Text Size

১৯৮২০৩০৯ শ্রীমদ্ভাগবতম ৪.২২.২৫ — খেতুরী গ্রামে প্রথম গৌর-পূর্ণিমা মহোৎসব উদযাপন।

9 Mar 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

প্রদত্ত প্রবচনটি শ্রী শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী ৯ মার্চ, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে, শ্রীধাম মায়াপুরে প্রদান করেছেন। প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগতমের ৪.২২.২৫ শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রীচৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
    ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!
      ওঁ নম ভগবতে বাসুদেবায়!  

শ্রীমদ্ভাগবতম ৪.২২.২৫ 
হরের্মুহুস্তৎপরকর্ণপূর-
গুণাভিধানেন বিজৃম্ভমাণয়া ।
ভক্ত্যা হ্যসঙ্গঃ সদসত্যনাত্মনি
স্যান্নির্গুণে ব্রহ্মণি চাঞ্জসা রতিঃ।।

 

অনুবাদ:- ভক্তের কর্তব্য নিরন্তর ভগবানের দিব্য গুণাবলী শ্রবণ দ্বারা ভ্রমশ ভগবদ্ভক্তি বৃদ্ধি করা। ভগবানের লীলাসমূহ ভক্তের কর্ণভূষণ-সদৃশ। ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবা সম্পাদনের দ্বারা এবং জড়া প্রকৃতির গুণের অতীত হওয়ার দ্বারা, অনায়াসে চিন্ময় পরমেশ্বর ভগবানে স্থির হওয়া যায়।

তাৎপর্য:- এই শ্লোকে বিশেষভাবে ভগবদ্ভক্তির বিষয়ে শ্রবণের দ্বারা ভক্তির পুষ্টিসাধনের উল্লেখ করা হয়েছে। ভগবদ্ভক্ত পরমেশ্বর ভগবানের চিন্ময় কার্যকলাপ অথবা লীলাবিলাস ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে শ্রবণ করতে চান না। আত্ম-তত্ত্ববেত্তা ব্যক্তির কাছে ভগবদ্‌গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করার দ্বারা ভগদ্ভক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি করা যায়। আত্মতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তির কাছে যতই শ্রবণ করা যায়, ততই ভগবদ্ভক্তির পথে উন্নতিসাধন করা যায়। ভগবদ্ভক্তিতে আমরা যতই উন্নতিসাধন করি, ততই আমরা জড় জগতের প্রতি অনাসক্ত হই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উপদেশ অনুসারে, জড় জগতের প্রতি আমরা যতই অনাসক্ত হই, পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি আসক্তি ততই বর্ধিত হয়। তাই, যে ভক্ত ভগবদ্ভক্তিতে উন্নতিসাধন করে তার প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে চান, তার পক্ষে অর্থ ও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি আসক্ত বিষয়ীর সঙ্গ ত্যাগ করা অবশ্য কর্তব্য। সেই সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন 

নিস্তিঞ্চনস্য ভগবদ্ভজনোন্মুখস্য
পারং পরং জিগমিষোর্ভবসাগরস্য।
সন্দর্শনং বিষয়িণামথ যোষিতাঞ্চ
হা হন্ত হন্ত বিষভক্ষণতোঽপ্যসাধু ॥
(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত মধ্য ১১/৮)

এই শ্লোকে ব্রহ্মণি শব্দটির টীকায় আসুরী বর্ণাশ্রম প্রথার সমর্থক নির্বিশেষবাদী অথবা শ্রীমদ্ভাগবতের পেশাদারি পাঠকেরা বলে যে, ব্রহ্মাণি শব্দটির অর্থ হচ্ছে নির্বিশেষ ব্রহ্ম। কিন্তু এই শ্লোকের ভক্ত্যা ও গুণাভিধানেন শব্দগুলির পরিপ্রেক্ষিতে এই অর্থ সমীচীন নয়। নির্বিশেষবাদীদের মতে, নির্বিশেষ ব্রহ্মের কোন দিব্যগুণ নেই; তাই ব্রহ্মণি শব্দটির অর্থ ‘পরমেশ্বর ভগবানে’ বলে বুঝতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, যে-কথা ভগবদ্‌গীতায় অর্জুন স্বীকার করেছেন; তাই যখনই ব্রহ্ম শব্দটির ব্যবহার হয়, তখন বুঝতে হবে যে, তা অবশ্যই শ্রীকৃষ্ণকে ইঙ্গিত করছে, নির্বিশেষ ব্রহ্মাজ্যোতিকে নয়। ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবানিতি শব্দ্যতে (শ্রীমদ্ভাগবত ১/২/১১)। ব্রহ্ম বলতে ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবানকে বোঝাতে পারে, কিন্তু যখন সেই শব্দটি ভক্তি অথবা দিব্য গুণাবলীর স্মরণ সম্বন্ধে উল্লেখ হয়, তখন তা পরমেশ্বর ভগবানকে ইঙ্গিত করে, নির্বিশেষ ব্রহ্মকে নয়।

এখানে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক ২৫তম শ্লোকের তাৎপর্য সমাপ্ত। 

ভক্তগণ:- জয় শ্রীল প্রভুপাদ! 

জয়পতাকা স্বামী:-  আজকে আমরা কলিযুগের উদ্ধারকারী, সকল অবতারের উৎস অবতারী, শ্রীকৃষ্ণের সর্বাপেক্ষা কৃপাময় অবতার শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর অতি পবিত্র ৪৯৬তম আবির্ভাব তিথিতে এখানে সমবেত হয়েছি।   

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- শ্রী শ্রী শচীসুত কি! 

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- শ্রী শ্রী শচীনন্দন কি! 

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- এই দিনটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর শিক্ষার মহিমা শ্রবণের জন্য একেবারে সঠিক। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা কৃষ্ণদাস কবিরাজ কর্তৃক সূর্য সম উজ্জ্বল রূপে বর্ণিত হয়েছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু গৌরদেশের পূর্বভাগে, গৌর মণ্ডল ভূমির পবিত্র স্থান, শ্রী মায়াপুর ধামে সূর্য ও চন্দ্রের মত উদিত হয়েছিলেন। ঠিক যেমন সূর্য ও চন্দ্র পূর্ব দিকে উদিত হয় এবং তারা পরিক্রমা শুরু করে সমগ্র বিশ্বে ভ্রমণ করে, ঠিক তেমনই শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই বাণী পূর্বভাগে অবস্থিত শ্রীধাম মায়াপুর (নবদ্বীপ ধাম) থেকে নিয়ে পতিত জীবদের সুবিধার্থে সমগ্র বিশ্বের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ কি! 

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- এই শ্রবন পন্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কাউকে সঠিক উৎস থেকে তা শ্রবন করতে হবে। যখন কেউ সঠিক উৎস থেকে তা শ্রবণ করে, তখন তৎক্ষণাৎ তার হৃদয়ের সকল কলুষতা বিনষ্ট হয়। যখন কেউ সঠিক উৎস থেকে শ্রবণ করে, তখন সে ভক্তিমূলক সেবায় স্থির হয়। শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র বিশ্বে প্রচারের জন্য ভ্রমণ করেছিলেন, কেবল তার হরি কথার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব কৃষ্ণ ভক্তে রূপান্তরিত হয়েছে। এটিই হচ্ছে বিপ্লব। অতএব, এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হচ্ছে চেতনার রূপান্তর, এই রূপান্তর মানবজাতির পাপময় জীবনকে ধ্বংস করে। যারা বিশেষত এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তাদের শ্রীল প্রভুপাদের আশ্রয়ে থাকতে এবং সঠিক উৎস থেকে নির্দেশ শ্রবণ করতে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। 

এখানে শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক উল্লেখিত শ্লোকটিতে তিনি বলছেনহা হন্ত হন্ত বিষভক্ষণতোঽপ্যসাধু” (চৈতন্য চরিতামৃত মধ্য ১১.৮) এটিতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, যদি কেউ শ্রবণ করে, কেউ যদি এমন কারোর থেকে শ্রবণ করে যে এই জড়জগতের প্রতি আসক্ত ও ভক্তিমূলকভাবে সেবা সম্পাদন করে না, তাহলে তা বিষ ভক্ষণের সমান।বিষভক্ষণতোঽপ্যসাধুবিষ এর অর্থ গরল। তাই, এটি আমাদের কাছে এক বিরাট সুযোগ যে শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায়, পূর্ব আচার্যবর্গ যেমন ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর, গৌরকিশোর দাস বাবাজি মহারাজ এবং ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের কৃপায় কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে, আমাদেরকে আশ্রয় প্রদান করছে। শ্রীল প্রভুপাদ বর্ণনা করেছেন যে, এই আন্দোলন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর থেকে অভিন্ন। এটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বৃক্ষের একটি শাখা, তাই আমাদের শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশাবলী যথাযথভাবে অনুশীলনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে, কারণ তিনি হলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বৃক্ষের সাথে আমাদের যোগসূত্র। এই কারণে আমরা শ্রীল প্রভুপাদকে আমাদের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য রূপে অর্চনা করি। তিনি আমাদের সাথে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই বৃক্ষের যোগসূত্র। তিনি সমগ্র বিশ্বকে অসীম আশ্রয় প্রদানের জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রকাশিত করেছেন।

আসলে সমগ্র বিশ্বের শ্রীল প্রভুপাদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারোরই তাঁর বিরোধী হওয়া উচিত নয় কারণ তিনি এমন কিছু করেছেন, যা আগে কেউ কখনও করেনি। তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভবিষ্যৎ বাণী সম্পূর্ণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে, মানুষদের তাঁর প্রতি কেবল অন্তরিকতাবিহীন সেবা করা উচিত নয়, তাদের কেবল তাকে উচ্চ কোন নামেই সম্বোধন উচিত নয়, বরঞ্চ আসলে শ্রীল প্রভুপাদকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নিজ প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, যিনি সকল শুদ্ধ বৈষ্ণবদের একত্রিত করতে এসেছিলেন। তাদের কেবল অন্তরিকতাবিহীন সেবা প্রদান করা উচিত নয়, তাদের আসলে হৃদয় থেকে শ্রীল প্রভুপাদের কাছে আত্মসমর্পণ করা উচিত। তবে মিতব্যায়িতার কারণে সকলে তা করে না, কিন্তু অন্ততপক্ষে এই আন্দোলনে আমাদের এই চেতনা সংরক্ষণ করতে হবে এবং যেমন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, তাঁর এই আন্দোলন নগরাদি গ্রামে প্রচারিত হবে — 

পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম,
সর্বত্র প্রচারিত হইবে মোর নাম
(চৈ.ভা. অন্ত্য খন্ড ৪.১২৬) 

তেমনই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই দিব্য বৃক্ষের সাথে সংযুক্ত থাকার মাধ্যমে এই শাখা প্রসারিত হবে এবং তা প্রসারিত হতে হতে সমগ্র বিশ্বকে কলিযুগের প্রচণ্ড তাপে ছায়া প্রদান করবে। শ্রীল প্রভুপাদ কি! 

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- ইস্‌কন কি!  

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- ঠিক যেমন পদ্মপুরাণে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছে যে চারটি বৈষ্ণব সম্প্রদায় — শ্রী, ব্রহ্মা, রুদ্র এবং কুমার কিন্তু কলিযুগে এই চারটি সম্প্রদায় মিলিত হয়ে একটি হবে।” একইভাবে চৈতন্য চরিতামৃত, চৈতন্য ভাগবতেও এটি ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছে যে, মহাসমুদ্র, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্লাবন এত বিশাল যে, তা সকলকে সরিয়ে নিয়ে যাবে, যারা শুদ্ধ ভক্ত তারা সমুদ্রের জলের ভিতর প্রবেশ করবে আর এমনকি যারা অভক্ত, বিভেদবাদী, সমালোচক, তারাও সরে গিয়ে জলের উপর ভাসমান হবে। কেউ এই বন্যা থেকে পালাতে পারবে না। এই হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভু এবং আমাদের পূর্বতন আচার্যবর্গের বিশেষ কৃপা। প্রকৃতপক্ষে, আমরা শুনেছি যে কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, তিনি কখনোই আশা করেননি যে পাশ্চাত্য দেশের মানুষেরা এই চারটি নিয়ম পালন করবে, তিনি আশা রেখেছিলেন যে তারা কেবল হরে কৃষ্ণ জপ করবে কিন্তু তিনি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন যে এই ভক্তরা আন্তরিক, তারা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এই নিয়ম পালন করছে এবং এতে স্থিতিশীল আছে। তাই তিনি এই আন্দোলনের মধ্যে তাঁর অভিলাষ মত শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। 

শ্রীমদ্ভাগবতম শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর বিভিন্ন অবতারের লীলা মহিমা বর্ণনা করে। সেই সকল অবতার জীবদের উদ্ধার করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন, বিশেষত ভক্তদের উদ্ধারের জন্য এসেছিলেন, অবশ্য অসুরদের দমনও করেছিলেন, তবে বিশেষত ভক্তদের উদ্ধারের জন্য এসেছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তদের উদ্ধার করতে এসেছেন এবং এমনকি অসুরদের আসুরিক মনোবৃত্তি নির্মূল করার মাধ্যমে, তাদেরকেও উদ্ধার করতে এসেছেন । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কত দয়ালু এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে, আসলে তিনি অনুপস্থিত নয়, তিনি এখানেই আছেন। ঠিক যেমন যখন শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে বৃন্দাবন ছেড়ে যাননি, তিনি সর্বদা তাঁর ভাবমূর্তিতে বৃন্দাবনেই ছিলেন। সেইরকমই বৃন্দাবন দাস ঠাকুর আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে — 

যদ্যপি করে লীলা গৌর-রায়
কোনো কোনো ভাগ্যবান দেখিবারে পায়
(চৈতন্য ভাগবত)

এখনও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন লীলা চলছে এবং যিনি অত্যন্ত ভাগ্যবান, তিনি সেই সব দিব্য লীলার দর্শন করতে ও তার সাক্ষী থাকতে সক্ষম হন। শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের কাছে প্রকাশ করেছেন যে এই ইস্‌কন আন্দোলন হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বৃক্ষের একটি শাখা এবং সংকীর্তন আন্দোলন হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলা। 

কখনও কখনও তখনকার সময়ে তারা অত্যন্ত অসাধারণ সংকীর্তন করতেন, অসাধারণ কীর্তন, হরিনাম কীর্তন হত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু, পঞ্চতত্ত্ব বা তখনকার সেই সব মহান পার্ষদ ভক্ত সেই সময় উপস্থিত ছিলেন, সেই কারণে ভক্তবৃন্দ অসাধারণ সাত্ত্বিক ভাব অনুভব করতেন। অনেক সময় শ্রীল প্রভুপাদ প্রকাশিত করতেন যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিভিন্ন নিত্য পার্ষদ আমাদের ইস্‌কন মন্দিরের সংকীর্তনে প্রবেশ করেছেন, রথযাত্রার সময় এবং তারা যে যোগদান করেছে তা কেবল কয়েকজন ভাগ্যবান জীব দর্শন করতে পারতেন, তবে প্রত্যেকে তাঁদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারতেন। 

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- শ্রী শ্রী পঞ্চতত্ত্ব কি!

ভক্তগণ:- জয়! হরিবোল! 

জয়পতাকা স্বামী:- তাই আপনি যখন দিব্য শাস্ত্রগ্রন্থ বিতরণের জন্য যাবেন, তখন আপনারা আনন্দ অনুভব করবেন, আপনারা জানেন না আপনাদের স্কন্ধের দিকে তখন কে তাকিয়ে আছেন। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন যে শ্রীল প্রভুপাদ, শ্রী গুরুদেব, গুরু পরম্পরা তারা আপনার সাথে আছেন। এটি তাঁদের বিশেষ কৃপা যে তারা সংকীর্তন আন্দোলনে যোগদানের সময় ভক্তদের সাথে থাকেন। ভগবানকে স্মরণ করার সব থেকে সহজপন্থা অবশ্য তাঁর নির্দেশাবলী, তার দিব্যলিলা শ্রবণ করা। যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই ধরাধাম থেকে অপ্রকট হয়েছিলেন, সেই সময় সকল ভক্তরা গভীর বিরহে ছিলেন, তখন নরোত্তম দাস ঠাকুর ভেবেছিলেন যে আমাদের এই মহান বৈষ্ণবদের ডাকা উচিত যাতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তগণ সমবেত হয়। এবং তাঁরা ৪৫০ বছর আগে গৌর পূর্ণিমার দিনে এই মহোত্সব উদযাপন করেছিলেন। তিনি তার গুরুভ্রাতা (আপনারা বলতে পারেন তার পিসতুতো ভ্রাতা) শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে গিয়েছিলেন ও তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন যে তিনি যাতে এই মহোৎসবের আয়োজন করেন, যেখানে তিনি শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর শ্রীনিবাস আচার্য নরোত্তম দাস ঠাকুরকে এই বিষয়ে সহায়তা করতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন, তিনি সম্মত হয়েছিলেন, “হ্যাঁ! আমি তোমাকে এই সেবায় সাহায্য করবো।” 

তারপর সেই সন্ধ্যার পরে প্রত্যেকের বিশ্রাম গ্রহণ করছিলেন, তখন শ্রীনিবাস আচার্য চিন্তামগ্ন হয়েছিলেন যে এটি প্রায় অসম্ভব কার্য যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর যে সকল পার্ষদগণ এখনো আছেন, তাদের সকলকে একস্থানে সমবেত করা, কারণ তাঁরা সকলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিরহে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় ছিলেন, তাঁরা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদেরকে উড়িষ্যা এবং বাংলা থেকে নরোত্তম দাস ঠাকুরের শ্রীপাট, খেতুরিতে, এই ধামে নিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন হবে।তিনি ভাবছিলেন যে, “আমি কিভাবে তা করতে পারব? আমি অত্যন্ত নগণ্য জীব, আমি এমন কেউ নই যে এত বরিষ্ঠ বৈষ্ণবদের কাছে এমনকিছু দাবি করতে পারি, তবে আমি এতে সহমত। আমি এখন এই বিষয়ে সত্যই দৃঢ়। সেই সময় ভগবানের কৃপায় তার নিদ্রা আসে এবং স্বপ্নে তিনি একটি দৃশ্য দেখেন যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তার সামনে প্রকট হয়েছেন ও তাকে বলছেন যে, “এটি আমার বাসনা, আমি সবস্থান থেকে বৈষ্ণবদের মহামিলন করাতে চাই, আমার সকল ভক্তদের আমার আবির্ভাব তিথিতে সমবেত হওয়া উচিত। ভয় পেয়ো না! এটি আমার ইচ্ছা যে তারা সকলে একত্রিত হবে। তুমি যাও এবং প্রত্যেককে নিয়ে এসো।এরপর তিনি অপ্রকটিত হন, তারপর শ্রীনিবাস আচার্য জেগে উঠলেন ও সম্পূর্ণ ভাবে বিভোর হয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দ্বারা তিনি সেই আদেশ পেয়েছিলেন। 

তৎক্ষণাৎ তিনি সংবাদ বাহকদের ডাকলেন, তাদেরকে একত্রিত করলেন ও সেই নির্দেশ দিলেন। বিভিন্ন চিঠি লিখলেন, ওড়িশায় শ্যামানন্দ পণ্ডিতকে, খরদহে জাহ্নবা দেবীকে, পানিহাটিতে রাঘব পণ্ডিতের অনুসারীদের, শ্রীখণ্ডের ভক্তদের, কুলিয়া গ্রামের ভক্তদের, ও সর্বত্র চিঠি পাঠালেন। স্বাভাবিকভাবে তখন পূর্বের বিমান বা স্থানান্তরনের জন্য বিশ্ব বিমান ছিল না, কিন্তু তারা কেবল পায়ে হেঁটে, কমপক্ষে দুশ, তিনশ, চারশ, পাঁচশ হাজার মাইল হেঁটে তাদের আধ্যাত্মিক গুরুদেবের বাক্য প্রেরণ করেছিলেন। আসলে সংকীর্তন ভক্তরা এটি থেকে এক বিরাট উৎসাহ, অনুপ্রেরণা নিতে পারে। সেই সময় তাদের আধ্যাত্মিক গুরুদেবের নির্দেশ পূরণের জন্য তাদেরকে পায়ে হেঁটে পাঁচ হাজার কিলোমিটার গিয়ে সেই বার্তা দিতে হয়েছিল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, নদীর মধ্যে দিয়ে সর্বত্র যেতে হয়েছিল, এখন ভক্তদের কেবল সংকীর্তন ভ্যানে করে যেতে হয় বা বিমানবন্দরে যেতে হয় অথবা রাস্তায় গিয়ে, গৃহে গিয়ে বাণী বিতরণ করতে হয়। অর্থাৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় এটি সরল হয়েছে। তখনকার দিনে বাইরে গিয়ে প্রচারের জন্য তারা অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন, এমনকি সংকীর্তন স্থান পাঁচ হাজার মাইল দূরে থাকলেও, তারা যেতেন। সংকীর্তন যজ্ঞ কি! 

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- তারা যখন নিত্যানন্দ প্রভুর স্ত্রী জাহ্নবা দেবীর কাছে পৌঁছালেন, তখন নিত্যানন্দ প্রভু ইতিমধ্যেই অনেক আগে অপ্রকটিত হয়েছিলেন, যদিও তিনি কোন অবশিষ্ঠাংশ রেখে যাননি, তিনি কেবল অপ্রকটিত হয়েছিলেন। জাহ্নবা দেবী ভাবছিলেন যে, “আমি বিধবা হয়ে এতদূর গিয়ে কিভাবে এইরকম একটি উৎসবে যোগদান করবো?” শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর সামনে প্রকঠিত হয়েছিলেন, চৈতন্য মহাপ্রভু প্রকৃটিত হয়ে তাঁকে বললেন যে, “এই মহোৎসব হোক তা আমার ইচ্ছা!” এবং তাঁর নিজ অনুসারীদের সাথে সেখানে যাওয়া উচিত ও সকল বৈষ্ণবদের তার সাথে করে নিয়ে যাওয়া উচিত। তাই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন এবং অন্যরা যেমন অবিরাম ঠাকুর এবং মিনাকেতন রামদাস ও নিত্যানন্দের অন্যান্য পার্ষদবর্গ সকলে সেখানে গিয়েছিলেন, তারা কালনায় গিয়েছিলেন, নবদ্বীপে গিয়েছিলেন আর সেখান থেকেও সকল ভক্তরা সেখানে সমবেত হয়েছিলেন। তারা নবদ্বীপে যান, সেখান থেকে রামাই পণ্ডিত এবং শ্রীবাস ঠাকুরের অন্যান্য ভ্রাতাবৃন্দ সমবেত হয়েছিলেন, তারা ভাবছিলেন যে আমাদের মধ্যে অদ্বৈতের পুত্র অচ্যুতানন্দ নেই, “তার কি খবর? আমরা শান্তিপুরে যেতে পারি।” আর তখনই তিনি সেই সময় এসে সেই দলে যোগ দিয়েছিলেন। 

এইভাবে হাজার হাজার ভক্তবৃন্দ সব স্থান থেকে সেখানে সমবেত হয়েছিলেন, তারা সকলেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অধিষ্ঠিত শিষ্যবৃন্দ বা সেই সময়ের অনুসারীগণ, তারা যখন পদ্ম নদীর কাছে পৌঁছান, যেখানে খেতুরী গ্রাম অবস্থিত, তখন খেতুরির রাজা হাজার হাজার নৌকো পাঠিয়েছিলেন এবং ভক্তদের পদধৌত করে, ললাটে চন্দন দিয়ে, মালা পড়িয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন ও তারপর তারা সেই নদী পার করেছিলেন। 

সেই সময় খেতুরী গ্রাম আনন্দে ভরে উঠেছিল, সকল ভক্তরা গৌর পূর্ণিমা উদযাপনের জন্য এসেছিলেন এবং প্রত্যেক গৃহ আম পত্র, কলা বৃন্ত ও তার সাথে আখ দ্বারা সুসজ্জিত ছিল এবং রাস্তা ধৌত করা হয়েছিল, তারা সুগন্ধি জল দিয়ে রাস্তা ধৌত করেছিলেন। কেবল সর্বত্র সেই দলেদের কীর্তন শুনতে পারবেন, শোনা যাবে যে ভাগবত কথা হচ্ছে, প্রত্যেকে হরি কথা বলছে, গ্রামের সকলে কেবল গৌর পূর্ণিমা সম্পর্কে চর্চা করছে, গৌর পূর্ণিমা!! গৌর পূর্ণিমা!! গৌর পূর্ণিমা!! চৈতন্য মহাপ্রভুর মহোৎসব! সকল ভক্তবৃন্দ সমবেত হয়েছিলেন, তিনি এখান থেকে আসছেন, উনি সেখান থেকে আসছেন, প্রত্যেকে কেবল সেই বিষয়ে চর্চা করছিলেন, আর চৈতন্য মহাপ্রভুর এই গৌর পূর্ণিমার দিব্য মহোৎসবে, বৈকুন্ঠে (আধ্যাত্মিক জগতে) স্থিত ছিলেন। 

সেই সময় গৌর পূর্ণিমার দিনে ভাগবত পাঠে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রকটকালীন লীলা বর্ণিত হচ্ছিল এবং চৈতন্য চরিতামৃত পাঠ হচ্ছিল যে কিভাবে, কখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হয়েছেন, কিভাবে সমগ্র বিশ্ব আনন্দ অনুভব করছিল, কিভাবে গঙ্গায় প্রত্যেকে উচ্চারণ করছিল — হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল! হরিবোল! চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব সম্পর্কে চর্চা করা হচ্ছিল আর কিভাবে সকল পার্ষদদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে, তিনি নবদ্বীপের রাস্তায় নৃত্য করেছিলেন, কিভাবে তিনি সমগ্র ভারতে প্রচার করেছিলেন, সেই সব কিছু চর্চা হচ্ছিল। 

সেই সময় জাহ্নবা দেবী, যিনি অবশ্য ভগবানের নিত্য শক্তি, তিনি কোন সাধারণ বদ্ধ জীব নন, কোন মুক্ত জীব নন, তিনি ভগবানের অন্তরঙ্গ শক্তি। তিনি নরোত্তম দাস ঠাকুরের কাছে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং রাধা কৃষ্ণের শ্রী বিগ্রহ অভিষেকের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। ঠিক যেমন আমরা এখানে কিছু বছর বা দুই বছর আগে এখানে রাধা মাধবের অভিষেক করেছিলাম, আমরাও এই পবিত্র দিনটিতে শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। তাই তখন নরোত্তম দাস, শ্রীনিবাসকে অভিষেক সংযোজিত করতে বললেন, তিনি শ্রীবিগ্রহকে অভিষেক করলেন, সেই দিন ৬ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারপর তিনি অনুমতি গ্রহণ করেন ও তারা শ্রীবিগ্রহের থেকে মহাপ্রসাদ মালা নিয়ে চৈতন্য মহাপ্রভুর যে সকল পার্ষদবর্গ উপস্থিত ছিলেন, তাদেরকে পড়িয়ে দেন। তারপর জাহ্নবা দেবী একজন পার্ষদকে আদেশ দেন যে, “এখন তুমি এই সকল ভক্তদের মালা পড়িয়ে দাও।” 

এইভাবে বরিষ্ঠ ভক্ত, যে সকল পার্ষদবর্গ উপস্থিত ছিলেন, তাদেরকে কনিষ্ঠ ভক্তরা মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন। এইভাবে “দদাতি প্রতি ঘৃণান্তি” “দদাতি” — সকলের সাথে প্রেমময় আদান-প্রদান হয়, বিভিন্ন ভক্তকে সম্মান প্রদর্শন ও একইসাথে একে অপরের সাথে প্রেমপূর্ণ আদান-প্রদান হয়েছিল তারপর জাহ্নবা দেবী আরতি করতে বললেন, তখন শ্রীনিবাস আচার্য, যিনি নরোত্তম দাস ঠাকুরকে সহায়তা করতে সাজ সরঞ্জামের দায়িত্বে ছিলেনতিনি আরতি শুরু করলেন। 

যখন আরতি শুরু হল, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একটি অলৌকিক লীলা করলেন, তিনি সেই দিব্য স্থান থেকে সম্প্রসারিত করতে থাকলেন এবং তার শ্রীমূর্তি থেকে এক সুগন্ধ বিস্তৃত হতে থাকে, সেই সুগন্ধ অত্যন্ত শক্তিশালী, অবিশ্বাস্য দিব্যভাবে পরিপূর্ণ ছিল। আসলে সেই সুগন্ধ কৃষ্ণের শ্রীঅঙ্গের সুবাস, যা শ্রীমূর্তি থেকে ভক্তদের কাছে যেতে থাকে এবং তাদের কাছে যখন এর ঘ্রাণ যায়, [এক পাশে: অবশ্য এটি অমার্জিত দৃষ্টান্ত হবে, তবে আমরা জানি যে কিভাবে যখন রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তখন যদি আপনি এর ঘ্রাণ গ্রহণ করেন, তখন তা এক আলাদা অনুভূতি দেয়। কিন্তু এখানে এটি ঘটছে দিব্যভাবে] যখন কৃষ্ণের সুবাস ভক্তদের কাছে পৌঁছায়, তখন তারা দৃশ্যত সম্পূর্ণভাবে অভিভূত ও সমাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এবং কৃষ্ণের বিরহে তারা উন্মত্ত হয়ে পড়ে, এইভাবে প্রত্যেকে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতশূন্য হয়ে অমৃতসাগরে ভাসতে থাকেন। এইভাবে সেই আরতি অনুষ্ঠানটি এমন ছিল যে কেউ যেন তরল অমৃতের মধ্যে দিয়ে চলছিল এবং সেই কীর্তন এত গভীর ছিল যে প্রত্যেকে এর সাথে তাল মেলাতে পারছিলেন না। তারা কেবল সেই গভীর অমৃতময় হরিনামে ভাসছিলেন, ভগবানের প্রতি গভীর বিরহ অনুভব করে তাদের নিজেদের চুল ধরে টানছিলেন, বুক চাপড়াচ্ছিলেন। 

এরপর জাহ্নবা দেবী . . . যখন সবকিছু স্বাভাবিক হয়, সেই সময় সেই মহান ভক্ত সমাবেশে, জাহ্নবা দেবী. . . আসলে. . . অচ্যুতানন্দ বলছিলেন যে, “আমি নরোত্তম দাস ঠাকুরের কীর্তন শুনতে চাই।” এইভাবে বিভিন্ন ভক্তরা কীর্তন করছিলেন, . . . তাই তিনি বলছিলেন, “এখন আমি নরোত্তমের থেকে শুনতে চাই, ভালো হবে যদি তিনি কীর্তন করেন।” তখন নরোত্তম দাস ঠাকুর কীর্তন করতে শুরু করেন, প্রত্যেকে সম্পূর্ণ সমাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। প্রত্যেকে এত ভাবে বিভোর হয়ে পড়েছিলেন, সেই কীর্তন সর্ব ব্যাপ্তীশীল হয়ে ওঠে ও তখন কেউ শুধু দিব্য নাম শুনতে পারছিলেন, প্রত্যেকে সমাধিস্থ হয়েছিলেন ও বিরহভাবে পরিপূর্ণ ছিলেন। তখন হঠাৎ সব থেকে চমৎকার এক অলৌকিক ঘটনা ঘটলো। পারমার্থিক ভক্ত সমাগমের মাঝে হঠাৎ করে তাঁরা প্রকটিত হলেন, প্রত্যেকেই দেখতে পারছিলেন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু, অদ্বৈত, গদাধর, শ্রীবাস, মুরারি, মুকুন্দ ও সব পার্ষদবৃন্দ প্রত্যেকে প্রকঠিত হয়েছিলেন এবং ভক্তদের সাথে উল্লম্ফন করে কীর্তন করছিলেন, সেই সময় সকলে মহানন্দে বলতে থাকেন, “জয় শচীনন্দন! জয় শচীনন্দন! জয় শচীনন্দন! গৌর হরি! হরি হরি বোল! 

ভক্তগণ:- হরি হরি বোল! 

জয়পতাকা স্বামী:- এইভাবে কীর্তন চলতে থাকে, ঠিক যেমন গোপীরা যখন বিরহ অনুভব করছিলেন তখন কৃষ্ণ প্রকট হয়েছিলেন, তেমনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সকল ভক্তদের বিরহ দূরীভূত করার জন্য প্রকট হয়েছিলেন এবং সেই কীর্তন ব্রহ্মার এক দিন যাবত চলতে থাকে। একইভাবে যদি আমরা আমাদেরকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই সংকীর্তনে সম্পূর্ণ নিমগ্ন রাখি, যেমন শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে আমাদেরকে নিজেদের ভাব সেই স্থিতিতে নিমগ্ন রাখতে হবে। তার বইয়ের প্রত্যেক পৃষ্ঠা, প্রত্যেক নির্দেশ হচ্ছে কিভাবে নিজেদেরকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শুদ্ধ সংকীর্তন আন্দোলনে নিমগ্ন রাখা যাবে। এইভাবে নিমগ্ন চিত্ত যে সকল প্রচারক ছিলেন, তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন। শ্রীনিবাস আচার্য রাজগুরু, বিষ্ণুপুরের রাজার গুরু ছিলেন। নরোত্তম দাস ঠাকুর মণিপুরে প্রচারকদের পাঠিয়েছিলেন আর তিনি পূর্ব বাংলায় প্রচার করেছিলেন। শ্যামানন্দ পণ্ডিত ওড়িশায় প্রচার করছিলেন, এইভাবে সব প্রচারক ভক্তবৃন্দ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে প্রচার করে চৈতন্য মহাপ্রভুর এই আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করছিলেন। আবার পরবর্তীতে তারা একসাথে হয়েছিলেন ও হরি কথা আলোচনা এবং পবিত্র নাম জপ করেছিলেন। তারা চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তনের ভাবে নিবিষ্ট ছিলেন। 

এইভাবে আমরা হয়তো তড়িঘড়ি নরোত্তম দাস ঠাকুর বা অন্যান্যদের মতো এত শুদ্ধ হতে পারব না কারণ অবশ্যই তারা চৈতন্য মহাপ্রভুর নিত্য পার্ষদ, তবে তাদের কৃপায়, শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় সবকিছুই হতে পারে। অন্ততপক্ষে এমনকি যদি আমরা তৎক্ষণাৎ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আমাদের চক্ষু দ্বারা দর্শন করতে নাও পারি, তবে আমরা যদি নিজেদেরকে তার সংকীর্তন আন্দোলনে নিবিষ্ট রাখি, আমরা যদি নিজেদেরকে সেই ভাবে নিমগ্ন রাখি, তাহলে তৎক্ষণাৎ আমরা তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতে পারব, তার থেকে বিরহ অনুভব করতে পারব এবং আমরা যদি সেই অহৈতুকী কৃপা প্রাপ্ত হই, তাহলে তার মানে এটি নয় যে আমরা তাঁকে দর্শন করতে পারব না, কেবল তাঁর সংকীর্তন আন্দোলনে নিজেদেরকে সমর্পণ করার মাধ্যমে ও সমগ্র বিশ্বের প্রতি গ্রামে ও নগরে এই সংকীর্তন বাণী প্রচারের মাধ্যমে আমরাও যথাসময়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর পার্ষদদের ও লীলা দর্শন করতে সক্ষম হব। 

যদিও অচ্যুতানন্দ ছিলেন অদ্বৈতের ৬জন পুত্রের মধ্যে একজন এবং সেই সভায় কেবল তিন জন পুত্র এসেছিলেন। অদ্বৈতের অন্য তিনজন পুত্র আসেননি, কারণ তারা নিজেদেরকে চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনের মূল ধারার অংশ হিসেবে অনুভব করেননি, তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনভাবে সেই উৎসব বা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে সেবা করার দিব্য বাসনা খর্ব হয়েছিলপ্রত্যেকে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর সন্তুষ্টিবিধানের বাসনায় স্থির ছিলেন। একইভাবে আমাদেরও একসাথে হয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সম্পর্কে শ্রবণ করতে হবে। এখানে শ্রীল প্রভুপাদ, রাধামাধব, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সামনে তাদের বিশেষ কৃপা প্রাপ্ত হওয়ার জন্য, যাতে আমরাও চৈতন্য মহাপ্রভুর এই সংকীর্তন মনোভাবে নিমগ্ন হতে পারি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এত মহৎ এবং তাঁর এই আন্দোলন এত মহত্বম যে আমরা এই কলিযুগে খুব সহজেই তাঁর কৃপা প্রাপ্ত হতে পারি। এমনকি যদিও কেউ পতিত হতে পারে, কেউ অত্যন্ত অযোগ্য হতে পারে, তবে তিনিও চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা প্রাপ্ত হতে পারেন, কেবল কৃপা প্রার্থনা করার মাধ্যমে। 

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, আমায় আপনার কৃপা প্রদান করুন। আমাকে কৃপা করুন, আমাকে আপনার সংকীর্তন আন্দোলনে যুক্ত করুন। হে কৃষ্ণ, হে রাধা আমাকে আপনাদের সংকীর্তন আন্দোলনে যুক্ত করুন, আমাকে আপনাদের দিব্য সেবায় নিযুক্ত করুন।”  

এটিই হচ্ছে ভক্তদের প্রার্থনা, তারা সর্বদা এই প্রার্থনা করে। কোনো না কোনোভাবে দৈব যোগে আমরা এই ইস্‌কন আন্দোলনকে বিশ্বের কাছে নিয়ে এসেছি যাতে এই আন্দোলন যাতে সমগ্র বিশ্বকে আশ্রয় প্রদান করে, এটি একটি জাহাজের মত বা সমুদ্রে থাকা আশ্রয়স্থলের মত। সমুদ্র হাঙ্গর, তিমি মাছ, এবং ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ভয়ংকর জিনিস দ্বারা পূর্ণ। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা জাহাজে আছি, আমরা সুরক্ষিত আছি এবং যখনই আমরা এর থেকে বাইরে যাব, তখনই কোন এক ধরনের এই ভয়ংকর প্রাণী দ্বারা আমরা সম্পূর্ণ শেষ হব। পুণ্য ফল লাভের আশা, যৌগিক শক্তি অথবা মুক্তি লাভের আশা, খ্যাতি, সম্মান, পূজা প্রাপ্তির আশা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অনর্থ, সেই জন্য শ্রীল প্রভুপাদ অনুরোধ করেছেন যে আমরা যাতে এই আন্দোলনকে অত্যন্ত পবিত্র, সম্পূর্ণ শুদ্ধ রাখি, যাতে যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনের অমৃত আস্বাদন করতে চায়, তাদেরকে এই সংস্থা আশ্রয় প্রদান করতে পারে। অতএব, এটি আমাদের ওপর এক গুরুদায়িত্ব, আমরা সকল বৈষ্ণবদের কৃপা চাই। বিশেষত আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুদেব শ্রীল প্রভুপাদের (কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য), আমাদের পূর্বতন আচার্যদের, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা দরকার। আমাদের কোনো না কোনোভাবে তাঁদের কৃপা প্রাপ্ত হওয়া উচিত।

এতে কোন সংশয় নেই যে একসাথে কার্য করা একটি তপস্যার মত, কলিযুগে এটি একটি বিরাট তপস্যা। কেউই একসাথে কাজ করতে পারে না। সব দেশ একসাথে কাজ করতে পারেনা, সেই একই দেশে থাকা বিভিন্ন রাজ্য একসাথে কাজ করতে পারে না, পরিবার, দুটি শহর তারা একসাথে কার্য করতে পারে না। দেখুন ক্যালিফোর্নিয়াতে কবে সান ফ্রান্সিস্ক এবং লস এঞ্জেলস আবার একসাথে হবে? তারা একে অপরকে ঘৃণা করে। এরা সব সময় একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে, অস্ট্রেলিয়া, মেলবর্ন এবং সিডনি তারাও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছে, এটি অতিরিক্ত। তাদেরকে তাদের দেশের নগরগুলিকে কোন না কোনভাবে একসাথে রাখতে হবে, এমন কোন পন্থা নেই যে একজন এর কৃতিত্ব পাবে। কানাডাতে তাদের মন্ট্রিল এবং টরন্টো দুটি বড় শহর আছে, তাদের সেটি করতে হবে, অটোয়াতে রাখতে হবে, তাই শহর গুলি তারা একসাথে হতে পারে না। পরিবার, এমনকি তারাও একসাথে থাকতে পারেনা। আমাকে দেখুন। এখনো আপ্পলাচিয়ান পর্বতসমূহে শত বছর ধরে চলছে জাতিবিবাদ নিয়ে লড়াই, এমনকি এখনো তারা . . . বৈষ্ণব সমাজে অদ্বৈত বংশ এবং নিত্যানন্দ বংশ একে অপরের অনুষ্ঠানে যায় না এবং এমনকি পরিবারের স্বামী, স্ত্রী, মাতা, পুত্র, পিতা, কন্যা তারা খুব কমই একত্রিত হয়। তাই এই কলি যুগে একসাথে কার্য করা অত্যন্ত কঠিন। 

শ্রীল প্রভুপাদ একবার চিঠি লিখেছিলেন যে একসাথে কার্য করার একটি রহস্য আছে। (যদি আপনি অত্যন্ত আসক্ত হন, আপনি দেখবেন আসলে যে . . .) তিনি বলেছিলেন যে, একসাথে কার্য করার রহস্য হচ্ছে, ধরুন কেউ একসাথে শ্রী-চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্য সেবা করতে প্রচেষ্টা করছেন। তখন মায়া দেবী বিভিন্ন ধারণা দেবেন এবং একটি মাত্র আশ্রয় হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মে আরো আসক্ত হওয়া। তাই যখন মায়া দেবী বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধি দেবে, তখন ভক্ত সেটি গ্রহণ করবে না, “মায়া দেবী না আমি তোমার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাই না, আমি কেবল চৈতন্য মহাপ্রভুর পরিকল্পনাটি গ্রহণ করতে চাই।তাহলে এমনকি কেউ এই কলিযুগে থেকেও একসাথে কার্য করতে সক্ষম হবে, যা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব, এই কলিযুগে একসাথে কার্য করা, যা কেউ করতে সক্ষম নয়। শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে সেই বিশাল কার্য করার পরীক্ষা দিয়েছেন যে, “আমার অনুসারীরা, যারা আমাকে সত্যই ভালোবাসে, তার প্রমাণ হচ্ছে তারা একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে চলবে, তারা একে অপরের সাথে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রসারের কার্য সম্পাদন করবে।” এটিই হচ্ছে প্রেমের বোঝা।

এটি হচ্ছে তপস্যা, এটি প্রত্যেকের জন্য — আশ্রমে থাকা ব্রহ্মচারী যিনি চিন্তিত যে গত রাতে তার জামা চুরি হয়ে গেছে এবং অন্য ব্রহ্মচারীদের তিনি পছন্দ করেন না, বা সেই ব্যক্তি যার জুতো চুরি হয়ে গেছে, গৃহস্থদের ক্ষেত্রে যাদের মাত্র বিবাহ হয়েছে – তা দেখাশোনা করে হয়েছিল এবং এরপর ছয় মাস ধরে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে কথা বলে না, তারা তাদের গুরুদেবের কাছে গিয়ে বলে সেই সম্পর্ক শেষ, মন্দিরে থাকা ভক্তরা যারা মন্দির অধ্যক্ষকে পছন্দ করে না, যিনি সর্বদা তারা যেমন চায় তার থেকেও ১৫ মিনিট আগে ওঠার জন্য তাদের উপর চিৎকার করে, সংকীর্তন আন্দোলনের ভক্তরা এবং সেইসব ভক্তরা যারা মন্দিরের সেবা করে, তাদের যেন একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উৎসাহ থাকে। ভক্তরা যারা গ্রন্থ মুদ্রণ করে এবং যারা গ্রন্থ লেখে, যারা সেটি শুনতে আসে ও সেই সব গ্রন্থের শিক্ষা পড়ে বা বিভিন্ন নেত্রীবৃন্দ — তারা সকলে একে অপরকে বৈষ্ণব হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করুন এবং  শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রীতিবিধান করতে চেষ্টা করুন। 

এটিই হচ্ছে এই আন্দোলনে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য যে আমরা শচীসুতর যা প্রিয় সেটি করতে চাই, আর যা কিছু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রীতিবিধান করে, আমরা সেটি গ্রহণ করতে চাই ও যা কিছু তাঁকে অসন্তুষ্ট করে, সেটি আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমরা কিভাবে জানবো যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কি চান? প্রভুপাদ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, পরবর্তী ১০,০০০ বছরের জন্য এই ইস্‌কন আন্দোলন প্রভুপাদের শিক্ষা নিয়ে চলবে, যাতে আমরা জানতে পারি যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদেরকে দিয়ে কি কার্য করাতে চান, যার দ্বারা তিনি প্রসন্ন হবেন। যদি আমরা তাতে স্থির থাকি তাহলে আমরা এত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমাদের ভক্তিমূলক সেবাভাব বজায় রাখতে পারব, সর্বদাই কিছু বাধা বিপত্তি থাকবে, এমনকি আমরা যদি বাধা-বিপত্তি না চাই, তবুও তা আমাদের কাছে আসবে। যদি আমরা তা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি, তাহলেও সেটি অনিবার্য। ঠিক যেমন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধ এড়ানোর জন্য কত প্রয়াস করা হয়েছিল, কিন্তু অবশেষে তা এড়ানো যায়নি। ঠিক তেমনি ভক্তরা সর্বদা যে কোন ধরনের কঠিনতা, যে কোন বাধা বিপত্তি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে ও সংকীর্তন আন্দোলনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে। কিন্তু ঠিক যেমন চাঁদ কাজী এসে সংকীর্তন আন্দোলন বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, ঠিক যেমন বিভিন্ন নিন্দুকরা চৈতন্য মহাপ্রভুর এই আন্দোলন অনুসরণ করার প্রতি সাধারন মানুষদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল তেমন। যারা অত্যন্ত অদমনীয় ছিল, তারা হরে কৃষ্ণ জপ করেছিল, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এমনভাবে কার্য করেছিলেন যা তাদের বোধগম্যতার বাইরে।

প্রকৃতপক্ষে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন কৃষ্ণ এবং আমরা কৃষ্ণকে অনুকরণ করতে পারি না। আমাদের তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে, একইভাবে শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে অনুকরণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন, বলেছেন অনুসরণ করতে। তিনি হচ্ছেন আমাদের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য, তিনি ইস্‌কনের একজন আচার্য, কিন্তু তিনি আমাদেরকে বলেছেন যে আমরা যাতে অনুকরণ না করে, তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করি। তাই আমরা যাতে একসাথে কার্য করার এবং তাঁর নির্দেশ পালন করার চেষ্টা করি, সেটি আমাদের লক্ষ্য। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথিতে আমাদের নিজেদের এই সংকল্পে স্থির হওয়া উচিত যে, যা কিছু চৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীল প্রভুপাদ ও আমাদের পূর্বতন আচার্যদের প্রীতিবিধান করে, আমরা সেই সব কিছু করতে প্রস্তুত থাকবো। যদি আমরা এই একটি কার্য করতে পারি, তাহলে আমরা মায়ার সব ধরনের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকবো। 

জয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি-গৌর-ভক্তবৃন্দ

ভক্তগণ:- জয়! 

জয়পতাকা স্বামী:- এবং যেমন আমি আগে পরিক্রমায় উল্লেখ করেছিলাম যে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে মায়াপুর থেকে সংকীর্তন আন্দোলনের বন্যা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা নিয়ে সমগ্র জগতকে প্লাবিত করবে। প্রত্যেকের সমগ্র বিশ্বের কোণায় কোণায় এই সংকীর্তন ভাব নিয়ে যাওয়া উচিত, দৃঢ় হওয়া উচিত যে কোনভাবে এই সংকীর্তন আন্দোলন হ্রাস প্রাপ্ত হতে দেওয়া যাবে না। এটিকে বৃদ্ধি করতে হবে। ঠিক যেমন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা সমুদ্র সর্বদা বিস্তৃত, সেই রকমই সংকীর্তন আন্দোলনও সর্বদা বিস্তারিত হতে হবে, সর্বত্র এই পবিত্র নাম প্রচার প্রসার করতে হবে — 

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।

আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ! 

ভক্তগণ:- জয়! হরিবোল! 

ভক্ত:- শ্রীল আচার্যপাদ কি!

ভক্তগণ:- জয়! 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী (23/6/2023)
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions