Text Size

১৯৮২০৩১২ শ্রীমদ্ভাগবত ৮.১১.৮

12 Mar 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|Kolkata, India

নিম্নোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ১২ মার্চ, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ, কলকাতা ভারতে দিয়েছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৮ম স্কন্ধ, ১১ অধ্যায়, শ্লোক 8 পাঠের মাধ্যমে ও এর সাথে ‘বৈষ্ণব কে?’ গ্রন্থের ৭ - ৯ শ্লোকসমূহের পাঠ বহাল রাখা হয়েছে।

তৎ—অতএব; ইদম্—এই জড় জগৎ, কাল-রশনম্—কালের প্রভাবে গতিশীল; জগৎ—চলমান (ব্রহ্মাণ্ড); পশ্যন্তি—দর্শন করে; সূরয়ঃ—তত্ত্বজ্ঞানের প্রভাবে বিবেকবান; ন—না; হৃষ্যন্তি—হরষিত হন; ন—না; শোচন্তি—শোক করেন; তত্র—এই প্রকার; যূয়ম্—তোমরা সমস্ত দেবতারা; অপণ্ডিতাঃ—অনভিজ্ঞ (কারণ তোমরা ভুলে গেছ যে, তোমরা কালের অধীনে কর্ম করছ)।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক অনুবাদ:

কালের গতি দর্শন করে বিবেকী ব্যক্তিরা বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য হরষিত হন না অথবা শোক করেন না। তাই, তুমি যেহেতু তোমার জয়ের কারণে হরষিত হচ্ছ, তাই তোমাকে খুব একটা বিচক্ষণ বলে মনে হয় না। 

তাৎপর্য: বলি মহারাজ জানতেন যে, দেবরাজ ইন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী, এমন কি তাঁর থেকেও অধিক শক্তিশালী ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও, বলি মহারাজ ইন্দ্রকে অনভিজ্ঞ বলে তিরস্কার করে যুদ্ধে আহ্বান করেছিলেন। ভগবদ্গীতায় (২/১১) শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তিরস্কার করে বলেছিলেন—

অশোচ্যানন্বশোচত্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে।
গতাসুনগতাসূংশ নানুশোচন্তি পণ্ডিতাঃ॥

“পরমেশ্বর ভগবান বললেন—তুমি প্রাজ্ঞের মতো কথা বলছ, অথচ যে বিষয়ে শোক করা উচিত নয় সেই বিষয়ে শোক করছ। যাঁরা যথার্থই পণ্ডিত, তাঁরা কখনও জীবিত অথবা মৃত কারও জন্যই শোক করেন না।” এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ যেমন অর্জুনকে তিরস্কার করে বলেছিলেন যে, তিনি পণ্ডিত নন, তেমনই বলি মহারাজও ইন্দ্র এবং তাঁর পার্ষদদের তিরস্কার করেছিলেন। এই জড় জগতে সব কিছুই সম্পাদিত হয় কালের প্রভাবে। তার ফলে, সব কিছু কিভাবে সম্পাদিত হচ্ছে তা দর্শন করেন যে বিজ্ঞ ব্যক্তি, তার জড়া প্রকৃতির তরঙ্গে দুঃখিত হওয়ার অথবা সুখী হওয়ার কোন প্রশ্ন ওঠে না। যেহেতু আমরা এই তরঙ্গের দ্বারা প্রবাহিত হচ্ছি, তাই হরষিত হওয়ার অথবা বিষণ্ণ হওয়ার কি অর্থ হতে পারে? যিনি প্রকৃতির নিয়ম সম্বন্ধে অবগত, তিনি কখনও প্রকৃতির কার্যকলাপে হরষিত হন না বা বিষণ্ণ হন না। ভগবদ্গীতায় (২/১৪) শ্রীকৃষ্ণ সহিষ্ণু হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন—তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত। শ্রীকৃষ্ণের এই উপদেশ অনুসারে মানুষের কর্তব্য অবস্থার পরিবর্তনে সুখী অথবা দুঃখিত না হওয়া। এটিই হচ্ছে ভক্তের লক্ষণ। ভক্ত কৃষ্ণভাবনায় তাঁর কর্তব্য পালন করেন এবং বিষম পরিস্থিতিতেও কখনও অসুখী হন না। তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে যে, সর্ব অবস্থাতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের রক্ষা করেন। তাই ভক্ত কখনও তাঁর কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুত হন না। হরষিত এবং বিষণ্ণ হওয়ার জড় গুণ উচ্চতর স্বর্গলোকে অবস্থিত দেবতাদের মধ্যেও রয়েছে। তাই, কেউ যখন জড় জগতের তথাকথিত অনুকূল অথবা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিচলিত হন না, তখন তিনি ব্রহ্মভূত স্তর লাভ করেছেন বা আত্ম-উপলব্ধি লাভ করেছেন বলে বুঝতে হবে। ভগবদ্গীতায় (১৮/৫৪) উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি—“যে ব্যক্তি ব্রহ্মভূত স্তর প্রাপ্ত হন, তিনি পরমব্রহ্মকে উপলব্ধি করে সর্বতোভাবে প্রসন্ন হন।” কেউ যখন জড়-জাগতিক পরিস্থিতির দ্বারা বিচলিত হন না, তখন বুঝতে হবে যে, তিনি জড়া প্রকৃতির তিনগুণের অতীত চিন্ময় স্তর প্রাপ্ত হয়েছেন। 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এখানে আমরা দেখছি কিভাবে বলি মহারাজ, প্রহ্লাদ মহারাজের পৌত্র, যদিও তিনি অসুর কূলে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন অসুরদের রাজা, তবুও তার এই জড়জগতের দুঃখ কষ্ট বা সুখের কারণ সম্বন্ধে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আছে। 

একবার শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে তাঁর সাথে গাড়িতে করে মায়াপুরে নিয়ে আসছিলেন এবং তাঁর গাড়ির সামনে তিনি একটি কৃষ্ণ বলরামের ছবি রাখতেন। তারপর তিনি বললেন যে, এই হচ্ছে কৃষ্ণ এবং বলরাম। তাঁরা হচ্ছে... তিনি আসলে ২টি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন। প্রথম প্রশ্নটি তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, “কে বেশি শক্তিশালী — কৃষ্ণ নাকি বলরাম? কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম নাকি স্বয়ং কৃষ্ণ?” সেই ছবিতে বলরাম শ্রীকৃষ্ণের কন্ধের উপর হাত রেখেছিলেন, সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেহেতু বলরাম কৃষ্ণের থেকে উন্নতকায়।

কেউ কি এর উত্তর জানে?

ভক্ত: প্রভুপাদ বলেছেন যে কৃষ্ণ… 

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: তুমি ইতিমধ্যেই জানো। অন্য কেউ... কোন নতুন ভক্ত?

ভক্ত: কৃষ্ণ।

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: কৃষ্ণ? কেন?

ভক্ত: বলরাম তাঁর হাত কৃষ্ণের উপর রেখেছেন এবং কৃষ্ণ বলরামকে ধারণ করে আছেন।

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: হ্যাঁ! বলরাম গ্রহমণ্ডলি ধারণ করে আছেন, কিন্তু কৃষ্ণ বলরামকে ধারণ করে আছেন। শ্রীল প্রভুপাদ এটি বলেছিলেন কারণ যেহেতু বলরামের শ্রীহস্ত শ্রীকৃষ্ণের কন্ধের উপর ছিল। কিন্তু যাই হোক না কেন, এটাই হচ্ছে তত্ত্ব যে কৃষ্ণ হচ্ছেন বলরামের মূল কারণ। তখন হঠাৎ করে শ্রীল প্রভুপাদ পিছনের দিকে হেলান দিলেন এবং তিনি বললেন যে, এই জগতে ভালো এবং মন্দ আছে। আর এই দুইয়ের মধ্যে সব সময় লড়াই হচ্ছে। কখনো কখনো ভালো জয়লাভ করে এবং কখনো কখনো মন্দ জয়লাভ করে, কিন্তু কৃষ্ণ এবং বলরাম হচ্ছেন এইসবের থেকে ভিন্ন। তারা না ভালোর দিকে না মন্দের দিকে, তারা হচ্ছেন দিব্য এবং কৃষ্ণের ভক্তরাও কৃষ্ণ বলরামের সঙ্গে আছেন, তাই তারাও এই দুইয়ের কোন দিকেই নেই। তাই কখনো কখনো এটা হয়ত দেখা যায় যে ভক্ত হয়ত ভালোর দিকে আছেন, এটাও শ্রীলা প্রভুপাদেরই নির্দেশ, কিন্তু আসলে ভক্ত কেবল কৃষ্ণের হয়ে কার্য করছেন। ভক্তের দ্বারা না ধার্মিক কার্য হচ্ছে না অধার্মিক কার্য হচ্ছে আর না পাপ কার্য হচ্ছে। দুটি নিষিদ্ধ বিষয় হচ্ছে — পাপ এবং পুণ্য। কোন ব্যক্তির না পুণ্য কর্ম করা উচিত আর না পাপকর্ম করা উচিত। 

এখানে ইন্দ্র তার নিজের উন্নতি, তার স্বর্গলোক বজায় রাখার জন্য যুদ্ধ করছিল, যা খুব একটা পান্ডিত্যপূর্ণ কার্য নয়। তাই বলি মহারাজ, অবশ্য বাহ্যিকভাবে তিনিও সেই একই উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করছিলেন, কিন্তু তিনি অধিক তত্ত্বগত দিক সংযোজন করেছিলেন, তিনি কিছু কৃষ্ণভাবনাময় তত্ত্ব সংযুক্ত করেছিলেন যে—সবশেষে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম নিয়ন্তা। তাই, একজন ভক্তের মানসিকতা কি আছে, সেটা তিনি কি করছেন তার থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য এমন কিছু নির্দিষ্ট বিষয় আছে যা করা নিষিদ্ধ, কারণ সেটা আমাদের মনে প্রভাব ফেলে। তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে আমাদের নিজেদের চেতনা যথার্থ অবস্থায় থাকতে হবে। সেটাই হচ্ছে সবকিছুর লক্ষ্য। 

আমরা মাছ, মাংস, ডিম, পিঁয়াজ, রসুন খাওয়া, নেশা করা, দূত ক্রীড়া করা বা অবৈধ সম্বন্ধ করা থেকে এড়িয়ে চলি কারণ এগুলি আমাদের চেতনায় প্রভাব ফেলে। সেইসব আমাদের চেতনাকে কলুষিত করে। একইভাবে প্রজল্প করা এবং অন্যান্য কিছুও চেতনাকে দূষিত করে। সেইজন্য আমাদেরকে এমনভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে হয়ত আমাদের চেতনা সহজেই কৃষ্ণের দিকে উদ্দিষ্ট হবে। প্রভুপাদ আমাদেরকে বর যাত্রী এবং মাঝির নদী পার করা ও তার দাঁড় টানার কাহিনী বলেছেন। সেই নৌকের নোঙ্গর একপাশে আটকানো ছিল, তাই তারা কোথাও যেতে পারেনি। তাই, আমাদের চেতনার নোঙ্গর যদি শ্রীগরু এবং গৌরাঙ্গের শ্রীপাদপদ্মে নিবন্ধিত থাকে, তাহলে তা আমাদেরকে কৃষ্ণের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আর যদি আমাদের চেতনার নোঙর জাগতিক জীবনের পঙ্কিলে নিবন্ধিত থাকে, তাহলে এমনকি আমরা যদি এটা দেখাই যে আমরা কৃষ্ণের দিকে ফিরে যাচ্ছি, তবুও আমরা এগিয়ে যেতে পারব না।

এটি আমাদের পূর্ববর্তী আচার্যদের দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে কেন পবিত্র নাম জপ অন্যান্য যুগের সময় কার্যকরী ছিল না। আমি বলতে চাইছি, এটা সব সময় বলবৎ কিন্তু কেন বিশেষত এই কলিযুগে এটা সক্রিয়? কারণ হচ্ছে অন্যান্য যুগে, আপনি দেখবেন, নাম জপের সাথে সাথে কোন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই কিছু অপরাধ করে এবং সেই জন্য সেই সব অপরাধ নাম জপের প্রভাবকে নাকচ করে দেয়। এইভাবে যদি কেউ অপরাধ যুক্ত নাম করে, তাহলে তিনি হয়ত লক্ষ লক্ষ জনম ধরে জপ করতে পারে, কিন্তু তবুও তিনি কৃষ্ণের কাছে ফিরে যেতে পারবেন না। তবে এই কলিযুগে চৈতন্য মহাপ্রভু তিনি এত কৃপালু যে তিনি কোন অপরাধ গ্রহণ করেন না। এই কারণে আমরা — ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ নাম করার পূর্বে চৈতন্য মহাপ্রভু এবং পঞ্চতত্ত্বের নাম করি, কারণ তাঁদের কৃপায় সব অপরাধ ধুয়ে যাবে। এই জন্য আমরা বৃন্দাবন যাওয়ার পূর্বে মায়াপুরে যাই। মায়াপুর যাওয়ার মাধ্যমে কেউ তার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রাপ্ত হয়। এবং তারপর কেউ সহজেই বৃন্দাবনের অর্চন করতে পারে। যাইহোক, এমনকি চৈতন্য মহাপ্রভুও অনুরোধ করেছেন বৈষ্ণব অপরাধ না করতে। এই হচ্ছে একটি অপরাধ যা এমনকি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সহ্য করতে পারেন না। এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদেরকে এমন এক সুযোগ দিয়েছেন, যেখানে তিনি আমাদেরকে অনুরোধ করেছেন যে ভক্তিমূলক সেবার কোন আগাছা যেন আমাদের হৃদয়কে গ্রাস না করে নেয়, কারণ তাহলে প্রকৃত ভক্তিলতা, যাতে চৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপায় জলসিঞ্চিত হচ্ছে, তা নিঃশেষিত হবে এবং বিকাশ ক্ষান্ত হবে।

এই প্রসঙ্গে আমরা একটি কবিতা থেকে পড়ছি যা শ্রীল প্রভুপাদ বারংবার আমাদের কাছে “দুষ্ট মন! তুমি কিসের বৈষ্ণব?” বলে উদ্ধৃতি করেছেন, এটি ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের বিরচিত। আমরা পুরোটা কবিতাই শেষ করে ফেলেছি, কেবল ৭, ৮ ও ৯ নম্বর শ্লোক বাকি আছে। সেগুলি আজকের এই শ্লোকের সাথে মানানসই।

মূলত আপনাদেরকে প্রস্তাবনা বলছি, ভক্তিসিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করছেন, কিভাবে যে ভক্ত চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনের সঙ্গ ছেড়ে বেরিয়ে যায় ও স্বাধীনভাবে পূজা বা অন্যান্য কার্য করে, তা দেখে এমনকি ভক্তিমূলক সেবা বলে মনে হলেও, আসলে সেই ব্যক্তি তার নিজের মিথ্যে প্রতিষ্ঠার পিছনে লালায়িত ও সে এই সব কিছু মিথ্যে অহংকারবশত করে। তিনি মূলত ব্যাখ্যা করছেন যে, অনেক ধরনের অহংকার আছে যা আমাদের চেতনাকে আক্রমণ করতে পারে, যখন আমরা ভক্তিপথে প্রবেশ করি। তিনি আমাদেরকে অর্থ এবং ধন-সম্পত্তির বিপদ থেকে সতর্ক করেছেন যে, এমনকি যদি আমরা ভক্তদের সঙ্গ পরিত্যাগ করি ও দেখাই যে আমরা অধিক উন্নত ভক্ত, তবু তখনও পর্যন্ত আমাদের মন হয়ত স্ত্রীসঙ্গ, ধন-সম্পদ এবং ইন্দ্রিয়তৃপ্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়। সেই জন্য এমন কিছু করার কোন ব্যবহারিকতা নেই।

হরিবোল! জয় রাধা গোবিন্দ! জয় জগন্নাথ সুভদ্রা বলরাম! 

এরপর তিনি আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন যে, কেউ তার নিজের খ্যাতি আকাঙ্ক্ষা করলে, তখন আমরা ঠিক রাবণের মত হয়ে উঠি, যে সব সময় রামের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল এবং যাকে অবশেষে শ্রীরাম হত্যা করেছিলেন। তিনি আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন যে প্রকৃত খ্যাতি হচ্ছে একজন বৈষ্ণব হওয়া, দাসানুদাস হওয়া। ও সেই জন্য আমাদেরকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে এবং আমরা যদি কেবল একজন বৈষ্ণবের দাসানুদাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সেই মনোভাব নিয়ে কৃষ্ণের সেবা না করি, তাহলে আমরা কেবল আমাদের সকল পূজার্চনা দিয়ে রৌরব নামে পরিচিত যমলোকেই উন্নীত হব।

এরপর তিনি আমাদেরকে আরও উপদেশ দিয়েছেন যে, কেউ যদি তার নিজস্ব প্রতিপত্তি কামনার এই দুঃখ দুর্দশা ভোগ করতে থাকে, তাহলে সে শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ওঠে।  এবং সেই জন্য তিনি উপদেশ দিয়েছেন যে আমাদের কখনও গর্বিত হওয়া উচিত নয় বা আমাদের স্থিতিতে থেকে নিজেদের পদ বা সম্মান আশা করার প্রতি বিশ্বাসী হওয়া উচিত নয়, কারণ এর ফলে অন্যান্য বৈষ্ণবদের প্রতি অসম্মান ভাব আসে। শুদ্ধ ভক্তদের স্বাভাবিকভাবেই দাসানুদাস হওয়ার সবথেকে উন্নত পদ লাভের বাসনা থাকে এবং সেই বাসনার পিছনে কোন জড় জাগতিক স্পর্শ মাত্র নেই, শ্রীকৃষ্ণের সাথে সেই শুদ্ধ সম্পর্কে এমনকি জড়জাগতিক স্বাদগন্ধের স্পর্শ মাত্র নেই। অন্যদিকে, নিজেকে উন্নত করার জড়জাগতিক ইচ্ছা ঠিক এক চণ্ডালীর মত, তা এক পিশাচী, যা আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার বা নির্জনে ভজন করার ইচ্ছার মত তার জালে আটকে ফেলে। তাই আমাদের জানা উচিত যে এই দুটোই — একজন বৈরাগী ভক্ত হয়ে ওঠার ইচ্ছা বা একজন মহান ভক্তের মতো চলেগিয়ে, অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভজন করার ইচ্ছা — এই দুটিই হচ্ছে মায়ার ভিন্ন নারকীয় স্থিতি। এই হচ্ছে ভূমিকা। 

বৈষ্ণব কে?
শ্লোক ৭ 
‘কীর্তন ছারিব,           প্রতিষ্ঠা মাখিব’
কী কাজ ঢুরিয়া তাদৃশ গৌরব।
মাধবেন্দ্রপুরী,            ভাব-ঘরে চুরি,
না করিল কভু সদাই জানব ।।

কীর্তন ছারিব — সংকীর্তন আন্দোলন ছেড়ে দেওয়া, এটি গ্রহণ করার জন্য, আক্ষরিক অর্থে  নিজের প্রতিষ্ঠা লাভের বাসনার দ্বারা নিজেকে অভিষিক্ত করার জন্য। নিজের জড়জাগতিক পদ লাভকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হলে, তা কেবল এক অতি লজ্জা ও অনুশোচনার বিষয়।

মাধবেন্দ্রপুরী তার নিজের প্রতিষ্ঠা এড়িয়ে চলার জন্য মানুষের ভিড় থেকে দূরে পালিয়ে যেতেন। যদি কেউ নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষদের থেকে দূরে যাওয়ার এই বিষয়ের মিথ্যা নকল করে, তাহলে সেটা হচ্ছে কেবল এক প্রতারণা। মাধবেন্দ্রপুরী আন্তরিক ছিলেন, তিনি তত্ত্বগতভাবে সর্বোচ্চ ভাবযুক্ত হয়ে জীবনযাপন করছিলেন। এই বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই যে, শ্রীকৃষ্ণ মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন, যা শ্রীল প্রভুপাদ, ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের দ্বারা সমগ্র বিশ্বের কাছে প্রচার করা হয়েছে, সেটি এক মহান বিজ্ঞান এবং কোন ব্যক্তিই মহান ভক্তদের নকল করতে পারেন না। তারা ভগবানের নিত্যপার্ষদ, যারা নিম্মে এসেছেন ও সংকীর্তন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। তাই তাদেরকে সেই সমস্ত উন্নত বৈষ্ণবদের নকল না করে ও তাদের নির্দেশ এড়িয়ে না চলে গুরুপরম্পরার নিয়ম পালন করতে হবে, শিষ্য-পরম্পরার মাধ্যমে যে নির্দেশ ধারাবাহিকক্রমে নেমে এসেছে তা গ্রহণ করতে হবে। ঠিক যেমন ভক্তিবিনোদ ঠাকুর, তিনি ভক্তিসিদ্ধান্ত স্বরস্বতী ঠাকুরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তাঁর উচিত সবসময় প্রচার করা, মায়াপুরের বিকাশ করা, গ্রন্থ বিতরণ করা, গ্রন্থ মুদ্রণ করা। তিনি বলেছিলেন, “কোন নির্জন ভজন করবে না। কোথাও চলে গিয়ে নির্জনে সেবা করার মাধ্যমে সবকিছু নষ্ট করবে না।” এই হচ্ছে শেষ নির্দেশ যা ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরকে দিয়েছিলেন যে, “নির্জনে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেবা করবে না।” একইভাবে সেই একই নির্দেশ ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর দিয়েছেন, তিনিও এই নির্দেশ দিয়েছেন যে—প্রত্যেকের একসাথে সহযোগিতা করে থাকা উচিত এবং গভর্নিং বডি কমিশন-এর অধীনে একসাথে থেকে গৌড়ীয় মিশন পরিচালিত হওয়া উচিত।

ভক্তিসিদ্ধান্তের অপ্রকটের পর শ্রীল প্রভুপাদ, ভক্তিবেদান্ত স্বামী ওঁনার শ্রদ্ধাঞ্জলিতে তিনি তার অপ্রকটের পর গৌড়ীয় মিশনের পরিস্থিতি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন যে—ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের নির্দেশ অনুযায়ী গভর্নিং বডি করা ও সেইমতো কাজ করার পরিবর্তে, তারা নকল করছে ও আবার তিনি যেমন একজন আচার্য ছিলেন, তেমন একজন আচার্য তৈরি করেছেন। তিনি বলেছেন যে নকল করার ফলে আমরা নরকে যাব। তাঁর নির্দেশ পালন করলে, আমরা মহিমান্বিত হব।” এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, শ্রীল প্রভুপাদ ঠিক ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মনোভাব অনুবর্তন করেছেন। তেমনই আমাদেরও এই সংকীর্তন আন্দোলন গ্রহণ করা উচিত যে এই হচ্ছে চৈতন্য মহাপ্রভুর আদেশ, এই হচ্ছে আমাদের পরম্পরার মহান আচার্যদের দৃষ্টান্ত, যে সমস্ত ভক্তরা এই সংকীর্তন আন্দোলনে আছেন, তা করার মাধ্যমে নিত্যভাবে প্রকৃত প্রতিষ্ঠা এবং প্রকৃত খ্যাতি বা প্রকৃত পদ তাদেরকে প্রদান করা হবে। 

কোন ব্যক্তি যদি সংকীর্তন, চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন, একত্রে মিলে প্রচারকার্য পরিত্যাগ করে, তার মানে হচ্ছে সেটা কেবল তার নিজের প্রতিষ্ঠা লাভের বাসনার জন্য, মিথ্যা অহংকারের জন্য এবং এটিকে বলা যেতে পারে মাধবেন্দ্রপুরীর অতি হীন নকল করা। কোন ব্যক্তির মাধবেন্দ্রপুরীকে নকল করা উচিত নয়। কোন ব্যক্তির আসলে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করা উচিত যে, তিনি ভগবানকে সন্তুষ্ট করার জন্য সবকিছু দিয়েছিলেন, যখন ভগবান তাকে বলেছিলেন যে তার রেমুনাতে থাকা উচিত, তিনি সেই আদেশ গ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানেই ছিলেন। অবশেষে, ভগবান যাই নির্দেশ দেন, এমনকি যদি তা প্রথমদিকে অপ্রীতিকর মনে হয়, তবুও তা আমাদের গ্রহণ করা উচিত। আমাদের ষড় গোস্বামীগণের ও মাধবেন্দ্রপুরীর তথাকথিত দৃষ্টান্ত নকল করা উচিত নয়, কারণ সেই নকল প্রকৃত নকল নয়। এটা হচ্ছে কৃত্রিমভাবে নকল করা। 

ষড় গোস্বামীগণ সমগ্র গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের জন্য কত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তারা বৃন্দাবনের কত পবিত্র স্থানসমূহ উদঘাটন করেছিলেন এবং যদি কেউ কেবল তাদের নকল করে, যেমন তারা কেবল একটি গাছের তলায় এক রাত্রি থাকতেন, বৃন্দাবনে দৌড়ে যেতেন, তাহলে সেগুলি মন্দভাবে নকল করা। না তারা এটা যথাযথভাবে করতে পারবে, আর না এটা প্রকৃত নকল, কারণ এটা কি সত্যিকারেই তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করায়? কারণ তারা বৃন্দাবনের স্থানসমূহ উদঘাটনের মাধ্যমে, তাদের বৈষ্ণব গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে, পরম সত্যরূপে কৃষ্ণের পূজা করার মাধ্যমে প্রচার প্রসার করছিলেন ও তারা সমগ্র বিশ্বকে পরিশুদ্ধ করেছিলেন। আমাদের আছে এই উদাহরণ আছে যে জীব গোস্বামী ও গোপাল ভট্ট গোস্বামী, রঘুনাথ দাস গোস্বামী, যারা তখন ছিলেন যখন চৈতন্যচরিতামৃত এবং অন্যান্য গ্রন্থ সংকলন করা সম্পন্ন হয়েছিল, তারা নরোত্তম দাস ঠাকুর, শ্রীনিবাস আচার্য, শ্যামানন্দ প্রভু ও অন্যান্যদেরকে এই গ্রন্থ নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন, বৃন্দাবন ছেড়ে চলে গিয়ে সর্বত্র বৈষ্ণব জগতে তা প্রচার করতে বলেছিলেন। যদিও তারা ছিলেন নিত্য মুক্ত জীব, নিত্যপার্ষদ, তবুও তারা নিম্নে অবতীর্ণ হয়ে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। তারা বৃন্দাবনে ছিলেন না। শ্রীনিবাস আচার্য ও অন্যান্যরা, নরোত্তম দাস ঠাকুর, তারা এই সমস্ত শাস্ত্রগ্রন্থ নিয়ে পূর্ব ভারতে গ্রন্থ প্রচারের জন্য গিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন। এমনকি যদি কেউ কোন নির্জন স্থানে থাকতে পছন্দ করেন, যদি তা ভগবানের ইচ্ছা না হয়, তাহলে তিনি তা করেন না, তিনি প্রচারসহ সংকীর্তন করেন। জয়!

শ্লোক ৮
তোমার প্রতিষ্ঠা, —    শূকরের বিষ্ঠা’,
তার-সহ সম কভু না মানব। 
মৎসরতা-বশে,           তুমি জড়রসে,
মজেছ ছাড়িয়া কীর্তন-সৌষ্ঠব।। 

এখন এটা মনকে বলা হচ্ছে। মনে রাখুন এই কবিতা মনের জন্য। ‘তোমার প্রতিষ্ঠা’ — তোমার গুরুত্ব হচ্ছে শুকরের বিষ্ঠার মতো এবং এইভাবে চিন্তা করলে তা এমনকি প্রকৃত মানুষের স্তরেও নয়, তা কেবল বিভিন্ন ধরনের ঈর্ষার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন তুমি দৃঢ়ভাবে জাগতিক ভাবনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এখন তুমি সংকীর্তনের প্রকৃত অমৃত ত্যাগ করে এই ভ্রম আস্বাদন করছ। 

এই প্রসঙ্গে বলি, মন হচ্ছে চঞ্চল। মন যেখানে খুশি যেতে পারে, যদি আপনি তা নিয়ন্ত্রণ না করেন, এমনকি একজন ভক্ত হয়ত জাগতিক প্রভাব সম্পন্ন ভাবনাগুলোর কথাও বিবেচনা করেন ও মানসিক স্তরে তার নিজের গুরুত্বের কথা চিন্তা করেন, “আমি একজন পুরাতন ভক্ত, কেন সাম্প্রতিক দীক্ষা প্রাপ্ত এই ভক্ত আমার থেকে উন্নত পদে আসীন হবে? কেন তিনি সংকীর্তন নেত্রী আমি নই? কেন এটা, কেন ওটা?” এইভাবে মানসিক স্তরে কেউ হয়ত হঠাৎ করে এইরকম কোন ধরনের ভ্রম, এইরকম কোন ধরনের মিথ্যা অহংকারের বশীভূত হতে পারে এবং তার প্রকৃত বৈষ্ণব আচরণ ত্যাগ করতে পারে কেবলমাত্র সেই সেবা গ্রহণের জন্য। সেবায় মনোনয়নের পরিবর্তে সে ঈর্ষাপরায়ন হতে শুরু করে, অন্যান্য ভক্তদের প্রতি ক্ষুদ্ধ হতে শুরু করে, আর সব থেকে চরম হচ্ছে হৃদয়ে এই ধরনের গভীর ক্রোধ হলে তা কোন ব্যক্তির সংকীর্তন ছাড়ার, চৈতন্য মহাপ্রভুর এই আন্দোলন ছাড়ার কারণ হবে। এবং মিথ্যা অহংকারবশত ভাববে যে “আমি একজন মহান ভক্ত!”  তারা জপ করতে থাকে, কিন্তু তা তাদের নিজেদের গৃহে, কোন নির্জন স্থানে বা এমনকি পবিত্র ধামে কিন্তু আসলে এইসব তাদের নিজস্ব মানসিক জল্পনা-কল্পনার দ্বারা হচ্ছে। কেবল এই সংকীর্তন যজ্ঞে আত্মসমর্পণ করা, একসাথে সেবা করা এবং সংকীর্তন আন্দোলন প্রচার করার পরিবর্তে তারা গৌরব, প্রতিষ্ঠা বা জাগতিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তি লাভের মানসিক আকাঙ্ক্ষার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। 

আমার ব্যক্তিগতভাবে এই বিষয়ে অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, এই মনভাবের প্রবণতা হচ্ছে যে সেই ব্যক্তি কোন বয়ঃকনিষ্ঠ ভক্তের গুরুত্ব স্বীকার করে না, এমনকি যদি তিনি সংকীর্তন আন্দোলনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোন অবদান দিয়ে থাকেন তবুও। জড়জাগতিক কলুষতার জন্য এইরকম প্রবণতা থাকে। যখন শ্রীল প্রভুপাদের আমাকে ১৯৭০ সালে ভারতে পাঠিয়েছিলেন, তখন শ্রীল প্রভুপাদের আসার জন্য আমরা একটি স্থান পেয়েছিলাম, সেই সময় আমার মনে হয় ১৯৭০ সালে সেখানে সমগ্র বিশ্বে তখন প্রায় ৪০-এর কাছাকাছি মন্দির ছিল এবং আমার উপর দায়িত্ব পড়েছিল শ্রীল প্রভুপাদের গুরুভ্রাতাদেরকে এসে তার(প্রভুপাদের) সঙ্গে বিমানবন্দরে সাক্ষাত করতে নিমন্ত্রণ করার। এবং এক অভ্যর্থনার ব্যবস্থাপনা করা যে যেমনটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, তেমন এখন গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের একজন সমগ্র বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের লক্ষ্য অর্জন করেছেন।

স্বাভাবিকভাবেই ইসকনে আমাদের এই অভিজ্ঞতা আছে যে, “যদি কোন ভক্ত ভালো প্রচার করেন, তাহলে আমরা সকলেই সেইজন্য খুব আনন্দিত হই ও আমরা সেই ব্যক্তিকে অভিনন্দন জানাই কিন্তু এক্ষেত্রে আমি দেখলাম যে আমি যখন গৌড়ীয় মঠে গিয়েছিলাম, তখন প্রত্যেকেই আমাকে এই বলে উপেক্ষা করছিলেন যে তারা আসবে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন। তখন একজন অত্যন্ত বরিষ্ঠ ভক্ত, গৌড়ীয় মঠের একজন অত্যন্ত বরিষ্ঠ মহারাজ, শ্রীল প্রভুপাদের সন্ন্যাসী গুরুভ্রাতা, সিড়িতে যখন আমার তার সাথে দেখা হয়েছিল, আমি তাকে অনুরোধ করেছিলাম যে,  “আপনি কি আপনার গুরুভ্রাতা প্রভুপাদের সঙ্গে বিমান বন্দরে দেখা করতে আসবেন?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ! আমি যাব। আমি তার সাফল্যে খুবই খুশি হয়েছি।” এবং তখন হঠাৎ করে কিছু গৃহস্থ গুরুভ্রাতা আসলেন এবং বললেন, “নাহ! আপনি যেতে পারবেন না, আপনি যেতে পারেন না ও তার সাথে এয়ারপোর্টে দেখা করতে পারেন না।” তিনি বললেন, “কেন নয়?” “তিনি আপনার পরে সন্ন্যাস নিয়েছেন। আপনি বরিষ্ঠ সন্ন্যাসী ভ্রাতা, তিনি আপনার থেকে কনিষ্ঠ। তাহলে কিভাবে আপনি যেতে পারেন ও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেন যিনি তুলনায় আপনার থেকে কনিষ্ঠ?” এবং তিনি এত জোর দিচ্ছিলেন যে তারপর মহারাজ বললেন, “ঠিক আছে! ঠিক আছে!”  তিনি পিছনে সরে গেলেন। ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তার কিছু গুরুভ্রাতার এই সমস্যা হচ্ছিল কারণ তিনি হয়ত দীর্ঘ সময় ধরে গৃহস্থ ছিলেন এবং তিনি তাদের অনেকের পরে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। তাই, তারা চিন্তা করছিলেন যে সন্ন্যাস-ই হচ্ছে সবকিছু। এমনকি একজন উৎসর্গপ্রাণ গৃহস্থ, তাদেরকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হত না, এমনকি যদিও প্রভুপাদ লিখছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের পত্রিকার সম্পাদক, এমনকি একজন গৃহস্থ হয়েও তিনি কত প্রচার করছিলেন। তিনি প্রথম থেকেই ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন, তবে জড়জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আসলে আমরা সন্ন্যাস গ্রহণ করি। আমরা বর্ণাশ্রমের মধ্যে যাই প্রচারের উদ্দেশ্যে, তবে আমরা একে অপরকে বৈষ্ণব রূপে দেখি। বাহ্যিকভাবে আমরা হয়ত কোন সদাচার পালন করতে পারি, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তা প্রচারে সাহায্য করছে, ততক্ষণ পর্যন্তই সেই সদাচার ঠিক আছে। এটিকে আমদের প্রকৃত বৈষ্ণব সম্বন্ধীয় ধারণার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়।

এই কারণে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, ভালো ভক্তেরা স্বাভাবিকভাবেই লক্ষিত হবে, আমাদের আন্দোলনে ভক্তরা স্ব-প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা হয়ত জানি না যে ভবিষ্যতে কোন ভক্ত মহান গুণ,  সংকীর্তন আন্দোলনের জন্য প্রচারে মহাশক্তি প্রকাশ করবে। হয়তো আজ আমরা যে দৃঢ়ভক্তকে দেখছি তাদের মধ্যে কেউ, হয়ত কোন একজন বয়ঃকনিষ্ঠ ভক্ত এগিয়ে আসতে চলেছেন, এতে কোন সংশয় নেই, তা ঘটবে। আমাদেরকে কেবল বৃহৎ দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। নিজের গুরুত্ব বিবেচনা করার দ্বারা অভিভূত হলে, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে এমন কোন ভক্ত যিনি কৃষ্ণ সেবায় কোন মহান সাফল্য অর্জন করেছেন, তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার ভয় আছে। 

এই সতর্কবাণী রাম কর্তৃক করা হয়েছিল, যখন হনুমান বড় পাথর ছুঁড়ে ফেলছিলেন এবং তারই পাশে ছিলেন মাকড়সা, কাঠবিড়ালি। কাঠবিড়ালি ছোট ছোট নুরি ছুঁড়ে ফেলছিলেন এবং তখন হনুমান বলল, “সরে যাও আমার পথ থেকে, এই কাঠবেড়ালি! তুমি দেখতে পারছ না আমি এক বড় সেবা করছি।?” তখন রামচন্দ্র বললেন, “না! মিথ্যাভাবে অহংকারী হয়ও না, এই কাঠবিড়ালি তার নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ধূলি কণা বা নড়িপাথর ছুঁড়ে ফেলছে, সেটাও আমাকে সম্পূর্ণ তৃপ্ত করছে।” ভক্তের নিজের সেবাকে বড় বা ছোট হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, অন্য ভক্তের থেকে অধিক ভাবা উচিত নয়, যিনি হয়ত পুরোপুরি প্রচেষ্টা করছেন। কারণ কেউ যে পরিমাণ সেবা করতে পারে, তা পরিশেষে গুরু এবং কৃষ্ণের কৃপার দ্বারাই সম্পাদিত হয়। একজন ভক্ত তিনি কোন না কোনভাবে কৃষ্ণকে সেবা করার সুযোগের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, এর গুরুত্ব হচ্ছে যে কোনো না কোনোভাবে আমাকে সেবায় নিযুক্ত রাখা হয়েছে কেউ হয়ত এটা অনুভব করতে পারে, কিন্তু সেই সেবা কতটা করা হয়েছে, সেই কৃতিত্ব, ব্যক্তিগতভাবে আমরা তার কৃতিত্ব গুরু এবং চৈতন্য মহাপ্রভুকে দেই। অবশ্য, অন্যান্য বৈষ্ণবরা সেই ভক্তকে কৃতিত্ব দেবেন, যিনি তা সম্পাদন করেছেন, কিন্তু সেই ভক্তের সেই কৃতিত্ব বৈষ্ণবগণ ও কৃষ্ণকে দেওয়া উচিত। এইভাবে যদি কেউ ভক্তিমূলক সেবায় যথার্থ আচরণ করেন, তাহলে তিনি এই সবধরনের মৎসরতা — ঈর্ষা পরায়ণতা, তম, রজ, সত্ত্ব গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবেন। মন হচ্ছে অত্যন্ত শয়তানসুলভ, মন যে কোন জায়গায় যেতে পারে। তাই, আমাদেরকে মনকে পবিত্র করতে হবে, আমাদেরকে সেটাকে সব ধরনের অসন্তোষ, সব ধরনের ঈর্ষাপরায়ণতা থেকে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে ফিরিয়ে আনতে হবে। যদি আমাদের সাথে এমনকি খারাপ কিছুও ঘটে, তাহলেও তা আমরা কৃষ্ণের কৃপা হিসেবে গ্রহণ করি। যদি আমাদেরকে কোন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হয়, তাহলে সেটাও হচ্ছে আমাদের প্রতি শ্রীকৃষ্ণ প্রদত্ত পরীক্ষণ।

ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর, আমাদেরকে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে, তিনি সব ভক্তদেরকে বলেছেন যে, সকালে প্রত্যেকদিন তিনি তার মনের শুদ্ধিকরণ করতেন এবং প্রত্যেকেরই সেই একই শুদ্ধিকরণ করা উচিত। সেটা হচ্ছে জুতো জোড়া নিয়ে কোন ব্যক্তির তার মনকে ১০৮ বার মারা উচিত এবং ঝাড়ু নিয়ে আবার ১০৮ বার মারা উচিত, মনকে গরু এবং কৃষ্ণ, গুরু এবং গৌরাঙ্গের শ্রীপাদপদ্মে আত্মসমর্পণ করাতে। এই হচ্ছে শ্লোক ৮।

এখন শ্লোক ৯

শ্লোক ৯ 
তাই দুষ্ট মন, ‘নির্জন ভজন’
প্রচারিছ ছলে ‘কুযোগী-বৈভব’।
প্রভু সনাতনে, পরম যতনে,
শিক্ষা দিল যাহা, চিন্ত সেই সব।। 

আমার জড়জাগতিক মন, যখন তুমি নির্জন ভজনের বাসনা কর, তার দ্বারা তুমি মিথ্যা ভাবে মেকি যোগী, মিথ্যাচারী যোগী বা নকল যোগীদের প্রচার কর। আমাদের সম্মানীয় আচার্য, সনাতন প্রভু অত্যন্ত যত্ন সহকারে যে নির্দেশ দিয়েছেন, তোমার সেই সমস্ত নির্দেশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা উচিত। 

এইভাবে মনকে শাসন করা হয়েছে উন্নত উদ্দেশ্য বা উন্নত চেতনার অজুহাতে চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন ছাড়ার কথা ভাবার জন্য, এক ধরনের বিচ্ছিন্ন হয়ে বা স্বতন্ত্র হয়ে অথবা নির্জনে ভজন করার কথা চিন্তা করার জন্য। এই উন্নতি করার অজুহাতে কোন ব্যক্তি আসলে মিথ্যা উপদেশ ছড়াচ্ছে, ষড় গোস্বামীগণের উপদেশের বিরুদ্ধে তত্ত্ব ছড়াচ্ছে, সেই তত্ত্ব প্রচার করছে যা আসলে শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবার শুদ্ধ নিয়মনীতির ধ্বংস করছে। যদিও এটা দেখে মনে হতে পারে কোন উন্নত তত্ত্ব, কিন্তু আসলে এই নির্জন ভজন করা, প্রচারের উদ্দীপনা ত্যাগ করা, প্রচারের মনোভাব ত্যাগ করার দ্বারা তারা প্রচার বিরোধিতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই জন্য, তারা তাদের নিজেদেরই সবথেকে সম্মানহানি করছে ও সমাজে মিথ্যা ধর্মীয়নীতি প্রতিষ্ঠা করছে। 

সনাতন গোস্বামী, ষড় গোস্বামীগণ কত অসাধারণ নির্দেশাবলী দিয়েছেন, ঠিক যেমন আমরা পড়েছি বৃহদভাগবতামৃত বা হরিভক্তিবিলাস, উপদেশামৃত, এইসব দিব্যগ্রন্থসমূহ, যা আমাদেরকে উপদেশ দেয় সমগ্র বিশ্বে চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুসারী তৈরি করতে, যা হচ্ছে সম্পূর্ণ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ,  দিব্যচেতনার ফল। এমন নয় যে এটি একটি জড়জাগতিক কার্য। এর পরিবর্তে বৈষ্ণবদের সঙ্গ ত্যাগ করা, হরিদাস ঠাকুরের নকল করে কোন গুহায় যাওয়া ও মাধবীন্দ্রপুরের নকল করে ধ্যান মগ্ন হওয়া এবং সংকীর্তন প্রচারকে এড়িয়ে চলা, নিজেকে এইসবের ঊর্ধ্বে বা অধিক উন্নত বৈষ্ণবের উন্নত স্থিতিতে বা কোন বাবাজি, কোন বিশেষ ভক্ত মনে করা — এগুলি হচ্ছে ষড় গোস্বামীগণের শিক্ষা ও চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনের বড় অসম্মান। আর এর ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাই বর্তমান দিনের বাবাজিদের, তারা চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলনের সম্মান বজায় রাখতে সক্ষম নয়। অনেক সময় তারা কেবল ধামে বসবাসকারী বিধবা স্ত্রীদের দ্বারা অবৈধ সন্তান সৃষ্টি করে। এত অধার্মিকতা, এত নাস্তিকতা, এত জড়জাগতিকতা সমগ্র বিশ্বকে গ্রাস করে নিচ্ছে, তবুও তারা তা থামানোর জন্য কিছুই করছে না।

যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, ভারতের মধ্যে থাকা সকল ব্যক্তিকে আদেশ দিয়েছেন,

ভারত–ভূমিতে মনুষ্য–জন্ম হৈল যার ।
জন্ম সার্থক করি’ কর পর–উপকার ॥
(চৈ. চৈ. আদি ৯.৪) 
 

তখন তাদের নিজেদের জীবন সার্থক করা উচিত, আধ্যাত্মিকভাবে চৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা উপলব্ধি করা উচিত ও এরপর অন্যান্যদের সাহায্য করা উচিত। নির্জন ভজনের মত তথাকথিত একান্তে ভজন করার মধ্যে পর-উপকার কোথায় আছে? কৃষ্ণের সাথে অধিক অন্তরঙ্গ হওয়ার অজুহাতে,  কৃষ্ণের লীলায় উন্নত হওয়ার অজুহাতে,  সেই ব্যক্তি আসলে ক্ষতি করছে, কত জীবদের প্রতি হিংসা করছে যারা আসলে উপকৃত হতে পারতেন এইসব শ্রবন করার মাধ্যমে যে—শ্রীকৃষ্ণ কে? কিভাবে কৃষ্ণের সেবা করা যাবে? তাদের সাথে কৃষ্ণের নিত্য সম্বন্ধ কি?

এই আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) এই নীতির উপর ভিত্তি করে আছে যে একসাথে থেকে সেইসব ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে হবে যারা এই জড়জগতে কষ্ট ভোগ করছে। এই হচ্ছে সর্বোচ্চ সেবা যা আমরা করতে পারি। 

একবার আমরা তা করতে সক্ষম হলে, তাদের চেতনার মাধ্যমে তাদের উদ্ধার করতে পারলে,  তারপর কেউ তার জীবনের শেষ সময়ে কিছু নির্জন ভজন করার অনুমতি লাভ করতে পারে। নয়ত নয়। কোন ভক্তের তার পুরো শক্তি সংকীর্তন আন্দোলন প্রচারের লক্ষে লক্ষিত হতে হবে। এই সংকীর্তন আন্দোলনে, এই সংকীর্তন প্রবাহে, ঠিক যেমন গঙ্গা আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে নিন্মে এসে সাগরের দিকে প্রবাহিত হচ্ছেন, তার প্লাবনে যেমন সবই ভেসে যায়, তেমনই সংকীর্তনের ফলে কেউ অবিরতভাবে অন্তরঙ্গ সঙ্গ, ভগবান এবং তার ভক্তদের সাথে ঐকান্তিক সম্বন্ধের উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে, কিন্তু এই একান্তে ভজনের নকলের মতো তথাকথিত নির্জন ভজনের ফলে কোন ব্যক্তি কৃষ্ণের সাথে দিব্য সম্বন্ধের স্বাদ আস্বাদন করে না। এর পরিবর্তে সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এটা শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভুর ধারার মহান আচার্যদের শিক্ষা বিরুদ্ধ।

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
 হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

এর পরিবর্তে কোন ব্যক্তির অনেক ব্যক্তিদের সাথে একত্রে এই মহামন্ত্র কীর্তন করা উচিত।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 20/4/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions