Text Size

১৯৮২০৫২৯ শ্রীমদ্ভাগবতম ৮.১৮.৫

29 May 1982|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam

নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ ২৯ মে, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে দিয়েছেন। এই প্রবচন শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৮ম স্কন্ধ, ১৮ অধ্যায়, শ্লোক ৫ পাঠের মাধ্যমে।

শ্রবণ দ্বাদশীর দিন (ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশী) যখন চন্দ্র শ্রবণস্থ হয়েছিল, অভিজিৎ নক্ষত্রে পরম শুভলগ্নে ভগবান এই ব্রহ্মাণ্ডে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ভগবানের আবির্ভাব অত্যন্ত মঙ্গলজনক বলে মনে করে, সূর্য থেকে শনি পর্যন্ত সমস্ত নক্ষত্র এবং গ্রহ অত্যন্ত উদার ও মঙ্গলপ্রদ হয়েছিল।

শ্রীল প্রভুপাদ কি জয়! 

তাৎপর্য: নিপুণ জ্যোতিষী শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর নক্ষত্রতারাদ্যাঃ শব্দটির বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে এই প্রসঙ্গে তারা শব্দটির অর্থ হচ্ছে গ্রহগণ। গ্রহদের মধ্যে প্রথম হচ্ছে সূর্য, চন্দ্র নয়। তাই, আধুনিক জ্যোতির্বিদেরা যে বলে পৃথিবীর সব চাইতে নিকটবর্তী জ্যোতিষ্ক হচ্ছে চন্দ্র, তা বৈদিক বিচার অনুসারে স্বীকার করা যায় না। যেই ক্রম অনুসারে সারা পৃথিবীর মানুষ সপ্তাহের দিন — রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র এবং শনি গণনা করে, তা বৈদিক ক্রমেরই অনুরূপ এবং তা বৈদিক উক্তিকে প্রতিপন্ন করে। ভগবান যখন আবির্ভূত হন, তখন জ্যোতির্গণনা অনুসারে, গ্রহ-নক্ষত্রগুলি ভগবানের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য অত্যন্ত মঙ্গলজনকভাবে অবস্থিত হয়। 

শ্রীমদ্ভাগবত বামন অবতার লীলা কি জয় !

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: যখন রূপ গোস্বামী, না রামানন্দ রায়কে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এটি বর্ণনা করতে বলেছিলেন যে, “সব থেকে মঙ্গলময় বিষয় কী?” তখন তিনি বিভিন্ন কিছু বর্ণনা করেছিলেন, যেমন — বর্ণাশ্রম ধর্ম, ভগবানের জন্য সব সবকিছু পরিত্যাগ করা, কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন, “না, ইহা বাহ্য, আগে কহ আর, আগে কহ আর।” যখন তিনি বলেছিলেন যে, “ভক্ত সঙ্গে ভাগবত শ্রবণ”, তখন চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন, “ইহা হয়।” হ্যাঁ এটি শুদ্ধ আন্তরিক বিষয়, এটি হচ্ছে এক দিব্য প্রক্রিয়া। তাই শ্রীমদ্ভাগবত থেকে বামন অবতার সম্বন্ধে বা যে কোন অবতার সম্বন্ধীয় লীলা শ্রবণ করা হচ্ছে সব থেকে মঙ্গলময়। ভক্ত সঙ্গে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করা হচ্ছে এক বিশেষ আশীর্বাদ কারণ শ্রীমদ্ভাগবতের শব্দতরঙ্গ হচ্ছে সম্পূর্ণ দিব্য। 

এখানে সেই শুভ মুহূর্তের বর্ণনা করা হয়েছে, [পাশে: শোনো তোমার এই যন্ত্র বাইরে গিয়ে ঠিক কর।] ভগবানের আবির্ভাবের শুভ মুহূর্তের বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবান হচ্ছেন সর্বমঙ্গলময়, তাই যখন তিনি আবির্ভূত হন, তখন সবকিছুই মঙ্গলময় হয়ে যায়, তখন সবকিছুকেই সর্বোচ্চ মঙ্গলময় স্থিতিতে থাকতে হবে। তাই, ভগবানের আবির্ভাবের জন্য তারাসমূহ স্বাভাবিকভাবেই সবথেকে মঙ্গলময় অবস্থা গ্রহণ করেছিল। এটা ভগবানের জন্য স্বাভাবিক। একইভাবে, যখন একজন নিত্য মুক্ত জীব আবির্ভূত হন, তখন তার জন্যও সর্ব মঙ্গলময় ব্যবস্থাপনা হয়। কিন্তু সব সময় তা নয়.. তবে ভগবানের জন্য যে ব্যবস্থাপনা, তা সর্বাপেক্ষা মঙ্গলময়। এবং সেটাই এখানে বর্ণনা করা হচ্ছে। 

একইভাবে, যখন আমাদের চেতনা সম্পূর্ণরূপে ভগবানের দিব্য বাণী শ্রবণে স্থির হয়, তখন তৎক্ষণাৎ আমাদের চেতনাও মঙ্গলময় হয়। যখনই আমরা ইন্দ্রিয়তৃপ্তির কথা চিন্তা করা শুরু করি,  তখন আমাদের চেতনা কলুষিত হয়ে যায়। আধ্যাত্মিক গুরুদেবের আশীর্বাদে, যাঁকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করছি, তাঁর জন্যই আজকে আমরা শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করতে পারছি। এমনকি যদিও আমরা শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করতে কত ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে এসেছি, তবুও এটি এক অতি অসাধারণ সুবর্ণ সুযোগ। 

এটা উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন বামন দেব আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সকলেই অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, ভগবানের এক শুভ মুহূর্তে আবির্ভাব কেবল তাঁর জন্যই ভালো নয়, তাঁর কোন ভালো কিছুর দরকার নেই, কারণ তিনি ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ অবস্থানে অবস্থান করছেন, তিনি শুদ্ধ, দিব্য ব্যক্তিত্ব, কিন্তু এতে বাকি সকলের সৌভাগ্যের উদয় হয়। একইভাবে, যখন আমরা ভগবানের নাম জপ করি, ভগবান তাঁর নাম রূপে উপস্থিত, তাই তার ফলে যেখানে পবিত্র নাম কীর্তন করা হচ্ছে, তা এর আশেপাশের সকল জীবের পরম মঙ্গল বা সৌভাগ্য আনায়ন করে। কলকাতায় চারিদিকে যে হরিনাম উৎসব করা হচ্ছে, তাতে সেই সমস্ত ভক্তরা  অনেক, অসীম মাত্রায় শুভ ফল লাভ করছেন। 

শ্রীল প্রভুপাদ, তিনি আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, কিভাবে পবিত্র ধামও হচ্ছেন ভগবানের থেকে অভিন্ন এবং সেই স্থানও ভক্তদের জন্য সর্ব মঙ্গলময়। একইভাবে, আমরা সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন মন্দিরে ভগবানকে স্থাপন করেছি ও সেটিও ভক্তদের জন্য এক শুভ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।  একজন শুদ্ধ ভক্তের প্রতি অপরাধ করলে তা অমঙ্গলময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ঠিক যেমন যখন দক্ষ শিবকে অভিসংবাদ দিয়েছিলেন, [পাশে: এইরকম ভাবে বস না।] তখন তা দক্ষের অনুসারীদের জন্য ও স্বয়ং দক্ষের জন্য এমন এক অমঙ্গলময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল যে, তারা তাদের সেই অপরাধের জন্য অভিশপ্ত হয়েছিলেন ও ধ্বংস হয়েছিলেন। চিত্রকেতু, যিনি ছিলেন ভগবানের এক ভক্ত। তিনিও মহাদেব শিবের প্রতি অপরাধ করেছিলেন, যার জন্য তাকে অভিশাপ পেতে হয়েছিল, কিন্তু তিনি ধ্বংস হননি। একজন ভক্ত হয়ত কখনো কখনো ভুল করতে পারেন,  অপরাধ হতে পারে, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি” — আমার ভক্তের কখনো বিনাশ হবে না।” কিন্তু দক্ষের মতো একজন অভক্ত, তিনি যখন অপরাধ করেছিলেন, বাস্তবিকভাবে বললে, তিনি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলেন। এটা হয়েছিল কেবল এই জন্য যে…  তিনি নিজের জন্য শিবের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন এবং যেহেতু শিব হচ্ছেন অত্যন্ত করুণাময়, তিনি দক্ষকে তার অপরাধের জন্য ক্ষমা করেছিলেন, আর সেই জন্যই তিনি উদ্ধার লাভ করেছিলেন। 

এই প্রসঙ্গে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর, তাঁর কবিতা যা শ্রীল প্রভুপাদ বারংবার উল্লেখ করেছেন—“দুষ্ট মন! তুমি কিসের বৈষ্ণব?”  তাতে তিনি আমাদের কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন, প্রচার, ভগবানের মহিমাগান, ও অন্যান্য ভক্তদের সাথে একত্রে নাম-কীর্তন করা ছেড়ে দেওয়ার বিপদ সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন।

বৈষ্ণব কে?
শ্লোক ৭ 
‘কীর্তন ছারিব,           প্রতিষ্ঠা মাখিব’
কী কাজ ঢুরিয়া তাদৃশ গৌরব।
মাধবেন্দ্রপুরী,            ভাব-ঘরে চুরি,
না করিল কভু সদাই জানব ।।

তিনি বর্ণনা করেছেন যে, যদি কেউ মনে করে — এইসব বৈষ্ণবগণ যারা পবিত্র নাম জপ করেন, প্রচার করেন ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনে নিযুক্ত আছেন, আমি তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করব, আমি তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করব কোন কারণে… তারা হয়ত, সেই ব্যক্তি তিনি হয়ত বাহ্যিকভাবে কিছু ত্রুটি খুঁজে বের করবে, সেই ব্যক্তি হয়ত এই ত্রুটি খুঁজে বের করবে যে এইভাবে চৈতন্য মহাপ্রভুর পূজা করা খুবই কঠিন। অথবা সেই ব্যক্তি যিনি সংকীর্তন আন্দোলন ছেড়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করছে, সে হয়ত তা কেবল ভ্রমবশত বা মিথ্যা অহংকারবশত করতে পারে। সেটাই এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন ছেড়ে যাওয়ার এই ইচ্ছা হচ্ছে এক বিশাল বড় ভুল। কেউ হয়ত চিন্তা করতে পারেন যে, আমি যদি নিজে চলে যাই বা কোন না কোনভাবে আমি যদি অনেক কঠিন তপস্যা করি, তাহলে আমার অনেক নাম হবে, আমি ভক্তদের সঙ্গ ত্যাগ করব ও আমি স্বাধীন হব, তারপর নিজে কোন মহৎ কিছু করব, আমি ৩০০০০০ নাম করব, আমি অত্যন্ত কঠোর তপস্যা করব বা আমি হয়ত নিজে কোন তথাকথিত প্রচার করব, তবে এই সবকিছুকেই কেবল নাম ও প্রসিদ্ধি লাভের ইচ্ছা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এর দ্বারা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কোন মহিমা কীর্তিত হবে না বা এর দ্বারা সমগ্র বিশ্বেও কোন মঙ্গল সাধিত হবে না। 

কীর্তন — যা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কর্তৃক প্রদত্ত পন্থা, তা বিশেষত এক সম্পূর্ণ ও নিখুঁত পন্থা। কীর্তনে আমাদেরকে কত জনের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। মৃদঙ্গ, কর্তাল সহ সাধারণ কীর্তন করা হলে, সেখানে একটা, দুটো বা অধিক ড্রাম বাজানো হয়। অন্যান্যরা যেমন কেউ কর্তাল বাজান, কেউ কীর্তনে নেতৃত্ব দেন এবং অন্যান্যরা তার পর পর পুনরাবৃত্তি করেন এবং কেউ কেউ নৃত্য করেন, এইভাবে সেখানে এক সহযোগিতা পূর্ণ মনোভাব আছে, কেউ হয়তো শঙ্খ ধ্বনিত করেন বা ঘন্টা বাজান, এইভাবে সম্পূর্ণ কীর্তনের প্রভাব অর্জিত হয়। কিন্তু এই পুরো বিষয়টি হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের মহিমা কীর্তনের জন্য। বৃহৎ অর্থে, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এবং ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী ‘বৃহৎ মৃদঙ্গ’ বা ‘বৃহৎ কীর্তন’-এর ব্যাখ্যা করেছেন। বৃহৎ মৃদঙ্গ বা প্রত্যেকের কাছে দিব্য শাস্ত্র গ্রন্থের বিতরণের ক্ষেত্রেও চৈতন্য মহাপ্রভুর বিভিন্ন ধরনের ভক্তদের মধ্যে অত্যন্ত সহযোগিতা পূর্ণ প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় — কেউ লেখেন, কেউ অনুবাদ করেন, কেউ তা সম্পাদনা করেন, কেউ তা সংশোধন করেন, কেউ হরফ (টাইপ) করেন, কেউ মুদ্রণ করেন, কেউ প্যাকেট করেন, কেউ তা পৌঁছে দেন, এবং কয়েকজন সমগ্র বিশ্বে সেই গ্রন্থাবলী প্রচার করেন।

[পাখি ডাকছে]

[পাশে: ময়ূর?]

এইভাবে সেই মুহূর্ত, যখন কেউ সেই সমস্ত গ্রন্থ বিতরণ করছেন তা থেকে শুরু করে যখন তা লেখা হচ্ছিল এই সমস্ত প্রক্রিয়া এক দিব্য সহযোগিতাপূর্ণ উদ্দীপনা। একইভাবে, ব্যক্তিদের মন্দিরে নিয়ে আসা, তাদেরকে কৃষ্ণভাবনামৃতের তত্ত্বে প্রশিক্ষিত করা, এই সব কিছুই হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনের ধরন। তাই, কারো মিথ্যা অহংকার বা কৃষ্ণের থেকে স্বতন্ত্র হওয়ার মিছে বাসনা, কেবল অনিয়ন্ত্রিত মন অথবা ইন্দ্রিয়ের মান্য করার ইচ্ছা — এগুলি হচ্ছে জড়জাগতিক বিশ্বের বৈশিষ্ট্য। কেউ তা স্থূলভাবে ইন্দ্রিয়ের দ্বারা আনন্দ উপভোগের জন্য করুক বা এইভাবে কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হওয়ার থেকে স্বতন্ত্রতা লাভের জন্য করুক, তা এক অধঃপতন হিসেবে বিবেচিত হয়। 

মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন পরিত্যাগ করা মানে সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক স্থিতি থেকে অধঃপতিত হওয়া এবং যে ব্যক্তি আধ্যাত্মিক জীবনে উন্নত স্তরে আছেন, তার মন স্বাভাবিকভাবেই এইরকম অধঃপতন এড়িয়ে চলার প্রতি প্রশিক্ষিত। মন অত্যন্ত চালাক ও তা এমন কিছু করার জন্য অজুহাত খোঁজার চেষ্টা করে যা হচ্ছে ভুল। যেমন এটি বলা হয়, নরকের রাস্তা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি। সাম্প্রতিক আমেরিকাতে একজন অপরাধী ছিল যে জন্ম থেকেই মানুষদের হত্যা করে ও ক্ষতি করে আসছে। তাকে জেলে রাখা হয়েছিল, একজন তথাকথিত সমাজ সেবক, সাংবাদিক প্রচার করেছে যে যেহেতু সে তার ৬ বছর বয়স থেকে কারাগারে বদ্ধ আছে, তাই তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করা হোক, যেহেতু সে প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে আছে। সে ইতিমধ্যে এক মধ্যবয়সী পুরুষ, তাই তাকে যাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তার অপরাধের জন্য এমন কষ্ট না দেওয়া হয়। কিন্তু যখনই সেই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে সে বোতল ভেঙে এক মহিলাকে আক্রমণ করেছিল ও সেই ভাঙ্গা বোতলকে এক হাতিয়ার হিসেবে ধরে জোর করে তাকে ধর্ষণ করেছিল। যখন তাকে আটক করা হয় ও জিজ্ঞেস করা হয় যে, “কেন সে এরকম কাজ করেছে?” সে বলেছিল, “এটা আমার ভুল নয়। আসলে এটা হচ্ছে সমাজের ভুল। কেন মহিলারা এই রকমভাবে পোশাক পড়ে? কেন একজন ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ তার ইচ্ছা সন্তুষ্ট করতে পারবে না? এটা আমার ভুল নয়, আমি কেবল ভালো কিছু করেছি। কিন্তু অন্যান্য সবাই সহযোগিতা করছে না, তারা সবাই ভুল। এটা খুবই কষ্টকর।”  ইত্যাদি.. ইত্যাদি..  সে কত কিছু অজুহাত দিয়েছে। সে কখনোই চিন্তাও করেনি যে সে ভুল করেছে। এটা হচ্ছে তার ভ্রম। তাই, এমনকি একজন ব্যক্তি ভুল করলেও তার মন এমনই যে সে বলবে, “ও হ্যাঁ! এইটা, এটা ঠিক আছে।” এমনকি যদিও সে জানে যে তাকে কারাগারে ফিরে যেতে হবে, সে খুব বাজে কাজ করেছে, সে জানে তা অবৈধ, কিন্তু কোন না কোনভাবে তার মন এইভাবে অন্বয় করে চলেছে যে এটা করা ঠিক আছে। কত চোরেরা তারা মনে করে যে — “ঠিক আছে আমি কারো থেকে চুরি করছি, কারণ তারা এর যোগ্য নয়, আমি এটা লাভ করার যোগ্য।” কিভাবে এই প্রার্থনায় মনকে বলা হয়েছে, এত মূর্খ হয় না। নিজেকে বৈষ্ণব ভেব না এবং একই সাথে চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন পরিত্যাগ করার যে চেতনা যে তুমি জড়জাগতিক ভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারবে ও এইভাবে সরে দাঁড়াতে পারবে তা ছাড়ো। এই সংকীর্তন মানে হচ্ছে বিনয় নম্র স্থান গ্রহণ করা। সংকীর্তনের সদস্য হয়ে কেউ হয়ত কীর্তনে নেতৃত্ব দিতে পারেন, আরেকজন হয়ত নৃত্য করতে পারেন, অন্য কেউ হয়ত অনুসরণ করতে পারেন, অন্য একজন হয়ত করতাল বাজাতে পারেন, প্রত্যেকেই কীর্তনে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না, প্রত্যেকেই নৃত্য করতে পারবেন না বা প্রত্যেকেই করতাল বাজাতে পারবেন না, প্রত্যেককে তার নিজের নিজের স্থান গ্রহণ করতে হবে। যদি কেউ অন্য কোন ভক্তের স্থান গ্রহণ করতে চান, তাহলে সেটা হচ্ছে কেবল তার ঈর্ষাপরায়ণতা জন্য। দেখুন স্বাভাবিকভাবেই ভগবান ডাকবেন — তুমি নেতৃত্ব দাও! তুমি করতাল বাজাও! ড্রাম বাজাও! যেমন কীর্তনে হয়ে থাকে, একজনই সবসময় কীর্তনে নেতৃত্ব দেন না, তিনি পথ করে দেন এবং অন্য কেউ নেতৃত্ব দেন, আবার তিনি পথ করে দেন ও অন্য কেউ কিছু সময়ের জন্য মৃদঙ্গ বাজান ও তিনি আবার আরেকজনকে তা করতে দেন। এইভাবে প্রত্যেকেই সেই সুযোগ লাভ করেন, ভগবানের ইচ্ছা অনুযায়ী সকলেই সুযোগ পান, কিন্তু যদি কেউ করতাল সঠিকভাবে বাজাতে না পারেন, ঠিক যেমন শ্রীল প্রভুপাদ সবসময় বলতেন, “না তুমি বাজিও না। অন্য কাউকে বাজাতে বলো।” কিন্তু এইভাবে যদি কেউ মিথ্যা অহংকারবশত বা ভ্রমবশত মনে করে আমি সংকীর্তন আন্দোলন থেকে সরে যাব, তাহলে তার নিজের মনকে প্রশ্ন করা উচিত, “এর লাভ কি? এই অহংকার এর লাভ কি?” 

এখানে মাধবেন্দ্রপুরীর দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে, কেউই তার নকল করতে পারবে না। আসলে মাধবেন্দ্রপুরী হচ্ছেন দিব্য স্তরের এবং মাধবেন্দ্রপুরীর নাম, তার সুখ্যাতি সবসময় ছড়িয়ে যেত। তিনি ভগবানের সেবা করতেন, ভগবান চুরি করেছিলেন…  ক্ষীরচোরা…  তার জন্য ক্ষীর চুরি করেছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই তিনি এমন একজন ভক্ত হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন যে যাঁর জন্য শ্রীবিগ্রহ ক্ষীর চুরি করেছিলেন। কিন্তু মাধবেন্দ্রপুরী, তিনি কোন মিথ্যা অহমিকা চাননি, কোন নাম, প্রসিদ্ধি-এর পরিবর্তে যখন অনেক মানুষেরা তার কাছে আসতেন এবং তার কৃষ্ণ সেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতেন ও বিভিন্নভাবে তার মনকে বিচলিত করতেন, তখন তিনি পালিয়ে যেতেন, তিনি এইরকম ধরনের মিথ্যা এড়িয়ে পালিয়ে যেতেন। তবে সেই অর্থে এটি ছিল প্রকৃত খ্যাতি, কিন্তু তিনি তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। যাই হোক না কেন, যেহেতু তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত ভক্ত, তাই এমনকি যদিও তিনি প্রসিদ্ধি এড়িয়ে চলতেন, সর্বদা কেবল ভগবানের মহিমা প্রকাশের জন্য সচেষ্ট থাকতেন, তবুও ভগবানের হস্তক্ষেপে তিনি সবসময় মহিমান্বিত হতেন। তাই, একজন ভক্তকে স্বতন্ত্রভাবে ইচ্ছা করতে হবে না, বরং এমন করা এক মহাবিপদ—ব্যক্তিগত প্রসিদ্ধি লাভের বাসনা, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠা বা গুরুত্ব লাভের বাসনা। বরং ভগবান স্বয়ং ভক্তকে তুলে আনবেন, যেমন শ্রীল প্রভুপাদ বর্ণনা করতেন, ভালো জিনিস সবসময় উপরে উঠে আসে। এবং যদি কেউ কখনো ভক্তিমূলক সেবায় ভগবানের থেকে যেকোনো ধরনের কৃপা লাভ করা ভিন্ন অন্য চিন্তা করে, তাহলে ভগবান তার আশ্রয় যেকোন মুহূর্তে সরিয়ে নিতে পারেন, আধ্যাত্মিক গুরু আশ্রয় সরিয়ে নিতে পারেন। তাই, কোন ভক্তের সবসময় চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনে অত্যন্ত বিনয়-নম্র হয়ে কেবল এতে অংশগ্রহণ করার মনোভাব নিয়ে থাকা উচিত এবং সেটাই হচ্ছে সব ধরনের ভ্রমের বিরুদ্ধে সব থেকে বড় পরীরক্ষণ। এবং মনকে নিশ্চিতভাবে এইরকমভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে ও এইরকম স্বতন্ত্র পথে না যাওয়ার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। এমনকি যদিও তা দেখতে হয়ত খুবই আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের এটিকে একটি ভ্রম হিসেবে জানা উচিত এবং এক মারাত্মক বিপদ বলে বুঝতে হবে, যা আমাদের কৃষ্ণ ভাবনামৃতের উন্নতির ধ্বংস সাধন করতে পারে। 

শ্লোক ৮
তোমার প্রতিষ্ঠা, —    শূকরের বিষ্ঠা’,
তার-সহ সম কভু না মানব। 
মৎসরতা-বশে,           তুমি জড়রসে,
মজেছ ছাড়িয়া কীর্তন-সৌষ্ঠব।।

মনকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, শাসন করা হচ্ছে যে, মন যেটাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বা বড় নাম বা প্রসিদ্ধি হিসেবে ভাবছে, তা আসলে শূকরের বিষ্ঠার থেকেও হীন। এটা কেবল মানসিক জল্পনা, একটা অখাদ্য বস্তু যার কোন সৌন্দর্য নেই ও কোন আকর্ষণ নেই পরমেশ্বর ভগবানের কাছে। প্রকৃত ভক্তরা স্বাভাবিকভাবেই এমনকি কৃষ্ণের কাছেও আকর্ষণীয়, তাদের উৎসর্গমনোভাব, তাদের শরণাগতি, তাদের উদ্দেশ্যের শুদ্ধতা, তাদের তপস্যার জন্য। ভগবানের প্রতি তাদের ভক্তির কারণে তাদের মধ্যে সমস্ত ভালো গুণাবলী প্রকাশিত হয়। অতীব উন্নত বৈষ্ণব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মহান অভিমত অনুসারে, যদি কেউ শুদ্ধভক্তি ছাড়া অন্য কোন কারণে তা করে, তাহলে এমনকি এটা হয়ত খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু সেই গুরুত্ব কেবল হীন থেকেও হীনতর, এটিকে শূকরের বিষ্ঠার থেকেও হীন হিসেবে ধরা হয়। 

তার-সহ সম কভু না মানব।  

ভক্ত: তিনি তার সমতুল্য বলে গ্রহণ করবেন না।

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: সে এমনকি মনুষ্যের সমতুল্য নয়।

ভক্ত: তার-সহ সম

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: আমি বুঝতে পেরেছি কভু না মানব?

ভক্ত: গ্রহণ করবেন না, কখনও গ্রহণ করবেন না। একজন মানুষ সেই স্তরের সমান নয়। তাকে গণ্য করা হয় না…

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: মানে, তিনি মানুষের থেকে নিচ? অন্য কথায় বলতে গেলে, তিনি মানুষের থেকেও নিচ বা একজন পশু। একজন প্রকৃত সভ্য মানুষ কখনই এমন কিছু করবে না। মানুষের মন হচ্ছে ভগবত চেতনাময় হওয়ার জন্য। পশুর মন ইন্দ্রিয় তৃপ্তিতে মগ্ন, তার নিজের দেহভিত্তিক চেতনা এবং উপভোগ করার মানসিকতায় নিমগ্ন। যখন একজন পশুর মন কোন কিছু দেখে, তখন সেই বস্তু ইন্দ্রিয় বা অন্য কোন ভাবে কিভাবে উপভোগ করা যাবে সেই সম্বন্ধ নিয়ে দেখে, কিন্তু একজন মানুষের মন সবকিছুকে কৃষ্ণ সেবার সম্বন্ধ নিয়ে দেখার মত স্তরে উন্নত করার জন্য। যদি কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হন, হরিতোষনম, তাহলে সেটাকেই প্রকৃত যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদি কৃষ্ণ সন্তুষ্ট না হন, তার মানে সেই কাজকে গণ্য করা হয় — স এব গোখরঃ (শ্রী. ভা. ১০.৮৪.১৩) বা শ্রম এব হি কেবলম্ (শ্রী. ভা. ১.২.৮), কেবল সময় নষ্ট করা। মন যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হওয়া পরিত্যাগ করে, এর পরিবর্তে যেকোনো ধরনের সুক্ষ বা স্থুল ইন্দ্রিয়তৃপ্তিতে মগ্ন থাকে, তা এমনকি সভ্য মানুষের মানসিকতা নয়। এটি মনুষ্য শ্রেণীর মানসিকতার থেকেও হীন, এটি পশুর মানসিকতার মত। কারণ মন কেবল এই ক্ষণস্থায়ী জড়জগতের বিভিন্ন ধরনের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির স্বাদ আস্বাদনে মগ্ন। এই ইন্দ্রিয়তৃপ্তির স্বাদ পশু যোনিতেও লভ্য। সহবাস, নেশা, আহার, যৌনমিলন, নিদ্রা এবং আত্মরক্ষা, পশুদের জন্য এই বিভিন্ন ধরনের কাজ হচ্ছে আনন্দের উৎস, কিন্তু মানুষের জন্য এটি আনন্দের উৎস হিসেবে মানানসই নয়। যখন কোন ব্যক্তি হিংসাবশত, যেমন এখানে বলা হয়েছে মৎসরতাবশে, কোন ঈর্ষাপরায়ণতার কারণে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন পরিত্যাগ করে ও সেই উপভোগের বিষয়বস্তু মন ও ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপভোগ করা শুরু করে, সেটিকে আধ্যাত্মিক জীবন থেকে, মনুষ্য জীবন থেকে পশু জীবনের স্তরে অধঃপতন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা এটা বুঝতে পারি যে, এর মানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার এত মহান সৌভাগ্য অর্জনের পরেও যদি কেউ এমন কোন কুরুচিকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে সে তার আধ্যাত্মিক উন্নতি হারিয়ে ফেলে এবং আবার দিব্য স্তর অর্জনের পূর্বে তাকে বহু বহু জন্মগ্রহণ করতে হয়। 

এটি কোন ধরনের উপভোগ যখন কেউ শুদ্ধ আধ্যাত্মিক আনন্দ পরিত্যাগ করে, যার মধ্যে জড়জাগতিক প্রমত্তা সহ দুঃখের স্পর্শ মাত্র নেই, যা অসীম এবং নিত্য? একপ্রকার মিথ্যে অহংকারের জন্য, অতি উদ্ধত মনের জন্য কেউ নিজেকে এই ধরনের কার্যকলাপ অনুকরণে লিপ্ত করে এবং এর মাধ্যমে আসলে সে কেবল মন ও ইন্দ্রিয় উপভোগে মগ্ন হয়। এটা কোন ধরনের দিব্য কার্য? এটা কেবল অতি বিরক্তিকর, খুবই দুর্ভাগ্যজনক কাজ। কোন সত্য সন্ধিৎসু বা যোগী বা ভক্তের এটিকে সব বিপদের মধ্যে সবথেকে বড় বিপদ হিসেবে মনে করে এড়িয়ে চলা উচিত। এর পরিবর্তে কেউ যদি শরণাগত হয় ও কেবল নিজেকে সংকীর্তন আন্দোলনে নিমগ্ন করে, তাহলে কোন ভক্ত সবসময় দিব্য ভাব বিনময়ের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবেন, যা সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তিকর। 

এই প্রশ্ন হয়ত আসতে পারে, “যদি কেউ সংকীর্তন অনুশীলন করে, তাহলে কেউ কিভাবে তা পরিত্যাগ করতে পারে?” এই মিথ্যা অহংকার-এর কারণে কেউ যদি সংকীর্তন ছেড়ে দেয়, তাহলে সে কৃষ্ণের আশ্রয় হারিয়ে ফেলে এবং মনকে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়, তিনি মনে করে যে মন হচ্ছে তার বন্ধু, এমনকি যদিও তার মন তার শত্রুর মতো কাজ করছে এবং তিনি তার অহংকারের কারণে অন্যান্য বৈষ্ণবদের, গুরুদেবের, শাস্ত্রের, আধ্যাত্মিক বুদ্ধির ভালো উপদেশ শোনে না;  এর পরিবর্তে মনের কথা শোনে যা জীবনের প্রকৃত মূল্য বিষয়ে ভুল ধারণার বশবর্তী। এরপর মিথ্যে অহংকারের কারণে কেউ তার প্রকৃত দায়িত্ব ভুলে যায় ও এই ধরনের ভ্রমে মধ্যে পতিত হয়। সেই জন্য ভক্তকে সবসময় তার মনকে মনে করিয়ে দিতে হবে, উর্ধ্বস্থ বুদ্ধির দ্বারা মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এইজন্য ভক্তিযোগের এই পন্থাটি ‘বুদ্ধিযোগ’ নামে পরিচিত, যেখানে বুদ্ধি মন এবং ইন্দ্রিয়সমূহকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলিকে জড়জাগতিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তি, প্রতিষ্ঠা, সম্মান এবং  পূজা লাভের বাসনার মানসিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বিপদ থেকে দূরে রাখে।

শ্লোক ৯ 
তাই দুষ্ট মন,       ‘নির্জন ভজন’
প্রচারিছ ছলে ‘কুযোগী-বৈভব’।
প্রভু সনাতনে,       পরম যতনে,
শিক্ষা দিল যাহা, চিন্ত সেই সব।।

এখানে আবার মনকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, মনকে শাসন করা হয়েছে, আমার খুব দুষ্ট মন!  এই তুমি জরজাগতিক মন! তুমি আমাকে তুমি আমাকে বিপথে চালিত করছ। তুমি আমাকে কত যুক্তি দিয়েছ, অনেক যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছ, কিন্তু সেই সব হচ্ছে মিথ্যা যোগের মতো। কেবল আমাকে আমার প্রকৃত কর্তব্য থেকে বিপথে চালিত করছে, আমাকে নির্জনভজনের দিকে চালিত করছে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন এর আশ্রয় থেকে দূরে চালিত করছে। তুমি আমাকে প্রতারণা করেছ। তুমি হচ্ছ প্রতারক। আমার মন, এই প্রতারক! কেন আমার তোমাকে অনুসরণ করা উচিত? আমার মালিক সনাতন গোস্বামী, তিনি কত সযত্নে আমাদেরকে ভক্তিমূলক সেবার এইসব ধরনের আগাছা এড়িয়ে যেতে শিক্ষা দিয়েছেন। 

যেমন চৈতন্যচরিতামৃতে সনাতন গোস্বামীড় প্রতি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষায়, ভক্তিমূলক সেবার বিভিন্ন ধরনের আগাছার কথা উল্লেখ করা হয়েছে —

‘নিষিদ্ধাচার’, ‘কুটীনাটী’, ‘জীবহিংসন’।
‘লাভ’, ‘পূজা’, ‘প্রতিষ্ঠাদি’ যত উপশাখাগণ।।
(চৈ. চ. মধ্য ১৯.১৫৯)

আরো অন্যান্য শ্লোক আছে যে নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করা, প্রতারণাপূর্ণ হওয়া বা ভক্তের তার আধ্যাত্মিক গুরু বা অন্যান্য বৈষ্ণবের সাথে কপট আচরণ করা, জীবের প্রতি হিংসা করা, পূজা লাভের বাসনা, ভক্ত সমাজে কোন পদ লাভের বাসনা, ভক্তিমূলক সেবার পরিবর্তে কোন ধরনের সুবিধা লাভের ইচ্ছা এবং ভক্তিতে আরো এইরকম অনেক আগাছা আছে যা ত্যাগ করা উচিত ও এড়িয়ে চলা উচিত। এখানে মনকে বারংবার সেটাই মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে ও তাকে তার যথাস্থানে রাখা হচ্ছে। 

মনের অত্যন্ত বিনয় নম্র হওয়া উচিত। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর, আমাদেরকে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে তিনি তার শিষ্যদেরকে বলতেন যে প্রত্যেকদিন সকালে তিনি উঠতেন ও তার মনকে ১০০ বার ঝাড়ুর বাড়ি এবং ১০০ বার জুতোর বাড়ি দিতেন, মনকে আধ্যাত্মিক গুরুর  আদেশের প্রতি, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আদেশের প্রতি অনুগত করানোর জন্য। এইরকম সাধারণ আনুগত্য না থাকলে এবং শরণাগত স্বভাবের মন না থাকলে, মন সবসময় আমাদের শত্রু হয়ে উঠবে ও আমাদেরকে চৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনের শুদ্ধ পথ থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। 

ইন্দ্র, তিনি মিথ্যেভাবে সন্ন্যাসীর পোশাকে এসেছিলেন পৃথু মহারাজের যজ্ঞের অশ্ব চুরি করতে এবং এইভাবে তিনি অনেক প্রকার অপসম্প্রদায় বা মিথ্যা গুরুপরম্পরা সৃষ্টি করেছিলেন, যা নকল যোগী বা নকল সন্ন্যাসীর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এমনকি আজও অনেক অপসম্প্রদায় আছে, যারা পরম সত্যের প্রচার করে না, এর পরিবর্তে বিকৃত ধারণা প্রচার করে যা পরম সত্যের অনুরূপ কিন্তু যা হচ্ছে আসলে কায়-মন এবং আত্মার ভুল ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ও সনাতন গোস্বামীর মত কর্তৃপক্ষ বা প্রামানিক শাস্ত্রের দ্বারা অনুমোদিত নয়। মন বিকৃত ধারণা উপস্থাপন করতে অত্যন্ত নিপুন, এটি শাস্ত্রের থেকে কোন শ্লোক নিয়ে তা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে, আমাদেরকে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করার একটি যুক্তি দেখানোর জন্য মনের এটি করার সক্ষমতা আছে, সেই জন্য কোন ভক্তের কেবল তার আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশের প্রতি শরণাগত হতে হবে। 

আধ্যাত্মিক গুরু হচ্ছেন সর্বোচ্চ আশ্রয়। যতক্ষণ না তিনি কাউকে শিক্ষাগুরু গ্রহণের অনুমোদন দিচ্ছেন, ততক্ষণ কোন ভক্তের অন্য কাউকে তার শিক্ষাগুরু হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। শ্রীল প্রভুপাদ আমাদেরকে বলেছিলেন যে, তিনি আমাদের দীক্ষাগুরু হিসেবে আছেন এবং তার সব শিষ্যদের জন্য তিনি হচ্ছেন শিক্ষাগুরু। তিনি বলেছিলেন যে, “আমার সব শিষ্যদের জন্য আমি হচ্ছি দীক্ষা এবং শিক্ষাগুরু।” তিনি আমাদেরকে তার আশ্রয় ছাড়া অন্য কোথাও যেতে অনুমোদন দেননি। একইভাবে, ভক্তকে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, আধ্যাত্মিক গুরুদেবের নির্দেশ মান্য করতে হবে। কারণ আমরা যদি মনের কথা মানি, তাহলে মন আমাদেরকে এমন অনেক যুক্তি দেবে যা তত্ত্বগতভাবে সঠিক বলে মনে হবে, কিন্তু সেইভাবে আমাদের মন আমাদেরকে প্রতারিত করবে। সেইজন্য, আমাদেরকে আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশ পালন করতে হবে, তাহলে আমরা নিরাপদ। উপনিষদ এটি বলা হয়েছে যে, “যার তার আধ্যাত্মিক গুরু এবং পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস আছে, তিনি অতি শীঘ্রই পরমেশ্বরের ভগবানের পূর্ণ আশ্রয় লাভ করেন ও সবকিছু, বেদের সকল নিগূঢ় তত্ত্ব তার কাছে প্রকাশিত হয়।” তাই প্রত্যেক যোগীর কর্তব্য হচ্ছে মনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। 

যোগীরা প্রাণায়াম করে, হঠ যোগ অনুশীলন করে শরীরের নিয়ন্ত্রণের জন্য। যখন তাদের শরীর নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তারা নিশ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে, যখন মন নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন তারা তা ধ্যানে মগ্ন করে, কুচিন্তা থেকে দূরে রাখে, এবং অবশেষে তারা ধ্যানে মগ্ন হয়ে সমাধি লাভের চেষ্টা করে, যেখানে তারা তাদের মনের কার্যকলাপ বন্ধ করে ফেলে এবং তারা ভগবানের স্বরূপের ধ্যানে মগ্ন হয়। ভক্তিযোগের পথ হচ্ছে এই ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে যান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও পরিবর্তনীয় প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলা এবং সরাসরি মনকে শ্রীকৃষ্ণে স্থির করা। যখন মন প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে, তখন ভক্তিযোগী পূর্ণ দৃঢ়তা ও বলসহ মনের সেইসব কার্যকলাপ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে এবং এটিকে শরণাগত হতে বাধ্য করে। শাস্ত্র বাক্যের ওপর ভিত্তি করে, আধ্যাত্মিক গুরুদেবের বাক্যের উপর ভিত্তি করে উচ্চ বুদ্ধির দ্বারা পরাস্ত করে। মনকে স্বতন্ত্র হতে দেয় না ও জোরপূর্বক হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে নাম শ্রবণে বাধ্য করে এবং পবিত্র নামের মহিমা সমন্বিত সংকীর্তনে নিযুক্ত করে। 

এইভাবে, মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। যদি আমরা মনকে অনিয়ন্ত্রিত হতে দেই, তাহলে আমরা এক খুব বিপদজনক পরিস্থিতিতে আছি। যেমন ভগবদগীতায় এটি বলা হয়েছে যে, “নিয়ন্ত্রিত মন হচ্ছে আমাদের বন্ধু আর অনিয়ন্ত্রিত মন হচ্ছে আমাদের সবথেকে বাজে শত্রু।” 

এখানে আমরা আজকে বামন দেবের আবির্ভাব সম্বন্ধে শুনলাম যে কিভাবে সবকিছু ছিল মঙ্গলময় ছিল। যখন আমরা কৃষ্ণকে আমাদের মনে মধ্যে রাখব, তখন তিনি আমাদের মনের মধ্যে আবির্ভূত হন এবং মনকে অন্য কোথাও বিপথগামী হতে দেন না। তখন সবকিছু মঙ্গলময় হয়। তখন আমাদের চেতনা আনন্দিত হয়। ঠিক যেমন, এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে এখানে সব ব্যক্তিরা আনন্দিত হয়েছিলেন — দেবতারা, গাভীরা, ব্রাহ্মণেরা, পাহাড়-পর্বত সব আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সর্বত্র আনন্দ বিরাজ করছিল। যখন ভগবান আমাদের চেতনায় আবির্ভূত হন, তখন আমরাও আনন্দিত হই। যদি আমরা ভক্তিমূলক সেবাতে আনন্দিত হচ্ছি না, তার মানে কোন না কোনভাবে আমরা কৃষ্ণকে আমাদের চেতনায় আনায়ন করতে সক্ষম হয়নি। যদি আমরা কৃষ্ণকে আমাদের চেতনায় আনয়ন করতে সক্ষম হতাম, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই আনন্দিত হতাম। যেইভাবে আমরা কৃষ্ণকে আমাদের চেতনায় আনয়ন করতে পারি, তা হচ্ছে তাঁর সেবার মাধ্যমে। কৃষ্ণ আমাদের উপভোগের বস্তু নয়, আমরা কৃষ্ণকে উপভোগ করতে পারব না, সেটা হচ্ছে জড়জাগতিক। আমরা পবিত্র নাম উপভোগ করতে পারব না, আমরা হরিনামের প্রতি শরণাগত হই, আমরা নাম কীর্তন করি, যাতে পবিত্র নামকে আমাদের কীর্তনের দ্বারা, জপের দ্বারা সন্তুষ্ট করতে পারি, আর তখন আমরা আনন্দ অনুভব করি। সহজিয়ারা কৃষ্ণকে উপভোগ করতে চায়, তারা পবিত্র নামকে উপভোগ করতে চায়, তারা কৃষ্ণের লীলা উপভোগ করতে চায় এবং সেইজন্য তাদের অপরাধের কারণে তারা প্রকৃত আনন্দ থেকে বঞ্চিত, যা আধ্যাত্মিক স্তরে উপলব্ধ হয় এবং এইভাবে তাদের আভ্যন্তরীণ বাসনা অপূর্ণ অনুভব করে তারা বিভিন্ন অবৈধ ক্রিয়া-কলাপে অধঃপতিত হয়। তাই প্রকৃত আনন্দের শুভারম্ভ হয় তখন, যখন আমরা সঠিক সেবা মনবৃত্তির মাধ্যমে আমাদের চেতনায় কৃষ্ণকে আনায়ন করতে পারি এবং সেই সেবা মনোবৃত্তি শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ ভক্তদের শ্রীপাদপদ্মের সেবার মাধ্যমেই সর্বশ্রেষ্ঠভাবে লাভ করা যায়, তা সেই সেবা ব্যক্তিগতভাবে হোক বা তাদের নির্দেশ পালন করার মাধ্যমে হোক। 

বামন অবতার আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তিনি সকল মঙ্গল বিধান করেছিলেন। একইভাবে ভগবান, আমরা যে মনোভাব নিয়ে তাঁর সেবা করি, সেই বিশেষ ভাব অনুসারে তিনি আসেন। তার সাথে আমাদের বিশেষ সম্পর্ক হচ্ছে তাঁর সেবা করার মাধ্যমে। তিনি কোন উপযুক্ত স্বরূপে আসবেন যাতে আমরা তাকে যথাযথভাবে সেবা করতে পারি। বামনদেব দরকার অনুসারে উপযুক্ত স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণও তেমনি আমাদের প্রত্যেকের সাথে তাঁর সম্বন্ধ অনুসারে সেইমত আমাদের মন, আমাদের হৃদয়ে আবির্ভূত হন। যখন আমরা যথার্থ ভক্তিমূলক মনোভাব নিয়ে তাঁর কাছে যাই, তখন তিনি নিখুঁতভাবে ভাব বিনিময় করেন। এই কারণে তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান। তিনি স্বয়ংপূর্ণ, তিনি সবদিক থেকে নিখুত। যদি আমরা কোন অপূর্ণতা অনুভব করি, কোন ত্রুটি অনুভব করি, ও যদি আমাদের নিজেদেরকে ঠিক করা ছাড়া আর কোন সমাধান না থাকে, তাহলে মনকে বুদ্ধির অধীন নিয়ে যাও এবং তা শুদ্ধ করো, ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত থাকো যতক্ষণ না তা ভগবানের আবির্ভাবের জন্য যথার্থভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তখন আমরা প্রকৃত আনন্দ অর্জন করতে পারব, এর কোন ছোট সহজ পথ নেই। অন্য কোন ধরনের আনন্দ বা তথাকথিত আনন্দ আমাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারবেনা। আমাদের কেবল নাম-কীর্তন, সংকীর্তনের শরণাগত হওয়া ছাড়া সব ধরনের অন্যান্য ইচ্ছা, সব ধরনের অন্যান্য আশা প্রত্যাখ্যান করা উচিত যাতে ভগবানকে তাঁর স্বাধীন ইচ্ছাবশত আমাদের মনে আবির্ভূত হন এবং সেটাই আমাদেরকে পরম পরিপূর্ণতা প্রদান করবে ও এমনকি আমরা জন্ম-জন্মান্তর ধরে তাঁর সেবায় নিযুক্ত থাকতে পারব। 

শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু-নিত্যানন্দ শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ॥  

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে 
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 22/4/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions