Text Size

২০২৫০৫১৭ শ্রীমদ্ভাগবতম ৩.১৫.৪৫

17 May 2025|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী ১৭ই মে, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারতে প্রদান করেছেন। এই প্রবচনটি শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ৩য় স্কন্ধ, ১৫শ অধ্যায়, ৪৫ নং শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎ কৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রীচৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ

ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ
নমো ভগবতে বাসুদেবায়
ওঁ
নমো ভগবতে বাসুদেবায়

শ্লোক ৩.১৫.৪৫
পুংসাং গতিং মৃগয়তামিহ যোগমার্গৈ
-ধ্যানাস্পদং বহু মতং নয়নাভিরামম্।
পৌংস্নং বপুর্দর্শয়ানমনন্যসিদ্ধৈ-
রৌৎপত্তিকৈঃ সমগৃণন্ যুতমষ্টভোগৈঃ॥

অনুবাদ: এইটি ভগবানের সেই রূপ যাঁর ধ্যান যোগীরা করে থাকেন, এবং এই রূপ তাঁদের কাছে পরম আনন্দদায়ক। এই রূপ কাল্পনিক নয়, বাস্তব, যা মহান যোগীরা অনুমোদন করে গেছেন। ভগবান অষ্ট ঐশ্বর্যযুক্ত, কিন্তু অন্যদের পক্ষে সেই সিদ্ধি পূর্ণরূপে লাভ করা সম্ভব নয়।

তাৎপর্য: যোগ-সিদ্ধির পন্থা এখানে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যোগ-মার্গের অনুগামীদের ধ্যানের বিষয় হচ্ছেন চতুর্ভুজ নারায়ণ। আধুনিক যুগে তথাকথিত বহু যোগী রয়েছে, যারা চতুর্ভুজ নারায়ণকে তাদের ধ্যানের লক্ষ্য বলে বিবেচনা করে না। তাদের কেউ কেউ নির্বিশেষ অথবা শূন্যের ধ্যান করার চেষ্টা করে, কিন্তু তা আদর্শ পন্থা অনুসরণকারী মহান যোগীদের দ্বারা অনুমোদিত হয়নি। প্রকৃত যোগ-মার্গের পন্থা হচ্ছে ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করা, এবং এই অধ্যায়ে বর্ণিত চারজন ঋষির সম্মুখে তিনি যেভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, কোন নির্জন ও পবিত্র স্থানে উপবেশন করে, সেই চতুর্ভুজ নারায়ণের ধ্যান করা। এই নারায়ণ রূপ হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের প্রকাশ বা বিস্তার; তাই, এই কৃষ্ণভাবনার আন্দোলন যা এখন সর্বত্র প্রসারিত হচ্ছে, সেটিই যোগের প্রকৃত এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা।

কৃষ্ণভক্তি হচ্ছে সুশিক্ষিত ভক্তিযোগীদের দ্বারা অনুষ্ঠিত সর্বোত্তম যোগের পন্থা। যোগ অনুশীলনের সমস্ত প্রলোভন সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষের পক্ষে অষ্ট-সিদ্ধি লাভ করা দুষ্কর। কিন্তু এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবান যিনি চারজন মহর্ষির সম্মুখে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি স্বয়ং এই অষ্ট-সিদ্ধি সমন্বিত। সর্বশ্রেষ্ঠ যোগের মার্গ হচ্ছে মনকে দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টা শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় একাগ্রীভূত করা। এই পন্থাকে বলা হয় কৃষ্ণভাবনা। শ্রীমদ্ভাগবত এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় কিংবা পতঞ্জলি কর্তৃক অনুমোদিত যে যোগ পদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে, সেইটি আজকাল পাশ্চাত্য দেশগুলিতে হঠযোগ বলে পরিচিত যে যোগের অনুশীলন হচ্ছে, তা থেকে ভিন্ন। প্রকৃত যোগ হচ্ছে ইন্দ্রিয় সংযমের অনুশীলন, এবং সেই অনুশীলনের ফলে ইন্দ্রিয়গুলি যখন সংযত হয়, তখন মনকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নারায়ণ রূপে একাগ্রীভূত করা উচিত। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান, এবং শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম শোভিত অন্য সমস্ত বিষ্ণুরূপ হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের অংশ-প্রকাশ। ভগবদ্গীতায় ভগবানের রূপের ধ্যান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মনের একাগ্রতার অভ্যাস করার জন্য মানুষকে তার মস্তক ও পিঠ এক সরল রেখায় সোজা করে রেখে বসতে হয়, এবং পবিত্র পরিবেশের প্রভাবে নির্মল হয়ে, নির্জন স্থানে অনুশীলন করতে হয়। যোগীকে কঠোরভাবে ব্রহ্মচর্যের নিয়ম ও বিধি পালন করতে হয়। জনাকীর্ণ নগরীতে, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করে, অসংযত যৌনজীবনে লিপ্ত হয়ে এবং জিহ্বার ব্যভিচারে প্রবৃত্ত থেকে কখনও যোগ অভ্যাস করা যায় না। যোগ অভ্যাসের জন্য ইন্দ্রিয় সংযম আবশ্যক, এবং ইন্দ্রিয়ের সংযম শুরু হয় জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। যিনি জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তিনি অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলিকেও দমন করতে পারেন। জিহ্বাকে সব রকম নিষিদ্ধ আহার এবং পানীয় গ্রহণ করার স্বাধীনতা প্রদান করে যোগ অভ্যাসে প্রগতি সাধন করা সম্ভব নয়। এইটি অত্যন্ত অনুশোচনার বিষয় যে, বহু তথাকথিত যোগী যারা যোগ সম্বন্ধে কিছুই জানে না, তারা পাশ্চাত্য দেশগুলিতে এসে যোগ অভ্যাসের প্রতি সেখানকার মানুষদের প্রবণতার সুযোগ নিয়ে তাদের প্রতারণা করে। এই সমস্ত ভণ্ড যোগীরা প্রকাশ্যে এমন কথা বলারও সাহস করে যে, মানুষ তার সুরাপানের প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে পারে এবং সেই সঙ্গে ধ্যানেরও অভ্যাস করতে পারে।

পাঁচ হাজার বছর আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাছে যোগ অভ্যাসের পন্থা বর্ণনা করেছিলেন, কিন্তু অর্জুন যোগ পদ্ধতির কঠোর বিধি-নিষেধ অনুসরণ করার প্রতি তার অযোগ্যতা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছিলেন। সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে তাদের কার্যকলাপের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অত্যন্ত ব্যবহারিক হওয়া এবং যোগ অনুশীলনের নামে কতকগুলি অর্থহীন কসরতের অভ্যাস করে তার মূল্যবান সময়ের অপচয় না করা। প্রকৃত যোগ হচ্ছে হৃদয়ের অভ্যন্তরে চতুর্ভুজ পরমাত্মার অন্বেষণ করা এবং ধ্যানের মাধ্যমে নিরন্তর তাঁকে দর্শন করা। এই প্রকার নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানকে বলা হয় সমাধি, এবং সেই ধ্যানের বিষয় হচ্ছেন চতুর্ভুজ নারায়ণ, যাঁর শ্রীঅঙ্গের বর্ণনা শ্রীমদ্ভাগবতের এই অধ্যায়ে করা হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি শূন্যের অথবা নির্বিশেষের ধ্যান করে, তাহলে যোগ অভ্যাসের মাধ্যমে সিদ্ধি লাভ করতে তার অতি দীর্ঘ সময় লাগবে। আমরা কখনই নির্বিশেষ বা শূন্যে মনকে একাগ্রীভূত করতে পারি না। প্রকৃত যোগ হচ্ছে ভগবানের চতুর্ভুজ নারায়ণ রূপে মনকে একাগ্রীভূত করা, যিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজমান।

ধ্যানের দ্বারা উপলব্ধি করা যায় যে, ভগবান হৃদয়ে বিরাজ করছেন। কেউ যদি তা না জেনেও থাকে, তবুও ভগবান সকলেরই হৃদয়ে বিরাজ করছেন। তিনি কেবল মানুষদের হৃদয়েই নয়, এমনকি কুকুর ও বিড়ালের হৃদয়েও রয়েছেন। ভগবদ্গীতায় ভগবান ঘোষণা করেছেন—ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের পরম নিয়ন্তা ঈশ্বর সকলের হৃদয়ে বিরাজ করছেন। তিনি কেবল সকলের হৃদয়েই নন, পরমাণুর অভ্যন্তরেও তিনি রয়েছেন। কোন স্থানই ভগবানের উপস্থিতিরহিত অথবা শূন্য নয়। এইটি ঈশোপনিষদের বাণী। ভগবান সর্বত্রই বিরাজমান, এবং তাঁর প্রভুত্ব সব কিছুর উপরেই প্রযোজ্য। যেই রূপে ভগবান সর্বত্রই বিরাজমান, তাঁর সেই রূপকে বলা হয় পরমাত্মা। আত্মা এবং পরমাত্মা উভয়েই স্বতন্ত্র ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে যে, আত্মা কেবল একটি বিশেষ শরীরে বর্তমান, কিন্তু পরমাত্মা সর্বত্রই বর্তমান। এই সম্পর্কে সূর্যের দৃষ্টান্তটি অত্যন্ত সুন্দর। কোন একজন ব্যক্তি কোন একটি স্থানে অবস্থান করতে পারেন, কিন্তু সূর্য স্বতন্ত্র ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও সমস্ত জীবের মাথার উপরে উপস্থিত। ভগবদ্গীতায় এই তত্ত্বের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাই, গুণগতভাবে যদিও সমস্ত জীব এবং ভগবান সমান, কিন্তু বিস্তারের আয়তনগত শক্তি অনুসারে পরমাত্মা জীবাত্মা থেকে ভিন্ন। ভগবান অথবা পরমাত্মা অনন্ত কোটি বিভিন্ন রূপে নিজেকে বিস্তার করতে পারেন, কিন্তু স্বতন্ত্র জীবাত্মা তা পারে না।

সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমাত্মা প্রত্যেকের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমস্ত কার্যকলাপের সাক্ষী থাকেন। উপনিষদে বর্ণনা করা হয়েছে যে, পরমাত্মা জীবাত্মার সখা এবং সাক্ষীরূপে তার সঙ্গে অবস্থান করেন। ভগবান সখারূপে সর্বদাই তাঁর বন্ধু জীবাত্মাকে তার প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উৎকণ্ঠিত থাকেন। সাক্ষীরূপে তিনি তার সমস্ত মঙ্গলবিধান করেন, এবং তার কর্মের ফল প্রদান করেন। এই জড় জগতে জীবাত্মাকে তার বাসনা অনুসারে উপভোগ করার জন্য পরমাত্মা সমস্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। জড় জগতের উপর প্রভুত্ব করার প্রবৃত্তির প্রতিক্রিয়া হচ্ছে দুঃখ। কিন্তু ভগবান তাঁর বন্ধু জীবাত্মাকে, যে তাঁর পুত্রও, অন্য সমস্ত কার্যকলাপ পরিত্যাগ করে নিত্য আনন্দ এবং জ্ঞানে পরিপূর্ণ শাশ্বত জীবন লাভ করার জন্য কেবল তাঁর শরণাগত হওয়ার উপদেশ দেন। সর্বপ্রকার যোগের সবচাইতে প্রামাণিক এবং ব্যাপকভাবে পঠিত গ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এইটি হচ্ছে চরম উপদেশ। এইভাবে ভগবদ্গীতার অন্তিম উপদেশ হচ্ছে যোগের পূর্ণতা বিষয়ে অন্তিম বাণী।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, যিনি সর্বদাই কৃষ্ণভাবনায় মগ্ন তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী। কৃষ্ণভাবনামৃত কি? জীবাত্মা যেমন তার চেতনার মাধ্যমে তার সমগ্র শরীরে বিদ্যমান, তেমনই পরমাত্মা তাঁর পরম চেতনার দ্বারা সমগ্র সৃষ্টি জুড়ে বিদ্যমান। সীমিত চেতনাসম্পন্ন জীবাত্মা এই পরম চেতন শক্তির অনুকরণ করে। আমার সীমিত শরীরে কি হচ্ছে তা আমি বুঝতে পারি, কিন্তু অন্য আর একজনের শরীরে কি হচ্ছে সেই সম্বন্ধে আমি কিছুই অনুভব করতে পারি না। আমার চেতনার দ্বারা আমি আমার সমগ্র শরীর জুড়ে বর্তমান, কিন্তু আমার চেতনা অন্য কারোর শরীরে বিদ্যমান নয়। কিন্তু, পরমাত্মা সর্বত্র এবং সকলের অন্তরে উপস্থিত থাকার ফলে, প্রত্যেকের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন। আত্মা এবং পরমাত্মার এক হওয়ার যে মতবাদ তা স্বীকার করা যায় না, কেননা প্রামাণিক বৈদিক শাস্ত্রের দ্বারা তা প্রতিপন্ন হয়নি। স্বতন্ত্র জীবাত্মার চেতনা পরম চেতনারূপে কার্য করতে পারে না। এই পরম চেতনা কিন্তু লাভ করা সম্ভব পরমেশ্বর ভগবানের চেতনার সঙ্গে স্বতন্ত্র জীবের চেতনাকে একীভূত করার মাধ্যমে। এই একীভূত করার পন্থাকে বলা হয় শরণাগতি বা কৃষ্ণভাবনামৃত। ভগবদ্গীতার উপদেশ থেকে আমরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানতে পারি যে, প্রথমে অর্জুন তাঁর ভাই এবং আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাননি, কিন্তু ভগবদ্গীতার উপদেশ হৃদয়ঙ্গম করার পর, তিনি শ্রীকৃষ্ণের পরম চেতনার সঙ্গে তাঁর চেতনা একীভূত করেছিলেন। তখন তিনি কৃষ্ণভাবনাময় হয়েছিলেন।

যে ব্যক্তি পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনাময়, তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ অনুসারে কার্য করেন। কৃষ্ণভক্তির শুরুতে, সদ্গুরুর মাধ্যমে এই নির্দেশ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যথেষ্ট শিক্ষা লাভের পর, কেউ যখন সদ্গুরুর তত্ত্বাবধানে প্রেম এবং ঐকান্তিক শ্রদ্ধা সহকারে শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেন, তখন তাঁর একাগ্রীভূতকরণের পন্থা আরও দৃঢ় ও নির্ভুল হয়। ভগবদ্ভক্তির এই স্তর হচ্ছে যোগের পরম পূর্ণতার স্তর। এই স্তরে, শ্রীকৃষ্ণ অথবা পরমাত্মা অন্তর থেকে নির্দেশ দেন, আর বাইরে থেকে শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ প্রতিনিধি সদ্গুরু কর্তৃক ভক্ত সাহায্য লাভ করেন। অন্তর থেকে চৈত্যগুরুরূপে তিনি তাঁর ভক্তকে সাহায্য করেন, কেননা তিনি সকলেরই হৃদয়ে বিরাজ করছেন। ভগবান যে সকলেরই হৃদয়ে বিরাজ করছেন তা উপলব্ধি করাই যথেষ্ট নয়। মানুষের কর্তব্য হচ্ছে অন্তরে ও বাইরে দুদিক থেকেই ভগবানের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, এবং কৃষ্ণভাবনায় সক্রিয় হওয়ার জন্য অন্তর থেকে ও বাইরে থেকে অবশ্যই র্দেশ গ্রহণ করা। সেটিই হচ্ছে মানবজীবনের পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তর এবং সমস্ত যোগের সর্বোচ্চ সিদ্ধি।

সিদ্ধযোগী আট প্রকার সিদ্ধি লাভ করতে পারেন, সেইগুলি হচ্ছে—তিনি বায়ুর থেকে হালকা হতে পারেন, পরমাণু থেকেও ছোট হতে পারেন, পর্বতের থেকেও বিশাল হতে পারেন, তার ইচ্ছা অনুসারে তিনি সব কিছু লাভ করতে পারেন, তিনি ভগবানের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, ইত্যাদি। কিন্তু, কেউ যখন ভগবানের নির্দেশ প্রাপ্ত হওয়ার শুদ্ধ অবস্থার স্তরে উন্নীত হন, তখন উল্লিখিত যে কোন জড়জাগতিক সিদ্ধির স্তরের থেকে সেই স্তর অনেক ঊর্ধ্বে। যোগ পদ্ধতির অনুশীলনে যে প্রাণায়ামের অভ্যাস করা হয় তা সাধারণত প্রাথমিক স্তরের অনুশীলন। পরমাত্মার ধ্যান করা হচ্ছে অগ্রসর হওয়ার পথে একটি পদক্ষেপ মাত্র। কিন্তু পরমাত্মার সঙ্গে সরাসরিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা এবং তাঁর নির্দেশ গ্রহণ করা হচ্ছে সর্বোচ্চ সিদ্ধির স্তর। পাঁচ হাজার বছর আগেও ধ্যানযোগে প্রাণায়ামের অভ্যাস অত্যন্ত কঠিন ছিল, তা না হলে শ্রীকৃষ্ণের উপদিষ্ট এই পন্থা অর্জুন প্রত্যাখ্যান করতেন না। এই কলিযুগকে বলা হয় অধঃপতিত যুগ। এই যুগে সাধারণ মানুষের আয়ু অল্প এবং আত্ম-উপলব্ধি বা পারমার্থিক জীবনের উপলব্ধির ব্যাপারে তারা অত্যন্ত মন্দমতি; তারা সকলেই প্রায় ভাগ্যহীন, এবং তাই, আত্ম-উপলব্ধি সম্বন্ধে কারও যদি একটু প্রবণতা থেকেও থাকে, তাহলে নানা প্রকার প্রবঞ্চনার প্রভাবে তারা পথভ্রষ্ট হতে পারে। যোগের পূর্ণতার স্তর হৃদয়ঙ্গম করার একমাত্র উপায় হচ্ছে ভগবদ্গীতার তত্ত্ব অনুশীলন করা, যা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু করেছিলেন। সেটিই হচ্ছে যোগ অনুশীলনের সবচাইতে সরল এবং সর্বোত্তম পূর্ণতা। বেদান্ত, শ্রীমদ্ভাগবত, ভগবদ্গীতা এবং অন্যান্য বহু গুরুত্বপূর্ণ পুরাণের নির্দেশ অনুসারে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু কেবল ভগবানের দিব্য নাম কীর্তন করার মাধ্যমে ব্যবহারিকভাবে কৃষ্ণভাবনাময় যোগ-পদ্ধতির পন্থা প্রদর্শন করে গেছেন।

সবচাইতে অধিক সংখ্যক ভারতবাসীরা এই যোগ পদ্ধতির অনুশীলন করেন, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু শহরে ধীরে ধীরে তার প্রসার হচ্ছে। এই যুগের জন্য এই পন্থাটি অত্যন্ত সরল এবং ব্যবহারিক, বিশেষ করে যোগ অনুশীলনে সফল হওয়ার ব্যাপারে যারা ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী তাদের জন্য। এই যুগে অন্য কোন যোগের পন্থা সফল হতে পারে না। সুবর্ণ যুগ বা সত্যযুগে, ধ্যানের পন্থা সম্ভব ছিল, কেননা সেই যুগে মানুষের আয়ু ছিল শত সহস্র বৎসর। কেউ যদি ব্যবহারিক অনুশীলনে সফল হতে চান, তাহলে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তিনি যেন হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে,এই মহামন্ত্র কীর্তন করেন, এবং তার ফলে তিনি নিজেই বুঝতে পারবেন কিভাবে তাঁর প্রগতি হচ্ছে। ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণভাবনার এই অনুশীলনকে রাজবিদ্যা বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

যাঁরা সবচাইতে সাবলীল এই ভক্তিযোগের পন্থা অবলম্বন করেছেন, যাঁরা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অপ্রাকৃত প্রেমপরায়ণ হয়ে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত সেবার পন্থা অবলম্বন করেছেন, তাঁরা হলফ করে বলতে পারেন যে, এই পন্থা কত সুখকর এবং সহজসাধ্য। সনক, সনাতন, সনন্দন ও সনৎকুমার এই চারজন মহর্ষিও ভগবানের রূপ এবং তাঁর শ্রীপাদপদ্মরেণুর দিব্য সৌরভের দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যা ইতিমধ্যেই ৪৩ নম্বর শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে।

যোগ অভ্যাসে ইন্দ্রিয় সংযম আবশ্যক, কিন্তু ভক্তিযোগ বা কৃষ্ণভাবনার পন্থা হচ্ছে ইন্দ্রিয়গুলিকে কলুষ থেকে মুক্ত করার পন্থা। ইন্দ্রিয়গুলি যখন নির্মল হয়, তখন সেইগুলি আপনা থেকেই সংযত হয়। কৃত্রিম উপায়ে ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ বন্ধ করা যায় না, কিন্তু ইন্দ্রিয়গুলি যদি ভগবানের সেবায় যুক্ত করার মাধ্যমে পবিত্র করা হয়, তখন সেইগুলিকে কেবল কলুষিত প্রবৃত্তি থেকেই নিয়ন্ত্রিত করা যায় না, উপরন্তু ভগবানের দিব্য সেবাতেও যুক্ত করা যায়, যা সনক, সনাতন, সনন্দন এবং সনৎকুমার এই চারজন মহর্ষি অভিলাষ করেছিলেন। তাই, কৃষ্ণভাবনামৃত কোন মনগড়া কৃত্রিম পন্থা নয়, এইটি ভগবদ্গীতার (৯/৩৪) নির্দেশিত পন্থা-মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।

........

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: এখানে আমরা যোগ অভ্যাসকারীদের বিষয়ে দেখতে পাচ্ছি। এখানে  বিভিন্ন দৈহিক যোগব্যায়াম অনুশীলন সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন রকমের যোগ পদ্ধতি রয়েছে। অনেক প্রকারের যোগ রয়েছে, যেমন—কর্মযোগ, ধ্যানযোগ, জ্ঞানযোগ, অষ্টাঙ্গযোগ, ভক্তিযোগ। বেদ আমাদের বিভিন্ন সত্য সম্বন্ধে জ্ঞান প্রদান করে। এখন অষ্টাঙ্গযোগ অভ্যাস—এই পাশ্চাত্য দেশে বলে যে তোমরা সবকিছু করতে পারো, সেই সঙ্গে যোগ করতে পারো। শ্রীল প্রভুপাদ এখানে প্রকৃত অষ্টাঙ্গযোগ অনুশীলন এবং পাশ্চাত্য দেশে যা অনুশীলন করা হয় উভয়ের মধ্যে তারতম্য প্রদর্শন করেছেন। বর্তমানে ক্যালেন্ডারে ‘যোগ দিবস’ নামক একটি দিন তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীও কিছু যোগাসন করেন। হঠযোগ হয়ত স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম, কিন্তু তা যথাযথভাবে অনুশীলন করা না হলে সেটা যথার্থ ফল দেবে না। তাই শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের—“হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে” জপ করার বিধান দিয়েছেন।

যারা ভক্তিযোগের পন্থা অনুশীলন করেন, তারা অতি দ্রুত উন্নতি লাভ করেন। চার কুমারগণ—সনক, সনাতন, সনন্দন এবং সনৎকুমার, তাঁরা নির্বিশেষ উপলব্ধিতে মগ্ন ছিলেন, কিন্তু যখন তাঁরা ভগবান ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুর চতুর্ভুজ রূপ ও তাঁর শ্রীপাদপদ্মে নিবেদিত তুলসী দর্শন করেছিলেন, (তখন তাঁরা ভগবানের সবিশেষ রূপের প্রতি আকৃষ্ট হলেন) এই ভক্তিযোগের পন্থা হচ্ছে এমনকিছু, যে সম্বন্ধে ভগবদগীতায় প্রতিপন্ন করা হয়েছে—“মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমঃস্কুরু”।

আমরা এই ভক্তিযোগের পন্থা অনুশীলন করি। আমরা সবাই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ-কীর্তন করি, প্রসাদ গ্রহণ করি, নিজেদের ইন্দ্রিয়সমূহকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করি এবং এর মাধ্যমে আমাদের ইন্দ্রিয়সমূহ স্বাভাবিকভাবেই পরিশুদ্ধ হয়। এই ভক্তিযোগের পন্থা আমাদের সকল ইন্দ্রিয়সমূহকেই সর্বতোভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করে। সকল ইন্দ্রিয়সমূহকেই ভগবানের সেবায় ব্যবহার করা যায়। আমাদের কিছু ভক্তগণ গ্রন্থ বিতরণ সেবায় নিযুক্ত আছেন। আমাদের শ্রীশ্রীমৎ ভক্তিবিজয় ভাগবত স্বামী মহারাজ বর্ণনা করতে পারবেন যে এই গ্রন্থ বিতরণ সেবা কত আত্মশুদ্ধকারী একটি পন্থা। এই ইন্দ্রিয়গুলি কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করলে স্বাভাবিকভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। প্রত্যেক ইন্দ্রিয়, যেমন—জিহ্বাকে কৃষ্ণকথা বলতে ও কৃষ্ণপ্রসাদ আস্বাদনে নিযুক্ত করতে পারি। নাক ভগবানকে নিবেদিত ধুপ ও পুষ্পের সুঘ্রাণ গ্রহণ করতে পারে। শ্রীমদ্ভাগবত, ভক্তিরসামৃতসিন্ধুত এবং শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে এর বর্ণিত হয়েছে যে কিভাবে উন্নত ভক্তেগণ স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গসৌরভ আঘ্রাণ করতে পারেন, এবং এটা তাদের অনেক বিরহের মধ্যে ফেলেছে। বর্ণিত আছে—শ্রীকৃষ্ণ তাঁর শ্রীঅঙ্গে অগরু এবং চন্দন  লেপন করেন, এবং কৃষ্ণের এক নিজস্ব অঙ্গসুবাস আছে, আর এই সুগন্ধ সমগ্র স্থানকে সুগন্ধিত করে তোলে।

পাণিহাটিতে একটি লীলায় সংঘটিত হয়েছিল ও আজ এস.এম.আই.এস স্কুল পাণিহাটি মহোৎসব উদযাপন করছে। প্রসাদ বিতরণের পর সবাই রাঘব পণ্ডিতের গৃহে একত্রিত হয়েছিলেন। ভগবান শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু নৃত্য করেছিলেন এবং ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন—যথায় শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু নৃত্য করেন, তথায় তিনি উপস্থিত থাকবেন। আমরা জানি না যে ভগবান নিতাই-গৌর যখন একসাথে নৃত্য করেন, তখন সেই দৃশ্য কেমন অপরূপ সুন্দর দেখায়। ভগবান শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু চৈতন্য মহাপ্রভুকে দর্শন করতে পারছিলেন, কিন্তু অন্যেরা তাঁকে দর্শন করতে পারছিলেন না। নিতাই বললেন—“শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দক্ষিণ ভারতীয় পুষ্পরাজি সমন্বিত একটি মাল্য পরিধান করে আছেন!” তবে সেই পুষ্পমাল্য সহ ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সুঘ্রাণ সবাই গ্রহণ করতে পারছিলেন। তখন কিছু ভক্তগণ সেই সৌরভ আঘ্রাণে সচেষ্ট হলেন! এবং তারপর যখন তারা ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অঙ্গসৌরভ ঘ্রাণ করতে পারলেন, তখন তারা চেতননাশক গ্যাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার মতো অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। পর পর সব ভক্তরা পড়ে গেলো! কিন্তু তারা ধীরে ধীরে  মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন।

অতএব, সব ইন্দ্রিয়সমূহ কৃষ্ণসেবায় নিযুক্ত করা যায়। আমরা আমাদের কর্ণদ্বয় শ্রবন করার জন্য ব্যাবহার করি এবং আমরা আমাদের চক্ষুদ্বয় শ্রীশ্রীপঞ্চতত্ব ভগবানের অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত রূপ দর্শনের জন্য এবং সুন্দর রাধা-মাধব অষ্টসখী এবং রাধা-মাধব মায়াপুরচন্দ্রকে দেখার জন্য ব্যাবহার করি। গতকাল ঘোষণা করা হয়েছিল যে গঙ্গায় কুমির দেখা গেছে। আজকে কি দেখা গেছে? আমার চিত্ত বিক্ষিপ্ত হয়েছিল, কারণ কুমীরেরা যেভাবে তাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে ভক্তদের ভক্ষণ করার জন্য ব্যাবহার করে—এটা পূর্ব বর্ণিত ইন্দ্রিয় সংযুক্তির মতো এক বিষয় নয়।

শ্রীধাম মায়াপুরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সংকীর্তন আন্দোলনের শুভারম্ভ করেছিলেন। ২৪ বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাস নিয়েছেন এবং জগন্নাথপুরী গেছেন। ভগবানের চিন্ময় জগত থেকে শ্রীধাম মায়াপুরে অবতরণের বহু কারণের মধ্যে একটি কারণ ছিল পতিত জীবদের উদ্ধার করা। তিনি দেখলেন কিছু মানুষ তাঁর কৃপা লাভ না করে পলায়ন করছে, যেমন—নির্বিশেষবাদী, অভক্ত ও আরও অন্যান্য অনেকে। তাই তিনি ভাবলেন ‘আমি কিভাবে সকলকে উদ্ধার করব?’ তখন তিনি মনস্থ করলেন—আমি সন্ন্যাস গ্রহণ করব। কারণ তৎকালীন সময়ে ছাত্ররা এবং মায়াবাদীরা সন্ন্যাসীদের সম্মান করত। তিনি জগন্নাথপুরীতে তাঁর সংকীর্তন আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিলেন এবং কিছু গুহ্যলীলাবিলাসও করেছিলেন। এরপর তিনি সমগ্র দক্ষিণ ভারত এবং ভারতের অন্যান্য প্রান্তে গিয়ে প্রচার করেছিলেন। তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ভক্তের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এইভাবে তিনি সংকীর্তন আন্দোলনের প্রচার-প্রসার করছিলেন। এই সংকীর্তন আন্দোলন প্রসারের জন্য আমাদের আপনাদেরও সহায়তা প্রয়োজন।

গতকাল মায়াপুরে ২৮০০০ দর্শনার্থী এসেছিলেন। কেউ একজন আমাকে চিঠি লিখেছিলেন যে আমরা এই সকল দর্শনার্থীদের কাছে প্রচার করতে পারি। এই ভক্ত লিখেছিল যে—কিছু সিনেমাকৃষ্ণের উপরে করলে, সেটা দেখা যায়। যে যদি আমরা কৃষ্ণভাবনাময় কোন চলচ্চিত্র বা সেরকম কিছুর ব্যবস্থা করি, তাহলে তারা তা দর্শনে আগ্রহী হবে। এভাবে আপনারাও ভাবতে পারেন যে কিভাবে কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রচার করা যাবে। তৃণমূল কংগ্রেস দল পুরো কলকাতায় শ্রীল প্রভুপাদ ও টি.ও.ভি.পি.-র ছবি দিয়ে ব্যানার লাগিয়েছে এবং তারা বলছে আপনারা আপনাদের এম.এল.এ.-র থেকে মায়াপুর যাওয়ার জন্য বিনামূল্য টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন। আমি জানি না ভারতে বা বিশ্বের অন্য কোনো সরকার এমনভাবে শ্রীল প্রভুপাদের বিজ্ঞাপন দিয়েছে কিনা! হরিবোল! অতএব, সরকারও মায়াপুরের প্রচার করছে! হয়ত এর মধ্যে কোন রাজনৈতিক রণকৌশল থাকতে পারে, সেই সম্বন্ধে আমি জানি না, তবে যাইহোক তারা শ্রীল প্রভুপাদের প্রচার করছেন! তারা মায়াপুরের প্রচার করছেন!

আজকে আমাদের সংকীর্তন দলের ভক্তরা পূর্ব ভারতে যাবে এবং তাঁরা সমগ্র পূর্ব ভারতে মায়াপুর সম্বন্ধে প্রচার করবে। আমাকে বলা হয়েছিল তাঁরা আজকে রওনা দেবে, কিন্তু এখন বলা হল আজ নয় তাঁরা ২৪শে মে যাবে। এখন গ্রীষ্মকাল এবং তাই সাধারনত ভক্তরা বলে—আমি মায়াপুরে থাকব। কিন্তু সংকীর্তন ভক্তরা সেখানে গিয়ে সংকীর্তন প্রচার, গ্রন্থ বিতরণ ও মায়াপুরের মহিমা প্রচারের কৃচ্ছসাধনে স্বেচ্ছায় ব্রতী হচ্ছেন। অবশ্য যদি আপনারা গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে চান, তাহলে অবশ্যই দীঘার জগন্নাথ ধামে যেতে পারেন! আর গ্রন্থ বিতরণের ব্যবস্থাপনা পরিদর্শনের জন্য কালকে মহারাজও সেখানে যাবেন।

শ্রীশ্রীমৎ ভক্তিবিজয় ভাগবত স্বামী মহারাজ: গুরুমহারাজ সেখানে আমাদের গ্রন্থ বিতরণ ও অন্যান্য বিভিন্ন সেবার জন্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ভক্তের প্রয়োজন আছে।

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: তারা আপনাকে প্রসাদ এবং থাকবার জায়গা দেবেন, আর যদি কেউ বিদেশী হন, তাহলে শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ পাবেন!

কোনো প্রশ্ন আছে?

প্রশ্ন: গুরুমহারাজ আপনি সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলি ভগবানের সেবায় নিযুক্ত করার ব্যাখ্যা দিলেন, কিন্তু অনেক সময় ভক্তগোষ্ঠীর বিভিন্ন ভক্তদের নিজেদের ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, তারা বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারে কৃপা করে কিছু উপদেশ দিন।

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী : আমি জানি না, আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করতে পারেন যে তারা কি আসলেই সম্পূর্ণভাবে তাদের ইন্দ্রিয়সমূহকে কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করছে? কিছু ভক্তদের পরিস্থিতি হয়ত ভিন্ন, যেমন গজেন্দ্র মোক্ষ লীলায় গজেন্দ্র কুমিরের সাথে যুদ্ধ করছিল। গজেন্দ্র ছিল একটি স্থলজ পশু, কিন্তু সেই পরিস্থিতি কুমিরের জন্য ভালো ছিল কারণ কুমির জলজ প্রাণী। তাই শ্রীল প্রভুপাদ তাৎপর্যে বলেছেন—যেরকম পরিস্থিতিতে আপনি নিজেকে অধিক শক্তিশালী অনুভব করেন, আপনি সেই পরিস্থিতি গ্রহণ করুন। কিছু মানুষ হয়ত সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারী হয়ে অধিক শক্তিশালী এবং কিছু জন হয়ত গৃহস্থ আশ্রমে অধিক শক্তিবান। আমি কখনো কখনো কিছু ভক্তদের দেখি যে তারা তাদের স্মার্টফোনে মহিলাদের সাথে কথা বলছেন! তাই লক্ষ্য করুন যে আপনি কোন আশ্রমে অধিক বলবেন, কারণ আমরা এখন মায়ার সাথে যুদ্ধ করছি! আমাদের সংস্থায় অনেক কৃষ্ণভাবনাময় নারীরা আছেন, তাই আপনি এমন কাউকে বিবাহ করতে পারেন ও একজোট হয়ে মায়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন! যদি আপনারা সন্ন্যাস আশ্রমের মধ্যে শক্তি বেশি পায়, তাহলে ঠিক আছে সেভাবে হয়। ঠিক আছে?

 

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by পায়েল চন্দ্র 31/12/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions