Text Size

২০২১০৭২৫ শ্রীমদ্ভাগবতম ১.৯.৪৭

25 Jul 2021|Duration: 00:45:03|Bengali|Śrīmad-Bhāgavatam|শ্রীমায়াপুর্ ধাম, ভারত

শ্রীমদ্ভাগবতম্ ১.৯.৪৭ 
তুষ্টুবুর্মুনয়ো হৃষ্টাঃ কৃষ্ণং তদগুহ্যনামভিঃ।
ততস্তে কৃষ্ণহৃদয়াঃ স্বাশ্রমান্‌ প্রযযুঃ পুনঃ॥

অনুবাদ:- সমস্ত মহর্ষিগণ গুঢ় বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা সেখানে উপস্থিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গুণ কীর্তন করলেন। তারপর শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ে ধারণ করে তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করলেন।

তাৎপর্য:- ভগবানের ভক্ত সর্বদাই ভগবানের হৃদয়ে থাকেন, আর ভগবান ও সর্বদা ভক্তের হৃদয়ে থাকেন। সেটিই হচ্ছে ভগবানের সঙ্গে তাঁর ভক্তের মধুর সম্পর্ক। ভগবানের প্রতি অনন্য প্রেম এবং ভক্তির ফলে ভক্তেরা সর্বদাই তাদের অন্তরে তাঁকে দর্শন করেন, এবং ভগবানও, যদিও তার কোনকিছু করার নেই বা কোন কিছু চাওয়ার নেই, তথাপি তিনি সর্বদা তার ভক্তের কল্যাণ সাধনে তৎপর থাকেন। সাধারণ জীবের সমস্ত কর্ম এবং তার ফলের জন্য প্রকৃতির নিয়ম রয়েছে, কিন্তু তিনি সর্বদাই তার ভক্তদের সৎ পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকেন। ভক্তরা তাই সরাসরি ভাবে ভগবানের তত্ত্বাবধানে থাকেন। আর ভগবানও স্বেচ্ছায় তাঁর ভক্তের তত্ত্বাবধানে নিজেকে সমর্পন করেন। তাই ব্যাসদেব প্রমুখ সমস্ত ভগবত ভক্ত ঋষিরা সেখানে সাক্ষাভাবে উপস্থিত পরমেশ্বর ভগবানের প্রসন্নতা বিধানের জন্য অন্তেষ্টি-ক্রিয়ার পর বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন। সমস্ত বৈদিক মন্ত্র কীর্তন করা হয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রসন্নতা বিধানের জন্য। সে কথা শ্রীমদ ভগবতগীতায় (১৫/১৫) প্রতিপন্ন হয়েছে। সমস্ত বেদ, উপনিষদ, বেদান্ত ইত্যাদি কেবল তাঁকেই অন্বেষণ করছে, এবং সমস্ত মন্ত্র কেবল তাঁরই মহিমা কীর্তনের জন্য। তাই সমস্ত খষিরা সেই উদ্দেশ্যে উপযুক্ত সমস্ত কার্য যথাযথভাবে সম্পাদন করেছিলেন, এবং তারা আনন্দিত চিন্তে তাদের নিজ নিজ আশ্রমের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেছিলেন।

জয়পতাকা স্বামী:- ভক্ত হৃদয়ের মধ্যে ভগবান থাকে, ভগবানের হৃদয়ের মধ্যে ভক্ত থাকে। এখন ভীষ্মদেব শেষ মুহূর্তে সম্পূর্ণভাবে চেতনা কৃষ্ণের উপর রেখেছেন। তিনি এইসব তীরের আর কোন কষ্ট অনুভব করছেন না, তিনি কেবল শ্রীকৃষ্ণের দিব্য রূপের কথা স্মরণ করছেন, সেই ধ্যানের মধ্যে তিনি দেহ ত্যাগ করলেন। প্রত্যেকেই চুপ ছিলেন, তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি ভগবদ্ধামে ফিরে গেছেন। তখন আকাশ থেকে পুষ্প বৃষ্টি হয়েছে এবং এই শ্লোকে সমস্ত ঋষিরা মন্ত্র পাঠ করা শুরু করেছে। এই সমস্ত বৈদিক শ্লোকগুলো ভগবানের সন্তুষ্ট করার জন্য, এইভাবে সবকিছুই অত্যন্ত কৃষ্ণভাবনাময় ছিল। 

ভানু স্বামী এটি ব্যাখ্যা করছিলেন যে কিভাবে সত্যযুগে প্রত্যেকেই মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিলেন, সেই জন্য তারা ধ্যান করতে পেরেছিলেন। ত্রেতা যুগে এক চতুর্থাংশ ধর্ম নষ্ট হয়ে যায় এবং মন একটু অধিক অস্থির হয়ে ওঠে, তাদের মন সংযোগের জন্য অগ্নির প্রয়োজন ছিল। ত্রেতা যুগের নিয়ম ছিল হোম-যজ্ঞ, দ্বাপর যুগে অর্ধেক ধর্ম নষ্ট হয়ে যায়, সেই জন্য তাদের মন সংযোগের জন্য মন্দিরে শ্রীবিগ্রহের প্রয়োজন ছিল। আমরা জানি যে সেখানে অনেক অসুর ছিল, শ্রীকৃষ্ণ অনেক অসুরকে হত্যা করেছিলেন এবং কলিযুগে মন আরও বিক্ষিপ্ত এবং তিন চতুর্থাংশ ধর্ম নষ্ট হয়ে গিয়েছে, সেই জন্য কলিযুগে হরিনাম সংকীর্তনের এই পন্থা দেওয়া হয়েছে। হরিনাম যে কোন স্থান, যেকোনো জায়গায় করতে পারে, কেবলমাত্র পবিত্র নাম শ্রবণ করা, কিন্তু এখন মানুষদের মধ্যে দৈব এবং আসুরিক গুন আছে। আমি খবরে দেখেছি যে আমেরিকাতে তারা কোভিড-১৯ এর বিধি-নিষেধ দিয়েছে এবং সেখানে একটা নাইট ক্লাব আছে, যেখানে ভর্তি মানুষেরা নাচছিল এবং নেশা করছিল ৫০০-১০০০ জন। এটা দেখা ঠিক নারকীয় পরিস্থিতির মত ছিল, সম্পূর্ণ তমগুণ। বর্তমান সময়ে মানুষেরা এতই বিভ্রান্ত যে তারা মূল্যবান মনুষ্য জীবন সম্পর্কে জানেনা। তারা প্রকৃতপক্ষে পবিত্র নাম জপ করে সুখী হতে পারবে।

এইভাবে কালকে আমরা করছিলাম শ্রীমদ্ভাগবত অধ্যয়ন করে পুরুষ, মহিলা সবাই বিশেষ উপকৃত হয়। বোকা মানুষেরা, তারা মনে করে যে তাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করার মাধ্যমে তারা খুশি হবে, কিন্তু তারা সেই একই ইন্দ্রিয় দ্বারা দুঃখ পেতে বাধ্য হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যে মানুষদের সতর্ক হওয়া উচিত, কিন্তু মানুষেরা এর গ্রাহ্য করছে না। শ্রীল প্রভুপাদ বলছিলেন যে আমরা কাউকে একে একে হত্যা করি, কিন্তু যখন কৃষ্ণ তা করেন, তিনি বহু সংখ্যায় হত্যা করেন। এখন ইতিমধ্যেই কোভিড-১৯ এর জন্য ৪ লক্ষ মানুষ মারা গেছে এবং এই সংখ্যা কমছে না। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষেরা যাতে হরে কৃষ্ণ জপ করে এবং ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হয়। 

আমরা ভীষ্মদেবের শরীর ত্যাগ সম্পর্কে শ্রবণ করছি, এটা অত্যন্ত সুন্দর ব্যাপার। আমরা দেহ নই, আমরা নিত্য শাশ্বত আত্মা, আমরা কৃষ্ণের আণবিক শক্তি। ভক্ত কৃষ্ণের জন্য প্রেম আছে বলে, সবসময় কৃষ্ণ রাখেন হৃদয়ের মধ্যে। আমরা শুদ্ধ প্রেমের প্রচার করছি, কিন্তু মানুষেরা বিভ্রান্ত এবং তারা কামের প্রচার করছে। যখন তারা নেশা করে, তখন তারা খুব খুশি, এই কারণে প্রভুপাদ বলছিলেন যে বর্তমান সমাজ হচ্ছে আধুনিক পশু সমাজ। কৃষ্ণ তাঁর ভক্তদেরকে তাঁর হৃদয়ে রাখেন, কৃষ্ণ দেখতে চান যে তাঁর ভক্তরা যেন সঠিক পথে থাকে এবং যাতে তারা ভগবদ্ধামে ফিরে যায়, কৃষ্ণ কখনো কখনো নিজেকে তাঁর ভক্তের তত্ত্বাবধানে রাখতেন, তিনি হচ্ছেন সবার ভগবান, তিনি হচ্ছেন জগন্নাথ কিন্তু নন্দ মহারাজের জন্য তিনি ওনার পাদুকা বহন করেছিলেন, কৃষ্ণ ওনাকে তাঁর যত্ন নিতে দিয়েছিলেন। তিনি শান্তি দূত হয়েছিলেন, তিনি অর্জুনের রথচালক হয়েছিলেন, তার এসব করতে হতো না, কিন্তু তিনি এটা করতে পছন্দ করেন। ঠিক যেমন তিনি তাঁর ভক্তদের সেবা করতে পছন্দ করেন, তাঁর ভক্তরা সবসময় তাঁর সেবা করতে চান। যখন মা পার্বতী মহাদেব শিবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে— “অনেক ধরনের পূজা আছে, কোনটি শ্রেষ্ঠ?” মহাদেব শিব উত্তর দিয়েছিলেন, “আরাধনাং সর্বেষাং বিষ্ণোরাধনং পরম” (পদ্ম পুরাণ) সব ধরনের পূজার মধ্যে বিষ্ণুর পূজা শ্রেষ্ঠ। একটি জিনিস তার থেকেও শ্রেষ্ঠ, সেটা হচ্ছে কৃষ্ণের সাথে সম্বন্ধিত বিষয়ের পূজা, ‘তদিয়া’-এর পূজা তার থেকেও শ্রেষ্ঠ। যদি আপনি মহাদেব শিবকে একজন স্বাধীন ভগবান হিসেবে পূজা করেন, তাহলে তা প্রসন্নতাবিধানকারী নয়, কিন্তু যদি আপনি মহাদেব শিবকে সর্বশ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব রূপে পূজা করেন, তাহলে তা প্রসন্নতাবিধানকারী। বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভুঃ(ভাগবত ১২.১৩.১৬) শম্ভু হচ্ছেন সব বৈষ্ণবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এটাই হচ্ছে রহস্য যে আমাদের কৃষ্ণের সাথে সম্বন্ধিতভাবে দেবতাগণের পূজা করা উচিত, তাহলে তা মঙ্গলময়।

এখন আমরা ভীষ্মদেবের শরীর ত্যাগ সম্পর্কে এবং কিভাবে তারা শেষকৃত্য করেছিলেন তা পড়ছি। এবং কিভাবে সব ঋষিগণ বিভিন্ন বৈদিক স্তোত্র পাঠ করে তার প্রয়াণ উদযাপন করছিলেন। গতকাল মায়াপুরে আমরা শ্রী শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামীর অপ্রকট বার্ষিকী উদযাপন করেছি, কোনভাবে এই একই সময় আমরা ভাগবতে ভীষ্মদেবের অপ্রকটের শ্লোক পড়ছি। গতকাল তারা শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের উদ্ধৃতি দিয়েছিল এবং তিনি লিখেছিলেন যে, যারা বলে বৈষ্ণব মারা যায়, তারা ভ্রমাত্মক, কারণ তারা এখনও বাণীর মাধ্যমে বিরাজমান এবং জীবিত থাকাকালীন তারা চারিদিকে পবিত্র নাম প্রচার করার প্রয়াস করেছেন। 

আমি মনে করছিলাম যে কিভাবে দেবানন্দ পণ্ডিত অপরাধী ছিলেন, কিন্তু বক্রেশ্বর পণ্ডিতের সঙ্গে পেয়ে তিনি পরিবর্তিত হয়েছিলেন। তিনি জানতে চাইছিলেন যে কিভাবে ভাগবত অধ্যয়ন করা হয়, কিভাবে ভাগবত শিখাব? চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন যে ভাগবতে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভক্তিমূলক সেবা ছাড়া আর কিছুই নেই। এই কারণে ভাগবতকে বলা হয় অমল পুরান। যেহেতু সেখানে ভক্তিমূলক সেবা ছাড়া আর কিছুর বর্ণনা নেই, অন্যান্য পুরান বা অন্যান্য শাস্ত্রে ভগবান আছেন, ভক্তিমূলক সেবার কথা আছে, কিন্তু অন্যান্য কিছু আছে, এই কারণে মানুষেরা মাঝে মধ্যেই একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে তাদের কি করা উচিত, কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতে ভক্তি ছাড়া কিছুই নেই। এটি বলা হয়েছে যে যদি কোন মূর্খ ব্যক্তি শ্রীমদ্ভাগবতের শরণ গ্রহণ করে, তাহলে তারাও আশীর্বাদ পায়। তাই ভাগবত প্রত্যেকের অধ্যয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরীক্ষিত মহারাজ জীবন উৎসর্গ করেছেন ভগবানকে আকর্ষণ করার জন্য, শ্রীল প্রভুপাদ অনেক কষ্ট করে শ্রীমদ্ভাগবত ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন এবং ভক্তি চারু মহারাজ তিনি তা ইংরেজি থেকে বাংলাতে অনুবাদ করেছিলেন। ভক্তিবিজয় ভাগবত স্বামী বলছিলেন, অনেক অধ্যাপক শিক্ষক ইত্যাদি শিক্ষিত লোক প্রশংসা করেন এই শ্রীমদ্ভাগবত সাধু ভাষায় নয় — সাধারণ বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছে। একজন ব্যক্তি মায়াবাদী পণ্ডিতের এক পাঠ থেকে ফিরছিল, একজন ভক্তও ফিরছিলেন, তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ওহ! আপনার অনুষ্ঠানটি কেমন লেগেছে?” “ওহ! খুব খুব ভালো, ভীষণ ভালো অনুষ্ঠান।” “স্বামীজি কি বলেছেন?” “স্বামীজি তিনি কি বলেছেন! তিনি কি বলেছেন! আমি সাধারণ ব্যক্তি, আমি কিভাবে জানবো তিনি কি বলেছেন। এটা খুবই ভালো ছিল, কিন্তু আমি কিছুই বুঝিনি।” তাই এটাই হচ্ছে ভিন্নতা যে শ্রীল প্রভুপাদ এই উচ্চতত্ত্ব অত্যন্ত সহজে বোঝার মতো করে উপস্থাপন করেছেন। 

এই ছিল দেবানন্দ পণ্ডিতের প্রতি চৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ যে দয়া করে ভাগবতে ভক্তিমূলক সেবাকে উপস্থাপন করুন, এটাই হচ্ছে মানুষের দুঃখ দুর্দশার সমাধান। এখন কোনো না কোনোভাবে এই মহামারীতে আমাদের মানুষদের দিয়ে হরে কৃষ্ণ জপ করানো উচিত। ভগবানের নাম জপ করানো উচিত। যেহেতু আমরা কর্মের নিয়ম, প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করেছি, তাই আমরা কষ্ট ভোগ করতে বাধ্য হচ্ছি। এমনকি আমাদের কিছু ভক্তরাও কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু যদি তারা তাদের চেতনা কৃষ্ণতে কেন্দ্রীভূত করতে পারে, যেমন ভীষ্মদেব করেছিলেন, তাহলে এইভাবে তারা সর্বোচ্চ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। তাই ভাগবতের এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে যেহেতু আমরা সকলেই মৃত্যুর সম্মুখীন হব এবং তাই আমরা যদি সতর্ক না হই, তাহলে আমাদের আবার জন্মগ্রহণ করতে হবে কিন্তু যেভাবে ভীষ্মদেচলে গেলেন, সবাই জানে তিনি আর ফিরে আসবেন না। হরিবোল! হরিবোল! আমি আশা করি যে প্রত্যেকেই নিজেদেরকে সর্বশেষ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করবে, তাহলে প্রত্যেকেই কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার মাধ্যমে সারাজীবন সুখী হবে।

- END OF TRANSCRIPTION -
Transcribed by ভক্তিপ্রিয়া রাই দেবী দাসী 5/3/2024
Verifyed by
Reviewed by

Lecture Suggetions