Text Size

২০২১০৬০৬ ভক্তি-বৈভব প্রশ্নের উত্তর

6 Jun 2021|Duration: 00:05:08|Bengali|Question and Answer Session|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

এখন আমি আমার ভক্তি-বৈভব পরীক্ষার অংশ হিসেবে একটি সংক্ষিপ্ত প্রবচন দেব। তারপরে আমি ইংল্যান্ডের ভক্তদের দর্শন করব।

ভক্তি-বৈঠক নিবন্ধের প্রশ্ন:- কেন রানী কুন্তী দুঃখ চেয়েছেন? এর সাথে নিজের ব্যক্তিগত অনুশীলন এবং কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করুন। শ্রীমদ্ভাগবতমের ১/৮/২৫ শ্লোক এবং তাৎপর্য থেকে এর প্রসঙ্গ তুলে ধরুন এবং কমপক্ষে এর সাথে প্রাসঙ্গিক ভক্তিশাস্ত্রীর তিনটি যথাযথ শ্লোক উল্লেখ করুন।  

জয়পতাকা স্বামী:- 

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
পরমানন্দমাধবম্ শ্রী চৈতন্য ঈশ্বরম্
হরি ওঁ তৎ সৎ 

কুন্তী মহারানী কৃষ্ণের কাছে দুঃখ প্রার্থনা করেছিলেন, কারণ “তাতে যদি আমি তোমার শ্রীপাদপদ্ম দর্শন করতে সক্ষম হই, তাহলে বারংবার আমার জীবনে দুঃখ আসুক। কারণ তোমাকে দর্শন করে আমি মুক্তি প্রাপ্ত হতে পারব।” এখন এই প্রার্থনায় কুন্তী দেবী ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বারংবার দর্শন করার ইচ্ছা ব্যক্ত করছিলেন। সাধারণত ভক্তরা, সকাম ভক্ত, কামনা যুক্ত ভক্ত। তারা ভগবানের কাছে জড় জাগতিক ইচ্ছা পূর্তির প্রার্থনা করে, তারা দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে চায় না। কিন্তু এখানে কুন্তী দেবী ব্যক্ত করছেন যে শ্রীকৃষ্ণের দর্শন লাভ এতই প্রশংসনীয় যে তার মূল্য যদি দুঃখ-কষ্ট ভোগ করা হয়, তাহলে যাতে তার জীবনে দুঃখ আসে। অতএব, আমরা আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে এই থেকে বুঝতে পারি যে আমাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় অত্যন্ত সমর্পিত হওয়া উচিত।

ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, জড় জাগতিক মানুষের সঙ্গ করার থেকে আমাদের নারকীয় পরিস্থিতিতে কোন লৌহ স্থানে থাকা ভালো। কাত্যায়নী সংহিতাতে একটি শ্লোক আছে যে, যে সকল অভক্তরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজার বিরোধী, তাদের সঙ্গে থাকার থেকে লৌহ কারাগারে বা জ্বলমান অগ্নিতে থাকা ভালো। বিষ্ণু রহস্যে উল্লেখ আছে, যে সমস্ত ব্যক্তিরা মনে করে দেবতাগণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সমতুল্য বা তার থেকে স্বাধীন, তাদের সঙ্গ করার পরিবর্তে সাপ, বাঘ বা কুমিরকে আলিঙ্গন করা উচিত। এই সমস্ত মানুষেরা জড়জাগতিক ইচ্ছা দ্বারা পরিপূর্ণ। তাই এক অর্থে বলা যেতে পারে, ভক্তিমূলক সেবার বিপরীত কোন কিছু গ্রহণ করার থেকে, দুঃখ কষ্ট গ্রহণ করা ভালো। এবং ভক্তরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে প্রসন্ন করার জন্য সবকিছু করতে পারে। 

যখন শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে তাঁর মাথাব্যথা করছে, তখন নারদ মুনি বিভিন্নজনের কাছে যান। মাথা ব্যথা সারানোর জন্য তার ভক্ত পদধুলি দরকার এবং তখন নারদ মুনির বিভিন্নজনের কাছে যান —ব্রাহ্মণ, কৃষ্ণের পত্নীগণ। প্রত্যেকে বলেছিলেন, “আমি কিভাবে আমার চরণ ধুলি দিতে পারি? আমাকে নরকে যেতে হবে।” কিন্তু যখন তিনি গোপীদের কাছে গেলেন, তখন তারা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “নিন! নিন! কৃষ্ণের মাথা ব্যথা হয়েছে।” “আপনারা নরকের যাওয়ার ব্যাপারে চিন্তিত নন?” “সে ঠিক আছে! প্রথমে কৃষ্ণের মাথাব্যথা সেরে যাক।” তাই শুদ্ধ ভক্তরা কৃষ্ণের প্রীতিবিধানের জন্য কঠিনতা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। আমরা দেখি যে কুন্তী দেবী তিনিও সেই মনোভাবে ছিলেন। আমাদেরও সেই মনোভাবে থাকা দরকার যে কৃষ্ণের প্রীতিবিধানের জন্য আমরা যাতে যে কোনো কঠিনতা গ্রহণ করতে পারি। গ্রন্থ প্রচারকারীরা তারা গ্রন্থ প্রচার করে, কখনো গ্রীষ্ম কখনো শীত। কিন্তু তারা সেই সব ক্লেশ গ্রহণ করে কৃষ্ণকে খুশি করার জন্য, তাই এটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে আমাদের প্রাধান্য কি — আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে চাই নাকি আমরা কৃষ্ণের প্রীতিবিধান করতে চাই? 

দশম স্কন্ধের, ১৪ অধ্যায়, ভক্তরা কৃষ্ণের কৃপার জন্য অপেক্ষারত ছিলেন এবং সেই জন্য তারা বিভিন্ন ক্লেশ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তবুও তারা কৃষ্ণের কৃপা চাইছিলেন। এই হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তের ভাবনা এবং আমাদেরও এই ধরনের ভাবনা থাকা উচিত। জড় জগতে আমরা আমাদের পূর্ব কর্মের জন্য দুঃখ-কষ্ট ভোগ করি, কখনও আনন্দ কখনও দুঃখ। কিন্তু ভক্তরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপালাভের জন্য সবকিছু স্মরণ করতে সক্ষম, তাই কখনও কখনও ভক্তরা মনে করে যে ভক্ত হওয়ায় কারণে আমার কোন কষ্ট আসবেনা, কিন্তু কুন্তী দেবী তিনি বলছেন, “কষ্টের সময় আমরা তোমাকে দেখতে পাই, তাই আমাদের জীবনে যাতে কষ্ট থাকে। যদি তোমাকে দর্শন করার জন্য কষ্ট পেতে হবে, তাহলে আমি কষ্ট পেতে চাই।” এই জড় জগতে আমরা দুঃখ ও আনন্দ ভোগ করতে বাধ্য, কিন্তু ভক্তরা দুঃখ বা আনন্দ গ্রাহ্য করে না, তারা কেবল কৃষ্ণের সেবা করতে চায়। হরিবোল! 

বলা হয়েছে যে ভগবত গীতা ৪র্থ অধ্যায়, ৯ নং শ্লোক —জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ। ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।যদি কেউ বুঝতে পারে যে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এবং কর্ম দিব্য, তাহলে মৃত্যুর পর তিনি দেহ রাখলে কৃষ্ণের কাছে ফিরে যান। আসলে কৃষ্ণকে স্মরণ করাই হচ্ছে মুক্তির পথ। ঈষোপনিষদ মন্ত্র ১৪তে বলা হয়েছে যে, কৃষ্ণ হচ্ছেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান। যাঁর নাম, রূপ, গুণ ও লীলা তাঁর থেকে অভিন্ন এবং কেউ যদি এটি বুঝতে সক্ষম হয়, তাহলে মৃত্যুর পর তিনি ভগবদ্ধামে ফিরে যাবে। তাই কৃষ্ণের প্রতি সমর্পিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তাঁর নাম, লীলা, গুণ তাঁর থেকে অভিন্ন। যুধিষ্ঠির মহারাজির কৃষ্ণের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন, যদিও কুন্তী দেবী এই অপূর্ব সুন্দর প্রার্থনা বলছিলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠির মহারাজ প্রেমবশত ভগবানকে বিলম্বে রওনা হওয়ার প্রার্থনা করেছিলেন। যুধিষ্ঠিরের সেই প্রেমভাব ভগবানকে বাধিত করেছিল। ভগবান স্বাধীন কিন্তু তিনি প্রেম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে চান। যুধিষ্ঠির মহারাজ তার রাজ্যের সকলকে তার সন্তানের মত দেখতেন। কেবল মনুষ্য নয়, পশু ও অন্যান্যদেরও যেমন পক্ষী, সরীসৃপ প্রাণী, তার রাজ্যে থাকা প্রত্যেককেই। এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে তিনি সকল জীবের প্রতি কত যত্নশীল ছিলেন।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 21/7/2023
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions