগুলি এসেছে অত্যন্ত শুদ্ধভাবে, নিঃসংশয়ে শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবার মনোভাবে। কেউ যত বড়ই হোক না কেন, যদি আমরা অসতর্ক হই, তাহলে আমরা এই ৩ গুণের কোনটির দ্বারা বা ভক্তিমূলক সেবার ৮১ প্রকার কলুষতার কোনোটির দ্বারা কলুষিত হতে পারি। এমনকি যদি তা ৮১ তম হয়, যা হচ্ছে সত্ত্ব-সত্ত্ব, আত্মনিবেদন এর সাথে দ্বিমিশ্রিত, তবুও আমরা তার তোয়াক্কা করি না। আমরা ১০০% শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা করতে চাই — অন্যাভিলাষিতা-শূন্যং জ্ঞান-কর্ম্মাদ্যনাবৃতম্ — আমরা সেই শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা চাই। সেইজন্য, আমাদের এমনকি সত্ত্ব গুণের কলুষাতার প্রতিও অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত, তাহলে রজ ও তম গুণ সম্পর্কে আর কি বলার আছে? যদি কোন ভক্ত তম গুণের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়, তাহলে সে ভক্তিমূলক সেবায় প্রতিশোধমূলক, ঈর্ষাপরায়ণ, ক্রোধী হয়ে যায়, তার সেটা বর্জন করা উচিত। এটা প্রভুপাদকে প্রসন্ন করার পন্থা নয়। এটা প্রভুপাদের স্বার্থে নয়, এইরকমভাবে যদি কেউ ভক্তিমূলক সেবায় অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়, তার তা বর্জন করা উচিত। যদি কেউ একটু গর্বিত হয় বা কোন না কোনভাবে সত্ত্বগুণে থাকে, বর্ণাশ্রম ধারণায় থাকে যে, “যেহেতু আমি একজন সন্ন্যাসী, তাই আমি সেইভাবে সেবা করতে পারব না বা যেহেতু আমি একজন গৃহস্থ, আমি কৃষ্ণের বাণী প্রচার করতে পারব না।” ভক্তিমূলক সেবা অনুশীলনের ক্ষেত্রে এমন কোন বাধানিষেধ নেই। বা পূজারীরা কখনো কখনো প্রচারকেদের ছোট চোখে দেখে, এই, ওই, এক্ষেত্রে এই ধরনের সবকিছু হচ্ছে ভক্তিমূলক সেবায় তম, রজ ও সত্ত্ব গুণের সামান্য সংমিশ্রণের বিভিন্ন প্রকার। কোন ব্যক্তিকে কেবল আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ পালনের শুদ্ধ স্তরে আসতে হবে, বাদবাকি সব হচ্ছে সহায়ক, এটাই হচ্ছে সারবস্তু।
এখানে আমরা দেখতে পারছি যে এই কলিযুগে যেহেতু নেতৃবৃন্দ তাদের শাস্ত্রের নির্দেশিকা হারিয়েছে, তাই তারা বিপথগামী হচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব এখন পুরোপুরি বিপরীত পরিস্থিতিতে আছে। একমাত্র সমাধান, এই কলিযুগে একমাত্র সমাধান হচ্ছে — হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করা, যার অর্থ হচ্ছে কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর এই শুদ্ধ আন্দোলনের প্রচারকেরাই সমগ্র বিশ্বের একমাত্র আশা। তাই প্রচারকদের অবশ্যই সবসময় প্রভুপাদের নির্দেশ স্মরণ করতে হবে, সেই শুদ্ধতাই হচ্ছে শক্তি। শুদ্ধতার অর্থ কেবল জাগতিক নিয়ম, নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করা এড়িয়ে চলা নয়, এটা ছাড়াও আমাদের ভক্তিমূলক সেবায় সত্ত্ব রজ ও তম গুণের কলুষাতা থেকে দূরে থাকা।
আমাদের উচিত প্রতি মুহূর্তে কেবল এই চিন্তা করা যে কোনটি কৃষ্ণকে প্রসন্ন করবে, কোনটি আমার গুরুদেবকে প্রসন্ন করবে, গুরুপরম্পরাকে প্রসন্ন করবে, এবং সেটাই গ্রহণ করা। যেটা তাদেরকে অপ্রসন্ন করবে, তা প্রত্যাখ্যান করা। এটাই হচ্ছে ভক্তিমূলক সেবায় আত্মসমর্পণ। আমাদের সবসময় উচিত সেই নীতি পালন করা এবং তাহলে অবশ্যই আমরা আমাদের পূর্ববর্তী আচার্যদের আশ্রয় লাভ করব এবং আমরা আমাদের নিজেদের ধারণারও অধিক পূরণ করতে সক্ষম হব। ঠিক যেমন প্রভুপাদ, তিনি তার ধারণার অধিক সেই ভবিষ্যৎবাণী পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একইভাবে প্রভুপাদের কৃপায় এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় ও তাঁর মহান ভক্তগণের কৃপায় এই ইসকন আন্দোলন চৈতন্য মহাপ্রভু এবং প্রভুপাদের ইচ্ছা পূরণ করতে পারবে, যতটা আমরা আশা করতে পারি তার থেকেও অধিক। আমরা যেন কেবল বিনম্রভাবে ও আন্তরিকভাবে তাদের বাণী, তাদের মুখপদ্ম বাক্যতে স্থির থাকি যে সেটাই হচ্ছে আমাদের একমাত্র আশ্রয়, সেটাই হচ্ছে আমাদের একমাত্র সংযোগ।
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ ॥
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে
কোন প্রশ্ন আছে?
হ্যাঁ…
প্রশ্ন: (শ্রুতিহীন) তমগুণ ও রজগুণের ভক্তিমূলক সেবা, আমরা সেই সমস্ত ব্যক্তিদের সাথে কি করব যারা ভক্ত নয়, কিন্তু তারা সত্ত্ব গুণে আছে, যা হচ্ছে আমরা এই সময় ভারতে প্রচার করছি। বেশিরভাগ মানুষেরা তারা সত্ত্ব গুণে আছে, তারা শিক্ষিত, তারা মন্দিরে যায় এবং তারা সত্ত্ব গুণের দ্বারা গর্বিত, আমাদের কাছে তাদের অবস্থা কী?
জয়পতাকা স্বামী: এটা হচ্ছে সত্ত্ব গুনে ভক্তিমূলক সেবা। তারা মন্দিরে যায়, তারা কিছু ভক্তিমূলক সেবা করে, হয়ত তাদের মান… নয় ধরনের ভক্তি সেবার উপবিভক্ত, তারপর তা আবার উপবিভক্ত, আর তারপর সেটা আবার প্রত্যেক গুণ, তিন গুণ নিয়ে ৮১টি ভাগে উপবিভক্ত আছে। সরলভাবে সমাধান হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তি সেবার প্রচার করা।
কখনো কখনো যেহেতু চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনে তিনি এমনকি সবথেকে পতিত ব্যক্তিদেরও শুদ্ধ করতে সক্ষম, তাই যে সমস্ত ব্যক্তিরা অত্যন্ত সত্ত্ব গুণের মধ্যে আছে, তারা মনে করে — শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই আন্দোলন কেবল ম্লেচ্ছদের জন্য, পতিত জীবদের জন্য, বিভিন্ন ধরনের অপসম্প্রদায়ের জন্য; কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে আমরা গোঁড়া বর্ণাশ্রম পালন করি, হিন্দু ধর্ম, এই ওই এরকম যে কোনকিছু। তবে বিষয় হচ্ছে যে চৈতন্য মহাপ্রভুর অমৃতসিন্ধু বাহিত হচ্ছে এবং এবং এই সমুদ্রের সীমারেখা ভক্তদের প্রচারের দ্বারা অতিক্রান্ত হচ্ছে, তাই আমাদেরকে খুব ভালো দৃষ্টান্ত দেখাতে হবে ও তাদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে যে এটা কেবল কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের জন্য নয়। এটা সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য, সে তারা সত্ত্ব গুণে হোক বা তম গুণে হোক বা হয়ত যাই হোক না কেন, এটি সকলের জন্য। এটি হচ্ছে এই কলিযুগের সার্বজনীন পন্থা।
যারা বুদ্ধিমান, তারা এটি গ্রহণ করবে এবং যারা বুদ্ধিমান নয়, তারা এমনকি তা গ্রহণও করবে না। দেখুন যারা বুদ্ধিমান, তারা গ্রহণ করবে এবং তারা এই অমৃতসিন্ধুতে সাঁতার কাটবে, যখন এতে বন্যা হবে এবং অন্যান্যরা হয়ত সাঁতার কাটতে সক্ষম হবে না, কিন্তু তারা ভেসে যাবে। কোনভাবে এবং তারা এর উপরে ভাসতে বাধ্য হবে, যেহেতু আর কোন শুকনো ভূমি থাকবে না, সর্বত্রই কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনের অমৃত ধারা বইবে।
এইভাবে বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে, সর্বত্র বিভিন্নভাবে প্রচারের আয়োজন করা হলে, সেই ব্যক্তিরা তারা নাম জপ করা এড়িয়ে যেতে পারবে না। তাই চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি বলেছেন, বিনয়ী হও। মানুষদের কাছে ভিক্ষা করো, তাদের কাছে ভিক্ষা কর। দ্বারে দ্বারে যাও এবং তাদেরকে এই হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন গ্রহণ করতে, কৃষ্ণের পূজা করতে, কৃষ্ণের পবিত্র শিক্ষা গীতা এবং ভাগবত অধ্যায়ন করতে আবেদন করো। তিনি বলেছেন, “লোকেদের কাছে ভিক্ষা করো।” ব্যক্তিগতভাবে নিত্যানন্দ প্রভু এবং হরিদাস ঠাকুর, তাঁরা দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভিক্ষা চেয়েছিলেন। এই প্রচার আন্দোলন হচ্ছে শুদ্ধ অমৃত, যা হচ্ছে গিয়ে গিয়ে কেবল মানুষদের থেকে এই ভিক্ষা চাওয়া। একজন ব্যক্তি খুব গর্বিত এবং যদি আপনি তার কাছে গিয়ে ভিক্ষা করেন, “একটা জিনিস, আপনি দয়া করে হরে কৃষ্ণ নাম করুন”, তাহলে তিনি কিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করবে, “না আমি হরে কৃষ্ণ নাম করবো না।” এমনকি কেউ আছে? তিনি কিভাবে প্রত্যাখ্যান করবে যদি তিনি ধর্মীয় হওয়ার গর্বে গর্বিত হন, যদি আমরা তাদের কাছে সঠিকভাবে তা উপস্থাপন করি, তবে সেই সক্ষমতা কেবল তখনই সম্ভব যদি আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক গরুর, শ্রীকৃষ্ণের, চৈতন্য মহাপ্রভুর, নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা লাভ করি। তাহলে আমরা কোন না কোনভাবে তাদের কৃপায় এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারব এবং নিশ্চিতভাবে একদিন আমরা অনেক ব্যক্তিদের দিয়ে তা করাতে সক্ষম হব।
দক্ষিণ ভারতে আমরা লোকেদের হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন করার জন্য বলেছিলাম এবং তারা হচ্ছেন অত্যন্ত কঠোর কিন্তু এমনকি উচ্চ ব্রাহ্মণ শ্রেণী, এমনকি কিছু মুসলিম ও অন্যান্য মানুষেরা তারাও এগিয়ে এসে এই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন যে তারা প্রত্যেকদিন ১০৮ বার হরে কৃষ্ণ জপ করবেন কারণ এটিই হচ্ছে যুগ ধর্ম এবং তারা যতটা সম্ভব চৈতন্য মহাপ্রভুর এই নীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করবেন। এক সাক্ষাৎকারে একা মাদ্রাসে ৩০০০ ব্যক্তি সেখানে সই করেছিলেন। আমি দিল্লি গিয়েছিলাম, লোকনাথ স্বামী বললেন, “আমার মনে হয় না আপনি তা দিল্লিতে করতে পারবেন। এটা খুবই কঠিন।” আমরা একদিনে ১০০ পাতা মুদ্রণ করেছিলাম। এবং রামানন্দী সাক্ষাৎকারের মাঝে, আমি শেষে এই অনুরোধ করেছিলাম যে, “এটাই হচ্ছে যুগ ধর্ম আপনারা কতজন এই কলিযুগের পবিত্রতার জন্য চৈতন্য মহাপ্রভুর জ্ঞানের আলো এগিয়ে নিয়ে যেতে একদিনে ১০৮ বার নাম করবেন?” সেই জনসমাবেশে প্রায় ১৫০০ মানুষের মধ্যে ৫০০ জন উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, “আমরা প্রত্যেকদিন হরে কৃষ্ণ জপ করব। আমরা চৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ পালন করব। তারা ফর্ম সই করতে এসেছিলেন।” সেই রামানন্দী গুরু, তিনি পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন, তিনি সম্পূর্ণ রেগে গিয়েছিলেন ও আমার থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে নিয়েছিলেন এই বলে যে, এটা একটি বিশৃঙ্খলার কারণ হবে ও এরকম কিছু, এবং তা তিনি একজন রামায়ণের গায়ককে দিয়েছিলেন যে তৎক্ষণাৎ তুলসী দাস রামায়ণের রাম নাম করতে শুরু করেছিল। এই সত্ত্বেও মানুষেরা এসে সই করেছিলেন এবং বলেছিলেন – “আমাকে একটি ফরম দিন আমরা চাই...” এমনকি একজন রামানন্দী সাধু, তিনিও এসেছিলেন ও বলেছিলেন, “আমিও জপ করব।”
ভক্তবৃন্দ: হরিবোল!
জয়পতাকা স্বামী: বিষয় হচ্ছে, এটি পন্থা যে যদি আমরা মানুষদের জপ করতে অনুরোধ করি, তাহলে কত মানুষেরা এগিয়ে আসবে। তখন আমাদেরকে যা করতে হবে, তা হচ্ছে পরে আমাদের, তারা জপ করতে সহমত হওয়ার পরে, আমরা তাদের সাথে কিছু যোগাযোগ রাখব এবং দেখব তারা যাতে জপ করতে থাকেন। যাইহোক, এর অর্থ যাইহোক না কেন, যদি কোন না কোনভাবে গ্রন্থ বিতরণের মাধ্যমে, আমাদের আবেদনের মাধ্যমে তা করা যায়… তিনি তার শিষ্যদের লিখেছিলেন, তা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তিনি তার শিষ্যকে চিঠি লিখেছিলেন কিভাবে তারা মায়াপুর প্রচারকে বজায় রাখবেন। তিনি বলেছিলেন যে প্রথম হচ্ছে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করা এবং তারপর বিতরণ করা, মুদ্রণ করা এবং গ্রন্থ বিতরণ করা। তৃতীয় বিষয় যা তিনি বলেছেন যে নামহট্ট প্রচার করা। নামহট্ট মানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে অনুশীলন করানো, এমন নয় যে কেবল সবসময়ের ভক্তরাই অনুশীলন করেন। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তাদের নিজেদের গৃহে, তাদের নিজেদের গোষ্ঠীতে এটি অনুশীলন করতে অনুপ্রাণিত করা। আপনারা দেখুন এই কথা প্রভুপাদ ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধে বলেছেন, “এমন কোন কারণ নেই যে কেন প্রত্যেক গোষ্ঠী, প্রত্যেক পরিবার, বিশ্বের প্রত্যেক দেশে সবাই প্রত্যেকদিন তাদের গৃহে হরে কৃষ্ণ নাম করতে পারবে না।” শ্রীল প্রভুপাদ… এটাই শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের কাছে বর্ণাশ্রম প্রচার হিসেবে পুনরায় বলে গেছেন। বর্ণাশ্রম প্রচার আমরা সবসময় বলি, কেবল ভক্তরা বলে না, জনগণ… জনগণ.. জনগণ.. বর্ণাশ্রম প্রচার সেটা হচ্ছে আধুনিক এইভাবে প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন, যা ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন নামহট্ট। এটি তার থেকে ভিন্ন নয়, এর মানে মানুষদের দিয়ে অনুশীলন করানো। বর্ণাশ্রম কি? সেটা হচ্ছে কৃষ্ণকে গ্রহণ করা। যদি আপনি কৃষ্ণকে গ্রহণ না করেন, তাহলে বর্ণাশ্রমের কোন প্রশ্নই ওঠে না। তাই সেটা এই একই কার্যক্রম। হরে কৃষ্ণ!
ভক্তবৃন্দ: হরিবোল!
Lecture Suggetions
-
20210320 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 4 Koladvīpa Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৩০শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২১ ভক্তদের মহিমা কীর্তন এবং দিব্য পবিত্র নাম কীর্তনে ভক্তগণের অপরাধ অপসারণ
-
২০২১০৭১১ গোলোকে গমন করো – ভাদ্র পূর্ণিমা অভিযান সম্বোধন জ্ঞাপন
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব্ব – ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭১৯ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল।
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব, ২রা মার্চ – ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২০ ফলশ্রুতি – কুলিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেবের লীলা প্রসঙ্গ শ্রবণের ফল- ২য় ভাগ
-
20221103 Addressing Kārtika Navadvīpa Mandala Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২৩ দেবানন্দ পণ্ডিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে শ্রীমদ্ভাগবত ব্যাখ্যা করার সঠিক উপায় সম্পর্কে নির্দেশ দানের অনুরোধ করলেন
-
২০২২০৪০১ প্রশ্নোত্তর পর্ব
-
20221031 Address to Navadvīpa-maṇḍala Kārtika Parikramā Devotees
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20210318 Navadvīpa Maṇḍala Parikramā Day 2 Haṁsa-vāhana Address
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২৮শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ৫ই মার্চ ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২১শে ফ্রব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
২০২১০৭২২ দেবানন্দ পণ্ডিতের শ্রদ্ধাহীনতা বক্রেশ্বর পণ্ডিতের কৃপার দ্বারা ধ্বংস হয়
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব- ২৭শে মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
20220306 Addressing Śrī Navadvīpa-maṇḍala-parikramā Participants
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৪ঠা মার্চ, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব – ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
-
প্রশ্নোত্তর পর্ব - ৩রা মার্চ ২০২২
-
২০২১০৭২৬ নবাব হুসেন শাহ্ বাদশা তাজা সংবাদ পেলেন – রামকেলি গ্রামে একজন সন্ন্যাসী আগমন করেছেন