Text Size

২০২০১১২৮ শ্রীমদ্ভাগবতম ১.৪.১৫-১৬

28 Nov 2020|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

নিন্মোক্ত প্রবচনটি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী ২৮ শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, শ্রীধাম মায়াপুর, ভারতে প্রদান করেছেন। এই প্রবচনটি শুরু হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধ, ৪র্থ অধ্যায়, ১৫-১৬ নং শ্লোক পাঠের মাধ্যমে।

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্
 যৎ কৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীন তারণম
 পরমানন্দমাধবম্ শ্রীচৈতন্য ঈশ্বরম্
 হরি ওঁ তৎ সৎ

শ্লোক ১৫
স কদাচিৎ সরস্বত্যা উপস্পৃশ্য জলং শুচিঃ।
বিবিক্ত এক আসীন উদিতে রবিমণ্ডলে॥ ১৫॥

অনুবাদ: একসময়ে তিনি (ব্যাসদেব) সূর্যোদয়ের সময় সরস্বতী নদীর জলে প্রাতঃস্নান করে একাকী উপবিষ্ট হয়ে ধ্যানস্থ হলেন।

তাৎপর্য: হিমালয়ের শিখরে বদরিকাশ্রমের পাশ দিয়ে সরস্বতী নদী প্রবাহিত হচ্ছে। সুতরাং, এখানে যে স্থানের উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে বদরিকাশ্রমের শম্যাপ্রাস নামক স্থান, যেখানে শ্রীব্যাসদেব অবস্থান করছিলেন।

শ্লোক ১৬
পরাবরজ্ঞঃ স ঋষিঃ কালেনাব্যক্তরংহসা।
যুগধর্মব্যতিকরং প্রাপ্তং ভুবি যুগে যুগে॥ ১৬॥

অনুবাদ: মহর্ষি বেদব্যাস এই যুগের ধর্ম-বিপর্যয় দর্শন করলেন। কালের অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে বিভিন্ন যুগে পৃথিবীতে তা হয়ে থাকে।

তাৎপর্য: ব্যাসদেবের মতো মহান্ ঋষিরা হচ্ছেন মুক্ত পুরুষ, এবং তাই তাঁরা অতীত এবং ভবিষ্যৎ স্পষ্টরূপে দর্শন করতে পারেন। তাই তিনি কলিযুগের দুর্দশাগ্রস্ত ভবিষ্যৎ দর্শন করতে পেরেছিলেন, এবং সেই জন্য এই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের মানুষেরা যাতে পারমার্থিক জীবন লাভ করতে পারে, তার আয়োজন করেছিলেন। এই কলিযুগের মানুষেরা সাধারণত অত্যন্ত গভীরভাবে অনিত্য বিষয়ের প্রতি আসক্ত। অজ্ঞানাচ্ছন্ন থাকার ফলে তারা দুর্লভ মানব জীবনকে সার্থক করে পারমার্থিক জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হতে পারে না।

….....

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী: আমরা এখানে লক্ষ্য করতে পারছি যে ব্যাসদেব সরস্বতী নদীতে অবগাহন করেছিলেন। আমরা জানি যে প্রয়াগ বা এলাহাবাদে ত্রিবেণী রয়েছে—যেখানে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী একত্রে মিলিত হয়েছে। বর্তমানে সরস্বতী নদী ভূপৃষ্ঠের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হন। এখানে মায়াপুর ধামে সরস্বতী আছেন। এখানে যমুনা, সরস্বতী, গঙ্গা—একসাথে আছেন। আমি ভাবলাম ভক্তদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভাল যে এখানেও সরস্বতী নদী অবস্থান করছেন। ব্যাসদেব বসেছিলেন এটা ভবিষ্যতে কিভাবে মানুষের মঙ্গল হবে। উনি দেখতে পেরেছেন এই কলিযুগের মানুষ বিভিন্ন অসুবিধা হবে। শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এখানে মূল সমস্যার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। যা ১৬ নং শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে। কলিযুগে মানুষেরা অত্যন্ত জড় বিষয়াসক্ত। তারা এমনকি চিন্তাও করে না যে এই জড় দেহের উর্ধ্বেও কিছু আছে। আবার কিছু জন আছে, তারা মনে করে আমি দেহ ও আমার আত্মা আছে। বাংলায় বলে—“তোমার শরীর কেমন আছে?” কিন্তু পাশ্চাত্যদেশে তারা এরকম বলে না, তারা বলে—“তুমি কেমন আছ?” তারা মনে করে তারা হচ্ছে শরীর। প্রত্যেক ভাষাতেই এই একই কথা বলা হয়, যেমন “কোমো এসটাস?” (স্প্যানীশ ভাষায় আপনি কেমন আছেন) কিন্তু এই যে ধারণা যে—“আপনার শরীর কেমন আছে?” তা পারমার্থিক যুগ থেকেই চলে আসছে, কারণ আত্মা সর্বদা আনন্দময়, কিন্তু আমাদের শরীর কখনো অসুস্থ আবার কখনো সুস্থ থাকে।

আমরা দেখতে পারছি যে বর্তমানে আমাদের অনেক প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে। যেমন এই ভাগবত ক্লাস ইন্টারনেটে দেওয়া হচ্ছে। অনেকের কাছেই ক্যামেরা আছে, মোবাইল ফোন আছে। আমরা এইসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারি আধ্যাত্মিক চেতনা বিস্তার করার জন্য। চৈতন্য মহাপ্রভুর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের চেতনাকে পরমার্থিক স্তরে তুলে দেওয়া। এবং এটাই হচ্ছে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের বিশেষ কৃপা। প্রভুপাদ পাশ্চাত্য গিয়ে সেখানকার রজ ও তমগুণে আচ্ছন্ন মানুষদের দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন—তারা এর জন্য গর্বিত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা অনেক কষ্ট পাচ্ছে। অতএব, মানুষেরা মনে করে যে তারা সত্যিই অনেক উন্নতি করেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা জীবনের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে অজ্ঞাত, সেই জন্য বেশি কষ্ট পাচ্ছে। তাই তাদেরকে পারমার্থিক জ্ঞান প্রদান করার মাধ্যমে তারা মুক্ত ও সুখী হতে পারবে। কেউ বিশ্বের কোন স্থানে আছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ এখন বিশ্বের প্রত্যেক স্থানেই কলিযুগের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী—তা সেটা অস্ট্রেলিয়া হোক বা চীন, মালয়েশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা উত্তর আমেরিকা, সর্বত্র একই পরিস্থিতি। শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন যে মানুষের চিন্তাধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন গড়ে তোলা যাবে। আমাদের বৈদিক তারামণ্ডল সমন্বিত মন্দির বা টি.ও.ভি.পি মানুষের হৃদয়ে সেই আধ্যাত্মিক জাগরণ সৃষ্টি করবে। আর এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন তার সমগ্র বিশ্বে সৃষ্টি করবে। তাই আমরা বাণী প্রচারের জন্য এই সব আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে মানুষেরা এই সব প্রযুক্তি অবৈধ কার্যকলাপের জন্য ব্যবহার করছে, যেহেতু তারা জানে না আমাদের আসল প্রকৃতি কি। এইভাবে আমরা চাই মানুষ যাতে জাগে, আমাদের একটি গান আছে—“জীব জাগো! জীব জাগো!” মানুষেরা মায়ার কোলে নিদ্রিত অবস্থায় আছে। তারা মনে করে তারা হচ্ছে এই শরীর এবং তারা এটা বুঝতে পারে না যে তাদের সঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক নিত্য সম্বন্ধ রয়েছে। ঠিক আছে জাগতিকভাবে আমাদের একটি পরিবার আছে, যেমন—মা-বাবা, ভাই, বোন। কিন্তু আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে এটাই আমাদের জীবনের চরম বাস্তবতা নয়।

ঠিক যেমন ভগবান চৈতন্য মহাপ্রভুর কীর্তনের সময়ে শ্রীবাসের পুত্র মারা গিয়েছিলেন। চৈতন্য মহাপ্রভু বললেন—“তোমার পুত্রকে এখানে নিয়ে এসো।” তিনি তার পুত্রের মৃতদেহ নিয়ে এসেছিলেন। তখন চৈতন্যদেব বলছিলেন—“ওঠো! ওঠো! তুমি কেন তোমার পিতা-মাকে ছেড়েছ? কেন চলে গেছো?” তখন সেই বালক জিজ্ঞাসা করলেন—“কোন পিতা-মাতা? আমি যতবার জন্মগ্রহণ করেছি, ততবার পিতা মাতা পেয়েছি।” মহাপ্রভু বললেন, “আমি অবশ্যই শ্রীবাস ও মালিনী দেবীর কথা বলছি।” তখন তিনি বললেন, ‘ওহ, তারা খুবই যথার্থ পিতা-মাতা, তাঁরা আমাকে ভগবদ্ভক্তি দিয়েছেন। কিন্তু আমি এই জগতে অবস্থান করব নাকি চলে যাব—এই সব কিছুই তোমার নিয়ন্ত্রণাধীন, আমার কোন স্বতন্ত্রতা নেই। তুমি যদি চাও যে আমি চলে যাব, তাহলে যাব। আর যদি থাকতে বলো, তাহলে থাকব। তুমি হচ্ছ পরমেশ্বর ভগবান ও সবকিছুর নিয়ন্তা।” এইভাবে সেই পুত্র আধ্যাত্মিক স্তরে অধিষ্ঠিত হয়ে এই সব কথা বলছিলেন এবং তিনি এটি প্রকাশ করেছিলেন যে তিনি ভগবদ্ধামে ফিরে যাচ্ছেন। তখন চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর মাতাকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তিনি কি চান? কিন্তু শ্রীবাস ও তাঁর পত্নী এতটাই আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন ছিলেন যে, তাঁদের পুত্র ভগবদ্ধামে ফিরে যাচ্ছেন দেখে তারা বললেন, “ঠিক আছে!” তাই আমাদের বোঝা উচিত যে আমরা এই জড়দেহ নই। আমাদের দেহ আছে, আমাদের এই দেহের যত্ন নিতে হবে, কিন্তু সেটিই চরম বাস্তবতা নয়। সেইজন্য ভগবান কৃষ্ণ ভগবদগীতা বলেছেন এবং সেই জন্যই শ্রীমদ্ভাগবতম বলা হয়েছে, যাতে ‘প্রকৃত জীবন কী এবং পরমেশ্বর ভগবান কত অসাধারণ।’—সেই সম্বন্ধে মানুষদের প্রকৃত ধারণা প্রদান করা যেতে পারে ।

এই কলিযুগে আমরা হোমযজ্ঞ বা মন্দিরে বিগ্রহ অর্চন করার জন্য যোগ্য নই, সেই জন্য ভগবান তাঁর দিব্য নামরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। যদি আমরা এই দিব্যনাম জপ করি, তাহলে সর্ব সাফল্য লাভ করতে পারব। এই মানব জীবন অত্যন্ত দুর্লভ। আর এই মানব জন্মেই আমরা আসলে এটি উপলব্ধি করতে সক্ষম যে—আমরা কে? এবং আমাদের সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক কি? এবং যদি আমরা ভক্তিযোগ অনুশীলন করি, তাহলে আমরা খুব সহজেই সাফল্য লাভ করতে পারব। এই কলি যুগে ভক্তিযোগ হচ্ছে সবথেকে সোজা রাস্তা। এবং যেকোনো অন্য ভক্ত্যাঙ্গও আমরা হরে কৃষ্ণ নাম কীর্তন সহ সম্পাদন করি। যেমন—মন্দিরে শ্রীবিগ্রহ অর্চন, হোম-যজ্ঞ। আমরা দেখি যে মানুষেরা যখন হরে কৃষ্ণ কীর্তন করেন, তখন তারা নৃত্য করেন ও মহা আনন্দ অনুভব করেন। শ্রীল প্রভুপাদ চিন্তা করতেন যে মানুষেরা কিভাবে কৃষ্ণভাবনাময় হবে? সেভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু হরিদাস ঠাকুরের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিভাবে যারা যবন বা মাংসাহারী ইত্যাদি, কিভাবে উদ্ধার হবে?” ওই সময় বেশিরভাগ মাংসাহারী ছিল মুসলমান। হরিদাস ঠাকুর বললেন, “যখন তাদের কোন শুকর আক্রমণ করে, তখন তারা বলে ‘হারাম! হারাম! হারাম!’ যার অর্থ অপবিত্রকারী, কিন্তু কোন না কোনভাবে তারা বলছে ‘হা রাম’—‘হে আমার প্রিয় ভগবান শ্রীরাম।’ এমনকি যদিও তারা নামাভাস স্তরে নাম উচ্চারণ করছে, কিন্তু ভগবানের নাম এতই শক্তিশালী যে যেভাবেই উচ্চারণ করা হবে, তা কাজ হবে।” শ্রীল প্রভুপাদ বলছিলেন যে, শ্রীল হরিদাস ঠাকুর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে বলেছিলেন—“চিন্তা করবেন না! চিন্তা করবেন না!” এটাই যেকোনো ভক্তের মনোভাব হওয়া উচিত—চৈতন্য মহাপ্রভুর চিন্তাভার লাঘব হোক।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by পায়েল চন্দ্র 25/12/2025
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions